ভারতীয় চলচ্চিত্রে মহাকাব‍্যের অনুষঙ্গ – ‘আর আর আর’ ছায়াছবি বিষয়ে কিছু ব‍্যক্তিগত ভাবনা


ড. শারদা মণ্ডল, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, ভূগোল বিভাগ , প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজ 

সিনেমা রিভিউ

আর আর আর (Rise, Roar, Revolt) ছায়াছবির মুক্তির তারিখ – ২৫ শে মার্চ, ২০২২

পরিচালক: এস এস রাজামৌলি

এ ছবির মূল ভাবনাকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায় –
১। মানবিকতার প্রতি বার্তা
২। আধুনিক প্রযুক্তির দুরন্ত প্রয়োগ
৩। মহাকাব‍্যের ভিন্ন ব‍্যাখ‍্যা
৪। ভারতীয় মানসে অভিঘাত
৫। বাস্তব – কল্পনার মিশেল ও আবেগের বিস্ফোরণ

ছবিটি বোনা হয়েছে অত‍্যাচারী ইংরেজের বিরুদ্ধে গ্রামের ছেলে পুলিশ অফিসার রাম এবং গোন্ড উপজাতির সরল যুবক ভীমের, যৌথ লড়াইয়ের গল্প নিয়ে।

সিনেমা শুরু হয় দর্শককে চোখের আরাম দিয়ে, দাক্ষিণাত‍্যের মালভূমি আর অনুচ্চ পাহাড়ের মাঝে ঘন সবুজ অরণ‍্যে। ভেসে আসে কচি গলায় মিষ্টি গান। ক‍্যামেরা আরও ভিতরে ঢুকলে দেখা যায় জঙ্গলের ভিতরে ছোট্ট গ্রাম। সেখানে এক মেমসাহেবের ফর্সা হাতে  ময়ূর আঁকতে আঁকতে গান গাইছে একটি ক্ষুদ্র আদিবাসী বালিকা মল্লি। একটু পরেই বোঝা যায় এই মেমসাহেবা হলেন ফার্স্ট লেডি মানে বড়লাটের বৌ। তাঁর শখ পূরণ করতে ইংরেজ কনভয় জোর করে মল্লিকে গাড়িতে তুলে নেয় এবং দিল্লিতে লাটসাহেবের প্রাসাদে বন্দী করে। শুরুর এই ঘটনাটিতেই বোঝা যায় ক্ষমতাদর্পী শাসক জঙ্গলের মন বোঝেনা। সেখানে আসে শুধু তার সম্পদ আর ইমান লুন্ঠন করতে। ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তিতে দর্শকের স্নায়ু টানটান করে শুরু হয় ইংরেজ গাড়ির কনভয়ের সঙ্গে মল্লির মায়ের অসম দৌড়। মা পাহাড়ের পাকদন্ডি আর বনের অলিগলি দিয়ে ছুটে এসে কনভয়ের সামনে দাঁড়ায়, চিপকো আন্দোলনের মতো, মেয়ে যে গাড়িতে আছে, তার চাকা জড়িয়ে ধরে। এক লাফে ইংরেজ সার্জেন্ট মায়ের মাথায় বন্দুক ধরে। বড়লাট গাড়ি থেকে নেমে কঠোর কাটা কাটা ভাষায় তাকে নির্বিকার বুঝিয়ে দেয় কেন এক একটি ইংলিশ বুলেট একটি ভারতীয় প্রাণের তুলনায় দামী। ভারতীয় প্রাণ নিতে গেলে বিকল্প ভাবতে হবে। সার্জেন্ট মুহূর্তের মধ‍্যে শুকনো কাঠ কুড়িয়ে এনে মায়ের মাথায় ক্রিকেট ব‍্যাটের ভঙ্গিতে তীব্র আঘাত করে। প্রথম দৃশ‍্যেই মায়ের দেহ দর্শকের কোলের কাছে ছিটকে এসে দর্শকে বিবশ করে ফেলে। 

এরপর দর্শকের পরিচয় হয় রামের সঙ্গে, রাম ইংরেজ শাসকের এক বিশ্বস্ত পুলিশ অফিসার, যে পদোন্নতির জন‍্যে দেশের লোকের প্রতি যেকোনো অত‍্যাচারে সামিল হতে পারে। সে ইংরেজি কথোপকথনে চোস্ত, স্মার্ট এবং চালাকিতে সিদ্ধহস্ত এবং অসম্ভবকে সম্ভব করার মতো অমিত শক্তির অধিকারী। দেখা যায় পুলিশ কর্তার দফতরে নিজামের মুখপাত্র জানান নিজামের বার্তা এই যে তাঁর অধিকারভুক্ত এলাকা থেকে যে বালিকাকে ফার্স্ট লেডি নিয়ে এসেছেন, তাকে ফেরৎ দিয়ে দিলে ভালো হয়। কারণ ঐ আদিবাসীর দল মেয়েটিকে উদ্ধারের জন্য দিল্লি এসে গেছে। দর্পিত শাসক নিজামের বার্তা তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দেয় আর রামকে নিয়োগ করে ঐ দলকে ধরার জন্য। 

এইবার এই বিদ্রোহী দলের নেতা হিসেবে ভীমকে দর্শক চিনতে পারে। ভীম হল মল্লির ভাই। ক‍্যামেরা আবার ঢুকে পড়ে গভীর জঙ্গলে যেখানে আদিবাসীরা শেয়াল জাতীয় প্রাণী ধরার জন্য ফাঁদ পেতেছে। দেখা যায় শালপ্রাংশু মহাভুজ এক পুরুষ বন‍্য জন্তুকে আকৃষ্ট করার জন্য মাথায় এক ঘটি রক্ত ঢালছে। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়না, শেয়াল ছুটে আসে, তাকে ফাঁদের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য জঙ্গলের শুঁড়ি পথে দর্শককে সঙ্গে নিয়ে সেই বীরপুরুষ ভীমও দৌড়তে শুরু করে। কিন্তু সেই ছায়া ঘেরা জড়ামড়ি করে দাঁড়িয়ে থাকা বড় বড় গাছের মাঝে মাঝে ক‍্যামেরা ঘাসবনের দিকে ঘুরছে কেন? অপ্রত‍্যাশিত ভাবে অন‍্যদিক থেকে এক রাজকীয় রয়েল বেঙ্গল কেঁদো বাঘ ভীমকে ধরার জন্য লাফিয়ে পড়ে। দর্শক চোখ বন্ধ করতে গিয়েও পারেনা, কারণ বাঘের থাবায় শেয়াল চিৎ পটাং হয়ে দৌড় ছেড়ে দেয়। শুরু হয় বাঘের হাত থেকে বাঁচার দৌড়। শেষ মূহূর্তে বাঘ জালে আটক হয় কিন্তু শেয়ালের জাল বাঘকে ধরে রাখতে পারেনা। নিশ্চিত মৃত্যুর আগের মূহূর্তে কোনো অদ্ভুত জড়িবুটির চূর্ণ শুঁকে বাঘটা অজ্ঞান হয়ে যায়। কিন্তু জীবজন্তু ধরার, অজ্ঞান করার প্রয়োজন পড়ছে কেন এ প্রশ্নের উত্তর তখন মেলেনা। ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তিতে এই বাঘ মানুষের দৌড়ের দৃশ‍্যটি যে কোন ফাইভ ডি ভিডিওর উত্তেজনাকে দশগোলে হারিয়ে দিতে সক্ষম। 

রাম যেকোনো মূল‍্যে অচেনা ভীমকে খুঁজতে থাকে। এমনকি শ্রোতা হয়ে বাঙালি নেতার বাংলা মিটিংয়ে স্বাধীনতা কামী মানুষ সেজে ওঁৎ পেতে বসে থাকে। রাজামৌলি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যে ছায়াছবিটি তিনি প‍্যান ইন্ডিয়ান সিনেমা তৈরি করতে চেয়েছেন। দর্শক দেখে প্রতিশোধের ভাবনায় পাগল, অস্থির গোন্ড যুবক ভীম রাজধানী শহরে এসে এক মুসলিম যুবক আখতারের বেশ ধরে আপাত নিরীহ জীবন যাপন করে এবং গ‍্যারেজে ইংরেজদের গাড়ি সারায়। তার সঙ্গী সাথীরা মিলে একটি নিটোল মুসলিম পরিবার সাজিয়ে তোলে। কিন্তু তাদের আসল লক্ষ্য হল, গভর্নর হাউসে মল্লি আছে কিনা সেই খবর জোগাড় করা। এমন সময়ে ঘটে যায় এক সাংঘাতিক ঘটনা। রেলগাড়ি চলা ব্রিজের নিচে এক ছোট্ট বালক যমুনার বুকে পানসি ভাসিয়ে মাছ ধরে। ভীম তাকে পয়সা দিয়ে মাছ ধরে আনতে পাঠায়। কিন্তু ব্রিজের ওপরে হয়তো সন্ত্রাসী বিস্ফোরণে ট্রেন উড়ে যায়। জ্বলন্ত বগি আর ইঞ্জিনের অংশগুলি একে একে জলে পড়ে। সেই লেলিহান অগ্নি সুড়ঙ্গের মাঝে জলের মধ‍্যে আটকে পড়ে ছোট্ট বালকের পানসি। মানবিকতার খাতিরে নদীর পাড় থেকে ভীম, আর ব্রিজের ওপর থেকে রাম বালকটিকে বাঁচানোর জন্য এক অবিশ্বাস্য সংগ্রাম শুরু করে। কিন্তু বালক কীভাবে উদ্ধার হবে? না না না, সেটি তো বলা যাবেনা। ওটা হলে গিয়ে দর্শককে দেখতে হবে। ভীমের অভিনেতা জুনিয়র এন টি রামা রাও এবং রামের অভিনেতা রামচরণ এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন ঐ অবিশ্বাস্য স্টান্ট দৃশ‍্যটি শ‍্যুট করতে সময় লেগেছে দু দুটো মাস। শুধু বলা যেতে পারে ঐ দৃশ‍্যে দর্শকের আবেগ ও হৃদপিণ্ড থমকে যায়। উদ্ধার কার্যের শেষে ধোঁয়ার মধ‍্যে দড়ি ধরে ঝুলতে ঝুলতে দুই নায়ক হাত ধরে। পরিচয় না জেনে বাগী আর জল্লাদের দোস্তি হয়ে যায়। ক‍্যামেরা এগিয়ে যায় ধরে থাকা হাতের দিকে। বিস্মিত চোখের সামনে রামের হাত পরিণত হয় অগ্নিতে আর ভীমের হাত নির্মল জলধারায়। দর্শকের তখন হৃদয়ে আগুন আর দুচোখে অকাল বর্ষণ নামে। 

ভীম দয়ালু ইংরেজ তনয়া জেনির সঙ্গে আলাপ করে গভর্নর হাউসে ঢুকতে চায়। রাম ভাবে ভীম বুঝি জেনির প্রেমে পড়েছে। রামের ছলচাতুরীতে ভীম ইংরেজদের নাচের পার্টিতে আমন্ত্রণ পায়। কিন্তু ইংরেজি নাচ না জানা ভীমকে ইংরেজ যুবকের দল নানাভাবে হেনস্থা করতে থাকে। রামের ভরসা আর সহায়তায় ভর করে ভীম উঠে দাঁড়ায় আর দুই নায়ক এমন দেশি নাচ নাচতে শুরু করে, যে ইংলিশ জেন্টলম‍্যানেরা নাস্তানাবুদ হয়ে শেষে ঐ নাচে পা মেলানোর ব‍্যর্থ চেষ্টা করে। এই গান এবং কোরিওগ্রাফি শুধু ভারত নয় ভিন দেশেও অনেকদিন ডিস্কো থেক কাঁপাবে, এই ভবিষ‍্যৎবাণী জ‍্যোতিষী না হয়েও স্বচ্ছন্দে করা যায়। যাই হোক ভীম জেনির নয়নের মণি হয়ে ওঠে। জেনি তাকে গভর্নর হাউসে নেমন্তন্ন করে বসে আর এই সুযোগের অপেক্ষায় থাকা ভীম নানা পাহারা পেরিয়ে সত‍্যি সত‍্যি মল্লিকে খুঁজে পেয়ে যায়। কিন্তু দেখা তো হল, উদ্ধার করবে কীভাবে?  

ভীমের ভাইকে রাম আটক করে অত‍্যাচার করে, বারবার তার দলের লোকেদের ধরতে চায়। ভীমকেই খোঁজে কিন্তু পরিচয় জানেনা। অন্ধকার কুঠুরিতে বিষাক্ত সাপ ঢোকে। গোন্ড যুবক সেই সাপ পিছনে বাঁধা হাতে ধরে অপেক্ষা করে আর রামকে ছোবল খাওয়ায়। কালসাপ নাকি শক্তিশেলের ছোবলে নেতিয়ে পড়া লক্ষণ নয় রাম বাঁচার জন্য কোনক্রমে ভীমের কাছে পৌঁছয়। ভীম তাকে আদিবাসী বিদ‍্যা কাজে লাগিয়ে বাঁচায় আর নিজের রক্ষা কবচ জড়িবুটির মালা নাকি বিশল‍্যকরণী রামকে পরিয়ে দেয়, যাতে সে দ্রুত সুস্থ হতে পারে। কিন্তু আজ তার নিজের পক্ষে দাঁড়িয়ে সেবা করার সময় নেই। কারণ বড়লাটের বাড়িতে সেদিন বিরাট খানাপিনার উৎসব, সেই সুযোগে ভীম  তার বোন মল্লিকে উদ্ধারের এক ভয়ঙ্কর পরিকল্পনা করেছে। অর্ধচেতন রামের কাছে সে তার সব গোপন কথা পরম বিশ্বাসে প্রকাশ করে আর রামের বন্ধুত্বের ওপর আস্থা রেখে নিজের উদ্দেশ্যের দিকে এগিয়ে চলে। ভারী ট্রাক রূপকথার মতো প্রাসাদের একের পর এক অলঙ্ঘ‍্য দরজা ভেঙে এগিয়ে যায় এবং আপামর দর্শককে বিস্মিত করে ভরা সভায় ট্রাক থেকে  শাসকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জঙ্গলের হিংস্র জানোয়ারের দল। অনেক গোলাগুলি, সৈন‍্যসামন্ত, দমন পীড়নের বহু রসদ মজুত থাকা সত্ত্বেও শাসক সম্পূর্ণ হতবুদ্ধি হয়ে যায়। বাস্তব জীবনে প্রায় কোনো শাসকই পরিবেশের সমস‍্যা, জঙ্গলের কান্না, জঙলি আদিবাসীদের কন্ঠস্বর  শুনতে চায়না। তাই বন‍্য জন্তুদের এই প্রতিশোধের দৃশ‍্যটি সুধীজনের কাছে এনভায়রনমেন্টাল এথিকসের রূপক অর্থ বহন করে। কিন্তু ভীমের উদ্দেশ্য পূরণ হয়না। সুস্থ হয়ে রাম অলঙ্ঘ‍্য প্রাচীর হয়ে ভীমের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভীমের বিশ্বাস ভঙ্গ করে তাকে বন্দী করে। 

দ্বিতীয়ার্ধে দেখা যায় দর্শক এতক্ষণ যা বুঝেছে তার অনেকটাই ক‍্যামোফ্লেজ। রামের অতীত ভাবনায় ফ্ল‍্যাশব‍্যাকে একটি ছোট দৃশ‍্যে একজন প্রাক্তন  সৈন‍্যকে দেখা যায়, যিনি গ্রামের মানুষকে ইংরেজদের সঙ্গে লড়াইয়ে বন্দুক চালানোর ট্রেনিং দিচ্ছেন আর শিশু রাম সর্বোত্তম লক্ষভেদকারী হয়ে উঠছে। এই সৈনিকের চরিত্রে যথাযথ অভিনয় করেছেন অজয় দেবগন। দৃশ‍্যে সত‍্যি সত‍্যি ইংরেজ আসে। লড়াই গুরু নিহত হন আর সংগ্রামের উত্তরাধিকার দিয়ে যান রামকে। বর্তমানে রাম পুলিশ দফতরে পদোন্নতি চায়, কারণ সে অস্ত্রের গুদামের ইন চার্জ হতে চায়। হতে পারলে অস্ত্র পাচার করে সশস্ত্র বিপ্লব ঘটানোই তার একমাত্র উদ্দেশ্য। 

এ ছবিতে লালা লাজপত রাইকে ছেড়ে দেবার জন্য থানার বাইরে লাখ মানুষ বিক্ষোভ দেখায়। আবার খোলা ময়দানে ভীমকে প্রকাশ‍্যে কাঁটা লাগানো চাবুকের আঘাতে রক্তাক্ত হতে দেখে সাধারণ দর্শক দুঃখিত হয়। এই ত্রিমাত্রিক দৃশ‍্যগুলিতে আবেগ এতটাই বাস্তব, দর্শকও একাত্ম হয়ে শূন্যে দু একটা ঘুঁষি ছুঁড়ে দিতে চান। রাম ভীমকে ভালোবাসে। কিন্তু বৃহৎ স্বার্থে ইংরেজ বড়লাটের সামনে নিজের ছদ্মবেশ বজায় রাখার তাগিদে ভীমের ওপরে চাবুকের পর চাবুক চালায়। ভীম হাসে, ভীম গান করে, সিনেমার দর্শক আর দৃশ্যে ঘটনার দর্শক একই সঙ্গে রাগে অন্ধ হয়, বাড়তি হল সিনেমার দর্শক মানসচক্ষে রামের কান্না দেখতে পায় তাই কী যে করবে ভেবে পায়না। ভীমের রক্ত মাঠ দিয়ে গড়িয়ে চলে, মাঠে কাজ করা, খেটো শাড়ি পরা এক নারীর নাকি দেশ মায়ের চরণ ছুঁয়ে যায়। রক্ত লেগে নারীর পায়ের আঙ্গুলগুলি নাকি দর্শকের মন শিহরিত হয়ে ওঠে। অজ্ঞান হবার আগের মূহূর্তে ভীম সমবেত দর্শকের দিকে হাত তোলে, যেন বলতে চায়, কিছু বলবেনা? তারপর জ্ঞান হারায়। দৃশ্যে অভিনয় করা দর্শক আর সিনেমার দর্শক একযোগে ব‍্যারিকেড ভেঙে পুলিশকে আক্রমণ করে। ইংরেজ পুলিশ তাদের আবেগের চাপে, পদাঘাতে পিষতে থাকে। এখানে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, পরিচালক রাজামৌলি সমবেত দর্শকের মাঝে হিন্দু মুসলমান দুজনকেই দাঁড় করান। দুজনের আবেগ, ঘৃণা, ক্রোধ পরস্পরমুখী নয়, বরং ইংরেজমুখী সেটা বারবার ক‍্যামেরায় ধরা পড়ে।

বিচারে ভীমের ফাঁসি ঘোষণা হয়। রাম তার কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি পায়। তার স্বপ্ন বাস্তব হয়। রাম সত‍্যিসত‍্যি অস্ত্রাগারের অফিসার ইন চার্জ হয়ে যায়। এবারে সশস্ত্র বিপ্লব করে সে তার পরিবারের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবে, দেশমায়ের শৃঙ্খল ঘোচাবে, বাবার উত্তরাধিকারের মর্যাদা রাখবে। কিন্তু এসব কি সে ভীম আর মল্লির  বলিদানের মূল‍্যে কোনদিন চেয়েছিল? ভীমের সারল্য, বিশ্বাসভঙ্গের বিস্মিত দৃষ্টি তাকে স্থির থাকতে দেয়না। রাম উচিত অনুচিতের জ্বালায় পুড়তে থাকে। কিন্তু বলবে কাকে? রাম চিঠি লেখে। সে চিঠি পড়ে দুখিনী সীতা যাকে সে চারবছর আগে লক্ষ‍্যপূরণের জন্য ছেড়ে এসেছে। তারপর একটিবারের  জন‍্যেও যোগাযোগ করেনি। এতক্ষণে সীতারূপী আলিয়া ভাটের সঙ্গে দর্শকের পরিচয় হয়। চিঠি পড়ে সীতা বোঝে রাম তাকে ভোলেনি। অনুভব করে মানুষ রামের অসহায়তা। এদিকে রাম মনস্থির করে। ভীম আর মল্লির জীবনের বিনিময়ে সে লক্ষ‍্যপূরণ করতে পারেনা। একঢিলে দুই নায়কের স্বপ্নপূরণের জন্য সে এক ভয়ানক ষড়যন্ত্র করে। অস্ত্রাগারের অধিকারী হিসেবে সে গুলিহীন বন্দুক ইংরেজ সৈন‍্যদের পাঠাতে থাকে। আর জেলের কুঠুরির ভিতরে নয়, বরং খোলা মাঠে মল্লির সামনে ভীমকে ফাঁসি দিতে হবে বলে কর্তৃপক্ষকে রাজি করায়। কিন্তু মানুষ যা ভাবে সবকিছু তো ঘটেনা। করমর্দনের সময়ে রামের হাতে বারুদের চিহ্ন দেখে বড়লাটের সন্দেহ হয়। দুরন্ত অ্যাকশন আর অনেকটা আবেগের মেঘের আড়ালে ভীম মল্লির হাত ধরে দিগন্তে মিলিয়ে যায়, আর রাম মাটির নিচে সলিটারি সেলে বন্দী হয়। 

গল্পের চাকা দ্রুত গড়াতে থাকে। ভীম তার দলবল নিয়ে এক সাধারণ সরাইখানায় আশ্রয় নেয়, কিন্তু খাবার কেনার পয়সা তো নেই। বড়রা সহ‍্য করে কিন্তু মল্লি খিদের জ্বালায় কাঁদে। ইংরেজ পুলিশ তাদের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানায় বিদ্রোহী বেশিদূরে যেতে পারেনি। তল্লাশি চলছে, শুধু একটাই জায়গা বাকি আছে। মানচিত্রে এগিয়ে আসে আধুনিক ভারতের চেনা নাম হাথরাস। এরপর ইংরেজ পুলিশের তল্লাশির মধ‍্যে আকস্মিকভাবে ঐ হাথরাসে সীতার সঙ্গে ভীমের পরিচয় হয়। কারণ ফাঁসির পরে রামের দেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য জেল কর্তৃপক্ষ যে চিঠি দিয়েছে, তাই নিয়ে সে বুকে পাষাণভার বয়ে হাথরাসে অপেক্ষা করছে। ভীম দেখে সীতার গলায় সেই আধখানা লকেট যার আধখানা সে রামের গলায় দেখেছে। এখানে সীতা কীভাবে ভীম ও তার দলকে বাঁচায় তার একটি দৃশ‍্য আছে। কিন্তু না সব বিস্তারিত বললে দেখার চমক মাটি হবে। ভীম সীতার কাছে রামের আসল পরিচয় জানতে পারে, আর মাথায় মৃত্যুর পরোয়ানা বেঁধে নারীর অস্তিত্ব আর ভালোবাসার নায়ককে উদ্ধার করতে ছোটে। প্রাণ কাঁদে বাস্তবে হাথরাসে কেন শুধু রাক্ষস আসে, রাম লক্ষ্মণ, পান্ডবেরা আসেনা। এতক্ষণ বাস্তব আর কল্পনার মিশেল দিয়ে গল্প চলছিল। কিন্তু এই শেষ পর্বে রাজামৌলি তাঁর সৃষ্টিকে টোটাল ফ‍্যান্টাসিতে পরিণত করেন। 

আবার শুরু হয় মারকাটারি অ্যাকশন দৃশ‍্য। পর্দায় দেখা যায় রাম আহত এবং হাঁটার শক্তি নেই।  ভীম একা পিলপিলে ইংরেজ সৈন‍্য, হুহু গুলির তোড়, কামানের বিস্ফোরণ সবকিছুর মধ‍্যে রামকে কাঁধে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। জঙ্গলে রামের গায়ে জড়িবুটি লেপে দেয়। চারটে গেরুয়া পতাকা ছিঁড়ে রামের রক্তমাখা পুরোনো পোষাক পরিবর্তন করে গেরুয়া ধুতি পরিয়ে দেয়। এত করে ক্লান্ত হয়ে ভীম পুষ্করিণীতে জল খেতে যায়। এদিকে রাক্ষস বড়লাট স্কট গাদা পুলিশ পাঠিয়ে জঙ্গল ঘিরে নিয়েছে। একটা শয়তান পুলিশের এত সাহস ভীমের দিকে বন্দুক তাক করেছে। তখনই ভীমের হাঁ আর জলের ধারার মাঝখান দিয়ে একটা তীর দর্শকের নাকে বিঁধে যায়। না মানে থ্রি ডি তো, দর্শকের নাক ছুঁয়ে শয়তানের গর্দানে বেঁধে। পর্দা জুড়ে ফুটে ওঠে পরিত্যক্ত মন্দিরে এক বিশাল রামের মূর্তি। আধুনিক দর্শক আশা করি এই অনুষঙ্গ ভালোই বুঝতে পারবেন। রাম গেরুয়া ধুতি পরে রামের মূর্তি থেকে তীর ধনুক খুলে নেয়। জড়িবুটির ম‍্যাজিকে তার সমস্ত ক্ষত এতক্ষণে উধাও। সারাংশে রাম আর ভীম, সঙ্গে রয়েল বেঙ্গল বাঘ, কম্পজ্বর  ভাল্লুক, চিড়বিড়ে চিতাবাঘ, চোখানাক নেকড়ে, দৌড়বাজ হরিণ, উপজাতির শিকারী ভায়েরা – সিনেমার গল্প জুড়ে সবার  মিলিত প্রচেষ্টা বড়লাটের বাড়ি উড়িয়ে দিয়ে সব খারাপ ইংরেজ খতম করে। প্রথম দৃশ্যের নির্মম ফার্স্ট লেডির ময়ূর আঁকা নিথর হাতটি শূন‍্যে দোলে।

কিন্তু এতো শুধু খোলসের বিবরণ। ভাবুক দর্শকের সামনে খুলে যায় বোধের দরজা। আর্য আর ফর্সা ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধ করে ভীম। পাঁচ নিষাদ পুত্রকে তাদের মায়ের সঙ্গে জতুগৃহে পুড়িয়ে মারার গ্লানি ধুয়ে আজ সে নিজেই নিষাদের কন্ঠস্বর, তাদের চেতনার প্রতিভূ। আর আবহ জুড়ে গান বাজে রাঘবম রাজসম। তীরধনু আর অক্ষয় তূনীর হাতে ভীমকে সুরক্ষা দেন রাম। পুলিশ অফিসার রামের অহল‍্যা মনোভূমি আজ ভারতের ঐতিহ্যধারী রামের স্পর্শে প্রাণ পায়। আজ সে সত‍্যিকারের শ্রীরামচন্দ্র হয়ে ওঠে। কাব‍্যিক তীর চালানোর দৃশ‍্য পরিচালকের আগের ছবি বাহুবলীতেও ছিল, কম ছিল। এ ছবিতে রাজামৌলি সেই ঘাটতি পূরণ করে দর্শকের আশ মিটিয়েছেন। একদিন যে রাম নিষাদ পুত্র শম্বুককে হত‍্যা করেছিলেন তার মতো লোকেদের লেখাপড়া শিখে ভদ্র হবার ইচ্ছে দমন করার জন্য, আজ সেই পাপ ধুয়ে রামচন্দ্র নেবেছেন নিষাদের লড়াই সফল করার জন্য। 

এছবি দেখে আমার ব‍্যক্তিগত কিছু লাভ হয়েছে। ছোটবেলায় আমি রামকে খুব ভালোবাসতাম। বেশিরভাগ বাক‍্যরচনা রামনাম দিয়েই করতাম। বড় হয়ে সীতার বেদনা, সূর্পনখার অমর্যাদা, মন্দোদরীর দুঃখ আমাকে বেশি বিচলিত করছিল। সর্বোপরি জয় শ্রীরামের চাপে ভেবেছিলাম আমার উদার ভারতীয় সত্তা, বাঙালি অস্তিত্ব সব কিছু বুঝি শ্রীরাম কেড়ে নেবেন। রামকে ভয় পেতে শুরু করেছিলাম। রামের বিশাল মূর্তির প্রতি বিরূপ হয়েছিলাম। রাজামৌলি চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন ভারতীয় মানসে হাজার হাজার বছর ধরে স্থায়ী আসনে বসে থাকা রামচন্দ্র আর জয় শ্রীরাম এক নয়। তিনি ভয়জাগানিয়া যন্ত্র মাত্র নন, তিনি ভয়হারী, সত‍্যের রক্ষক, একান্ত আপন।  

এরপর মোটের ওপর যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। জেনি বলে ভালো মেয়েটা বেঁচে গেছে। খারাপ ইংরেজ হেরে গেছে, রাম সীতার দেখা হয়েছে, তাদের ভাঙা লকেট জুড়ে গেছে। সীতাকে রাম অগ্নিপরীক্ষা দিতে বলেনি (মনে হয় ভীমের ভয়ে), ভীম সীতার মাথায় হাত রেখেছে, মুখে কিছু বলেনি, কিন্তু তাদের চোখের দৃষ্টি আর শরীরী ভাষায় দর্শক স্পষ্ট বুঝেছে এ হাত হল সীতাকে ভাই হিসেবে রক্ষা করার জন‍্য ভীমের অঙ্গীকার। ভক্ত হনুমান যা পারেনি, দেবর লক্ষ্মণ যা পারেনি, নারীর প্রতি বিশ্বস্ত, বীরপুরুষ ভীম তা পারবে। রাম আর তার ওপরে কোন অবিচার করতে পারবেনা। ভাবি, যে মেয়েটা বনবাসে যায়, অপহৃত হয়, গর্ভবতী অবস্থায় স্বামী ত‍্যাগ করে, এমনকি সন্তানদের সামনে সতীত্বের পরীক্ষা দিতে বলে অপমান করে, সে মেয়েটার এমন ভাই থাকলে আত্মহত্যা করতে হতোনা গো। এজন্মে রাজামৌলি এই ঘাটতিটা পুষিয়ে দেন। আর হ্যাঁ রাক্ষস কন্যা হিড়িম্বার বদলে ইংরেজ দুহিতা জেনি ভীমকে বরণ করে। 

এ ছবিতে নারী বড় অল্প। তাদের ভূমিকাও কম। একজোড়া প্রেম আছে নিরুচ্চার। তবু যেন নারীর অধিকার রক্ষার এক তান ছড়িয়ে পড়ে দর্শকের মনে। আসলে এ গল্প নারী পুরুষ জাতি নির্বিশেষে অত‍্যাচারীর বিরুদ্ধে একতার গল্প, বন্ধুত্ব আর বিশ্বভ্রাতৃত্বের গল্প।

পরিচালকের আগের ছায়াছবি বাহুবলীতে তিনি বল্লালদেবের ষড়যন্ত্র অপশাসন ও অত‍্যাচার দেখিয়েছেন, এই ছবিতে শাসক ভিলেন ইংরেজ। বাহুবলীতে অত‍্যাচারী শাসক বাহুবলী অমরেন্দ্রের স্ত্রী, রানী ও রাজকন্যা দেবসেনাকে বন্দী করে রাখে, এখানে শাসক বন্দী করে গোন্ড উপজাতির এক সরল বালিকা মল্লিকে, যে স্বাধীন ভাবে জঙ্গল কে সমৃদ্ধ করে তার গান দিয়ে, কচি হাতে আঁকা ময়ূরের ছবি দিয়ে। দুটিতেই রাক্ষস পুরীতে বন্দিনী সীতার অনুষঙ্গ আসে। তবে রাজামৌলি চমকে দেন তাঁর কল্পনায়। কারণ বাহুবলীতে অদেখা বন্দিনী মাকে খুঁজে বেড়ায় তার সন্তান। আর এই ছবিতে এক অপাপবিদ্ধ দুখিনী বালিকাকে খুঁজে বেড়ায় তার ভাই। দুক্ষেত্রেই সতীত্ব রক্ষার প্রশ্ন অতলে তলিয়ে যায়।

বাহুবলীতে ধর্মসঙ্কট বা উচিত অনুচিতের প্রশ্ন ওঠে। কাটাপ্পা অমরেন্দ্রকে হত‍্যা করে ঠিক না ভুল করল? যদি ঠিক হয়, তবে কেন, যদি ভুল হয়, তার কারণ কী? ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের যখন এই প্রশ্ন করি, তারা বলে কাটাপ্পা বংশানুক্রমে রাজ অনুগত,  তাই রানী শিবগামীর কথা শুনে সে একাজ করেছে। তার দিক থেকে কাজটা ঠিক। কিন্তু যখন বলি, রাজ আনুগত্যের অর্থ কী? তা কি দেশ আনুগত‍্য নয়? তখন তারা বলে, ‘তা বটে’। কাটাপ্পারা আবেগে চলে, তারা মাথা খাটিয়ে তলিয়ে ভাবতে জানেনা। তাই কাটাপ্পা তার আনুগত‍্যের ভুল ব‍্যাখ‍্যা করে এবং দেশ ও জাতিকে দীর্ঘ অপশাসনের দিকে ঠেলে দেয়; অমরেন্দ্র – দেবসেনার বিশ্বাসভঙ্গ করে। এই নতুন ছবিতে রাজামৌলি এথিকস বা উচিত অনুচিতের প্রশ্ন এনেছেন কিঞ্চিত অন‍্য কিন্তু তীব্রভাবে যা সংবেদনশীল হৃদয়ে বেঁধে। যদিও এখানে পরিচালকের বার্তা লুকোনো আছে প্রযুক্তির ঘনঘটার আড়ালে। যে অতশত ভাবেনা, সে শুধু ছবির খোলসটুকু উপভোগ করে, কোন অসুবিধে হয়না। 

যাই হোক ছবি দেখে আমার সঙ্গী বাচ্ছারা তাদের মতো গল্প বুঝে খুব নেচেছে। আসলে এ ছবি প্রতি দর্শকের বৌদ্ধিক জগতের মাপ মতো বার্তা দিতে সক্ষম। প্রচন্ড নাচগান করে সিনেমার সকল কুশীলব সিনেমা শেষ করেছে। তিনঘন্টায় এতগুলি শক পেয়ে আমি অবশ হয়ে সীটে পড়েছিলাম। ভেবেছিলাম আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে, আমি আর বেঁচে নেই। কিন্তু পরে দেখলাম আমি বেঁচে আছি। হলে যতক্ষণ ছিলাম, কিছু চিন্তা করতে পারিনি, সে সুযোগও রাজামৌলি দেননি। কিন্তু হল থেকে বেরিয়ে এসে বুঝতে পারছি, অহো কী দেখিলাম। ধন‍্য রাজামৌলির এই অনার্য বিজয়গাথা। যদিও তিনি উত্তর ভারতে সহজে গ্রাহ‍্য হবার জন্য বলিউডের দুই নামকরা অভিনেতার সাহায্য নিয়েছেন, কিন্তু রাজামৌলি এইভাবে এগিয়ে চললে শুধু দক্ষিণী অভিনেতা দিয়েই সিনেমা হিট হবে। বলিউডের সাহায্য লাগবেনা। ইংরেজ অভিনেতারা চিত্রনাট‍্যের সহায়তা না পেয়েও ফাটিয়ে দিয়েছেন। সেই কবে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা অন‍্যায় করে গেছেন, আর আজ পর্দায় কিল খেয়ে গুলি খেয়ে, নেচে কুঁদে তাঁদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে। হায় রে বিধির বিধান আর তার পোয়েটিক জাস্টিস।

মেয়েদের লজ্জা থাকা দরকার

বিষয় – মেয়েদের লজ্জা থাকা দরকার
মতামত সপক্ষে

কলমে ড. শারদা মণ্ডল

ছোটবেলা থেকেই আমার খুব লজ্জা। থাকার কারণও আছে – আমি মেয়ে, আর মেয়েদের লজ্জা থাকাটা খুব দরকার। কম বয়সে মাস্টারনী হয়ে, কলেজে যেতাম হাল্কা রঙের শাড়ি পরে, গম্ভীর হয়ে। নাহলে ছেলেমেয়েরা যদি বন্ধু ভাবে, সে খুব লজ্জার ব‍্যাপার। এখন মাথায় নুন মরিচ কেশরাশি নিয়ে লেডিস প‍্যান্ট আর কামিজ পরে যাই। ও মা! যাবনা? ছেলেমেয়েরা যদি ভেবে বসে দিদিমণি অথর্ব, আর ফিল্ডে নিয়ে যেতে পারবেন না। সে ভারি লজ্জার বিষয়। তো একদিন কলেজের পথে টোটোর টিনে প‍্যান্ট গেল ছিঁড়ে এক খাবলা। চারজন সহযাত্রী দেখছেন গম্ভীর মুখে। টোটোওলাকে ডেকে বলি,

  • কি টোটোই করেছেন দাদা। প‍্যান্টটাই ছিঁড়ে গেল। যখন নামবো, আপনি টোটোটা পরের টোটো স্ট‍্যান্ডের গায়ে রাখবেন, যাতে বেশি হাঁটতে না হয়। আর কলেজের নাইট গার্ডের কোয়ার্টারে ফোন করে বলে দিলাম, – বৌদিকে বলবেন সূঁচ সুতো রেডি রাখতে, প‍্যান্ট সেলাই করবো। যেমন কথা, তেমন কাজ। ক্লাসে গেলাম ফিটফাট। সহকর্মীরা বললো, আপনি টোটোয় বসে প‍্যান্ট ছেঁড়ার কথা বলতে পারলেন? ওমা! বলবোনা কেন? সব লোককেই খারাপ ভাবা আর নিজের সমস্যা চেপে রাখা দুটোই ভীষণ লজ্জাস্কর। বাবা রে বাবা। অমন ভাবনা ভাবুক শত্তুরে। আমার ওসব ভাবতে খুব লজ্জা করে।
    ফিল্ডে যখন যাই, তখন তো কলেজের ছেলেমেয়েরাই পরিবার, তারাই অভিভাবক। ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়ি চলতে চলতে তলপেটে চাপ হয়। ঠান্ডায় শুনশান, অজানা পাহাড়ি রাস্তায় সবাই একসঙ্গে বাস থামিয়ে হিসু করার জায়গা খুঁজতে বেরোই। ঐ করতে গিয়ে, কে কী আবিষ্কার করে ফেললো, আর কোথায় কেমন অভিজ্ঞতা হল, এ নিয়ে হাসাহাসিও হয় দেদার। তবে হ‍্যাঁ, দেশটা ভারতবর্ষ। যেখানেই সাহায্য চাই, নারী অথবা পুরুষ, নরম মাটির মানুষ হোক বা পাথুরে – সাহায্য সবাই করে। মানুষ না থাকলে জঙ্গল বা পাহাড়ী খাঁজ তো আছেই। এখন অবিশ‍্যি মেয়েরা সব পী সেফ কিনে নিয়েছি। কোমর অবধি আড়ালই যথেষ্ট। হাঁটু মোড়ার প্রয়োজন নেই। মেয়েগুলোর পিরিয়ড হলে একটু বাড়তি সমস‍্যা হয়। তবে এখন কাপ বেরিয়ে যেতে অনেকটা বাঁচোয়া। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে সব খোলামেলা আলোচনা করি। ওদের থেকে নতুন কিছু শিখি। চুপি চুপি পেটের ভিতর কথা চাপা – না বাবা, ওসব খুব লজ্জাজনক ব‍্যাপার। ওসব আমরা করিনা। এখন বুড়ি হয়েছি বলে নয়। অল্পবয়সেও করতাম না। বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে, ডি এস টি প্রজেক্টে কাজ করতাম কিছু দিন। তা একদিন কামাই করলেই, প্রজেক্ট অফিসার প্রশ্ন করেন, ‘কী হয়েছিল, আসিসনি কেন?” বললাম, ‘শরীর ভালো ছিলনা।’ তাও উনি জিজ্ঞেস করেন, ‘কী হয়েছিল?’। বললাম, ‘পিরিয়ড হলে আমার দুদিন অসহ্য ব‍্যথা করে। শুয়ে থাকি। আজ ব‍্যথা নিয়েই এসেছি।’ শুনে তিনি বললেন, ‘আজ তাহলে তোকে এতলা, ওতলা ম‍্যাপ বেশি আনা নেওয়া করতে হবেনা। বসে কাজ কর।’ সিনিয়র দাদা দিদিরা শুনে বললো – ‘দারুণ, মুখের ওপর বলতে পেরেছিস তাহলে? তোকে খাওয়াব। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ব‍্যক্তিগত কথা শোনা ওঁর স্বভাব।’ আমি লজ্জা পেয়ে যাই। সত‍্যি কথা, সত‍্যি কথা। তা আবার মুখের উপরে না পিছনে – এসব ভাবিনা। আলটপকা, অপ্রয়োজনীয় ভাবনা ভাবতে খুব লজ্জা করে। আমি তো মেয়ে রে বাবা মেয়ে। আর মেয়েদের লজ্জা থাকাটা খুব দরকার।

পাকশালার গুরুচন্ডালি(পর্ব ছয়)

বুলবুলিতে ‘ভাত’ খেয়েছে –
খাজনা দেবো কিসে?

আসলে বেশি জনের রাঁধাবাড়া  এইরকম পরিকাঠামোয় করতে গেলে খেই হারিয়ে যেত আমার। রাঁধুনি দিদিদের যদি জিজ্ঞেস করতাম, কোনো জিনিস কতোটা নেব, তারা মিষ্টি করে বলতো জানিনা তো। আমি শাশুড়ি মাকে জিজ্ঞেস করতাম, এরকম কেন করে আমার সঙ্গে? উনি বলতেন ওসব কথা ধরতে নেই। এই রান্নাঘরে ওরা পুরোনো এবং দক্ষ। তুমি নতুন আর আনাড়ি। অথচ তোমার আদর, মর্যাদা বেশি। ওদের ঐ রান্নাঘরটাই অস্তিত্ব। তাই দখল ছাড়তে চায়না। ধীরে ধীরে অবশ‍্য রান্নাঘরের মেয়ে বৌদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে শুরু হলো। মাকে দেখে শিখেছিলাম। মা নিবেদিতা ইস্কুলের শিক্ষিকা, মেধাবী ছাত্রী। কিন্তু আড়বেলেতে মা কখনও খাপ খুলতোনা। জ‍্যাঠাইমাদের আড়ালে থাকতো। আমিও নিজেকে মায়ের ছাঁচে ঢেলে নিলাম। কিন্তু মাঝে মধ্যে দেখতাম, ঐ মেয়ে বৌরা মশলাপাতি, আটা ময়দা, চিনি কিছু কিছু নিয়ে যাচ্ছে আড়াল করে। শাশুড়ি মায়ের কানে তুললাম কথাটা। তিনি হাসলেন। বললেন কিছু বাসনও গেছে এভাবে। পুকুরে মাজা হয় তো। মাজার সময়ে ভাসিয়ে বা ডুবিয়ে দেয়। অন্ধকারে তুলে নিয়ে যায়। বললাম, সে কি, তুমি কিছু বলোনা? তিনি বললেন, সে অনেক কথা। বড়ো কিছু না হলে সব জিনিস দেখতে নেই। কথাটা শুনলাম, কিন্তু মানতে পারলাম না। কর্তার কানে তুললাম। কর্তা বললেন, খবরদার এসব ব‍্যাপারে নাক গলিওনা। মা যেমন বলছে, তেমনিভাবে চলো। আমরা এখানে থাকিনা। দুদিনের অতিথি। আমরা ওদের রাগিয়ে দিয়ে ঝামেলা করে চলে যাবো, তারপর সারাবছর কি হবে? যার হাতে রান্নাঘর, তার হাতে জীবন। ওসব মায়ের হাতে ছেড়ে দাও। পরে অবশ‍্য অনেক দাম দিয়ে বুঝেছি, কেন শাশুড়ি মা বলেছিলেন, সব জিনিস দেখতে নেই।

শ্বশুরবাড়ির রান্নাঘরের রাঁধুনি দিদিদের সঙ্গে আমার প্রথম মতান্তর হলো ভাত নিয়ে। আমাদের বাড়িতে ভাতের ফ‍্যান গালার আগে মা ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিতো। এর দুটো কারণ ছিল। নামানোর আগে মাড় খুব ঘন হয়ে যায়। জল দিয়ে পাতলা করে দিলে সেটা ভাতের গায়ে আঠালো হয়ে বসে থাকেনা, ভাতটা ঝরঝরে হয়। দ্বিতীয় কারণটা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফ‍্যান গালার সময়ে অনেক সময়েই হাত পিছলে যায়। ভাতের মাড় পিচ্ছিল কিন্তু আঠালো পদার্থ। পিছলে মাড় গায়ে পড়লে গড়িয়ে পড়ে যায়না, বরং চামড়ায় আটকে বসে। ফোসকা পড়ে যায়। আবার ভাতের ভাপেও অনেক সময়ে মুখ বা হাত ঝলসে যায়। নামানোর আগে ঠাণ্ডা জল দিয়ে দিলে মাড় আর ভাপ দুটোরই উত্তাপ কমে যায়। দুর্ঘটনা কিছু ঘটলেও উত্তাপ কমিয়ে দেবার ফলে সেটা তীব্র হয়না। কিন্তু এই রাঁধুনি দিদিদের বদ্ধমূল ধারণা যে ভাত একবার যে জল দিয়ে বসানো হবে সেটাই থাকবে। দ্বিতীয় বার আর জল দেওয়া যাবেনা। পরে জল দিলে ভাত নাকি পানসে হয়ে যাবে, সে যদি মাড় শুকিয়েও যায়, তাই সই।

আর একটা ব‍্যাপার হলো, মা বলে দিয়েছিল যে, চাল যদি মোটা হয়, আর বেশিক্ষণ সময় লাগে ফোটাতে, তবে সবার আগে ভাত বসাবি। ফুট এসে গেলে গ‍্যাস নিভিয়ে, ঐ অবস্থায় হাঁড়ি নামিয়ে রেখে অন‍্য রান্না সেরে নিবি চটপট। ফুটন্ত জলে চাল কিছুক্ষণ থাকলে নরম হয়ে যাবে। রান্না শেষ হয়ে এলে বা কারোর বেরোনোর সময় হয়ে এলে, ঐ হাঁড়ি আবার গ‍্যাসে বসিয়ে দিবি। এবার খুব চটপট ভাত হয়ে যাবে। এই পদ্ধতিতে ভাতটাও শেষে গরম পাওয়া যায়, কিন্তু জ্বালানিটা খুব কম পোড়ে। রাঁধুনি দিদিদের এসব কিছু শেখানো গেলোনা। কেউ যদি বলে আমায় তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে, যা হয়েছে তাই দিয়ে ভাত দিয়ে দাও, তারা দিতে পারতোনা। হয়তো তখন ভাত বসানোই হয়নি। দিদিদের ধারণা, সব রান্না হবে। শেষে ভাত বসবে। তবে ননদেরা আমার পদ্ধতিটা জেনে বাহবা দিলো।

আবার শহরে একার সংসারে এসে আমার ভাত নিয়ে অন্য একটা বিপদ হলো। চাল যা নিই, ভাতের মাপ ঠিক হয়না। আসলে শহরে আমাদের আপনি কোপনির সংসার। আর একটি মেয়ে থাকতো। তাকে আমার শাশুড়ি পাঠিয়েছিলেন। গাঁ গঞ্জের অনেক অসহায় মেয়েকেই শাশুড়ি আশ্রয় দিতেন। তিনি সমাজের তোয়াক্কা করতেন না, কাউকে ভয়ও পেতেন না। উল্টে ওনাকে গ্রামের লোক সমীহ করতো। এক একটি মেয়ের এক একরকম গল্প। রান্নাঘরে বসে বসে টুকিটাকি কাজের ফাঁকে তাদের কথা শুনতাম। একটি মেয়ের স্বামী সুরাটে কাজ করতে গিয়ে এইডস নিয়ে ফেরে। গ্রামে এসে মারা যায়। তিন ছেলেমেয়ে সমেত পরিবারের লোক অল্পবয়সী বিধবা মেয়েটিকে বাড়িছাড়া করে। সে আমার শাশুড়ি মায়ের আঁচলের তলায় ঠাঁই পায়। যে মেয়েটি আমার কাছে থাকতো, তার মা মুড়ি ভেজে দিন গুজরান করতেন। রাজরোগে মারা গেলেন বিনা চিকিৎসায়। বাপে আবার বিয়ে করলে। নতুন মায়ের একটি মেয়ে হবার পরে বাপ মায়ে শলা করে আগের পক্ষের মেয়েদুটিকে বিদায়ের ব‍্যবস্থা করলে, মানে শহরে চাকরির নাম করে দূর দেশে কোথাও পাঠানোর ব‍্যবস্থা হলো। খোঁজ পেয়ে বড়টিকে শাশুড়ি নিজের কাছে রাখলেন। দেখেশুনে বিয়ে দেবেন। কালোকোলো ছোটোখাটো, হাসিখুশি মিষ্টি মেয়েটিকে নাক বোঁচা বলে শ্বশুরমশাই জাপানি বলে ডাকতেন। দেওরের কালো রঙের লাসা আপসো কুকুর ছিল – নাম লাড্ডু। লাড্ডুকে কোলে বসিয়ে গরস গরস করে ভাত মেখে জাপানি খাইয়ে দিতো। ছোটোটিকে আমার সঙ্গে পাঠালেন। জাপানির সঙ্গে মিলিয়ে তার নতুন নাম দিলাম মিনি। শাশুড়ি মা বলে দিলেন দুজনেই বেরিয়ে যাবে, চাকরিতে। একজন ঘরে থাকুক। লেখাপড়া তেমন জানেনা। ছোটোবেলায় যা শিখেছিল ভুলে গেছে। আমাকে পইপই করে বলে দিলেন। আমি যেন তার পড়া ঝালিয়ে চিঠি পড়া এবং চিঠি লেখার উপযুক্ত করে দিই। এইটুকু না  জানার ফলে অনেক মেয়ে আসল শ্বশুরবাড়িতে বা পাচার হওয়া নকল শ্বশুরবাড়িতে মরে। তখন তো মোবাইলের যুগ আসেনি। চিঠিই একমাত্র ভরসা। অবাক হয়ে দেখতাম এই গ্রাম আমাদের আড়বালিয়ার থেকে অনেক পিছিয়ে আছে। শিক্ষিত মানুষ আছে অনেক। কিন্তু গরীব মানুষের সঙ্গে তাদের দিন যাপনের ফারাকটা বেশ চওড়া। যাক এসব কাহন পরে হবে। এখন ভাতের কথাটা বলে নিই।

শহরে ভাড়া বাড়িতে দুটো ঘরে আমরা তিনজন থাকতাম। কিন্তু প্রায়শই বাড়িটা আত্মীয় স্বজনে ভরে থাকতো। কারণ কেউ আসতো ডাক্তার দেখাতে। কেউ আসতো দূরপাল্লার ট্রেন ধরতে। এমন নানা কাজে গ্রামের মানুষের বিরতি যাপনের জায়গা ছিল ঐ এক চিলতে ভাড়ার ঘর। তখন সম্বৎসরের চালটা দীঘার বাড়ি থেকেই আসতো। চাল কিনতে হতোনা। কিন্তু সে চাল ছিল মোটা দানা আর লাল। আর কয়েকমাস অন্তর খেপে খেপে কোনো লোক এসে দিয়ে যেতো। একে তো ওরকম মোটা ভাত খাওয়া অভ‍্যেস ছিলনা আমার। আবার কখনও এক কাপ চালে তিনজনের হয়ে যায়, তো কখনও দুজনের কম পড়ে যায়। ভাত কোনোসময়ে অনেক বেশি হয়ে যেতো, আবার কখনও কম পড়ে যেত। মাপ করতে পারতামনা। সে ভারি মুসকিল। আতান্তরে পড়ে যেতাম। কিন্তু কারণটা উদ্ধার করতে পারতাম না। এই নিয়ে অনুযোগও করতাম। একদিন কর্তা বললেন, তুমি যে বলো তুমি নাকি বাংলায় ভালো। তোমার মা বাংলার টিচার, পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে কথাটা শোনোনি কখনও? সেদিন প্রথম ঐ কথাটার আসল অর্থ আমি জানতে পারলাম। যখন পুরোনো চালের বস্তা আসে, তখন দানাগুলো হয় শুকনো আর হাল্কা। এক কাপে বেশি দানা ধরে। তাই ভাতও বেশি হয়। আর যখন নতুন চালের বস্তা আসে, তখন দানাগুলো রসস্থ থাকে। তাই ওগুলো ফোলা আর ভারি থাকে, এক কাপে কম দানা ধরে, ভাতও কম হয়। কর্তা আরও বললেন,

– শহরের সরু সাদা চাল খেয়ে অভ‍্যেস। আমার বাড়ির মোটা লাল ভাত মুখে রোচেনা তোমার। কিন্তু জানো কি, যে এই ধরণের মোটা চাল থেকে এই আসল লাল জিনিসটা কে বাদ দিয়ে মেশিনে সরু সাদা চাল বানিয়ে তোমার মতো বেকুবদের কাছে বিক্রি করা হয়।
– আমি বেকুব?
– বেকুব নও? চিকন চালের দামে মোটা চালের বর্জ্য কিনছো। কেজি প্রতি প্রায় দশ কুড়ি টাকা ঠকছো, তাও ঠকাটাই তোমার ভালো মনে হচ্ছে। বোকা না হলে এমন কেউ করে? শহরে বসে বাড়ির চাল পাচ্ছো, লোকে চেয়েও পায়না। তাও তার দাম দিতে পারোনা। এও জানোনা যে ঐ লাল অংশটাই চালের পুষ্টি।
– কিন্তু এমন করা হয় কেন?
– কারণ লোকে চিকন চাল খেতে ভালোবাসে। আর ঐ লাল ব্র‍্যান অংশটা দিয়ে তেল তৈরি হয়, তাই।

চালের এই অষ্টোত্তর শত কাহিনী শুনে আমি তো থ, সত্যি সত‍্যিই বেকুব বনলাম।

তেজপাতে তেজ কেন, ঝাল কেন লঙ্কায়?

সুকুমারের এই কূটতর্ক তো সংসার করতে গেলে উঠে পড়বেই। প্রথমেই আবিষ্কার করলাম, কর্তামশাই সজনে ফুল, কাঁচা টমেটো এগুলো খেতে জানেন না। সজনে ফুলের চচ্চড়ি, মৌরলা মাছ আর কাঁচা টমেটোর বাটি চচ্চড়িতে তাঁর হাতেখড়ি হলো। আমিও কি ছাই জানতাম, যে তেঁতুল দিয়ে কাঁকড়ার দাঁড়ার টক এতো ভালো খেতে? এটাও জানতাম না গঙ্গার পাড়ে লঞ্চ ঘাটে সরু সরু চুনো মাছ পাওয়া যায়। ওটাকে বলে গঙ্গার কাঁচকি মাছ। ঐ চুনো মাছের আমসি টকও মুখে লেগে থাকে। আমি যেমন টকের স্বাদে মজলাম, কর্তার আবার নিরামিষ পটলের ঝাল খুব ভালো লেগে গেল। একটু বড় আকৃতির কিন্তু কচি পটল হলে ভালো হয়। পটলগুলো খোসা ছাড়ানো হবেনা। বঁটি বা ছুরির উল্টো ধার দিয়ে একটু আঁশ ছাড়িয়ে নিতে হবে। তারপর লম্বালম্বি দুফালা করে নিতে হবে। তেলে পাঁচ ফোড়ন কাঁচা লঙ্কা দিয়ে পটলগুলো হাল্কা ভেজে নিতে হবে। তার পর নুন, মিষ্টি, হলুদ আর সর্ষে বাটা ভেজানো জল দিয়ে ফোটাতে হবে। একটু মিষ্টি স্বাদের ঘন ঝোল রেখে নামিয়ে নিতে হবে। নামানোর আগে কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে নিলে ঐ ঝাঁঝটা খাওয়ার সময়ে ভালো লাগে। কিন্তু এখানে একটা কথা আছে। এই কাঁচা তেল দিয়ে রান্না নামানোর কৌশলটা মিনিকে শেখাতে গিয়ে একটা মুশকিল হয়েছিল, মানে বোঝার ভুল হয়েছিল। কাঁচা তেল দেবার পর ঝোলটা বেশ কয়েক মিনিট টগবগিয়ে ফোটাতে হবে। তারপর রান্না নামাতে হবে, তেলটা দিয়েই নামিয়ে নিলে হবেনা, তেলচিটে গন্ধ বেরোবে। আর একটা ব‍্যাপার লক্ষ‍্য করছিলাম। কর্তামশাই বাজারে পেঁয়াজ কলি কিনে রোজ ভাজা করতে বলতো। আমি তো জানিনা যে ও ভাজা ছাড়া আর কিভাবে খেতে হয়, সেটাই জানেনা। আমি একদিন ফালি ফালি পাতলা আলু কেটে পেঁয়াজকলির চচ্চড়ি করলাম। একদিন ভাজা পেঁয়াজ কলি দিয়ে মাছের ঝাল করলাম। এই রান্নাগুলো করে কর্তা আর মিনি দুজনেরই প্রশংসা পেলাম। পেঁয়াজ কলি ভাজা দিয়ে ভাত খাওয়া বন্ধ হল।

এখন আমাদের বাড়িতে কাঁকড়ার শাঁসালো শরীরটা ঝাল, কালিয়া বা মালাইকারি হয় আর দাঁড়াগুলো দিয়ে টক বানানো হয়। পাকা তেঁতুল জলের মধ্যে চটকে গুলে রাখতে হবে। এবারে সর্ষের তেলে পাঁচফোড়ন, শুকনো লঙ্কা দিয়ে তারপর দাঁড়াগুলো দিয়ে ভালো করে গনগনে আঁচে ভাজতে হবে। ভাজার সময়ে নুন, হলুদ, চাইলে একটু লঙ্কা গুঁড়ো দেওয়া যেতে পারে। ভালো করে ভাজা হয়ে গেলে তেঁতুল জল দিয়ে ফোটাতে হবে। ফোটানোর সময়ে চিনি দিয়ে দিতে হবে। শ্বশুর শাশুড়ি ডাক্তার দেখাতে আমাদের শহরের বাড়িতে আসতেন। তখন এইসব রেসিপি জেনে নিতাম। শাশুড়ি শিখিয়ে দিয়েছিলেন আমসি বা তার বদলে পাতি লেবুর রস দিয়েও টক হয়। কিন্তু সেটা করতে গেলে পাতিলেবুর রসটা রান্নার শেষের দিকে মেশাতে হয় না হলে তিতকুটে ভাব চলে আসবে আর রান্নায় জল দেবার সময়ে তাতে আমসিটা চটকে দিতে হবে। তেঁতুলের টক করতে গেলে তেঁতুলের জলটা রান্নার প্রথমদিকেই মেশাতে হবে। তেঁতুল যত জাল খাবে, তত তার স্বাদ খুলবে। মোটা শক্ত দাঁড়াগুলো সাঁড়াশি বা নোড়া দিয়ে ফাটিয়ে দিলে তাতে নুন মিষ্টি ভালো ভাবে ঢুকবে আর ভাতের পাতে খেতেও সুবিধে হবে।

মায়ার সংসার

শ্বশুর শাশুড়ি যখন আসতেন, তখন অনেক মজার মজার কান্ড ঘটতো। শ্বশুরবাড়ির সব পুরুষ মানুষ, বর, দেওর, শ্বশুর সকলেই প্রচণ্ড ঘুমোতে পারে। বিছানায় পিঠ দিলেই ঘুম।  রবিবার দুপুরে কর্তারা ঘুমোলে, আমি আর শাশুড়ি মা দুই সইয়ের মতো মনের কথা কইতে বসতাম। অনেক সময়েই সেই পি এন পি সি মানে পরচর্চা পরনিন্দা পতিনিন্দার দিকে গড়াতো।
– … তখন বাপু কি বললো জানো? …….
– ঐ তো ঠিক বাপের স্বভাব পেয়েছে। ঐ নিয়ে তো সারা জীবন জ্বলছি।
– …… তারপর এই শুনে বাপু কি অশান্তি করলো।
– বলতে গেছো কেন? সংসারে সব কথা পুরুষ মানুষকে বলতে নেই।

কর্তারা ঘুম থেকে উঠলে দেখা যেতো  মা ছেলের আর বৌমা শ্বশুরের অনেক গোপন খবর জেনে ফেলেছে।  তারপর বিকেলের মুড়িমাখার সময়ে সব ফাঁস করা হতো। বরেদের বিব্রত করে দুই সখি অনাবিল আনন্দ উপভোগ করতাম। আর যখন ননদেরা আসতো, তখন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিতো, দুজনে বসে কি কি পতিনিন্দা করেছি আর অট্টহাসির রোল উঠতো বাড়িতে। বিয়ের আগে যে তেল আমের আচার এসেছিল, বড় বয়ামে সেই আচারই আসতো গ্রামের বাড়ি থেকে। ঐ তেলে মুড়ি মাখতো মিনি।

শাশুড়ি মা আমার সঙ্গে শাড়ি অদলবদল করতে পছন্দ করতেন। পুজোর সময়ে পাওয়া একটু দামি অমরশীর তাঁত, ঢাকাই না পরে নিয়ে আসতেন। বলতেন এগুলো তুমি ভাঙবে। পরে কলেজে যাবে। পরের বার এলে নিয়ে যাবো। ততদিনে মাড় ধুয়ে কাপড় নরম হয়ে যাবে। তার বদলে আমার আলমারি থেকে সাদা বা চন্দন বেসের বাটিক, কলমকারি নিয়ে যেতেন। পরের বার আবার ফেরত দিয়ে নিজের গুলো নিয়ে যেতেন। ছেলে টক ছাড়া ভাত খেতে পারেনা, তাই ধৈর্য ধরে আমাকে টক রান্নার কৌশল শেখাতেন। কয়েকটা এখানে বলছি।

১) কাঁচা মৌরলা মাছের অম্বল :
কাঁচা মাছে রান্না হবে যখন, মাছটা টাটকা হতে হবে। প্রথমে মাছগুলো পরিষ্কার করে আঁশ ছাড়িয়ে ধুয়ে নুন আর হলুদ মেখে ঘন্টা খানেক ঢেকে রেখে দিতে হবে। পুরোনো তেঁতুল হলে স্বাদটা ভালো হবে। এবার কড়াতে তেল দিয়ে পাঁচ ফোড়ন আর শুকনো লঙ্কা দিয়েই কড়ার উপর একটি মাপ মতো ঢাকনা চাপা দিতে হবে যাতে ফোড়নের গন্ধ উড়ে না যায়। এবার কড়ায় তেঁতুল গোলা জল দিয়ে একইরকম ভাবে চাপা দিয়ে ফোটাতে হবে। বেশ কিছুক্ষণ ফোটার পরে ওই ফুটন্ত তেঁতুল জলে মাছগুলো ছেড়ে দিতে হবে এবার মাছ সেদ্ধ হয়ে গেলে পরিমাণ মতো নুন আর চিনি দিয়ে নামাতে হবে। এই পদটা স্বাদে একটু টক মিষ্টি হয়। একই রকম ভাবে এই টক লেবু, কাঁচা আম বা আমসি দিয়ে বানানো যায় শুধু লেবু, কাঁচা আম বা আমসির ক্ষেত্রে মিষ্টি দেওয়া হয় না আর টকে লেবু দেওয়ার নিয়ম হলো ঝোল একেবারে তৈরী হয়ে গেলে লেবু দিয়েই আঁচ থেকে নামাতে হবে অর্থাৎ লেবু দিয়ে আর ফোটানো যাবে না।
২) পোনা মাছের টক : সাধারণত কাঁচা আম বা আমসি দিয়ে এই টক রান্না করা হয়। আমসি দিয়ে রান্না করতে গেলে আমসিটা আগে থেকে জলে ভিজিয়ে রাখলে ভালো হয়। রুই, কাতলা বা মৃগেল জাতীয় মাছের টক রান্না করা হয়। যত বড় বা পাকা মাছ হবে তত ভালো টক রান্না হবে। যদি একেবারে টাটকা মাছ হয় তাহলে মাছের টুকরোগুলো খুব হালকা করে ভাজতে হবে আবার অনেকে না ভেজেও করে। এই টক রান্নায় কাঁচা লঙ্কা আর সর্ষে একসঙ্গে বেটে নিয়ে ব‍্যবহার করতে হয়। প্রথমে তেলে শুকনো লঙ্কা পাঁচ ফোড়ন দিতে হবে। অবশ্য পাঁচ ফোড়নের বদলে কালো গোটা সর্ষেও দেওয়া যায়। তারপরে কাঁচা আম বা আমসি দিয়ে একটু নেড়ে নিয়ে পরিমাণ মতো জল দিয়ে তাতে সর্ষে কাঁচা লঙ্কা বাটা দিয়ে ফোটাতে হয়, একটু পরে মাছ দিয়ে ভালো করে ফুটিয়ে নামিয়ে নিলেই মাছের টক রেডি।
৩) নানা সামুদ্রিক মাছের টক:  উপকূলবর্তী এলাকায় এবং যারা ট্রলারে করে দিনের পর দিন সমুদ্রে মাছ ধরতে যায় তাদের মধ্যে এই পদগুলো অত‍্যন্ত জনপ্রিয়। নানা প্রজাতির ফ‍্যাসা, ফিতে বা পাটিয়া, খাঁড়া বা সোর্ড ফিস, ভোলা,  নানা প্রজাতির চিংড়ি থেকে পমফ্রেট বা মহার্ঘ ইলিশ সব ধরনের মাছের টক রান্নার ব‍্যকরণ মোটামুটি এক। তবে সমুদ্রের মাছ আগে ভালো করে ভেজে নিতে হবে আর সাধারনত এই মাছের টক তেঁতুল দিয়েই রান্না করা হয়। ফোড়ন হিসেবে সর্ষে আর শুকনো লঙ্কা দিয়ে একটু বেশি সময় টকটা ফোটানো হয়। চিংড়ির টকটা একটু ঘন করা হয় , অনেকে আবার এই টকে একটু মিষ্টি ও ব‍্যবহার করে। একমাত্র ইলিশের ক্ষেত্রে মাছটা কড়া ভাজা হবেনা। হাল্কা ভাজা হবে। মেজ নন্দাই যখন শ্বশুর বাড়িতে আসতেন, আমাকে বক্সী বাজারে নিয়ে যেতেন। কতোরকম যে নোনামাছ বাজারে, তাদের চেহারা, আকৃতি সব কিছু অদ্ভুত। আমি অবাক হয়ে যেতাম। মাছগুলো বেশ স্বাদু, কিন্তু দামে কম। কম তো হবেই, স্থানীয় সমুদ্রের মাছ স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। শহরের মানুষ তো খেতে জানেনা, তাই দামও ওঠেনা। কিন্তু এই মাছগুলো এখানকার মানুষের শরীরে শস্তা প্রোটিনের যোগানদার। আর দীঘা মোহনায় ইলিশ উঠলে, বাড়িতে ফোন চলে আসে। তখন বর, দেওর, আরো কয়েকজন বন্ধু বান্ধব মিলে কাকভোরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যায়। কারখানা থেকে থার্মোকলের বাক্স কিনে রেখেছে বেশ কয়েকটা। তার মধ্যে টাটকা ইলিশ ঠেসে বরফ দিয়ে চওড়া সেলোটেপ দিয়ে সীল করে নিয়ে আসে। শহরেও এভাবে ইলিশ নিয়ে আসি আমরা। প্রতিবেশী, নিকটজন ইলিশ উপহার পেলে খুবই খুশি হয়। হাওড়া স্টেশনের পাশে ইলিশের নীলাম হয়। সেখানেও যাওয়া হয় কখনো সখনো।

৪) কাতলা বা ভেটকি মাছের মাখা ঝাল: দু আড়াই  কেজির উপরের কাতলা বা ভেটকি মাছে এই রান্নাটা খুব ভালো হয়। কাতলা মাছ দাগা পেটি সহ কাটালে অর্থাৎ একটা রিং পিসকে আড়াআড়ি ভাগ করে রান্না করলে সবচেয়ে ভালো হয়। মাছের টুকরোগুলো ভালো করে ধুয়ে ওতে নুন, হলুদ মাখাতে হবে। এরপর  পেঁয়াজ, রসুন, সর্ষে আর কাঁচা লঙ্কা একসঙ্গে বেটে ওই মাছের টুকরো গুলোর সঙ্গে ভালো করে মাখাতে হবে, এবার মাছগুলোতে অল্প করে সর্ষের তেলও মাখাতে হবে। মাছগুলো এইভাবে ঘন্টা খানেক রেখে দিতে হবে। এই রান্নায় ওই বাটার সঙ্গে যেটুকু জল আর মাছের গায়ে যেটুকু জল লেগে থাকবে তার বাইরে একফোঁটাও জল ব‍্যবহার করা হয় না। এবার কড়ায় তেলে তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে তাতে মেখে রাখা মাছ মশলা সুদ্ধ দিয়ে ঢাকা দিয়ে দিতে হবে। আঁচ একেবারে ঢিমে থাকবে। কিছুক্ষণ পরে পরে ঢাকা খুলে খুব সাবধানে মশলা সুদ্ধ মাছ উল্টে দিতে হবে। সাবধানে ওল্টাতে হবে কারণ তা নইলে মাছের টুকরোগুলো ভেঙে যেতে পারে। এভাবে বারকতক ওল্টানোর পরে যখন তরকারি থেকে তেল ছেড়ে যাবে তখন বোঝা যাবে রান্না হয়ে গেছে। এই মাখা ঝাল ভাতের সঙ্গে গরম গরম খেলে জিভের তারে ঝঙ্কার ওঠে নিশ্চিত, আমার উঠেছিল। আসলে আমার বাপের বাড়িতে মাছ রান্নার বেস মশলা যেমন জিরে, ধনে, আদা, শ্বশুরবাড়িতে হল পেঁয়াজ, রসুন, সর্ষে। আবার বাপের বাড়িতে সর্ষেটা জল মিশিয়ে ঢেলে দেওয়া হয়। ঘন সর্ষে বাটা কখনও অন‍্য মশলার সঙ্গে কষতে দেখিনি। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে সেটাও দেখেছি। যদিও আমি এমন করিনা। একটু আধটু নিজের মতো ইম্প্রোভাইজ করেছি।

শ্বশুরবাড়িতে রোজকার ঝোল, ডাল সব্জি সবকিছুতেই পেঁয়াজ পড়ে। ওটা ছাড়া রান্নার ধারণা খুব কম মানুষের আছে। বাড়িতে মিনিকে ডাল রান্না শিখিয়ে দিতাম। আমার মা সপ্তাহে সাতদিন সাতরকম ডাল করতো, আমারও তাই খাওয়া অভ‍্যেস ছিল। কিন্তু মিনি শুনতোনা। ও যা আগে থেকে জানতো, সেটাই থোড় বড়ি খাড়া করে যেত। একদিন খুব বিরক্ত হয়ে বললাম, তুই ডাল করতে পারিস না কেনো রে? তোদের বাড়িতে তো ডাল খেয়েছিস। কথাটা বললাম, কারণ ছোটো থেকে শুনেছি, প্লেন লিভিং হাই থিঙ্কিং করতে হলে মোটা কাপড় আর ডালভাত হলেই চলে যায়। পুঁথিগত বিদ‍্যে থেকে আমার ধারণা হয়েছিল, গরীব মানুষেরা, যারা বেশি উপকরণ জোটাতে পারেনা, তারা ডালভাত খায়। কিন্তু আমার কথা শুনে মিনি হেসে উঠলো। বললে,
– ডাল? আমাদের বাড়িতে ডাল? ডালের কতো দাম তুমি জানো বো-দি?
– না, অনেক দাম?
সত‍্যিই আমি জানিনা। আমি তো মাসকাবারি বাজার করিনা। শখে এটা ওটা কিনি, লাল হলুদ বেল পেপার, ব্রকোলি এইসব।
– শোনো বো-দি, আমাদের বাড়িতে একটাই তরকি হয়, বেশি করে কঁচা ঝাল্অ দিয়ে, যাতে একটুখানি তরকি দিয়ে বেশি ভাত খাওয়া যায়। অনেকে ভাতেও কঁচা ঝাল্অ চকটে দেয়।
অধোবদন হই, গরীব মানুষ ডাল দিয়ে নয় ঝাল দিয়ে ভাত খায়। ‘আমি ঝাল খেতে পারিনা’ – এধরণের বাক‍্যবন্ধ যে বলতে পারে সে আসলে খাদ‍্যের বিষয়ে সুরক্ষিত। রান্নাঘর যেনো আমার গালে ঠাসিয়ে এক চড় মারে।

শ্বশুরবাড়ির দেশে নিরামিষ বা পেঁয়াজ রসুন ছাড়া রান্নার চল একেবারে যে নেই, তা কিন্তু নয়। কিন্তু এর সঙ্গে একটা অনুষঙ্গ আছে।  সেই অনুষঙ্গ হলেন শ্রীচৈতন্যদেব। আমার কলেজের পাশে শাঁখরাইল থেকে সেই যে তিনি নৌকোয় উঠলেন শেষবারের মতো ঊৎকল যাবার জন্য, সেই নৌকোতেই ডায়মন্ড হারবারের কাছে কোনো জায়গায় তিনি মেদিনীপুরের মাটিতে পা রাখেন। তাঁর যাত্রাপথে আজও বেঁচে আছে বৈষ্ণব সংস্কৃতি। এ অঞ্চলে রথযাত্রা খুব বড় উৎসব, আর শ্বশুরবাড়ির পাশের গ্রাম ডেমুরিয়াতে আছে এক সুপ্রাচীন জগন্নাথ মন্দির। এক ভক্ত পুরীর জগন্নাথ দর্শন করে এসে বর্ণনা করে করে শিল্পীকে দিয়ে বিগ্রহ নির্মাণ করিয়ে ছিলেন। তখন তো আর ছবি তোলা আবিষ্কার হয়নি। সেই বিগ্রহ আজও তেমনই আছেন, নবকলেবর হননি। বর্গী আক্রমণের সময়ে ইনি ভক্ত গৃহে অন্তর্ধানও করেছিলেন। রথ উপলক্ষে তো বটেই, পারিবারিক যে কোনো ভালো মন্দে, শোকে, আনন্দে মহোৎসবের আয়োজন করা এই এলাকার মানুষের সংস্কৃতি। এখানেই স্থানীয় মানুষের মুখে গল্প শুনেছি চৈতন্য নয় নিত‍্যানন্দ প্রথম চূড়া মহোৎসবের আয়োজন করেছিলেন। চূড়া মানে চিঁড়ে। উদ্দেশ্য ছিল জাতপাত নির্বিশেষে একসঙ্গে পংক্তি ভোজন। সেই সংস্কৃতি সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ভোগের জন্য যে তরকারি রান্না করা হয় তার বিশেষ পদ্ধতি আছে। এখানে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে যে পদই রান্না হোকনা কেন তাতে কোন তেল পড়ে না। সবটাই মূলত সেদ্ধ নির্ভর। সে শাক হোক বা আলুপটলের ডালনা বা এঁচোড়ের তরকারি। কোন সব্জিই কষা হয় না। আগে সেদ্ধ করে তাতে পদ অনুযায়ী নারকেলের দুধ, জিরে বা আদা বাটা মিশিয়ে আর ঘি ছড়িয়ে এই রান্না করা হয়। নানা পদের সঙ্গে একটি নিরামিষ টক রাখতেই হয়। এই বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা তরকারির স্বাদ হয় অপূর্ব। যে না খেয়েছে, সে বুঝবেনা। যাঁরা এই ভোগ রান্না করেন তাঁরা বহু প্রজন্ম ধরে এই পদ্ধতিতে রান্না করে আসছেন। এবং এই পদ্ধতির মধ্যে মন্ত্রগুপ্তি আছে যা ঐ পরিবারগুলির বাইরের মানুষেরা জানেনা। ডেমুরিয়ার ঐ প্রাচীন মন্দিরে এইভাবেই নিত্য অন্নভোগ হয়। দীঘায় ঘুরতে আসা পর্যটকেরা বেশিরভাগই এই মন্দিরের কথা জানেন না। কিন্তু দীঘা থেকে ঘুরে আসা যায়। কারণ এটি ওখান থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কাছেই স্থানীয় পঞ্চায়েত একটি চমৎকার সাজানো ঝিল বানিয়েছে – নীলাচল। বিগ্রহের সঙ্গে ঝিলটাও ঘোরার মতোই জায়গা। পরবর্তী কালে ডেমুরিয়ার মন্দিরে যে সংস্কার কার্য হয়েছিল, তাতে আমাদের পরিবারের অবদান আছে। শ্বেতপাথরের ফলকগুলির প্রথম ফলকটিতেই সে কথা লেখা আছে।

মহোৎসবের রান্না ছাড়াও টুকিটাকি নিরামিষ হয়। যেমন রান্নার শেষে নিভন্ত উনুনে আলু ফেলে আলু পোড়ানো। আলু ভাতের থেকে আলু পোড়া অনেক বেশি স্বাদু। আঁচে চাটু রেখে টমেটোও পোড়ানো হয়। টমেটো পোড়া দিয়ে মুড়ি মেখে খেতে আমার কর্তা ভালোবাসেন। এরকম আর একটা পদ হলো মোচা পোড়া।
এক্ষেত্রে পুরো মোচাটা কাঠ বা কয়লার আঁচে পোড়ানো হয়। উপরের খোলা পুড়ে গেলে আগুন থেকে বার করে মোচার খোলা খুলে খুলে ভেতরের অংশ বার করে তার সঙ্গে সর্ষে, কাঁচা লঙ্কা, ভাজা জিরে গুঁড়ো, পরিমাণ মতো নুন ভালো করে মেখে, প্রয়োজনে শিল নোড়ায় থেঁতো করে মেখে পরিবেশন করা হয়। গরম ভাতে খেতে খুব ভালো লাগে।

ভাতে খাওয়ার কথায় মনে পড়ল, এখানে এসে আর একটা জিনিস খেয়েছি, যেটা বাপের বাড়িতে কখনও খাইনি – চালতা ভাতে। বাড়ির পিছনে রাস্তার ধারে এক বিশাল চালতা গাছ আছে, প্রচুর ফলে ভরে থাকে। গ্রামের বহু বাড়িতে হঠাৎ অতিথি এসে গেলে, এ গাছ থেকে চালতা পেড়ে, অতিথি সৎকার করা হয়। আর একটা কথা, আমাদের বাড়ির জমি দেখিয়ে ঘটকেরা নাকি বহু ছেলের বিয়ে দিয়েছে। প্রমাণ করেছে ছেলে বর্ধিষ্ণু ঘরের, মেয়ে দিতে পারেন। তারপর বিয়ের পর পর্দা ফাঁস। বৌগুলির তখন ঘটককে শাপশাপান্ত করা ছাড়া আর অন্য উপায় থাকেনা। প্রথম প্রথম এসব শুনে অবাক হতাম, রাগ হতো। কিন্তু এখন বুঝেছি, গরীব ঘরে বাপ মায়ের কাছেই মেয়েদের দাম নেই। কোনো ক্রমে মেয়ে পার করতে পারলেই তারা নিশ্চিন্ত। তারপর যা খুশি হোকনা। দায় মেয়েটির, বাপের নয়। কখনও সখনো বিয়ের পরে আমাদের বাড়িতে মেয়ের বাড়ির লোক খোঁজ নিতে আসে। তখন এবাড়ির লোক জানতে পারে। মেয়েদের জীবনে মিথ‍্যার চাষ বড় বেশি। হাজার লোক তাকে শুধু ঠকিয়েই যায়। যা হোক চালতায় ফিরি। আমার বাপের বাড়িতে চালতার মিষ্টি চাটনি করতো মা। কিন্তু এখানে মিষ্টি পড়েনা। চালতার নোনতা টক হয়। আর হিট আইটেম হল চালতা চিংড়ি। এখন আমার হট ফেভারিট। তবে হ‍্যাঁ, চালতা কাটা খুব শক্ত, বিশেষ পদ্ধতি আছে। আর ফলটা পিচ্ছিল। চাপ দিয়ে কাটতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই চালতার বদলে চালতা কাটুনির হাত ফালাফালা হবার ঝুঁকি থাকে ষোলো আনা। তাই চালতা পাড়া হলে, সব চালতা একসঙ্গে কেটে সেদ্ধ করে ফ্রিজে রেখে দেওয়া হয়। ইচ্ছে মতো রান্না করা হয়। চালতা সেদ্ধ করে নিয়ে জল ফেলে না দিলে তরকারি কষা হয়ে যায়। রান্নার তাড়াহুড়োর সময়ে চালতা কাটা যায়না। তবে চালতা ভাতে হলে ঝুঁকি কম। কারণ বর্ষা কালে যখন নরম চালতা ওঠে, তখন আস্ত ফলটাই ভাতের মধ্যে ফেলে সেদ্ধ করে নেওয়া হয়। এবার সেদ্ধ চালতা সর্ষে বাটা, কাঁচা লঙ্কা, নুন আর অল্প একটু সর্ষের তেল দিয়ে মেখে খাওয়া হয়। আর চালতা চিংড়ি করাও শক্ত কিছু নয়। চিংড়ি আগে ভেজে নিতে হবে। চিংড়িটার কিন্তু আকারের ব‍্যাপার আছে। বড় চিংড়িতে এই টকের স্বাদ খোলেনা, ছোটো চিংড়ি চাই। আবার খোসা ছাড়ানো যাবেনা এতোটা ছোটো হলেও চলবেনা। চালতা লম্বা করে কেটে আগেই সেদ্ধ করা আছে। এবারে তেলে গোটা কালো সর্ষে আর শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে তার মধ্যে কিছুটা চালতা সেদ্ধ দিয়ে নেড়ে নিতে হবে। তারপর সর্ষেবাটা জলে গুলে একটু হলুদ, নুন দিয়ে ঢেলে দিতে হবে। তার পর ঝোল ফুটে গেলে ভাজা চিংড়ি দিয়ে আর একটু ফুটিয়ে নিতে হবে। চালতা চিংড়ির ঝোল পাতলা রাখা হয়। খুব ঘন, আর অতিরিক্ত টক হলে চালতা চিংড়ি খেতে ভালো লাগেনা।

রান্নাঘরের মেয়েরা

‘ছেঁড়া মেঘের আলো পড়ে
দেউল চূড়ার ত্রিশূলে।’
রান্নাঘরের মেয়েগুলো
রেঁধেছে ‘পাঁচমিশুলে।’

আমাদের মিনি ভালো চালতা কাটতে পারতো। আমিও শিখেছিলাম, তবে খুব একটা হাত লাগাতাম না। ভয় লাগতো। মিনি পড়তে শিখে গিয়েছিল। ওরা মানে ঐ এলাকার মানুষ ড় উচ্চারণ করতে পারেনা। ডয়ে শূন্য অড় বলে। তখন আমাদের শহরের বাড়িতে ল‍্যান্ডফোন ছিলনা। শাশুড়ি মা প্রতিমাসে লম্বা লম্বা চিঠি লিখতেন। সেই চিঠিতে খবর পেলাম, জাপানিকে তার বাবা আর নতুন মা এসে নিয়ে গেছে। জাপানি যেতে চায়নি। কিন্তু বাপ মা এসে শ্বশুর মশায়ের হাতে পায়ে ধরেছে। খুব ভালো সম্বন্ধ পাওয়া গেছে। ছেলে বাইরের নয়, এক জেলায় বাড়ি। জমিজমা আছে, পাকা বাড়ি। বছরখানেক পরে কর্তার অফিসে ফোন এলো, মিনিকে বাড়ি পাঠাতে হবে, জরুরী দরকার। ওকে বাড়ি পাঠানোর ব‍্যবস্থা হল। তিন চারদিন পরে মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এলো। জাপানি মারা গেছে। অন্তসত্ত্বা অবস্থায় শারীরিক অবস্থা জটিল হয়ে গিয়েছিল। শীর্ণ শরীর, বোধহয় খাওয়া জুটতোনা ঠিকঠাক। বাপ মা খবর রাখেনি। শেষ অবস্থায় বাপের ছিটে বেড়ার ঘরে রেখে গিয়েছিল। হাসপাতালে দেওয়া হয়েছিল। বাচ্ছা বিয়োতে গিয়ে মা সন্তান কেউই বাঁচেনি। বরও খবর নিতে আসেনি। বর নাকি গাল তোবড়া আধবুড়ো। মিনির ফোঁপানির আওয়াজ শুনি, আর মনে মনে ফুঁসি। করবোটা কি? কর্তা, গিন্নি, দেওর, ননদ মিলে শলা করে খবরটা শ্বশুর শাশুড়ির কাছে গোপন রাখি। আমার ছোটো জা সরকারি সিনিয়র নার্স। বদলির চাকরিতে গাঁয়ে গঞ্জে বহু জায়গায় পোস্টিং পেয়েছে। মেয়েদের বহু ঘটনার সাক্ষী। খবর শুনে বললো, কি করবে শারদা দি? এর তো আঠেরো হয়েছিল, একটা বিয়ে হয়েছিল। জগৎটাই এমন। যেখানেই পোস্টিং পাই, কিছু দিন অন্তর অন্তর ছোটো ছোটো বালিকা, কিশোরী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি হয়। অসুখ সব এক – পেটে টিউমার। আসলে টিউমার নয়। পাশবিকতার শিকার হয়ে পিরিয়ড বন্ধ। গর্ভপাত করাতে আসে। কাকা, মামা, দাদা খুব আদর করে মা, মা ডেকে ভর্তি করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারাই কালপ্রিট। শুনে স্তব্ধ হয়ে থাকি। এই ঘটনার কিছুদিন পরে মিনির প্রবল জ্বর আসে। শরীরের সব গ্ল‍্যান্ড ফুলে ওঠে। ওর বয়স তখন ষোলো সতেরো হবে। কলকাতার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করি। জ্বর বাগে আসতে চায়না। পিজি হাসপাতাল ওর ঐ অসহ্য জ্বর বাগে আনতে আট আটজন ডাক্তারের বোর্ড বসিয়ে দেয়। পোড়া দেশের গরীব মেয়ে এতো সম্মানও পায়! ডাক্তারবাবুদের হাতযশে নাকি জীবনে আরও যন্ত্রণা ভোগ আছে বলে মিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি এলো। কিন্তু তার বাপ মা বললে তাকে বাড়ি নিয়ে যাবে। পরের মেয়ে। জোর কিকরে করি? বছরখানেক পরে তার বাবা এলে আমাদের কাছে। বক্তব্য, কিছু অর্থসাহায্য দরকার। মিনির বিয়ের ঠিক হয়েছে। শুনেই জ্বলে উঠি, আবার জাপানির মতো এটিরও বলি চড়বে? মিনির বাপ নানাভাবে আশ্বস্ত করতে চায় আমাদের। ততোদিনে ফোন এসেছে বাড়িতে। মিনি ফোন করে বলে, ‘চিন্তা নেই গো বো-দি। ছেলে দেখেছি আমি। পছন্দ হয়েছে।’ কানের দুল আর কিছু নগদ নিয়ে মিনির বাপ বাড়ি ফেরে। সেই শেষ। মিনির খবর আর পাইনি। লোক পাঠিয়েছিলাম কয়েকবার। সেই জানা ঠিকানায় ওর বাপ মাও থাকেনা আর। গাঁয়ের মানুষও খোঁজ দিতে পারেনি। ও চলে গেছে, তা কুড়ি বছর তো হবে। জানিনা কেমন আছে বা আদৌ বেঁচে আছে কিনা। মিনির বিয়ের আলোচনায় মূহূর্তের অসতর্কতায় জাপানির মরার খবর ফাঁস হয়ে যায় শাশুড়ি মায়ের সামনে। তিনি শয‍্যা নেন। কেঁদে কেঁদে হাহুতাশ করেন, ‘বৌরানী, তোমরা তো কতো লেখাপড়া করেছো, এমনকি কোনো ব‍্যবস্থা হয় না গো, নিজের বাড়িতে থেকে মাসে মাসে মেয়েদের হাতে একটা টাকা আসে। সামান্য হলেও হবে। তবু যেন সেটা মেয়ের টাকা হয়, কেউ কেড়ে নিতে পারবেনা এমন টাকা। এমন কি কিছু হয়না যেখানে মেয়ে থাকবে প্রধান হয়ে, বাড়ির লোকগুলো দরকারি কিছু পাবার জন্য ঐ মেয়ের খুঁটোয় বাঁধা থাকবে। মেয়েগুলোর কি কেউ দাম দেবে না গো।’ শাশুড়ি মায়ের বিলাপ শুনি। কিন্তু উনি যা চান, সেরকম কোনো ব‍্যবস্থা যে জানা নেই আমার। একটু সামলে নিয়ে তিনি আমায় বলেছিলেন, ‘চোদ্দ বছর বয়সে এ সংসারে এসেছি। তারপর চারপাশে কতো মেয়ের যে না খেয়ে, মার খেয়ে মৃত্যু দেখলাম তার ইয়ত্তা নেই। যখন যেভাবে পারি, যতোটা পারি এদের বাঁচানোর চেষ্টা করি, তবু অনেক লড়াই হেরে যেতে হয়। এইসব মেয়েগুলো যে বাড়ির লোকের কাছে মর্যাদা পায়না, তাদেরই কিছু সুরাহা করার জন্য রান্নাঘর থেকে লুকিয়ে কিছু নিয়ে যায়। সবসময় চাইতে হয়তো মানে লাগে। তাই এদের কিছু বলতে পারিনা। আজ দশটাকার জিরে গুঁড়ো নিয়ে যাকে বকবো, কাল পরশু হয়তো সে কাঁচা বয়সের কাজল চোখে চিতেয় উঠবে। এমন আগে ঘটেছে, তাই কিছু বলতে পারিনা। ওসব সংসারের খরচ হিসেবে ধরে নিই।’ শাশুড়ি মার কথাগুলি মর্ম ভেদ করে আমার। স্তব্ধ হয়ে থাকি। পুঁথির পাতায় এই মরা মেয়েগুলোর গালভারি নাম আছে একটা, এই বাংলারই সেন মশাইয়ের দেওয়া – মিসিং উওম‍্যান। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়েছিলাম এসব, তখন নিজে তো কাউকে হঠাৎ মিসিং হতে দেখিনি। আজ বুঝছি। হারিয়ে যাওয়া মেয়েগুলোকে যারা চিনতো, তাদের বড্ড কষ্ট। বুকে পাথর চেপে রাখতে হয়।

শ্বশুর শাশুড়ি যখন আসতেন শহরে, পোঁটলা বেঁধে অনেক কিছু আনতেন। আর পোঁটলা র মধ্যে থাকতো নানারকম শাক – হিঞ্চে, গিমে, মেথি শাক, ছোলা শাক, রসুন শাক এইসব। আর একটা শাক থাকতো, বাপের বাড়িতে তার নাম শুনিনি কোনোদিন – পিড়িং শাক। অনেকটা মেথি শাকের মতো দেখতে। তবে মেথি শাকের থেকে তিতকুটে ভাব কম। দুটো শাক একরকম ভাবেই রান্না হয়। আর দুটো শাকই আমার ভালো লাগে। তেলে পাঁচফোড়ন শুকনো লঙ্কা দিয়ে ছোটো ছোটো টুকরো আলু ভেজে নিতে হবে। তারপর হলুদ, জিরে গুঁড়ো দিয়ে কষে শাকটা দিতে হবে। শাক নেড়েচেড়ে মশলার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়ে, তারপর ঢাকা দিতে হবে। মেথি বা পিড়িং যাই রান্না হোক এই শাকদুটো একটু শুকনো শুকনো ভাজা ভাজা হলে ভালো খেতে লাগে। মেথি শাকটা বেছেবুছে ডাঁটি ছাড়িয়ে শুধু পাতাটুকুই রাখতে হবে। তারপর পাতাগুলো সামান্য নুন দিয়ে কিছুক্ষণ মজিয়ে রেখে দিয়ে জল নিংড়ে নিলে তেতো ভাবটা কমে যায়। আলু না দিয়ে বেগুন ছোটো ছোটো করে দিয়েও রান্নাটা করা যায়। তবে আমার আর কর্তার দুজনেরই শিম আর কড়াইশুঁটি দিয়ে মেথি শাকভাজা ভালো লাগে।

শাশুড়ি মা আর একটা খাবার বানাতেন, তেঁতুল দিয়ে চীনে বাদাম বাটা। বাদামগুলো কিন্তু কাঁচা হলে হবেনা, ভাজা হতে হবে। স্বাদমতো নুন মিষ্টি মিশিয়ে নিতে হবে। কচি আম হলে তার আমসি দিয়েও ভাজা বাদামের বাটা খেতে ভালো লাগে। আর একটা হতো বাদামের চাটনি। সর্ষের তেলে গোটা সর্ষে আর শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে আমসি আর বাদাম গোলা জল দিয়ে ফুটিয়ে নিতে হয়। আর গরমকাল হলে আমসির বদলে কাঁচা আমের ফালি ভেজে নিয়েও চাটনিটা করা যায়। কাঁচা আম দিয়ে শোল মাছের টক কর্তা খেতে খুব ভালোবাসেন। তবে আমার ফেভারিট হয়ে গেছে শোল মাছের ধো়ঁকা। এই রান্নাটা আমার মেজ ননদ খুব ভালো করে। এই রান্না করার জন্য শোলমাছটা কিন্তু বোনলেস কিউব করে কাটতে হবে। তারপর যেমন নুন হলুদ মেখে মাছ ভাজা হয়, তেমনি হবে। রান্না হবে পুরো কষা মাংসের মতো, একটু ঝোল ঝোল। শুধু মাংসের বদলে থাকবে শোল মাছ।

শ্বশুরবাড়ির খিড়কি পুকুরটায় খুব কই মাছ হয়। মেজদি এলেই আমার কর্তা গামছা পরে পুকুরে নেমে পড়ে। হাতে আর একটা গামছা থাকে। তারপর পাড়ের কাছে কাদায় চেপে চেপে হাতে কইমাছ ধরে ধরে পাড়ের দিকে ছোঁড়ে। মেজদি একটা হাঁড়ি নিয়ে পুকুরের চারপাশে ঘোরে। মাছ যেখানে পড়ে সেখান থেকে কুড়িয়ে নেয়। আমিও ঘুরি সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু কাঁটার ভয়ে হাত লাগাতে পারিনা। আমার দেওর কই মাছের হরগৌরি রান্না করে। একপিঠ সর্ষে দিয়ে ঝালঝাল কাই মাখানো, আর এক পিঠ ডোবানো থাকে ঘন তেঁতুলের টকে। কিন্তু পুকুরের শেওলা ধরা রয়‍্যাল সাইজের দিশি কই না হলে হরগৌরি খেয়ে শান্তি নেই। শহরে তাই আমি পমফ্রেট মাছের হরগৌরি করি। পমফ্রেটের বড় আকার আর প্রশস্ত পিঠ হরগৌরি করার জন্য আদর্শ। তবে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা পমফ্রেটের চেয়েও বাউল মাছ বেশি পছন্দ করে। ওদিকে রাঁধুনিরা পমফ্রেটকে পমফ্লেট বলে ডাকে। বাউল মাছ সুস্বাদু। এ মাছের ঝোল, ঝাল, টক সবই হয়। তবে টাটকা বাউল এলে কাঁটা ছাড়িয়ে, ফিলে কেটে সন্ধেবেলা ফিস ফিঙ্গার ভাজা হয়। এক প্লেট করে ফিস ফিঙ্গার সহযোগে মুড়িমাখা নিয়ে আড্ডা বসে। 

আশ্বিনের ঝড়

মেঘের সারি আসছে তেড়ে,
সাগর ডাকে কন্ঠ ছেড়ে।
জল চলে জোর ঘরটি ঘিরে,
আয় নিয়ে সই ধনে জিরে।
ঝড়ে যাক সব উড়ে পুড়ে,
মাছে মাছ খাই পাতটি জুড়ে।

এক দুর্গাপুজোয় এক ঘটনা ঘটলো। বাড়িতে গোপীনাথের মন্দির। দুর্গাপুজোয় নিরামিষ হয়। কিন্তু বিসর্জন হয়ে গেলে তো আর আমিষ খেতে বাধা নেই। দশমীর বিকেলে মেজদি খিড়কি পুকুরে ছিপ ফেলে পুঁটি মাছ, চারা পোনা এসব ধরছিল। তাই দেখে আমার কর্তা উত্তেজিত হয়ে হুইল ছিপ বার করে একটা বড়সড় রুই মাছ ধরে ফেললেন। সেই মাছ সারা পুকুরে ছুটে বেড়াচ্ছিল, আর কায়দা করে ছিপে সুতো ছেড়ে মাছ খেলিয়ে তোলা হচ্ছিল। সবাই ভিড় করে দেখছিল। ভিড়ের মধ্যে আমিও ছিলাম। হৈ চৈয়ের মধ‍্যেও কোথায় যেন একটা অদ্ভুত আওয়াজ ভেসে আসছিল। যখন সচেতন হয়ে শোনার চেষ্টা করছি তখন মনে হচ্ছে, না কিছু তো নেই। কিন্তু আনমনা হলেই আবার। একটা ঝিনঝিনে নাকি গুমগুমে রিদমিক আওয়াজ। কেমন যেন একটাই শব্দ বারবার রিপিট হচ্ছে। শেষকালে বলেই ফেললাম, তোমরা কেউ কিছু শুনতে পাচ্ছো? সবাই পিছন ফিরে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, সমুদ্র ডাকছে। সমুদ্র? এখান থেকে কোনদিন তো এভাবে শুনিনি। শোনা তো যায়না। শাশুড়ি মা বললেন, হ‍্যাঁ দীঘা মোহনা ডাকছে। বড় কিছু ঘটবে। বলেই একটা ছড়া কাটলেন,
দীঘা মোহনা, মন্দারমণি মানে মন্দার খালের মোহনা, সুবর্ণরেখার মোহনা আর রসুলপুরের মোহনা ডাকলে কি কি হয়। অনেকটা খনার বচনের মতো, পূর্বাভাস। খুব কষ্ট হচ্ছে, যে ছড়াটা লিখে রাখিনি। অনেককে জিজ্ঞাসা করেছি পরে, কিন্তু ওসব পুরোনো ছড়ার কথা কেউ বলতে পারেনা। ওনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এখানে দাঁড়িয়ে বুঝলে কি করে কোন মোহনা ডাকছে? উনি বলেছিলেন শব্দের দিক থেকে। শুনশান নিস্তব্ধতায় যারা বাঁচে, তারা অনেক মৃদু শব্দ ভালো করে বুঝতে পারে। আমি শহরের মানুষ। উঁচু তারের শব্দের মধ্যে থাকতে থাকতে, শ্রুতির মিহি তারগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে। তার সাড়া পাওয়া যায়না। আমার কর্তাকেও দেখি, কটকটে রোদের মধ‍্যে হঠাৎ বলে, একটু পরে বৃষ্টি হবে। আমি বলি, ধ‍্যাৎ। ও বলে, দেখবে তুমি, চ‍্যালেঞ্জ। আর আমাকে অবাক করে সত্যি সত‍্যি বৃষ্টি নামে। আমি বলি, বোঝো কি করে? ও বলে, তুমি বুঝবেনা। হাওয়ার স্পর্শ বদলে যায়। সেদিন রোদ কিংবা বাতাস, কোথাও কোনো ইঙ্গিত ছিলনা প্রলয়ের, শুধু ঐ ঝিনঝিনে শব্দ ছাড়া।

সন্ধেবেলা সে এক কান্ড। দেখি এক একটা দেওয়াল জুড়ে লাল পিঁপড়ের ঢল নেমেছে। একফোঁটা জায়গা খালি থাকছেনা। তারপর খাটেও লাল পিঁপড়ে। শেষে এমন অবস্থা হারিকেন থেকে কেরোসিন ঢেলে খাট, জানলা, টেবিল চেয়ার মুছতে হলো। দেওয়াল থেকে খাট টেনে আনতে হলো মাঝখানে। সবাই বললো পিঁপড়ে উথলি হয়েছে। বাড়িতে সাজো সাজো রব পড়লো। ধানের গোলা থেকে বেশ কয়েক বস্তা চাল এনে বাড়িতে রাখা হলো। বারান্দা ভারি প্লাস্টিক শিট দিয়ে বেঁধে ঢাকা হতে লাগলো। শাশুড়ি মা রান্নাঘরে আনাজ, মশলা কতোদিন চলতে পারে সেটা হিসেব করতে লাগলেন। লোকজন ডেকে কর্তা আর দেওর গেল পুকুর বাঁচাতে। আমি তো এসব প্রস্তুতি দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি। কোনো যুদ্ধ হবে মনে হচ্ছে। শ্বশুর মশাইকে গিয়ে জিজ্ঞেস করি পুকুর বাঁচানো মানে কি? উনি বুঝিয়ে বলেন, প্রতি পুকুরের একদিকে ঢাল থাকে। বন‍্যা হলে পুকুরের জল উপছে সেই দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়, তাই সেদিকে বাঁধ দিতে হয়, যাতে মাছ না বেরিয়ে যায়। কিন্তু সেতো বন‍্যা হলে। এখনও তো বৃষ্টি নামেনি। খটখটে শুকনো। তারপর রাত তিনটে থেকে শুরু হলো প্রলয়। কানে তালা ধরা বৃষ্টির আওয়াজ। হাওয়ার ধাক্কায় বাড়িটা কাঁপছিল। ও বৃষ্টির আওয়াজ যে শোনে তার মৃত্যুভয় চলে আসে। তারপর দিন সাতেক জলবন্দী জীবন। আসলে আমাদের বাড়িটাতো বালিয়াড়ির ওপরে। আশপাশের বাড়িগুলোও তাই। রাস্তাগুলো আসলে ঐ বালির টিলার মাঝখানের উপত‍্যকা। ওগুলো দিয়ে বালিয়াড়ির জল যায়। কাজেই বেলে রাস্তা বছরের আট মাসই ভেজা ভেজা থাকে। ঐ রাস্তাগুলো দিয়ে খরস্রোতে বৃষ্টি আর জোয়ারের জল চলল খলবলিয়ে। চারিদিকে নদী আর মাঝখানে বাড়িগুলো যেন দ্বীপ। এমন জিনিস তো দেখিনি বাপের জন্মে। ল‍্যান্ডফোন বন্ধ, বিদ্যুৎ নেই, তখন তো আর মোবাইল ফোন ছিলনা। কেবল উপকূলের মানুষের অভিজ্ঞতার জোরে সেযাত্রা বেঁচে গেলাম সকলে। বৃষ্টি একটু কমতে রাস্তার ধারে গিয়ে দেখি চুনো মাছের স্রোত চলেছে রাস্তা দিয়ে। সবাই জলের স্রোতে ঝুড়ি আড় করে দাঁড়িয়ে আছে জায়গায় জায়গায়। কয়েক মিনিট পরে পরে তুলে নিলে আধঝুড়ি করে মাছ উঠছে। আমিও ঝুড়ি পাতলাম। হঠাৎ দেখি সবাই চেঁচিয়ে কি একটা ইশারা করছে আমাকে। তাকিয়ে দেখি আমার খুব কাছে কিছু একটা গোল্লা পাকিয়ে ঘুরে ঘুরে চলে যাচ্ছে। আমি কি আর জানি ছাই যে ওটা চিংড়ি মাছের ঝাঁক। যাই হোক শেষ মূহূর্তে বুঝে ঝুড়ি দিয়ে গোল্লাটা আটকে দিলাম। আর আমার ঝুড়িতে চিংড়ির ঝাঁক কিলবিল করতে লাগলো। বাড়িতে অতো লোক, আনাজপাতি যা ছিল, দুদিনে ফুরিয়ে গেল। তখন খাওয়া বলতে শুধু ভাত আর মাছ। মানে মাছ আর মাছ। পাঁচমিশালি নানা রঙের, নানা স্বাদের বিনা পয়সার মাছ খেয়ে বেঁচে রইলাম সবাই। সবাই মানে পাড়া প্রতিবেশী সবারই এক দশা। কয়েকটি বাড়ি অবশ‍্য চাল বাড়ন্ত বলে আমাদের বাড়ি থেকে নিয়ে গেলো। সেই সময়ে আমাদের পাকশালার হেড ম‍্যানেজার ছিল জানকী। সবাই ডাকতো জান্-কি। ফর্সা রোগাভোগা মেয়ে একটা। তার সঙ্গে ফুটফুটে একটা বাচ্ছা আসতো, জানকীর ছেলে। নাম – নাঃ আসল নামটা থাক। একটা কাছাকাছি নাম দিই বরং। ধরে নিলাম বাচ্ছাটার নাম সূরজ সিং। জানকীকে আমি খুব একটা পছন্দ করতাম না, কারণ রান্নাঘরে তার একটু হাতটান ছিল। কিন্তু শাশুড়ি মা সব জেনেশুনেও তাকে ভালোবাসতেন। জানকীর নামটা বলে দিলাম, কারণ সে যে আর বেঁচে নেই গো। পরে ননদের কাছে শুনেছিলাম ছোটো বয়সে মোটা কন‍্যাপণ দিয়ে ওকে বিয়ে করে নিয়ে গিয়েছিল এক প্রতিবেশী রাজ‍্যের ছোকরা। দেহাতে সেই শ্বশুর ঘরে মহিলা নেই। বরেরা না না বর নয় স্বামীরা সাত ভাই। জানকী তাকে স্বেচ্ছায় কি বরণ করেছিল নাকি, যে সে ছোকরা বর হবে। স্বামী বা মালিকেরা ছিল সাতভাই। সোজা কথা জানকীকে তার বাবা মা একরকম বিক্রিই করে দিয়েছিল বলা যায়। যা হোক, সেই শ্বশুর ঘরে, দেওর ভাসুরের পল্টন আর শ্বশুর সবার বৌ হয়ে কাটাতে হতো একরত্তি মেয়েটাকে। উপরি পুরষ্কার ছিল অনাহার, স্বল্পাহার আর মার। তারপর একদিন পেটে বাচ্ছা নিয়ে জানকী পালালো। কিকরে সে যে বাপের ঘরে পৌঁছোলো, সেটা আমি আর বিশদে জিজ্ঞেস করিনি, প্রবৃত্তি হয়নি। জনক দুহিতা জানকীর অপহরণ, বনবাস, তপোবনে ত‍্যাগ যাই হয়ে যাক না কেন, তার বাপের ঘর মিথিলা কোনোদিন ফিরে তাকায়নি। তবে এই জানকীর কপালটা খুব চওড়া, তাই বাপের ঘরে আবার জায়গা পেলো, ছেলে হলো। বাপের বাড়ি অনেক ভাই, কাজকর্ম তেমন করেনা। জানকীর বাপ দুর্গাঠাকুরের অস্ত্র বানাতো। সে কাজ তো আর সারা বছর থাকেনা। যেদিন তার কোনো ভাই এবাড়িতে কাজে লাগতো, সেদিন তার পাত পড়তো এখানে। কিন্তু বাকিরা? গরীবের ঘরে সংস্থান থাক আর না থাক, সবাই বিয়েটা আগেভাগে করে নেয়, আর মা ষষ্ঠীও হাত ভরে কেবল আশীর্বাদ দিয়েই যান। জানকী তাই আড়ালে আবডালে রান্নাঘর থেকে কিছুমিছু প্রায়ই নিতো। ওর এই গল্প শোনার পর, আমি নিজের চোখের সামনে একটা চিকের পর্দা টেনে নিয়েছিলাম। সব কিছু দেখতে পেতাম না। বেছে বেছে দেখতাম।

সেবার পুজোর আগে ছোটোননদ তার ছেলেদের অনেকগুলো ছোটো হয়ে যাওয়া জামা প‍্যান্ট দিয়ে গিয়েছিল, প্রায় নতুন নতুন। শাশুড়ি মা যার বাড়ির ছেলেমেয়েদের ফিট করবে, সব ডেকে ডেকে বিলিয়ে দিলেন। কোন বাড়িতে কোন ছেলেমেয়ে কতো বড়ো হল, সব তাঁর নখদর্পণে থাকতো। ওনার কাছ থেকে ছেলেপুলের বাপ মায়েরা জন্মদিন জেনে যেতো। শুধু ছোটোরা নয়, আমাদের বয়সী বড়দেরও  ঠিকুজি কুষ্ঠি তিনি জানতেন। অথচ কিছু লেখা থাকতোনা। তিনি ছিলেন এলাকা বাসীর জন্মনথির জীবন্ত ডাইরেক্টরি। সে যা হোক, দুখানা হাফপ‍্যান্ট সূরজ সিংয়ের মাপমতো বুঝে তিনি ওদুটো জানকীকে দিলেন। আর আমার বরকে নির্দেশ দিলেন, সূরজকে নিয়ে গিয়ে ওর পছন্দমতো দুটি জামা কিনে দিতে। হুকুম পালন হল। কিছুক্ষণ পরে দূরে রাস্তায় আমার কর্তার অবয়ব দেখা গেল। আর সঙ্গে দেখলাম একটা ছোটো মূর্তি লাফাতে লাফাতে আসছে। ঠিক লাফাচ্ছে না, ড‍্যাডাং ড‍্যাং ঢাকের তালে লাফালে যেমন হয়, তেমন। ঢাক বাজছেনা যদিও সূরজ সিং ওভাবে নাচতে নাচতে আসছে। একটু আড়াল থেকে ব‍্যাপারটা দেখতে লাগলাম। কাছে এলে বুঝলাম ঢাক ছাড়াও সে পায়ের তালটা বজায় রাখছে কিভাবে। সে আসলে ছন্দোময় কিছু বলতে বলতে আসছে। জানকী তখন পুকুর ঘাটে বাসন ধুচ্ছিল। আমি একটু কাছাকাছি গিয়ে প্রকৃতি দেখতে লাগলাম। সূরজ সিং বাড়ির উঠোনে এসেই মায়ের দিকে ঐভাবে নেচে নেচে ছুটলো। তার কথাগুলো এবার স্পষ্ট শুনলাম –
– এ জামাটো আমোর পছন্দ হই আলা।
আমো লে-ই চলি আলা।

মাকে জামা দেখানোর পর সে আমার কাছে ছুটে এল, বললো
– বা-পু মামা জামা দ‍্যালা, পেন দ‍্যালানি।

দেখো কান্ড। পেন যে দুটো তার মায়ের কাছে জমা আছে, এখবর তার কাছে নেই। তবে নালিশ ঠোকার ভঙ্গি শুনে আশপাশের সকলে হেসে উঠলো। পুজোয় এবাড়িতে যারা ঘরে বা মন্দিরে কাজ করে, অথবা যারা অনেক বছর করেছে, এখন আর পারেনা, সকলেই নতুন পোষাক পায়। দায়রা আদালতে সাহস করে এগিয়ে এসে নালিশ ঠোকার জন্য কর্তামশাইয়ের সাজা হলো। খর রোদে তিনি আবার সেই বক্সীবাজারে হেঁটে গিয়ে দুটো নতুন ‘পেন’ আনলেন। পরে শুনলাম সে আর্জি নিয়ে দেওরের কাছেও গিয়েছিল। বলেছে – তপু মামা, বাপু মামা তো জামা পেন দ‍্যালা। তুমো কি দৌউচে? দেওর নাকি বলেছে – তুমোর লোভো কি বাড়ুচি? মুখে বললেও তপু মামা একজোড়া জুতো এনে দিল। জানকী হাসে। বলে, ‘আমোর কোটি স‍্যায়না ছুয়া। মামা ঘরর নেবে না তো কি?’ এখানে কোটিয়া ছুয়া মানে ছোটো ছেলে। আর ‘র’ হলো অব‍্যয়, মানে থেকে।  এইভাবে হেসে খেলেই কাটছিল। হঠাৎ এসে গেল বন‍্যার দিন।

কথা হচ্ছিল যে আমরা সবাই জলবন্দী ছিলাম আর মাছ, কেবলি মাছ খাচ্ছিলাম। মাছের পয়সা লাগছিল না। যাদের পুকুর ভেসেছে, তাদের বুকে শেল বিঁধছিল। সে তো আমাদেরও আটখানা পুকুর ভেসেছিল। তখনতো কিছু করারও ছিলনা। জানকীর বাবা ঐ দুর্যোগের মধ্যে আমাদের দুপুরে খাওয়ার নেমন্তন্ন করলো। কারণ আমরা যেমন রাস্তায় চুনোমাছ ধরেছিলাম, জানকীর ভাইয়েরা মাঠে জাল ফেলে বড় বড় রুই কাতলা ধরেছে। ছাতা মাথায় গেলাম সেই নদীপথ ধরে পা ডুবিয়ে, খালি পায়ে। জানকীদের মাটির ঘর, ঝকঝকে পরিষ্কার। চৌকিটাকে টেবিলের মতো করে ওরা আমাদের খেতে দিল যত্ন করে। একটা জিনিস দেখলাম, ওদের বাড়িতে আগে ডাল আর নটে শাক পরিবেশন করলো, তার পরে উচ্ছের চচ্চড়ি। এটা কিন্তু আমি এ অঞ্চলের অনেক বাড়িতেই দেখেছি। পাঁচমিশালি চচ্চড়িতে একটা সব্জি হিসেবে করোলা দিয়েছে। প্রথমে ডাল আর কলমি শাক ভাজা দিয়ে শুরু হলো। তারপর তেতো স্বাদের চচ্চড়ি দিচ্ছে। সব পরিবার অবশ্য এমন নয়। এমন হতে পারে, যে কিছু একটা খেলেই হলো, তেতো আগে এমন ব‍্যাপার নেই। কাতলা মাছ আলু ছাড়া পেঁয়াজ রসুন দিয়ে রান্না করেছিল, তবে ঝোলে নারকেলের দুধ দিয়েছিল। আর খাইয়েছিল পোনা মাছের টক। যা হোক, তখন আমরা বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। জল বের করার জন্য সব রাস্তা কেটে দেওয়া হয়েছিল। যোগাযোগ বলতে শুধু ব‍্যাটারিতে চলা রেডিও ছিল। তার মধ‍্যেই একটা নেমন্তন্ন খাওয়া হয়ে গেল।

ঐ বন‍্যার সময়ে একটা নতুন জিনিস খেলাম। সেটা হচ্ছে চালকুমড়ো বিচির চাটনি। এসবতো কিছু বাপের বাড়িতে খাইনি। চালকুমড়ো বিচি জিনিসটা এ অঞ্চলে খুব ব‍্যবহার হয়। বিচিগুলো বার করে সারা বছর ব‍্যবহারের জন্য শুকিয়ে রাখা হয়। ঐ শুকনো বিচিগুলোর ওপরের ছালটা ছাড়িয়ে ফেলতে হয়। ভিতরের নরম বীজটা বেটে বাদাম বাটার মতো চাটনি হয়। চালকুমড়ো বিচি এখানে বড়িতেও ব‍্যবহার হয়। আমাদের আড়বেলের বড়ি থেকে এখানকার বড়ি সম্পূর্ণ আলাদা। অনেক রকম বড়ি দেখলাম, যেগুলো মনে পড়ছে, বলি – বাতাসা বড়ি, গয়না বড়ি, জিলিপি বড়ি আর তরকারি বড়ি। এর মধ‍্যে গয়না বড়িটা চিনতাম। কলকাতায় মেলায় বিক্রি হয়, বড়ির তলায় পোস্ত ছড়ানো থাকে। গয়নার নকশা বদল করে জিলিপির প‍্যাঁচ দিলে ওটাই হয়ে যায় জিলিপি বড়ি। এতে চালকুমড়ো কোরা মেশানো হয়, অন‍্য কিছু না। গয়না বড়ি আর জিলিপি বড়ির নকশাটা খুব মুন্সিয়ানার সঙ্গে করতে হয়। ভাজা খেতে ভালো লাগে। অন‍্য বড়িগুলোয়  লঙ্কাগুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, পাঁচ ফোড়ন গুঁড়ো, আদাবাটা, তেজপাতা গুঁড়ো এইসব মেশানো হয়। এই বড়ি নিয়ে কর্তা আর আমার সঙ্গে প্রেস্টিজ ফাইট শুরু হয়েছিল বিয়ের প্রথম থেকেই। সেই ফাইট এখনও চলছে। কর্তার মনে হতো আড়বেলের বড়ি স্বাদহীন ঘাস বড়ি। আমি মেদিনীপুরের ঐ মশলাবড়ি মুখে তুলতে পারতাম না। লঙ্কা গুঁড়ো ঠাসা, কি ঝাল বাপরে বাপ, কোনোটা আবার নিমপাতা দেওয়া কুটকুটে তেতো বড়ি। কর্তার যুক্তি ছিল তেতো বড়ি সব্জির মধ্যে ফেলে দিলেই নাকি শুক্তো হয়ে যায়। আদাবাটা আর লঙ্কা গুঁড়ো ঠাসা বড়ি ফেলে দিলেই নাকি তরকারিতে আর মশলা দেবার দরকার পড়েনা। শেষে দুজনে ঘাট মেনে সন্ধি করেছি যে, তোমার বড়ি তুমি খাও, আমার বড়ি আমি। জেলার প্রেস্টিজ যেখানে জুড়ে রয়েছে, সেখানে পিছু হটা যাবেনা, কভি নেহি। অবশ‍্য সময় সব যুদ্ধের তীব্রতা কমিয়ে দেয়। কর্তা এখন বড়ি সেদ্ধ, নিরামিষ বড়ির ঝাল সব খেয়ে নেয়, আগের মতো অসুবিধে নেই। আমিও তরকারিতে মশলা বড়ি খাই, তবে পুরোপুরি যে অ্যাকসেপ্ট করেছি বা আপন করেছি তা নয় – একথা দুজনের ক্ষেত্রেই সত‍্যি। আর একটা খাবার আছে, যেটা কর্তা খুব পছন্দ করেন, অথচ আমার একদম ভালোলাগেনি। সেই খাবারটা হলো মুড়ির ছাতু। ঐজন‍্য কর্তামশাই আমাকে আরও দেখিয়ে দেখিয়ে জামবাটিতে বাড়ির গরুর দুধ নিয়ে, তাতে গুড়, বাতাসা আর মুড়ির ছাতু গুলে খান। তা খাক, যার যা ভালোলাগে, খেলে আপত্তি তো কিছু নেই।

বেলা তুমি ধন‍্যা
আছে ঘরকন্না।
তার মাঝে রেখে
গেছো একটুকু ফাঁক।
সেথা হতে আসে
কতো মেয়েদের ডাক।

শ্বশুর মশাই কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ চলে গেলেন হৃদরোগে। কোনো সুযোগ দিলেননা চিকিৎসার। তার অল্প কিছুদিন পরেই শাশুড়ি মায়ের ও স্ট্রোক হলো। একসঙ্গে তেষট্টিটা বসন্ত পার করেছিলেন দুজনে। বিরহ সহ‍্য হয়নি। শেষ দুবছর আমার কাছেই শয‍্যাশায়ী ছিলেন তিনি। শ্বশুরবাড়ির রান্নাঘরে সম্বৎসরের ব‍্যস্ততা ফুরোলো শুধু পুজোর সময়টুকু ছাড়া। তাই জানকীর মতো মেয়েদের কাজ ফুরোলো আমাদের বাড়িতে। বছর দুই পরে তার খবর নিতে গিয়ে শুনি জানকী মরেছে। কি করে মরলো কারণটা তার বাড়ির লোকও বলতে পারেনা। বাপের ঘরে জায়গা তো সে পেয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসার খরচ বুঝি মুখ ফুটে চাইতে পারেনি। তাই কী হয়েছে নির্ণয় হবার আগেই তার আয়ু ফুরোলো। ভালোই হয়েছে, জানকীর মরাটা শাশুড়ি মাকে দেখে যেতে হয়নি। যতদিন তাঁর জ্ঞান ছিল, তিনি খুঁজে গেছেন এমন কোনো পথ, যেখানে মেয়ের টাকা কেউ কেড়ে নিতে পারেনা, এমন কোনো সুযোগ বা পরিষেবা, যেখানে পুরুষের খুঁটো বাঁধা থাকে মেয়েদের হাতে।

শ্বশুরবাড়ি গিয়ে একদিন মেনু ঠিক করলাম বিউলির ডাল আর আলুপোস্ত। কিন্তু রান্না এমন হলো, যেন পোস্ত দর্শন করানো আলু চচ্চড়ি। ভাবি বসে, এটা কেন হলো ব‍্যাপারখানা কী? কর্তা বলেন, গরীব মানুষ যা খায়না, তা রাঁধা শিখবে কি করে? হক কথা। এভাবে তো ভাবিনি আগে। এক ঝটকায় মনে পড়ে গেল এক সেমিনারে ঐতিহাসিক গৌতম ভদ্রের বক্তৃতার কথা। তিনি বলেছিলেন ঠাকুমার কাছে সবসময়ে ছোটবেলা থেকে ঢাকার পাতক্ষীরের গল্প শুনতেন। যেদিন সত্যি সত্যিই প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন কাজে, সেদিন ওখানকার এক অধ‍্যাপককে বললেন, পাতক্ষীর খাওয়াতেই হবে। এদিকে ঐ অধ‍্যাপক জানেননা, সেটা কি জিনিস। দুজনেই তাজ্জব। তারপর গৌতম স‍্যারের ঠাকুমার কথা শুনে, ঐ অধ‍্যাপক বলেছিলেন, তোমার ঠাকুরদাদা জমিদারের ব‍্যাটা, পাতক্ষীরে তাঁর পাত পড়তো। আর আমার ঠাকুরদাদা চাষার পোলা। আমি কিকরে জানবো এসব খাবারের কথা। পরে গোলপার্কের এক মিষ্টির দোকানে দেখেছিলেন পাশে লেখা আছে, এখানে ঢাকার পাতক্ষীর পাওয়া যায়। যা হোক শ্বশুরবাড়িতে ফিরি। কর্তা বললেন এই এলাকায় পোস্তর বদলে ভাঙা কাজু বাটা দিয়ে লোকে রান্না করে। কিন্তু ভাঙা কাজু জিনিসটা কী? কর্তা বুঝিয়ে বলেন যে, এই এলাকায় প্রচুর কাজুর কারখানা। সেখানে কাজু প্রসেস করার সময়ে কিছু কাজু ভেঙে যায়, সেগুলো জড়ো করে ভাঙা কাজু প‍্যাকেট করা হয়। এগুলো বড় টুকরো নয়, একেবারে গুঁড়িয়ে যাওয়ার আগের পর্যায়। সমপরিমাণ পোস্তর প‍্যাকেটের তুলনায় এর দাম কিছুটা হলেও কম।

একদিন সকালের জলখাবারে ঘুগনি করতে বলেও ঠকে গেলাম। দেখি রুটির সঙ্গে বাটিতে যেটা এসেছে, সেটা দেখে মনে হচ্ছে কাঁচা পেঁয়াজ বাটা দিয়ে করা আলু মটরের তরকারি। বুঝলাম এ বাড়িতে দাঁড়িয়ে থেকে রান্না করাতে হবে। চার পুরুষ আগের শারদা, তারপরের প্রজন্মের বৌরা – মোক্ষদা, বেলারানী সকলেই মেদিনীপুরের মেয়ে। তার মানে গত একশো বছরে এই প্রথম আমি হলাম জেলার বাইরের বৌ যে এই রান্নাঘরে ঢুকেছে। তেলে জলে মিশ খেতে গেলে একটু সমস্যা তো হবেই।

আমার ছোটোজায়ের রান্নাঘরে এক সহকারিণী ছিল, বয়সে তরুণী, ধরে নিলাম, তার নাম মায়ারানী। খুব হাসিখুশি, চটপটে, চোখেমুখে কথা। আমরা ওকে ভালোবাসতাম। আমার জায়ের মেয়ের কথা ফোটার পর তাকে সে প্রায় একশ ছড়া শিখিয়েছিল। গল্প একই প্রায়, শুধু শেষটায় একটু তফাৎ আছে। মায়ারানীর বিয়ের পর বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনার জন্য ওকে নাকি মারধোর করতো শ্বশুরবাড়ির লোক। বাপেরবাড়ি চিরাচরিত মানিয়ে নেবার গান গাইতো। একদিন শ্বশুরবাড়ির পাড়ার কোন ভালোমানুষ এলে ছুটতে ছুটতে। খবর পেয়ে বাপ দাদা পাগলের মতো ছোটে। গিয়ে দেখে মায়ারানী পড়ে আছে মেঝেয়। আর হাট্টাকাট্টা স্বামীটা দাঁড়িয়ে আছে তার বুকের ওপরে, পাঁজরের খাঁচাটা পিষছে পায়ের তলায় যাতে প্রাণপাখিটা বেরোতে পারে। তারপর আর কি,  লাঠিসোঁটা, থানা পুলিশ, জেল জরিমানা অনেক কিছু হলো। মায়ারাণীর প্রাণপাখিটা এখনও তার বুকের খাঁচার ভিতর আছে। যখন থানা পুলিশ হলো, পেটে বাচ্ছা ছিলো তার। মায়া এখন তার সন্তান নিয়ে আলাদা থাকে। বাপের ঘর বা শ্বশুর ঘর কারোর তোয়াক্কা রাখেনা। যুঝছে দুজন জীবন যুদ্ধে। এইসব মেয়েদের ঘামে আর চোখের জলে ভিজে যায় রান্নাঘরের মেঝে, ওদের দীর্ঘশ্বাসে ঝাপসা হয়ে যায় আমার কলমের কালি।

শাশুড়ি যখন শহরে আমাদের বাড়িতে আসতেন, তখন ওনার সঙ্গে একটা তালিকা থাকতো। তাতে লেখা থাকতো
রথের ঘরের মেয়ের জামা
পন্ডা বৌয়ের লাল আয়না … এমন টুকিটাকি পনের ষোলোজনের জন্য কিছুমিছু জিনিস। ছেলেকে দেখাতেননা। তখন আমাদের মাইনে তো বেশি ছিলনা। ঘরভাড়া দিয়ে থাকতে হতো। একটু টানাটানি তো ছিলোই। ঐ বড় লিস্ট দেখলে ছেলে চেঁচাতো,
– মা তোমার শ্বশুর শেষ জমিদার ছিল, আমি না।
শাশুড়ি করুণ মুখে বোঝানোর চেষ্টা করতেন
– বাপু শোন, একটা মেয়ে আমার সামনে দিয়ে পড়তে যাচ্ছে, জামা ছেঁড়া। আমি কি চুপ করে থাকবো? ছোটো ছিল সব, বড় হয়ে যাচ্ছে, চিনতে পারিনা। আজকাল ঘরে থাকি। বেশি যাতায়াত করতে পারিনা। ডেকে কোন বাড়ির  মেয়ে জিজ্ঞেস করলাম। আমি ওকে বলেছি, আমি বাপুর বাড়ি যাবো, ওখান থেকে তোমার জামা নিয়ে আসবো।
– লাল আয়নাটা কি ব‍্যাপার?
– মেলা থেকে গতবার বৌরানী আমাকে যে আয়নাটা এনে দিয়েছিল, ওটা তো জানলায় বসিয়ে আমি সিঁদূর পরি। পন্ডা বৌ বলে কিনা জেঠিমা আমায় আয়নাটা দাও। আমি বললাম ‘না বাবা! এটা আমায় বৌরানী কিনে দিয়েছে, এটা আমি দিতে পারবোনা। আমি বাপুর বাড়ি যাচ্ছি। ওখান থেকে তোমায় একটা এনে দেব।
এইরকম ষোলোটা গল্প পরপর শুনতে হতো। মায়ের যতো বয়স বাড়ছিলো, অবিরাম কথা বলাও বাড়ছিলো। আমার বড় ননদ বুদ্ধি দিতো,  ‘শোন, মা যখন বেশি কথা বলে আমি কায়দা করে ঘুমিয়ে যাই, আর মাঝে মাঝে হুঁ দিয়ে যাই। তুইও হুঁ দিতে দিতে নিজের কাজ সেরে নিবি।’ কিন্তু এই বুদ্ধি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলাম। কারণ মা পড়া ধরা শুরু করলো, কি বললাম বলোতো। ঐ পদ্ধতিটি ছাড়তে হলো। কলেজ থেকে ফিরে,মায়ের তালিকা নিয়ে, মাকে সঙ্গে নিয়ে বেরোতাম। তখন মা টুকিটাকি নিজের জিনিসও কিনে নিতো – একটা রুমাল, একটা মিকি মাউস ছাপ দেওয়া প্লাস্টিকের ব‍্যাগ। চোদ্দ বছর বয়েসে শ্বশুরবাড়ি ঢুকেছে, হেঁশেল ঠেলতে গিয়ে হাজারো নিয়মকানুনের অত‍্যাচার সয়েছে। কনকনে শীতে বা খর গ্রীষ্মে দিন নেই রাত নেই, আমিষ, নিরামিষের বিচার, বারবার পুকুরে ডোবা, বাড়িতে অতিথির ঢল, পেটে বাচ্ছা নিয়েও কোনো কাজ থেকে ছাড় নেই – মায়ের এসব গল্প শুনে বুক কেঁপে যেতো আমার। শখ আহ্লাদ কিছুই করতে পারেনি জীবনে। আজ যদি এইটুকু শখ তার হয়ে থাকে, তাকে কি ফেরানো যায়? ছেলে সামনে চেঁচালেও পরে জিজ্ঞেস করতো, মার লিস্টের সব কেনা হলো নাকি কিছু বাকি আছে?

দিন চলে যায় হু হু করে,
বছর নাকি জল?
বক্সীঘরে রান্না করে
অন‍্য মেয়ের দল।

এখন তো মোবাইল ফোনের যুগ। রান্নাঘরের মেয়েরা অষ্টপ্রহর এক কাঁধ উঁচু করে মোবাইল কানে চেপে কুটনো কোটা থেকে খুন্তি নাড়া সব করে। একই সঙ্গে ফোনের বন্ধু আর আমাদের সঙ্গে কথা বলে সমান দক্ষতায়।

রান্নাঘরের একটি বৌয়ের দুটি মেয়ে, পিঠোপিঠি বয়সের কিশোরী। একই ক্লাসে পড়ে। নামদুটো ধরে নিই রানু আর রিমি। দুজনেই মাধ‍্যমিকে বসলো। বড়ো রানুটা পারলোনা বেড়া টপকাতে। ছোটোটা পেরিয়ে গেল। এবার যা হবার তাই হলো। রানুর সম্বন্ধ দেখা শুরু হলো আর রিমির জন্যে একাদশের বই এল। বছরখানেকের মধ্যে রানুর বিয়েও হয়ে গেল। একমাস গেলোনা ছোটো রিমিও মোবাইল ফ্রেন্ডের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালালো। হায় রে কপাল! পরের পুজোয় দুজনের দুরকম খবর পেলাম। রিমি তার বন্ধুর সঙ্গে চলে গিয়েছিল ব‍্যাঙ্গালোর। কোনো কাজ জুটিয়ে থেকে গেছে সেখানে। তার বন্ধুটি অন্য সঙ্গিনী খুঁজে নিয়ে তাকে ফেলে পালিয়েছে। আর রানুর বরের সারাবছর রোজগার করার মতো কাজ থাকেনা। কিন্তু একটা কাজ সে নিয়মিত করে। সেটা হলো বৌ পেটানো। নবমী এসে পড়তে খোঁজ নিলাম, ‘কি গো বৌ, রানুর বাড়ি তো পাশের গ্রামে, পূজোয় আসবেনা এবছর?’ উত্তর পেলাম, মেয়ে হয়েছে রানুর, হয়তো সেই নিয়ে ব‍্যস্ত। আমি শুধোলাম, ‘নাতনি কেমন হয়েছে?’ যে উত্তরটা পেলাম এবার, তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। রানুর শাশুড়ি বাপের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখা পছন্দ করেনা। একবার বাপ মা গিয়েছিল জোর করে, বসতে বলেনি। যে ছেলের যথেষ্ট রোজগার নেই, তার মায়েরও এতো তেজ! লক্ষ্মীপুজোর দিন রানু এল সকালে মেয়ে কোলে নিয়ে। এসেই বললো আমাকে তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে। তার মা অনেক বুঝিয়ে, অনুনয় করে তাকে একটা রাত রেখে দিলে। পরদিন আমরা শহরে ফেরার পথে রাস্তায় ফোনে খবর পেলাম, বাপের বাড়ি একরাত থাকার জন্য রানু বেধড়ক মার খেয়েছে শ্বশুরবাড়িতে, থানা পুলিশ হয়েছে। কর্তা শুনে বললেন, গ্রামে এসব আখছার হয়।

বছর দুয়েকের মাথায় পুজোর একটু আগে একটা ঘটনা ঘটলো। নিত‍্যদিন মার সহ‍্য করতে না পেরে রানু পালিয়ে এল বাপের বাড়ি। ততদিনে আবার একটি ছেলে হয়েছে তার। এবার একেবারে পঞ্চায়েতে বিচার বসলো। কিন্তু সে বিচার সভা ঘিরে ঝাঁটা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল জনা পঞ্চাশ ‘মেয়ে-মানুষ’। প্রথমদিকে রানুর শাশুড়ি আর তার ছেলে রোগা শরীরে সিংহনাদ করছিল, বক্তব্য হলো, বৌ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে যখন, তখন আর ঘরে তুলবোনা। কিন্তু পঞ্চাশটি মারমুখী রাজসিক আকৃতির নারকেল কাঠির গুচ্ছ এগিয়ে আসছে দেখে সিংহনাদ, ইঁদুরের কিঁচকিঁচে পরিণত হল। ঝাঁটাবৃত্তের বাইরে জনা চারেক লাঠিধারী পুলিশও ছিল। বিচার সভায় আর মারবোনা বলে কান মুলে রানুকে নিয়ে শাশুড়ি আর তার ছেলে বাড়ি গেলো। কর্তার মুখে বিস্তারিত এসব কাহিনী শুনে, বললাম,
– আবার মেয়েটাকে তো সেই নরকেই সবাই পাঠালো। শাশুড়ি আর তার ছেলেকে গ্রেপ্তার করিয়ে দিলেই তো হতো।
কিন্তু কর্তা বললেন,
– ব‍্যাপারটা অতো সোজা নয়।
– কেনো?
– নিম্নবর্গে কে কদিন জেল খাটলো, এতে খুব একটা কিছু তাদের সামাজিক ক্ষতি হয়না। কিন্তু বৌটার প্রতি জাতক্রোধ তৈরি হয়। ছাড়া পাওয়ার পর মেয়ে সন্তান থাকলে, মা মেয়ে দুজনকে বার করে দেয়। আর ছেলে সন্তান থাকলে, বাচ্ছাটাকে কেড়ে নিয়ে, মাকে বার করে দেয়। বাপের বাড়ি যখন দেখে বাচ্ছাকাচ্ছা নিয়ে মেয়ে সারাজীবনের মতো ঘাড়ে পড়ছে, কিছুদিন পরে তারাও রাস্তা দেখিয়ে দেয়। অনেক মেয়ে আত্মহত্যা করে, অথবা কোনঠাসা হতে হতে কেউ কেউ ঘরের লক্ষ্মী থেকে সার্বজনীন হয়ে যায়। এইজন্য প্রথম সালিশিতে কাউকে গ্রেপ্তার করানো হয়না। ভয় দেখিয়ে সমঝে রাখার চেষ্টা হয়।
– বুঝলাম। রানুর কালপ্রিটরা কি ভয় পেয়েছে?
– তাদের তালু শুকিয়ে গেছে।

আমার শহুরে যুক্তি আর পুঁথিগত বিদ‍্যা বাস্তব প্রেক্ষাপটে যে কতো ফাঁকা, সেটা পদেপদে এখন বুঝতে পারি।

এই ঘটনার কিছুদিন পরে পুজো। সপ্তমীতেই দেখলাম আরতির সময়ে রানু তার বর আর দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে আমাদের ঠাকুরদালানে প্রণাম করছে। রানুর মেয়েটাকে কোলে নিলাম। বেশ টরটরি হয়েছে। তার দুহাতে দুটো প‍্যাঁচানো চুড়ি কিনতে লোক পাঠালাম দোকানে। রান্নাঘরে ইশারায় বলে দিলাম চা জলখাবার দিতে। অন‍্য মেয়ে বৌরা ‘এসো জামাই এসো’ বলে আদর করে নিয়ে তাকে বসালো সেই চৌঘেরা রান্নাঘরের টেবিলে। আমি ভিতরে গিয়ে দেখি এক কান্ড। খাবার বাড়তে গিয়ে একজন বলছে, এখানে পঞ্চাশটা কাগজের প্লেট ছিলো, কোথায় গেল? একজন বলছে, ওরে পঞ্চাশ ধনে এনে এখানে রেখেছিলাম, কেউ নিয়েছিস? প্রতিটি কথায় পঞ্চাশ শব্দটা জামাইকে শোনানো হচ্ছে, আর খিক খিক, খুক খুক করে হাসছে মেয়ের দল। আমি দেখলাম এখানে বেশিক্ষণ থাকলে, আমারও হাসি চাপা দায় হবে। বক্সীবাড়ির রান্নাঘর নিজেই এখন একটা গরম কড়া। তাতে শব্দের ফোড়ন দিয়ে বৌ পেটানো জামাই ভাজা চলছে। কাজের ছুতোয় বাইরে এসে আড়াল থেকে দেখি। ধিনিকেষ্ট জামাই মুখ গোঁজ করে বসে আছে।

কতগুলো ঝাঁটা?
তবু বুকে পাটা –
পেস্টিজে টলোমলো।
কাকপানা মুখ,
আহা দেখে সুখ,
জামাইরাজাটি ভালো।

এমনি গোঁজ করে থাকা প‍্যাঁচা মুখ এই প্রথম নয়, আগেও দেখেছি আমি। অল্পবয়সে একবার পিজি হাসপাতালের গাইনি বিভাগে ভর্তি ছিলাম কয়েকদিন। একদিন গভীর রাতে দেখি ওয়ার্ডের সব আলো জ্বলে উঠলো। ডাক্তার, নার্স সব খুব ছোটাছুটি করে বেড রেডি করছেন। তারপর বেনারসী পরা এক সালঙ্কারা মেয়েকে সেখানে শুইয়ে দেওয়া হল। আনতে আনতে মেঝেতে রক্ত গড়িয়ে যাচ্ছিল। বিশাল ওয়ার্ডের সেই অনন্ত সংখ‍্যক বেডে পড়ে আছি পেটকাটা মেয়ের দল। কিছুটা নির্বিকার উদাসীনতা, কিছুটা ক্রোধ, কিছুটা উদ্বেগ সব খেলা করে মেয়েদের মনে। গরীব কিংবা বড়লোক, হিন্দু নাকি মুসলমান, বিয়েওলা বা অনূঢ়া, অল্পবয়সী না পাকাচুলো – সব ধরণের মেয়ে সাক্ষী রইলো ঘটনার। চোখের পাতা এক হলোনা। এরপর সকাল হলে সিস্টারদের কাছ থেকে সব খুঁটিয়ে জেনে নিলাম আমরা। বরযন্ত্রে সতীচ্ছদ ফাটার এমনি তেজ, ফুলশয্যা, মৃত‍্যুশয‍্যা হতে যাচ্ছিল অল্পবয়সী বধূটির। কি সুন্দর মুক্তি পেয়ে যাচ্ছিল মেয়েটি, এই ডাক্তার বাবুরা কি যে করেন, লড়াই ছাড়তে পারেননা। কি দরকার বাবা আবার এদের বাঁচিয়ে তুলে কষ্ট দেবার। শরীরের কষ্ট অপারেশন করে কমিয়ে দিলে মনের কষ্ট যায় বুঝি? এতো লেখাপড়া করে ডাক্তার বাবুরা এসব বোঝেন না কেন? যা হোক দুদিন পরে মেয়েটি উঠে বসাতে, বীরের ছাঁদওলা বরটি দেখতে এল তাকে। আর তখনই শুরু হলো খেলা – মেয়েদের শব্দজব্দ। পাকাচুলো এক রসিকা ওয়ার্ডের দরজার কাছেই ছিলেন। করিডোর দেখতে পেতেন। এক মিনিট আগেই সতর্ক করতেন ‘ফাটাকেষ্ট’ আসছে। সে ঢুকলেই মেয়েরা বেশ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বাছাবাছা গালি দিতো। আমি তো বেশি গালি জানিনা। মজাটা নিতাম। সেসব শুনে কান গরম হবার বদলে হুড়হুড়িয়ে হাসি আসতো। হাসি চাপারও প্রয়োজন ছিলোনা। সিস্টারেরা নিজেরা কিছু বলতেন না বটে, আমাদের বারণও করতেন না। বরং তাঁদের হাঁটাচলায় বিরক্তি কেটে গিয়ে এক প্রসন্ন নৃত‍্যভঙ্গিমা ফুটে উঠতো। বীরের ছাঁদওলা টাকলা মাথা বরটি মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকতো। শেষের দিকে ওয়ার্ডে আর ঢুকতোনা। দরজায় দাঁড়াতো। অন‍্য পেশেন্ট পার্টিরাও চিনে গিয়েছিল লোকটিকে। পাশ দিয়ে যাবার সময়ে কেউ ঘৃণা ছুঁড়ে দিতো দৃষ্টিতে, কেউ হাসিমুখে কানের পাশে দিয়ে যেতো বিষমাখা তীর।  মেয়েদের তীক্ষ্ণ কন্ঠ আর খিলখিল হাসি দরজা পেরিয়ে তার মাংস ছিঁড়ে হাড় অবধি পৌঁছোতো।

সন্ধেবেলা ঐ রান্নাঘরেই, দেওরঝির সঙ্গে পুজোর প্রসাদ খেতে খেতে আড্ডা চলছিলো। দেওরঝি বলে ওঠে,
– জেঠিমা, আজ সকালে রানুর বরের  গোল্ডেন জুবিলী দেখেছো? মানে ঐ পঞ্চাশ পূর্তির কথা বলছি।
– হ‍্যাঁ দেখেছি।
– মেয়েগুলো একশো দিন মার খেয়ে একদিন প্রতিবাদ করবে, আর কি হবে, ছেলেদের তো লেজ গজাবেই। এডুকেশন জেঠিমা এডুকেশন। মেয়েদের এডুকেশন দরকার।
– ছেলেদের সভ‍্যতা, ভব‍্যতা, মানবিকতার এডুকেশন দরকার নেই? রানু মাধ‍্যমিক পাশ না করলেও, প্রিলিমিনারি এডুকেশন তো পেয়েছে। ওর কনফিডেন্স নেই, কারণ রোজগার, খাওয়া পরার বিকল্প যোগাড় নেই।
– হুম, একটা কোনো রাস্তা প্রত‍্যেক মেয়েকে অর্জন করতে হবে, যাতে সম্পর্কের মধ‍্যে সে নিজের শর্ত রাখতে পারে।
দেওরঝির দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাই, দেখি ঐ উজ্জ্বল চোখ দিয়ে বেলারানী তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। সে আরো বলে চলে,
– ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে এডুকেশন আরও এডুকেশন দরকার জেঠিমা। শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব। এই কথাটা আগে শুনেছো জেঠিমা?
– (হেসে বলি) নারে, ঠিক মনে পড়ছেনা। তবে অন্য একটা কথা শুনেছি।
– কি?
– কৃষি আমাদের ভিত্তি আর শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ।
– জে – ঠি – মা! তুমি খুব বাজে, আমার লেগপুল করছো।
– করবো না তো কি? যেমন প্রশ্ন তেমন উত্তর।
– তুমি তো নাও জানতে পারতে।
– দেখ্, বামপন্থী সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তখন আমি ক্লাস ওয়ান। সরকার যখন গেলো, তখন আমার বারো বছর মানে এক যুগ চাকরি করা হয়ে গেছে। আমরা কেন্দ্রে কংগ্রেস আর রাজ‍্যে বামফ্রন্ট নিয়ে জীবন কাটিয়ে ফেললাম। সেই আমাকে তুই জিজ্ঞেস করছিস।
– হে হে, ভুল হয়ে গেছে।
– তবে তুই কেন্দ্রে বিজেপি, আর রাজ‍্যে তৃণমূল নিয়ে বড় হয়েও কথাটা শুনেছিস, তাই কনগ্র‍্যাচুলেশন।
– হা হা হা, আচ্ছা জেঠিমা তুমি এখন রাজনীতি সচেতন হয়েছো, নাকি ছোটো থেকেই ছিলে?
– প্রথম থেকেই মানে ছোটো থেকেই ছিলাম। কারণ আমি খুঁটিয়ে কাগজ পড়তাম রোজ।
– তোমাদের ছোটোবেলায় কেমন দিন ছিল, আমাকে বলবে। আমি একটা ওয়েবজিনে মেয়েদের অধিকার নিয়ে লিখছি।
– রাজনীতি ঐভাবে বলতে পারবোনা। ছোটোবেলার অনুভব স্মৃতি এগুলো বলতে পারি।
– তাই বলো।

তৃণমূল, বিজেপি এসব শুনে, রান্নাঘরের মহিলারাও কান পাতে। পঞ্চায়েত, একশো দিনের কাজ, সদ‍্য আসা কন‍্যাশ্রীও ঢুকে পড়ে আলোচনায়। বক্সিবাড়ির রান্নাঘরের মহিলা মহলে রাজনৈতিক আড্ডা জমে ওঠে। কয়েকজন একথাও বলে যে, রানুর বিয়ে আর রিমির পালানোর আগে যদি কন‍্যাশ্রীটা এসে যেত, মেয়েদুটোর হয়তো এদশা হতোনা।


পাকশালার গুরুচণ্ডালি (পর্ব চার – পাঁচ)

উচ্ছল দিন – স্বপ্ন রঙীন

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে চাকরি করতে গেলাম সল্টলেকের ওয়েটল‍্যান্ড ম‍্যানেজমেন্টে। সরকারি প্রোজেক্টে অস্থায়ী গবেষণা ভিত্তিক কাজ। মাইনে কম, তবে গালভারি একটা নাম আছে – প্রোজেক্ট সায়েন্টিস্ট। সেখানে ল‍্যাবরেটরিগুলোয় একঝাঁক আমার মতোই ছেলেমেয়ে, বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে স্নাতকোত্তর। নানান কাজ শিখতে লাগলাম। আর টিফিনের সময়টা বেশ মজা হতো। সবাই জড়ো হতাম। প্রথমে যে যা আনবে, সব ভাগাভাগি হবে। তারপর নিচে অন্য অফিসের ক‍্যান্টিন থেকে খাবার আনানো হত, শেষে ফল কাটা হতো। চায়ের চিনি রাখা থাকতো। সব খাওয়ার পরে, যদি কারোর মনটা মিষ্টি মিষ্টি করতো, তখন সে খানিক ঘুর ঘুর করে, দুচামচ চিনি খেয়ে নিতো। পাশের ল‍্যাবে হিটার ছিল। সেখানে বোরোসিলের বীকারে চায়ের জল, গলা ব‍্যথা হলে গার্গলের জল, সবই ফোটানো হতো। গার্গলের কথাটা উঠলো, তার কারণ আছে। শীতকালে সল্টলেকের তাপমাত্রা কলকাতার কেন্দ্র থেকে বেশ কম। ল‍্যাবটা বেশ উঁচু ফ্লোরে। চারপাশে ফাঁকা। কনকনে হাওয়া দিতো। তাই অনেকেরই ঠান্ডা লেগে যেত।  একবার আমাদের ল‍্যাব থেকে মীনাক্ষীদি বীকারে ঠান্ডা জলে চিনি দিয়ে নিয়ে গেল চায়ের জল ফোটাবে বলে। এক মিনিট পরে নাচতে নাচতে ফুটন্ত জল নিয়ে চলে এল। সকলের হাঁ মুখের সামনে বললো যে ওই ল‍্যাবের চায়ের জল ফুটছিল। আমি টুক করে আমাদের বীকারটা হিটারে বসিয়ে ওদের ফুটন্ত জল নিয়ে চলে এসেছি। কিন্তু একাজের ফলং ফলং ফলাঃ ভালো হলো না। আমাদের নুনে পোড়া চা খেয়ে ওয়াক থু করতে হল। আর ও ল‍্যাবের কৃষ্ণেন্দুদা যে গার্গলের জল বসিয়ে কাজে ব‍্যস্ত হয়ে গিয়েছিল, সে মিষ্টি মিষ্টি গার্গল করতে বাধ্য হল।

অতগুলো ছেলেমেয়ের মধ্যে প্রায়ই, কারোর না কারোর জন্মদিন এসে পড়তো। আর আমরা হৈ হৈ করে তার পয়সায় রেস্তোরাঁয় খেতে যেতাম। আর বাইরে খাওয়া মানেই তখন চাইনিজ খাবার। অনেক কিছু নতুন শিখলাম কলিগদের পাল্লায় পড়ে। নুডলস হাক্কা না গ্রেভি – প্রথম প্রথম বোকা হলেও চটপট শিখে গেলাম, হাক্কা মানে ভাজা ভাজা, শুকনো। আর গ্রেভি মানে ঝোল ঝোল, ওতে তেল কম। আমার গ্রেভিটাই ভালো লাগে। তারপর প্রদেশ অনুযায়ী চাররকম স্টাইল আছে, হুনান, ক‍্যান্টন, সেজুয়ান আর মাঞ্চুরিয়ান। তার মধ্যে প্রথম দুটো ভালো লাগেনি। মনে হয় কারোরই ভালো লাগেনা। তাই কলকাতায় সেজুয়ান আর মাঞ্চুরিয়ানই বেশি চলে। সেজুয়ানটা দেখতে লাল, আর স্বাদে ঝাল। মাঞ্চুরিয়ান রূপে কালো, জিভে ভালো। আর একটা জিনিস খেলাম চপসুয়ে। মুচমুচে শক্ত নুডলস। সব্জি আর সসের কারির সঙ্গে মিশিয়ে খেতে হয়। তবে চাইনিজ চপসুয়ের থেকেও আমেরিকান চপসুয়েটা রসনায় ঝঙ্কার তুললো বেশি। নিজামের আভিজাত্য থেকে বেরিয়ে ততোদিনে কলকাতার ফুটপাত শাসন করছে এগ রোল। তারপর রাইস নুডলস – সেটাও বেশ ভালো। আর একদিন এক্সাইড মোড় থেকে একটু এগিয়ে মোমো প্লাজা বলে একটা দোকানে একরকম থাইল‍্যান্ডের খাবার খেলাম। চিকেন স্টিমড মোমো আর থুকপা। এখন অবশ্য এক্সাইড মোড়ে হলদিরামের উল্টো দিকে ফুটপাতেই মোমো খাই। দারুণ করে।  শুধু যে এসব খেতে শিখলাম, তাই নয়, উপকরণগুলো কোথায় পাওয়া যায়, সেগুলো খোঁজখবর শুরু করলাম। বাড়িতে শখ করে চাইনিজ রান্নাও শুরু করলাম একটু আধটু করে। বেলা দের রান্নার বই কিনলাম শখ করে। ক‍্যাপসিকাম, পার্সলে পাতা, লেমন গ্রাস, চিজ, কর্ন ফ্লাওয়ার, রকমারি সস – এই ধরণের উপকরণ বাড়িতে আগে কখনও ব‍্যবহার হতোনা। কিন্তু এগুলো আমি খুঁজে খুঁজে কিনে আনতে শুরু করলাম। ছুরি কিনলাম মাপ মতো, কাঁটা চামচ কিনলাম, খোসা ছাড়ানো পিলার, আইসক্রিম জমানোর কাপ কিনলাম। স‍্যালাড, সুপ, নুডলস আর রকমারি যন্ত্রপাতির হাত ধরে, আমাদের রান্নাঘর একটু একটু করে বদলাতে শুরু করলো। বাবার তো রান্না নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করার বাতিক ছিলই। এখন আমি একটু ধুনোর ধোঁয়া দিতে, সেটা আবার চাগিয়ে উঠল। লেকটাউনে মিলন সঙ্ঘের মেলায় নানারকম স্টলের মধ‍্যে এইসব সব্জি কাটার যন্ত্রপাতির স্টলও আসতো। কেটে কেটে দেখানোর লোকও থাকতো। বাপ মেয়ে দেখে শুনে চোখে চোখে যুক্তি করতাম। যেটা মনে হতো ব‍্যবহার করা সম্ভব, সেটা কিনে ফেলতাম। তখনতো ইউ টিউবের যুগ আসেনি। বাড়িতে পার্সোনাল কম্পিউটার কিংবা হাতে হাতে স্মার্ট ফোন ভবিষ্যতের গর্ভে। তাই রান্নার বই কিনে, অভিজ্ঞ লোককে জিজ্ঞেস করে, কষ্ট করে রেসিপি যোগাড় করতে হতো। তবে যোগাড় হয়েও যেতো। কিভাবে হতো সেটা বলি বরং।

আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আমার বৃত্তটা বেশ বড় হয়ে গিয়েছিল। সেখানে গ্রাম থেকে আসা প্রথম প্রজন্মের মেধাবী পড়ুয়া যেমন ছিল, তেমন কলকাতার অতি ধনাঢ্য পরিবার, আত্মীয় স্বজনেরা ইউরোপ আমেরিকায় থাকে, নিজেরাও ছুটি ছাঁটায় সেখানে চলে যায়, এমন পড়ুয়াও ছিল। আর আমাদের ভূগোল বিষয়টাই এমন, প্র‍্যাকটিকাল করতে গিয়ে, ফিল্ড সার্ভের সময়ে একসঙ্গে থাকতে গিয়ে ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায়। আর হাজারটা গল্পের মধ্যে রান্না খাওয়ার কথা হবেনা, এটা কি হয়? বিভিন্ন জেলায়, বিভিন্ন রাজ‍্যে, বিভিন্ন দেশে রান্নার স্টাইল তো আলাদা হবেই। ঐ স্বদেশ বিদেশ মিলিয়ে থাকা ট‍্যাঁশ বন্ধুদের থেকে শিখলাম পাস্তা রান্না, হোয়াইট সস কিকরে বানাতে হয়। মেয়নিজ, চীজ এগুলো ব‍্যবহার করে কি করে স‍্যান্ডুইচ, বার্গার বানাতে হয়। আর শিখলাম নাইফ কাটের কেতা। যেমন ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের লম্বা কাঠির মতো আলু কাটার নাম জুলিয়ান কাট। পেঁয়াজটা বসিয়ে ছয় বা আট বার ব‍্যাস বা রেডিয়াস বরাবর ছুরি চালিয়ে, তারপর কাত করে স্লাইস কাটার মতো ছুরি চালালেই পেঁয়াজ কুচি কুচি হয়ে যায়। একে বলে ফাইন চপ। পদ্ধতিটা জেনেই মনে পড়ে গেল রাস্তায় ঝালমুড়িওলা আর আলুকাবলিওলারা এভাবেই মিনিটের মধ্যে পেঁয়াজ কুচো করে ফেলে। আর গ্রামের বন্ধুদের কাছে শিখলাম চালকুমড়ো পাতার পাতুরি। পুরভরা উচ্ছে ভাজা, পুরভরা কাঁকরোল ভাজা। উচ্ছের মুখটা ছোটো করে কেটে ভিতরের বীজ বার করে নিতে হবে। তারপর পেঁয়াজ ভেজে, সর্ষে, পোস্ত, নারকেল বাটা দিয়ে কষে পুর বানিয়ে নিতে হবে। ঝাল, নুন, মিষ্টি পরিমাণ মতো। এবারে চামচের ডাঁটি দিয়ে উচ্ছে গুলোর মধ্যে পুর ভরে কড়া করে ভেজে নিতে হবে। কাঁকরোলের নিয়ম প্রায় এক। কিন্তু এক্ষেত্রে কাঁকরোলটা লম্বায় অর্ধেক করে কেটে নিতে হবে। এবারে ঐ অর্ধেকটা কুরিয়ে নিয়ে পুর ভরতে হবে। কাঁকরোলের ভিতরের কোরানো অংশ আর বীজগুলো থেঁতো করে ঐ পুরের সঙ্গেই কষা হবে। এবারে পুরভরা কাঁকরোলগুলো বেসনে ডুবিয়ে ভাজতে হবে। চালকুমড়ো পাতার পাতুরি আমাদের বাড়িতে কোনদিন হয়নি। কিন্তু বড়োবেলায় খেয়ে ভীষণ ভালো লেগে গেল। পাতাগুলো নুন মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। তাহলে পাতা থেকে বাষ্প বেরিয়ে পাতাটাকে মজিয়ে বেশ নরম করে দেবে। পাতাটা ভালো ভাবে মোড়া যাবে। এবার কাঁচা পেঁয়াজ কুচি সর্ষের তেল দিয়ে চটকে মজিয়ে নেওয়া যায়। তার সঙ্গে নুন, হলুদ, লঙ্কা মিশিয়ে পাতার সিম্পল পুর করাই যায়। তবে আগের মতো সর্ষে, পোস্ত, নারকেল বাটা দিয়ে পেঁয়াজটা কষে নিলে স্বাদটা রাজকীয় হয়ে যায়। আর তার সঙ্গে ভাজা চিংড়ির বাটা মেশালে স্বাদটা খানদানি হয়ে ওঠে। এবারে দুটো করে চালকুমড়ো পাতা একসঙ্গে নিয়ে, তার ওপরে পরিমাণ মতো পুর রেখে পাতা মুড়ে নিতে হবে। আর চাটুতে তেল বুলিয়ে সেঁকার মতো করে খুন্তি দিয়ে চেপে চেপে পাতা মোড়া পাতুরিগুরো এপিঠ ওপিঠ করে ভাজতে হবে। কিন্তু আঁচটা খুব ঢিমে রাখতে হবে, বাড়ালে চলবেনা। এখন ইউটিউবের ভিডিওগুলোয় কেতা করে নাইলনের ব্রাশ দিয়ে তেল বোলানো দেখায়। কিন্তু মা এমন তেল বুলিয়ে নেওয়ার দরকার হলে বেগুন বোঁটা দিয়ে চাটুতে তেল মাখাতো, বা কোনদিন বেগুন না থাকলে খোসাসমেত আলু মাঝখান থেকে কেটে, সেই কাটামুখটা দিয়ে তেল মাখাতো। আমি এখনও সেই প্রথাই ধরে রেখেছি। এই পাতুরি ভাজার সব চেয়ে সুবিধে হলো  কোনো সুতো, দড়ি কিচ্ছু লাগবেনা। এমনিই সুন্দর মুড়ে থাকবে কিন্তু মচমচে হবে। পরে আমার এক অধ‍্যাপিকা বন্ধু একটা খুব দরকারি পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই মতো বাড়িতে ইলিশের পাতুরি করতে গেলে আমি আর বাজারওলাদের পিছনে পড়িনা একটু কলাপাতার জন্য। আমার কর্তামশাইয়ের বাগানের শখ। ফ্ল‍্যাটের বারান্দায়, জানলায় মাচা বেঁধে শাকপাতি, শসা সব ফলান। তাই চালকুমড়ো, কুমড়ো, লাউ যখন যেমন পাই, টুক করে পাতা কেটে নিয়ে ওতেই পাতুরি বানাই। একেবারে পাতাসমেত খাওয়া যায়। শহরে কলাপাতা পাওয়া ভীষণ মুশকিল। তাই ইলিশ পাতুরির জন্য অন্তত আমার বাড়িতে এখন নো কলাপাতা বিজনেস। 

ব্রেবোর্ন কলেজে পড়তে একজন বন্ধু পেয়েছিলাম হিমানী। ওরা পঞ্জাবী। দমদমে থাকতো। সায়েন্স কলেজেও পড়েছি একসঙ্গে। মাঝেমধ্যেই ওর বাড়ি যেতাম। তখনই দেখেছিলাম ওরা ময়দা খায়না। আটার মোটা লুচি তৈরি করে। সেটাই হল পুরী। হিমানীর মা গরম গরম লালচে পুরী ভেজে থালায় দিতেন। আকৃতিতে একটু ছোটো, একেবারে গোল গোল বলের মতো। এমন শুধু পুরী কখনও আমাদের বাড়িতে হতোনা। মা মাঝে মাঝে করতো ডালপুরী। ছোলার ডাল সেদ্ধ করে কড়াতেই শুকিয়ে নেওয়া হতো। এবারে গোটা জিরে, ধনে, একটু গরম মশলা শুকনো খোলায় ভেজে গুঁড়িয়ে নেওয়া হতো। এবারে সাদা তেলে একটুখানি আদাবাটা আর হিং দিয়ে ডাল আর ভাজা মশলা দিয়ে নেড়ে একদম শুকনো করা হতো। তারপর ময়দার লেচি কেটে তার মধ্যে পুর দিয়ে বেলে নেওয়া হতো, তারপর তেলটা কষকষে গরম করে তাতে ফুলো ফুলো ডালপুরী ভাজতো মা। আর আমরা উত্তর কলকাতার লোক। তাই এটা জানতাম যে দোকানের কচুরি কাঁচা বিউলির ডাল বাটার পুর দিয়ে করা হয়। আর ঐ পুর যখন পাঁচফোড়ন দিয়ে ভাজা হয়, তখন তার নাম হয় রাধাবল্লভী। তবে এসব বাড়িতে করার কোনো ব‍্যাপার ছিলনা, প্রয়োজনও না। কারণ শ‍্যামবাজার, বাগবাজারে তো বটেই, পাইকপাড়া, দত্তবাগান, পাতিপুকুর সর্বত্রই কচুরি, রাধাবল্লভীর দোকান ছিল। কচুরির সঙ্গে ছোলার ডাল অথবা খোসাওলা আলুর তরকারি, আর রাধাবল্লভীর দোসর হল আলুর দম। কোনো কোনো দোকানে কচুরির সঙ্গে সিঙাড়ার চাটনির মতো চাটনিও দিতো। তবে হ‍্যাঁ, বাড়িতে একটা জিনিস কালেভদ্রে হতো, শীতকালে কড়াইশুঁটির কচুরি। কালেভদ্রে, কারণ অনেক তরিবত লাগে। ডালপুরীতে ডাল সেদ্ধ হয়, কিন্তু কড়াইশুঁটির কচুরির ক্ষেত্রে গায়ের জোর দিয়ে কড়াইশুঁটিগুলো কাঁচা বাটতে হয়। মা চাকরি করে অত পেরে উঠতোনা। তবে অফিসের এক বিবাহিতা সহকর্মিনীর বাড়িতে গিয়েছিলাম দরকারে। সে মিনিট পনেরোর মধ‍্যে আমার সামনেই গরম গরম কড়াইশুঁটির কচুরি ভেজে সঙ্গে তেলের আচার দিয়ে প্লেটে সাজিয়ে দিল। আমি তো তাজ্জব। রহস‍্যটা ভালো করে বুঝে নিলাম। ছুটির দিন দেখে ময়েন দিয়ে ময়দা মেখে, তালটার ওপরে তেলহাত বুলিয়ে ফ্রিজে রেখে দিয়েছে। আবার বেশ কিছুটা কাঁচা কড়াইশুঁটি, দুটো কাঁচা লঙ্কা, পরিমাণ মতো নুন, একটু চিনি, গোটা জিরে আর কয়েক টুকরো আদা মিক্সিতে বেটে নিয়েছে। তারপর সাদা তেলে হিং ফোড়ন দিয়ে এই বাটাটা খুব ভালো করে নেড়ে পুরো শুকিয়ে নিয়েছে। তারপর এই পুরটাও ফ্রিজে রেখে দিয়েছে। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে কয়েকটা লেচি কেটে পুর ভরে কচুরি ভেজে দিয়ে দেয়। আমাকে জিজ্ঞেস করাতে বলেছিলাম তিনটে খাব। তিনটে কচুরি ভেজে আচার দিয়ে সাজিয়ে দিতে মেরে কেটে পনেরো মিনিট। ওর এই পদ্ধতিটি আমি মাথায় তুলে নিলাম। ঐ সহকর্মিনীকেও গুরু মানলাম।

হিমানীর বাড়িতে শিখেছিলাম আলু পরোটা,  বেসনের লাড্ডু, বেসনের বরফি, রাজমা আর ডি লা গ্র‍্যান্ডি বল্লে বল্লে তড়কা। আলু সেদ্ধ করে তাতে নুন একটু হলুদ দিয়ে মেখে রাখতে হবে। পেঁয়াজ ঝিরিঝিরি করে কেটে মুচমুচে করে ভেজে নিতে হবে। আর শুকনো লঙ্কা ভেজে হাত দিয়ে চটকে নিলে চিলি ফ্লেক্স হয়ে যাবে। এবারে পেঁয়াজ আর লঙ্কা ঐ আলুতে মেখে নিতে হবে। আটা ময়ান দিয়ে মেখে নিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। বড় লেচি কেটে ছোটো মোটা রুটির মতো বেলে নিতে হবে প্রথমে। এইবার খানিকটা আলুর পুর ঐ রুটির মধ্যে রেখে চারপাশ মুড়ে আবার আর একটা পুর ভরা লেচি বানিয়ে নিতে হবে। এবারে ঐ লেচি দিয়ে একটা পুর ভরা গোল পরোটা বেলে নিতে হবে। প্রথমে ঐ পরোটা রুটির মতো হাল্কা সেঁকে নিয়ে, পাশ দিয়ে একপলা ঘি অথবা সাদা তেল দিয়ে ভাজতে হবে। আলু পরোটা এতো সুস্বাদু, বাঙালি ঘরে গ্রহণযোগ্য হতে কোনো অসুবিধেই হয়নি। আমার মা সাধারণ তিনকোণা পরোটা করার সময়ে, প্রথমে সেঁকে নিয়ে, পাশ দিয়ে আধপলা তেল দিয়ে, একটা পরিষ্কার ন‍্যাকড়া দিয়ে চেপে চেপে খুব সুন্দর পরোটা করতো। আমার সেরকম খাওয়াই অভ‍্যেস। কিন্তু পরে দেখলাম নানা জায়গায় নানা রীতি। ওয়েটল‍্যান্ড ম‍্যানেজমেন্টে থাকতে থাকতে কলেজ সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলাম। ইন্টারভিউ দিয়ে চাকরি পেলাম কলকাতার এক মহিলা কলেজে। সেখানে ক‍্যান্টিনের দিদি মোটা পরোটা বেলে লুচির মতো ছাঁকা তেলে পরোটা ভাজত। এদিকে ময়ান কম। তেল জবজবে মোটা বেশ বড়সড় গোল পরোটা, এদিকে ছিঁড়তে একেবারে রবারের মতো। সহকর্মিনীরা ঐ বিশেষ পরোটার নাম দিয়েছিলেন গলোটা। অর্থাৎ গলায় আটকে যায় এমন পরোটা, সমাস করে গলোটা। টিফিন হলেই এই নিয়ে হাসাহাসি হতো। আবার যখন ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ফিল্ডে যাই, প্রাতরাশে ভাজাভুজি আমার ভালো লাগেনা। যেদিন পরোটা হয়, সেদিন ট্রাভেল এজেন্টের রাঁধুনি ময়ান দেওয়া ময়দায় শুধু সেঁকে আমায় পরোটা করে দেন। ওটা খুব ভালোলাগে। বাড়িতেও অন‍্যদেরটা ভেজে দিই, নিজেরটা  আমি এভাবে সেঁকে নিয়ে খাই। পরে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখি, সেখানকার রাঁধুনি দিদিও গলোটা ভাজে, পরোটা নয়। যাক শ্বশুরবাড়ির গল্প এখন তোলা থাক, পরে আবার হবে।

হিমানী আমাকে বেসনের লাড্ডু বানাতে শিখিয়েছিল। বেসনটা প্রথমে একটু শুকনো খোলায় নাড়তে হবে। বেশ সুন্দর একটা গন্ধ উঠবে। এবারে অল্প অল্প করে ঘি মেশাতে হবে। খানিক পরে চিনির রস মেশাতে হবে। নাড়তে নাড়তে বেশ নাড়ু পাকানোর মতো চিট ধরবে। একটুখানি হাতে নিয়ে গোল পাকিয়ে দেখতে হবে যেকোনো আকৃতি দেওয়া যাচ্ছে কিনা। যদি দেওয়া যায়, তবে আঁচ নিভিয়ে ঠান্ডা হতে দিতে হবে। এবারে দুহাতের চেটোয় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বড় বড় নাড়ু পাকানোর মতো লাড্ডু পাকাতে হবে। আর বরফি করতে হলে কানা উঁচু থালায় মণ্ডটা সমান করে রেখে ঠান্ডা হলে, ছুরি বা খুন্তি দিয়ে কেটে নিতে হবে।
এবারে তড়কার তরিবৎটা বলে দিই। বাঙালি ঘরে এটা এখন অতি প্রয়োজনীয় রেসিপি। গোটা মুগ কলাই কয়েকঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। সঙ্গে ইচ্ছে হলে অল্প রাজমাও মিশিয়ে দেওয়া যায়। যদি দোকানের মতো ঘন তড়কা খাওয়ার ইচ্ছে হয়, তবে কিছুটা রাজমা আলাদা ভেজাতে হবে। ভিজিয়ে রাখা মুগ কলাই অল্প হলুদ আর নুন দিয়ে প্রেসার কুকারে সিটি দিয়ে সেদ্ধ করে নিলে খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। এবারে তড়কার মশলা বানাতে হবে। ফ্রাই প‍্যানে দু পলা তেল দিয়ে তাতে আস্ত রসুন কোয়া বেশ কয়েকটা, গোটা জিরে, শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা, গোটা গরম মশলা আর কয়েক টুকরো আদা লাল করে ভাজতে হবে। এতে টমেটো কুচো যোগ করতে হবে। ভাজা গন্ধ উঠলে আঁচ বন্ধ করে কিছুটা ধনে পাতা আর অল্প পুদিনা পাতা ঐ মশলার ওপরে দিয়ে খুন্তি দিয়ে নেড়ে তেলে মিশিয়ে নিতে হবে। পাতাগুলো তেলে মজবে কিন্তু ভাজা হবেনা, মানে এদের গন্ধ অটুট থাকবে। এবারে পুরো জিনিসটা ঠান্ডা করে মিক্সিতে পিষে নিতে হবে। পেষার আগে এতে ভেজানো রাজমা কিছুটা মেশাতে হবে। সব মিলিয়ে মিশ্রণটা খুব মিহি হতে হবে। ইচ্ছে হলে কাঁচা লঙ্কাও মেশানো যায়। যার যেমন মর্জি। বাটার পর পরিমাণটা অনেকটাই হবে, আর একটা খুব সুন্দর মশলার গন্ধ উঠবে। এইবার কড়ায় তেল দিয়ে বেশ খানিকটা ঝিরিঝিরি পেঁয়াজ খুব ভালো করে ভাজতে হবে। ভাজা হলে ঐ তেলে আমি হলুদ, কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো আর অল্প গরম মশলা পাউডার দিয়ে কষে নিই। তেলে এই মশলাগুলো কষলে একটা বেশ সুন্দর কালচে লাল রঙ ধরে। এবারে মিক্সি থেকে পুরো মশলাটা কড়ায় ঢেলে দিতে হবে। নেড়েচেড়ে তেল ছাড়া অবধি অপেক্ষা করতে হবে। তেল ছেড়ে দিলে সেদ্ধ মুগ কলাই জল সমেত কড়ায় ঢেলে দিতে হবে। এবারে ভালো করে কিছুক্ষণ ফোটাতে হবে, যাতে গোটা মুগটা মশলার সঙ্গে মিশে একটু বেশ মাখা মাখা হয়ে আসে। একেবারে শেষে ছোটো ফোড়ন কড়ায় এক পলা ঘি দিয়ে তাতে কসুরি মেথি ফোড়ন দিয়ে, মুগের মধ্যে ঢেলে দিতে হবে। নুন মিষ্টি স্বাদ মতো। বাড়ির তড়কা রেস্তোরাঁকে হার মানাবে। কসুরি মেথিটা শুকনো খোলায় নেড়ে নিলেও গন্ধটা খুব সুন্দর ওঠে। ঘি দিতে না চাইলে, ঐ ড্রাই রোস্টেড কসুরি মেথিও মিশিয়ে নেওয়া যায়। ইচ্ছে হলে একপলা ঘি গরম করে ওপরেও ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।

হচ্ছিল অফিসের গল্প, চাইনিজ খাবারের গল্প, কোথা থেকে কী সব উধোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে উঠে পড়লো। অফিসের ছুটি হলে বিবাহিতা সায়েন্টিস্টরা রাস্তায় ঝালমুড়ি, ফুচকা যা পাওয়া যায়, খেতে দাঁড়িয়ে যেতো। অগত্যা আমাদেরও খেতে হতো। বাকিরা বলতো, রোজ রোজ রাস্তার খাবার খাও কেনো। ওরা বলতো, বাড়ি গিয়ে কাজে লেগে পড়তে হবে। কেউ তো খাবারের থালা নিয়ে বসে নেই। এতো খিদে পেয়ে যায়, তখন আর অন‍্যদের যত্ন করা যায়না। ঘর বার সামলাতে গেলে, মুখে হাসি রেখে এনার্জি ধরে রাখতে গেলে রাস্তায় খেয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমি চাকরি করলেও, তখনও বাবার হোটেলে খাই। মা খাবার নিয়ে বসে থাকে, অদূর ভবিষ্যতে কী হবে ভেবে কেঁপে যেতাম।

নদী ধীর লয়ে ভাঙে
একূল, ওকূল।
আমার মনের গাঙে
অস্ফুট স্বপ্নের ফুল।

এমন চলতে চলতে অফিসে একটি ছেলে আমাদের ল‍্যাবে যোগ দিলো। বাড়ি দীঘার কাছে রামনগরে। আমার থেকে বয়সে খানিক বড়ো, তবে অফিসে তো জুনিয়র, তাই একটু অ্যাটিট‍্যুড নিয়ে থাকতাম। তবে পরে বন্ধুত্ব হয়ে গেল, কারণ ছেলেটি ছোটো থেকে আমার মতো শুকতারা, আনন্দ বাজার এবং অরণ‍্যদেব পড়ে। লামান্ডা, লুয়াগা, ডেভ কাকা, গুরান, বুড়ো মজ, মিস তাগামা, হীরো ঘোড়া, বাঘা নেকড়ে, হিজ বনমানুষ, স্টেগি ডাইনোসর, ফ্রাকা বাজপাখি আর ডায়ানা সকলকেই চেনে। তাছাড়া রিপ কার্বি, ডেসমন্ড, ম‍্যানড্রেক, নার্দা, লোথার, কার্মা, হোজো, রহস‍্যময় আট, ম‍্যাগনন, ফ্ল‍্যাশ, ডেল, জারকভ এদেরকেও চেনে।
কিছুদিন পরে ল‍্যাবের বড় দাদা মানে জগাদা আমাকে ডাকলো –

– কি রে! TUMPA -র সঙ্গে এত গল্প করছিস, ব‍্যাপার কি?

– টুম্পার সঙ্গে গল্প মানে? আমার নাম তো টুম্পা।

– কি! তোর ডাকনাম টুম্পা? তুই তাহলে টুম্পা ওয়ান।
অমনি সবাই হো হো হা হা করে হাসতে লাগল।

–  কি ইনোসেন্ট রে, তুই TUMPA জানিসনা?
আমাকে হাঁ হয়ে থাকতে দেখে বললো, TUMPA মানে Total Uncultured Medinipurian Public Association। মানে মেদিনীপুরের ছেলে।
আমার হাঁ মুখ বন্ধ হচ্ছেনা দেখে আরও বললো –
বাড়ি আর ইস্কুল করলে জগৎটা চেনা যায়না মামণি। ভাষা শিখতে হলে, হোস্টেল টোস্টেলে থাকতে হয়।

– গরর গরর

– রেগে যাচ্ছিস কেনো! বুঝিয়ে বলে দিচ্ছি। মেদিনীপুরের ছেলেরা তেল চুপচুপে চুল নিয়ে কলকাতার কলেজে আসে। হোস্টেলে এসে শ‍্যাম্পু শেখে। বাড়ি থেকে ধামা করে মুড়ি আনে। ঘরে খিল তুলে মুড়িতে জল মেরে খায়, আর পড়া মুখস্থ করে। তারপর চাকরি বাকরি বাগিয়ে কলকাতার ছেলেদের নাকের সামনে দিয়ে ভালো ভালো পাখি তোলে।

– পাখি তোলে?

– বুঝতে পারলিনা? বুঝিয়ে দিচ্ছি। যেমন ধর, তুই একটা মোটা পাখি। হেড ফ‍্যাট, তোর মাথা মোটা।
আরে! পেপার ওয়েট তুলছিস কেন? মারবি নাকি? ভেবে দেখ! তোর কেরিয়ার ভালো। আজ এখানে টেম্পু আছিস, কাল কোথাও পার্মেন্ট লেবার হতে পারিস। জেলার ছেলে কলকাতার জামাই হলে কলকাতায় তার একটা আস্তানা ফ্রি। তোর ভাই নেই। দুবোন, বাবা মার যা, তাই মেয়েদের। তোর একটা ভালো মার্কেট ভ‍্যালু আছে। তুই TUMPA টুয়ের দিকে ঝুঁকছিস, এটা আমাদের রাডারে ধরা পড়েছে।

আচ্ছা, জগাদার কথাটা ভেবে দেখার মতো। আমার মার্কেট ভ‍্যালু কতো এটাতো কখনও ভেবে দেখিনি। জগাদার কথা অনুযায়ী কলকাতার ছেলেরা তাহলে Total Envious Calcuttan Public Association, অর্থাৎ কিনা টেকপা। কিন্তু আমি তো আর ছেলে না মেয়ে। মেয়েদের ঠিকানা বদলায়। যার নিজের ঠিকানার ঠিক নেই, তার কে টুম্পা, কে টেকপা, কে পরিযায়ী, কে উদ্বাস্তু এসব নিয়ে মাথা ঘামাবারও কিছু নেই। যেখানে পাইবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলে পাইতে পারো …… হেঁ হেঁ।

মুখে এসব কিছুই বললাম না। শুধু মিষ্টি হেসে বললাম,
– Zoগাদা গো, তুমি আমাদের ‘দাদার কীর্তির’ ভোম্বলদা। তা তুমিও তো TUMPA, তোমার পাখি কই?

– দেখেছিস! বড় দাদা হয়ে ভালো কথা বোঝাতে গেলাম, অমনি দাগা দিয়ে কথা বলছিস? কি জন্তু রে তোরা? মেয়ে জাতটাই বেইমান।

অমনি মেয়ে বিজ্ঞানীর দল কলকলিয়ে উঠলো।
– জগা ধরবে পাখি? একটা গাঁট। পাখি ধরতে গেলে কিছু ইনভেস্ট করতে হয় – সময়, টাকা। ওয়ান পাইস ফাদার মাদার। অফিস থেকে টিউশন পড়াতে যাবে, রাত দশটায় মেসে ঢুকবে। টাকা, সময়, মন, ইচ্ছে যার কিছুই নেই, জিন্দেগীতেও কোনো পাখি তার দাঁড়ে বসবেনা।

– হ‍্যাঁ, তোরা Soব জানিS। জ‍্যোতিষীর বোর্ড লাগিয়ে বসে যা। টু পাইস আসবে। আরে এ ব‍্যাটা আড়ি পেতে সব শুনছে।

সবাই তাকিয়ে দেখি টুম্পা টু হে হে টাইপ দন্ত বিকশিত করে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর ধীরে সুস্থে সে টেবিল বাজিয়ে একটা গান ধরলো। হেমন্ত মুখার্জির মনে কি দ্বিধা রেখে গানটার একটা লাইন আছে ‘আকাশে উড়িছে বকপাতি’। সেটার প‍্যারডি করে গাইতে লাগলো, আকাশে উড়িছে মোটা পাখি ….। আর কি হবে! অফিসে আমার একটা স্থায়ী নাম হলো – মোটা পাখি। আর উপসংহার টানা হল যে জগাদা খাঁচা পেতে বসে আছে, কিন্তু শিকগুলো এতো ফাঁক ফাঁক, যে পাখি ঢুকেও বেরিয়ে যাচ্ছে, আর অন্য দাঁড়ে বসে যাচ্ছে। জগাদা আর কি করে, পাখিগুলি তার মুক্ত খাঁচায় রইলোনা বলে গুনগুন করতে লাগলো। আমরা সকলেই জানি জগাদা কেন হাড় কেপ্পন। হাজার তিনেক টাকা মাইনে তে নিজের থাকা খাওয়া, বোনকে পড়ানো, বাড়িতে পাঠানো। ঐজন‍্যে খুব কিপটেমি করে। কিন্তু ঐ – পিছনে লাগার জন্য লাগা, সবাই গাঁট বলে ডাকে।

ল‍্যাবে আমাদের কাজটা ছিল, ভারতের কৃত্রিম উপগ্রহ ইনস‍্যাট টু বি – এর ইমেজ দেখে পশ্চিমবঙ্গের জলাভূমির মানচিত্র তৈরি করা। কিন্তু তখনও তো কম্পিউটার আর জি আই এস সফ্টওয়্যারের যুগ আসেনি। তাই সব চোখে দেখে করতে হতো। যখন কোনো ধন্দ উপস্থিত হতো, যে এই রংটা কিরকম ভূমি ব‍্যবহার বোঝাচ্ছে, তখন সন্দেহ নিরসন করতে সেখানে গিয়ে দেখতে হতো। হয়তো ইমেজে কোথাও অদ্ভুত উজ্জ্বল একটা মেটে লাল রং দেখা গেল, বোঝা যাচ্ছেনা ওখানে কী আছে, তখন ঐ জায়গায় গিয়ে দেখা গেল, ওখানে হয়তো কচুরি পানা রয়েছে। এই কারণে প্রায়ই আমাদের এদিক সেদিক যেতে হতো। কাছাকাছি সাইট থাকলে দুজন করে যেতাম। আর দূরে যেতে হলে তিন চারজন মিলেও যাওয়া হতো। একবার আমাকে আর টুম্পা টু কে যেতে হলো গড়িয়ার দিকে এমন একটা সাইট সিয়িংয়ে। ফেরার পথে ধর্মতলায় যখন নামলাম, তখন দুপুর রোদ, আর প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। সারাটা রাস্তা টুম্পা টুয়ের বকবক চললো কলকাতা ময়দান, ফুটবল, খেলোয়াড়দের ঠিকুজি কুষ্ঠি আর মহমেডান স্পোর্টিং, ইস্টবেঙ্গল আর মোহনবাগান মাঠের ক‍্যান্টিন নিয়ে। এতে আমার মনে একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হল। একতরফা জ্ঞান দেবার আগে শ্রোতা কি জানে, সে উৎসাহী না কি অনুৎসাহী সেটা তো জানতে  চাইলোনা। তাছাড়া তুই ছেলে জন্ম পেয়েছিস, বল পায়ে নিতে পেরেছিস, আমি পারিনি। তা বলে তুই দীঘার ছেলে, আমি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে জন্মেছি, এখানে বড় হয়েছি। আমার বাবা মোহনবাগান, মা মোহনবাগান, মামা, মাসি, জ‍্যাঠা, কাকা, চোদ্দ গুষ্টি মোহনবাগান। আমার মামার বাড়ির পূর্বপুরুষ ১৮৮৯ এ মোহনবাগান তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। মানছি তুইও মোহনবাগান, তা বলে কলকাতা ময়দান নিয়ে তুই জ্ঞান দিবি, আর আমি শুনবো? তবে হ‍্যাঁ, এটা ঠিক, দশটা মেয়ে দেখা, বা কূটকচালি করার চেয়ে ফুটবল নিয়ে মেতে থাকা ভালো। বিবেকানন্দেরও তাই মত। আমি ওনার কথা খুব মেনে চলি। তাই নিজে কোনো খাপ না খুলে মিচকে মেরে সব কথা শুনতে লাগলাম। 

ধর্মতলা ক্রসিংয়ে অনাদি কেবিনের সামনে দাঁড়িয়ে ছেলেটা একটা অদ্ভুত কথা বললো।

– এই দোকানটা চিনিস?

– (আবার! আমাকে অনাদির মোগলাই পরোটা আর কষা মাংস শেখানোর চেষ্টা হচ্ছে? যদিও শ‍্যামবাজারের গোলবাড়ির মতো নয়, তবু এটাও ঐতিহ‍্যশালী।) উত্তর না দিয়ে একটা তেরছা নজর হানলাম। ছেলেটা লক্ষ্য করলো বলে মনে হলনা। সে বলে চললো,

– এটা ১৯২৫ সালে তৈরি হয়েছে। অনাদির যিনি প্রতিষ্ঠাতা সেই বলরাম জানা আমাদের ওদিকের লোক। মোহনপুরে বাড়ি। আমার ঠাকুরদার বন্ধু। বড়ছেলে অনাদি টাইফয়েডে মারা গেল। সেই ছেলের নামে দোকান। ছোটোছেলের ছেলেরা, আশুতোষ আর ভবতোষ এখন মালিক। ছমাস করে পালা পড়ে। বড়দার যখন পালা পড়ে, তখন তার স্টাফ কাজ করে, আবার ছোড়দার পালাতে স্টাফ বদলে যায়।

– মানে ছমাস বেকার?

– না বেকার নয়, মাইনে দেওয়া হয়। বলরাম বাবু মোহনপুরে ইস্কুল করেছেন। আমাদের বাড়ি থেকেও ছেলে আর মেয়েদের দুটো ইস্কুল করা হয়েছে তো। আমাদের বাড়ির পুরোনো মন্দিরটার অনেক বয়েস হয়েছিল, দেড়শো, দুশো হবে। ভেঙে পড়ছিল। এখন সংস্কার করে যে মন্দির হয়েছে, সেটা এই বলরাম জানা তৈরি করে দিয়েছিলেন। আমাদের গ্রামের কয়েকজন ছেলে এই দোকানের কর্মচারী।

– তা চেনা যখন, এখানেই খেয়ে নিই। পেটে তো ছুঁচো দৌড়োচ্ছে। আমি খিদে সহ‍্য করতে পারিনা।

– খেপেছিস? এখানে খেতে ঢুকবো? চেনা মুখ দেখলে ছেলেগুলো কেউ পয়সা নেবেনা। নিজেরা ক‍্যাশে টাকা দিয়ে দেবে। ঐজন‍্যে আমি লুকিয়ে পালিয়ে যাই। চৌরঙ্গী কেবিনেও এক দশা, ওখানেও আমাদের গ্রামের ছেলেরা আছে। অন‍্য একটা জায়গায় চল।

তারপর রাজভবনের দিকে মুখ করে খানিক সোজা হেঁটে, ডানদিকের গলিতে ঢুকলাম।

– এই গলিটার নাম ডেকার্স লেন। বুঝলি? 
(আচ্ছা, এটাই ডেকার্স লেন! বাবার মুখে অনেকবার শুনেছি, কিন্তু আসা হয়নি। এখানেই চিত্তদার দোকান আছে, বাবা বলেছিল।) অপরিসর গলি, আর অসংখ্য খাবারের দোকান, চা থেকে চাউমিন, স‍্যান্ডুইচ সব কিছু। চিত্তবাবুর আদি দোকানের সামনে নর্দমার ওপরে বেঞ্চিতে বসে পড়লাম, মোটা পাঁউরুটি আর চিকেন স্টু কোলে নিয়ে। ডেকার্স লেনে আসা তো হলো। একথাও শুনলাম, এত খাবারের দোকানের মধ্যে চিত্তদার দোকানের প্রতি ছেলেটার এত টানের কারণটা শুধু ঐতিহ্য নয়, চিত্তদার সঙ্গে মোহনবাগানের সম্পর্কটাই প্রধান। চিত্তদা নাকি গরীব খেলোয়াড়দের বিনামূল্যে লিভার কারি খাওয়াতেন, দোকান এখন ভাইপোরা চালায়, এমন কতো কথা ছেলেটা বলতে লাগলো। মনে মনে অনেক বিচার চলতে লাগলো। ছেলেটা ক্লাস টেনের পর থেকে হোস্টেলে। এমন ছেলেরা বিনা পয়সায় কোথাও খাবার সুযোগ থাকলে ছাড়েনা। কিন্তু এ বলছে, অনাদি কেবিন, চৌরঙ্গী কেবিনে পয়সা নেবেনা বলে লুকিয়ে পালিয়ে যায়, সুযোগ নেয়না। তাছাড়া কথা শুনে মনে হলো, নিজের বাড়ির ইতিহাস, দোকানের ইতিহাস এসবের মূল‍্য দেয়। মানে মূল‍্যবোধ আছে। তবে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। কলকাতার খাবারের ঘাঁতঘোঁত চিনেছে, মনে হচ্ছে বেশ পেটুক। সারাদিন এতো বকবকানি চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সোজাসাপ্টা কথা, মেকি, মনমজানো কথার বালাই নেই।

সানাই ষষ্ঠী

সালটা ১৯৯৬। অফিসের কাজের ব‍্যস্ততার ফাঁকে দুর্গাপুজো এসে গেল। ষষ্ঠীর দিন অফিস হয়ে ছুটি পড়বে। আমরা ঠিক করলাম বসকে বলে হাফ ডে  করে দুটো নাগাদ বেরিয়ে পড়বো। তারপর বাইরে খেয়ে, যে যার রাস্তা ধরবো। পার্ক সার্কাসের কাছে একটা রেস্তোরাঁ সদ‍্য নতুন খুলেছে, ওখানে যাওয়াই স্থির হলো। চিকেন বিরিয়ানি আর মাটন চাঁপ খেয়ে বিকেল চারটে নাগাদ যখন বেরোচ্ছি, ছেলেটা জিজ্ঞেস করলো,
– এখন কি সোজা বাড়ি যাবি?
– না, কুমোরটুলি, বাগবাজার সর্বজনীন দেখে যাব।
– ওখানে কেন?
– ছোটবেলার অভ‍্যেস। বাবা মায়ের সঙ্গে যেতাম। ওখানে না গেলে আমার চলবেনা।
– আমার আবার উত্তর কলকাতাটা একেবারেই চেনা হয়নি, যাওয়া পড়েনা তো। চল, তাহলে তোর সঙ্গে আমিও যাই।

সেই পুরোনো পথ, কুমোরটুলির গলিতে ঢোকার মুখে ছোট্ট পেতলের দুর্গা, তারপর ঠাকুর, গোকুল মিত্রের বাড়ি, মদনমোহন, চিলড্রেন্স পার্ক, গিরিশ ঘোষের বাড়ি, তারপর বাগবাজার সর্বজনীন। মেলার মাঠ থেকে বেরিয়ে দুজনে ফুটপাতের স্টলে বেঞ্চিতে বসে কচুরি তরকারি খেলাম। ছেলেটি আগামীকাল “ভোর” চলে যাবে গ্রামের বাড়িতে। ওর বাড়িতে নাকি ‘দুর্গো’ পুজো হয়। শুনেছিলাম দুর্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হলেন দুর্গা। তবে এমন সরাসরি দুর্গোপুজো করতে কাউকে দেখিনি। ওর কথাবার্তায় বাংলাটা অন‍্যরকম। ও ভোরে বেরোয়না, ভোর ভোর বেরোয়না, ‘ভোর’ বেরোয়। কচুরির দোকান থেকে খায়না। কচুরি দোকান, মিষ্টি দোকান, পান দোকান, মুদী দোকান থেকে জিনিস কেনে, ষষ্ঠী বিভক্তির অস্তিত্ব ওর বাংলায় নেই। ল‍্যাবে আড়ালে সবাই মজা করে। সে অবশ‍্য জগাদার কথাও এরকম। চলে গেলাম, বোঝাতে বলে পালিয়ে গেলাম। চলে যাওয়া আর পালিয়ে যাওয়া আমাদের কাছে আলাদা, ওদের কাছে এক। শ‍্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় থেকে দুজনের দুটি পথ আলাদা হল। আমি চললাম পাতিপুকুরের সরকারি আবাসনে আর অন‍্যজন চললো বেহালা রবীন্দ্র নগরের ভাড়াবাড়িতে।

দুর্গাপুজো চললো পুজোর মতো। এখন তো আর ইস্কুল কলেজের মতো ভাইফোঁটা পর্যন্ত লম্বা ছুটির ব‍্যাপার নেই। একাদশীর পরে খুলে গেল অফিস। আমরা আবার কাজে মন দিলাম। লক্ষ্মীপুজোর পরে ছেলেটি এসে হঠাৎ আমার হাতে একটা কাচের শিশি ধরিয়ে দিল।

– এটা কী?
– আমার মা পাঠিয়েছে, তেল আমের আচার।
– তাই! বাকিদের বলো। 
– কেন? এটা তোর জন্য।
– আমার এ-কা-র?
– হ‍্যাঁ
– কেন?
– আমি মাকে বলে দিয়েছি।
– কী?
– ঐ, মাকে বলে দিলাম, আমি তোকেই বিয়ে করবো। মা তোর নাম জিজ্ঞেস করলো। কালো না ফর্সা জিজ্ঞেস করলো। ফেরার সময়ে এই আচারটা দিয়ে বললো, শারদাকে দিস। সামনের রবিবার দুপুরে তুই আমার বেহালার বাড়িতে যাবি, ওখানেই খাবি। আমার বাবা মা আসছে, ডাক্তার দেখাতে। সোমবার উডল‍্যানডসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছি। অফিসে আসবোনা। রবিবার আমার বাবা মা তোকে দেখবে।

আমি তো ওর কথা শুনে তাজ্জব। কি সাহস রে বাবা! কিছু তেড়েমেড়ে বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মনের ভেতরে দেখলাম, প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে করছেনা। আচারটা অ্যাকসেপ্ট করে নিলাম। এরকম বাবা, মা, ডাক্তার বদ‍্যি, হাসপাতাল সব টেনে, আচার দিয়ে কেউ প্রোপোজ করে? কস্মিনকালেও কেউ শুনেছে? ধ‍্যাৎ।

রবিবার চললাম বেহালা। বাড়িতে বললাম বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্ন। অফিসে আমার ল‍্যাবের সহকর্মীদের বাড়িতে সকলেই চিনতো। আর আমি সবকথা খুলে বলে দিয়েছিলাম। কারণ জীবনে আমি কিছু নীতি নিয়ে চলি। আমি যা করি, সেটা ঠিক বলে মনে করি বলেই করি। আমার চোখে কোনো কাজ যদি ঠিকই হয়, তবে তা গোপন করার কিছু নেই। আর যেখানে সিদ্ধান্ত আমার, সেখানে দায়িত্বও আমার। রবিবার প্রথমে বেলগাছিয়া থেকে মেট্রো ধরে হাজরা। ওখান থেকে অটো রিক্সো করে বেহালা। তারপর সাইকেল রিক্সো ধরে বাড়ি। হবু শ্বশুর শাশুড়ির সঙ্গে দেখা হলো। তাঁরা আমাকে হাসিমুখেই অভ‍্যর্থনা করলেন। তারপর এটা ওটা গল্প চলতে লাগলো।

খেতে বসার সময়ে কয়েকটা জিনিস লক্ষ্য করলাম। করলা মোটা মোটা করে কেটে নরম ভাজা হয়েছে। আমাদের যেমন তেতো কমানোর জন্য পাতলা স্লাইস কেটে মড়মড়ে করে ভাজা হয়, তেমন নয়। থালার পাশে একটা বাটিতে অনেক কাঁচালঙ্কা রাখা আছে। আমি বাদে বাকি সবাই ভাত খেতে খেতে কুটকুট করে লঙ্কা খাচ্ছে। আর পোনা মাছের টক বানানো হয়েছে। আমাকে আগে অবশ্য জিজ্ঞেস করা হয়েছিল মাছের টক খাই কিনা। আমি বলেছি, না। কারণ আমি কখনও টক খাইনি। তাই আমার জন‍্যে ডিমের কারি বানানো হয়েছে আলু ছাড়া। ডিমটা খুব ভালো করে ভাজা। আর তরকারিটা মশলাদার, কিন্তু মিষ্টি দেওয়া নেই। ডাল জিরে ফোড়ন দিয়ে করা, কিন্তু ওটাতেও মিষ্টি দেওয়া নেই। বাঁধাকপিটাও ঝালঝাল, কিন্তু পেঁয়াজ রসুন দিয়ে করা। আমাদের বাড়িতে জিরে, শুকনো লঙ্কা, গরমমশলা ফোড়ন দিয়ে বাঁধাকপি রান্না হতো। তাই এরকম কখনোই খাইনি। আমার মনে হলো, এই পরিবার তেতো, ঝাল, টক সবগুলো স্বাদই উগ্র পছন্দ করে। আর রান্নার ব‍্যাকরণটা আমার এতদিনের জানা ব‍্যাকরণ থেকে একেবারেই আলাদা। এতদিন জানতাম, রান্নার ব‍্যকরণ ঘটি আর বাঙাল বাড়িতে আলাদা হয়। এখানে দেখছি ঘটি হলেও আলাদা হচ্ছে। কারণটা মনে হয় ভৌগোলিক। আমরা কলকাতা এবং উত্তর চব্বিশ পরগণায় ম‍্যাচিওরড ডেল্টা মানে পরিণত বদ্বীপে থাকি। আমরা পলিমাটির ওপরে থাকা মানুষ। এরা উপকূলের মানুষ। কিন্তু বদ্বীপীয় উপকূল নয়, গঙ্গার ওপাশের দীঘা উপকূলের মানুষ। মৈতনা গ্রামটা শুনেছি বালিয়াড়ির ওপরে। এরা বালি আর নোনা হাওয়ার দেশের মানুষ। তাই মুখের স্বাদ আলাদা। অবশ্য ঘটি বাঙালের যে পার্থক্য তার শিকড়েও তো ভৌগোলিক কারণই লুকিয়ে আছে। বাড়ি ফেরার সময়ে হবু শাশুড়ি একটা রূপোর চেন পরিয়ে দিলেন গলায়। তারপর একদিন দুই বাড়ি শলা করে আমাদের চার হাত এক করে দিল। ততদিনে আমরা দুজনেই চাকরি বদলেছি। তবে ষষ্ঠীর দিন, মদনমোহন আর বাগবাজার সর্বজনীনের মা দুর্গা জীবনের বড় একটা ধাপের সাক্ষী রইলেন।

পর্ব পাঁচ

বিবাহ পর্ব

আমার জন্ম কলকাতা মেডিকেল কলেজে। কর্ম ধর্ম এই শহরেই। তবে বাপ-ঠাকুর্দার ভিটে ছিল বসিরহাটের আড়বালিয়ায়। স্কুলের ছুটি পড়লেই চলে যেতাম দেশের বাড়ি। বড়জেঠু, মেজজেঠু, সেজজেঠু, তিন জ‍্যাঠাইমা, ভাইবোন মিলে পুরো দশ। আনন্দেই কেটে যেত দিনগুলো। দোর্দণ্ড প্রতাপ পিসি ছিল। কেবল বাবা সবার ছোট বলে নিজের কাকু ছিলনা আমার। বাবাই ছিল সবার ছোটকা। তাই আমার বড় হওয়া গ্রাম শহর মিশিয়ে – এসব কাহনতো আগেই বলেছি, তবু শ্বশুরবাড়ি যাবার আগে শিকড়টা ঝালিয়ে নিতে ক্ষতি কি?

বি. এ, এম. এ পাশ দেবার পর বাবা ভেবেছিলেন সম্বন্ধ খুঁজবেন আমার জন্য। লাল কলম হাতে পরীক্ষার খাতা থেকে মুখ তুলে মা বললেন, সাত জন্মের বেড়ি। যে হাঁড়িতে চাল দিয়েছে, সে বাড়ি ঠিক খুঁজে নেবে ওকে। মায়ের বিশ্বাসের ছিলায় বিধির বিধান – তীর ছুটল এঁটেল মাটির দেশ থেকে গঙ্গা পেরিয়ে আড়াআড়ি দক্ষিণ মুখে। গাঁথল গিয়ে বঙ্গোপসাগরের পারে বালিয়াড়ির দেশে। কোষ্ঠীবিচারের বালাই নেই, তবু অবাক হলাম। এপারে বাবা সমীর, আর ওপারে বাবা অমর। এপারে মা নদীর নামে কৃষ্ণা, তো ওপারে মা সাগরবেলায় বেলারানী। এপারে জেঠতুত খুড়তুতো মিলিয়ে দশ, ওদিকে ওরা একবাড়িতে নিজেরাই ছয়। রাঙামাথায় চিরুনি দিয়ে, আর একরাশ কৌতূহল নিয়ে মৈথুনা গ্রামের বালিয়াড়িতে পা রাখলাম। রসুলপুর নদী থেকে সুবর্ণরেখার পাড় অবধি চলেছে বালিয়াড়ির সারি। চেনা বাংলার অচেনা সেই নোনা বালির দেশে ওড়নার ফাঁক করে তাকালাম। প্রশস্ত উঠোনের এক পাশে খড়ের গাদা। অন‍্যধারে বেলনাকৃতি ধানের গোলা। মাথায় কুঁড়েঘরের মতো খড়ের চালা। বাঁপাশে গোয়াল ঘর, তাতে দু তিনটি গরু বাছুর রয়েছে। সামনে ডানদিকে দোতলা বাড়ি। ধানের গোলা আর গোয়াল ঘরের মাঝখানে গোপীনাথের মন্দির। তার উঁচু চূড়োয় গরুড়দেব বসে আছেন দুটি ডানা মেলে। আর চারিপাশে অজস্র গাছগাছালি। মন্দিরের দাওয়ায় শাশুড়ি কোলে বসিয়ে মধু খাইয়ে দিলেন। কিন্তু বরণডালা, দুধে আলতায় পা এসব কিছু হলনা। জ‍্যান্ত মাছ ধরতে হবেনা তো, মনে ভয় ছিল ভীষন, সেসব ও হলনা, বেঁচে গেলাম। বাড়িতে ওঠার সময়ে দেখলাম চওড়া ঢালা কাঠের এক চেয়ার, দুপাশে হাতল। তাতে বসে আছেন হাসিমুখে তিন বৃদ্ধ। মাঝের জনকে চিনি, আমার শ্বশুর বাবা। কিন্তু পাশের দুজন? পিঠোপিঠি এক ননদ আছে,  পরিচয় করিয়ে দিল। আমার কাকুর জায়গা ফাঁকা ছিল। এবার আমার কাকু হল। অখিল কাকু, শচীন কাকু।

অন্তরঙ্গ

শ্বশুর বাড়ি ঢুকে তো রৈরৈ, সকলে অনেক কিছু জানতে চায়। গাছে উঠতে পারি কিনা। পুকুরে সাঁতার দিতে পারি কিনা, ছিপে মাছ ধরতে পারি কিনা। মাছ কুটতে পারি কিনা। গ্রামে থাকতে পারব কিনা। আমি শুধু হাসি, আসলে কাজ কর্ম কিছুই পারিনা। দোষ দিতেও পারিনা। মহানগরিনী নায়িকা আর অজ গ্রামের নায়ক নিয়ে নাটকটা ফ্লপ হবে কিনা এনিয়ে অতিথি কেউ চিন্তিত হতেই পারেন। আমারও যে গ্রাম-যোগাযোগ আছে, সেটা তাঁদের অজানা। তবে দশকথার আটকথাই মাছ নিয়ে হচ্ছে। মাছ আমার প্রিয় নয়। ছোটবেলায় সেজ জ‍্যাঠামশাই অট্টহাসি হেসে বলতেন এ মেয়ের মেছোর ঘরে বিয়ে হবে। তা কি এমনভাবেই সত্যি হল! ভারি বিপন্ন হই। শুধু দশজোড়া চোখের বৃত্তের বাইরে সেই ঢালা চেয়ারে তিনজোড়া দৃষ্টি প্রসন্ন প্রশ্রয় দেন। ইশারায় কিছু কাজ হল কিনা বুঝিনি, শাশুড়ি একটানে উদ্ধার করে দোতলায় নিয়ে চলে গেলেন। সেযাত্রা স্বস্তি পেলাম।

নতুন দিন

ছিলাম সুন্দরবনের উত্তর দিশায়, ইছামতীর পাড়ে, বাংলাদেশের সাতক্ষীরার ধারে। এসে পড়লাম কর্ণ বরাবর উল্টো মুখে উড়িষ‍্যার পারে। রন্ধন আর ভাব প্রকাশের ভাষা, দুটি ব‍্যাকরণই অচেনা।
“হেথা গড়িয়ায় চান হয়, মাড়ায় মশারি,
দুর্গা পুজা ঘরে হয়, রথ বারোয়ারি।
কত রঙ্গ বঙ্গদেশে আহা বলিহারি।
প‍্যাকেট(র) মিষ্টি নিয়ে যাউচে ফটক
ট‍্যাংরায় কালিয়া হয়, রুই মাছে টক
জেনে নব বৌএর চক্ষু চড়ক।”

(গড়িয়া মানে পুকুর, মশারি মাড়ানো মানে মশারি তোষকের চারপাশে গুঁজে দেওয়া, ‘র’ হল অব‍্যয় – যার অর্থ থেকে)

বিয়ের চারদিনের দিন এক ঘটনা ঘটল। এখানে বাসি বিয়ে হয়না। চৌথী হয়। মানে চারদিনের দিন মন্দিরে আবার বিয়ে হয়। কিন্তু মুস্কিল অন্য জায়গায়। ঐদিন রাতে শাড়ির আঁচলে পাঁচটা ফল বেঁধে ঘুমোতে হয়। ভোরে পুকুরে ডুব দিয়ে বিয়ে সম্পন্ন হয়। ভোররাতে বর ঘুম থেকে ডেকে বলে, নিচে কলটানার আওয়াজ। মা উঠে পড়েছে। তুমি উঠে পড়। আমার আর হুঁশ নেই। চিরকাল রাতে পড়াশোনা করি, আমি লেট রাইজার। শেষে দরজায় ঠকঠক। নভেম্বরে বালির ঠান্ডা, হু হু করে কাঁপতে কাঁপতে খিল খুললাম। দেখি বাইরে মোটা শাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শাশুড়ি মা। পুকুরে নামা অভ‍্যেস নেই। এই ঠান্ডায় শাল জড়িয়ে…. বলির পাঁঠা হয়ে চললাম। সূর্য উঠতে এখনো দেরি। পুকুরের সামনে শাশুড়ি বললেন,   গাছের আড়ালে জামা বদলে নাও। বলে আমার পরনের শাড়িটা পুকুরে কেচে মেলে দিলেন। আর বললেন, চুপচাপ ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। কাউকে কিচ্ছু বলার দরকার নেই। আমার ওপরে যা চলেছে তা বৌয়ের ওপর হতে দেবনা। মনে ভাবি আড়বালিয়ায় যদি এমন হতো, জ‍্যাঠাইমারা বলতেন একটা দিন মানতে হয়। ওষুধ খেয়ে নেবে। মায়ের বুক ফাটলেও জ‍্যাঠাইমাদের ওপরে কথা বলতেন না। ছোট বেলায় হাঁপের টান উঠত আমার। এখনও পান থেকে চুন খসলে সর্দি কাশি। এসব না জেনেও, রীতি রেওয়াজ এক ফুঁয়ে উড়িয়ে আমার প্রাণ রক্ষা করলেন ইনি। নাহলে হাসপাতালের শয্যা অপেক্ষায় ছিল। চিরঋণী হয়ে গেলাম। দিন গেলে বুঝলাম গ্রাম‍্যতার মাঝে তিনি মূর্তিমতী বিদ্রোহিনী। একশো বছর আগে সেই যিনি আয়ার্ল‍্যান্ড থেকে এসে গুরু বিবেকানন্দের কথায় মেয়েদের ইস্কুল করেছিলেন, আমি সেই স্কুলের ছাত্রী। ফেমিনিস্ট চিনতে ভুল আমার হয়নি। ক্রমে এই গাঁয়ে মেয়েদের ইস্কুল খোলা, আরও নানা সমাজ সংস্কারে শাশুড়ি মায়ের অবদান জানলাম। যত চিনলাম মনের দিক থেকে ততই তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম। এও বুঝলাম, তাঁর মনের জোরের নৌকোর হাল বাঁধা আছে তিন খুঁটিতে। বাবা আর দুই কাকা। শহরে আমরা রোদ বেরোলেই ছাতা, সানগ্লাস, এয়ার কন্ডিশনার কতো আড়াল খুঁজি। আর এখানে গায়ে রোদ লাগানোর রীতি। ঢালা চেয়ারটা লোক দিয়ে উঠোনে বার করে, তিন বৃদ্ধ বসে থাকতেন আয়েশে। কাজ সেরে মা এসে বসতেন মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে। কখনো বা মাদুরে। গল্প গাছা কতকিছু হতো। দোতলা থেকে দেখি আর হাসি। মনে মনে নাম দিয়েছি “চার ইয়ার”। কাকারা যে রক্তের সম্পর্কের নন, তা আমি বহুদিন জানতাম না। ভাবতাম অন‍্য বাড়িতে থাকেন শুধু। জানার পর মনে ভাবি, সত্যিই তো।

“রক্তের মিল আর স্বার্থের অমিল।
চুম্বকের দুই মেরু, বড় গরমিল।।
পরস্পরকে টানে, তবু দ্বন্দ্ব-বর্গীয়।
সখ্যতা অমৃত বটে, তাই স্বর্গীয়।।”

সিঁড়ির যেমন ধাপ আছে, বন্ধুতার ও ক্রম আছে। সবচেয়ে ওপরে, এ বাড়িতে অমর-বেলা তো ওবাড়িতে শচীন-অখিল। পরের ধাপে, এ বাড়িতে বাপু-তপু তো ওবাড়িতে তুলু-পিপলু। দিন যায়। এ বাড়িতে রঞ্জা-কর্ণা, তো ওবাড়িতে সোহম, মাম্পি, ভোম্বল।

এবাড়িতে বাবা সবচাইতে মজার মানুষ। অষ্টপ্রহর তাঁর হা হা হাসিতে ঘর ভরে থাকে। অখিল কাকু খুব চুপচাপ, তিনি আমাদের লেভেলে তেমন মেশামেশি করেননা। শচীন কাকু তেমন না। প্রণাম করলে লাজুক হাসেন। আবার গল্প ও করেন। শুনতে পাই তিনি পণ্ডিত মানুষ। অনেক বই লেখেন। অনেক ইস্কুলে তাঁর লেখা বই পড়ানো হয়। তবে আমার চোখে তিনি লাজুক কিন্তু মিশুক, ভারি মিষ্টি একজন মানুষ।

দুর্গায় দুর্গতি

বিয়ের পর প্রথম দুর্গা পুজোয় এক গোল বাধল। যবে থেকে হাঁটতে শিখেছি, তবে থেকে বিয়ের বছর পর্যন্ত দুর্গাপুজোয় আমাদের বাঁধা রুটিন ছিল। ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী তিন দিন আলোয় আর পুজোর গানে ভাসা কলকাতায় বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঠাকুর দেখা, চপ, কাটলেট, ফুচকা যা পাওয়া যায় খাওয়া। নবমীতে সোজা সোদপুর – বড়মামার বাড়ি। ফিরে হাতিবাগানে নতুন কোন থিয়েটার দেখা। আর দশমীতে ভোরে উঠে আড়বালিয়ায়। সেখানে ছিল বিরাট আকর্ষণ। তিন মন্দিরের মাঠে মেলা, এলাকার যত দুর্গাঠাকুর আসত বরণ হবার জন্য। সব গ্রামের বৌরা আসত বরণডালা নিয়ে। সিঁদুর খেলা হত। এতকাল শুধু দেখেছি। এবারই প্রথম আমার এন্ট্রি পাবার কথা। বাড়ি ফিরে বেলপাতায় শ্রী শ্রী দুর্গা সহায় লেখা। সেই লেখার জন্য দুপুর থেকে প্রস্তুতি। কঞ্চির কলম কাটা, আলতা গুছিয়ে রাখা, লক্ষ্মীপুজোর জলচৌকি নামিয়ে সাজানো। অনেক কাজ। লেখা হয়ে গেলে, মূল আকর্ষণ ছিল বড়দের প্রণাম করে পার্বণী পাওয়া। শেষে ভাইবোনেরা বসে কার কত আয় হল, তার হিসেব কষা। অলিখিত নিয়ম ছিল, বিয়ে হয়ে গেলে সে আর পার্বণী পাবেনা। তাকে দিতে হবে। আমার বাবা সবার ছোট। তাই আমি ও দশজনের মধ্যে ছোটোর দিকে। আমার ওপরে সাতজন। গতবছর আমি হায়েস্ট পেয়েছিলাম। আমার নিচে, দুজন দুধেভাতে। তারা একটু কম পেয়েছিল। আসলে যখন যে হায়েস্টে ওঠে, তার পরে তার বিয়ে হয়ে যায়। ছোটোদের আর একটু লাভ বাড়ে। এবার আমি ডোনার হব। মনে মনে অনেক জাল বুনে রেখেছিলাম। বিজয়া পালন হতো ঘটা করে। স্পেশাল আইটেম ছিল মেজজ‍্যাঠাইমার মাংসের ঘুগনি। আমাদের এক এক বাড়িতে এক এক রকম মিষ্টির রকমারি বাহার থাকতো। বিজয়ার পরে কয়েকদিন সব বাড়িতে খেতে খেতে রাতে আর খেতে হতনা। আর অষ্টমী বাদে অন্তত দুদিন পাঁঠার মাংস হবেই। বাকি দিন চিকেন বা রুই কাতলা হত।

এবছর শুনলাম পঞ্চমীতেই চলে যাব শ্বশুর বাড়ি। ফিরব লক্ষ্মীপুজোর পর। সেখানে বাড়িতে পুজো। আড়বেলে যাবার কোনো গল্প নেই। যত জাল বুনেছিলাম, এক কোপে ফালাফালা। কলেজের এক রসিক প্রবীণ সহকর্মী বলেন, দুর্গাপুজো তো মেয়েদের বাপের বাড়ি যাবার উৎসব। তুমি উল্টো দিকে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছ, কলকাতা ছেড়ে পুজোয় প্রথমবার। পারবে তো? তাঁকে বলি, বাড়িতে তো পুজো হয়। আসলে বাড়ির পুজো সম্পর্কে আমার একটা ধারণা ছিল, সিনেমা আর উপন্যাসে যেমন হয়, অথবা অন্তত খবরের কাগজে যেমন পড়া যায়।

কিছু অন‍্য পাওয়া

প্রত‍্যাশা পূর্ণ হলনা। শ্বশুর বাড়ি গিয়ে দেখলাম, মন্দিরে নিত্য পূজার সাথে একপাশে ঘট পেতে, পিছনে একটা পট রেখে দুর্গাপুজো হচ্ছে। তিন দিন হবে। বৈষ্ণব মতে পুজো, তাই পুরোটাই নিরামিষ। ষষ্ঠীর বোধন আর দশমীতে বিসর্জন নেই, তাই বিজয়া পালন, কোলাকুলি, মিষ্টি মুখের পর্ব ও নেই। মৃন্ময়ী মা নেই। কোনোদিনই ছিলেন না। আমাদের বিয়ের এক বছর আগে, কষ্টি পাথরের গোপীনাথ, কয়েকশো বছরের পুরনো রাধা, অষ্ট ধাতুর অ্যান্টিক বৈষ্ণবী স্টাইলের দুর্গামূর্তি, মায় ঘন্টা কাঁসর, বাসন কোসন সব চুরি হয়ে গেছে। এখন নিমকাঠের মূর্তিতে গোপীনাথ রাধারানী পূজিত হচ্ছেন। দোষ লাগার নিদান হয়েছে, তাই ঘটে পুজো। শাক্ত দেবীর যে বৈষ্ণবমতে পুজো হতে পারে, এ বিষয়ে কোনো পূর্ব জ্ঞান ছিলনা আমার। বিয়ের সময়ে ডায়নামো আলো ছিল, ভিড় ছিল, কিছু বুঝিনি। অন্য সময় হলে হয়তো ভালো লাগত। দুর্গাষষ্ঠী, সপ্তমীতে মন্দিরের প্রদীপ, হারিকেনের টিমটিমে আলো, আর দেবদারু জঙ্গলের নিশ্ছিদ্র আঁধার আমাকে যেন গিলে খেতে এল। এবাড়ির ছেলে মেয়েরা লেখাপড়ার জন্য সব ছোট থেকে হোস্টেলে। পুজো হল ছুটিতে বাড়ি ফিরে আড্ডা দেওয়া, আরাম করা। আমার আটাশ বছরের ঝোড়ো দুর্গাপুজো নিম্নচাপের স্থির কেন্দ্রে এসে পড়ল। তার চেয়ে বেশি ভয়, বাকি পুজোগুলো ও এমন কাটবে। বাড়ির লোকে ছেলে বউ, মেয়ে জামাই বাড়ি আসাতে এতই মশগুল, মেজোবৌয়ের মনখারাপের খবর কারো কাছে পৌঁছলনা। রুমমেট যাঁর কাছে খবর পৌঁছতে পারত, তাঁর টিকি পাওয়া গেলোনা। তিনি বন্ধু বান্ধব নিয়ে ব‍্যস্ত রইলেন।

পঞ্চমীতে আসার পর আজ তিনদিন। খাঁচায় বন্দী পাখি হয়ে আনমনে বসেছিলাম। বিকেলে শচীন কাকু এলেন।
“কি বৌমা, কলকাতায় তো খুব ঘুরুথায়। এঠি কিছি নাই।”

“ঠাকুরের মুখ দেখা হয়নি কাকু”।

“এখানে দুটো পুজো তো হয়। মাইতি হাট আর রথতলা।”

“তাই নাকি?”

“তুমি বাপুকে (আমার বরকে) ধরো বৌমা। নতুন সংসার তো। এখনো ব‍্যাচেলরের মতো টো টো কোম্পানি করছে। একান্ত যদি না নেয়, আমাকে বোলো। আমি রথতলার প্রেসিডেন্ট। হাঁটতে পারো তো?”

“আচ্ছা। হ‍্যাঁ তা পারি। ….আজ আসুক, মজা দেখাচ্ছি”।

পরের সন্ধ‍্যেয় বাপু বন্ধুর বাইক ধার নিয়ে, আমাকে ঠাকুর দেখাতে বেরোলো। মাইতি হাট, রথতলা পেরিয়ে হিরাকনিয়া। পুজোর মেলা। বক্সিগঞ্জের হাটের মতো বেতের বোনা ধামা কুলো থেকে শীতের র‍্যাপার নক্সা কাটা; পিতলের বাসন থেকে লোহার ছুরি কাঁচি – খুব মজা হচ্ছিল। খুব ঝালঝাল মশলাদার ঘুগনি খেলাম, শালপাতায়, বলে দিলাম, পেঁয়াজ কুচি দেবেন না। এখানে এমন ঘুগনিকে বলে চটপটি। এগরোলের দোকান, মাংসের চপ, সবের দোকান বসেছে। ম‍্যারাপ বেঁধে, প্লাস্টিকের চেয়ার টেবিল পেতে অস্থায়ী রেস্তোরাঁ বসেছে কয়েকটা। সামনে দিয়ে হেঁটে গেলেই হাসিমুখ বেরিয়ে আসছে,

– কিরে, বাপু নাকি, বৌদি এসো এসো।
কর্তামশাই বললেন,
– আমার বন্ধুরা দোকান দিয়েছে। তোমাকে দেখে ডাকছে। যাবে নাকি?
– এখানে নিরামিষ আছে?
– নিরামিষ? নিরামিষ খাবে কেন?
– পুজো চলছে, তোমাদের পুজো তো নিরামিষ।
– সে তো বাড়িতে, বাইরে কিসের? অ, ঐজন‍্যে চটপটিতে পেঁয়াজ দিতে বারণ করলে?
– এ্যাঁ! বাইরে নিয়ম মানোনা?
– না।
– সে কি?
– একটা কথা বলে দিচ্ছি, শোনো। ঐতিহ্য মেনে চলতে চাইলে চলবে। কিন্তু নিজেকে সবসময়ে নিয়মের বেড়ি পরাবেনা। খুব বাজে জিনিস।
– কিন্তু এখানে আমিষ খেলে তো সবাই দেখবে। বাড়িতে বলে দেবে তো।
– সেতো বলবেই। আমি নতুন বৌ নিয়ে খেতে এসেছি, এটাই তো ওদের আনন্দ।
– কিন্তু মা যদি রাগ করে।
– মা! রাগ করবে? হাসালে দেখছি। তোমার এখানে প্রথম পুজো। পুজোর মেলা। তায় মোগলাই পরোটা আয় আয় করে ডাকছে। এখন মা যদি শোনে, আলুর চপ খাইয়েছি, তাহলে আমায় আস্ত রাখবে? কথার ছুরি দিয়ে কাটবে।
– কাকে? তোমায় না আমায়।
– তোমায়? আমায় কাটবে। মায়ের কাছে মেয়েরা হচ্ছে সব। ছেলেরা ফ‍্যালনা।
– তাই নাকি?
– হ‍্যাঁ, বড়দি, মেজদি অনেক বড়। আগে বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। ছোড়দি আর আমি পিঠোপিঠি। অন‍্যবাড়িতে দধির অগ্র ঘোলের শেষ সব ছেলেরা পায়। আমাদের বাড়িতে উল্টো। মানে মা উল্টে দিয়েছে। আগে এমন ছিলনা। মার তত্ত্বাবধানে সব ভালো অংশ ছোড়দি পেতো। তারপর আমি, তপু।
মনে ভাবি, ভারি আশ্চর্য মানুষ এই বেলারানী। যাই হোক। সেই মেলা – হোটেলে পেটপুরে মোগলাই পরোটা দিয়ে পেটপুজো হলো। পুজোয় নিরামিষ খেয়ে প্রাণপাখিটা কষ্টে ছিল, কিছুটাতো উপশম হলো। টেবিলে পরোটা দেবার সময়ে বন্ধুটি বললো,
– খেয়ে দেখো বৌদি, একেবারে স্পেশাল বানিয়েছি। কলকাতার থেকে আলাদা পাবেনা।

খেয়েও দেখলাম বেশ ভালো। কর্তা বললেন,
– এরা সব কলকাতার হোটেলে কাজ করে। বলেছিলাম না সেই অনাদি কেবিন, চৌরঙ্গী কেবিনের কথা। এমন হাজারো আছে। পুজোর ছুটিতে বাড়ি এসে দোকান দেয়।

কথাটা ঠিকই। ছেলেটি আমার সঙ্গে কলকাত্তাই বাংলা ভাষায় কথা বললো। এখানকার ওড়িয়া মেশানো বাংলা নয়। খাওয়া শেষ হলে ছেলেটি বললো,
– একটা পান দেবো বৌদি?
শুনেই কর্তা বলে উঠলেন,
– এ্যাই ভ‍্যাট। এ এসব পান ফান খায়না।
আমি চুপিচুপি বললাম, পুজোয় বেরিয়ে আমি তো পান খাই। কিন্তু কর্তা ইশারায় চুপ করতে বললেন। ওখান থেকে বেরিয়ে বললাম
– এটা কি হলো?
– কী কি হলো?
– পান খেতে দিলে না কেন?
– আরে তুমি কলকাতার রাস্তায় বেনারসী পান খাও। এসব এখানে পাওয়া যায়না। এখানে বরোজে বরোজে পান চাষ হয়। অভ‍্যেস না থাকলে, ঐ পান খেলে মুখ জিভ পুড়ে যাবে।
– ওঃ
– বেশি শখ হলে দেবো একটা জর্দা পান মুখে ঠুসে। এখুনি আঁ আঁ করে মাথা ঘুরে পড়বে।

মাথায় একটা চিন্তা আসে। আমার কলেজের এক সহকর্মিনী মেদিনীপুরে শ্বশুরবাড়ি শুনে বলেছিলেন,
“ঐ এক বিদ‍্যাসাগর।
বাকি সব মেসের চাকর।”

এ জেলার অনেক মানুষই দেখছি রন্ধনশিল্পী। কিন্তু বাকি জেলায় মেদিনীপুরকে নিয়ে দেখছি ভারি মাথাব‍্যথা। বললাম,
– তোমাদের বাড়ির তো কেউ পান খায়না। কিন্তু আশপাশের যাকেই দেখি বেশিরভাগই পচর পচর করে পান খেতে খেতে কথা বলে। হাসলেই ক্ষয়াটে লাল দাঁত দেখা যায়।
– মায়ের রুলের গুঁতোয় আমাদের বাড়ির কেউ পানদোষ করতে পারেনি।
হেসে উঠি। পানদোষ? তা অষ্টপ্রহর পান মুখে নিয়ে ক‍্যানসারের দিকে এগিয়ে যাওয়া দোষ বইকি।

বাইক এগিয়ে চলে। একটা মেলা থেকে আর একটা মেলা পর্যন্ত ছমছমে অন্ধকার পথ, না পুরো অন্ধকার নয়। আকাশে ফালি চাঁদ ছিল, পথের পাশে জোনাকি ছিল, ঝোপেঝাড়ে জ্বলজ্বলে চোখ ছিল। কি জানি, হয়তো শেয়ালের। কিছুটা পাকা, বেশিটাই কাঁচা রাস্তা। রথতলায় ম‍্যারাপ বেঁধে পুতুল নাচ হচ্ছে। হিরাকনিয়ায় বিরাট বটগাছ। মাইতিহাটের মেলা সবচেয়ে বড়।  শহরে ফিরে বলার মতো কিছু তো হল। আর কী? শচীন কাকু আমারও বন্ধু হয়ে গেলেন।

সংসার বহতা নদী

জীবন চলে গেল কুড়ি কুড়ি বছরের পার। চার ইয়ারের তিন ইয়ার অমর, বেলা, অখিল তিনজনই ছুটি নিয়েছেন। মেয়েরা বড় হয়ে মায়ের জায়গা নিয়েছে। সুবর্ণলতার দক্ষিণের বারান্দা হয়েছিল। আমারও দুর্গাদালান হয়েছে। মৃন্ময়ী মা আসেন। বাড়িতে কারেন্টের ভোল্টেজ বেড়েছে। তা সত্ত্বেও পুরো সময় জেনারেটর ভাড়া ক‍রা থাকে। সেই ঢালা চেয়ারটায় শচীন কাকু একাই বসে থাকেন। পুজোর আগে আমাদের গাড়িটা জিনিসপত্র নিয়ে যখন গ্রামের পথে ঢোকে, রথতলার মাঠ পেরোয়, খেয়াল করি কাকু বসে আছেন কিনা। বসে থাকলে নিশ্চিন্ত।

হঠাৎ চেনা দাঁড়িপাল্লা গুলো গোলমাল করে এল ভয়ানক উম্পুন ঝড়। আড়বেলে আর মৈথুনা দুটোই তছনছ। হিরাকনিয়ার বিরাট গাছটাও উপড়ে গেল। ঐ ঝড় কাকুর কাছে চিঠি দিয়েছিল। আমরা টের পাইনি। দিন পনেরোর মধ্যেই খবর পেলাম কাকু তাঁর কলমটি রেখে, বাকি তল্পিতল্পা নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন আকাশের ওপারে। আচ্ছা চেয়ারটা পাঠানো যাবে? বা মাদুরটা? চার ইয়ারের দল পূর্ণ হল। আচ্ছা থাক। যেখানে ওঁরা গেছেন, সেখানে আসন আছে। ঝড়বৃষ্টি কেটে গেলে, আকাশ ভরা তারা উঠবে। ভালো করে খুঁজলে চার ইয়ারের আড্ডা ঠিকই দেখতে পাব।

পুনশ্চঃ দুই বাড়ির ইয়ারানা আমার মধ্যে ও সংক্রামিত হয়েছে একটু একটু। যাক আবার ফিরে যাই সেই সংসার শুরুর দিনগুলোতে।

নতুন হেঁশেল

মনে ডালপালা মেলে পিছুটান
কানে আনকোরা হেঁশেলের গান।

বিয়ের পরে শাশুড়িকে একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলাম,
– আচ্ছা মা, যেদিন প্রথম তোমার সঙ্গে আমার দেখা হল, সেদিন তুমি কি করে নিশ্চিত ছিলে যে আমাদের বিয়ে হবেই, আমি তো নিশ্চিত ছিলাম না।
– আমি নিশ্চিত ছিলাম, তুমিই এবাড়ির বৌ হবে।
– কিন্তু কী করে, সেটাই তো জানতে চাইছি
– আমার মনের ভেতরে কেউ বলছিল।
– কিন্তু কেন বলছিল, কোনো কার্যকারণ তো থাকবে।
– হুঁ, কার্যকারণ ঠিক নয়, অন্য কথা। তুমি বিশ্বাস করবেনা।
– আচ্ছা, তুমি বলো তো। বিশ্বাস অবিশ্বাসের প্রশ্ন পরে হবে।
– ওসব বলতে গেলে এখন সাতকাহন খুলে বলতে হবে।
– সাতকাহন? তার মানে তো অনেক পুরোনো গল্প। বলো বলো। প্লিজ প্লিজ।
– এপরিবার এই ভিটেতে আছে, তা প্রায় তিনশো বছর হবে।
– আচ্ছা! তার আগে কোথায় ছিল? – – উড়িষ্যার রানীগুড়ায়, যদিও ওদিকটা বৃহত্তর বাংলারই অংশ ছিল তখন। বর্গী আক্রমণের সময়ে নিমাইচরণ এবং রূপচরণ দাসমহাপাত্র নামে দুই ভাই তাঁদের মামার বাড়ির ভিটেতে বসবাস শুরু করেন। দাদুর পুত্র ছিলনা বা মৃত্যু হয়েছিল – কিছু একটা হয়ে থাকবে। সেই থেকে এই পরিবার এই ভিটেতেই আছে।
– ভালো কথা তার সঙ্গে আমাদের বিয়ের কী সম্পর্ক?
– নিমাই এবং রূপ বৈষ্ণব ছিলেন। তাঁরা এই ভিটেতে গোপীনাথ আর রাধারাণীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
– বৈষ্ণব? একটা কথা জানো মা, এখন আমি যে হাওড়া আন্দুলের কলেজে পড়াই, সেই নামের একটা ইতিহাস আছে। চৈতন্যদেবের প্রভাবে নামসংকীর্তন, ভক্তদের ধুলোয় গড়াগড়ি এইসব ঘটনার প্রভাবে ঐ জায়গাকে সকলে আনন্দ ধূল নামে ডাকতে থাকে। আনন্দ ধূল কালক্রমে লোকমুখে আঁদুল হয়ে যায়। তারপর ইংরেজি বানানের প্রভাবে হয় আন্দুল। একথা কলেজে চাকরি পাবার পরে প্রথম বলেছিলেন আমার বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের স‍্যার সুভাষচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। তারপর ঐ সংক্রান্ত আরও অনেক কাহিনী শুনেছি আন্দুলে। সরস্বতী নদী যেখানে ভাগীরথী-হুগলীতে মেশে সেখানে শঙ্খরোল করে মেয়েরা চৈতন‍্যকে বাংলা থেকে বিদায় জানান। ঐ জায়গার নাম হয়ে যায় শাঁখরাইল। পরে আবার ইংরেজি বানানের অনুসরণে লোকে সাঁকরাইল বলে। ধূলাগড়ি বলেও একটা জায়গা আছে। সরস্বতী নদীর যে পাড়ে আমাদের কলেজ, সেদিকটা বৈষ্ণব অধ‍্যুষিত। আর ওপাশটা শাক্তদের। আমাদের কলেজের বিল্ডিংয়ের ভিত খুঁড়তে গিয়ে বসা অবস্থায় কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল। বৈষ্ণবেরা নিজের জমিতে ধ‍্যানাসনে মৃতদেহ সমাধি দেয়। পোড়ায়না।
– আমাদের পরিবারেও মৃতদেহ দাহ হয় নিজের জমিতে। জায়গাটাকে সমাধি বলা হয়।
– তাই নাকি, পূর্ব পুরুষদের সমাধি আছে এখানে? কোনদিকে? আমাকে দেখাবে।
– হ‍্যাঁ বাপুকে (আমার বর) বোলো, নিয়ে যাবে।
– আচ্ছা, তারপর বলো।
– রূপচরণ সন্ন্যাসী হয়ে চলে যান। তাঁর কথা আর জানা যায়নি। নিমাইচরণের ছেলে জগদ্বন্ধু, নাতি সন্তোষ। তাঁর ছেলে গোবিন্দ প্রসাদ, আমার দাদা শ্বশুর। এই সন্তোষ ছিলেন গড় কৃষ্ণনগরের জমিদারের নায়েব বা বক্সি।
– আচ্ছা, সেইজন‍্যই সকলে বলে বক্সিবাড়ির বৌ দেখতে এসেছি।
– হ‍্যাঁ, সেই থেকে লোকমুখে বক্সিবাড়ি হয়ে গেছে। পূর্বপুরুষেরা গ্রামে যে বাজার বসিয়েছিলেন, তার নাম এখনও বক্সিবাজার।
– গড় কৃষ্ণনগর মানে? নদীয়ায়?
– না না, এটা মেদিনীপুরের পুরোনো হিজলীর নবাব বা রাজার অধস্তন মহাল।
– এই যে পরপর ছেলেদের নাম বলছো, সব এক ছেলে? বাকি কেউ নেই?
– মেয়েরা ছিল। তবে সব একটা করেই ছেলে ছিল। শুনেছি এই সন্তোষের এক কাকা জন্মেছিলেন – অপর্তি, কিন্তু তাঁর কোনো সন্তানাদি হয়নি। অল্পবয়সে মারা যান। সন্তোষের সময় থেকে এই পরিবারের প্রভাব প্রতিপত্তি খুব বেড়ে যায়। কিন্তু পুত্র জন্মায়না। তখন গোবিন্দের কাছে মানত করে পুত্র হলো। সন্তোষ নাম রাখলেন গোবিন্দ প্রসাদ। গোবিন্দ প্রসাদও যোগ্য সন্তান হয়ে সন্তোষের সময়কার প্রতিপত্তি ধরে রেখেছিলেন। গোবিন্দ প্রসাদের স্ত্রী মানে আমার দিদি শাশুড়ির নাম ছিল শারদা।
– কি!!! তালব‍্য শ য়ে শারদা? আমার মতোন?
– হ‍্যাঁ, তোমার চার পুরুষ আগেও এ বাড়ির বৌয়ের নাম ছিল শারদা।
– দেখো মা, এক নাম হতেই পারে। সেটা কিছু নয়, তবে বাঙালি বাড়িতে ঐ এক সারদামণি মা। মেয়েদের নাম চট করে সারদা বা শারদা রাখা হয়না। তাই এটা একটু অদ্ভুত, তা সত্যি।
– আরও একটা কথা আছে। আমার ছেলে, মানে তোমার বর যখন জন্মায়, তখন অনেক দিন অসুস্থ ছিল, অনেক চিকিৎসা করতে হয়েছে। তখন রোজ গোপীনাথের কাছে ওর নামে তুলসী দেওয়া হতো। সুস্থ করে বাড়ি ফেরার পর, ছেলের নাম রাখা হল তুলসী প্রসাদ। গোবিন্দ প্রসাদের স্ত্রীর নাম শারদা ছিল, তারপর বাপু এসে বললো ওর বান্ধবীর নাম শারদা, বিয়ে করতে চায়। আমার আর কোনো ছেলের নামে তো প্রসাদ নেই। দুজনের জীবনই কৃষ্ণের ইচ্ছায়। আমার বিশ্বাস হলো এ গোপীনাথেরই ইঙ্গিত। এ মেয়েই এ বাড়ির বৌ হবে। তাই আমি নিশ্চিত ছিলাম। এর পিছনে তোমার কথা মতো কার্যকারণ তো আছে, তবে কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই। তাই বলে কি হবে? আমার বিশ্বাস আমার কাছে।
– হুম, গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং। আগের শারদা কেমন ছিলেন?
– উনি একশো কুড়ি বছর বেঁচেছিলেন।
– এ্যাঁ!! তখন অত জন্মদিন তো কেউ জানতোনা। তুমি নিশ্চিত একশো কুড়ি?
– তিনিও বৌ, আমিও বৌ। অন্য বাড়ি থেকে এসেছি। ওনার জন্মের খবর তো বলতে পারবোনা। তবে আমি ওনাকে দেখেছি। ওনার মৃত্যুর সময়ে সকলে বলেছিল একশো কুড়ি বছর, তাই শুনেছি। হয়তো নির্ভুল নয়, তবু একশোর ওপর তো নিশ্চয়ই।
– আর দাদাশ্বশুর, গোবিন্দ প্রসাদ?
– না তাঁকে দেখিনি। তিনি বহুদিন আগে মারা গেছেন। তখন বৌয়েরা বয়সে বরের থেকে অনেক ছোটো হতো। তাই বৌরা প্রায়ই অল্পবয়সে বিধবা হতো। ইনিও তাই। তবে একটা কথা শুনেছি আমার শাশুড়ির মুখে।
– তোমার শাশুড়ির নাম কি?
– মোক্ষদা।
– শারদা আর মোক্ষদা, মানে শাশুড়ি বৌমা এক পরিবারের মেয়ে।
– তাই নাকি? আচ্ছা মোক্ষদার গল্পে পরে আসছি। ওনার মুখে কি শুনেছিলে?
– শুনেছিলাম গোবিন্দ প্রসাদ মৃত্যুর আগে যুবতী বধূকে বলেছিলেন, কাঁদুচু কেনি? বছর প্রতিদিনর জন্য দুই একরর ধান্অ তো রখি দৌউচু। এ্যাতে চলবুনি? মানে কাঁদছো কেন? বছরের প্রতিটা দিনের জন্য দু একরের ধান তো রেখে যাচ্ছি। এতে চলবেনা?
– বছরের প্রতিটা দিনের জন্য দু একরের ধান? মানে সাতশো তিরিশ একর ধানজমি?
শাশুড়িমা হেসে উঠলেন।
– এখন সাত একরও নেই।
– সে যাক গে, ঐ শারদার কথা বলো। কি করতো, কি খেতে ভালোবাসতো?
– আমি বৌ হয়ে এসে দেখেছি, ও বুড়ি চাকুন্দা শাকের ভাজা আর পান্তাভাত খেতে ভালোবাসতো। চাকুন্দা শাকের টক ও খেতো খুব।
– চাকুন্দা শাক? কোনোদিন শুনিনি। তোমরাও খাও? তুলসী খায়? আমার কিন্তু এসব খাওয়া বা রান্নার কোনো ধারণা নেই।
শাশুড়ি খিলখিলিয়ে হেসে উঠে আমার গাল টিপে দিয়ে ছড়া কাটলেন –
মা রানছি লা – উ
পাতের তলায় থা – উ।
বৌ রানছি লা – উ
গাউল গাউল খা – উ।
তুমি যা করবে পোড়া ভাত, আলুনি তরকারি, আমার ছেলে তাই খাবে। আর তুমি একা সব করবেই বা কেন?  দুজনে চাকরি করো। ঘরের কাজও তো দুজনকেই করতে হবে।
আমি হেসে বললাম,
– তা ঠিক। তবে ঐ চাকুন্দা শাকটা ভাজা, টক এসব কিকরে করে, একটু বলে দাও তো। কানে শুনলাম যখন, জানতে তো হবেই।
– চাকুন্দা একটা শাক, যাতে হলুদ রঙের ফুল ফোটে। আমার তো সাতজন পিসশাশুড়ি ছিলেন। মানে শারদার এক ছেলে, সাত মেয়ে। তার মধ‍্যে সেজ মেয়ে ত্রিবেণী কাছাকাছি থাকতো। সেই ঐ চাকুন্দা যোগাড় করে, রান্না করে আনতো। আমাদের এখানে সাধারণত রসুন দিয়ে শাক ভাজা হয়। তবে পেঁয়াজ দিয়ে, কাঁচা কাজুবাদাম দিয়েও ভাজা হয়। এই শাকটা ভাজার নিয়ম আলাদা। পাঁচফোড়ন, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে ভাজতে হয়। শেষে নারকেল কোরা ছড়িয়ে নামানো হয়।
– কাঁচা কাজু? কাজুবাদাম দিয়ে শাকভাজা? না মানে পোলাও, ফ্রায়েড রাইস, এইসব রইসি রান্নায় যা কালেভদ্রে হয়, তাতে কাজু পড়ে। শাকভাজার মতো রোজকার সাধারণ রান্নায় কাজু?
– হ‍্যাঁ, এটা তো কাজুর জায়গা। আমাদের বাড়িতেও এককালে কাজুচাষ হতো। তাই এ অঞ্চলে রোজকার বা নেমন্তন্ন – সব রান্নাতেই কাজু দেওয়ার চল আছে। গিমাতেও কাজু পড়ে।
– গিমা? সেটা আবার কি?
– ও একরকমের শাক, তেতো স্বাদের।
– ও. কে। ওটা পরে হবে, ওয়ান বাই ওয়ান। চাকুন্দার টকটা বলো কিভাবে হয়।
– এ টকটা আমসি দিয়ে হয়। বাড়িতে মাটির হাঁড়িতে আমসি করা থাকে।
– ওরে বাবা! আমসিটা তবে গিমার পরে হবে। টকটা বলো। এটাও কি গিমার মতো তেতো?
– না না। এটা মিষ্টি শাক। তাই অনেক সময়েই এই গাছে পোকা হয়। তাই খুব ভালো করে পোকা বেছে নিতে হয়। চাকুন্দার টকে আলু পড়েনা। কুমড়ো, ঢেঁড়স আর বেগুন ছোটো ছোটো টুকরো করে কেটে নিতে হবে। এবারে সর্ষে ফোড়ন, কাঁচা লঙ্কা দিয়ে আনাজগুলো হাল্কা ভেজে নেওয়া হবে। আনাজের সঙ্গে শাকের ঐ হলুদ ফুল ও একসঙ্গে ভাজা হবে। তারপর জল দিয়ে সর্ষেবাটা আর আমসি দিয়ে কিছুক্ষণ ঝোলটা ফুটবে। তবে ঝোল বেশি থাকবেনা, একটু মাখা মাখা হবে।
– আচ্ছা শুনে তো বেশ সুস্বাদু মনে হচ্ছে।
– কথায় কথায় অনেক বেলা হলো। তুমি এবার চান করে নাও। জানকীকে বলে দিয়েছি, বালতিতে তোমার চানের জল তুলে দেবে।

এ বাড়িতে দুটো নলকূপ আছে আর মোট আটটা পুকুর। খিড়কি পুকুরে মেয়েরা আর ছেলেরা চান করে, যদিও আলাদা সময়ে। সদর পুকুরে চান করতে আসে বাইরের মানুষেরা। মন্দিরের পুকুরে আর রান্নাঘরের পুকুরে কেউ চান করেনা। কারণ চারিপাশে ঝুঁকে পড়া দেবদারু, কেয়াঝোপ, তেঁতুলের ঝুরি মিলে ও দুটো ছায়া হয়ে আছে। রোদ্দুর পড়েনা। বাকি তিনটে পুকুর ভিটেতেই, তবে বড় জঙ্গল। কাঁটা বাঁচিয়ে পায়ে চলা পথ ধরে এগোতে হয়। ওদিকে সমাধিগুলি আছে আর কিছু সব্জি চাষ হয়। কেবল একটা পুকুর আছে ধানমাঠে। কিন্তু আমি তো পুকুরে চান করতে পারিনা। যদিও ইচ্ছে আছে ষোলোআনা। কিন্তু করবোটা কি? আমি যে সাঁতার জানিনা। তাই নলকূপের তোলা জল নিয়ে চানঘরে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। দুটো নলকূপের একটা বড় রান্নাঘরের মাঝখানে। আর একটা ছোটো রান্নাঘরের সামনে। বড় রান্নাঘরের নক্সাটা অদ্ভুত। আমাদের আড়বালিয়ার দিকে অমন হয়না। এই নক্সাটার একটা নাম আছে – চৌঘেরা। নলকূপ ঘিরে চার দিকে চৌকো দালান। দালানে টালির চাল আর মাঝখানে নলকূপের মাথা ফাঁকা। সেখান থেকে আলো আসে। একদিকের দালানে উনুন করা। সেদিকে রান্না হয়। একদিকে বাসন, মশলা আর আনাজ থাকে। একদিকে আসন পেতে লম্বা সারিতে খাওয়া দাওয়া। আর বাকি দিকটায় টেবিল চেয়ার পাতা। যাদের হাঁটু মুড়ে বাবু হয়ে বসা অসুবিধে, তাদের জন‍্যে। ঐ দিকেই দেয়ালের পাশে রান্নার গ‍্যাসের টেবিল আছে। ছোটো রান্নাঘরটা ছিটে বেড়ার, মাথায় খোড়ো চাল, বাড়ির বাইরের দিকে আছে। ভিতরে জ্বালানি কাঠ শুকোনো থাকে। এই রান্নাঘরের দাওয়ায় উনুন করা আছে। শীতকালে রোদে বসে রাঁধুনিরা এখানে রান্না করে।

ঐ রান্নাঘরে প্রবেশ কিন্তু আমার পক্ষে সহজ হলোনা। আসলে ছটা ছেলেমেয়ে আর তাদের পরিবার সারাবছর কেউ তো পাশে থাকেনা। উৎসবে বা দরকারে আসে। এদিকে বক্সি বাড়ির দালানে শ্বশুর মশাইয়ের আড্ডার মজলিস চলতেই থাকে। আর বাড়িতে কেউ এলে অভুক্ত ফেরেনা। এটাই এ বাড়ির নিয়ম। তাই সংখ্যা ঠিক থাকেনা দুপুরে কজন খাবে। শাশুড়ি মায়ের বয়স হয়েছে। অনেক কাল এই জোয়াল টেনেছেন। নিজের মুখের খাবার হঠাৎ আসা অতিথির মুখে ধরেছেন। কিন্তু এখন আর পারেননা। বাবাও পঁচাত্তর পেরিয়েছেন। সময়ে ভাত দিতে হয়। সারা বছর তাই এতোবড়ো হেঁশেল ঠেলতে, কুটনো, বাটনা সামলাতে গোটা চারেক মাইনে করা তত্ত্বাবধায়ক লাগেই। তার ওপরে মন্দিরের আলাদা রান্নাঘর। সেখানে আবার গোপীনাথের নিত‍্যভোগ হয়। এলাকার গরীব মানুষের দুপুরের ভরসা এই মন্দির। গত তিনশো বছর এমনই চলছে। দুই হেঁশেল মিলিয়ে তত্ত্বাবধায়ক হলো ছয়। তাদের ছানাপোনারা তো আছেই। তাদের পরিবারের লোকও হয়তো ডাব পাড়ে, জঙ্গল পরিষ্কার করে। দুপুরে তাদের পাতও পড়ে। সারাদিন গ‍্যাসে চায়ের জল ফুটছে। আর হাঁ হাঁ করে উনুন জ্বলছে। বিরাট লোহার কড়া। সেই রকম বড় খুন্তি। কড়ায় দুপাশে আংটা লাগানো। খুন্তির হাতলটা দুটো আংটার মধ্যে ঢুকিয়ে কায়দা করে ঐ ভারী কড়া নামাতে হয়। সাঁড়াশির ব‍্যবহার এই রাঁধুনিদের জানা নেই। রান্নাঘরেও সাঁড়াশি নেই। খুন্তি নাড়ার সময়ে কড়া ধরতে হলে, কাপড় দিয়ে আংটা ধরে কাজ করতে হয়। যেহেতু আংটাওলা কড়া, তাই তরকারি চাপা দিতে হলে, টপাস করে কড়ার চেয়ে ছোটো মাপের কাঁসি দিয়ে ওরা চাপা দিয়ে দেয়। তারপরে তোলার সময়ে খুন্তি দিয়ে ঠেলে তুলে দেয়। কিন্তু ওটা কাত হবার সময়ে কাঁসির অন‍্য ধারটা ঝোলে ডুবে যায়। গোল গোল চোখ করে দেখলাম, তরকারি চাপা কাঁসিটা মেঝে থেকে তুলেই ওরা চাপা দিচ্ছে। ধুয়ে নিচ্ছে না। আর বালিয়াড়ির ওপরে ঘর। ঝাঁট মোছ করার একটু পরেই আবার বালিতে বালি হয়ে যায়। কাজেই তরকারি চাপা কাঁসি থেকে রান্নায় বালি ঢোকার সম্ভাবনা প্রবল। হতে পারে  তোলা জলে কাজ। সেজন্য ধুয়ে নেওয়ার সমস্যা। সেতো আমাদের আড়বেলেতেও তাই ছিল। কিন্তু সেখানে মা, জ‍্যাঠাইমারা নিজে হাতে কাজ করতো। সাহায‍্যকারিণীরা থাকতো, তবে এভাবে পুরোটা তাদের হাতে ছিলনা। সব মিলিয়ে এই রান্নাঘর একেবারেই আলাদা। আমার বাপের বাড়ির অভিজ্ঞতার সঙ্গে একেবারেই মেলেনা।

শ্বশুরবাড়ি যখন যেতাম, সকালবেলা শাশুড়ি মা আমার জন্য মৌরিবাটা সরবৎ নিয়ে আসতেন। ভেজা নোনা হাওয়া আর সকালের মিঠে আলোয় বসে ঐ সরবৎটা খেতে খুব ভালো লাগতো আমার। শাশুড়ি  বলতেন, সারা সপ্তাহ কলেজ করো, সরবৎ খেলে শরীর ঠান্ডা হবে। আমার বাপের বাড়িতে, রাতে মৌরি, মিছরি ভেজানো জল সকালে খেয়েছি কখনও, বিশেষ করে পরীক্ষার সময়ে। কিন্তু এমন মৌরিবাটা সরবৎ ওখানে হতোনা। সকালে এক একদিন এক একরকম জলখাবার হতো। কিন্তু যেদিন লুচি হতো, সেদিন আমার একটু কষ্ট হতো। ময়দা দিয়ে লুচি হতো, অথচ সাদা, ফুলকো নয়। একেবারে লাল, মোটা বোগড়া লুচি, তায় প্রায় পাঁপড়। আমি তো সমানে সন্ধান করতে লাগলাম, ময়দা দিয়ে এমন জিনিস হচ্ছে কিভাবে? তারপর উদ্ধার করলাম, এরা অনেকটা চিনি মিশিয়ে ময়দা মাখে। আর ময়ানের অনুপাতও ঠিক হয়না। বড় বড় লেচি কেটে ছোটো বেলে। সব মিলিয়ে কেলেঙ্কারি হয়ে যায়। লোকসংখ্যা বেশি। পাতলা ফুলকো হলে লুচি টানবে বেশি, সেজন্য করে কিনা জানিনা। তবে অন‍্যরকম বললেও, ওদের জানা নিয়ম থেকে ওরা কিছুতেই বেরোতে চায়না।

তবে জাউ হলে দারুণ আনন্দ হতো। ব‍্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলতে হবে। শীতের সকালে একদিন ঘুম থেকে উঠে শুনি, খুব হৈ হৈ হচ্ছে। সবাই খড়ের গাদার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তড়বড়িয়ে খড়ের গাদাটা কাছ থেকে দেখতে গেলাম। দেখি খড়ের গায়ে অনেক সাদা সাদা ব‍্যাঙের ছাতা ফুটে আছে, ঠিক যেন খড়ের ফুল। আর মাটির কাছের ছাতাগুলো লালচে। এগুলো দেখে সবাই আনন্দ করছে। এবার আমার সঙ্গে কর্তার যা কথোপকথন হলো তা এইরকম –

– এগুলো কী?
– ছাতু ফুটেছে, খড় ছাতু।
– মানে? মাশরুম?
– হ‍্যাঁ, দারুণ খেতে। মাংসের মতো মাকে বলবো আজ সকালে জাউ করতে।
– ঝাউ করা কী?
– আরে দূর! ঝাউ নয় জাউ। খেলে বুঝবে।

সেদিন সকালের জলখাবারে খেলাম গরম গরম জাউ আর খড়ছাতু ভাজা। সত‍্যিই দারুণ। জাউ আর কিছুই নয়। সেদ্ধ চালের খুদ দিয়ে তৈরি ফ‍্যান ভাত, কিন্তু নুন আর অনেকটা নারকেল কোরা দিয়ে ফোটানো। আতপ চালেও হয়। তবে সেদ্ধ চালে মাড় ঘন হয় তাই ভালো লাগে। এক কাপ খুদের চাল ফুটে গেলে, তাতে এক মালা নারকেল কোরা দিয়ে নামাতে হবে। পাতে ঘি বা মাখন দিয়ে খেলে আরো ভালো লাগবে। সঙ্গে এক গোলা আলুভাতে। তবে এখানে আলুভাতে বলা হয়না। বলে আলু মাখা। পেঁয়াজ আর শুকনো লঙ্কা ভেজে চটকে আলুর সঙ্গে মাখা হয়। এর সঙ্গে এক পাশে দিয়ে গেল ছাতু ভাজা। মুখে দিতে চমকে গেলাম। এমন স্বাদ পাইনি আগে। সত‍্যি সত্যিই মাংস ভাজার মতো মনে হচ্ছে। আজ এতো বছর পরে, ধানের গোলা আর নেই। তাই খড়ের গাদাও স্মৃতির মধ‍্যে লুকিয়ে পড়েছে। তবে এখনও পুজোয় সকলে বাড়ি আসে। দশমীতে দর্পণে শরৎশশীর বিসর্জনের পর নিরামিষের পর্ব চুকলে, বক্সি বাজারে লোক পাঠানো হয়। সেদিন বাজারে যত খড়ছাতু ওঠে, পুরোটাই কিনে নেওয়া হয়। বাড়ির সকলেই এমনকি ছোটোরাও ছাতু বলতে অজ্ঞান। আমিও শিখে গেছি ছাতুর আইটেম – ভাজা, চচ্চড়ি, টক – এগুলো রাঁধতে। তবে এখন এটা আমি স‍্যালাড, ফ্রায়েড রাইস সবেতেই মেশাই। খড়ছাতুগুলো বোঁটা ছাড়িয়ে একটা পাত্রে জলে ভিজিয়ে দিতে হবে। ভালো করে চটকে ধুয়ে নিলে একটা লালচে জল বেরিয়ে যাবে। তারপর আলতো হাতে ওপরের আঁশ বা খোসা ছাড়িয়ে নিতে হবে। বৃষ্টি হলে বা ভেজা আবহাওয়া হলে সাদা ছাতুগুলোয় লালচে ছাল ধরে। খড়ের গাদায় নিচের দিকে ভেজা ভেজা থাকে বলে ছাতু লালচে হয়ে যায়। ঐ লাল ছাল অবশ্যই তুলে ফেলতে হবে। ছাল থাকলে স্বাদটা কষা লাগে। আঁশ ছাড়িয়ে, জলটা হাতে চেপে চেপে ঝরিয়ে নিতে হবে। এবারে বঁটিতে বা ছুরিতে এগুলো একেবারে কুচি কুচি করে কেটে নিতে হবে। এবারে ঝিরিঝিরি করে কাটা পেঁয়াজ ভাজতে হবে। অর্ধেক ভাজা হলে মাশরুম কুচি দিয়ে খুব ভালো করে পেঁয়াজের সঙ্গে ভাজাভাজা করতে হবে। স্বাদমতো নুন পড়বে। ইচ্ছে হলে কাঁচা লঙ্কা কুচো মেশানো যায় বা শুকনো লঙ্কা পুড়িয়ে চটকে চিলি ফ্লেক্স বানিয়েও মেশানো যায় – যার যেমন ইচ্ছে। মাশরুম ভাজার সঙ্গে ঝিরিঝিরি আলু আর বেগুন দিয়ে নাড়লে, ওটাই চচ্চড়ি হয়ে যাবে। আর খড়ছাতুর টক বানাতে হলে, পেঁয়াজ পড়বেনা। গোটা কালো সর্ষে আর কাঁচা লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে মাশরুম ভেজে নিতে হবে। এখানে কিন্তু ছাতুটা হাল্কা করে ভাজতে হবে। নুন, হলুদ স্বাদমতো দিতে হবে। সর্ষে বাটার জলে আমসি চটকে নিয়ে জলটা কড়ায় ঢেলে দিতে হবে। ফুটিয়ে নিয়ে ঝোল ঝোল নামিয়ে নিতে হবে। শ্বশুর বাড়িতেই আমি মিষ্টি বাদ দিয়ে নোনতা টক খেতে শিখলাম।

ওহ, মাই ক্রন, কলকাতা গন

ড. শারদা মন্ডল

কোভিড প‍্যানডেমিকের এক শীতকাতুরে সন্ধেবেলায় তৃতীয় ঢেউ আমায় ভাসিয়ে নিয়ে গেল। কখন ভেসেছিলাম বুঝিনি। পারে যখন উঠলাম, সারা গায়ে অদৃশ‍্যপূর্ব এক মেদুর ব‍্যথা, মাথায় শিরা দপদপ, গলার কাছটা এমন ঘন, ঢোঁক গেলা দুস্তর। খবর হতেই পরীক্ষাগারের পাইক এসে হাজির হল, আর চব্বিশ ঘন্টার মধ‍্যে চিঠি এল যে পাশ করেছি। সরকার মুঠোফোনে এখনকার মতো শংসাপত্র দিলেন, পরে হয়তো চ‍্যালেঞ্জ কাপ বা মেডেল ও আসতে পারে। বাড়িতে সাজো সাজো রব পড়ল, ঘটি বাটি, চাদর কাঁথা সমেত পড়ার ঘরে নতুন আশ্রয় মিলল। একটি রজনী একেলা পেরোতে না পেরোতে, সহোদরা ও পাকশালের সহকারিনীটিও সঙ্গী হলেন। দ্বিতীয় ঢেউয়ে আমরা তিনজন ছিলাম করোনা সেনানী। কর্তা আর কন‍্যা ছিলেন করোনা জয়ী। আত্মীয় বন্ধুরা মুঠোফোনে অভিনন্দন জানাতে লাগলেন, আর কটা দিন পরেই, তোরাও করোনা জয়ীর পুরষ্কার পাবি।

সবই ভালোই চলছিল। কিন্তু একটাই মুশকিল, এবারে পাকশালায় কে?
কর্তা ভরসা যোগালেন, তিনি একাই একশো,  বাকি চারজনকে সহজেই রান্না করে খাওয়াতে পারবেন। বাড়িতে এখন তিন জনের করোনা পল্টন, দুজনের রক্ষা পল্টন। আমি অবস্থা আন্দাজ করে প্রস্তাব দিয়েছিলাম রক্ষা পল্টন ঘরে আইসোলেশনে থাক। আমরা যা পারি রান্না করবো। সে প্রস্তাব বিরাট হম্বিতম্বিতে নাকচ হয়ে গেল।

সকালে ঘুমের মধ‍্যে একটা যেন আর্ত চিৎকার শুনতে পেয়েছিলাম, “চাল কোথায় চাল?” তার পর আর জানিনা। একটু বেলা করে উঠে শুনি “আলুর তরকারি করে রেখেছি, এখনো বলো পাঁউরুটি করবো কিনা”। টলে টলে দাঁত মেজে দেখি ভাত উনুনে পুড়ছে। রক্ষা পল্টনের কর্তা ফোনে ব‍্যস্ত। রান্নার মেয়েটি তীরবেগে বেরিয়ে একবাটি মুড়ি ঢেলে নিয়ে ঘরে চলে গেল।

ভাত পুড়ে গেছে শুনে নার্ভাসনেসে কর্তার এমন বেগ এসে গেল, লুঙ্গি নষ্ট হবার যোগাড়। তিনি পোস্ট কোভিডে আছেন, এমনিতে জন্ম পেটরোগা, এখন সমস‍্যা তীব্র হয়েছে। কর্তা বাথরুমে আশ্রয় নিতে, অগত‍্যা আমাকেই মাঠে নামতে হল। সয়াবিন দিয়ে ডালিয়া করে নিজে আর বাকি রোগীদের দিলাম। পরে শুনলাম, সকালে চাল চাল চীৎকার শুনে রান্নার মেয়েটি ভেবেছিল দাদা সকালে চাউ রান্না করে খাওয়াবে। দা়ঁত মেজে ঘরে অপেক্ষা করছিল। যখন বুঝল সে হবার নয়, অভিমানে মুড়ি খেয়ে নিয়েছে।

এবারে আমি ঐ রান্নার মেয়ে মিঠুকে বললাম আমি ডাল চাপাচ্ছি, তুমি মাছের ঝোলের আনাজ কাটো। ডাল, ঝোল, চচ্চড়ি রান্না করে চান করে দেখছি আমার ব্রহ্মাণ্ড ঘুরছে, প্রচন্ড শরীর খারাপ লাগছে। চিঁ চিঁ করতে করতে বললাম, ওগো, আমায় একটু ভাত বেড়ে দাও। বন্ধ ঘরের ওপাশ থেকে আওয়াজ এল, দাঁড়াও দাঁড়াও দরকারি ফোন করছি। তখন আমি মরতে মরতে নিজে বেড়ে খেলাম, বাকিরা খেলো। তারপর সকলে যে যার শুয়ে আছি। তিনটের সময়ে কর্তার গলার আওয়াজ পেলাম, মেয়েকে বলছে,

– হ‍্যাঁ রে করোনা পার্টি চান করেছে?

মেয়ের ছোট্ট উত্তর – হ‍্যাঁ। সে এখন অনলাইন ক্লাস করছে।

– বাবা, খাওয়াদাওয়ার কোনো চাড় নেই। আমি আর কী করব।

– সবার খাওয়া হয়ে গেছে।

– উরি শ্লা সবাই কাজ সেরে শুয়ে পড়েছে? তাহলে আমার তো আর কিছু করার নেই।

এবার শুয়ে শুয়ে আমি বেশ বাছা বাছা বাক‍্যবাণ দেবার পর, মুখ বাড়িয়ে বলে গেল
– আমি যে ফোনটা করছিলাম সেটা সবার ভবিষ্যত সুরক্ষার জন‍্যে।

ভ‍্যালা রে ঠ‍্যালা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি বর্তমান শেষ হয়ে যায়, ভবিষ্যত আসে কোথা থেকে। তোমরাই বিচার কর। আমার কিছু বলার নেই।

আমার এক কলেজ লাইফের বান্ধবী পরিবেশ বিজ্ঞানী, গোয়ায় থাকে। কলকাতায় এসেছিল কাজে। ফিরে গিয়ে ওর আর ওর মেয়ের আমার মতো অবস্থা হল। ও একটা ঘরে আর মেয়ে আর একটা ঘরে বন্দী হল। ওর কর্তা আবার রান্না জানে, কিন্তু এতোদিন রান্নাঘরের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব পায়নি। এবারেই এসেছে সেই মাহেন্দ্র যোগ। বান্ধবী চারবেলা প্লেটে খাবার পেতে লাগলো। ফোন করে বরকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল যে এমন রাজসিক মেনু ও মশলা রোগীকে দিতে নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা। এদিকে বান্ধবীর মেয়ে অন‍্যঘর থেকে কাঁদো কাঁদো স্বরে মাকে ফোন করছে, মা, বাবা তো জলখাবারে প্রচন্ড ঝাল কাই সমেত চারখানা ডিম দিয়ে গেল। বলে গেল এখন বেশি বেশি করে শুধু প্রোটিন খেতে হবে। বান্ধবী হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে আমাদের কাছে হা হুতাশ করতে লাগল, – ওরে যাই আসুক, বড্ড মেগা ডোজে আসছে।

আর সেই মেসেজ পড়ে কলকাতা থেকে কোঝিকোড়, ক‍্যানবেরা থেকে ক‍্যালিফোর্নিয়া কলেজের বান্ধবীদের থেকে নানা পরামর্শ ভেসে আসতে লাগলো।

– আরে অতো ঝাল চারখানা ডিম একসঙ্গে খেলে পেট খারাপ হয়ে যাবে তো।

– ওরে তমালকে বোঝাবার চেষ্টা কর।  করোনায় একটা পেটখারাপ হবার টেন্ডেন্সি এমনিতেই থাকে।

– হা হা হা হা, তমাল স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। তোরাও করোনা ভুলে সেই স্বাদ গ্রহণ কর।

গোয়ার বান্ধবী এক্কেবারে চুপ। যাক গে যাক, যে যার সমস‍্যা নিজের বাড়ির ইনসাইডে মিটিয়ে নেওয়াই ভালো।

আমার বাড়িতে ফিরে আসি। পরদিন সকালে নটা নাগাদ আবার ঘুমের মধ‍্যে অনেক কথা শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেল। আসলে এই করোনায় দেখছি রাতে ঘুম বার বার ছিঁড়ে যায়। তাই সকালে উঠতে দেরী হয়। কান করে শুনে বুঝলাম, কর্তা ঘরের বাইরে ফোনে কারোর সঙ্গে কথা বলছেন।

– না না ঐ দোকানে বড্ড চর্বি দেয়। বাজারের শেষের দিকে চলে যা। ছেলেটাকে বলবি চর্বি ছাড়া এক কেজি দিতে। তপু বার বার ফোন করে বলছে, এদের সব মাটন স্টু খাওয়াতে হবে, নাহলে কেউ বিছানা থেকে উঠবেনা। আর শোন বাপ্পা চিকেনও আনবি এক কেজি।

বুঝলাম, আমার পিস্তুত ভাই বাপ্পাকে বলছে সব। পাশেই থাকে। সঙ্গে আবার জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বিল্ডিংয়ের কেয়ারটেকারকে বাজার আনার নির্দেশ দিচ্ছে।

ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি, গ‍্যাসের উনুন যেমন কে তেমন। না সকাল, না দুপুর কোনো খাবারের যোগাড়ই শুরু হয়নি। বিরক্ত হয়ে বললাম,

– কোনো ক্রাইসিস পিরিয়ডে ঘুম থেকে উঠে, আগে ভাত আর ডাল বসিয়ে দিতে হয় জানোনা। তুমি তো অনেকক্ষণ উঠেছো। ডালটা সিটি দেওয়া থাকলে, তাতে ডুবিয়েও তো সবাই পাঁউরুটি খেতে পারতো। তিনটে অসুস্থ, দুটো সুস্থ মানুষ খাবে কী এখন। ঘড়িতে সকাল দশটা বাজতে যায়?

কর্তা দেখলাম জুৎসই উত্তর হাতড়াচ্ছেন। এমন সময় রান্নার মেয়েটি ঘর থেকে বেরোলো, আর বাংলার পাঁচ, ছয়, সাত সবরকম মুখ করে চাল ধুতে শুরু করলো। সহোদরাও বেরিয়ে পড়লো। আমাদের ঘরে তো আর অ্যাটাচড বাথ নেই। আর পতিদেব সুযোগ বুঝে
– ‘ওরে বাবা, চারদিকে করোনা বেরিয়ে পড়েছে, মাস্ক আমার মা – স্ক’ – এই বলে  এক লাফে বেডরুমে ঢুকে পড়লেন।

আমি দাঁত কিড়মিড় করে ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলাম, কর্তা একেবারে কম্বলের তলায় ঢুকে পড়েছে আর দুটো চোখ বার করে দেখছে, আমি তাকে দেখছি কিনা। যেই আমি তাকিয়েছি, দেখি মুখে একটা অসহায় হাসি, এদিকে কম্বল থেকে একটা পা বার করে নাচাচ্ছে – পা দেখিয়ে আমায় রাগাচ্ছে। কী আর করি। পাত্তা দিলাম না। কিন্তু বুঝলাম মাটন স্টুটা আমাকেই রাঁধতে হবে।

একমনে মহা করোনাঞ্জয় মন্ত্র আওড়ালাম –

“মাটোন আমার কাঁটোন
সই উনুনের ঝিক।
বুকে আছে রাম করোনা
পারবো আমি ঠিক।”

রান্না বান্না সেরে তপু মানে আমার  যে দেওর মাটনের বুদ্ধি দিয়েছে, তার পিন্ডি চটকানোর উপকরণ জমা করতে তার মেয়েকে ফোন লাগালাম।

– হ‍্যাঁ রে কর্ণা কেমন আছিস?

– জেঠিমা? খবর তো তোমাদের। করোনা কেমন আছে? আমাদের পাট চুকেছে।

– হ‍্যাঁ রে বাপ মেয়ে থাকিস, বাবার কোভিড হল। রান্নার পিসিও ছিলনা। তাহলে তোরা কি করলি, তখন?

– মাটন স্টু জেঠিমা, মাটন স্টু। বানানো খুব সহজ।

– তাই তাই? কীভাবে হয়?

– দেখো জেঠিমা, আমি তো আর করিনি, বাবাকে যেমন দেখেছি, তেমন বলছি।

– বল।

– আলু চারফালি কেটে প্রেশারে ফেলে দাও। একটা বড় পেঁপে চারফালি করে প্রেশারে ফেলে দাও।

– এ্যাঁ!

– আস্ত টমেটো ফেলে দাও।, তারপর মাটন দিয়ে দাও।

– সব্জির সঙ্গে এক সঙ্গে? কোনো ম‍্যারিনেশন?

– না না, ওসব দরকার নেই।

– তাহলে মাটন সেদ্ধ হতে তো সাত আটটা সিটি দিতে হবে, সব্জি তো ঘ‍্যাঁট হয়ে যাবে।

– হোক, ওটাই তো সুরুয়া হয়ে যাবে।

– আচ্ছা, কোনো মশলাপাতি বা তেলের ব‍্যাপার আছে?

– তেল? মাটনের মধ‍্যেই তো তেল আছে। আবার তেলের কী দরকার। খাওয়ার আগে মাখন আর মরিচ ফেলে দাও।

– আর কোনো মশলা?

– দেখো জেঠিমা বাবা তো মশলার ইউজ জানেনা, কিসে কী হয়। যেগুলো সামনে পায়, একটু একটু দিয়ে দেয়। আর হ‍্যাঁ গরম মশলাটা দিতেই হবে। কারণ গরম মশলার গন্ধে স্মোকি খেয়ে নেয়। একটাই তো খাবার, স্মোকি খেতে পারবে, এমনই তো আমাদের খেতে হবে।

(দেওরঝির লাসা আপসো কুকুর আছে। আমার মেয়ের প‍্যারাকিট আছে। দুই জ‍্যেঠতুতো খুড়তুতো বোন কর্ণাবতী আর রঞ্জাবতীর সঙ্গে মিলিয়ে কুকুর বোনের নাম পদ্মাবতী আর প‍্যারাকিটের নাম সত‍্যবতী। পদ্মার ডাকনাম স্মোকি লামা। কারণ লাসা আপসো আসলে তিব্বতের কুকুর)

– ওহ। স্মোকি আর তোদের খাবার এক! দুবেলাই তাহলে মাটন স্টু?

– দুবেলা না তিনবেলা। দুপুর, সন্ধে, রাত্তির।

– আচ্ছা সকালটা?

– ঐ কফি, বিস্কুট এইসব। তোমরাও এরকম করো গো জেঠিমা। দেখবে পরিশ্রমটা বেঁচে যাবে।

– বাঃ। এরকম পথ তো মাথায় আসেনি। তা, কতদিন এমন খাওয়া চললো?

– আমাদের কোয়ারেন্টিন কেটে রিনা পিসি আসা পর্যন্ত।

– বা বা, তোর জেঠু তো এখন সুস্থ, কিন্তু পারেনা বলে করোনা পার্টির রাঁধা ভাত খাচ্ছে। জেঠুকেই এমন খাওয়াবো। আর কিছু বললে বলবো কর্ণা রেসিপি দিয়েছে।

– ঠিক আছে, জেঠু যখন কাঁথি আসবে, আমাকে একটু আগে থেকে বলে দেবে, বাড়ি থেকে পালাবো। অন‍্য কোনো জায়গায় আশ্রয় নেবো। আমি তো ভালোর জন‍্যেই বলছি জেঠিমা। তোমরা মাছের কালিয়া খাবে, ডালের গমের ডালিয়া খাবে। আবার করোনা করোনা, আহা উহু করবে এটা কী হয়?

– না না হয় না। হওয়া উচিত নয়। ভারতীয় খানা ছেড়ে এমন পিওর ইংলিশ খানা খেতে হবে। তবেনা ম‍্যানেজমেন্ট অফ করোনা সফল হবে!

– মাইনর একটু সমস্যা আছে জেঠিমা। তোমরা তো আবার একটু বেশি খাদ‍্যরসিক আছো তাই।

– তাতে কী?

– ওটাই তো। এই মাটন স্টু খেলে তোমাদের শরীর সুস্থ হয়ে যাবে, আমি গ‍্যারান্টি দিচ্ছি। কিন্তু মন খারাপ হয়ে যেতে পারে। মানে শরীরটা বেঁচে উঠে মনটা মরে যেতে পারে।

– কেন তোদের মনটা কেমন আছে?

– আরে আমার আর বাবার তো এমনিতেই ডিপ্রেশন আছে। তাই খাবার নিয়ে আমাদের কোনো প্রবলেম নেই। কিন্তু তোমরা….।

– এ্যাঁও। এই মাটন স্টু টা করোনা কাম ডিপ্রেশন স্পেশাল? কিন্তু আমার তো ডিপ্রেশন নেই। আর কস্মিনকালেও আনতে চাইনা।

– খিঁ খিঁ খিঁ, ফোন রাখো জেঠিমা, আমার পড়া আছে।

হুম, বিটলে শয়তানটা ফোন ছেড়ে পালালো। কিন্তু করোনায় মাটন স্টুয়ের রহস‍্যটা জানা গেল। ইশকুলের গ্রুপে হাসাহাসি চলছে, করোনার অনেক গুণের মধ‍্যে একটা গুণ নাকি এটা – যে করোনা অনেক পরিবারের অকর্মক ক্রিয়া পদগুলোকে সকর্মক করে ছেড়েছে। কিন্তু আমাদের বাড়িতে কী হবে?

দ্বিতীয় দিন দুপুরে খাওয়ার পর কর্তা গেলেন বাসন মাজতে। বুক চিতিয়ে পিঠের দিকে হেলে বাসনে সাবান বোলাচ্ছেন। আর মুখে কন‍্যাকে নির্দেশ দিচ্ছেন,

– ওরে রঞ্জা কোথায় গেলি? এ্যাই ছাগল ডাকছি শুনতে পাচ্ছিস না?

মেয়ে এসে দাঁড়াতে একটা একটা করে ধুয়ে বাসন মেয়ের হাতে দিচ্ছেন। বাসন সাজিয়ে রাখতে হবে। জল ঝরানোর বালাই নেই। দাঁড়িয়ে বাসন ধুতে ধুতে নিচু হয়ে কিছু করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। হাত লাগিয়ে ধুতে পারবেননা। জানি শুকোনোর পরে একপরত সাদা স্তর বাসনে লেগে থাকবে। ভেজা বাসন তাকে সেজে উঠছে, আর রান্নাঘরের মেঝেটায় ঝর ঝর ঝরণা, জাহ্নবী যমুনা বয়ে যাচ্ছে। আমরা ঘরের দরজা একটু ফাঁক করে চুপি চুপি দেখতে লাগলাম।

কর্তার মুখে অমৃতভাষণ বর্ষিত হচ্ছে,

– কিরে ডগু, বাসন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবো নাকি রে, চটপট কর।

– ডগু আমি ডগু? তাহলে তুমি কী?

– চুপ কর নিষ্কর্মা। বড় একটা মেয়ে থাকতে বুড়ো বাবার কতো কষ্ট।

– বুড়ো, তাই বুঝি? কী আমার বুড়ো বাবা রে। এই যে বলো, তোর মায়ের থেকে আমি কতো হ‍্যান্ডসাম। তুড়ি মারলেই এখনও পাত্রী জুটে যাবে। বাসন মাজতে গিয়ে অমনি বুড়ো হয়ে গেলে।

একটু পরেই মেয়ের ফোন

– মা, দেখো না বাবা কেমন করছে। আমি আজকের আগে তো দুবেলা বাসন মেজেছি, তাও একা। বাবা একা কিছু পারবেনা। আর আমাকে কেমন করছে। তুমি কিছু বলবেনা?

– হুঁ, খক খক খক। দেখ বাবু খক খক, আমি তো কথা খক খক এখন বলতে পারছিনা। একটু মানিয়ে নে। খকর খকর খকর…..

– ধুর, আমি যাচ্ছি, তোমায় ছুঁয়ে দেব।

– খবর – খক খক খক, খবরদার। একদম না।

– আমি এসে গেছি। হি হি হি। দরজার দিকে দেখো। ধরব, ধরব, ধরি ধরি, হা-উ-উ।

– এ্যাই হাত গোটা, কেন বাড়িয়েছিস? স‍্যানিটাইজ কর। যাঃ।

– উঁ! বলার কিছু নেই বলে, ফোনে খক খক করা হচ্ছে। আমি কিছু বুঝিনা, অতো বোকা পাওনি আমায়…।

– কী মুশকিল, কোন দিকে যাবো রে বাবা। এই ওমিক্রনটাই যতো নষ্টের গোড়া।

ও মাই ক্রন।
কলকাতা গন।।
গা ঝনঝন।
মাথা টনটন।।
শীতে কনকন।
চোখে বনবন।।
পতি কাজে ঢনঢন।
উনি পজিটিভ নন।।
কেন এলি শনশন।
ব‍্যাটা পচা ওমিক্রন।।





কুমুদিনীর কথা


পাকশালার..(পর্ব নয়)

কুমুদিনীর কথা

কুমুদিনী স্মৃতি ফুটবল – খাদ‍্য উৎসব শেষ। পরদিন সকালে বক্সিবাড়ির দোতলার চওড়া বারান্দায় রোদে বসে আছি মায়েতে মেয়েতে। রোজকার মতোই আবার শুরু হয়েছে আড্ডা আর গুলতানি। এবাড়ির লোকেরা অবশ‍্য দোতলাকে বলে ছাদ। কেন যে এমন বলে, জিজ্ঞেস করলে তারা হাসে, অর্থাৎ উত্তর নেই – এটাই অভ‍্যেস।

– মা বললেনা তো আমার রান্নাটা কেমন হয়েছিল।

– কেন, সবাই তো ভালোই বলেছে।

– তবু, তুমি তো বলোনি।

– তোর ইলিশের ঝালটা আর একটু নুন দিলেই নোনতা হয়ে যেত।

– মানে?

– মানে, তুই প্রশংসা শুনতে চাইছিলি। কায়দা করে সমালোচনার ঢঙে বললাম – ঠিক ছিলো।

– কামড়ে দেবো মা তোমায়, আঁ- –আঁ

– ঐ মৌমাছি আসছে, হাঁয়ের ভেতর মৌচাক বানাবে।

– আর জেঠিমা আমারটা?

– তোর ডাব চিংড়িটা আর সামান্য এক পরত নুন হলে ঠিক ছিলো। একটু আলুনি হয়েছিলো।

– হ‍্যাঁ- অ্যাঁ- অ্যাঁ——-

– চেঁচাসনা, উনুনে ঢোকানোর আগে চামচে তুলে একটু চেখে নিতে হতো।

– তরকারিতে নুন কম বেশি হলে কী করতে হয় গো মা?

– কম হলে খুব একটা অসুবিধে নেই, দিয়ে খাওয়া যায়। বেশি হলে বিপদ।

– বেশি হলে কী করবো?

– রান্না অনুযায়ী হবে। ধর, মাংসের ঝোলে নুন বেশি হয়েছে। তখন গরম জল মিশিয়ে ঝোল পাতলা করতে পারিস। যদি দেখিস আর জল মেশালে গামছা কাঁধে ঝোল পুকুরে নামার অবস্থা হবে, তখন এক দেড় চামচ টক দই এক চিলতে হলুদ, লঙ্কা গুঁড়ো আর ময়দা মিশিয়ে দিতে পারিস। টকে নুন টেনে নেবে, ঝোল ও পাতলা হবেনা। দইয়ে হলুদ লঙ্কা মিশিয়ে দিলে রংটাও হাল্কা হবেনা। আবার ধর ঘুগনি জাতীয় কিছুতে নুন বেশি হলে তেঁতুল গোলা জল বা লেবুর রস মেশানো যেতে পারে। যদি টমেটো দেওয়া রান্না হয়, তবে টমেটো ঘিসনিতে ঘষে পিউরি বানিয়ে আলাদা ফোড়ন কড়ায় একটু ফ্রাই করে মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। হাল্কা ফ্রাই না করলে আবার কাঁচা টমেটোর গন্ধ উঠবে।

তবে হাল্কা পাতলা মাছের ঝোলে, ডালনায়, দমে নুন বেশি হলে আমার মা চাকা করে আলু কেটে ঝোলে ফেলে দিতো। আলুতে নুন টেনে নেয়।

– চাকা করে কেন?

– দুটো কারন। একদম চাকা আলুভাজার মতো পাতলা কাটলে হবেনা। চাকা কিন্তু একটু মোটা করে কাটতে হবে। ওভাবে কাটলে সারফেসটা বেশি থাকে। তাড়াতাড়ি সেদ্ধ হয়। আসলে নুন বেশিটা তো আমরা বুঝতে পারি রান্নার একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে। তখন আবার এক প্রস্থ আলু দিয়ে ফোটাতে গেলে তো বাকি উপকরণের দফারফা হবে। তাই এই কৌশল।

– রান্নাটা হাল্কা, পাতলা, অথচ আলু দিয়ে নয়, তখন কী করবো জেঠিমা?

– তখন আলু ফেলে নুন টানিয়ে নিবি। তারপর হাতা দিয়ে টুকটুক করে আলুগুলো তুলে নিবি। পরের বেলার রান্নার সময়ে কিছু একটায় আলুগুলো চালিয়ে দিবি।

– হুম, আলু ফেলা যাবেনা।

– ফেলবি কেন? মশলাদার তরিবতের রান্নায় অনেক সময়ে বেশ কিছুটা কাই থেকে যায়। সেগুলোও কায়দা করে পরের বেলায় মিশেল দিতে দিতে হয়।

– কাই? কাইটা কী? হি হি।

– খুব হাসি পাচ্ছে না? আমাদের উত্তর কলকাতায় গ্রেভিকে বলে কাই। তোদের এখানে যে তরকারির গ্রেভিকে বলে জুস, তার বেলা? শুনে আমারও দমফাটা হাসি আসে। বলে মাছের টকের জুস নেবে? মাংসের জুস নেবে? আমিও মনে মনে বলি, হ‍্যাঁ, মাংসের অরেঞ্জ জুস দাও। মাছের টকের ম‍্যাঙ্গো জুস দাও। মুখে কিছু বলিনা।

– জেঠিমা, তুমি উত্তর কলকাতার হতে পারো, কিন্তু আমরা মেদিনীপুরের মেয়ে।

– তাতে কী? তুই যদি কাই শুনে হাসিস, আমিও জুস বলে খোঁটা দেবো।

– দিদি শান্তি, মা শান্তি। কাইও না, জুসও না। গ্রেভি চলুক। ওটা আন্তর্জাতিক। কিন্তু মা, একটা কথা আছে। একটা রান্নার গ্রেভি, অন‍্য রান্নায় চার্জ হলে, গন্ধটা যে ছিটকোবে, সেটায় গোলমাল হবেনা?

– হবেতো, নিশ্চয়ই হবে, বুঝতে পারলেই পুরুষ খাদক চেঁচাবে, শাপ শাপান্ত, গুষ্টির তুষ্টি করবে।

– তাহলে?

– তাহলে বুদ্ধি করতে হবে। যে মশলাটা বেঁচেছে, এমন রান্নায় সেটা মেশাতে হবে, যাতে উপকরণগুলো কমন। হিং দেওয়া নিরামিষ ছানার ডালনায়, তুই যদি এখন ডিমের কষার গ্রেভি মেশাস, সেটা কি চলবে? এমনভাবে মিশেল দিতে হবে, যাতে কেউ খেয়ে বুঝতে না পারে। আর যদি না হয়, তো ফেলা যাবে। পরিবারের হেল্থ হাইজিন তো রান্নাঘরে। তার সঙ্গে তো আপস করা যায়না।

– তাহলে এই মিশেলের দরকার কী যখন পুরুষ খাদক গালি দেবে?

– পুরুষ খাদকের চেঁচানি তুই বন্ধ করতে পারবিনা। ওরা চায় ভালো ভালো রান্না হোক। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে যখন তেল মশলা তাড়াতাড়ি ফুরোবে, আবার কিনতে হবে, তখনও ওরা চেঁচাবে। তাই ওসব ভেবে লাভ নেই। স্বাস্থ্য বিধি মেনে কখন কীভাবে আয় দেখতে হবে, খরচ কমাতে হবে, বা খরচ করতে হবে, সেগুলো মেয়েদের সিদ্ধান্ত। আর সঠিক সিদ্ধান্ত অভিজ্ঞতা আর হাতের যাদুর ওপরে নির্ভর করে। বুঝলি কিছু?

– বুঝলাম মা, বুঝলাম। ঐ যে ঠাকুমা তোমায় বলেছিলো না। সংসারের সব কথা পুরুষ মানুষকে বলতে নেই, ওটাই হক কথা।

– জেঠিমা, সংসারে মেয়েদের অনেক ইধার কা মাল উধার করতে হয়, বলো!

– এ্যাই, আমি হেঁশেলের কথা বলছি, সংসারে ইধার কা মাল উধার? সে তো অন‍্য মানে হয়ে গেলো। একটি মেয়ে আমাকে বাড়িতে ফেসিয়াল করতে আসতো, অনেক দিন আগে। সে একটা কথা বলেছিলো। কথাটা হচ্ছে, “বৌদি, নিজে হাজার টাকা রোজগার করে অত আনন্দ নেই, যতো আনন্দ বরের পকেট থেকে দশটাকা নিয়ে।”

– এ্যাঁ, এ বাবা, ছ‍্যা, ছ‍্যা। তুমিও জেঠুর পকেট কাটো জেঠিমা?

– আমাদের বাড়িতে অন‍্য কেত্তন হয় রে দিদি। মা মাঝে মাঝে ঐ ডিসট‍্যান্স ইউনিভার্সিটিতে পড়িয়ে বা স্টাডি মডিউল লিখে কিছু বাড়তি ইনকাম করে। আর আমি জানতে পারলেই মাকে ভজিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে যাই। বাবার জন্য খাবার নিয়ে আসি। খাবারটা দিলেই, বাবা চুপি চুপি আমায় জিজ্ঞেস করে, “কি রে গরম গরম খবর আছে?” আমি তখন খবর চালাচালি করে, সব বাবার কাছে ফাঁস করি। বাবা অমনি পর দিন সকালে ধর্নায় বসে।
– “খবর পেলাম আজ বাজারে বড়ো বড়ো গলদা এসেছে, ভালো ভেটকি উঠেছে। দুহাজার টাকা দাও তো।”

মা চুপচাপ। যখন কিছুই হচ্ছে না, বাবা সেই অফিসে একসঙ্গে চাকরির দিনে ফিরে যায়, তুই তোকারি শুরু করে দেয়।
“হাজার টাকা দে অন্তত।”
মা চুপচাপ। বাবা বলে চলে, “আচ্ছা, ঠিক আছে, গোটা পাঁশশো দে। দুশো দিবিনা, কি চামার রে?” আমি ও ধুয়ো ধরি, চাইছে যখন দিয়ে দাও না মা। মা আর কি করবে, হেসে ফেলে। এইভাবে মায়ের ঘাড় ভেঙে দুবার খাই।

– এ্যাঁ, এ কী বলে গো জেঠিমা।

– শোন ভালো করে, তোর বোনটি কী চীজ।

– জেঠিমা, ও জেঠিমা, আমি তো কলেজে ভর্তি হলে, শহরে তোমার কাছে থাকবো। তখন, তোমার ঘাড় ভেঙে চারবার করে খাবো।

– হা হা হা, হো হো হো। দুজন একসঙ্গে খাবো।
এই না বলে রঞ্জা গান ধরে
‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার খ‍্যাঁটন ভালো চাই….
মনোহরণ সুবাসভরণ
স্বাদের রাঁধন চাই…..
না না না না না…..

– ওরে, রবিঠাকুর কে আর কষ্ট দিসনা, তুই।

– জেঠিমা, তুমি সেদিন তোমার গল্পে বিবেকানন্দকে ডেকে এনেছিলে বটে, তোমার গল্পে কিন্তু রবি ঠাকুর নেই।

– কে বলেছে তোদের – রবি ঠাকুর নেই?

– আছেন?

– হ‍্যাঁ আছেন, আর খুব স্পষ্টভাবেই আছেন। কুমুদিনীর মা লীলাবতীর বিয়েতে, রবীন্দ্রনাথ আর বিবেকানন্দ দুজনেই উপস্থিত ছিলেন। আর কুমুদিনীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বন্ধুত্বও ছিলো

দুই মেয়েই সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে, কী বললে?

– মা আমার হাতটা চেপে ধরো দেখি, আমি মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছি।

– আমি যখন প্রথম এইকথাটা জানতে পারি, আমার যে কি দশা হয়েছিল তা বলে বোঝাতে পারবোনা। এই কথাটা তাঁর বইতে লিখে গেছেন লীলাবতীর ছোটো মেয়ে বাসন্তী, কুমুদিনীর বোন। বাসন্তীও সুলেখিকা, দীর্ঘ দশ বছর তিনি ‘মুকুল’ নামে একটি শিশু পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। 

– আচ্ছা! ডিটেইলস প্লিজ।

কুমুদিনীর বাবা মা কৃষ্ণকুমার – লীলাবতীর বিবাহবাসর বসেছিল কলকাতায়। অন্তর্জালে লেখা আছে অতিথি অভ‍্যাগতের ভরা সভা উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি গান লিখে এনেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে ব্রাহ্মসমাজের সেই বিবাহবাসরে অতিথি অভ‍্যাগতদের গান পরিবেশন করে শুনিয়েছিলেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত। আর কয়েক বছর পরে যিনি তুফানি সাধু হয়ে জগৎ জয় করবেন। বাসন্তী লিখেছেন বিবেকানন্দ দেওঘরে মাঝে মাঝেই কুমুদিনীর দাদু রাজনারায়ণ বসুর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। তাঁর স্মৃতি অনুযায়ী ১৮৯৩ এ শিকাগো যাত্রার বছর চারেক আগে ১৮৮৯ সালের ডিসেম্বরে গিয়েছিলেন। আর ১৮৯৭ এ দেশে ফিরে আসার পরে ১৮৯৮ সালে দুবার দেখা করে এসেছিলেন। ঐ বছরেই রাজনারায়ণের মৃত্যু হয়। আবার ঐ সময়েই বাংলায় প্লেগ মহামারী হিসেবে দেখা দেয়, যার কথা আগেই আলোচনা করেছি। নিবেদিতা ইস্কুলে পড়ার সময়ে সেই কোন ছোটবেলায় বিবেকানন্দের পায়ে নিজের মন দিয়ে বসে আছি আমি। ছোটবেলায় স্বপ্ন দেখতাম তিনি আমাকে স্কুল থেকে নিতে এসেছেন, আমার সঙ্গে গল্প করছেন। কিন্তু তিনি সত‍্যি সত্যিই আমার পূর্ব পুরুষের বিবাহে গান গেয়েছেন, আলাপ করেছেন। দৃশ্যগুলো কল্পনায় ভেসে উঠছিলো। চোখের জল ধরে রাখতে পারছিলামনা আমি।

তবে একথাটা অন্তর্জালের একটা ওয়ান লাইনার দেখে আমি নাচানাচি করিনি। রীতিমতো পড়াশোনা করেছি।

কুমুদিনীর বাবা কৃষ্ণকুমার মিত্র, ময়মনসিংহের লেখক, সাংবাদিক, সঞ্জীবনী নামক পত্রিকা সম্পাদক, দেশপ্রেমিক, পূর্ববঙ্গে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী, কলেজের অধ্যাপক এবং ব্রাহ্মসমাজের একজন মাথা। আসামের চা বাগানে কুলিদের দুঃখ মোচনে তাঁর লেখা ও আন্দোলন আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। অন্তর্জাল বলছে ১৯৩৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। অসমীয়া লেখক পদ্মনাথ গোঁহাই বড়ুয়া স্কুল পাঠ‍্য নীতিকথা বইয়ে কৃষ্ণকুমারের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিপিবদ্ধ করেন। কুমুদিনীর মা হলেন ঋষি রাজনারায়ণ বসুর ন মেয়ে মানে চতুর্থ কন্যা লীলাবতী। এই রাজনারায়ণের সহপাঠী আবার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। অন্তর্জালের পাতা উল্টে উল্টে পড়ি আর হাসি, কোথায় সেই মহাপুরুষেরা আর কোথায় আমি। যাই হোক, রাজনারায়ণও ব্রাহ্ম। কাজেই কুমুদিনীর মা ও বাবা দুজনেই ব্রাহ্ম।

বাসন্তী মিত্রের ঐ বইটা পাগলের মতো খুঁজেছি, কিন্তু পেলাম না, তবে অন্তর্জালে ওনার আর একটা লেখা খুঁজে পেলাম – নাম ‘অরোদাদা’। অর্থাৎ বাসন্তী তাঁর মাসতুত দাদা শ্রী অরবিন্দ ঘোষকে নিয়ে স্মৃতি ভিত্তি ক‍রে গল্প লিখেছেন। কুমুদিনী, বাসন্তী আর সুকুমার – এই তিন ভাইবোনের মা লীলাবতী। তাঁর বড়দিদি স্বর্ণলতার পুত্র হলেন অরবিন্দ। তার মানে স্বর্ণলতা ও লীলাবতীর দুজনেরই বাবা হলেন ঋষি রাজনারায়ণ বসু। সুপ্রভাত পত্রিকাটি ১৯০৭ সালে শুরু হয়ে ৯ বছর পর্যন্ত চলেছিল। জুলাই মাসে এর প্রথম সংখ‍্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সুপ্রভাত নামে একটি কবিতা লিখে দিয়েছিলেন। শ্রী অরবিন্দের কর্মযোগিন্ পত্রিকায় ১৯০৯ সালে সুপ্রভাতের একটি রিভিউ বার হয়। সেখানে ঐ পত্রিকার লেখার মানের প্রশংসা করা হয়। সেই সঙ্গে সুপ্রভাতে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের দুঃখাভিসার নামে একটি কবিতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়। ওখানে একটা লিঙ্ক ছিলো, মোবাইলে সেভ করে রেখেছি দাঁড়া।

পেয়েছি – (incarnateword.in/cwsa/1/suprabhat) লিঙ্ক ছিলো, ঐ লিঙ্কে গিয়ে রিভিউটি পড়েও ফেললাম। প্রথমে আমি ভেবেছিলাম সঞ্চয়িতায় যে অভিসার কবিতাটি পড়েছি, সেটি আর এটি অভিন্ন। কিন্তু দেখলাম দুটির প্রকাশকাল মিলছেনা। তারপর bichitra.jdvu.ac.in এ দেখলাম এটি গান হিসেবে গীতাঞ্জলিতে ০১৭ নম্বরে নথিভুক্ত – “কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো” এই গানটিই সুপ্রভাতের দুঃখাভিসার। এই লিঙ্কে দেখলাম গীতাঞ্জলির মধ্যে সুপ্রভাতে প্রকাশিত মোট পাঁচটি গান আছে। এরপর দুই বোনের অনুরোধে ১৯০৯ থেকেই অরবিন্দ ‘কারাকাহিনী’ নাম দিয়ে আলিপুর বোমার মামলায় তাঁর জেলবন্দী জীবনের অভিজ্ঞতা ধারাবাহিক ভাবে লিখতে শুরু করেন। এই কারাকাহিনীর ইংরেজি অনুবাদ আমাজনে পেপার ব‍্যাক ভার্সনে পাওয়া যায় দেখলাম। তবে সেটি কেনার জন্য অপেক্ষা করতে হলনা। ইউ টিউবে কারাকাহিনীর গল্পটি শুনে নিলাম। আমার কান দিয়ে প্রাণ মন যেন গঙ্গাস্নানে শুদ্ধ হল। এতদিন এগুলো না জেনেও আমি খেয়েপরে বেঁচে আছি, ভারি আশ্চর্য।

– আমিও শুনবো জেঠিমা।

– এবারে আর একটু পিছনে যেতে হবে আমাকে। প্রশ্ন হলো লীলাবতী কৃষ্ণকুমারের বিয়েটা কবে হলো, কোন সাল? অন্তর্জালে লেখা আছে ১৮৮১। এইটা আমি মানতে পারছিনা।

– কেন মানতে পারছোনা?

– কুমুদিনীর প্রথম সন্তান, বড়ো ছেলে সতীশচন্দ্রের জন্ম ১৮৮৮ তে। এটা নিশ্চিত। কারণ, সতীশ বাবলিদির ঠাকুরদা। ঠাকুরদার জন্মসাল ও নিশ্চিত জানে। যেমন আমি জানি, সতীশের ভাই আমার দাদু বিকাশের জন্ম ১৯০৩ এ, মা আমাকে বলে গেছে। এখন যদি ধরে নিই, ১৮৮৮ তে কুমুদিনীর বয়স অন্তত পনেরো, তাহলে কুমুদিনীর জন্মসাল ১৮৭৩। তাহলে লীলাবতীর বিয়ে অন্তত ১৮৭২ বা ১৮৭১ এ হতে হবে, ১৮৮১ নয়। যদি বিয়ের সাল ১৮৭২ হয়, তবে রবি ঠাকুরের বয়স এগারো, আর নরেন্দ্রের বয়স নয়। দুজনেই বালক, অভিভাবকদের সঙ্গে ঐ বিয়েবাড়িতে গিয়েছিলেন।

– তাহলে গান লেখা আর গান গাওয়ার ব‍্যাপারটার কী ব‍্যাখ‍্যা হবে?

– সেটা ছোটোদের মতো করে ভাবতে হবে। দুটো আলাদা ঘটনা। দুটোর সঙ্গে সম্পর্ক নেই।

– বিবেকানন্দের ব‍্যাপারটা আমি ভেবে বলছি মা কেমন হয়েছিলো,
” জানো তো, বিশ্বনাথদার ছেলেটা দুষ্টু হলেও, খুব ভালো গান করে। এ্যাই কেউ বিলেকে ডাক তো। একটা গান শোনাও তো খোকন।”

– হা হা হা হা। তা হতে পারে। ব্রাহ্ম বিয়েই তো হতো ব্রহ্মসঙ্গীত গেয়ে। তাই ছোটো বিলে প্রার্থনা সঙ্গীত, ভক্তিগীতি গেয়েও শোনাতে পারে।

– আর রবীন্দ্রনাথের কথাটা আমি বলছি জেঠিমা। ছোট্ট রবি রাফ খাতার পাতায় একটা গান লিখেছিলো। সেটা জ‍্যোতিদাদা দেখতে পেয়ে গেলো। কাটাকুটি, সংশোধন করার পর, জ‍্যোতিদাদা বললো, এটা বিয়েবাড়িতে নিয়ে যাবি।

– হুম, খুবই সম্ভব। তবে মজার কথা কি জানিস, খান দুয়েক প্রবন্ধ পড়লাম, তাতে রবীন্দ্রনাথ গান লিখেছেন, সেটা নরেন্দ্রনাথকে গাইতে শেখাচ্ছেন, নরেন গিয়ে বিয়েবাড়িতে গাইছেন, এই নিয়ে পল্লবিত বাংলায় উচ্ছাস ভরা কাহিনী লেখা আছে। পড়ে আমি তো তাজ্জব। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখি এসব অজানা কথা জানাবার জন্য খুব ওয়াহ ওয়াহ তালিয়া চলছে। দুজনকেই ট‍্যাগ করে বিশদে জানতে চেয়েছিলাম। দুজনেই চুপ। তাতেই আমার মনে হলো ঐ লেখকেরা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে যা প্রাণে চায় লিখে দিয়েছেন। আমার ভাবনা ঠিক পথেই এগোচ্ছে।

– দেখো মা, বাংলা ক্লাসে ম‍্যাম বলেছিলেন, জীবদ্দশায় বিবেকানন্দ আর রবীন্দ্রনাথের তেমন সদ্ভাব জন্মাবার সুযোগ হয়নি।

– ম‍্যাডাম ঠিকই বলেছেন। পরিণত রবীন্দ্রনাথকে বিবেকানন্দ দেখে যেতে পারেননি। ১৯০২ তে উনচল্লিশের তাজা যুবক যখন চলে গেলেন, রবীন্দ্রনাথ তখন মূলতঃ প্রেমের কবিতা লিখছেন। তাই হয়তো তেমন মনের মিল হবার সুযোগ হয়নি। বিবেকানন্দ যদি আরও কুড়ি বছর বাঁচতেন, তাহলে ইতিহাস হয়তো অন‍্যভাবে লেখা হতো। কিন্তু কি করলে কী হতো, এই নিয়ে ভেবে তো লাভ নেই।

– সেতো বটেই জেঠিমা।

–————––———————-–—

আলোচনাটা তখনকার মতো এখানেই ইতি টানতে হলো। কারণ নিচে একটা হৈ হৈ রৈ রৈ রব উঠলো। আর রঞ্জা, কর্ণা কইরে, ও বৌদি দেখে যাও – এইসব ডাক শোনা যাচ্ছিল। কী না কী হল, দেখতে আমরা ছাদ থুড়ি দোতলা থেকে দুদ্দাড় করে নেমে এলাম। নেমে দেখি ভগবান আজ খুবই সদয়, দুখানা বেশ বড় সাইজের রুই মাছ ধরা পড়েছে সদর পুকুর থেকে। দুটোই কেজি তিনেক করে হবে। জাল থেকে ছাড়িয়ে বালতিতে রাখা হয়েছে। মাছ দুটো দমে গেছে বটে এখনও মাঝে মাঝে লেজের ঝাপটা দিচ্ছে। কর্তা আত্মহারা। এবারে গ্রামের বাড়িতে এসে আজ এতবড়ো সাফল্য মিললো। আর বাকি সবাই খুব খুশি, কারণ রোজ নোনা মাছের টক হয়, আজ রয়‍্যাল রুই মাছের টক হবে।

মেদিনীপুরের কুয়োয় কলকাতার ব‍্যাঙ ঢুকলে তার অবস্থা বোধহয় খুব সুবিধের হয়না। অন্তত আমার হচ্ছিলনা। ঝকঝকে টাটকা রুই দেখে আমার চোখে বড় বড় আলুর টুকরো দিয়ে মাছের কালিয়া, পোস্ত, ধনেপাতা, কাঁচালঙ্কা দিয়ে রুই মাছের ঝাল, দইমাছ – এইসব ভাসছিল। দিবাস্বপ্নে রান্নাগুলোর সুবাস ভেসে আসছিল। রান্না ভরা বাটিগুলো নেচে নেচে এসে ঘুরপাক খেতে খেতে মিলিয়ে যাচ্ছিল। টক এখন খেতে শিখেছি বটে, কিন্তু শেষ পাতে চাটনির মতো চেটে খাই। টক দিয়ে টকটক করে পুরো ভাত মারার ক্ষমতা আমার এখনও জন্মায়নি। এ জীবনে জন্মাবে বলে মনে হয়না। আর আমি হওয়াতে চাইওনা। আমি এখানে সংখ্যালঘু। আর সেই সেন্টিমেন্টেই প্রাণপণ টকের পায়ে মাথা না নোয়ানোর চেষ্টা করি, মানে নিজের আইডেন্টিটি বজায় রাখার চেষ্টা করি।

বাকিদের হঠাৎ নজর পড়লো আমার দিকে। কেউ একজন হয়তো দয়া পরবশ হয়ে জিজ্ঞেস করলো, বৌদি কী খাবে দেখো। কিন্তু একার জন্য রান্না করাটা বিড়ম্বনা। আমি মেয়েদের দিকে তাকাই। মেয়েরা সমস্বরে বলে ওঠে
– আমরা খাবো সেন বাড়ির ঝোল। চমকে যাই,

– মানে?

– মানে আবার কি মা! সেই লম্বা করে আলু আর পটল, নইলে বেগুন, নইলে কাঁচকলা দিয়ে জিরে ধনের পাতলা ঝোল।

– ঐ ঝোলের কি ব্র‍্যান্ড নেম হয়ে গেল, সেনবাড়ির ঝোল?

– হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ ব্র‍্যান্ডনেম। আমাদের তিনজনের ঐ রকম ঝোল করবে মা।

– আচ্ছা জেঠিমা, জিরে ধনের পাতলা ঝোলে তো তেল একদিকে জল একদিকে হয়না। কিন্তু রান্নাঘরের পিসিরা যে পেঁয়াজ ঘ‍্যাঁটের মাছের ঝোল করে, তার জল তেল আলাদা ঘোরে কেন?

– না না, ব‍্যাপার টা সেরকম নয়। ওরা মাছের টক ভালোবাসে, ওটা রোজ করতে করতে চোখ বুজে ঠিক ঠাক করে ফেলে। আর এখানে কালিয়া, ঝোল, ঝাল, ডালনা, দম – এইসব পার্থক‍্যের ধারণা নেই। আর মাছের ঝোল যেটাকে বলে, তাতে সর্ষের তেলে পেঁয়াজ বাটা দিয়ে কষে হলুদ, নুন, লঙ্কা, জিরে গুঁড়ো দিয়ে জল ঢেলে দেয়। ঐ গ্রেভিতে ভাজা মাছ ফেলে ফুটিয়ে নেয়।

– কোনো সব্জি নেই।

– হ‍্যাঁ, এরকম ঝোলে ওরা সব্জি দেয়না, টকে সব্জি দেয়। আমরা যেভাবে মাছের ঝাল করি টকের রেসিপিটা তার সঙ্গে মেলে। আমরা আবার মাছের ঝালে সব্জি দিইনা।

– আচ্ছা পেঁয়াজ ঘ‍্যাঁটে জিরের কথা বললে, ধনে দেবেনা।

– না এদিকে ধনে তেমন ব‍্যবহার হয়না, বা এবাড়িতে যারা রান্না করে, তারা ধনের ব‍্যবহার জানেনা।

– কিন্তু আমি জানতে চাই, এখানকার পেঁয়াজ দেওয়া মাছের ঝোলে তেল জল আলাদা লাগে কেন?

– সেটা রেসিপির দোষ নয়। আমরা কুচো পেঁয়াজ দিয়ে রান্না করি, শহরে অতো বাটাবাটি করবে কে? এখানে এরা পেঁয়াজ বাটা দিয়ে রান্না করে। কিন্তু অনেক লোকের রান্না তো, বেগার ঠেলা যেমন তেমন করে দেয়। পেঁয়াজ বাটা আর বাকি মশলা ভালো করে কষেনা। কোনো সব্জির ক্বাথ ও সঙ্গে মিশছেনা। কাঁচা মশলায় জল ঢেলে দেয় বলে অমন লাগে। হোটেলে দেখবি এই ধরণের রেসিপিতে মাছ রান্না হয়। কিন্তু মশলা কষা থাকে বলে ভালোই লাগে।

– সেনবাড়ির ঝোল আর মাছের ঝালের তফাৎটা কি?

– তফাতের বদলে তুলনা বলছি।
১। দুটোতেই তেলে পাঁচফোড়ন আর লঙ্কা ফোড়ন পড়ে। কাঁচা লঙ্কা অথবা শুকনো লঙ্কা – আপরুচি খানা। মা কাঁচা লঙ্কা দিত, আমিও তাই।
২। ঝোলে নানারকম সব্জি দেওয়া যাবে। কিন্তু ঝালে সেটা হয়না। ঝালে আমার মা মাঝে মাঝে আলু বা বেগুন, অথবা শীতের সময়ে পেঁয়াজ কলি বা কচি শিম ভেজে দিতো, যেকোনো একরকম।
৩। আজকাল সারাবছর টমেটো পাওয়া যায় বলে, দুটোতেই টমেটো দেওয়ার চল হয়েছে। আমাদের ছোটবেলায় টমেটোর এত ব‍্যবহার ছিলনা।
৪। হলুদ দুটোতেই কমন।
৫। ঝোল বা ঝাল হবে নোনতা স্বাদের। কোনো মিষ্টি পড়বেনা।
৬। ঝোলের মশলা হচ্ছে প্রধানত ধনে, জিরে দিলে খুব অল্প, মা জিরে দিতনা। ডালনা বা দমে জিরে হল প্রধান, কিন্তু ঝোলে নয়। বেগুন দিয়ে ঝোল হলে হাল্কা সর্ষে ধোওয়া জল দেওয়া যাবে।
ঝালে শুধু হলুদ লঙ্কা দিলেও স্বাদ হবে। আবার সর্ষেবাটা বা পোস্তবাটা দিয়ে ঘন করলেও চলবে, দুরকম বাটা মিশিয়েও দেওয়া যাবে। কিন্তু কোনোভাবেই ধনে জিরে পড়বেনা।

– আচ্ছা, বুঝলাম।

রান্না চান, খাওয়া সব করতে বেলা গড়ায়। আমাদের উঠোনে ঢোকার মুখে বাঁ ধারে গোয়াল, আর ডান পাশে আছে এক জোড়া দেবদারু গাছ, কবেকার কে জানে। তাদের মোটা মোটা গুঁড়ি, আকাশ ছোঁয়া শিষ আর চিকন চিকন পাতা। জোড়ার মধ্যে বামের গাছটি মাথায় সামান্য খাটো। ওরা আমাদের অনেক পূর্বপুরুষকে দেখেছে। তাই বাড়িতে ওদের শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। সবাই ডাকে রাধাকৃষ্ণ। সূর্য যত ঢলতে থাকে রাধাকৃষ্ণের মাথার দিকের পাতাগুলি কমলা রোদে চিকমিক করে, আর তলার দিকটা ছায়া ছায়া হয়। আমি দুই মেয়ে নিয়ে হাঁটতে বেরোই। নীল আকাশের নিচে ধানক্ষেতের মাঝখান দিয়ে বালিয়াড়ি ঢাকা রাস্তা ঢেউ তুলে দিগন্তে মিশে যায়।
কর্ণা বলে,
– জেঠিমা সেই যেখানে থেমেছিলে, লীলাবতীর বিয়ের গল্পটা বলো। তারপর কী হল?

– বিয়ের গল্পটাতো আর বিশদে জানিনা রে বাবু। তবে এই ১৮৮১ নাকি ১৮৭১ – কোনটা ঠিক এই ভাবতে আমার মনে একটা সংশয় উপস্থিত হল।

– কী সংশয়?

– মনে হল যে, লীলাবতীর মেয়ে আর আমার মায়ের ঠাকুমা এক মানুষ তো নাকি আলাদা?

– সে কি! তারপর?

– আবার খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। কিন্তু সংশয় নিরসন হওয়া দূর, সন্দেহ বাড়তে লাগল।

– কীরকম?

– রাতের পর রাত আমার কাটে নির্ঘুম। অন্তর্জালের গোলোক ধাঁধায় ঘুরে মরি। এক অবিশ্বাস্য কান্ড ঘটায় গুগল। গণক যন্ত্রের পর্দায় ফুটে ওঠে ছবি ‘বোঝবার ভুল’ এর প্রচ্ছদ। যে বই আমার কাছে আছে। মা তুলে দিয়ে গেছে আমার হাতে। সঙ্গে আরও কিছু বই আভা, লহরী, সাহিত্য চিন্তা। পাশে লেখা বঙ্গলক্ষী কুমুদিনী বসু (মিত্র) – writer, editor, parents Krishna Kumar Mitra। জীবনকাল ১৮৭৮ – ১৯৪৩

– ১৮৭৮? তাহলে মা লীলাবতীর বিয়ে ১৮৮১ তো হতে পারে না।

– দুজন আলাদা হলে হতে পারে। আরও লেখা আছে যে,
১৯০৭ থেকে ১৯১৪ পর্যন্ত তিনি সুপ্রভাত পত্রিকা এবং ১৯২৫ থেকে ১৯২৭ বঙ্গলক্ষী পত্রিকার সম্পাদিকা ছিলেন। নামের পাশে লেখা আছে, লেখিকা, সম্পাদিকা, রচনার প্রকার হিসেবে লেখা আছে সাহিত্য ও সাংবাদিকতা। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের ওয়েবসাইটে দেখছি ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ের প্রথম যুগের স্বনামধন্য ছাত্রী তালিকায় প্রথমটিই তাঁর নাম।

– আচ্ছা!

– কিন্তু সেকালের মেয়েদের কলেজ খুঁজে দেখছি ওনার নাম পাচ্ছিনা। বেথুন কলেজের ওয়েবসাইটে কামিনী রায়ের নাম আছে, কুমুদিনীর নেই। তাহলে কলকাতায় বসে গ্র‍্যাজুয়েশন করলেন কোথা থেকে। বাড়িতে অনেক শিক্ষিকা আসতেন শুনেছি। তবে কি প্রাইভেটে পরীক্ষা দিলেন?

– তারপর?

– খুঁজতে খুঁজতে এবারে আমি একটা পি. এইচ. ডি. থিসিসের সন্ধান পেলাম।  ২০০৭ এ প্রকাশিত সুতনুকা ঘোষের লেখা। এখানে পরিষ্কার করে লেখা আছে যে লীলাবতী মিত্র অল্পবয়সে বিবাহের কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। তাই কন্যাদের শিক্ষার বিষয়ে খুবই যত্নবান ছিলেন। এই রিপোর্টের ৯৫ পাতায় লেখা আছে, কুমুদিনীকে তাঁর স্বামী বাড়িতে প্রাইভেটে পড়িয়েছেন।

– তাই নাকি?

– হ‍্যাঁ রে, এই দেখ রেফারেন্স, মোবাইলে আছে।
(Ref. Becoming a Bengali Woman: Exploring Identities in Bengali Women’s Fiction, 1930-1955 Sutanuka Ghosh Ph.D Thesis School of Oriental and African Studies University of London July 2007)

– বাঃ, তাহলে তো এই ধন্দটারও নিষ্পত্তি হয়ে গেল।

– কিন্তু ইনি আমার মায়ের ঠাকুমা কিনা, সেটা তো বোঝা বাকি।

– তা বটে। কন্টিনিউ।

indianculture.gov.in এ দেখছি তাঁর লেখা লহরী কাব‍্যগ্রন্থটি পড়া যাচ্ছে। ১২৯৩ বঙ্গাব্দের ১০ ই অগ্রহায়ণ, ১৮৮৬ খৃষ্টাব্দের ২৫ শে নভেম্বর প্রথম সংস্করণ ঢাকা থেকে শ্রী গোপীনাথ বসাক কর্তৃক মুদ্রিত হল। প্রকাশক অতুল চন্দ্র বসু। বই থেকে জানা যাচ্ছে, লহরীর কিছু কবিতা সাধারণী পত্রিকা, ঢাকা প্রকাশ এবং সারস্বত পত্রে প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলির সঙ্গে আরো নতুন কবিতা একত্রিত করা হয়েছে। আরও লেখা রয়েছে, “লেখিকার বয়স অল্প এবং ইহাই তাঁহার প্রথম উদ‍্যম। প্রায় আড়াই বৎসর হইল, লেখিকা যখন বালিকা, তখনই তাঁহার কবিতা সাধারণীতে প্রকাশিত হয়।” একজায়গায় লেখা আছে যে, শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়চন্দ্র সরকার, কবিতার দুই একটি স্থল সংশোধন করে দিয়েছেন। শেষে লেখা আছে, “এই সমস্ত পর্যালোচনা করিয়া সহৃদয় পাঠক, কবিতায় যে কোনো ত্রুটি থাকুক, মাপ করিয়া লইবেন।” সবই তো পড়ছি, গুগল অনুযায়ী যদি ধরে নিই, কুমুদিনীর জন্মসাল ১৮৭৮ অর্থাৎ ১২৮৫ বঙ্গাব্দ, তবে লহরী প্রকাশিত হওয়ার সময়ে তাঁর বয়স হবে আট বৎসর। এবং বইয়ের ভাষ‍্য অনুযায়ী কিছু কবিতা আরও আড়াই বছর আগে থেকে সাধারণীতে প্রকাশিত হচ্ছে, অর্থাৎ ছয় বছর বয়স থেকে? তাহলে তো সেটা অস্বাভাবিক প্রতিভা। কিন্তু তেমন কিছু বইতে লেখা নেই। আর কবিতাগুলিও প্রণিধানযোগ্য।

– কেমন কবিতা মা?

– দেখাচ্ছি দাঁড়া। কিন্তু এভাবে রাস্তায় হবেনা। কোথাও একটা বসতে হবে।

– ঐ পুকুর পাড়ে চলো মা। শান বাঁধানো আছে।

– চল। পিঁপড়ে দেখে বসবি।

– এবার দেখাও জেঠিমা।

– এইযে আমি স্ক্রিনশট তুলে রেখেছি।

– ওরে বাবা, এ যে লম্বা লম্বা কবিতা। তুমি পড়ে শোনাও মা।

– পড়ছি শোন।
১৪ নম্বর কবিতা এইরকম –

“….হেসে আয় প্রভাবতি,
আর না কাঁদিবে সতী,
ভারতের চির দুঃখী কুমারী কুমার গণে;
শ্বেতাঙ্গ চরণে পড়ি,
কত সুখ হরি হরি,
বুঝিবে হাসিবে, সবে এ শুভ মাহেন্দ্রক্ষণে…..
ইত্যাদি অনেক কবিতাতেই বিদেশী শাসন বিরোধিতার নির্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
বেশ কয়েকটি কবিতা রয়েছে, যেগুলির শিরোণাম আর্য সঙ্গীত।
সেরকম একটা পড়ছি শোন –

অসীম উচ্ছ্বাস ভরে,
মধুর অমিয়া ধারে,
গাও সবে জয় জয় ভারত জননী;
জগতের প্রতি স্তরে
ঘোষিবে প্রদীপ্ত স্বরে,
সে মহা সঙ্গীত স্রোত দ্রুত প্রতিধ্বনি।
হৃদয়ের অভ‍্যন্তরে আছে গো লুকায়ে
এখনও বীরপণা,
সে পূর্ব্ব শোণিত কণা,
আছে পূর্ব্ব তেজ বহ্নি ভস্ম আচ্ছাদিত;
আবার তেমতি ভাবে,
নব জ‍্যোতি আবির্ভাবে,
শিরায় শিরায় বেগে হবে প্রবাহিত।

অল্পবয়সে লেখা জীবনের প্রথম কাব‍্যগ্রন্থে যে জাতীয়তাবোধ এবং শব্দচয়ন দেখা যাচ্ছে, তা কি ছয় বা আট বছরের মেয়ের হওয়া সম্ভব? লেখাপড়াতো শুরুই হয় ঐ বয়সে। তাছাড়া সেকালে জন্মসালের নথিও থাকতোনা। আচ্ছা এই লহরী বইটি সত্যি সত্যি কি আমার কুমুদিনীর লেখা?  নাকি ইনি অন্য কেউ? অথচ বোঝবার ভুল এবং লহরীর ডিজাইন, অক্ষর, ফন্ট সব একরকম। কিন্তু প্রকাশক হিসেবে যাঁর নাম রয়েছে, তিনি কে? কে এই অতুলচন্দ্র বসু? এনার নাম তো আমার চেনা নয়। বাবলিদি ও চিনতে পারছেনা। 

– তারপর তারপর?

southasiaarchive.gov.in এ সুপ্রভাত পত্রিকার কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে, যেখানে মুখবন্ধ সমেত বেশ কিছু প্রবন্ধের লেখিকা কুমুদিনী। যেমন – গুরু অঙ্গদ, শিশু জীবন, গার্হস্থ্য প্রসঙ্গ, স্বাস্থ্য প্রসঙ্গ, প্রাপ্ত গ্রন্থাদির সমালোচনা প্রভৃতি। লহরী ছাড়াও তাঁর লেখা অনেকগুলি বইয়ের নাম পাচ্ছি – যেমন ‘শিখের বলিদান’, ‘অমরেন্দ্র’, ‘পঞ্চপুষ্প’, ‘আভা’, ‘সাহিত্য – চিন্তা’। আর ‘বোঝবার ভুল’ উপন্যাস ও ‘পূজার ফুল’ আমার নিজের বাড়িতেই আছে। আভা কাব‍্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হচ্ছে ১৩১১ বঙ্গাব্দে অর্থাৎ ১৯০৪ খৃষ্টাব্দে কুমিল্লা থেকে। লেখা আছে চাকলা রাধাকিশোর – যন্ত্রে শ্রী নীলাম্বর দত্ত কর্তৃক মুদ্রিত।  অন্তর্জালে আভা এবং সাহিত্য চিন্তা বইদুটি পড়াও যায় দেখছি। কিন্তু আভা পড়তে গিয়ে আমার মনে ধন্ধ জাগছে। মুখবন্ধে লেখা আছে, এই লেখিকাই কিছু বৎসর আগে লহরী প্রকাশ করেছেন, কিন্তু বাকি বইগুলোর তো নাম দেখছিনা। আরও লেখা আছে, লেখিকার পিতা শ্রীযুক্ত বাবু মদনমোহন মিত্র ত্রিপুরাধীপ স্বর্গীয় বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুরের সভাকবি ছিলেন। লেখিকার স্বামী শ্রীযুক্তবাবু অতুল চন্দ্র বসু। প্রকাশক শ্রী মহিমচন্দ্র দেব বর্ম্মা। আর বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘পরম পূজ্যপাদ স্বাধীন ত্রিপুরেশ্বর শ্রী শ্রীযুক্ত মহারাজা রাধাকিশোর দেববর্ম্মা মাণিক্য বাহাদুরকে। কিন্তু মুশকিল হোল, আমাদের পরিবারের কারোর ত্রিপুরার রাজার সঙ্গে মোলাকাত হয়েছে, এ আমি কস্মিন কালেও শুনিনি। আর আমাদের কুমুদিনী বসুর স্বামী তো শরৎ চন্দ্র বসু। আমার মায়ের তিনি ঠাকুরদা। যদিও বাবলিদি বলছে, তখনকার দিনে এখনকার মত সার্টিফিকেটের ব্যাপার ছিলনা, তাই এক লোকের দু তিন রকম নাম থাকতো। আচ্ছা মেনে নিলাম ওর কথা। আরও এগোনো যাক।

এবারে সাহিত্য চিন্তা বইটি ডাউনলোড করে পড়তে বসলাম। কিন্তু একী! এ বই তো ওনার মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়েছে। মুখবন্ধের লেখা ধরলে এই কুমুদিনীর মৃত্যু হয়েছে ১৯২৫ সালে। কিন্তু আমার কুমুদিনীর মৃত্যু ১৯৪০ বা তার একটু পরে। সব থেকে বড় কথা হল, লেখিকার একটা ছবি আছে, বইতে। সে ছবি যত অস্পষ্টই হোক, তাঁর ছবি আমাদের পারিবারিক অ্যালবামে রাখা কুমুদিনী বসুর সাথে মেলেনা। তার মানে আমার প্রাথমিক খটকাই ঠিক। সাহিত্য চিন্তায় পাওয়া যাচ্ছে, এই কুমুদিনীর লেখা বইগুলি হল,  লহরী, ‘অমরেন্দ্র’, ‘পঞ্চপুষ্প’, ‘আভা’ ও ‘সাহিত্য – চিন্তা’।

উফফ, একটা শান্তি পেলাম। তার মানে সমকালে দুজন কুমুদিনী আছেন এবং  বাকি বইগুলো দ্বিতীয় কুমুদিনীর লেখা। দুজনেই বিয়ের পরে বসু, বিয়ের আগে মিত্র এবং লেখিকা। বইয়ের নকশাও এক। বইগুলো না পড়লে তফাৎ বোঝা যাবেনা।

– এতো গোয়েন্দা গল্প জেঠিমা। নাম মিলে গেছে বলে গুগল সব গুলিয়ে গ আর ঘেঁটে ঘ করে ফেলেছে।

– কিন্তু এতে তো আমার প্রশ্নের উত্তর হলনা। প্রথমজন আমার পূর্বপুরুষ নন। কিন্তু দ্বিতীয় জনের পরিচয়টা কি?

– খুঁজতে খুঁজতে এবারে কুমুদিনী বসুর “মেরী কারপেনটার” নামে একটা বই পেলাম। কিন্তু বইয়ের ভিতরে লেখিকার নাম কুমুদিনী মিত্র বি. এ.।
বইটির ভূমিকা লিখেছেন স্বনামধন্য শিবনাথ শাস্ত্রী। এবং শেষেও সেযুগের বিখ্যাত মানুষদের লেখা রিভিউ ছাপা আছে। তার প্রথমটাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা। রবীন্দ্রনাথের লেখায় বোঝা যাচ্ছে যে এই লেখিকাই কিছুকাল আগে শিখের বলিদান বলে আর একটি শিশু পাঠ্য বই রচনা করেছেন, তা তিনি জানেন এবং দুটি বইয়েরই প্রশংসা করছেন। আরও আটখানি রিভিউ লিখেছেন যথাক্রমে –    

The Indian Social Reformer, Bombay, 15th July, 1906, শ্রী গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বামাবোধিনী পত্রিকা, প্রবাসী,  Amrita Bazar Patrika, ED. C. Woodley, Principal, L.M.S College, Bhowanipur, Florence Sypett, Superintendent, London Mission Christian Girls’ School, Bhawanipur  এবং বাবু সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। 

– বলো কি গো মা? আমি কত রাতে উঠে তোমায় জিজ্ঞেস করেছি কী করছো? তখন তো কিছু বলোনি।

– কী বলবো? তখন আমি ঘোরের মধ‍্যে থাকতাম।
অমৃত বাজার পত্রিকা এবং সুরেন ব্যানার্জীর দীর্ঘ রিভিউ থেকে জানা যাচ্ছে যে লেখিকা সঞ্জীবনী পত্রিকার সম্পাদক ও দেশপ্রেমিক কৃষ্ণ কুমার মিত্রের মেয়ে। ভালো কথা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই কুমুদিনী মিত্র আর আমার মায়ের ঠাকুমা কি একই  ব্যক্তি? গুগল বলছে, যিনি মিত্র তিনিই বসু। 

– আচ্ছা, দ্বিতীয় কুমুদিনী তবে লীলাবতীর মেয়ে। তারপর?

– এবারে অন্তর্জালে আর একটা বই খুঁজে পেলাম – সাহিত্যে নারী: স্রষ্ট্রী ও সৃষ্টি, লিখেছেন অনুরূপা দেবী।  সেখানে অনুরূপা দেবী, কুমুদিনী বসুর লেখা দুটি  বইয়ের উল্লেখ করেছেন, পূজার ফুল ও শিশু পাঠ্য শিখের বলিদান। গুগলে দেখছি অনুরূপা দেবী (১৮৮২ – ১৯৫৮) কুমুদিনীর সমসাময়িক। তাহলে তিনি নিশ্চিত হয়েই লিখে থাকবেন।
এখন যুক্তি সাজালাম –
১। পূজার ফুল আমার কাছে আছে। মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনীর লেখা।
২। অনুরূপা দেবী বলছেন পূজার ফুল এবং শিখের বলিদান একজনের লেখা।
৩। মেরী কার্পেন্টার বইয়ের শেষে ছাপা রিভিউতে দেখছি এই লেখিকাই শিখের বলিদান লিখেছেন এবং তিনি কৃষ্ণকুমারের মেয়ে।

এবারে নিশ্চয়ই বলা যেতে পারে, আমার কুমুদিনী লীলাবতীর মেয়ে। এবং রঞ্জাবতী তাঁর ছয় প্রজন্মের পরের উত্তর পুরুষ।

দুই মেয়ে হাততালি দিয়ে ওঠে।

– মা মা, সব পুরুষের নামগুলো একটু বলো।

– উর্ধ্বতন সাতপুরুষ বলছি মনে করে রাখ।
৭। ঋষি রাজনারায়ণ বসু – নিস্তারিনী দেবী
৬। লীলাবতী বসু – কৃষ্ণকুমার মিত্র
৫। কুমুদিনী মিত্র – শরৎচন্দ্র বসু
৪। বিকাশচন্দ্র বসু – লাবণ‍্যপ্রভা ঘোষ
৩। কৃষ্ণকুমারী বসু – সমীরকুমার মণ্ডল
২। শারদা মণ্ডল – তুলসীপ্রসাদ দাসমহাপাত্র
১। আমাদের রঞ্জু বুড়ি।

– একটা কথা আছে জেঠিমা। কুমুদিনীর অন‍্য বইগুলো তোমার কাছে নেই কেন?

– আমার দাদুর উড়নচন্ডীপনার জন্য মামার বাড়ির পরিবার খুব গরীব হয়ে যায়। কুমুদিনীর লেখা দুটি মাত্র বই পূজার ফুল ও বোঝবার ভুল আমার মা আমাকে দিয়ে যেতে পেরেছেন। ঐ বই দুটি আমার জ্ঞাতিদের বাড়িতেও আছে। সেনবাড়িতেও আছে। এবং মা বলে গিয়েছেন, ওনার লেখা আরও অনেক অনেক বই ছিল, গাঁটরি গাঁটরি পত্রিকা ছিল, পুরষ্কার ছিল। খবরের কাগজের কাটিং ছিল। কিন্তু দারিদ্র্যের জন্য পরিবার তার দাম দিতে পারেনি। বাড়িতে বেশিরভাগ সব উইয়ে কেটে নষ্ট করেছে। ইতিহাস নষ্ট হয়ে গেছে।

– ইশশ, গ্রেট লস জেঠিমা, গ্রেট লস।

– ভগবানকে ধন‍্যবাদ দাও মা, তাও কিছুটা তো জানা গেছে।

– হ‍্যাঁ রে, ব‍্যক্তিগত বা পারিবারিক স্মৃতি হারালেও সামাজিক স্মৃতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে দিয়েছে। তবে তোরা একটা ভুল ক‍রছিস। এখনও কিন্তু সব সমস্যা মেটেনি।

– আবার কিসের সংশয়?

– আছে। অনেক কিছু আছে।

– বলো তাড়াতাড়ি।

– এখন আর নয়। অন্ধকার নেমে আসছে। বাড়ি থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি আমরা। গল্প আবার পরে হবে।

সূর্য এখন দিগন্তের নিচে, সাত ঘোড়ার রথে করে পৃথিবীর অন‍্য কোনায় ফুটিয়ে তুলছেন ভোরের আলো। আকাশে তবু একটা মরা আলোর আভাস। সেই আলোয় কুমুদিনীর উত্তরসূরীরা চিনে নেয় নীড়ে ফেরার পথ। 

–——————————————-

বক্সি বাড়ির চারপাশে রাতে ঝিঁঝিঁ ডাকে। দোতলার বারান্দা থেকে তারার আলোও চোখে পড়া দুষ্কর। চারিদিকে ঝুপসি গাছে আলো আটকে যায়। ঠাকুর মশাই গোপীনাথের দ্বার খোলেন। রোজকার মতো বেজে ওঠে বড় কাঁসর, ছোটো ঝালি। ঠাকুরমশাই আরতি করেন পঞ্চপ্রদীপ দিয়ে। ঘন্টাধ্বনি শোনা যায়।

রান্নাঘরে নতুন করে আঁচ পড়ে। সকালের ডাল অনেকটা আছে। বেগুন ভাজা হবে। আর একটা বিশেষ আইটেম রান্না হবে রাতে।সেটা হল গুগলির তরকারি। মেয়েরা খুব ভালোবাসে। বেগুনটা আজ মশলা দিয়ে ভাজা হবে।

একটা কাঁসিতে বেসন, চালের গুঁড়ো, আমচুর পাউডার, হলুদ, অল্প একটু কালোজিরে, একটু লঙ্কা গুঁড়ো আর নুন মিশিয়ে রাখতে হবে। বড় মোটা কালো বেগুনগুলো একটু মোটা চাকা চাকা করে কাটা হয়। মিশ্রণে একটু জলের ছিটে দিয়ে বেগুনগুলো ভালো করে মাখিয়ে তেলে ভেজে নিতে হবে। বাড়িতে এই মশলা দিয়ে বেগুন ভাজা সকলে পছন্দ করে। আমি অবশ‍্য খাবার সময়ে বেসনের ছাল ছাড়িয়ে ভেতরের বেগুনটা খাই। ওপরে পরত থাকলে, ভেতরের বেগুন সেদ্ধ হয়ে যায়, কিন্তু সরাসরি তেল ঢুকে বজবজ করেনা।

আর গুগলির স্বাদে আমি বিয়ের পরেই মজেছি। বাপের বাড়িতে এসব খাওয়ার চল ছিলনা। মেয়েরা ভীষণ ভালোবাসে বলে, কর্তা গুগলি পেলেই কিনে নেন। রান্নাটা একটু গরগরে মাখামাখা হয়। স্বাদটা পুরো মাংসের মতো লাগে। অথচ মাংসের থেকে অনেক সহজে কম সময়ে হয়ে যায়। আজও বিকেলে হাট থেকে কর্তা গুগলি নিয়ে এসেছেন।

গুগলিগুলো রান্না করার আগে ভালো করে ঘষে ঘষে খুব ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করে রাখতে হয়। তারপর জল ঝরিয়ে গরম তেলে নুন হলুদ দিয়ে গুগলি ভেজে তুলে নিতে হয়। সেই তেলেই পেয়াজ লাল করে ভেজে নিতে হয়। তারমধ্যে ডুমো আলু, নুন, হলুদ দিয়ে ভেজে নিতে হয়। ভাজা হলে আদা, রসুন, টমেটোর পেস্ট, নুন, চিনি, হলুদ, ধনেগুড়ো, জিরেগুড়ো, লঙ্কাগুড়ো দিয়ে নাড়তে থাকলাম । মশলা বেশ করে কষা হয়ে গেলে তেল ছেড়ে যাবে। তখন ভাজা গুগলি দিয়ে নেড়েচেড়ে একটু জল দিয়ে চাপা দিতে হয় কুড়ি মিনিটের জন্য। তারপর ঢাকা খুলে ধনেপাতা ও গরমমশলা ছড়িয়ে নামিয়ে দিলাম। ধনেপাতা না দিলেও হয়। এটা তো শ্বশুরবাড়ির রেসিপি বললাম। এর সঙ্গে মাঝে মাঝে আমি একটু মাত্রা দিয়ে দিই। কড়ায় পেঁয়াজ ভাজার আগে সর্ষের তেলে হলুদ আর কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে দিই। এতে মশলা কষার পর যখন তেল ছাড়ে, তারপর জল দিয়ে ফোটানো হয়, তখন সুন্দর লাল রঙের তেল ওপরে ভাসে। নামানোর আগে কখনও ইচ্ছে হলে ধনেপাতা না দিয়ে ঘি, গরম মশলা দিয়ে নামাই।

খাওয়া দাওয়া সেরে রাতে একটু নিচের বারান্দায় আড্ডা হয়। কিন্তু মেয়েরা আজ ছিনে জোঁক। ছোঁ মেরে আমায় নিয়ে গেল দোতলায়।

– এবারে বাকিটা বলো মা।

– সে অনেক কথা, আবার কাল হবে।

– না না প্লিজ মা। আজ আর একটু এগোতে হবে।

– হ‍্যাঁ জেঠিমা, শুরু করো।

– আসলে কি জানিস, দুই কুমুদিনীকে গুলিয়ে ফেলার জন্য শুধু গুগলকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তের সংসদ বাঙ্গালী চরিতাভিধানে পর্যন্ত দুই কুমুদিনী মিশে গেছেন। একজন কুমুদিনী বসুর বিষয়ে যে প‍্যারাগ্রাফ রয়েছে, তাতে একসঙ্গে দুই কুমুদিনী বসুর বইয়ের তালিকা রয়েছে। বইগুলো খুলে না পড়লে, শুধু ওপর থেকে বোঝা অসম্ভব।

– রবীন্দ্রনাথ মেরী কার্পেন্টার বইয়ের রিভিউতে কী লিখেছেন জেঠিমা?

– রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন এই বইটিও শিখের বলিদানের মতোই ভালো হয়েছে। শিখের বলিদান বইটি ভালো লেগেছিল বলে তিনি বাড়ির ছেলেদের দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের হাতে পড়ে বইটির পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটেছে।

– হা হা হা, তাই নাকি। দেখো মা, ঠাকুর বাড়ির ছেলেপুলেরাও আমাদের মতো।

– হুম। যাই হোক এই সূত্র ধরে আমরা বলতে পারি, যে শিখের বলিদান (১৯০৪), মেরী কার্পেন্টার (১৯০৬), পূজার ফুল (১৯২৫), এবং বোঝবার ভুল (১৯২৭) আমার পূর্ব পুরুষ কুমুদিনী বসুর লেখা।

কিন্তু সন্দেহ হচ্ছে দুটো জায়গায়। এক অন্তর্জালের আর পরিবারের সালের হিসেব মিলছেনা। আর ঐ কুমুদিনী বসুর স্বামী হিসেবে কোথাও ব্রাহ্মনেতা শচীন্দ্রনাথ বসু, কোথাও বসু মল্লিক পরিবারের প্রবোধচন্দ্র বসুর নাম আছে। এবং দুটি সন্তানের উল্লেখ আছে। কিন্তু পারিবারিক ইতিহাসের সূত্রে আমরা জানি, যে কুমুদিনীর স্বামী এবং আমার মায়ের ঠাকুরদা হলেন শরৎচন্দ্র বসু। তাঁদের পাঁচটি পুত্র এবং তিনটি কন‍্যা মোট আটটি সন্তান বয়োপ্রাপ্ত হয়েছে।

আর একটি সূত্র আছে। বোঝবার ভুল বইটা লেখিকা উৎসর্গ করেছেন বান্ধবী সুলাজিনী দেবীকে। লেখা আছে তিনি রণেন্দ্রমোহন ঠাকুরের পত্নী।

– সুলাজিনী কে?

– অন্তর্জালে জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুমারের বংশপরিচয় তৃতীয় খন্ড থেকে, সুলাজিনী দেবীর পরিচয় বার করেছি। সম্পর্কটা একটু ধৈর্য ধরে তোদের বুঝতে হবে।

ঠাকুর পরিবারের আদি পুরুষ জগন্নাথ ঠাকুর। তাঁর পরে পরপর বলরাম, হরিহর, রামানন্দ, মহেশ্বর, পঞ্চানন ও জয়রাম এই ছয় পুরুষ। জয়রামের পুত্র দর্পনারায়ণের থেকে শুরু হয় পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবার। আর জয়রামের অপর পুত্র, দর্পনারায়ণের ভাই নীলমণির থেকে শুরু হয় জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার।

– আচ্ছা।

– দর্পনারায়ণের পাঁচ পুত্রের দুজন হলেন গোপীমোহন ঠাকুর এবং হরিমোহন ঠাকুর। গোপীমোহনের পুত্র বিখ্যাত প্রসন্ন কুমার ঠাকুর। এঁর দৌহিত্র ভুজেন্দ্রভূষণ চ‍্যাটার্জি। তাঁর তৃতীয়া কন্যা সুলাজিনী দেবী। এবার হরিমোহনের পরপর উত্তর পুরুষেরা হলেন – নন্দলাল, ললিতমোহন, রঘুনন্দন। রঘুনন্দন ঠাকুরের স্ত্রী হলেন রাজা দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় ও জ্ঞানদাসুন্দরী দেবীর কন‍্যা মুক্তকেশী। রঘুনন্দন ও মুক্তকেশীর পুত্র রণেন্দ্রমোহন ঠাকুর। অর্থাৎ দুই সহোদর ভ্রাতার পরিবারের মধ‍্যে একজনের নাতনির দিক দিয়ে চতুর্থ পুরুষ এবং অপরজনের নাতির দিক থেকে চতুর্থ পুরুষের বিবাহ হয়েছে।

– এরকম ও হয়?

– রণেন্দ্র – সুলাজিনীর কন্যা লীলাদেবীও লেখিকা ও শিল্পী। তাঁর স্বামী হলেন, স‍্যার আশুতোষ চৌধুরীর ছেলে বিখ্যাত আর্কিটেক্ট আর্যকুমার চৌধুরী। সে যাই হোক। ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধ এবং বিংশ শতকের গোড়ায় এঁরা প্রত‍্যেকেই ছিলেন সমাজের মাথা। একই সঙ্গে ক্ষমতাশালী এবং প্রতিভাধর। আমার পূর্বপুরুষ কুমুদিনীর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী যখন সুলাজিনী, এবং তাঁকে ইতি তোমার মিলন বলে সম্বোধন করে বই উৎসর্গ করেছেন, তখন এটাই প্রমাণ হয়, যে কুমুদিনীও ঐ ক্ষমতা ও প্রতিভাশালী সমাজের অংশ। মেরী কারপেনটার বইয়ের জন্য রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ে মনে হয়, তাঁর সঙ্গে কুমুদিনীর খুবই সুসম্পর্ক। আবার বোঝবার ভুলের উৎসর্গ দেখে জানা যায়, ঠাকুর পরিবারের বংশধর ও বধূ সুলাজিনী তাঁর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী। এতে ও কিছুটা দিক নির্দেশ পাওয়া যায়, যে দুই লেখিকা এক ব্যক্তি। 

– ঠিক আছে, কিন্তু প্রবোধ বসুমল্লিক, আর দুটো সন্তানের কথা কিভাবে এল?

– বলছি, বলছি, ধৈর্য্য ধর। ফেসবুকে রাজা সুবোধ মল্লিকের বাড়ি রক্ষা করা নিয়ে একটি প্রবন্ধ পেলাম। সেখানে জনৈক রামকুমার বসুমল্লিকের উল্লেখ পেলাম। যিনি বসু বংশজাত, কিন্ত পূর্ব পুরুষেরা বাংলার সুবেদার ছিলেন বলে মল্লিক উপাধি পান। তিনি বর্ধমান, হুগলি ও চব্বিশ পরগণার কিছু অঞ্চলের ভূস্বামী ছিলেন। তাঁর দুই স্ত্রী – প্রথম স্ত্রীয়ের এক পুত্র পার্বতী চরণ এবং দ্বিতীয় স্ত্রীয়ের দুই পুত্র জ‍্যেষ্ঠ রাধানাথ ও কনিষ্ঠ মহেশচন্দ্র। রাধানাথের জীবনকাল লেখা আছে ১৭৯৮ – ১৮৪৪। এই রাধানাথ নিজ ব‍্যবসায়িক কুশলতায় M/S Beauchamp কোম্পানির অংশীদার হন এবং Sir William Wallace নামে একটি মালপরিবহনকারী স্টিমারের মালিক হন। কালক্রমে তাঁর বংশধরেরা বসু পদবী পরিত্যাগ করে শুধু মল্লিক ব‍্যবহার শুরু করেন। কলকাতার বিখ্যাত রাজা সুবোধ মল্লিক এই বংশের কুলতিলক। ঐ প্রবন্ধে কিন্তু মহেশচন্দ্রের বংশধরদের কোনো উল্লেখ নেই।

যাই হোক, তবে অন্তর্জালের বিভিন্ন স্থানে কুমুদিনী বসুর  (মিত্রের) দুটি সন্তান কেন বলা হয়েছে, সেটি মনে হয় উদ্ধার করতে পেরেছি। কারণ রাজা সুবোধ মল্লিকের মা হলেন আর এক কুমুদিনী। তিনি দর্জিপাড়ার রাজকৃষ্ণ মিত্রের মেয়ে। রাজা সুবোধ মল্লিক হলেন, পূর্বে বর্ণিত রাধানাথ বসু মল্লিকের প্রপৌত্র। রাধানাথ – জয়গোপাল – প্রবোধ চন্দ্র – সুবোধ চন্দ্র। প্রবোধ চন্দ্রের স্ত্রী ঐ আমলের তৃতীয় কুমুদিনী। তাঁর দুটি সন্তান। সুবোধ চন্দ্র ও ইন্দুমতী। অন্তর্জালে যাঁরাই দু চার কথায় কুমুদিনী বসুর অণু জীবনী লিখেছেন, তাঁরা দুই নয়, এই তিন কুমুদিনীকে গুলিয়ে ফেলেছেন, কারণ অদ্ভুত ভাবে তিনজনেরই বাপের বাড়ি মিত্র, আর শ্বশুর বাড়ি বসু। তৃতীয় জনের ক্ষেত্রে বসুমল্লিক পদবীর বসু অংশটি প্রাথমিক। মল্লিক হল জমিদারদের মুসলমানী উপাধি।

– আগের দুই কুমুদিনী লেখিকা। ইনিও কি লেখিকা?

– না তেমন কোনো তথ‍্যপ্রমাণ পাইনি।

– দেখো মা, আমার কাছে কিন্তু কুমুদিনীদের রহস্য সব সহজ হয়ে যাচ্ছে।

– কীরকম?

– প্রথম কুমুদিনী মিত্র যাঁর স্বামী অতুল বোস, আর বাবা মদনমোহন মিত্র, তিনি লেখিকা কিন্তু বিপ্লবী নন।

– ঠিক।

– তৃতীয় কুমুদিনী মিত্র, যাঁর স্বামী প্রবোধ বসুমল্লিক আর বাবা রাজকৃষ্ণ মিত্র, তিনি লেখিকা বা বিপ্লবী নন।

– হুম, লেখিকা নন দেখা যাচ্ছে। কিন্তু যাঁর ছেলে সুবোধ মল্লিক, তাঁর বিপ্লবী চেতনা ছিলনা, একথা কি হলফ করে বলা যায়!

– সুবোধ মল্লিক কে গো মা?

– তিনিও একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। রাজা উপাধিটা তিনি দেশবাসীর কাছ থেকে পেয়েছেন। ইংরেজের উমেদারি করে নয়। উইকিপিডিয়ায় পড়ে নিস।

– আচ্ছা, দ্বিতীয় কুমুদিনী মিত্র লেখিকা, বিপ্লবী। আবার বলছো, বিপ্লবী ক্রিয়াকলাপের ব‍্যাপারে তাঁর নামের সঙ্গেই নিবেদিতার উল্লেখ রয়েছে। বিকাশ বোস তাঁর মা কুমুদিনীর সঙ্গে নিবেদিতার কাজের গল্প করে গেছেন। সেটা স্বকর্ণে শুনেছে বাবলি মাসি। সাক্ষী জীবিত। আবার ওনার লেখা বইও তোমার কাছে আছে জ্বলজ‍্যান্ত প্রমাণ। বিপ্লবী, লেখিকা, নিবেদিতার সহযোগী যে কুমুদিনী, তিনিই আমার পূর্বপুরুষ। এতে তো আর কোনো সন্দেহ নেই।

– সন্দেহ তো আজ আমারও নেই। অন্তর্জালের ভুল তথ‍্যগুলো যে কাঁটা ফোটাচ্ছিল, সেগুলো সব উপড়ে ফেলা গেছে। কিকরে নিঃসন্দেহ হলাম, সেই গল্পটাই তো বলছি।

– আচ্ছা মা, একটা কথা মনে হচ্ছে। হয়তো অবাস্তব, বলবো?

– হ‍্যাঁ, বলনা।

– তোমাদের তো বংশলতিকা হারিয়ে গেছে। শুধু জানো মহেশচন্দ্র রামরাম বসুর প্রপৌত্র। এমন নয় তো, যে
রাধানাথ বসুমল্লিকের ভাই যে মহেশচন্দ্রের কথা বললে সেই মহেশচন্দ্রই দেব বাড়ির জামাই। কারণ জীবনকালের সময়টা মিলে যাচ্ছে। রাধানাথের বংশধরেরা বাবার পদবী বসুমল্লিক থেকে বসু অংশটি ত‍্যাগ করলেন আর মহেশচন্দ্র গৃহত‍্যাগ করেছেন, ঘরজামাই হয়েছেন বলে উপাধি মল্লিক ত‍্যাগ করে শুধু বসু হলেন?

– সেটা কিকরে বলি বল?  আরও প্রমাণ না পেলে নির্দিষ্ট করে কিছুই বলা যায়না।  পারিবারিক শ্রুতি থেকে জেনেছি যে মহেশচন্দ্র তাঁর মামার বাড়ির সূত্রে নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের ভূসম্পত্তি পেয়েছিলেন। উত্তর চব্বিশ পরগণার বারাসতে বিশাল জমি ছিল একথা আমরাও জানতাম। আমার বড় বয়সে মানে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ঐ সম্পত্তি বিক্রি হয়। তখন আমার মা, মামারা, মাসিরা প্রত‍্যেকে এগারো হাজার টাকা করে ভাগে পেয়েছিল। বাবলিদিরা পরিবারের সকলে মিলে সেখানে মাঝে মাঝে বেড়াতে যেত, ওদের বাবা কাকারা সেখানে পুকুরে মাছ ধরতেন।

– নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রও জড়িত?

– সরাসরি জড়িত বলা যায়না। কিন্তু একটা যোগাযোগ তো আছেই। আন্দুলের রাজা রামলোচন রায়, শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণদেব এবং নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় সমসাময়িক। তিনজনেরই ধনভান্ডারের উৎস হল নবাব সিরাজদৌল্লার তোষাখানা। তবে আমাদের বংশের ইতিহাসে অন্য পরিবারগুলি ঘুরে ফিরে এলেও কৃষ্ণচন্দ্রের সঙ্গে এই ক্ষীণ  যোগাযোগ এই একবারই আমি খুঁজে পেয়েছি।

– জেঠিমা, আমারও একটা ভীষণ অবাস্তব কথা মনে হচ্ছে।

– কী।

– তুমি আগে বলো রাধানাথ বসুমল্লিকের মায়ের নাম কি জানো তুমি?

– হ‍্যাঁ। সেটা অন্তর্জালে লেখা আছে। তিনি পটলডাঙার ধনী ব‍্যবসায়ী কৃষ্ণরাম আইচের মেয়ে শঙ্করী আইচ।

– জেঠিমা, শঙ্করী আইচ থুড়ি বসুমল্লিকের ছোটোছেলে রহস্যময় মহেশচন্দ্র, তাইতো?

– হ‍্যাঁ।

– জেঠিমা!!

– বল।

– শঙ্করীর সিঁদুর কি তোমার মামার বাড়িতে পুজো হচ্ছে? উনি কি সতী হয়েছিলেন?

– সে কি আর আমি খুঁজিনি ভেবেছিস? কিন্তু কোনো সূত্র নেই। বড় বড় পরিবারের ব‍্যাপার। না জেনে কিছু বলা উচিত নয়।

– আইচ পরিবারে কি সতী হওয়ার চল ছিল?

– ছিল মনে হয়। প্রাণকৃষ্ণ দত্ত ওনার বইতে লিখেছেন যে সরসুনার বিখ্যাত সীতারাম আইচের দুজন উত্তর পুরুষ রামগোপাল আইচ ও জগন্নাথ আইচ পটলডাঙায় বিরাট বাড়ি করে থাকতে শুরু করেন। এই জগন্নাথ আইচের বৌ নাকি সতী হয়েছিলেন। তিনি চিতায় ওঠার আগে একজন বৌকে নিজের নথ খুলে দিয়ে যান। সেই বৌকে নাকি লেখক দেখেছেন।

– ওরে বাবা! বইটা কবে লেখা?

– আমি যেটা দেখেছি, সেটার প্রকাশ কাল ১৯৮১।

– সতীদাহ প্রথা রদ হয়েছে কবে?

– ১৮২৯।

– সর্বনাশ মা, রাউন্ড করে ১৯৮০ ধরছি। এবারে যদি ধরা যায় পঞ্চাশ বছর আগে লেখক কোনো আশি বছরের বৃদ্ধাকে দেখেছেন, তাহলেও তো ১৮২৯ এ পৌঁছনো যায়না।

– হুঁ, ১৮৫০ এ পৌঁছনো যায় বড়জোর।

– তার মানে সতীদাহ রদ হবার পরেও সতী হত।

– তাইতো মনে হচ্ছে। তবে আইন করে হঠাৎ নৃশংস প্রথা বন্ধ তো হয়না। জনচেতনা আসতে সময় লাগে।

যাক গে, এসব থাক, ভেবে লাভ নেই। আমরা কুমুদিনীর গল্প করছিলাম।

– থাকবে কেন জেঠিমা? মহেশের স্ত্রী তো কুমুদিনীর শ্বশুরমশাইয়ের মা। মানে দিদি শাশুড়ি, যিনি সতী হয়েছিলেন, যার জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পরিবার এখনও প্রায়শ্চিত্ত করছে। তিনি কে যাতে জানা যায়, সেই চেষ্টা তো করতে হবে।

– অনেক সমস্যা আছে।

– কী বলোনা।

– দেখ আমি অনেক কিছু খুঁজে বার করেছি। যা পারিনি, সেগুলো তোরা বার করবি। আর তোরা না, ফোকাস রাখতে পারিস না। শুরু তো করেছিলি, রবীন্দ্রনাথ আর বিবেকানন্দকে নিয়ে। এখন সেকথা ভুলে গিয়ে এখন মহেশচন্দ্র, আইচ পরিবার নিয়ে পড়েছিস।

– আরে, হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ। গল্পের তালে সব গুলিয়ে যাচ্ছে। লীলাবতীর মানে কুমুদিনীর মায়ের বিয়ে থেকে দিদিশাশুড়ির বাপের বাড়িতে চলে গেছি।

দেখো মা, কুমুদিনীর পরিচয় রহস্য যখন সলভড, তখন রবীন্দ্রনাথ আর বিবেকানন্দ যে ছোটোবেলাতেই লীলাবতীর বিয়েতে গিয়েছিলেন, সেটা একরকম নিশ্চিত হয়ে যায়। যারা একে অপরকে গান শেখানো, বিয়েতে সেই গান গাওয়ার গল্প লিখছে, তারা আপাদমস্তক গপ্পো বানিয়েছে।

– মনে তো হয় তাই। নরেন যখন বিলে, ন বছর মাত্র বয়স, তখন ব্রাহ্ম সমাজে যাতায়াত বা অনুরক্ত হবার প্রশ্নই ওঠেনা, রবীন্দ্রনাথের কাছে ব্রহ্ম সঙ্গীত শেখা দূরের কল্পনা।

– কিন্তু ওনারা ছোটবেলাতেই বা লীলাবতীর বিয়েতে কিসূত্রে গেলেন – এই প্রশ্নটার তো উত্তর চাই। 

– উত্তর চাই, মানে পেলে ভালো হয়। নিশ্চিত করে জানার তো কোনো উপায় নেই।

– সেই অনিশ্চিত টাই বলো।

– দেখ, রবীন্দ্রনাথের যাওয়া টা খুবই স্বাভাবিক।

– কিকরে?

– তোদের তো আগেই বললাম। ঐ বিয়ের যে কনে, মানে লীলাবতী – তার বাবা রাজনারায়ণ বসুর সহপাঠী তো মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। এক বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে আর এক বন্ধুর ছেলে যাবে, এটা তো খুব স্বাভাবিক ব‍্যাপার। আবার উপরি হল দুই বন্ধুই ব্রাহ্ম। আত্মীয়তা ছিল কিনা সেটা তো বলতে পারবোনা। ব্রাহ্মরা তখনকার দিনেও বামুন, কায়েত, শুদ্দুর – এসব জাতপাতের বিচার কিছু মানতেন না। তাই আন্তর্বর্ণ বিয়ের চলও ছিল। লীলাবতীর ছোটো মেয়ে বাসন্তী মিত্র বিয়ের পর হলেন বাসন্তী চক্রবর্তী। চক্রবর্তী তো ব্রাহ্মণ, আর মিত্র কায়স্থ। ঠাকুর পরিবার ব্রাহ্মণ আবার বসুরা কায়স্থ। কিন্তু ধর্ম বদলে ব্রাহ্ম হবার পরে আত্মীয়তা অসম্ভব নয়, তবে কোনো তথ‍্য এবিষয়ে আমি পাইনি।

– আর বিলে মা? সে কীভাবে গেল?

– বিলে তার বাবা বিশ্বনাথ দত্ত বা মাত ভুবনেশ্বরী দেবী এঁদের কারোর পরিচিতি, আত্মীয়তা বা বন্ধুত্ব সূত্রে হয়তো নিমন্ত্রিত ছিল।  আর এটাও জেনে রাখ, বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী কিন্তু বোস বাড়ির মেয়ে। তাঁর বাবা হলেন নন্দলাল বোস। তাঁর ঠাকুরদা দেওয়ান ভবানীচরণ বোস। লীলাবতীর বাপের বাড়িও তো বোস। ঐ সূত্রে কোনো লতায় পাতায় সম্পর্ক থাকতে পারে। আবার বিবেকানন্দের এক সম্পর্কে মাসি, নন্দলাল বোসের ভাই হরলাল বোসের মেয়ে, কৈলাস চন্দ্র বোসের বোনের বিয়ে হয়েছিল প্রেসিডেন্সির খ‍্যাতনামা অধ্যাপক রামচন্দ্র মিত্রের সঙ্গে। কৃষ্ণকুমারও তো মিত্র। তিনিও অধ্যাপক। সেদিক দিয়েও সম্পর্ক সম্ভব। আজ এতদিন পরে প্রামাণ্য নথি ছাড়া নির্দিষ্ট করে কিছু বলা অসম্ভব। 

তবে একটা কথা জেনে খুব অবাক হয়েছি জানিস? যদিও কথাটা আমার মূল কাহিনীতে অপ্রাসঙ্গিক।

– কী কথা?

– বসুদুলালী ভুবনেশ্বরী দেবী বিদূষী তো বটেই, এমনকি, ইংরেজি শিক্ষিত মহিলা। বাপের বাড়িতে তাঁর জন্য মেমসাহেব টিউটর আসতেন। আর বিবেকানন্দের ইংরেজিতে হাতেখড়ি মায়ের কাছেই হয়েছিল এবং তিনি স্মৃতিধর ছিলেন, যে গুণের পরাকাষ্ঠা তাঁর বিশ্ববিজয়ী পুত্রের মধ্যে প্রকাশ পায়।

– এ্যাঁ, বলো কি গো।

– কিন্তু সারাটা জীবন তাঁর দুঃখে ভরা – জনমদুখিনী।

– কেন?

– তাঁর স্বামী বিশ্বনাথ দত্ত জন্ম থেকেই অনাথবৎ। কারণ তাঁর পিতা দুর্গাচরণ পুত্রের মুখ দেখে সন্ন্যাসী হয়ে যান। বিশ্বনাথ কাকার সংসারে মানুষ। তাঁর স্ত্রীও ঐ খুড়শ্বশুরের অন্দরমহলে চিরকাল কষ্ট সয়েছেন। বিশ্বনাথ নামী আইনজীবী। অনেক টাকা রোজগার করতেন। কিন্তু যৌথ পরিবার তো। ভুবনেশ্বরীকে খুড়শাশুড়ির দাপটের তলায় আধপেটা খেয়ে থাকতে হত। যেদিন সংসারে কর্তৃত্ব পেলেন, সেসময়ে বিশ্বনাথ চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। বিশ্বনাথের মৃত্যুর পর নিদারুণ অন্নকষ্টও সইতে হয়েছে। শেষ আঘাত আসে, যেদিন ভুবনেশ্বরী একষট্টি বছর বয়সে বেলুড়ে তাঁর ভুবনজয়ী পুত্রের মরা মুখ দর্শন করেন।

– হায় হায়। এযে সহ‍্যের অতীত ব‍্যথা গো মা।

– মনে ভাবি, ভারতবর্ষের ট্র‍্যাজিক নায়িকা শুধু তো রামায়ণের সীতা নন। এই ভুবনেশ্বরী, কুমুদিনী – এঁরাও তো এক একজন সীতা,  সকলেই নিজের বৃত্তে ট্র‍্যাজেডি কুইন। শুধু তাঁদের নিয়ে কোনো মহাকাব্য রচনা হয়নি, এইটুকু তফাৎ। তোদের বলেছিলাম না, যে লাবণ‍্যপ্রভার জীবনও সীতার মতো।

– ভুবনেশ্বরী ঐ ব‍্যথার দামে যে অমর হয়েছেন মা।

– ঠিকই। কিন্তু ভুবনবিজয়ী ছেলে না থাকলে ভুবনেশ্বরীর ব‍্যথাও আর পাঁচটা মেয়েলি যন্ত্রণার মতো হারিয়ে যেত না কি?

– হ‍্যাঁ, তা যেত।

– যোগ‍্য উত্তরসূরী না থাকার জন্য, এত কিছু করেও কুমুদিনী হারিয়ে গেছেন। অন্তর্জালে একটা ছবি পর্যন্ত নেই। যার জন্য এত ভুলভ্রান্তি উধোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে খবর ওনার নামে ঘুরছে।

– জেঠিমা এই নন্দলাল বোস কি শিল্পী?

– না না, শিল্পী নন্দলাল আলাদা। ভুবনেশ্বরীর বাবা সিমলের নন্দলাল। আরও একজন নন্দলাল বোস ছিলেন, বাগবাজারে। তিনি বাগবাজারের বসুবাটীর কর্তা।

– বসুবাটী?

– হ‍্যাঁ, ঐ বসুবাটী থেকেই রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের পরে রাখীবন্ধন উৎসব শুরু করেছিলেন।

– সত‍্যি!

– হ‍্যাঁ রে, সত‍্যি।

– এই কলকাতার মাটিই যে তীর্থক্ষেত্র গো জেঠিমা। সাধে কি আর সবাই কলকাতা যেতে চায়, থাকতে চায়। আমিও চাই।

– তীর্থক্ষেত্র বলে সবাই যেতে চায়, কিন্তু থাকতে চায় অন‍্য কারণে।

– কী কারণ?

– কী আবার, কলকাতা ছাড়া, বাকি বাংলা তুলনায় অনুন্নত, সুযোগ সুবিধে কম বলে।

– হা হা, তা ঠিক।




























পাকশালার গুরু… (পর্ব আট)

আমাদের সূর্য মেরুন

দিন চলে যায় নিজের মতো। কন‍্যারা বড়ো হচ্ছে। দুই কন‍্যার আবদারে এক বিকেলে চিকেন আনা হলো বাড়িতে। খাসির মাংস তাদের ফেভারিট তালিকায় পড়েনা। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগেও বক্সি বাড়ির রান্নাঘরে মাংস ছিল নিষিদ্ধ বস্তু। আমার শ্বশুর মশাই বাড়িতে মাংস রান্না শুরু করেন। কিন্তু দাদাশ্বশুরমশাই তারিণীপ্রসাদের আচার বিচারের জন্য অন্দরমহলে মাংস ঢুকতোনা। বাইরে রান্না হতো। কর্তা গল্প করেন,

‘রবিবার সাতমাইলের হাট থেকে বাবা লুকিয়ে বিকেলে খাসির মাংস আনতো, কিন্তু কলাপাতায় মুড়ে মাংসটা জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা হতো। বিকেলে দুধ খই খেয়ে নিলে, দাদামশাই আর হেঁশেলের দিকে আসতেন না। তখন রাতে ভিটের মধ‍্যেই গাছের আড়ালে বাবা মা হারিকেন জ্বালিয়ে মাংস রান্না করতো। আমি আর তপু দুপুর থেকে উত্তেজনায় ফুটতাম। কথাবার্তায় দাদামশাই যাতে কিছু বুঝতে না পারেন, তাই দু ভাই মিলে মাংসের সাংকেতিক নাম দিয়েছিলাম মাং। কেবলই খোঁজ নিতাম, “মা, বাবা মাং আনলো?” রাত্তির বেলা গরম গরম মাংস আর আলুর ঝোল দিয়ে ভাত – মনে হতো ওটাই স্বর্গ। কিন্তু তপুটা ছোটো তো, উত্তেজনায় ঘুমিয়ে পড়তো। মা ওর জন্য হাড়ওলা টুকরো বেছে বাটি করে রেখে দিতো। রাত দেড়টা, দুটো যখন খিদের চোটে ওর ঘুম ভেঙে যেতো, তখন একা একা উঠে কুড়ুর মুড়ুর করে হাড় চিবোতো। খুব ছোটো থেকেই ওর দুর্জয় সাহস। অন্ধকার বা কোনো কিছুতে ভয় পায়না। দাদামশাই মারা যাবার পর রান্নাঘরেই মাংস রান্না শুরু হলো, বাধা নিষেধ রইলোনা।’

যা হোক, এসব যেন গত জন্মের কাহিনী। বর্তমানে, সন্ধেবেলায় কন্যা এসে আগ্রহ ভরে জিজ্ঞেস করে,
– আজ চিকেনের কি প্রিপারেশন হবে মা?
– চিকেন হরিয়ালি করবো।
– সেটা কিভাবে হয়?
– চিকেনটা কিউব করে কেটে নিতে হবে। বোনলেস বা উইথ বোন যে কোনোটাই চলবে। আমি এখন হাড় সমেত করছি।
– হরিয়ালি হবে কি করে?
– চিকেনে রসুনটা বেশি লাগে আদা কম। খাসির মাংসে ঠিক উল্টো। এটা তিনকেজি চিকেন রান্না হচ্ছে। আমি দুমুঠো  রসুনের কোয়া, একমুঠোর একটু কম কাঁচা লঙ্কা, তুলনায় অল্প আদা, দু আঁটি ধনে পাতা আর দু আঁটি পুদিনা পাতা একসঙ্গে মিক্সিতে পিষে নিয়েছিলাম বিকেলে। এই মশলাটা চিকেনে খুব ভালো করে মাখিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। এর সঙ্গে পরিমাণ মতো ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়ো আর টক দই মিশিয়ে মাংসে মেখে নিয়েছি। সেই বিকেল থেকে মশলা মাখা মাংস ঢাকা দিয়ে রেখে দিয়েছিলাম, এখন ঘন্টা তিনেক হয়ে গেছে। তাই সাদা তেলে গরম মশলা, গোল মরিচ আর শা জিরে ফোড়ন দিয়ে এখন পেঁয়াজ কুচো ভাজছি। ভাজা হয়ে গেলে ওতে মশলা মাখা মাংসটা ঢেলে দেব। নাড়তে নাড়তে তেল ছেড়ে যাবে। আঁচ কমিয়ে একটু ঢাকা দিয়ে দিলে, চিকেন, বাটা মশলা আর দই থেকে যে জল বেরোবে, তাতেই মাংস সেদ্ধ হয়ে যাবে।

– এই রান্নাটা কার কাছে শিখেছো?

-ইউটিউব। তবে ভেটকি মাছেও এই প্রিপারেশনটা ভালো লাগে। অবশ‍্য পেঁয়াজ, রসুন সব কম লাগবে মাছ দিয়ে করলে।

– আচ্ছা, করো দেখি।
বলেই সে দিদিকে হাঁক দেয়, দিদিরে আজ সবুজ রঙের তৃণমূল চিকেন রান্না করছে মা।

– এ্যাই, বদমাইশ, কোনো কিছু সবুজ হলে তৃণমূল হয়ে যায়?

– এখন হচ্ছে তো মা। দেখছো না সবুজ প্লাস্টিকের চেয়ার হলো। লাল কার্পেট উঠে চারদিকে সবুজ কার্পেট হচ্ছে ফাংশনে।

– শোন রক্ত সবুজ হয়না, গাছের পাতা লাল হয়না।

এবারে কন‍্যার বিজ্ঞ দিদির হাসিমুখে আবির্ভাব হয়।

– লাল সবুজ তো ঠিক আছে জেঠিমা। রং দে তু মোহে গেরুয়ার কী হবে?

– কেন, গেরুয়া রং খুব ভালো। ত‍্যাগের রং, জাতীয় পতাকার প্রথম রং। বিবেকানন্দের জোব্বার রং।

– বিবেকানন্দ? খুব ভালো মানুষ। আমার মতোই খেতে ভালোবাসতেন। আজও বেলুড় মঠে ওনার রেসিপিতে খিচুড়ি হয়, চাটনি হয়। কিন্তু বিবেকানন্দের সব কথা তুমি মানো জেঠিমা?

– মোটামুটি মানি। উনি আমার শক্তি। আমার ইনস্ট‍্যান্ট এনার্জি ট‍্যাবলেট।

– কিন্তু সীতা সাবিত্রীর কথাটা। মেয়েরা এখনও সীতা হবে? পিতৃতন্ত্রের তলায় পিষ্ট হয়ে থাকবে?

– সীতাকে তুই খুব দুর্বল চরিত্র মনে করিস? আমি মনে করিনা। আমি একজনের কথা জানি, যিনি সীতার মতো হয়েছিলেন।

– কে বলোতো?

– আমার দিদা, লাবণ‍্যপ্রভা।

– আবার গল্পরে বোনু। মাঝপথে জেঠিমা যেন না পালায় দেখ।

– আরে না না। রান্নাটা হয়ে গেলেই মাকে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে দেবো।

– দেখবি? বড্ড জ্বালাচ্ছিস তোরা।

রান্না হয়ে গেলে দুই মেয়েকে নিয়ে দাওয়ায় বসি।

– লাবণ‍্য দিদার সংসারের গল্প বলো মা।

– গল্পটা পুরোটা লাবণ‍্যপ্রভার নয় রে, বলতে পারিস মায়ের ঠাকুমা, মায়ের মা,  আমার মা আর আমার গল্প মানে কুমুদিনী, লাবণ্য, কৃষ্ণা আর শারদার গল্প।

– আচ্ছা বলো।

কবে সেই চাঁদ উঠেছিল যেন,
কবে জ্বলেছিল রবি।
আঁকতে পারিনা, শুধু লিখে যাই,
স্মৃতিপটে দেখা ছবি।

ইস্কুলে ছুটি হতো বিকেল সাড়ে চারটে। মায়ের সঙ্গে নিবেদিতা লেন থেকে শ‍্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় অবধি হেঁটে যেতাম। সেখান থেকে বাস। গিরিশ এভিনিউ আড়াআড়ি পেরিয়ে শ‍্যামপার্কের গলি, একটু এগিয়ে নববৃন্দাবন। তার পর ডানদিকে শ‍্যামপার্ক, বাঁদিকে সেনবাড়ি ছাড়িয়ে মণীন্দ্র কলেজের পাশ দিয়ে ভূপেন বোস এভিনিউ। তারপর সোজা মোড় অবধি হাঁটা লাগাতাম। নববৃন্দাবনের পথে ঝুলনের আগে মাটির পুতুলের পশরা বসতো। আর দেখলেই আমি খুব বায়না করতাম। আইসক্রিম ওলা, নাড়ুগোপাল, পুলিশ, ঘড়া কাঁখে ঘোমটা মাথায় মেয়ে, গোরু, হাতি, বর বৌ। এক একদিন বায়নায় পাগল হয়ে মা পুতুল কিনে দিত। দুহাতে দুটো পুতুল নিয়ে রানীর মতো বাড়ির পথ ধরতাম। কিন্তু যেদিনই শিকে ছিঁড়ত,  সেদিনই কেমন করে জানি বৃষ্টি এসে যেত। প্রাণপণ নিজে ভিজে পুতুল বাঁচাতাম। কোনোদিন হয়তো শ‍্যামবাজারের কোনো সহৃদয় দোকানি একটা প্লাস্টিকের প‍্যাকেট দিয়ে পুতুল মুড়ে দিতেন। যখন সেগুলো বাড়ি আসত, কোনোটার অভ্র ঝরে গেছে, অথবা কাঁচা মাটির ওপর রঙ চটে গেছে। তবু আনন্দের ঘাটতি ছিলনা। হোকনা ছাল ওঠা, নাক ভাঙা, আমার ভান্ডার কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। সেগুলো সাজিয়ে ঝুলন করতাম।

ঐ শ‍্যামপার্কের পাশে সেনবাড়ি হলো আমার একরকম মামার বাড়ি। মামারা ছিলেন বয়স্ক। মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে গিয়ে দেখা করে আসতাম। আর নারান মামা প্রায়ই সেনবাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে আসতেন। নারান মামা বাসে উঠতে পছন্দ করতেন না। বাগবাজার থেকে হেঁটে হেঁটে পাতিপুকুরে আমাদের বাড়ি যেতেন। মাকে ডেকে বলতেন, “রাজকুমারী একটু ভালো করে ডাল করো তো। ও বাড়িতে কত লোক। চৌবাচ্ছায় ডাল ঢালা হয়। ফোড়নের গন্ধ পাইনা।” সেনবাড়ির যৌথ পরিবারের সদস্য অনেক। তাছাড়াও অতিথি অভ‍্যাগতের ঢল লেগে থাকত। রান্নার ঠাকুরেরা শেষের দিকে উপায়ান্তর না দেখে ডালে ভাতের ফ‍্যান মেশাতো। আর সেটাই নারান মামার রাগ। নারান মামা সেনবাড়ির হেঁশেলের গল্প করতেন। আমরা অবাক হয়ে শুনতাম।

সেনবাড়িতে সকালে বিকেলে দুশো আড়াইশো করে লোকের পাত পড়তো। একে একান্নবর্তী পরিবার, তায় তার আশ্রিত, আত্মীয়, অনাহুত, রবাহূত কেউই অভুক্ত থাকতোনা। সব গিন্নিরা সকাল হলেই কাজে লেগে পড়তেন, আর তাঁদের সাহায্য করার জন্য ছিল বিহারী ঠাকুরের দল। তারা বংশ পরম্পরায় ও বাড়িতে থাকতো। সেনবাড়ির কিছু ভূসম্পত্তি আছে শিমূলতলায়। সেখান থেকেই এককালে তারা এসেছিলো।

– এখনও আছে মা?

– হ‍্যাঁ, এখনও আছে। মায়ের কাছে শুনেছি, আমার দাদুরও শিমূলতলায় জমি বাড়ি ছিলো।

– আমরা যাবো জেঠিমা। শুনেছি খুব সুন্দর জায়গা।

– কি করে যাবি? মায়ের ভাগের সেসব সম্পত্তি এখন কিছুই নেই। দাদু সব উড়িয়ে দিয়েছে। গেলে টুরিস্ট হয়ে যেতে হবে।

– আচ্ছা, তারপর বলো।

– সেনবাড়িতে দুটো খুব বড়ো বড়ো ঘর ছিলো। একটা ভাঁড়ার ঘর, আর একটা কুটনো কোটার ঘর। আর রান্নাঘর ও দুটো ছিলো, একটা নিরামিষের আর একটা আমিষের জন্য।

– ভাঁড়ার কি গো মা?

– ভাঁড়ার মানে ভান্ডার। সেখানে চাল ডাল তেল মশলা চিঁড়ে মুড়ি যা যা খ‍্যাঁটনে লাগে সব থাকতো। সেকালে সব বাড়িতেই আলাদা ভাঁড়ার ঘর থাকতো। গিন্নিরা সকালে বাসি কাপড় ছেড়ে, কাচা কাপড় পরে, তবেই রান্নাঘরের জিনিষে হাত দিতে পারতো। চুল টান করে বেঁধে রাখতে হতো, যাতে রান্নার উপকরণে চুল না পড়ে যায়। অনেক বড় বড় পরিবারে মুখে কাপড় বেঁধে রান্না করতে হতো, বাটনা বাটতে হতো, যাতে কথা বলতে গিয়ে থুতু না ছেটায়। আবার মার কাছে শুনেছি আমার দিদা ভাঁড়ার ঘরে বসে লুকিয়ে পড়াশোনা করতো।

– অতো সম্পর্ক বলতে হবেনা জেঠিমা। কুমুদিনী, লাবণ্য, কৃষ্ণা সব নাম ধরে বলো। আমরা বুঝে নেবো। লাবণ্যকে লুকিয়ে পড়াশোনা করতে হতো কেন? তাছাড়া ভাঁড়ার ঘরে তো দাসদাসী সকলেই ঢুকবে, লুকোবে কি করে?

– এই কথাটা ছোটোবেলায় আমিও কৃষ্ণাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে গল্প অন‍্য রামায়ণ। এখন মহাভারত শোন। মোহনবাগানের মহাভারত।

– বুঝলাম না, মোহনবাগানের মহাভারত মানে?

– মানে হলো, সেনবাড়ির সঙ্গেই জুড়ে আছে মোহনবাগান।

– কি বলছো মা! ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের মোহনবাগান? তাড়াতাড়ি বলো, ফাস্ট।

– বলছি তো রে বাবা। তোরাই তো ট্র‍্যাক চেঞ্জ করে গুলিয়ে দিচ্ছিস। সেনবাড়ির বিশাল ভাঁড়ার ঘরে থাকতো এক পেল্লাই দাঁড়িপাল্লা। একজন হেড গিন্নি থাকতেন। তিনি কখন কার কি দরকার বুঝে রোজকার চাল ডাল মশলাপাতি বার করে দিতেন। আর কুটনো কোটার ঘরে সব বৌদের আলাদা আসন পিঁড়ি আর নাম লেখা বঁটি থাকতো।

– নাম লেখা বঁটি?

– সেযুগে বাসন কোসনেও নাম লেখানোর খুব চল ছিলো। আমার ছোটোবেলায় মায়ের নাম লেখা গেলাস, আমার নাম লেখা থালা বাটি ছিলো।

– কিভাবে লিখতে মা? মার্কার পেন দিয়ে?

– আরে না রে পাগল, লোক আসতো বাড়িতে, যারা বাসনের গায়ে ঠুকে ঠুকে ফুট ফুট করে নাম ফুটিয়ে তুলতো।

– আচ্ছা।

– তোদের এই মৈতনার রান্নাঘরে যেমন সকাল থেকে উনুন জ্বলছে, লোক আসছে, অনেকটা এরকমই। কিন্তু এখানে যেমন রোজ পঁচিশ তিরিশ জনের ব‍্যাপার, সেনবাড়িতে ওটা দুশো, আড়াইশো। মানে আমাদের এখানকার সিস্টেম টাকে আটগুণ বড়ো করে কল্পনা কর।
সকালে জলখাবারে কোনোদিন ডালপুরী, কখনও লুচি, রুটি এইসব হতো। সঙ্গে মিলিয়ে আলু ছেঁচকি, চাকা চাকা করে আলু ভাজা, আলু মরিচ, সাদা আলুর তরকারি এইসব হতো এক একদিন।

– সব আলু?

– হ‍্যাঁ, আমাদের ছোটোবেলায় বা তার আগের যুগে লোকে খেয়ে বাঁচতো। অতো হার্টের রোগ, পেটের রোগ, ডায়াবেটিসের ভয় ছিলোনা।

– আলু ছেঁচকি কিকরে করে গো মা?
ছেঁচকি আর তরকারির মধ্যে তফাৎ কি?

– ছেঁচকিতে আলু হোক, পেঁপে হোক, অন‍্য সব্জি হোক একটু ছোটো করে কেটে জলে ভাপিয়ে নেওয়া হয়। তারপর অল্প তেলে হয় গোটা সর্ষে, নতুবা কালো জিরে, তার সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে ঐ তেলে ভাপানো সব্জি দিয়ে নেড়ে নিতে হবে। নুন মিষ্টি দেখে নামিয়ে নিতে হবে। সব্জি ভাপানো থাকে বলে, এতে কম তেল লাগে। অনেক সময়ে বাজারে আনা সব্জি পুরোনো হয়ে বুড়িয়ে গেলে তাই দিয়ে ছেঁচকি করা হয়। কিন্তু তরকারিতে আগে কাঁচা সব্জি ভেজে, মশলা দিয়ে কষে তারপর জল দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। এটাই তফাৎ।

– বুঝলাম, তারপর বলো।

– দুপুরে ডাল, চচ্চড়ি, চাটনি যাই হোক, পোনা মাছের পাতলা ঝোলটা  হতো। ওবাড়ির লোকের এমন অভ‍্যেস ছিলো, যে অনেকে ঐ জিরে ধনের ঝোল ছাড়া ভাত খেতে পারতোনা। আমার মা মানে কৃষ্ণাও অমন ঝোল রাঁধতে জানতো। মা সবসময়ে জিরেও দিতোনা। বেশিরভাগ সময়ে শুধু ধনেগুঁড়ো দিয়ে ঝোল করতো। অমৃত লাগতো।
_____—-_________—–______—

সেনবাড়ি এতোবড়ো পরিবার, সবসময়েই জন্মদিন, বিয়ে, অন্নপ্রাশন কিছু না কিছু লেগে থাকতো। আর মোহনবাগান জিতলে তো আর কথাই নেই। খেলার পরে খেলোয়াড়রা আসতো। উৎসব লেগে যেতো। চপ, কাটলেট, মাছের কচুরি, মাটন রোস্ট এসব বাড়িতেই হতো। আমার মামার বাড়িতে দিন রাত সেনবাড়ির গল্প হতো। আর নারানমামা এলে নানারকম গল্প করতো।

– মাছের কচুরি কেমন গো মা? কোনোদিন তো খাইনি।

– ওসব আমাদের কালের খাবার, বাড়িতে হতো, দোকানে পাওয়া যেতো।

– এখানে তো এতো মাছ, পুকুরের মাছ, সাগরের মাছ, এখানে করো।

– সাগরের নোনা মাছে এসব হয়না। আর পুকুর? গতকাল তো উঠলো, দেখলিনা – সি-ল-ভা-র কার্প। বনেদী খাবার দাবার এসব দিয়ে হয়না। এর জন্য রইসি রুই, কাতলা বা ভেটকি লাগে।

– কীভাবে করে?

– ভেটকি হলে কাঁটা কম। যেকোনো ধরণের পিস নেওয়া যায়। আর রুই বা কাতলা হলে পেটির দিকের টুকরো নিতো মা। ওতে কাঁটা ছাড়ানো সুবিধে হয়। টুকরো গুলো জলে নুন, হলুদ, ভিনিগার আর গোল মরিচ দিয়ে আগে সেদ্ধ করে নিতে হবে। তারপর মাছটা ঠান্ডা করে কাঁটা ছাড়িয়ে নিতে হবে। এবার পেঁয়াজ, রসুন, আদা, কাঁচালঙ্কা ভালো করে বেটে নিয়ে, ঐ মশলা দিয়ে মাছ সেদ্ধটা কষে একেবারে শুকনো শুকনো ভাজা ভাজা করে ফেলতে হবে। এতে ভাজা মশলা, গরম মশলা সবই দেওয়া যায়, আপ রুচি খানা। পুরটা রেডি হয়ে গেলে ময়দার লেচিতে পুর ভরে বেলে নিয়ে ছাঁকা তেলে ভাজতে হবে। কিন্তু বেলার সময়ে বেলন টা কায়দা করে একটু পাশ দিয়ে দিয়ে বেলতে হবে। তুই যদি মাঝখান দিয়ে চেপে বেলতে যাস, কচুরি ফেটে যাবে, তখন আর তেলে দিলে ফুলবেনা।

– শুধু বললে হবেনা। করবে একদিন।  আচ্ছা মা, সেন বাড়ির সঙ্গে তোমার কিরকম সম্পর্ক? মোহনবাগানই বা সেনবাড়ির সঙ্গে কিভাবে যুক্ত ?

– সেটা বলতে গেলে তো এককথায় হবেনা। অনেক কথা বলতে হবে। সেসব কি তোদের শোনার ধৈর্য্য আছে?

– আমাদের কী মনে করো বলোতো মা। ধৈর্য্য আছে, তুমি বলো।

– শোন তবে।

মায়ের কাছে কীর্তি মিত্তিরের বাড়ির গল্প শুনতাম, সেনবাড়ির গল্প শুনতাম। এও শুনেছিলাম বোসেরা, সেনেরা আর মিত্রেরা মিলে মোহনবাগান তৈরি করেছে। মায়েরা ছোটোবেলায় বাগবাজারে থাকত। মামারা সকলে বাগবাজারী শৈলীতে লুচিকে নুচি, লেবুকে নেবু, লুকোতেকে নুকুতে, ঘড়িতে দেড়টাকে ডেড্ডা বলতো। মুষলধারে বৃষ্টিকে উপঝ্ঝান্তে বৃষ্টি বলা হত। জানিনা কী শব্দ থেকে কথাটা এসেছে। আর সেনেদের বাড়ি উচ্চারণে হত স‍্যানেদের বাড়ি।  দিনরাত দাঁতি দা, মাল দা, বাচি দা, ভাউ দার গল্প হতো।

– এনারা কারা?

– এনারা সব মায়ের দাদা। আমার মামা। মা বলতো, জানিস সবাই মোহনবাগানের সঙ্গে যুক্ত। মা আরও বলতো মায়ের পূর্বপুরুষেরা মানে বোসেরা মোহনবাগানের তৈরির সময়ে মোটা অনুদান দিয়েছিল।

শ‍্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় পেরিয়ে, ভূপেন বোস এভিনিউ বরাবর হেঁটে, মনীন্দ্র কলেজের লাগোয়া গলি দিয়ে শ‍্যাম পার্কের পাশ দিয়ে, আমি, মা আর বোন গিরিশ এভিনিউ এ পড়তাম। বলরাম মন্দির, বোরোলীন হাউস আর গিরিশ ঘোষের বাড়ির পাশে নিবেদিতা লেন। সেই গলিতে আমাদের ইস্কুল। কিন্তু তখন জানতাম না ভূপেন বোস কে। ফেরার পথে শ‍্যামপার্কের ধারে বাগবাজারের সেনবাড়িতে যেতাম মাঝে মাঝে।পরিণত বয়সে যখন আমার কম্পিউটার হল, অন্তর্জাল সংযোগ হল, মনপ্রাণ দিয়ে আমার অনুসন্ধান শুরু করলাম। মানে টুকরো স্মৃতি, টুকরো কথা, কিছু পাঠ সূঁচ সুতো দিয়ে জুড়তে শুরু করলাম।

শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেব তাঁর পিতা গোপীমোহন দেবের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ফড়িয়াপুকুরে এক বিরাট বাগান পেয়েছিলেন। সেই বাগানই মোহনবাগান। গোপীমোহনের পালক পিতা হলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব। হয়তো গোপীমোহন পেয়েছিলেন নবকৃষ্ণের থেকে।

– পালক পিতা মানে?

– নবকৃষ্ণের নিজের পুত্র ছিলোনা বলে, তিনি দাদা রামসুন্দরের ছেলে মানে নিজের ভাইপোকে দত্তক নিয়েছিলেন।

– নিজের দাদা?

– হ‍্যাঁ। ঐ বাগান পরে গোপীমোহনের উত্তরপুরুষের কাছ থেকে কিনে নেন প্রখ্যাত পাট ব‍্যবসায়ী কীর্তি মিত্র। তিনি ঐ বাগানে তখনকার ডাকসাইটে স্থপতি নীলমণি মিত্রকে দিয়ে নকশা করিয়ে  মোহনবাগান ভিলা নামে শ্বেতপাথরের এক চোখ ধাঁধানো বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং  সেখানে বসবাস শুরু করেন, যদিও বেশিদিন এই প্রাসাদ তিনি ভোগ করতে পারেননি।

– কেন?

– প্রাসাদ তৈরির কিছুদিন পরে ওনার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর মালিক হলেন তাঁর পুত্র প্রিয়নাথ মিত্র। তিনি ব‍্যরিস্টার হরিদাস বোস, আইনজীবী ভূপেন বোস এবং আরো কয়েকজন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই মোহনবাগান ভিলার লাগোয়া মাঠে খেলা ছেলেদের নিয়ে একটা ফুটবল দল গঠন করেন। সেই দলই অনেক পথ পেরিয়ে আজকের “এ.টি.কে. মোহনবাগান”।  রাধাকান্ত দেবের সেজ মেয়ের বর মহেশচন্দ্র বোস রাজবাড়িতেই ঘরজামাই হয়ে সংসার পাতেন। এই মহেশের ছেলে শরৎচন্দ্র বসু, মায়ের মানে কৃষ্ণার  ঠাকুরদা ইংরেজদের সঙ্গে বস্ত্র ঊপকরণ রপ্তানি এবং বস্ত্র ও কাগজ আমদানির ব‍্যবসা করতেন। তাঁর স্ত্রী, কৃষ্ণার ঠাকুমা কুমুদিনী বসু লেখিকা, সমাজসেবী, সম্পাদিকা, স্বাধীনতা সংগ্রামী, ভগিনী নিবেদিতার সহযোগী। শরৎ – কুমুদিনীর ছোটো ছেলে হলেন আমার দাদু, বিকাশচন্দ্র বোস। দাদুরা পাঁচ ভাই, তিন বোন। বড়ো বোন লীলার বিয়ে হয় বাগবাজারের সেন পরিবারের অন‍্যতম প্রতিষ্ঠাতা ভবনাথ সেনের ছোটো ছেলে শ্রীশচন্দ্র সেনের সঙ্গে আর ছোটো বোন ইন্দিরার বিয়ে হয় প্রখ‍্যাত পাট ব‍্যবসায়ী কীর্তি মিত্রের নাতি এবং পি. মিত্রের ছেলে রবীন মিত্রের সঙ্গে।

– তার মানে সেন বাড়ি আর মিত্রবাড়ি কি তোমার পিসির বাড়ি হলো?

– আমার পিসি নয়, আমার মায়ের পিসি। আমার পিসি দিদার বাড়ি। মায়ের বড় পিসিমার শ্বশুরবাড়ি হল সেন বাড়ি আর ছোটোপিসিমণুর শ্বশুর বাড়ি হলো মিত্রবাড়ি। আমার পিসি তো ধান‍্যকুড়িয়ার যে গাইন গার্ডেন সবাই দেখতে যায়, সেই গাইনবাড়ির বৌ।

বড় পিসিদিদার শ্বশুর ভবনাথ সেন ইংরেজদের কাছ থেকে কলকাতার ধাপা লিজ নিয়ে, জঞ্জালের ওপরে ফসল ফলাতে সফল হন। আজ যে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি কলকাতার কিডনি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, তার সূত্রপাত ভবনাথ সেনের হাত ধরে।

– কলকাতার কিডনি কী?

– ময়দানকে বলা হয়, কলকাতার ফুসফুস। কারণ ফাঁকা জায়গা, গাছগাছালি আছে। পূর্ব কলকাতার জলাভূমিকে বলা হয় কলকাতার কিডনি। কারণ উত্তর কলকাতায় বাগজোলা খাল, মধ‍্যে কেষ্টপুর খাল আর দক্ষিণ কলকাতার টালি নালা – এই তিনটে প্রবাহ কলকাতার সব ময়লা জল টেনে নিয়ে ঐ জলাভূমিতে ফেলে। জলাভূমির মধ‍্যে মাছ চাষ হয়, মাছগুলো ঐ ময়লা জলের সঙ্গে ভেসে আসা জৈব পুষ্টিকর পদার্থ খেয়ে বেঁচে থাকে। অন‍্য কোনো খাবার দেওয়া হয়না। জলাভূমিগুলোর মাঝখানে মাঝখানে আবার সব্জি চাষও হয়। মাছ ময়লা খেয়ে ফেলে বলে, ঐ জলাভূমিতে কলকাতার নোংরা জল পরিষ্কার হয়ে যায়। ঐ ভালো জল জলাভূমি থেকে যায় কুল্টি গাং বলে একটা নদীতে। সেই নদী আবার মিশেছে মাতলা নদীতে। ঐ নদী পথ ধরে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে কলকাতার ব‍্যবহৃত জল চলে যায় বঙ্গোপসাগরে। যদি এতোবড়ো শহরের ময়লা জল সরাসরি যেতো, তবে সুন্দরবনের অনেক বেশি ক্ষতি হতো। মাঝখানে ময়লা টেনে পরিষ্কার করে দেয় বলে ঐ জলাভূমিকে কলকাতার কিডনি বলে।

– আচ্ছা, বুঝলাম। কিন্তু এর সঙ্গে ধাপার লিজের কি সম্পর্ক?

– এলাকাটাতো একই। জলাভূমিতে যেমন মাছগুলো জলের ময়লা খেয়ে বড়ো হয়, তেমন জমিতে কলকাতার ফেলে দেওয়া কঠিন বর্জ‍্যের ওপরেই চাষ হয়। কলকাতা শহর তৈরির শুরুতে  শহরের নোংরা আবর্জনা সব ফেলা হোতো সোজা আমাদের ভাগীরথী – হুগলী নদীতে মানে গঙ্গার জলে। কিন্তু ইংরেজরা দেখলো নদী থেকে খাবার জলের ব‍্যবস্থা করতে হবে। এমনিতেই গঙ্গার ঘোলাজল পানের উপযুক্ত করতে অনেক টাকা খরচ, তার ওপর ময়লা ফেললে আরও মুশকিল হবে।  তারপর বেশ কয়েক বছর ভরাট করা হোতো মজে যাওয়া খাল, নীচু জমি ওই নোংরা দিয়েই। এ ভাবেই সার্কুলার খাল বুজিয়ে সার্কুলার রোড তৈরী হয়েছে, সরু জলধারা বুজিয়ে ক্রিক রো হয়েছে। কিন্তু তারপর? কোনো স্থায়ী জায়গা তো চাই। শহর যত বপুতে বাড়ছে আবর্জনার স্তূপও বড় হয়ে যাচ্ছে।

1865 সালে পূর্ব কলকাতা জলা – ভূমির ধারে ধাপা অঞ্চলের এক (1) বর্গ মাইল অঞ্চলকে, বেছে নেওয়া হল শহরের ময়লা ফেলার জন্য। কিন্তু জঞ্জালগুলো তো কোনো কাজে লাগাতে হবে, নইলে বছরের পর বছর জমতে জমতে তো শহরটাই ঢাকা পড়ে যাবে। তাই ইংরেজরা চাইছিল, এই আবর্জনার ওপরে যেন চাষবাস করা যায়।
জঞ্জালের ওপরে চাষ করতে ভবনাথ সেন প্রথম সফল হন।

– আচ্ছা। এর সঙ্গে মোহনবাগান কীভাবে এলো?

– বলছি তো, শোন আগে।
ভবনাথ সেনের দাদা ব্রহ্মনাথ সেন ছিলেন আইনজ্ঞ। তাঁর ছেলে মণিলাল সেনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল আর এক খ‍্যাতনামা আইনজীবী ভূপেন্দ্রনাথ বসুর মেয়ে নীরোদবালার। রামরতন বসু ও দয়াময়ী দেবীর পুত্র ভূপেন্দ্রনাথ পরে আইন সভার সদস্য, জাতীয় কংগ্রেসের নেতা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। আইন ব‍্যবসার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন নিখাদ ক্রীড়াপ্রেমী। আবার মণিলাল সেন মোহনবাগানের ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটো দলেরই প্রথম অধিনায়ক। বাংলায় তিনি প্রথম রাউন্ড দ‍্য আর্ম বোলিং শুরু করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি নামকরা অ্যাটর্নি হন। মণিলাল – নীরোদবালার ছেলে দীনবন্ধু সেন বা দাঁতি সেন। মণিলাল সেনের খুড়তুতো ভাই ভবনাথ সেনের এক ছেলে হেমচন্দ্র সেনও মোহনবাগানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। দাঁতি সেন আমার দাদুর বিয়ের সম্বন্ধ করেন তাঁর শ‍্যালিকার সঙ্গে। এই শ‍্যালিকাই লাবণ‍্যপ্রভা। আমার দিদা।

– দাঁড়াও দাঁড়াও মা, সব গুলিয়ে যাচ্ছে।

– ভালো করে বোঝ, বিকাশ বোস, আমার দাদু। তার বড় ভগ্নীপতি শ্রীশ সেন বা ভূতিবাবু। এই ভূতিবাবুর জেঠতুত দাদা মণিলাল সেন। মানে আমার বড়ো পিসিদিদার ভাশুর। ব্রহ্মনাথ আর ভবনাথ তো দুই ভাই। ব্রহ্মনাথের ছেলে মণিলাল, ভবনাথের ছেলে ভূতিবাবু – মায়ের বড়ো পিসেমশাই। তাহলে ভূতিবাবুর জেঠতুত দাদা মণিলাল হলেন তো। মণিলালের ছেলে দাঁতি সেন। আর ভূতিবাবুর ছেলেরা হলো নমে সেন, হুঁকুজ সেন, বাচি সেন। এনারা তিনজন মায়ের পিস্তুত দাদা, আমার মামা। দাঁতি সেন মায়ের পিস্তুত দাদাদের জেঠতুত দাদা। একবাড়ি তো, যৌথ পরিবার। দাদার দাদাও দাদা। এবারে বুঝেছিস?

– আচ্ছা বুঝলাম। এবারে শ‍্যালিকার ব‍্যাপারটা বলো।

– দাঁতি সেনের স্ত্রী ফুলরানী সেন (বসু) চিকিৎসক আর জি করের ভাই রাধামাধব করের দৌহিত্রী এবং ফনীন্দ্রনাথ বসুর কন্যা। আর আমার দিদা লাবণ্য হলেন আর জি করের ছোটো ভাই রাধাকিশোর করের দৌহিত্রী এবং ধীরেন্দ্রনাথ ঘোষের কন্যা। ফনীন্দ্রনাথও আইনজীবী। আর ধীরেন্দ্রনাথেরা হলেন খানাকুলের ঘোষ। ইনি, এনার পরিবার  সব ব‍্যবসায়ী।

– দৌহিত্রী মানে কি?

-দৌহিত্রী মানে মেয়ের মেয়ে, মেয়ের দিকে নাতনি। ফুলরানী আর লাবণ্য দুই ভায়ের নাতনি। মানে সম্পর্কে বোন।

সেন পরিবার খেলাধূলায় খুবই উৎসাহী ছিল। দাঁতি সেন পরিণত বয়সে খ‍্যাতনামা অ্যাটর্নি হন। কিন্তু প্রথম জীবনে তিনি মোহনবাগানের খেলোয়াড় এবং পরবর্তীতে কর্মকর্তা। স্বাধীনতার পরে বেশ কিছু বছর তিনি মোহনবাগানের সহসভাপতি ছিলেন। এই দলে সেন পরিবারের অবদান শুধু ফুটবলে নয়, ক্রিকেট, হকি এবং টেনিস সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। মণিলালের আর এক পুত্র কানাই সেন ওরফে রবীন্দ্রনাথ সেনও ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটি দলেরই অধিনায়ক হয়েছিলেন। এঁদের এক ভাই সত‍্যেন্দ্রনাথ সেন বা মাল সেন মোহনবাগানে টেনিস বিভাগের প্রবর্তন করেন এবং ঐ বিভাগের সচিব ছিলেন। শুনেছি ছায়াছবির প্রয়োজনে উত্তম কুমার তাঁর কাছে টেনিসের কৃৎকৌশল শিখতে এসেছিলেন।

– উত্তম কুমার? তোমার গল্পে উত্তম সুচিত্রাও আছে?

– আছে তো। উত্তম কুমার আমার কাহিনীতে বারবার ফিরে আসবেন। সরাসরি না হলেও লাবণ্য আর কৃষ্ণার যুগটা তো উত্তমকুমারের যুগ।  তাই আসবেন। তবে সেটা শরৎ – কুমুদিনীর মেজমেয়ের মানে আমার মেজপিসিদিদার বাড়ির গল্প। এখন তো বড় আর ছোটো পিসিদিদার বাড়ির গল্প বলছি।

– তাহলে সিনেমার গল্পটা আগে হয়ে যাক জেঠিমা।

– দেখ এরকম করলে কিন্তু আমি খেই হারিয়ে ফেলবো। যা বলছি শোন। আমার পরিবারের ইতিহাস তো আর বাংলার ইতিহাস থেকে আলাদা কিছু নয়।

সেনবাড়িতে ফিরে আসি। যাঁদের কথা বললাম, তাঁরা ছাড়াও ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র সেন বা কেষ্ট সেন, খগেন্দ্রনাথ সেন বা মন্টু সেন, মন্টু সেনের দাদা দীপেন সেন। এঁরা প্রত‍্যেকেই খেলোয়াড় এবং সংগঠক হিসেবে মোহনবাগানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর একজনের কথা না বললেই নয়। সম্পর্কে তিনি মায়ের পিস্তুত দাদাদের জেঠতুত দাদা, মায়ের পিসেমশাই শ্রীশচন্দ্রের দাদা প্রিয়নাথ সেনের পুত্র। যৌথ পরিবার তো। দাদাদের তুতো দাদারাও নিজের দাদার মতো। তিনি ভাউ সেন বা জিতেন্দ্রনাথ সেন। ভাউমামাও দীর্ঘদিন মোহনবাগানের সহ সভাপতি ছিলেন। মা ভাউদা বলতে অজ্ঞান ছিল। মা লেখাপড়ায় ভালো, দেখতে সুশ্রী, পুতুল পুতুল। সেনবাড়িতে মায়ের খুবই আদর ছিল। ও বাড়িতে মায়ের স্নেহের নাম ছিল রাজকুমারী। আসল নাম কেউ মনে রাখেনি। 

কীর্তি মিত্রের পুত্র প্রিয়নাথ মিত্রও  খেলা নিয়েই বেশি মেতে থাকতেন। প্রিয়নাথের তিন ছেলে।

– দাঁড়াও দাঁড়াও মা। দুজন প্রিয়নাথ?

– হ‍্যাঁ, ভূতিবাবুর দাদা একজন, তিনি প্রিয়নাথ সেন। আর এখন যার কথা বলছি, তিনি কীর্তি মিত্রের ছেলে, প্রিয়নাথ মিত্র। খেলার মাঠে তাঁকে সবাই ডাকতো পি. মিত্র।

পি. মিত্রের  ছোটো ছেলে রবীন মিত্র হলেন মায়ের ছোটো পিসেমশাই। তিনিই পারিবারিক কারবার দেখাশোনা করতেন। বাকি দুই ছেলে হলেন শিশিল মিত্র এবং মলয় মিত্র। মা ডাকতো শিলি কাকা আর মন্টি কাকা। শিলি দাদুও আইনজ্ঞ। তাঁর মেয়ে দীপ্তির সঙ্গে বিয়ে হলো মায়ের বড় পিসির ছেলে বাচি সেনের। মন্টি দাদু বিয়ে করেনি। দীপ্তি মামীমার মাকে আমার মা ডাকত পেনি খুড়িমা বলে। তাঁর বিবাহ পূর্ব নাম অম্বালিকা দত্ত। আর এই মামীমা যেহেতু মিত্র বাড়ির সূত্রে আমার মাসি, মা এবং মামারা ওনাকে খুকুদি বলে ডাকত। বাচি সেনের বড়দা নমে সেনের স্ত্রী রেখা সেন ছিলেন এন্টালির দেব বাড়ির মেয়ে। ঐ বংশের প্রথিতযশা কন্যা নবনীতা দেবসেন। মোহনবাগান ই – লাইব্রেরি ফেসবুক পেজে নবনীতা দেবসেনের একটা চমৎকার ছড়া পড়েছি।

‘ “যদি মোহনবাগান জেতে,
ঢাকঢোল আর সানাই নিয়ে
উঠবে শহর মেতে।

যদি মোহনবাগান হারে?
এক মিনিটে লোডশেডিং হয়
হৃদযন্ত্রের তারে।”

মায়ের বড় পিসির আর এক ছেলে হুঁকুজ সেনের বিয়ে হয় চিকিৎসক আর জি করের আর এক ভাই রাধারমণ করের দৌহিত্রী এবং জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসুর কন্যা পূরবীর সঙ্গে।  রাধাগোবিন্দ কর বা আর জি কর নিজে নিঃসন্তান ছিলেন।

যদিও এইসব প্রজাপতি নির্বন্ধ ঘটেছিল, মোহনবাগানের জন্মের পরে। বোস, সেন আর মিত্র পরিবারের নেতৃত্বে মোহনবাগানের জন্ম হয়। এঁদের সঙ্গে লতায় পাতায় ছিল কর এবং দেব পরিবার। এমনিতেই প্রভাবশালী কায়স্থদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মোহনবাগানের জন্মের পরে দেখছি এই পরিবারগুলি বৈবাহিক প্রজাপতির পাখায় পাখায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী প্রজন্মের এই বাড়তি বন্ধুত্ব বা ভরসা হয়তো তৈরি হয়েছিল এই মোহনবাগান আবেগকে কেন্দ্র করে। আমি ভাবি, যেহেতু আমার দিদা লাবণ্য আর. জি. করের নাতনি এবং দাদু দিদার বিয়ের ঘটকালি করলেন দাঁতি সেন, তার মানে আমার এই অস্তিত্বটা মনে হয় মোহনবাগানের কাছে ঋণী।

দুই মেয়ে হাততালি দিয়ে ওঠে।
– তুমি মোহনবাগানের মেয়ে মা। তুমি হলে আমিও তাই।
– জেঠিমা আমার মামার বাড়ি তো অন‍্য। আমি কি করবো?
– এই বক্সিবাড়ি তো মোহনবাগান অন্তঃপ্রাণ। তোরও মোহনবাগানের মেয়ে হতে কোনো বাধা নেই তো।
– আচ্ছা ঠিক আছে তবে। তারপর বলো।

– বাংলায় ফুটবলের জনক নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীও শোভাবাজার রাজবাড়ি মানে দেববংশের জামাই, যাঁকে দেখে স্বামী বিবেকানন্দের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল।

– জেঠিমা, ন-গে-ন্দ্র প্রসাদ মানে গোলন্দাজ?

– হ‍্যাঁ, যাকে নিয়ে দেবের সিনেমা, সেই নগেন্দ্রপ্রসাদ।
১৮৮৫ সালে তখনকার ওয়েলিংটন, ফ্রেন্ডস, প্রেসিডেন্সি ও বয়েজ ক্লাবকে মিশিয়ে দিয়ে শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে তিনি তৈরি করেন শোভাবাজার ক্লাব। সঙ্গে ছিলেন রাজা জিতেন্দ্র কৃষ্ণ দেব। প্রায় একই সময়ে আরও তিনটে ক্লাবের জন্ম হয় – কুমোরটুলি ক্লাব, টাউন ক্লাব আর ন‍্যাশনাল ক্লাব। আর দেখ, এই ১৮৮৫ তেই প্রতিষ্ঠা হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের। ১৮৮৭ সালে নবাবজাদা আমিনুল ইসলামের পৃষ্ঠপোষণায় জন্ম নেয় জুবিলী ক্লাব। পরে (১৮৯১) এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাব। ১৮৮৯ সালে ভূপেন বসুর বাড়িতে যখন মোহনবাগানের জন্মমূহূর্তের সভা বসে, ভূপেন্দ্রনাথ তখন  তিরিশ বছরের যুবক। বয়সে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের থেকে দু বছরের আর স্বামী বিবেকানন্দের থেকে চার বছরের বড়। কলকাতা হাইকোর্টের নথি বলছে, বছরখানেক বিবেকানন্দ মানে নরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং ভূপেন্দ্রনাথ বসু দুজনে নিমাইচরণ বসুর এজলাসে আর্টিকেল ক্লার্ক হিসেবে কাজ করতেন। সময়টা সম্ভবত ১৮৮১। নিমাইচরণ বসু সেযুগের একজন মহানুভব ব‍্যক্তিত্ব। জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুমারের বংশপরিচয় ষষ্ঠ খন্ডে তাঁর কথা পড়েছি।

– বিবেকানন্দ আইনের কাজ শিখতেন?

– তখন তো বিবেকানন্দ হননি, নরেন দত্ত। না শেখার কি আছে?
নরেন্দ্রের বাবা বিশ্বনাথ দত্তও তো নামী অ্যাটর্নি ছিলেন। তবে নরেনের মন তখন অন‍্যদিকে টানছিলো।  ১৮৮০ তে নরেন্দ্রনাথ কেশব সেনের ব্রাহ্ম সমাজে যোগ দেন এবং ধর্মালোচনা ও ব্রহ্মসঙ্গীতের সুবাদে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। তবে ১৮৮১ সালে শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবার পরে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এজলাসে আইনের কাজ শেখাতেও অনিয়মিত হয়ে পড়েন। তবে লেখাপড়া চলছিল, ১৮৮৪ সালে যে বছর তিনি বি এ পাশ করলেন, ঐ বছরই বাবা বিশ্বনাথ দত্তের তিরোধান হয়। তবে আজন্ম খেলাধূলা প্রিয় বিবেকানন্দ যে ফুটবল ভোলেননি, তার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর সাধন জীবনের বিভিন্ন বক্তৃতায়।

– মোহনবাগান তৈরির সময়ে বিবেকানন্দ ছিলেন?

– না। ১৮৮৯ তে যখন মোহনবাগানের জন্ম হয়, বিবেকানন্দ তখন দেশকে চিনতে ভারত পরিভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছেন। তবে একথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে জাগে, ১৮৯৭ তে কলকাতায় ফেরার পরে নিশ্চয়ই এই দলের কথা তাঁর গোচরে আসে। ১৮৯৩ এ বম্বে থেকেই তিনি শিকাগো ধর্ম মহাসভায় চলে যান এবং বিশ্বজয় করেন। ১৮৯৮ সালে বিনয়কৃষ্ণ দেবের সভাপতিত্বে শোভাবাজার রাজবাড়িতে তাঁকে যখন সংবর্ধনা দেওয়া হয়, সেই বক্তৃতাতেও তিনি ফুটবলের উল্লেখ করেছিলেন।

আবার কেশব সেনের সঙ্গে যেমন বিবেকানন্দের যোগ আছে, তেমন তাঁর সঙ্গে মোহনবাগানও অদ্ভুত একটা সূত্রে জুড়ে আছে, পরে যথাসময়ে বলব। ১৮৯৮ এ বিবেকানন্দের সংবর্ধনার পরের বছরে মানে ১৮৯৯ সালে কলকাতায় ভয়াবহ ভাবে  বিউবোনিক প্লেগ  ছড়িয়ে পড়ে।

সে এক ভয়ানক দিন। কলকাতা কাঁপছে বিউবোনিক প্লেগের আতঙ্কে। দলে দলে মানুষ বাক্স প‍্যাঁটরা নিয়ে কলকাতা ছাড়ছেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইংরেজ সরকারের ব‍্যবস্থাপনার প্রতি অসন্তোষ এবং টীকার প্রতি সন্দেহ। প্লেগের টীকা দূরস্থান, বসন্ত রোগের টীকা দেয় এমন সরকারি কর্মচারীদেরও লোকে পথে মারতে তাড়া করছে। বাড়ির মেয়েদের টীকা বা চিকিৎসা করতে গেলে, অন্তঃপুরের আব্রু বা সম্ভ্রম যাবে, এই ভয়ে মানুষ কাঁটা হয়ে আছে। এইসময়ে রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে ভগিনী নিবেদিতা সেই প্লেগের বিরুদ্ধে জীবন পণ করে যুদ্ধে নামেন। আমার পারিবারিক শ্রুতি বলে, রামকৃষ্ণ মিশন ও ভগিনী নিবেদিতার সেই সেবা দলের সদস্য হয়ে প্লেগ নিবারণের মহৎ কার্যে ঝাঁপ দিয়েছিলেন কুমুদিনী, মায়ের ঠাকুমা। সেই সময়ে আরও একজন মানুষ নিজের আগ্রহে উত্তর কলকাতার প্লেগ আক্রান্তদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা করছিলেন। তিনি লাবণ‍্যর জ‍্যাঠামশাই – ড. আর. জি. কর। এরপর স্বাভাবিক ভাবেই রাধাগোবিন্দ ও নিবেদিতা পরস্পরের সহযোগী হয়ে ওঠেন।  কুমুদিনীর বয়স তখন আনুমানিক সাতাশ আঠাশ। তিনি ভগিনী নিবেদিতার সহযোগী হয়ে বস্তিতে বস্তিতে পরিচ্ছন্নতা আর স্বাস্থ্যরক্ষার লড়াই শুরু করেন। আসলে একাজে বেশ কিছু আলোকপ্রাপ্ত মহিলা এগিয়ে এসেছিলেন, কারণ অন্দরমহলে পুরুষদের প্রবেশাধিকার ছিলনা। লোকেরা মনে করতো অন্দরে ঢুকে কেউ টীকা দিলে, অসুস্থ মেয়েদের চিকিৎসা করলে পরিবারের আব্রু, সম্মান নষ্ট হবে। তাই তারা মরে যাবে, তাও স্বাস্থ্য কর্মী বা সমাজ কর্মীদের ঢুকতে দেবেনা। বস্তিগুলোর অবস্থা দাঁড়িয়েছিল ভয়াবহ। নর্দমাগুলো জঞ্জালে প্রায় বোজা। চারিদিকে নোংরা জল থৈথৈ। অপরিচ্ছন্নতা। তাই রোগও বাড়ছিল হু হু করে। নিবেদিতার নেতৃত্বে শিক্ষিত মেয়েরা প্লেগের লড়াইয়ে না নামলে পরিস্থিতি আরও বহুগুণ খারাপ হতে পারতো।  কিন্তু যাদের জন্য করা, তারা সহজে মেনে নেয়নি। রাগের মাথায় লোকে মাথায় গায়ে ময়লা ঢেলে দিয়েছে এমনও হয়েছে। সেই ময়লাই ঝুড়ি করে তাঁরা মাথায় তুলে নিয়ে, আবার জনসচেতনতার কাজে নেমেছেন।আমার মামাতো দিদি মানে বাবলিদি বলে আমার দাদু বিকাশ বোস খুব গর্বের সঙ্গে মায়ের এসব কাহিনী ওদের শোনাতেন। আমি তো দাদুকে দেখিনি। আমার জন্মের আগের বছর তিনি মারা যান। অন্তর্জালে বিবেকানন্দের প্লেগ ম‍্যানিফেস্টো পড়ে আমি সত‍্যি অবাক হয়ে গেছি।  একথা এখানে উল্লেখ করলাম, তার কারণ নিজের পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে চোখের সামনে খুলে গেছে কলকাতার বা বাংলার অদেখা অধ‍্যায়। মহামারী অতীতে বারবার আক্রমণ করেছে, কখনো প্লেগ, তো কখনো ম‍্যালেরিয়া, কলেরা বা স্প‍্যানিশ ফ্লু – নানা রূপে। কিন্তু জাতির জীবনসংগ্রাম থেমে থাকেনি। 

—––—————–/////—————–

– কলেরার মহামারী? আচ্ছা মা, তুমি যে ছোটোবেলায় গল্প বলতে, জামাই এসেছে, শাশুড়ি খেতে দিচ্ছে। জামাই একটু লেবু চেয়েছে বলে শাশুড়ি জানলা দিয়ে লম্বা হাত বাড়িয়ে থালার সামনে বসে গাছে লেবু পাড়ছে। সব কলেরায় ভুত হয়ে গেছে।

– হ‍্যাঁ, ঠিক মনে করেছিস। ও গল্পটার নাম গদখালির হাত। কলেরা মহামারীর গল্প।

– ওমা! আর একটা পড়ে শুনিয়েছিলে না, একজন লোক ভাবছে ম‍্যালেরিয়ার জ্বরে কাবু রামু আসছে পিছন পিছন কম্বল মুড়ি দিয়ে, আসলে ভালুক আসছে।

– হ‍্যাঁ, হ‍্যাঁ, নারায়ণ গাঙ্গুলির লেখা। ওটা ম‍্যালেরিয়ার গল্প বলা যেতে পারে।

– খুব বাজে জেঠিমা, তুমি বোনুকে সব বলে দিয়েছো, আমি শুনিনি।

– তাইতো ভারি অন‍্যায় হয়ে গেছে আমার। কিন্তু এগুলো এখন বলতে গেলে মোহনবাগানটা হবে না।

– হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ ওটা আগে শেষ করো। জেঠিমা এরপরে যখন মোহনবাগান জিতবে আমরা সেনবাড়ির মতো মাটন রোস্ট খাবো, কি বলিস রে বোনু?

– সে সম্ভব হবেনা। সেই রোস্ট সেনবাড়ির পুরিয়া ঠাকুর বানাতো। তার রেসিপি আমি জানিনা।

– ইউ টিউব দেখেও হবেনা?

– তোরা শিখে করে খাওয়া তাহলেই হবে।

– এ্যাঁ!! আমরা করবো? থাক, বাকিটা বলো।

– হুঁ, যা বলছিলাম আবার সে প্রসঙ্গে ফিরি। কলকাতার এই কুলীন পরিবার গুলির মধ্যে যেহেতু অন্দরে বাইরে লেখাপড়ার চর্চা ছিল, কোনো না কোনো সদস্যের হাত ধরে ব্রাহ্ম এবং অন্যান্য সমাজ সংস্কারক ভাবনাগুলো তাদের মধ‍্যে ঢুকে পড়েছিল। ভূপেন বসুর পুত্রবধূ মানে গিরীন্দ্রনাথ বসুর স্ত্রী মলিনা দেবী ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী দ্বারকানাথ মিত্রের মেয়ে। এই দ্বারকানাথ আবার ছিলেন বিদ‍্যাসাগরের সহযোগী। এই গিরীন্দ্র – মলিনার পুত্র কমল বসু হয়েছিলেন কলকাতার মেয়র।

শোভাবাজার রাজবাড়িতে আমার মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনী ব্রাহ্ম পরিবারের কন্যা ছিলেন। তাঁর কবিতা ও উপন‍্যাসের বইগুলিতে প্রকাশ কালের জায়গায় ব্রাহ্ম সম্বৎ ছাপা আছে। কুমুদিনী ঋষি রাজনারায়ণ বসুর নাতনি। রাজনারায়ণের আত্মচরিতে লেখা আছে, তিনি রাধাকান্ত দেবের এক নাতিকে ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। সমাজ রাধাকান্ত দেবের সতীদাহের পক্ষে আর বিধবা বিবাহের বিপক্ষে দাঁড়ানোটাই বেশি করে মনে রেখেছে। তাঁর শব্দকল্পদ্রুম, স্কুল কলেজ স্থাপনগুলি মনে রাখেনি। একথাও মনে রাখেনি যে রামমোহনের পরিবারেও সতীদাহ হয়েছে, দেব পরিবারে একটিও হয়নি। অবশ‍্য এতে সমাজকে দোষ দেওয়া যায়না। রেঁনেশার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে রাধাকান্ত আজও ভিলেন। তবে একথা আমি মন থেকে মানি ঐ বাধার পাহাড় দাঁড়িয়ে ছিল বলেই রামমোহনের আর বিদ‍্যাসাগরের জয় চিরস্থায়ী। যাকগে ঐ রাজবাড়ির কথা এখানে উঠছে, কারণ ওখানে শোভাবাজার ফুটবল ক্লাব স্থাপিত হয়েছিল এবং সাহেবদের বিরুদ্ধে খেলে নামডাক ও হয়েছিল।

এবারে কেশব সেনের প্রসঙ্গে আসি। কেশব সেনের কন‍্যা সুনীতি দেবীর সঙ্গে বিয়ে হয় কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ দেবের। নৃপেন্দ্র নারায়ণ বৃটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও প্রজাহিতৈষী এবং আধুনিক কোচবিহার শহরের রূপান্তর ও তাঁর হাতে হয়েছে। আবার এই বৃটিশ শিক্ষার হাত ধরেই কোচবিহারে আসে ফুটবল।

– এক মিনিট জেঠিমা। আমার একটা বন্ধু ইস্কুল ছেড়ে দিয়েছে। তার মা কোচবিহারে বদলি হয়ে গেছে। সে এখন সুনীতি অ্যাকাডেমিতে পড়ে। ফোন করেছিলো আমায়।

– আচ্ছা, এটা ঐ রানী সুনীতির নামেই ইস্কুল। রাজা রানী মিলেই তৈরি করেছেন। এই নৃপেন্দ্র নারায়ণের পুত্র রাজা রাজরাজেন্দ্র নারায়ণ মোহনবাগানের অন‍্যতম শুভানুধ্যায়ী হয়ে ওঠেন। তিনি মোহনবাগানের প্রথম কমিটিতেও ছিলেন। তার মানে সম্পর্কে কেশব সেন হলেন রাজরাজেন্দ্রের দাদু। এই রাজরাজেন্দ্রের এক ভাইপো মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ফুটবল আর ক্রিকেট দুটি খেলাতেই পারদর্শী ছিলেন। বিংশ শতকের চারের দশকে রঞ্জি ট্রফিতে তিনি ছিলেন বাংলার ক্রিকেট অধিনায়ক। এই জগদ্দীপেন্দ্রের বোন হলেন জয়পুরের মহারাণী গায়ত্রী দেবী। এসব কারণেই মনে হয় মোহনবাগান নিয়মিত কোচবিহার কাপ খেলতে যেত।  যা হোক, সেযুগে এত রাজা রাজড়া, ব‍্যবসায়ীদের সমাবেশের জন্যই বোধ হয় অন্তর্জালে লেখা আছে, ধনাঢ্য ব‍্যক্তিরা ব্রিটিশ আমোদের অঙ্গ হিসেবে ফুটবলের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন।

তবে মোহনবাগানের জন্মটা কেবল বৃটিশ আমোদের অনুকরণ একথা আমার সত্যি বলে মনে হয়না, কারণ ভূপেন বোস ও সেন পরিবারের উপস্থিতি। সেন পরিবার অত্যন্ত সংস্কৃতিমনস্ক এবং মানবিক। গত দেড়শো বছরে, কোনদিনই ঐ পরিবার বিরাট কোনো ব‍্যয়বাহুল‍্য করেনি, আবার ভয়ঙ্কর আর্থিক দুর্দশাতেও পড়েনি, যেটা কীর্তি মিত্রের পরিবারে হয়েছে।

গল্প শুনেছি  মিত্র পরিবারে ঠাটবাট ছিলো একেবারে পাক্কা সাহেবী। খাওয়া দাওয়া হতো টেবিলচেয়ারে, একেবারে টেবিল ম‍্যানারস, এটিকেট সব মেনে। সেযুগে সে বাড়িতে উইক এন্ড আউটিং, হোটেল, রেস্তোরাঁয় খাওয়ার চল ছিলো। বিলাসিতা ছিলো। এর উল্টো দিকে সেন পরিবার ছিলো সংযমী। তাদেরও তো ধাপার জমিদারী ছিলো। মা গল্প করতো, ধাপা থেকে গাড়ি করে প্রচুর সব্জি, বিশেষ করে ফুলকপি আর মূলো আসতো। আত্মীয় স্বজনদের বিলোনো হতো। মায়েদের বাড়িতেও আসতো। কিন্তু ব্রহ্মনাথ, ভবনাথ এই সম্পদকে মাথায় চড়তে দেননি। এই সংস্কারে ও বাড়িতে পাঁচদিনের দুর্গাপুজো না হয়ে একদিনের অন্নপূর্ণা পুজো হয়। সেই পুজো আজও চলছে। এই যাদুবলে আজও ঐ পরিবার তাদের যৌথ বাড়িতে বাস করছে এবং মণিলাল সেনের পৌত্র, দাঁতি সেনের পুত্র প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও রাজ‍্যপাল শ‍্যামল সেনের মতো বংশের কৃতি সন্তানেরা বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছেন‌। এখন শ‍্যামল মামাই ও বাড়ির কর্তা। আসলে সেন বাড়ির সূত্রে শ‍্যামল সেনের বাবা দাঁতি সেন আমার মামা। কিন্তু আর জি করের বাড়ির সূত্রে শ‍্যামল সেন আমার মামা। তিনি যখন রাজ‍্যপাল হলেন, আমরা সংবর্ধনা দিতে রাজভবনে গিয়েছিলাম।

– রাজভবনে কি আছে?

– অনেক সাজানো ঘর, মিউজিয়াম এইসব। অতিথিদের চা চক্রে চায়ে চিনি মেশানো আর নোনতায় সস মাখানোর কিংবা জামবাটি থেকে নিজের প্লেটে একটি মিষ্টি তুলে নেওয়ার চামচের মাপ যে আলাদা, অথবা কোনটার পরে কোন কাজ, এসব আদবকায়দা  তো আমরা জানতুমনা। ভুলভাল হয়ে যাচ্ছিল। রাজভবনের রাজকীয় পোশাক আর পাগড়ি পরা বয়স্ক কর্মীরা মুখে কথা বলেন না। কেবল চোখের ইশারায় ঠিকটা দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। রাজভবনের অসংখ্য ঘর, কোনটায় কোন রাষ্ট্রনেতা থাকা পছন্দ করতেন, ইন্দিরা গান্ধী এসে কোন ঘরে থাকতেন, নুরুল হাসানের জন্য শয়নঘর লাগোয়া স্নানাগারের নকশা কেমন পরিবর্তন ক‍রতে হয়েছিল, সেসব মৃদুকন্ঠে কিন্তু অনর্গল বলে চলেছিলেন গাইড। এখানে উচ্চগ্রামে কথা বলা মানা। উচ্চ শব্দে কয়েক শ বছরের প্রাচীন দেওয়াল, ছাদ, আসবাব, তৈলচিত্র, প্রত্ন সামগ্রীর আঘাত লাগে। ইংরেজ আমলের স্মৃতিচিহ্নের বিশাল অংশটির তালা খুলে দেখিয়েছিলেন গাইড। আবছা আলোয় চোখ সয়ে এলে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। চোখ আটকে গেল, দেওয়ালে ঝোলানো একটি ছবিতে। দেড়শো বছর আগেকার এক তারিখে সস্ত্রীক বড়লাট রাজভবনের ফটকে নেমে আসছেন ফিটন গাড়ি থেকে। ছবিতে মানব চরিত্রগুলির তুলনায় ফিটন গাড়িটি বড় বাঙ্ময়। পিছু ফিরতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম, ঘরের মাঝসারিতে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং কালো রঙের ফিটন গাড়িটি। এও শুনলাম কর্মীরা অনেক সময়েই অতীত চরিত্রদের পদচারণা অনুভব করেন। অনেকদিন পর্যন্ত মরা আলোয় দেখা রাজভবনের জমকালো অলিগলির ঘোর কাটতেই চাইছিলনা।

– মা, তোমার কপালটা না বেশ চওড়া। অনেক কিছু দেখেছো জীবনে।

– তোরাও দেখবি, কতটুকু আর জীবন দেখেছিস।

পারিবারিক শ্রুতিতে জেনেছি যে আমার মায়ের ঠাকুরদা শরৎচন্দ্র বোসও মোহনবাগানের জন্মে যুক্ত ছিলেন এবং অর্থসাহায্য করেছিলেন। হয়তো এমন আরো মানুষ আছেন। মোহনবাগানের প্রথম কমিটিতে তাঁদের নাম নথিভুক্ত নয় বলে মোহনবাগানের ইতিহাস থেকে তাঁরা আজ হারিয়ে গেছেন। আমার মনে হয়, প্রধান পরিবারগুলি তাঁদের জীবিকার জন্য ইংরেজ সরকারের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। তাই সরাসরি বিরোধিতা করা সম্ভব ছিলনা।  যদিও এর ব‍্যতিক্রম ভূপেন বোস। বঙ্গভঙ্গের পর প্রথম সঞ্জীবনী পত্রিকায় স্বদেশী ও বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন ব্রাহ্ম নেতা কৃষ্ণকুমার মিত্র। তিনি আমার মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনীর বাবা, রাজনারায়ণ বসুর জামাই, অরবিন্দ ঘোষের মেশোমশাই। আর ভূপেন বোস সরাসরি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। কুমুদিনী শোভাবাজার রাজবাড়িতে বসেই কলম দিয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে আগুন ঝরিয়েছেন। এতে অবশ‍্যই স্বামী শরৎচন্দ্রের পূর্ণ সমর্থন ছিল, নইলে তাঁর পক্ষে এসব কাজ সম্ভব ছিলনা। আরও একটা বিষয় আমাকে খুবই অবাক করেছে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে কৃষ্ণকুমারের কারাদন্ড হয়। তিনি আগ্রা ফোর্টে বন্দী হন। অথচ একই পথের পথিক কন্যা কুমুদিনীর গায়ে পুলিশের আঁচ লাগেনা কেন? শ্বশুরবাড়ি মানে শোভাবাজার রাজবাড়ি এবং বাকি ক্ষমতাবান পরিবারগুলির অক্ষ বা জোট কি তাঁর নিরাপত্তার ঢাল হয়ে দাঁড়ায়? দেড়শ বছর পরে ইতিহাস পুনর্গঠন খুবই কঠিন। অনেক সময়েই অনুমানের ভিত্তিতে তথ্য হাতড়াতে হয়। যদিও ১৮৮৯ সালে মোহনবাগানের জন্মের সময়ে তিনি নববধূ, কোলে সদ‍্যজাত জ‍্যেষ্ঠপুত্র সতীশ চন্দ্র। তবে পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ প্রমাণ করে মোহনবাগানের জন্মকালে জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল। এরপরেও সেকালে লেখাপড়া জানা কলেজের গন্ডিতে  পৌঁছনো মানুষজনের ওপরে ছিল ডিরোজিওর প্রভাব। এইসব কারণে আমার মনে হয় লেখাপড়া, ডিরোজিও এবং ব্রাহ্ম ও অন‍্যান‍্য সমাজ সংস্কারের সান্নিধ্যে এসে এই পরিবারগুলির মনে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হয়। সেই আবেগ ফুটবল দলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে, যা পূর্ণতা পায় ১৯১১ সালে, খেলার মাঠে ইংরেজের দল ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারিয়ে।

– মা আমার ভীষণ এক্সাইটেড লাগছে। কাল জিরে ধনে দিয়ে সেনবাড়ির মতো পাতলা পোনা মাছের ঝোল করবে?

– ঘরে তো নোনা মাছ ভর্তি। বাবাকে বল তাহলে কাল হুইল ছিপ বা জাল ফেলতে। রুই বা কাতলা যদি ওঠে। পোনা মাছ না থাকলে কিকরে ঝোল খাবি?

– বাড়িতে তো কখনো সখনো ওরকম ঝোল করো, রোজ করোনা কেন?

– কি করে করবো বল? তোর বাবা পোনা মাছ আনতে চায়না, খেতে চায়না। এ বাড়িতে তো তেল মশলা, পেঁয়াজ, সর্ষেবাটা, টক এসবের  চল বেশি। জিরে ধনের ঝোলকে বলে সেদ্ধ ঝোল। খেলে নাকি পেটে চড়া পড়ে যাবে।

–——————––//////////———–

যাকগে, এসব কথা ছাড়। আর একটা কথা জানিস?
মোহনবাগানের প্রথম  দিকের দলের একটি নাম নিয়ে আমি খুবই আগ্রহী। ইনি কে?

সেই নামটি হল দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু। মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনী বসুর প্রথম দিককার বই ১৯০৬ এ প্রকাশিত মেরী কার্পেন্টার – এর প্রকাশকও দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু।

ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে ইংরেজ মহিলা শিক্ষাবিদ মিস মেরী কার্পেন্টার কলকাতায় আসেন। রাজনারায়ণ বসুর ও অন‍্যান‍্য পন্ডিত ব‍্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। কুমুদিনীর বইতে পড়লাম যে খুব অল্প বয়সে ইংল‍্যান্ডে তাঁর সঙ্গে রাজা রামমোহন রায়ের সাক্ষাৎ হয়েছিল। তারপর থেকে তিনি ভারতবর্ষের প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। ১৮৭৬ সালে তিনি বঙ্গ মহিলা বিদ‍্যালয় স্থাপন করেছিলেন। তাঁরই জীবনী এই বই।

তখনকার নব‍্যলেখিকা কুমুদিনী সম্ভবত সিটি কলেজের অধ‍্যাপক পিতা কৃষ্ণকুমার মিত্রের পরিচয়টি কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন, তাই লেখিকার নাম ছাপা আছে শ্রী কুমুদিনী মিত্র বি. এ., বিবাহিতা বলে কুমারী লিখতে পারেননি। আজও সুচিত্রা সেনের দৌহিত্রীর নাম রাইমা দেব বর্মন না হয়ে সেন হয়, এও কতকটা তেমন। যাই হোক, পিতার সঞ্জীবনী পত্রিকার সহসম্পাদক ও সহযোদ্ধা দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির শ‍্যালক মানে, প্রথম বাঙালিনী চিকিৎসক কাদম্বিনীর ভাইও দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু। সমকালে এই তিন দ্বিজেন্দ্রনাথ কি এক মানুষ নাকি আলাদা? আবার এও হতে পারে তিনি ভূপেন্দ্রনাথের আত্মীয়। সন্ধান করছি এখনো, উত্তর পাইনি।

বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে আমার দাদু বিকাশচন্দ্রের পরিবার, আর ছোটোপিসিদিদার পরিবারে শনির দশা শুরু হয়। ১৯২১ এ আমার বড়দাদু মানে শরৎ – কুমুদিনীর জ‍্যেষ্ঠপুত্র সতীশচন্দ্রের  তেত্রিশ বছর বয়সে স্প‍্যানিশ ফ্লুতে অকস্মাৎ মৃত্যু থেকে এই বিপর্যয়ের শুরু।

– ফ্লু তে? মানে কুমুদিনীর বড়ো ছেলে জ্বর হয়ে মারা গেলো?

– হ‍্যাঁ, ডালহৌসি পাড়ায় মার্কেন্টাইল বিল্ডিংয়ে ওনার বড় অফিস ছিলো। বাবার কাপড়ের ব‍্যবসার সঙ্গে, নানা কোয়ালিটির কাগজ, তার কালি, অন‍্যান‍্য উপকরণ মানে নানারকম প্রিন্টিং গুডসের  ব‍্যবসা ছিল। দেশে তখনও কালি কলমের উৎপাদন তেমনভাবে শুরু হয়নি। ইংল্যান্ড থেকে জাহাজে টাইপ রাইটার, নানা ধরণের কাগজ, কালি কলম, পেনসিল এসব আমদানি করা হত। আর সতীশচন্দ্র এগুলো বিভিন্ন স্তরের গ্রাহকের কাছে অর্ডার অনুযায়ী সাপ্লাই করতেন। সেই অফিসের কিছু কাগজ পত্র, তাঁর স্বহস্তে লেখা হিসেবের খাতা আজও পরিবারের কাছে আছে।  যদিও কালিতে চুবিয়ে কলম দিয়ে লেখা আজ অনেকটাই আবছা  হয়ে গেছে। যাই হোক, সে সময়ে ধীরে ধীরে বড়ছেলে হিসেবে তিনি বাবার সব দায়িত্ব নিচ্ছিলেন। কিন্তু ১৯২১ এর এক বিকেলে জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, সেই যে শুলেন, আর উঠলেন না। দুদিন ঐভাবে কাটলো। তিনদিনের দিন তাগড়া জোয়ান ছেলে শেষ হয়ে গেলো। পিছনে রয়ে গেলো বাবা মা, দুটো ছোটো ছোটো ভাই, নিজের বৌ প্রতিমা, আর তিনটে বাচ্ছা – মুকুল, বকুল আর সুকুল। মুকুলের তখন সাত আট বছর হবে, বকুল তখন আড়াই, সুকুল তখন ছ মাসের।  আমার দাদু বিকাশচন্দ্রের বয়স তখন আঠেরো আর ওনার ওপরের দাদা ক্ষিতীশচন্দ্র তখন কুড়ির কোঠায়। দুজনের কারোরই সংসারের হাল ধরার বয়স হয়নি। রাজবাড়িতে আতুপুতু করে মানুষ হয়েছে। কষ্ট করে বড়ো হলে, তাও একটা ম‍্যাচিওরিটি থাকতো।
এই স্প‍্যানিশ ফ্লুতেই ১৯১৮ সালে মৃত্যু হয় চিকিৎসক আর জি করের। ১৯৯৮ সালে প্লেগ মহামারী তাঁর কাছে হার মানলেও, এবারে অন্য রূপে এসে মহামারী তাঁর প্রাণ কেড়ে নিলো।

এদিকে শোভাবাজারের বাড়িতে, বড়ো ছেলের শোক শরৎচন্দ্র সইতে পারলেন না। দুবছরের মধ‍্যে হৃদরোগে তাঁর মৃত্যু হলো। কুমুদিনী রাজবাড়িতে বসে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, কিন্তু বাড়িতে মাথায় তাঁর ডাকসাইটে ব‍্যবসায়ী শরতের ছায়া ছিলো। সেই ছায়া সরে যেতেই নানা পারিবারিক জটিলতা শুরু হলো। কুমুদিনীর পক্ষে ঠাকুর দেবতা নিয়ে কঠোর বৈধব‍্য যাপন সম্ভব ছিলোনা। তিনি তখন সেজ ছেলে সুরেন্দ্রনাথের বাড়িতে থাকতে শুরু করলেন। সুরেনকে ছোটোবেলায় হাটখোলা দত্ত বাড়িতে দত্তক নেওয়া হয়েছিল।

– কঠোর বৈধব‍্য জীবন? কীভাবে থাকতে হতো বিধবাদের?

– সময়টা উনিশ শতক। বিধবাদের নিরামিষ খেতে হতো। অনেক সময়ে স্বামীর মৃত্যুর পর কমবয়সী বিধবাদের তাঁদের বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হত। পতিগৃহে সাধারণভাবে তাঁদের স্থান হতো না। তবে কুমুদিনী যখন বিধবা হন, তাঁর বয়স একান্ন। তাই সেরকম সম্ভাবনা হয়তো ছিলোনা। সিঁথির সিঁদুর মুছে, দেহের সব অলঙ্কার খুলে ফেলে, চুল কেটে, সাদা থান পরে, এক বেলা নিরামিষ খেয়ে খিদে চেপে তাঁদের বৈধব্য পালন করতে হত। না খাওয়া থেকে হতো অপুষ্টি। ফলে অসুখ বিসুখ শরীরে বাসা বাঁধতো। শুধু আমিষ বর্জন নয়, মুসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি খাওয়ার ব্যাপারেও বাধানিষেধ ছিল, কারণ এসব খাবারকেও আমিষকে ধরা হয়। তাদের আলাদা নিরামিষ রান্নাঘর থাকতো। আলাদা খেতে বসতো। তাদের সামনে সবাই চর্ব‍্য চোষ‍্য, লেহ‍্য, পেয় খেয়ে যাবে। আর তারা সেদ্ধ ভাত, শাকপাতি খাবে, এই ছিলো বিধান। বিধবারা মুখবুজে সংসারে ঝি গিরি করবে, বাকিদের সেবা করবে, করুণার পাত্র হবে। আর ঠাকুর দেবতা নিয়ে শুদ্ধমনে পবিত্র জীবনযাপন করবে এইটেই ছিল সমাজের দাবী। বহু বিধবাকে জোর করে তীর্থক্ষেত্রে রেখে আসা হত । চোখের আড়ালে কাশী, বৃন্দাবন ইত্যাদি জায়গায় তাঁরা কীভাবে জীবন-যাপন করছে – সে খবরও কেউ রাখতো না।

– কুমুদিনীকে এসব করতে হয়নি তো মা? খুব কষ্ট।

– সেটা তো বলতে পারবোনা, কতটা রীতি উনি মেনেছিলেন বা মানতে বাধ‍্য হয়েছিলেন। তবে একটা কথা আছে জানিস।

– কী কথা?

– কুমুদিনীর দুটো ছবি আছে আমার কাছে। একটা তরুণী বয়সের পোট্রেট, মেজ ছেলে জ‍্যোতিষের মানে আমার মেজদাদুর আঁকা। হয়তো মায়ের কোনো ফটোগ্রাফ দেখে এঁকেছিলেন। আর একটা বেশ পাশ করে মুখ, পোজ দিয়ে তোলা ফটো। তখন পূর্ণ যুবতী। দুটোর একটাতেও মাথায় সিঁদুরের রেখা নেই। সাদা কালো স্পষ্ট ছবি। সিঁথি সাদা। তার মানে কি এই, যে হিন্দু পরিবারে বিয়ের পরেও উনি নিজের ব্রাহ্ম ধর্ম ধরে রেখেছিলেন?

– বলো কি মা! এযে সিনেমার মতো। যোধা কৃষ্ণ নিয়ে আগ্রা যাচ্ছে আকবরের মহলে।

– হ‍্যাঁ এখানে উল্টো। ব্রহ্ম ভাবনা নিয়ে গেলেন এমন মহলে, যেখানে গৃহদেবতা রাধারমণ – কৃষ্ণ।

– ব্রাহ্ম বিয়েতে বুঝি সিঁদুর পরায় না?

– সঠিক জানিনা, তবে না পরানোই উচিত। বইতে পড়েছি, ১৮৫০ নাগাদ যে ব্রাহ্ম বিবাহ আইন হয়, তাতে  আন্তর্বর্ণ বিবাহ ও বিধবা বিবাহ সমর্থন, বাল্য বিবাহ রদ, স্বামী বা স্ত্রী কর্তৃক দ্বিতীয় বিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ এবং বিবাহ বিচ্ছেদ স্বীকৃত ছিলো। বিবাহের রীতি হিসেবে বলা যায়, সাবালক পাত্র-পাত্রীরা ব্রাহ্ম সমাজ মন্দিরে উপস্থিত হয়ে স্ব স্ব ধর্মে বহাল থেকে ব্রাহ্ম রীতিতে সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্টে বিয়ে করতে পারতো। ব্রাহ্ম বিয়েতে সংস্কৃতের পরিবর্তে বাংলায় মন্ত্রোচ্চারণ হয় ৷ শেষে বর কনে, অভিভাবক, উপস্থিত অতিথিরা প্রার্থনা সভায় অংশ নেন এবং ব্রাহ্ম সংগীত গেয়ে বর-কনের মঙ্গল কামনা করেন। যৌতুক দেওয়া নেওয়া ও বিরাট লোক খাওয়ানো, বিলাসিতা, আড়ম্বর এসব চলেনা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শোভাবাজার রাজবাড়িতে শরৎ বোস ১৮৮৬-৮৭ সালে এইভাবে বিয়ে করেছিলেন?

আমি একটাই সান্ত্বনা খুঁজি জানিস, কুমুদিনী যদি ব্রাহ্ম ধর্ম বজায় রাখেন, তবে একাদশী পালন, চোদ্দ গন্ডা উপোস, নির্জলা উপোস, এসব বোধহয় করতে হয়নি। সঠিক জানার তো উপায় নেই, শুধু কল্পনা। 

এই শরৎ বোস চরিত্রটাকে নিয়ে এসব কথা যতো ভাবি, অবাক হয়ে যাই, অবিশ্বাস্য লাগে। নিজে ইংরেজের সঙ্গে ব‍্যবসা করছেন, সাহেব মেমের সঙ্গে দিবারাত্র খানাপিনা চলছে। প্রাসাদে বিলিতি জিনিস, ভোগ বিলাসের ফোয়ারা উঠছে। অথচ সন্তর্পণে বৌয়ের পত্রিকার টাকা যুগিয়ে যাচ্ছেন, বিপ্লব, সংগ্রামের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। বৌ প্লেগের লড়াইয়ে নামছেন, জাতীয় কংগ্রেসের পতাকা সেলাই করে দিচ্ছেন, সেসবে কোনো বাধা দিচ্ছেন না। আবার ইংরেজের রোষ থেকেও বৌকে নিজের প্রতিপত্তি দিয়ে রক্ষা করে যাচ্ছেন, এমন বরকে হারালে, যে কোনো মেয়েই ভেঙে পড়বে, সে যতো বড়ো নেত্রী হোক না কেন? মেয়েলি মনটা কোথায় যাবে? তাছাড়া কুমুদিনী তো শুধু যোদ্ধা নন, লেখিকা, কবি। সংবেদনশীল মন ছিলো।

– কুমুদিনী কবিতাও লিখেছেন?

– হ‍্যাঁ, পূজার ফুল তো কবিতার বই।

– শরৎ মারা যাওয়ার পরে, কুমুদিনী কি শোভাবাজার রাজবাড়ির পাট পুরো চুকিয়ে হাটখোলায় সেজ ছেলের বাড়িতে এলেন?

– হ‍্যাঁ। এমনকি রাজবাড়ির বিধবা ভাতা নামক মোটা মাসোহারাও গ্রহণ করতে তিনি পরে অস্বীকার করেছিলেন। হাটখোলার দত্ত বাড়ি আন্দুলের দত্ত চৌধুরী জমিদার বংশের একটি শাখা। অভিনেতা বসন্ত চৌধুরী এই দত্ত চৌধুরী বাড়ির ছেলে।  হাটখোলার দত্তরা আবার কলকাতার অন‍্য জমিদারদের মতো ইংরেজ ভজা বংশ ছিলোনা। বরং এই পরিবারে দেশাত্ববোধ প্রবল ছিলো। কুমুদিনীর দিদা মানে ঋষি রাজনারায়ণ বসুর স্ত্রী নিস্তারিনী হাটখোলা দত্ত বাড়ির মেয়ে। নেতাজী সুভাষের মা প্রভাবতীও এই বংশের মেয়ে। 

– তাই নাকি?

– কুমুদিনীর সেজ ছেলে সুরেন্দ্রনাথের বৌ আবার আন্দুল রাজবাড়ির মেয়ে।

– আন্দুলের দত্ত চৌধুরী?

– না না। আন্দুল রাজবাড়ি হলো কর – রায় – মিত্র বাড়ি। প্রথমে ছিলো কর, ইংরেজ ভজিয়ে উপাধি পেলো রায়, পরে ছেলে নেই, তাই জামাইয়ের হাতে জমিদারী গেছে। তারা মিত্র। এই আন্দুল রাজবাড়িতে তিরিশ বছর বয়সে সুরেনের মৃত্যু হয়।

– মানে শ্বশুরবাড়িতে ঘুরতে এসে মারা গেলো?

– হ‍্যাঁ। তার বৌ তখন সদ‍্য কিশোরী, কোলে কয়েকমাসের বাচ্ছা। কিন্তু কেন যে সুরেন মারা গেলো, সেই রহস‍্যের কিনারা আজও হয়নি।

– কিন্তু কেন? সেনবাড়ির অতো অ্যাটর্নি রয়েছে কুমুদিনীর হাতে, কিনারা হলোনা কেন?

– পয়েন্টটা ঠিকই রেজ করেছিস।

১৯২১ সালে স্প‍্যানিশ ফ্লুতে জ‍্যেষ্ঠ পুত্র সতীশকে হারানোর ব‍্যথা কুমুদিনী সামলেছিলেন স্বামী শরৎকে আঁকড়ে ধরে। ধুরন্ধর ব‍্যবসায়ী, ইংরেজি, ফরাসি ভাষায় সুপন্ডিত শরৎ সর্বকাজে যিনি কুমুদিনীকে আগলে রাখতেন, সংসারের আঁচটি লাগতে দেননি গায়ে, যাঁর পরম আশ্রয়ে সাহিত্য সেবা, দেশসেবা দুই ই চালিয়ে গেছেন নিশ্চিন্তে, সেই শরতের হাতটি ছেড়ে গেলো ১৯২৩ এ। পারিবারিক শ্রুতি বলে স্বামীর মৃত‍্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন কুমুদিনী। শোক ভুলতে দ্বিগুণ উদ‍্যমে আবার কর্মে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। তৃতীয় পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঐ তেইশ সালেই পুরো পরিবারকে শোভাবাজার রাজবাড়ি থেকে নিয়ে যান হাটখোলার দত্তবাড়িতে। এর পরে কুমুদিনী এবং তাঁর উত্তর পুরুষেরা আর কোনদিন ফিরে যাননি সেখানে। সাতবছর সেখানেই কাটে। ১৯৩০ এ শ্বশুর বাড়ি আন্দুল রাজবাড়িতে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় সুরেন্দ্রের। ওটা তো কুমুদিনীর নিজের অধিকারের বাড়ি নয়। তাই ওবাড়ি ছাড়লেন আবার। এবারে তিনি উঠে এলেন ফড়িয়াপুকুরের একটি ভাড়া বাড়িতে। তখন পরিবারে জ‍্যেষ্ঠ পূত্রবধূ প্রতিমা, তাঁর তিনটি কিশোর ও বালক পুত্র, মুকুল, বকুল ও সুকুল – পনেরো, তেরো আর এগারো বছর বয়স্ক। দুই পুত্র ক্ষিতীশ ও বিকাশ – তিরিশ ও সাতাশ বছর বয়স। কুমুদিনীর বয়স আটান্ন। না সুরেন্দ্রের মৃত্যুর কিনারা করতে পারেননি কুমুদিনী। কিন্তু কেন?

সেটা বুঝতে গেলে দেশের আর ওনার নিজের পরিস্থিতি বুঝতে হবে। দেশে তখন আইন অমান্য আন্দোলনের দামামা বাজছে। কয়েক বছর আগে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে, লালা লাজপত রায়ের মৃত্যু হয়েছে। সেই আগুন তখনও জ্বলছে ধিকি ধিকি। বঙ্গলক্ষ্মী, সুপ্রভাত এসব পত্রিকার কাজের আড়ালে বিপ্লবী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। সঙ্গে চলছে বঙ্গীয় নারী সমাজের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ। এই অবস্থায় ইংরেজ পুলিশের সাহায্য চাওয়া সম্ভব ছিলনা তাঁর পক্ষে।

আমার মা মানে কৃষ্ণা বলতো যে সেযুগে এতো চিকিৎসা নিয়মিত চেক আপ এসব তো ছিলোনা। উল্টে কেবল খাওয়া দাওয়ার বোল বোলাও ছিলো। তাই সেজদাদুর মৃত‍্যু হয়তো স্বাভাবিকই ছিলো।

– কিন্তু কিছুই কি জানা যায়নি?

– হ‍্যাঁ শুনেছি, খুব ভারি খাওয়াদাওয়া হয়েছিল। শরীরে অস্বস্তি হচ্ছিল। মৃত্যুর পরে ঠোঁট নাকি নীল হয়ে গিয়েছিলো। আমি ইন্টারনেটে খুঁজেছি, হার্ট অ্যাটাকেও মৃতদেহের এমন হতে পারে। সুরেন্দ্রনাথের বাবা শরৎও তো হৃদরোগে মারা গেছেন। ছেলেরও হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কোনো তদন্ত বা পোস্ট মর্টেম তো হয়নি। তখন প্রত‍্যক্ষদর্শীরা ঐ নীল ঠোঁট দেখে গুজব ছড়িয়েছিলো সুরেন বিষ খেয়েছে। আজ একশো বছর পরেও সেই কাঁটা আমাদের পরিবারে বিঁধে রয়েছে। যদিও আমি এসব মন থেকে মুছে ফেলেছি।

কিন্তু কুমুদিনীর কথা ভাবি। বঙ্গভঙ্গের পরে দুই মাস্তুত দাদা, অরবিন্দ আর বারীন আলিপুর বোমার মামলার আসামী। বাবাও জেলে ছিলেন। ১৯২৫ থেকে ১৯২৭ পর্যন্ত তিনি বঙ্গলক্ষী পত্রিকার সম্পাদিকা ছিলেন। আশা করা যায় হয়তো সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই এই পত্রিকার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।  সঙ্গে অন্য লেখালেখিও চলছিল। কারণ আমাদের বাড়িতে যে দুটি বই আছে, তার মধ্যে কবিতার বই ‘পূজার ফুলের’ প্রকাশ কাল ১৯২৫ এবং উপন্যাস ‘বোঝবার ভুলের’ প্রকাশকাল ১৯২৭। সুপ্রভাত এবং বঙ্গলক্ষী ছাড়াও তাঁর সম্পাদিত আরও একটি পত্রিকার নাম পাচ্ছি। সেটি হল ‘অন্তঃপুর’। ১৯০০ সালে এর প্রথম সম্পাদিকা বনলতা দেবীর মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন কুমুদিনী ও হেমন্তকুমারী চৌধুরী। এবারে আসি রাজনৈতিক কার্যকলাপ বিষয়ে। ১৯২১ সালে কুমুদিনী বসু, লেডি অবলা বসু, কামিনী রায়, মৃণালিনী সেন, জ‍্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী প্রভৃতি মিলে তৈরি করেন – ‘বঙ্গীয় নারী সমাজ’ নামে একটি সংগঠন, যাঁর সভাপতি হন কামিনী রায়। এঁরা মিলিত ভাবে ঐ বছরে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের নির্বাচনে মহিলাদের ভোটাধিকার পাওয়ার জন্য জোরদার সওয়াল করেন। এঁদের সমর্থন করেন, তখনকার দিনের তাবড় ব‍্যক্তিরা, যেমন – সুরেন্দ্র মোহন বসু, রামানন্দ চ‍্যাটার্জি, সুরেন্দ্রনাথ ব‍্যানার্জি, বিপিন চন্দ্র পাল প্রভৃতি। কিন্তু ইংরেজ সরকারকে এ প্রস্তাবে রাজি করানো গেলনা। এই ব‍্যর্থতায় হতাশ না হয়ে আন্দোলন আরও জোরদার করার লক্ষ্যে বঙ্গীয় নারী সমাজ মাদ্রাজের উইমেনস ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে জোট বাঁধে। সেই সঙ্গে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামের মহিলা সমিতিগুলি এই আন্দোলনে যোগ দেয়। কামিনী রায়, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এবং বেগম সুলতান মুয়াজিদজাদা তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড লিটনের সঙ্গে দেখা করেন এবং মহিলাদের ভোটাধিকারের দাবী জানান। ইংরেজ সরকার শেষ পর্যন্ত এই দাবী মেনে নিতে বাধ্য হন। এরপর ১৯২৩ সালে কলকাতার পুরভোটে এবং ১৯২৬ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের নির্বাচনে মহিলারা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। বিশ্বের অনেক দেশেই মেয়েরা এর অনেক অনেক পরে ভোটাধিকার পেয়েছেন। কত আত্মবিস্মৃত জাতি আমরা যে অগ্নিশিখাসম এই নেত্রীদের সম্পূর্ণ ভাবে ভুলে বসে আছি। এইসব কারণে কুমুদিনী অনেক আগে থেকেই ইংরেজের হিট লিস্টে ছিলেন, এটাতো ধরে নেওয়াই যায়। তিনি আবার থানা পুলিশ করলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ার সম্ভাবনা ছিলো ষোলো আনা। তাই ছেলের মৃত্যুর কোনো কিনারা করতে পারলেন না। সেটা ধামা চাপা পড়ে গেলো।

ট্রাজেডি হচ্ছে বাইরে কর্মজগতে যিনি আগুন ছড়াচ্ছেন, তাঁরই প্রিয়জনেরা এক এক করে তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ঠিক এই সময়ে যখন কুমুদিনীর সবচেয়ে সাপোর্টের দরকার, তখন জানা গেলো, যে সতীশের বৌ প্রতিমা যিনি সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন, তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত। পরিবারের বাকিরা যাতে সংক্রমিত না হয়, তার জন্য প্রতিমা কাশীর বাড়িতে চলে যান। যাওয়ার আগে ভ্রাতুষ্পুত্রী ভারতীর সঙ্গে বিকাশের বিয়ে দিয়ে যান তিনি। এই বিয়ের সময়কাল ১৯৩১। একবছর পরে একটি পুত্র সন্তানের (বিমানচন্দ্র, আমার বড়মামা) জন্ম দেন ভারতী। কিন্তু বাড়িটি একটি পৌত্রের হাসিতে মুখরিত হতে হতেও থমকে যায়। কারণ ১৯৩৩ শে কাশীতে মারা যান প্রতিমা আর ফড়িয়াপুকুরের বাড়িতে এক বছরের পুত্র রেখে, মারা যান সদ‍্য মা হওয়া ভারতী। দুর্যোগের যেন শেষ হওয়ার নাম নেই। পরের বছর ১৯৩৪ শে মাংস খেতে খেতে মাড়িতে হাড় ফুটে সেপটিক হয়ে মারা যান সতীশ – প্রতিমার জ‍্যেষ্ঠ সন্তান উনিশ বছরের সদ‍্য তরুণ মুকুল চন্দ্র। কুমুদিনী তখন কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচিত কাউন্সিলর। জানিনা আর সহ‍্য করার মতো ক্ষমতা ছিল কিনা কুমুদিনীর। দেশের জন্য জীবনটা উৎসর্গ করলেন যিনি, তাঁর ওপর একি ঈশ্বরের অবিচার নয়?

পাগলের মতো যখন কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তখন আশ্রয় দাতা হয়ে আসেন বড় জামাই ভূতিবাবু আর তাঁর দাদা দাঁতি সেন। কুমুদিনীকে পরামর্শ দেন ফড়িয়াপুকুরের বাড়ি ছেড়ে তাঁর কাছাকাছি থাকতে। বৃহৎ যৌথ সেন পরিবার যাতে ছাতা হয়ে দাঁড়াতে পারে নিয়তি তাড়িত পরিবারটির মাথায়। কুমুদিনী ফড়িয়াপুকুরের বাড়ি ছেড়ে উঠে আসেন বাগবাজারের শ‍্যামপার্কের ধারে। সেনবাড়ির লাগোয়া, নববৃন্দাবন মন্দিরের উল্টো দিকে দাঁতিসেনের একটি ফাঁকা বাড়ি ভাড়া নিয়ে। আসার পর দাঁতি সেন উদ‍্যোগী হয়ে তাঁর শ‍্যালিকা লাবণ‍্যপ্রভার সঙ্গে বিকাশের দ্বিতীয় বার বিবাহ দেন। লাবণ‍্যর বংশ পরিচয় আগেই দিয়েছি। যদিও আর জি কর অনেক আগে ১৯১৮ সালে মারা গেছেন, তাঁর সঙ্গে কুমুদিনীর প্লেগের লড়াইয়ের সময়ে পূর্ব পরিচয় ছিল। তাই এ সম্বন্ধে তাঁর কোনো আপত্তি হয়নি।

– জেঠিমা, একটা কথা বলছি, কংগ্রেস ও গান্ধীজীর নেতৃত্বে বৃটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় তো ১৯২০ থেকে ২২। তার মানে স্প‍্যানিশ ফ্লু অতিমারীর আবহেই দেশে আন্দোলন চলছিল?

– হ‍্যাঁ।

– আর বঙ্গভঙ্গের সময়ে কুমুদিনীর ভূমিকা কী?

– বলছি, কুমুদিনীর কর্মজীবন সম্পর্কে খুঁজতে খুঁজতে উত্তর বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পি এইচ ডি থিসিস (লেখক সুপ্রিয় পাঠক) পেলাম। সেখানে কিছু তথ্য পেয়েছি। ১৮৯৭ সালে শিকাগো ধর্মমহাসভা থেকে বিশ্বজয় করে দেশে ফেরার পরে কলকাতার যুবসমাজে বিবেকানন্দের প্রভাব খুব বেড়ে যায়। গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা ভালো – এই আদর্শ যুবসমাজের মর্মে প্রবেশ করে। পাড়ায় পাড়ায় ব‍্যায়ামাগার গজিয়ে ওঠে। ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের পরে এইসব ব‍্যায়ামাগারের আড়ালে কলকাতায় গোপন বিপ্লবী সমিতির কার্যকলাপ বাড়তে থাকে। কলকাতার প্রভাবশালী মহিলাদের মধ্যে ভগিনী নিবেদিতা, কুমুদিনী বসু, সরলা দেবী ঘোষাল এই সব সমিতির কাজে জড়িয়ে পড়েন। বাংলার অন্দরমহলে ইংরেজ বিরোধী বিদ্রোহের আগুন বৃহত্তর সমাজের চোখের আড়ালে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে। বিদেশি জিনিস বয়কটের ডাক দেওয়া হয়। কিন্তু বিদেশি জিনিসের স্বদেশী বিকল্প তো লোককে দিতে হবে। সেই বিকল্প সরবরাহের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয় স্বদেশী ভান্ডার, স্বদেশী মন্ডলী, মহিলা সমিতি, লক্ষীর ভান্ডার প্রভৃতি সংস্থাগুলি। এই সব সংস্থার পরিচালনায় প্রত‍্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা করেছিলেন যাঁরা, তারা হলেন ভগিনী নিবেদিতা, স্বর্ণকুমারী দেবী, সরোজিনী বোস, সরলাদেবী চৌধুরানী, নবশশী দেবী, সুশীলা সেন, কমলকামিনী গুপ্ত, ড. নীলরতন সরকারের স্ত্রী নির্মলা সরকার, ড. প্রাণকৃষ্ণ আচার্যের স্ত্রী সুবলা আচার্য, ড. সুন্দরী মোহন দাসের স্ত্রী হেমাঙ্গিনী দাস এবং অবশ্যই কুমুদিনী বসু। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে এইভাবে তাঁর জড়িয়ে পড়া অবশ্যই বাপের বাড়ির প্রভাবে। কারণ বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে দেখছি দেশবাসীকে ব্রিটিশ পণ্য বয়কট ও স্বদেশী দ্রব্য ব‍্যবহারের ডাক দিচ্ছেন সঞ্জীবনী পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্র ১৯০৫ এর পয়লা জুলাই, যিনি কুমুদিনীর পিতা। এখানে একটি কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, সঞ্জীবনীর যুগ্ম কর্ণধার এবং কৃষ্ণকুমারের সহযোগী ছিলেন কলকাতার প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর স্বামী স্বনামধন্য দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী। পিতা আগুন ঝরাচ্ছেন সঞ্জীবনীর পাতায়। সেই আগুন অন্তঃপুরে ছড়িয়ে দিচ্ছেন কন্যা, সুপ্রভাত নামক মহিলা পত্রিকার পাতায়। এমনকি তিনি বেঙ্গল কেমিক্যাল, ওরিয়েন্টাল সোপ প্রভৃতি দিশি উৎপাদনের বিজ্ঞাপন শুরু করেন সুপ্রভাত পত্রিকায়। ইংল্যান্ডের ন‍র্দাম্পটনের স্মিথ কলেজ থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ পড়লাম। লেখিকা এলিজাবেথ আর্মস্ট্রং। সেখানে লেখা আছে কুমুদিনী এবং তাঁর ভগ্নী বাসন্তী মিত্র মিলে সুপ্রভাত পত্রিকার সূচনা করেন। এই পত্রিকায় নানা লেখায় দেশমাতৃকা রক্ত ও জীবনের বলিদান চাইছেন, এর জন্য যোদ্ধা দরকার এসব কথা স্পষ্ট ভাবে বলা হত। এবং এর সঙ্গে শিক্ষার সুযোগ, বিবাহ প্রতিষ্ঠান ও আইনের প্রতিবিধানের মধ্যে নারীকে সমানাধিকার দিতে হবে সে দাবীও সোচ্চারে তোলা হত।  লেখিকা মনে করছেন সেযুগের মহিলার পক্ষে এই ভাবনা তাঁর বিপ্লবী মনের পরিচয় দেয়। এর সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই পরবর্তী তথ্য পাই। সশস্ত্র বিপ্লবীদের আড়াল থেকে সাহায্য করেছিলেন যেসব মহিয়সীরা সেই তালিকাতে নিবেদিতা ও কুমুদিনী দুজনেই আছেন। কুমুদিনীর মাও কিন্তু বসে ছিলেন না। স্বামী বিবেকানন্দের ছোট ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯০৭ সালে কারাবন্দী হন। তখন লীলাবতী মিত্রের নেতৃত্বে দুশোজন নারী ভূপেন্দ্রনাথের মায়ের কাছে সান্ত্বনা পত্র পাঠান। এমন কথাও পড়লাম যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর লীলাবতীর কাছে সহায়সম্বলহীন অনাথ বিধবা বালিকাদের পাঠাতেন দেখাশুনা করার জন্য। লীলাবতী এমন অনেকগুলি বিধবা কন‍্যার বিবাহ দিয়েছিলেন। তাঁর নাকি আক্ষেপ ছিল বেশি লেখাপড়া শিখতে পারেননি বলে মনের কথাগুলি লিখে প্রকাশ করতে পারেননা। কন‍্যা কুমুদিনী ও বাসন্তীর যাতে এমন না হয়, তার জন্য কন‍্যাদের উচ্চশিক্ষা তিনি নিশ্চিত করেছিলেন। যা হোক,  আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় ১৯১১ সালে। আর ঐ বছরেই অকালে জীবনদীপ নিভে যায় ভগিনী নিবেদিতার। এর ঠিক দশ বছরের মাথায় সতীশের মৃত‍্যু থেকে কুমুদিনীর পারিবারিক বিপর্যয় শুরু হয়। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বললে হয়তো খুব অপ্রাসঙ্গিক হবেনা। আমরা তো  মোহনবাগানের গল্প বলতে বসেছিলাম। এইসময়ে ১৯২০ তেই বাংলায় আর একটি ইতিহাস সৃষ্টিকারী ফুটবল দল ইস্টবেঙ্গলের জন্ম হয় – যার সঙ্গে মোহনবাগানের দ্বৈরথ একদিন অমরত্ব লাভ করবে।

আর একটা কথা জানলে হয়তো তোদের ভালো লাগবে, ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাসে কুমুদিনীর নাম জুড়ে আছে।

– তাই নাকি, কী করে?

– আমি ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাস নিয়ে একটি প্রবন্ধ খুঁজে পেলাম। লিখেছেন এন. কল‍্যাণী। সেখানে যা লেখা আছে, সংক্ষেপে তার উপজীব্য হল – ১৯০৪ থেকে সিস্টার নিবেদিতা অনুভব করেন ভারতবাসীর একটি নিজস্ব জাতীয় পতাকা প্রয়োজন। নিবেদিতার মননে অনুপ্রাণিত বজ্র চিহ্নের জাতীয় পতাকাটি চূড়ান্ত রূপ পায় ১৯০৬ সালে। প্রথমে বিপ্লবী দল অনুশীলন সমিতির গোপন সভায়, মাঝে বজ্র দুপাশে বন্দে মাতরম লেখা পতাকাটি উত্তোলন করেন স‍্যার সুরেন্দ্রনাথ ব‍্যানার্জি ১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট।
ঐ প্রথম পতাকাটি কলকাতার আচার্য্য ভবন মিউজিয়াম, বোস ইনস্টিটিউটে আজও রক্ষিত আছে।

– এখন গেলে দেখা যাবে মা?

– হ‍্যাঁ, দেখতে পাওয়া তো উচিত।
১৯০৫ এ বঙ্গভঙ্গের একবৎসর পূর্তিতে প্রতিবাদ জোরদার করার জন্য ১৯০৬ এর ডিসেম্বরে কলকাতায় কংগ্রেসের সভা বসে।  সেই সভায় ঐ বজ্র চিহ্নিত পতাকাটির নক্সায় কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসেন সুকুমার মিত্র ও শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু। উইকিপিডিয়ায় বলছে সুকুমার কৃষ্ণ কুমারের পুত্র, মানে কুমুদিনীর ভাই। পতাকায় তিনটি রং ব‍্যবহার করা হয়। বন্দেমাতরম লেখাটি মাঝে থাকে। কিন্তু একটি বজ্রের পরিবর্তে আটটি পদ্মফুল বসানো হয়। এই নক্সা কংগ্রেস অনুমোদন করে। উত্তোলন করেন দাদাভাই নৌরোজি। পতাকাটি সেলাই করে দেন সুকুমার মিত্রের বোন কুমুদিনী বসু। ভাষা খুঁজে পাইনা। লেখিকা, সম্পাদিকা, সমাজসেবী, স্বাধীনতা সংগ্রামী কীভাবে ব‍্যাখ‍্যা করব তাঁকে?  আমার মায়ের কাছে ছোটবেলায় গল্প শুনেছি, আমার দাদু কুমুদিনীর ছোটো ছেলে নয়। আর একজন ছিলো। সে মায়ের কাছে থাকবে বলে সবসময় বায়না করত। মা সময় দিতে পারতেন না, বিরক্ত হতেন। সে বলত, মা আমি বিরক্ত করবনা, তোমার গায়ে একটা কড়ে আঙ্গুল ছুঁইয়ে শোবো মা? পরে শিশু পুত্রটি মারা যায়। আমার মা কুমুদিনীকে দেখেননি। কারণ মায়ের জন্ম তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর পরে। এসব কথা শুনেছেন আমার দিদা, মানে কুমুদিনীর পঞ্চম পুত্রবধূ লাবণ‍্যপ্রভার কাছে। আমার মা আমাকে দেখিয়েছিলেন, শিশু পুত্রের শোকে পূজার ফুল বইয়ের কোন কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু আজ সে আমার আর স্মৃতিতে নেই। আজ পঞ্চাশ বছরে পৌঁছে মর্মে মর্মে বুঝি কর্মরতা মায়েদের বেদনা। একশ বছর আগে মায়ের ঠাকুমার নিয়তি তাড়িত মুখটি হৃদয়ে ভাসে।

———//////////————/////////—–

– মা! একটা অদ্ভুত চিন্তা মনে আসছে। কুমুদিনী কি নিয়তি মানতেন?

– কী জানি? স্বামী বিয়োগ, একের পর এক পুত্র বিয়োগে বিধ্বস্ত হলেও, দত্ত বাড়িতে ছেলের ভাগ দাবী করেননি কুমুদিনী। তাদের আশ্রিতও হতে চাননি। দেববাড়িতেও ফিরে যেতে রাজি ছিলেননা। হয়তো বিধবা হিসেবে সমাজের নানা বেড়ি পড়বে পায়ে সেই ভয় পেয়েছিলেন। তিনি স্বাধীনভাবে ফড়িয়া পুকুরে একটি বাড়ি কিনে পরিবার নিয়ে সেখানে উঠে আসেন এবং শোভাবাজার রাজবাড়িতে স্বামীর অংশের দখলীসত্ব ত‍্যাগ করেন।  তখন গ্রাসাচ্ছাদন চলছিল রাজবাড়িরই ভাতায় এবং সম্ভবত জমিজমা থেকে আয়ও ছিল। শোভাবাজার রাজবাড়িতে একটি প্রথা আছে, বিধবা কন‍্যা বা পুত্রবধূ মাসিক ভাতা পেতে পারে। স্বামী ও দুইপুত্র চলে যাওয়ার পরে কুমুদিনী সেই ভাতা পেতেন। কিন্তু সেই ভাতা তিনি যে নিরুপায় হয়ে গ্রহণ করেছিলেন, তার প্রমাণ পাই, যখন বাকি দুই পুত্র রোজগার শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই রাজবাড়ির বিধবা ভাতা তিনি ত‍্যাগ করেন। এত শোকের সাগর, অভাব অনটন পেরিয়েও বই লেখা, পত্রিকা সম্পাদনা, দেশসেবা করে গেছেন অবিচল ভাবে। নিবেদিতা বিদ‍্যালয়ে পড়েছিলাম আদর্শ জ্ঞানী ব‍্যক্তি হন – ‘সুখেষু বিগতস্পৃহ, দুঃখেষু নিরুদ্বিগ্নমনা। কুমুদিনী এর বাস্তব প্রতিমূর্তি। একবার বাবলিদিতে আমাতে গল্প হচ্ছিল, এত বড় বড় লোকের বংশধর, আত্মীয় যদি হই, তবে আমরা গরীব হলাম কেন? কি কষ্ট করে বড়ো হয়েছি আমরা। বাবলি দি বলে, “সোজা উত্তর, আমাদের গরীব হওয়ার পিছনে একমাত্র দায়ী ঐ কুমুদিনী। কি দরকার ছিলো সর্বস্ব ত‍্যাগ করার? সংসার দেখেননি। সাহিত্য সেবা, দেশসেবা, সমাজসেবা করে গেছেন শুধু।” বাবলিদির কথায় পয়েন্ট আছে। স্বীকার না করে উপায় নেই। তবু আজ বেশ লাগে এক ঋজু, বিদূষী, দেশ হিতৈষিনী, নির্লোভ নারীর বংশধর আমি। নাই বা রইল টাকা। এই বংশগৌরব যে কতটা তৃপ্তির, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না।

– মা কামিনী রায় বললে! কোন কামিনী রায়, যার কবিতা বইয়ে পড়েছি?

– হ‍্যাঁ রে, সেই কামিনী রায়, কবি।
“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি,
      এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে ?
      আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণেও সুখ,
      ‘সুখ’ ‘সুখ’ করি কেঁদো না আর,
যত‌ই কাঁদিবে, যত‌‌ই ভাবিবে,
       তত‌ই বাড়িবে হৃদয়-ভার।

– শেষটা আমি বলছি মা।
“সকলের মুখ হাসি-ভরা দেখে
       পার না মুছিতে নয়ন-ধার ?
পরহিত-ব্রতে পার না রাখিতে
       চাপিয়া আপন বিষাদ ভার ?
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
       আসে নাই কেহ অবনী পরে
সকলের তরে সকলে আমরা,
       প্রত‍্যেকে আমরা পরের তরে।”

তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী? এসব কথা তো বইয়ে লেখা ছিলনা। আর  লেডি অবলা বসু মানে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের স্ত্রী? তিনিও বিখ‍্যাত?

– হ‍্যাঁ, খুবই বিখ্যাত।  স্বাধীনতা সংগ্রাম, ইস্কুল কলেজ তৈরি সবেতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

– কুমুদিনী এঁদের সহযোদ্ধা!! মানে ঠিক কতদিন আগে? আমার সঙ্গে কিরকম সম্পর্ক হবে?

– সহজ করে ভাব। এনারা তোর দিদার দিদার বন্ধু, সহকর্মী। এবারে বসুতে, রায়েতে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিলো কিনা, সে আমার জানা নেই।

– মা – আ! ও মা!

– কী?

– কুমুদিনীর জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কান্না এসে যাচ্ছে।

– আমারও কষ্ট হচ্ছে জেঠিমা। কিন্তু কামিনী রায়, লেডি অবলা, বেগম রোকেয়া, স্বর্ণকুমারী দেবী, সরোজিনী বোস, সরলাদেবী চৌধুরানী, নবশশী দেবী, সুশীলা, কমলকামিনী, নির্মলা, সুবলা, হেমাঙ্গিনী, মৃণালিনী, জ‍্যোতির্ময়ী কত নাম বললে, আর একজন কে যেন সুলতান

– বেগম সুলতান মুয়াজিদজাদা

– হ‍্যাঁ, এদের খুব কাছের লোক মনে হচ্ছে। দিনগুলো যেন দেখতে পাচ্ছি। খুব গর্ব হচ্ছে, ভীষণ আনন্দও হচ্ছে আমার।  ভাগ‍্যিস আমাদের কুমুদিনী ওদের সঙ্গে ছিলো। তাই সবাই আমাদের দিদার দিদা হলো। 

– কুমুদিনী আমাদের পরিবারের মানুষ যদি নাও হতেন, তাও বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা ওনাদের উত্তরসূরী। কুমুদিনীও তো শুধু আমাদের পরিবারের নন, দুই বাংলার। উনি তো ময়মনসিংহের মেয়ে।

– জেঠিমা! কুমুদিনী বাঙাল! তায় ব্রাহ্ম। শোভাবাজার রাজবাড়ি ঘটি, ওদের ঠাকুর কি ছিলো?

– বললাম যে রাধারমণ কৃষ্ণ।

– তার মানে শরৎ কুমুদিনীর লাভ ম‍্যারেজ। হতেই হবে। হয়তো কোনো সাহিত্য সভা টভায় চোখে চোখে কথা …..।

– সেটা অবিশ‍্যি আমারও সন্দেহ হয়। তবে ছবি দেখে মনে হয়, শরৎ কুমুদিনীর বয়সের তফাৎ পনের কুড়ি বছর তো হবেই। শাড়ি গয়না পরে ছোটো মেয়েকেও বড়ো দেখায়, ঠিক বোঝা যায়না।

– কুমুদিনীর ছবি কেমন?

– খুব সুন্দরী, ডিগনিফায়েড।

– দেখাবে। আচ্ছা, বিকাশ –  লাবণ‍্যর সম্বন্ধ করে বিয়ে। তাইতো?
আর সমীর – কৃষ্ণার?

– লাভ

– তুমি আর জেঠু, তুলসী শারদা –  লাভ। চার পুরুষে তিনটে লাভ ম‍্যারেজ। বোনু শুনে রাখ। আমাদের যেন আবার পরে সম্বন্ধ না করে।

– মা, সেনবাড়ি ভালো, কুমুদিনীকে বাঁচালো। যে দেশসেবা করছে, তার পাশে তো দাঁড়ানো উচিত। সেই সময়ে ঐ সাপোর্ট না দিলে কৃষ্ণা, তুমি, আমি কেউই এই পৃথিবীতে আসতে পারতাম না।

– সেনবাড়ি শুধু কুমুদিনীকে নয়, মোহনবাগানকেও বাঁচালো তো। কুমুদিনীকে জানতে গিয়ে, মোহনবাগানকে তোরা ভুলে যাচ্ছিস।

– ওহ। তাইতো, মোহনবাগানটা বলো।

– প্রিয়নাথ মিত্র মানে ছোটোপিসিদিদার শ্বশুরমশাই রাজা রাজবল্লভ স্ট্রিটে তৈরি করেছিলেন অ্যাশক্রফ্ট হল। সেখানে ১৯২০ সালে ইংলিশ ফার্স্ট বুক প্রণেতা প‍্যারীচরণ সরকারের ছোটো ছেলে শিক্ষাবিদ বাবু শৈলেন্দ্র সরকার একটি স্কুল তৈরি করেন। নাম সরস্বতী ইনস্টিটিউশন। পরে অবশ্য ঐ ইস্কুল নতুন ঠিকানায় উঠে যায়, এখন যার নাম শৈলেন্দ্র সরকার বিদ‍্যালয়। প্রাক্তন রাজ‍্যপাল ও প্রধান বিচারপতি শ‍্যামল সেন এই ইস্কুলে পড়েছেন। এখন তিনি ওখানকার ম‍্যানেজিং কমিটির সভাপতি। কাছাকাছি এলাকায় প‍্যারীচরণের নিজের প্রতিষ্ঠিত একটি বালিকা বিদ‍্যালয়ও আছে। শরৎ কুমুদিনীর মধ‍্যম পুত্রবধূ মানে আমার মেজদিদা প‍্যারীচরণের বাড়ির মেয়ে। এই প‍্যারীচরণ সরকারের নাতি স‍্যার নৃপেন্দ্রনাথ সরকার মোহনবাগানের প্রথম কমিটির সদস্য ছিলেন। আবার  প্রথম কমিটির আর এক সদস্য হলেন রায়বাহাদুর চুনীলাল বসু। তিনি ছিলেন সেযুগের থেকে একজন এগিয়ে থাকা মানুষ। স্বাস্থ্যব‍্যবস্থা, খাদ্যে ভেজাল, সুষম আহার এইসব বিষয়ে গবেষণা করে জনসচেতনতা গড়ে তোলার কাজ করছিলেন। কলকাতার শেরিফও হয়েছিলেন।

– মধ‍্যম পুত্রবধূ মানে?

– মেজ বৌ।

– সতীশ বড়ো, তারপর সুরেন, ক্ষিতীশ, বিকাশ।

– সতীশ চন্দ্রের পর আর একজন মেজছেলে ছিলো জ‍্যোতিষচন্দ্র।

– যে মায়ের ছবি এঁকেছিলো? তার কি হলো, কিছু আগে বললেনা তো।

– বলিনি কারণ আছে। সে বাড়ি ছেড়ে, দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো।

– কোথায়?

– বর্মামুলুকে, মানে আজকের মায়ানমারে।

– কেন মা?

– মেজছেলে জ‍্যোতিষচন্দ্রের বিয়ে হয়েছিল ইংলিশ ফার্স্ট বুক প্রণেতা প্যারীমোহন সরকারের ভাইঝির সঙ্গে বা ভাইয়ের নাতনির সঙ্গে, সম্পর্কটা নিশ্চিত বলতে পারছিনা। সেই সূত্রে ড. মহেন্দ্রলাল সরকার সম্পর্কে আমার মেজদাদুর জ্ঞাতি শ্বশুর হন। জ‍্যোতিষচন্দ্র ছিলেন চিত্রশিল্পী। তাঁর শিল্পকলা, চিত্রাঙ্কনের কিছু নমুনা আজও পরিবারে রাখা আছে। বাবলিদির কাছে শুনলাম এসপ্লানেড  এলাকায় ওনার একটি বড়ো স্টুডিয়ো  ছিল। মেজদাদু তাঁর বাবা শরৎচন্দ্রের মতো ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় সুপন্ডিত ছিলেন। এই স্টুডিয়োতে ইউরোপিয়ানরা তো বটেই  তাছাড়াও অনেক অভিজাত নামকরা লোক পোট্রেট আঁকাতে আসতেন। স্টুডিওটার নাম বাবলিদির  মনে নেই। তবে ও শুনেছে ওটা তখনকার খুব নামকরা জনপ্রিয় স্টুডিয়ো ছিল। আমার এই দিদিমার বিয়ের সময় বয়স ছিল নয় বছর। ইনি খুব  সুন্দরী ছিলেন। কিন্তু একটু বড় হতে বোঝা যায়, যে তাঁর মানসিক ভারসাম‍্যের একটু অভাব আছে। তিনি শাড়িও নিজে পরতে পারতেননা বা চাইতেন না। এই বিষয়টি জ‍্যোতিষ চন্দ্র মেনে নিতে পারেননি।  সম্ভবতঃ পারিবারিক ব‍্যবসায়ও তাঁর মতি ছিলনা। এই দুই কারণে বড় ভায়ের মৃত্যুর পরে ভাগ‍্যান্বেষণে তিনি বর্মামুলুকে চলে যান। সুদূর বর্মাদেশে তিনি আবার এক বর্মী মেয়ে বিয়ে করেন। তাঁদের একটি কন্যা ছিল নাম মরিয়ম। জ‍্যোতিষচন্দ্র মাঝে মাঝে বাড়িতে আসতেন। তবে এই দ্বিতীয় স্ত্রী বা কন্যাকে তিনি দেশে কখনও আনেননি। তাঁর বাড়ি আসার স্মৃতি আমি বড়মামার মুখে শুনেছি। ওপরে ইউরোপীয়দের মতো কোট প‍্যান্ট, টাই আর পরনে বর্মীদের মতো সিল্কের লুঙ্গি পরে তিনি ফিটন গাড়ি করে গড়ের মাঠে বেড়াতে যেতেন। সঙ্গে বড়মামাও যেত। ঐ পোষাক দেখে অবাক হয়ে অন‍্যান‍্য লোকের কেমন প্রতিক্রিয়া হতো তা বড়মামা ছোটো হলেও মনে করে রেখে দিয়েছিল, আর আমাদের অভিনয় করে দেখাতো। আমরা হেসে গড়াগড়ি খেতাম।

আর একটা কথা বড়মামা বলেছিলো যে, মেজদাদু দেশে ফিরে চিংড়ি মাছ দিয়ে ঝাল ঝাল কেমন একটা ভাত রান্না করতেন। এটা নাকি একটা বর্মী রান্না। আর সবাইকে ধরে ধরে খাওয়াতেন। বাচ্ছা বুড়ো কারোর পালাবার জো নেই। মেজদাদু যেহেতু রান্না করেছেন, ঐ ঝাল ভাত নাকি সবাইকে খেতেই হবে। ঐ ভাতের সঙ্গে মেজদাদু নাকি পাঁপড় খেতেন।

– ঝাল ভাতটা আবার কীধরণের খাবার?

– বড়মামা ছোটো ছিলো তো, তাই রেসিপি কিছু বলতে পারেনি। শুধু বলেছিলো খুব ঝাল আর নারকেল দেওয়া। হয়তো এমন কিছু ঝাল নয়, ছোটোবেলায় খুব ঝাল লেগেছিলো।
পরে বড় হয়ে, আমি ইন্টারনেটে খুঁজে দেখেছি, সত‍্যিই ঝাল স্বাদের ভাত ওদেশে রান্না করে।

– কীরকম?

– প্রথমে বাসমতি চাল খুব ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। তারপর জল ঝরিয়ে, থালায় ছড়িয়ে জল শুকিয়ে নিতে হবে। এবার একটা হাঁড়িতে বেশ খানিকটা নারকেল এর দুধ নুন দিয়ে গরম করে নিতে হবে। গরম হলে শুকনো চাল ওর মধ‍্যে দিয়ে ফোটাতে হবে। রান্না হবে ঢিমে আঁচে, যাতে নারকেলের স্বাদ চালে ভালো ভাবে ঢুকে যায়। একটু পরে কড়াইশুঁটি আর কাজুবাদাম মেশাতে হবে। আগেই কড়ায় তেল দিয়ে চিংড়ি মাছ নুন, হলুদ ও লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে মেখে ভেজে রাখতে হবে। ভাত প্রায় হয়ে এলে হাঁড়ির ঢাকনা খুলে বেশ কয়েকটা কাঁচা লঙ্কা কুচো করে মিশিয়ে দিতে হবে। ফ‍্যান গালা হবেনা। পোলাওয়ের মতো জল ভাতের মধ‍্যেই শুকিয়ে যাবে। নারকেল ভাত হয়ে গেলে আঁচ বন্ধ করে উপরে চিংড়ি মাছ ভাজা ছড়িয়ে ঢাকনা দিয়ে রাখতে হবে। ভাত একটু নেড়ে চেড়ে দিতে হবে। ভাতের ভাপেই চিংড়ি নরম হয়ে যাবে, আর নির্যাসটাও মিশে যাবে। এই ভাতটা ঠান্ডা খাওয়ার চেয়ে গরম গরম খেলেই নাকি সঠিক স্বাদ পাওয়া যাবে। এই নারকেল ভাত ও দেশে পাঁপড় জাতীয় মচমচে খাবার দিয়ে খাওয়া হয়।   

– বেশ অদ্ভুত। খেতে কেমন লাগবে কে জানে! তবে আমরা তো সর্বভুক জেঠিমা, জ‍্যোতিষচন্দ্রের নামে একদিন ঝাল ভাত করে খেলে হয়। সবরকম ট্রাই করলে গল্পগুলো পেটের মধ‍্যে দিয়ে মাথায় বসে যাবে। তারপর বলো। 

– ঐ বর্মামুলুকেই মেজদাদুর জীবনাবসান হয়। মরিয়মের চিঠিতে বাড়ির লোক তাঁর মৃত্যুর খবর পায়।তখন নিয়ম মত অশৌচও পালন করা হয়েছিল। তবে এ সবই ঘটেছে আমার জন্মের অনেক আগে। জানিনা মরিয়ম বা তার পরিবার কোথায় কিভাবে আছে। জ‍্যোতিষচন্দ্রের প্রথম স্ত্রীকে বাবলিদি দেখেছে। কলকাতায় বিডন স্ট্রিটে কোথাও  ওনার বাপের বাড়ি ছিল। ও বলেছিলো – “আমি বাবির (আমার বকুল মামা) সঙ্গে সেখানে একদিন গিয়েছিলাম। আমার কিন্তু ঠাকুমাকে দেখে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে হয়নি। অসামান্যা রূপসী। খুব ভাল ব্যবহার করেছিলেন। আমাদের দেখে খুব খুশি হয়ে ছিলেন”। হয়তো স্বামী পরিত্যাগ করার পরবর্তীকালে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। সারাজীবন স্বামী পরিত‍্যক্তা তকমার কাঁটার মুকুট পরে দিন কেটেছে। কুমুদিনী নিজে ঊনবিংশ – বিংশ শতকের ফেমিনিস্ট অ্যাকটিভিস্ট। তাঁর পরিবারে মেজ বৌমার এমন ভবিতব্য একটা বিরাট ট্র‍্যাজেডি।

– তখন ন বছর বয়সে বিয়ে হতো?

– হ‍্যাঁ, পাঁচ বছরেও হতো – বলা হতো গৌরীদান। কুমুদিনী ব্রাহ্ম ছিলেন, ব্রাহ্মরা খুব ছোটোবয়সে মেয়ের বিয়ে দিতোনা। ওনার নিজের তেরো চোদ্দ বছরে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু শোভাবাজার রাজবাড়িতে ব্রাহ্ম নিয়ম খাটেনি। অনেক আপস করতে হয়েছিলো। বড় মেয়ে লীলার সেনবাড়িতে বিয়ে হয়েছিলো পাঁচ বছর বয়সে। ছোটোমেয়ে ইন্দিরার বিয়েও ঐ রকম বয়সেই হয়েছিলো। মা গল্প করতো, সেন বাড়িতে বৌ নিয়ে ভূতিবাবু ফেরার কিছুক্ষণ পরে বৌকে আর কেউ খুঁজে পায়না। ছোট্ট মেয়ে নতুন বাড়িতে গেলো কোথায়? খোঁজ খোঁজ। তারপর একজন রান্নার ঠাকুর দেখে, ভাঁড়ার ঘরে দেরাজের পিছনে বৌ ঘুমিয়ে আছে। এই দেখে গিন্নিরা কোলে করে তাকে নিয়ে গেলো। বাচ্ছা মেয়ে, অতো লোকজন দেখে ভয়েতে লুকিয়ে পড়েছিলো, তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে।

– এ বাবা!

– বাবলিদি বলেছে, ছোটোবেলায় বাবলিদিরা বাগবাজারে নিবেদিতা লেন এ থাকতো। সেইসময় বাবার (বকুলচন্দ্র – আমার দাদু বিকাশচন্দ্রের বড়দা সতীশ চন্দ্রের ছেলে, আমার বকুল মামা) সঙ্গে শোভাবাজার রাজবাড়িতে যেতো। শোভা বাজার রাজবাড়িতে ঠাকুর দালানে যেখানে দুর্গা প্রতিমা থাকে ঠিক তার ডানদিকে দোতলা যে অংশ আছে সেখানেই ছিল বসু পরিবারের বাস। রাজবাড়িতে ঠাকুর দালানের বাঁদিকে বাগানে যাওয়ার পথ। কুমুদিনী বা বাড়ির মেয়েরা গঙ্গা স্নান করতে গেলে দোতলার সিঁড়ি থেকে বাগান পর্যন্ত চিক ফেলা হতো আর পালকি করে মেয়েদের গঙ্গার পাড়ে নিয়ে গিয়ে একেকটা পালকি গঙ্গায় চোবানো হতো। বাড়িতে এসে তারা ভিজে কাপড়  ছাড়ত। কুমুদিনী বিদূষী, লেখিকা হলেও এই নিয়ম মানতে হতো।

– রাজবাড়িতে লেখাপড়া শিখেও এতো আচার বিচার?

– এসব মেয়েদের জন‍্যে। রান্নাঘরে ছেলেদের জন্য কিন্তু, কোফ্তা, কাবাব, কাটলেট, ফ্রাই চলছে। দিনরাত সাহেব সুবো অতিথি আর সাহেবী খানাপিনাও চলছে। আর শুনেছি রাম বা ওয়াইন দিয়ে একরকম অদ্ভুত পুডিং বানানো হতো, টিপসি পুডিং, যা খেয়ে নেশা হতো। কুমুদিনী সেই যুগে কেক আর কুকিজও বানাতে পারতেন। অল্পবয়সে কুমুদিনীর জন্য মেম টিচার আসতো। মেজছেলে জ‍্যোতিষের আঁকা একটা পোট্রেট আছে বাবলিদির কাছে। ছবিটা কুমুদিনীর মেম টিচারের। যাকগে, মোহনবাগানের মহাভারতটা শেষ করি।
এক এক করে প্রতিমা, ভারতী আর মুকুল যখন মারা যায়, সেই সময়ে খবর আসে ছোটো জামাই রবীন মিত্রের পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে অকাল মৃত্যু ঘটেছে।

– সে কি? ছোটো জামাইও চলে গেলো?

– হ‍্যাঁ। রবীনের বাবা প্রিয়নাথ মিত্র ব‍্যবসা বিষয়ে ছেলের ওপরে খুবই ভরসা করতেন। কারণ অন্য ছেলেদের একজন আইনজীবী। একজন ছোটোখাটো জীবনবীমা জাতীয় কাজে ব‍্যস্ত থাকতেন।  রবীনের মৃত্যুর পরে কীর্তি মিত্রের ব‍্যবসার সাম্রাজ্য ধসে পড়ে। পাওনাদারেরা ছেঁকে ধরে এবং তারাই মোহনবাগান ভিলা নীলামে তুলে দেয়। শেষে ভূপেন বসু এবং নিমাইচরণ বসু তখনকার দেড়লক্ষ টাকায় ঐ সম্পত্তি কিনে নেন। রবীন মিত্রের এক পুত্র অশোক এবং এক কন্যা বিবি। অশোক মামা এখন দিল্লিতে থাকে, বয়স নব্বই। বিবি মাসি অ্যাপেন্ডিসাইটিসের বিষক্রিয়ায় বালিকা বেলায় মারা যায়। সব মিলিয়ে প্রিয়নাথ খুবই ভেঙে পড়েন। মোহনবাগান ভিলার একপাশে নয়নচাঁদ দত্ত স্ট্রিটে একটি ছোটো বাড়ি ছিল। ওখানে অফিস ছিল, খেলোয়াড়েরা চুক্তি পত্রে সই করতো, দরকার হলে থাকতো। সেই বাড়িতেই প্রিয়নাথ থাকতে শুরু করেন। শেষ জীবন তিনি ওখানেই অতিবাহিত করেন। শিলি দাদু বাকিদের নিয়ে বিডন স্ট্রিটের একটি বাড়িতে উঠে আসেন। ছোটো পিসিদিদা ওখানেই থাকতেন। দুটি পরিবারের এই বিপর্যয়ে মোহনবাগানের আকাশেও মেঘ জমে ওঠে। আর বৃহৎ সেন পরিবার এই বিপর্যয় কাটাতে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে।

মোহনবাগান আগেই শ‍্যামপুকুরের দুর্গাচরণ লাহাবাবুদের মাঠ ছেড়ে সেনবাড়ির লাগোয়া শ‍্যাম স্কোয়ারে উঠে এসেছিল। শুনেছি ঐ মাঠ প্রতিষ্ঠায় শোভাবাজার রাজবাড়ির কিছু ভূমিকা ছিল। ফেসবুকের পুরোনো কলকাতার গল্প গ্রুপে একজন লিখেছেন রাধাকান্ত দেবের দৌহিত্র আনন্দ কৃষ্ণ বসু এবং তাঁর ভাই যোগেন্দ্র কৃষ্ণ বসুর তত্ত্বাবধানে শ‍্যাম পার্কের মাঠ প্রতিষ্ঠা হয়, তবে এবিষয়ে অন‍্য কোনো নথি পাইনি। এই আনন্দকৃষ্ণ বসুর কাছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ‍্যাসাগর আসতেন ইংরেজি শিখতে। যা হোক এইসব ঘটনার পর সেনবাড়ি অর্থাৎ ৪৪ নং রামকান্ত বোস স্ট্রিট হয়ে ওঠে মোহনবাগানের তৃতীয় অফিস। একদিকে ঐ বংশের ছেলেরা খেলা, সংগঠন, প্রশাসন সবেতে জড়িয়ে পড়েন, অন্য দিকে বড়জামাই শ্রীশচন্দ্র ওরফে ভূতনাথ সেন বা ভূতি বাবু কুমুদিনী কে তাঁর পরিবার সমেত নিজের আওতায় নিয়ে আসেন। পরিবারটি সেনবাড়ি লাগোয়া দাঁতি সেনের একটি বাড়িতে ভাড়ায় উঠে আসে। কুমুদিনী তখন কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর। ঐসময়েই দাঁতি সেন নিজের শ‍্যালিকা লাবণ‍্যপ্রভার সঙ্গে কুমুদিনী পুত্র বিকাশ চন্দ্রের পুনর্বিবাহ দিয়ে সংসারটা আবার বসিয়ে দেন। বিকাশ – লাবণ্য আমার মায়ের বাবা মা। বিকাশের প্রথম পক্ষের স্ত্রী ভারতীর পুত্র বিমানচন্দ্র তখন শিশু। দাঁতি সেনের বাড়িতেই আমার মামা সুজিতচন্দ্র, মা কৃষ্ণা (রাজকুমারী), দুই মাসি কাবেরী ও সুরভির জন্ম হয়। বিকাশচন্দ্রের পাঁচ সন্তান সেন বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বড় হতে থাকে। এই কারণে তাদের জগৎটাও মোহনবাগানময় হয়ে যায়।

সেজদাদু সুরেন্দ্রনাথ যখন মারা যান, দিদা তখন কিশোরী, কোলে সদ‍্যজাত কন্যা অমিয়া। তিনিও এই সেনবাড়িকেই ভরসা মনে করতেন। একদিকে এই পরিবার মোহনবাগানকে বাঁচিয়ে যেমন বাংলার ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে, তেমনি জ্ঞাতিদের শত্রু না মনে করে, আপন করেছে। দত্ত, মিত্র, বোস সবাইকে বিপদের দিনে মানসিক আশ্রয় দিয়েছে। এই সুকৃতির ফলও এই বংশ পেয়েছে। বাকিরা যে যার মতো ছিটকে পড়লেও, আজও বাগবাজারের সেনেদের যৌথ পরিবারের মহিমা অক্ষুন্ন আছে। আমি ঠিক জানিনা, বাংলার আর কোন পরিবারের এতজন কর্তা ডাকনামে সুপরিচিত কিনা। কলকাতা হাইকোর্টের নথিতে দীনবন্ধু সেন ব্র‍্যাকেটে দাঁতি লেখা দেখে আমি তো তাজ্জব। এখন ঐ পরিবারের লোকসংখ্যা বেড়ে গেছে। অনেকেই অন‍্যত্র বাসস্থান ক্রয় করতে বাধ্য হয়েছেন। তবু আমি চাই ঐ সেনবাড়ি যেন স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে থাকে।

আমার মামা বলতো অল্পবয়সে মামা মোহনবাগানের বার পুজোয় যেতো।

– বার পুজো কি? শনিবার?

– আরে নানা। পয়লা বৈশাখে ফুটবলের বারপোস্ট পুজো করা হতো। এখনও হয়। তবে আগের মতো জৌলুস নেই। ঐ দিন সেনবাড়ির কর্তারা সেজেগুজে যেতেন। মামাও যেতো। মামা বলতো, ষাট – সত্তর দশকে চৈত্র মাসের আগে শেষ হতো খেলোয়াড়দের দলবদল। পয়লা বৈশাখে নতুন মরুশুমের সূচনা হতো বারপোস্ট পুজো করে। অধিনায়কের নাম ঘোষণা হতো। নতুন ক‍্যাপ্টেন বার ছুঁয়ে মন্ত্র বলতো।   পুজোর পর মামা সবার সঙ্গে লাইন দিয়ে লুচি, বোঁদে আর পান্তুয়া খেতো।

– মজার ব‍্যাপার তো। বারপোস্ট পুজো কেন? বলটাকে পুজো করা উচিত।

– আরে বোকা, বারপোস্ট রেগে গেলে গোল করার সময়ে জালে না জড়িয়ে, বলটা যদি ধাক্কা মেরে ফিরিয়ে দেয়, তখন কি হবে? বল পুজো করলে, তাকে লাথি মারবে কি করে?

– বুঝলাম। আচ্ছা জেঠিমা আমরা তিনজন যে মোহনবাগানের মেয়ে হলাম, সেটা কি ধোপে টিঁকবে?

– কেন? টিঁকবেনা কেন?

– আমরা যে খুব ইলিশ খাই।

– তাতে কি? মোহনবাগানীরাও ইলিশ খায়, ইস্টবেঙ্গলীরাও চিংড়ি খায়। তাতে ভালোবাসা কমে না।

– বাড়িতে যে নোনা মাছ আছে বলছো, তাতে ইলিশ আছে?

– আছে তো।

– উমম, কাল তবে ইলিশের কি হবে?

– লাবণ‍্যর হাতের একটা রেসিপি করতে পারি, খাবি? কৃষ্ণার কাছে শিখেছি, কাঁচা ইলিশের ঝাল।

– হ‍্যাঁ খাবো তো বটেই জেঠিমা। পুরোনো দিনের রেসিপিতে করা রান্না খেলে, তবে তো পুরোনো গল্প জীবন্ত হয়ে উঠবে।

– মা রান্নাটা কিন্তু দেখবো, কিভাবে করো। কুমুদিনী – লাবণ্য – কৃষ্ণা – শারদা – আর একটা নাম জুড়ে যাবে রঞ্জাবতী। মানুষ থাকবেনা, রান্নার ঘরানা চলতে থাকবে।

– ঠিক, ঠিক।

– কাল কাঁচা ইলিশের ঝাল করলে পরশু ডাব চিংড়ি করবে জেঠিমা।

– ঠিক হ‍্যায়, করতেই হবে। আজ ইস্টবেঙ্গলী ইলিশ রান্না হলে কাল তো মোহনবাগানী চিংড়ি রান্না হতেই হবে।

– রান্নাদুটো আমরা করতে পারি মা? তুমি বলে বলে দেবে।

– এতো উত্তম প্রস্তাব। তাহলে আমি ঢ‍্যাঁড়া পিটিয়ে দিচ্ছি, কাল, পরশু বাড়িতে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের নামে ফুটবল – খাদ‍্য উৎসব হবে অরগানাইজড বাই আওয়ার টু প্রিন্সেসেস।

– ফুটবল – খাদ‍্য উৎসব কিন্তু কুমুদিনীর নামে হবে মা। কুমুদিনী স্মৃতি উৎসব।

– তথাস্তু। মোহনবাগানের যে দল ইংরেজকে হারিয়ে ছিল সেই দলে গোল করেছিলেন শিবদাস ভাদুড়ি আর অভিলাষ ঘোষ। তাহলে রঞ্জা হবে শিবদাস আর কর্ণা হবে অভিলাষ। শিবদাস বাঙাল ছিলেন। তাই ইলিশ যে রাঁধবে সে শিবদাস। আমি রেফারি। দেখি তোরা গোল করতে পারিস কিনা।

তাহলে কুমুদিনী স্মৃতি ফুটবল উৎসবে রঞ্জাবতীর করা কাঁচা ইলিশের ঝাল কেমন হলো?
পাকা বুড়ি ইলিশের টুকরোগুলো নিজে হাতে একটু সর্ষের তেল আর পরিমাণ মতো নুন মাখালো। কিন্তু হলুদ মাখালোনা। এবারে কড়ায় সর্ষের তেল ঢেলে তেলটা গরম করলো। বেশ ধোঁয়া ওঠা কষকষে গরম তেলে পাঁচফোড়ন, আর কয়েকটা চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে তেলটা ঢাকা দিয়ে গ‍্যাস কমিয়ে দিলো। সর্ষে আর কাঁচালঙ্কা একসঙ্গে বাটা ছিলো। খানিকটা ঐ বাটা একটা বাটিতে জলে গুলে তেলের ওপরে ঢেলে দিল। গ‍্যাস কমিয়ে দিয়ে জল ঢালাতে এই মূহূর্তে কড়ায় উত্তাপ কম। এবারে অল্প টক দই ফেটিয়ে তাতে চিলতে খানিক ময়দা মিশিয়ে ঐ ঝোলে মিশিয়ে দিলো। দইয়ের পরিমাণটা আমি নিক্তি মেপে দিলাম, যাতে ঝোলটা কোনোভাবেই টক না মনে হয়। দইটা ঝোলে মিশে গেলে মাছের টুকরোগুলো এক এক করে ঝোলে ছেড়ে দিলো রঞ্জা। এবারে ঝোলটা আঁচ বাড়িয়ে ফুটতে দিলো। ধীরে ধীরে মাছের তেল ছেড়ে ঝোলের ওপরে উঠে এলো। ঠিক লাবণ‍্যর মতোই ঝোলের নুন চেখে, কয়েক দানা চিনি ছড়িয়ে দিলো রঞ্জা। এতে ইলিশের ঝোলের স্বাদটা মিষ্টি হবেনা, কিন্তু ধারালো হবে। ইলিশ নরম মাছ বেশি ফুটবেনা। ঝোল পাতলা হবে, ঘন বা মাখামাখা নয়। হলুদ না দিলেও সর্ষের তেল আর সর্ষে বাটার জন্য ঝোলে একটা খুব হাল্কা বাসন্তী রং ধরে। নামানোর তিন চার মিনিট আগে ঝোলের ওপর কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে কয়েকটা গোটা কাঁচা লঙ্কা ফেলে ঢাকা দিতে বললাম। এতে গ্রেভি ঝাল হবেনা, কিন্তু সর্ষের তেলের ঝাঁজ আর কাঁচা লঙ্কার সুগন্ধ মিশে একটা বাড়তি মাত্রা দেবে।

পরদিন কর্ণাবতী রাঁধলো ডাব চিংড়ি। আমাদের বক্সিবাড়ির বর্তমান চৌকিদার কাম অভিভাবক রুণাদা নরম শাঁসওলা গোটা চারেক ডাবের মুখ কেটে দিলো চওড়া করে। তলাগুলোও কেটে দিলো সমান করে। কর্ণা এবার মাঝারি মাপের চিংড়িগুলো সর্ষের তেলে হাল্কা করে ভেজে নিলো। এবারে কড়ায় মাখন দিয়ে পেঁয়াজ কুচি, আদা রসুন বাটা, নুন আর লঙ্কাগুঁড়ো ছড়িয়ে ভাজা ভাজা করে নিলো। হয়ে গেলে ফ্রেশ ক্রিম মিশিয়ে আঁচ বন্ধ করলো। ডাবের শাঁস চামচ দিয়ে কুরিয়ে বার করে ভালো করে একজন বেটে দিলো। এবার কিছুটা ডাবের জল, ডাবের শাঁসবাটা, ভাজা চিংড়ি আর মাখনে নাড়া মশলা একসঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। এই পুরো জিনিসটা ডাবের মধ্যে পুরে, ডাবের মাথাটা ঢাকা দিয়ে দিলো কর্ণা। পাশে একজন আটা মেখে রেখেছিলো, সে ঐ আটা দিয়ে ডাবের মাথা, বাকি অংশের সঙ্গে চেপে আটকে দিলো। এভাবে চারটে ডাবই প্রস্তুত করা হলো। এবার রান্নাঘরের ভিতরের উনুনের পেটের ভিতর দুটো ডাব আর বাইরের উনুনের ভিতর দুটো ডাব ঢুকিয়ে রাখা হলো। নিভন্ত আঁচে, সব মশলা মিশে তৈরি হলো ডাব চিংড়ি। উপরি পাওনা হলো, একটা মৃদু ধোঁয়া ওঠা গন্ধ।

দুদিন দু মেয়ের রান্না সামলাতে গিয়ে, জনা চারেক সাহায্য কারিণী, তেল, নুন, ঝাল, বাটা, কাটা সব এগিয়ে দিতে গিয়ে এক রৈ রৈ কান্ড বেধে গেল, যেন বাড়িতেই পিকনিক হচ্ছে। তবে হ‍্যাঁ রান্না দুটোই উতরে গেছে। মেয়েদের হাতে খেয়ে বাবাদের মুখেও বেশ গর্বভাব ফুটে উঠেছে। আর দুদিনই খেয়ে ওঠার পর, সকলকে “জয় মোহনবাগান” ধ্বনি দিতে বাধ‍্য করা হয়েছে। খুব একটা বাধা আসেনি কারোর কাছ থেকেই। দেওরের এক বন্ধু এসেছিলেন বাড়িতে। কেবল তিনি সব শুনে টুনে খেয়েদেয়ে ইস্টবেঙ্গলের জয় দিয়েছেন, কারণ তিনি বাঙাল। এতে আপত্তিরও কিছু দেখিনা। কুমুদিনী বাঙাল সেটা তো জানি। আর অবিভক্ত বাংলায় আমাদের কোন পুরুষে কোন মা পুববাংলার ছিলেন, সেটাই কি জানি ছাই! দেশভাগ তো হলো এই সেদিন উনিশশো সাতচল্লিশে। ১৮৮৯ এ মোহনবাগানের ধারণায় কোনো ঘটি বাঙাল ছিলো নাকি?

পুনশ্চঃ শহর – ঘরে তো উনুন নেই। তাবলে কি ডাব চিংড়ি হবে না নাকি। মাইক্রো ওভেনে নর্মাল মোডে মশলা পোরা মাথা ঢাকা ডাব ঢুকিয়ে দশ মিনিট রেখে দিলেই কেল্লা ফতে। বের করে শুধু খাওয়ার অপেক্ষা।



পর্ব সাত

পাকশালার … (পর্ব সাত)

ইলশে গুঁড়ি ইলশে গুঁড়ি
আমরা সবাই বায়না বুড়ি।

সেটা এক শেষ বর্ষার দিন।  সকাল থেকেই ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি হয়ে চলেছে। আর কর্তারা সঙ্গী সাথী জুটিয়ে দীঘা মোহনায় চলে গেছে কাকভোরে। রাতে ফোন এসেছিল – ভালো ক‍্যাচ হয়েছে। মানে ভালো আকারের ইলিশ উঠেছে। কর্তারা সঙ্গে নিয়েছে। বেশ কয়েকটা থার্মোকলের বড় বড় বাক্স, চওড়া সেলোটেপ, কাঁচি। কেউ শুনলে অবাক হবে। মাছ কিনতে এসব ও লাগে। আসলে যতবার  আমার গাড়ি করে কর্তা নোনামাছ আনেন, ততবার পরের দশদিন গাড়িতে গন্ধে ভুত পালায়। ইলিশ আনলে তো কথাই নেই। কলেজে কেউ আমার গাড়িতে উঠলেই বলে, ‘শারদা, আমাদের না দিয়ে, একা ইলিশ খাওয়া কি ঠিক হচ্ছে?’, তারপর সবাই জেনে যায়। তাই কর্তা এখন মাছ কিনে জলরোধক মোড়কের জন্য, থার্মোকলের বাক্স বন্ধ করে চওড়া সেলোটেপ দিয়ে মোড়ম্বা করে বেঁধে নেয়, যাতে ভেতরের বরফ গলা আঁশটে জল গাড়িতে না পড়ে।

সেদিন সকালের জলখাবারে হয়েছে পরোটা আর আলুভাজা। কিন্তু দেখলাম কড়ায় চারখানা ম‍্যাগির কিউব ফুটছে। কি ব‍্যাপার খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম রাঁধুনিদের ছানাপোনারা পরোটা খাবেনা, ভালো লাগেনা, তারা ম‍্যাগি পেলে খুশি। কিন্তু আমার কন‍্যারা কোথায়, খেতে আসছেনা কেন, দেখি উঠোনের একপাশে তারা দুজন দুটো বড় প‍্যাকেট পটেটো চিপস নিয়ে বসে গেছে আর চটচটে নুনগুলো আঙুল চেটে খাচ্ছে, আর দুজনেই নিজের মোবাইলে বুঁদ হয়ে আছে। হাজার বললেও এরা শোনেনা। ভাবি বায়না আমাদেরও ছিলো, কিন্তু একটু অন‍্যরকম। কোনোরকমে চিপসের প‍্যাকেট কেড়ে নিয়ে তাদের খেতে বসানো তো গেলো, কিন্তু তারা নানা রকম অনুযোগ করতে লাগলো –
– তোমাদের কি বায়না ছিলোনা নাকি, তোমরা দোকানের জিনিস খেতে না নাকি।
আমি বলি,
– ওরে, বায়না আমাদের ছিলো। কিন্তু বাড়ির খাবার নষ্ট করে বাইরের খাবার খাওয়ার মতো বিলাসিতা করা আমাদের কালে সম্ভব ছিলোনা। তোদেরও অমন করা উচিত নয়। এই তো কদিনের ছুটিতে আমরা সকলে একসঙ্গে হয়েছি। খাবার টেবিলে একটু গল্পসল্প হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কথাবার্তা না বলে আলাদা হয়ে তোরা যদি মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকিস, আমাদের তো ভালো লাগেনা।

– তোমরা কথা বলতে, আমরা চ‍্যাট করি। সেটাও তো কথা।

– তাই বলে সামনের লোকের সঙ্গে কোনো কথা বলবিনা? আলোচনা করবিনা? কিছু জিজ্ঞেস করবিনা?

– কিছু জানতে হলে গুগলকে জিজ্ঞেস করি তো।

– গুগল? সে কি কাছের মানুষদের মনের কথা জানে?

– মনের কথা? (মেয়ে হেসে ওঠে), তুমি ছোটোবেলায় ভীষণ বায়না ওলা, তর্ক করা আর ছিনেজোঁক বাচ্ছা ছিলে মা। আমাদের ওপর যেমন জোর খাটাচ্ছো তাতেই বুঝতে পারছি। বেশি জোর ক‍রলে বাংলার দিদিকে মেল করে দেবো।

এই বলে মেয়ে পরোটা ছিঁড়ে মুখে পোরে। খুব হাসি পেয়ে যায় আমার, বাংলার দিদি? আমাদের কালে আমরা ইন্দিরা গান্ধীর রেফারেন্স দিতাম। একথা সত‍্যি আমার বায়না ছিলো, খুব ছিলো, এটা কেন ওটা কেন প্রশ্ন ছিলো।  মনটা ভেসে যায় উল্টো মুখে, আর কু ঝিক ঝিক করে একটা রেলগাড়ি আমায় নিয়ে চলে ছোটোবেলার দিকে। খাবার টেবিলে বসে আছি, তবু যেনো আমি নেই। কানের পাশ দিয়ে ছুটে যায়, ঘুরপাক খায় কিছু সুর। “খ‍্যাপ, খ‍্যাপ, খ‍্যাপ ক্ষ‍্যাপন বুড়ি……”; “ছনছা মনছা কই লো….”। আর সেই রেলগাড়ি আমায় দাঁড় করিয়ে দেয় বিস্মৃতি মেঘের ছায়া ঘেরা এক প্ল‍্যাটফর্মে। দেখি
মিষ্টি পিসিমণির দোতলার  বারান্দায় -আপাদমস্তক উলের পোষাকে ঢেকে আমি একটা নীল প্লাস্টিক ক্রিকেট ব‍্যাট নিয়ে দাঁড়াচ্ছি আর মা একটা লাল টুকটুকে বল ছুঁড়ে দিচ্ছে। আমি একবারও ব‍্যাটে বলে সংযোগ করতে পারছিনা কিন্তু বারান্দার ব‍্যাটিং পিচে খুব দৌড়োদৌড়ি করছি, এদিক থেকে ওদিক আবার ওদিক থেকে এদিক। বলটা রেলিং পেরিয়ে টুক করে পড়ে গেলো নিচের উঠোনে আর অমনি মেঝেতে পড়ে হাত মুঠো করে কাঁপছি, চ‍্যাঁচানির চোটে গগন ফাটে। ঠিক তখনই ভেসে আসে এক অবয়ব, হাতে কাঁসার বাটি নিয়ে লাল পাড় শাড়ি পরা কেউ দাঁড়িয়ে আছে, পান খেয়ে রাঙা ঠোঁটে বলছে

– খ‍্যাপ খ‍্যাপ খ‍্যাপ ক্ষ‍্যাপন বুড়ি, ক্ষেপিমণি  কি নেবে?
আমি বলছি
– নালতা
– লাল বলটা? পরে তুলে দেবো।ক্ষেপিমণি এখন পায়েস খাবে।
ওটা মিষ্টি পিসিমণি। বোন যখন জন্মায়নি, তখন পাইকপাড়ায় মিষ্টি পিসিমণিদের বাড়িতে ভাড়া থাকতাম আমরা। আমায় চামচে করে পায়েস খাইয়ে দিচ্ছে মিষ্টি পিসিমণি, মিষ্টি মিষ্টি স্বাদ আর খুব সুন্দর একটা গন্ধ।

আবার কখনও মনে পড়ে সরস্বতী পুজো হচ্ছে, সদর দরজার কাছে বাঁদিকে প্রথম ঘরে ঠাকুর। ঘর জুড়ে অনেক কিছু সাজানো। দূরে ঠাকুরের পাশে কয়েকটা বই রাখা, ওপরেরটা আমার। নীল মলাটের ওপর লাল আর সাদা দিয়ে লেখা। আমার বইটা নিয়ে নিয়েছে সবাই। এত জিনিস টপকে আমি যেতেও পারছিনা যে তুলে আনব। মা সমানে বোঝাচ্ছে, যে ঠাকুরের কাছ থেকে বই তুলে নিতে নেই। কিন্তু আমার ভবি ভোলার নয়। বারবার দরজা দিয়ে বইটা দেখছি, সদর দরজা অবধি দৌড়োচ্ছি আর প্রচন্ড চেঁচিয়ে কাঁদছি। আচ্ছা কি বই ছিল ওটা? দেওয়ালে ক‍্যালেন্ডার, মা কোলে করে ক‍্যালেন্ডারের সামনে আমায় নিয়ে গিয়ে বলছে এটা কে? আমি বলছি বিবেকান্দ-নন্দ। মা হাসছে, আমি হাততালি দিচ্ছি।

আসলে আমার বোন সর্বানী আমার থেকে খুব কিছু ছোটো নয়। তবে বোনের জন্মের আগের বেশ কিছু স্মৃতি এখনো আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি। পাইকপাড়ায় যে বাড়িতে শিশুকালে আমরা ভাড়া থাকতাম, সেই পরিবারের সঙ্গে এতটাই ভালো সম্পর্ক ছিল, যে বড়বেলাতেও সে বাড়ি যেতাম। গৃহকর্ত্রীকে মিষ্টি পিসিমণি বলে ডাকতাম। একজন দিদিভাই ছিল ব্রততী, ডাকনাম বনি, পিসিমণির মেয়ে। মাঝখানে একটি খোলা উঠোন, চারপাশে রেলিং দেওয়া বারান্দা মোজেইক করা। একতলায় আমরা থাকতাম, আর দোতলায় পিসিমণিরা। মিষ্টি পিসিমণি খুব ভালো রান্না করতো। মা গল্প করেছে পরে। আমার আবছা মনে পড়ে, মা আমাকে আপেল সেদ্ধ করে দিতো। যদিও আপেল সেদ্ধ করে খাওয়ার কোনো মানে নেই, তবু তখন বাচ্ছাদের এরকম খাওয়ানোর চল ছিল।

ছোটো থেকেই আমি খিদে একদম সহ‍্য করতে পারিনা। সেই স্বভাব এখনও আছে। যেই খিদের চোটে আমার কান্না শুরু হতো, ওমনি দোতলা থেকে বনি দিদিভাইয়ের ঠাকুমার গলা শুনতাম, সুর করে বলছেন –
“ছনছা মনছা কই লো –
লোহার কড়াই কে খেলো?
হীরামন রাক্ষুসী ঐ এলো।

ঐ ডাক শুনে যেই একটু চুপ করতাম, ঐ অবসরে মা খাবারের বাটি রেডি করে ফেলতো।
নিজের দাদু দিদা ঠাকুমা ঠাকুরদা সবাই চলে গেছেন আমার জন্মের আগে। তাই এই ঠাকুমার স্মৃতি মনের মাটিতে ঝুরি নামিয়ে বসে আছে।

আমাদের তখন হিটার ছিলো, মা হিটারে দুধ গরম করতো। দুধে ছাতু আর কলা মিশিয়ে খাইয়ে দিতো। আমি একটু মোটাসোটা ছিলাম। পাড়ায় সকলে বলতো গ্ল‍্যাক্সো বেবি, যদিও গ্ল‍্যাক্সো আমি কোনোদিনও খাইনি। বাবাকে অফিস যেতে দিতে চাইতামনা। খুব কাঁদতাম। বাবা রোজ অফিস যাওয়ার সময়ে আমাকে দুটো করে মাছ লজেন্স কিনে দিয়ে যেত। তখন সিগারেট লজেন্সও পাওয়া যেতো। সেই যে লজেন্স খাওয়া অভ‍্যেস হয়ে গেলো, বড়ো বয়সেও আর ছাড়তে পারলাম না। খুব কম লোক যারা আমায় ঘনিষ্ঠ ভাবে চেনে, কেবল তারাই আমার এই লজেন্স প্রীতির কথা জানে। শ্বশুর বাড়িতে এসে আমার প্রথম প্রথম খুব হাসি পেয়ে যেতো। এখানে লজেন্স শব্দের ব‍্যবহার নেই। লজেন্স কে সবাই বলে চক্লেট, আর চকোলেটকে বলে ক‍্যাডবেরি, তা সে যে কোম্পানিরই হোক।

যা হোক, লজেন্স খেয়ে খেয়ে দাঁতে এমন ব‍্যথা হলো যে দুধে দাঁত তুলতে হলো। দাঁতের ব‍্যাথায় সারা দেওয়ালে পেনসিল দিয়ে লিখে রাখতাম, দাঁত কনকন করছে। দাঁত তুলেও খুব কেঁদেছি। বাবা আমাকে ভোলাতে সিনেমা দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল, পথের পাঁচালি। তারপরে সারাজীবনে অসংখ্যবার সিনেমাটা দেখলাম। তবু বাবার সঙ্গে সেই প্রথম দেখার স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে। বাবা ফেরার পথে শ‍্যামবাজারে দ্বারিকের দোকান থেকে পান্তুয়া কিনে দিয়েছিলো। এই পান্তুয়ার প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেলো। যে কোনো মিষ্টি কেনার বিষয়ে বাবার দ্বারিকের ওপরে দুর্বলতা ছিলো। আর মায়ের এক বান্ধবী লীনা মাসি আবার সব সময়ে সেন মহাশয়ের সন্দেশ কিনতো। আর মা পান্তুয়া ভালোবাসতো, কিন্তু মায়ের ধারণা ছিলো, পান্তুয়াটা হাতিবাগানের নদীয়া সুইটস সবচেয়ে ভালো করে, এমনকি এমনও হতে পারে যে হয়তো পৃথিবীর মধ‍্যে সবচেয়ে ভালো করে। মায়ের কথা শুনে সবাই হাসতো। জিজ্ঞেস করতো, নদীয়া সুইটসে কী আছে? মায়ের একটা অদ্ভুত যুক্তি ছিলো, টুম্পার (মানে আমার) অন্নপ্রাশনে নদীয়া সুইটসের পান্তুয়া খেয়ে সবাই খুব ভালো বলেছে। ওরাই সবচেয়ে ভালো। এর ওপরে আর কথা চলেনা। “এই দুনিয়ার সকল ভালো, আসল ভালো নকল ভালো…. কিন্তু সবার চাইতে ভালো পাঁউরুটি আর ঝোলা গুড়।” ভালো মন্দ যে যার নিজের ওপর।

মনে পড়ে রাস্তার উল্টো দিকে অল্প দূরে আমার নিজের পিসির বাড়ি যেতাম। পিসির বাড়ির লম্বা জানলা, উঁচু খাট। মাদুর পেতে খাটের তলায় লাল সিমেন্টের মেঝেতে শুতাম। লম্বা জানলার নিচের অংশ দিয়ে বিকেলের রোদ ঢুকে খাটের তলায় আঁকিবুকি  কাটত। আমি দেখতাম। এখন বুঝি আমরা ছিলাম একেবারেই নিম্ন মধ‍্যবিত্ত পরিবার। তবে সামান্য উপকরণে কতো আনন্দ ছিলো। অভাব কোনোদিন কিছু বুঝতে পারিনি। আড়বেলে থেকে গাছের আম কাঁঠাল আসতো। পিসি কাঁঠাল বিচি সেদ্ধ দিয়ে গরমভাত মেখে খাইয়ে দিতো। রাতে তরকারি না থাকলে দুধ আম দিয়ে ভাত খাইয়ে দিতো বাবা। যে আলু দিয়ে দুপুরের তরকারি হতো, সেই আলুর খোসা ভাজা দিয়ে রুটি খেতাম সকালের জলখাবারে। যেদিন লাউ দিয়ে মুগ ডাল হতো, সেদিন লাউয়ের খোসাভাজা দিয়ে সকালে রুটি খেতাম আমরা।

পিসির বাড়ি ছোটো হলেও ছিলো তকতকে। খাটের তলাতেও কোনো ঝুল বা ধুলোর প্রবেশাধিকার ছিলনা। আর মা বলতো আমার পিসি ঘরে ম‍্যানেজার রাখলেও রান্নাঘরে স্টিলের, এ্যালুমিনিয়ামের আর হিন্ডালিয়ামের বাসনগুলো রুপো আর পিতল কাঁসার বাসনগুলো সোনা করে রাখতো ঘষে ঘষে। বাসনে কোনদিন কোনো দাগ ধরতে দেয়নি। বয়সকালে এই পরিষ্কার করাই বাতিক হয়ে কিছুটা শুচিবাইগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল।

ঐ কচি বয়সের স্মৃতি আমার আড়বেলেতেও আছে। বিকেলের হলুদ আলো, উঁচু অবধি বাঁশের ভারা, অনেক বাচ্ছা সেই উঁচুতে বাঁশে দাঁড়িয়ে। নিচে অনেকে মিলে একটা বড় জাল টেনে ধরে রেখেছে। ঐ জালে একটা করে বাচ্চা লাফ দিচ্ছে। বাবার কোল থেকে আমি অবাক হয়ে দেখছি। তারপরে রোদের মধ্যেই গায়ে জল পড়ল। বৃষ্টি নামল। বাবা একটু ঝুঁকে আমাকে দুটো হাত দিয়ে আড়াল করল। বাবা দৌড়োচ্ছিল। আমি বাবার ওমে ছিলাম, তখন আমার গায়ে জল পড়ছিলোনা। তারপরে কি ঘুমিয়ে গেলাম? স্মৃতিটা আর নেই। পরে বড় হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

মা, এমন কিছু কি ঘটেছিল, নাকি স্বপ্ন?
মা অবাক হয়ে বলেছিল
– আড়বেলের চড়কের মেলা, বাঁশে বাঁধা চড়কগাছ। বৃষ্টি এল, তোর বোন তখন পেটে। হিসেব মতো তোর তখন একবছর চার মাস। এসব কথা বলছিস কি করে রে?
– মনে যে ছবি ভেসে আসে, মা।
– এ কি অদ্ভুত রে?
– আচ্ছা মা, বিয়েবাড়ি, উঠোনে ইংরেজি এইচের মতো কমলা রঙের কাঠের চেয়ার, সামনে সাইকেল ভ‍্যান, তাতে অনেক কলাপাতা, কাপড় দিয়ে ঢাকা, এমন কিছু হয়েছিল?
– হ‍্যাঁ, সে তো বকুলদার মেয়ে বাবলির বিয়ে, দমদমে।
– মা শোনোনা, একটা সিনেমা হচ্ছে, একজন লোক, দরজার পর দরজা পেরিয়ে যাচ্ছে, ওটাও তাহলে সত্যি!
– ওটা তো প্রমথেশ বড়ুয়ার মুক্তি।
– প্রমথেশ বড়ুয়া! উত্তম কুমারের আইডল – পি সি বি?
– হ‍্যাঁ, সেই পি সি বি। বাবা ধন‍্যি তোর মনের ছবি।
– আচ্ছা মা, একজন সাদা শাড়ি পরা, সেজজেঠুর সোফায় বসে। সোফায় সবুজ ছোটো ছোটো ফুলওলা ঢাকা। খুব বুড়ি মানুষ, খুব রোগা। আমাকে আদর করছে। একটু আচার দিচ্ছে মুখে, টক টক, মিষ্টি মিষ্টি। আমি আবার খাবো বলে কাঁদছি, তার দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে যাচ্ছি। তুমি বকছো, সে কে গো মা?
– বলছিস কীরে? সেতো আদুরী দিদিমা। তাকে মনে আছে তোর? ভীষণ জেদ আর বায়না তোর। জেদ ধরলে ছাড়ান পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতো। তুই দিদিমাকে দেখলেই কোলে যাওয়ার জন্য ঝুঁকে যেতিস, বুড়ি গ্ল‍্যাক্সো বেবিকে কোলে নিতে পারতোনা। মুখে আচার দিতো।
– আদুরী কে গো মা?
– আমার শাশুড়ির মানে তোর ঠাকুমার এক পিসি। তোর বাবাকে ছোটোবেলায় মানুষ করেছে।বালবিধবা, বড় দুঃখী মানুষ। চিরকাল পরের হেঁশেল ঠেলে ঠেলে, আর পরের সেবা করতে করতে জীবন গেলো। সমাজ এদের শুধু শোষণ করে। বড় হয়ে এমন দুঃখী মানুষদের জন্য তুই কিছু করিস।
– কী করবো মা?
– তাতো জানিনা। তোর বুদ্ধি আছে, জেদ আছে। তুই বরং মেয়েদের পড়াবি। পড়াশোনা করতে পারলে, মেয়েরা অনেক বিপদ, হেনস্থা থেকে মুক্তি পাবে।

আদুরী দিদিমার গল্প শুনেছি মেজজ‍্যাঠাইমার মুখে। এখন আবার বর্তমান গল্পে ফিরি।

                       ——

থমকে যে ঐ রয়েছে সময়,
ডাকছে যেন পিছু।
মনের কথা বলবো ভাবি,
শুনবে কিছুমিছু?

বোন হবার পরে পাইকপাড়া ছেড়ে আমরা পাতিপুকুরের সরকারি আবাসনে উঠে এলাম। পাতিপুকুরে এসে মা বিবেকানন্দ বিদ‍্যাভবনে বি এ তে ভর্তি হল। আর বাবার তো ঠাকুরদার মতো ডাক্তার হবার ইচ্ছে ছিল। সে তো হলনা। বাবা সেই আশা কিছুটা হলেও পূরণ করার জন্য সরকারি হোমিওপ্যাথি কলেজে ভর্তি হল। শুরু হল সংসার, চাকরি আমাদের বড় করে তোলা আর সঙ্গে পড়াশোনা। আমরা একটা ঘরে থাকতাম। খাটটা ছিল উঁচু, তার তলায় সর্বস্ব। পাঁচ সাত খাটের মাঝখানে আমি আর বোন দুদিকে মাথা করে, পায়ে পা ঠেকিয়ে শুতাম। দুপাশে বাবা মা। বাবা আমার দিকে মাথা করে শুত আর মায়ের মাথা বোনের দিকে। গভীর রাতে যদি ঘুম ভেঙে যেত, দেখতাম খাটের একপাশে বা মেঝেতে হারিকেন জ্বালিয়ে বাবা মা পড়াশোনা করছে। আলোটা এপাশে খবরের কাগজ দিয়ে আড়াল করা, যাতে আমাদের চোখে না পড়ে।

উঠতি ঘরের ছেলে
আর পড়তি ঘরের মেয়ে,
বিদ‍্যেদেবী থাকেন তাদের
সারা জীবন ছেয়ে।

ঐ খাটের পাশে মা স্টোভ জ্বালিয়ে রান্না করতো। বাবা বসে কুটনো কুটে দিতো। দেওয়ালে চারটে বড় বড় তাক ছিল। সেই তাকে বাসন কোসন, মশলাপাতি সব থাকতো। ওখানে থাকতো কনডেন্সড মিল্কের টিন। মা ওটা রুটিতে মাখিয়ে রোল করে দিতো, আমরা দুবোন খেতাম। আড়বেলে থেকে পাটালি আসতো। আমরা গুড় রুটিও খেতাম।

বাবা মা দুজনেই খুব মেধাবী ছিল। কিন্তু মা যেকোনো বিষয়ে খুব উদ্বেগে ভুগত, আর বাবা নিরুত্তাপ। মা পার্ট ওয়ান পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগের দিন হয়তো ঠিক মতো প্রস্তুতি হয়নি, সেই ভেবে ভেবে বমি টমি করে একশা। পরীক্ষার দিন বাবাকে ছুটি নিতে হল, অসুস্থ মাকে নিয়ে যাবার জন্য। বাবা কিন্তু অফিস, সংসার সামলেও চুপচাপ প্রথম পরীক্ষা দিয়ে দিল, তেমন কোনো ঢেউ উঠলোনা। শুধু প্র‍্যাকটিকাল খাতার আঁকাগুলো আমার মাসি, কাবেরীকে দিয়ে আঁকাতো। মাসিমণি খুবই ভালো আঁকত। বাবা সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরে ঐ আঁকার উপর বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো ঠিক করে নিত আর স্কেল দিয়ে লাইন টেনে লেবেলিং করতো। আমি চুপচাপ একটু দূর থেকে ড‍্যাবডেবিয়ে দেখতাম, বাবা কি করছে। বাবার একটা ট্রাঙ্ক ভর্তি করে হাড় থাকত। সেই হাড় গুলো নিয়ে বাবা পড়াশোনা করত। ঐ হাড়ের বাক্স চানঘরের ওপরে লফ্টে রাখা থাকত। আমার প্রচন্ড আকর্ষণ ছিল ঐ ট্রাঙ্কের ওপর। ট্রাঙ্ক নামলে আমি আর দূরে থাকতে পারতাম না। বাবার পিঠের ওপর দিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে দেখতাম। এটা ওটা জিজ্ঞেস করতাম। ঐ দেখে দেখে চিনে গিয়েছিলাম, কোন হাড়টা শরীরের কোথায় থাকে। নিজের শরীরে স্পর্শ করে ঐ হাড়গুলো অনুভব করতাম। তবে সবচেয়ে ভালো লাগত ওপরের পিঠে, কাঁধের নিচের তিনকোণা স্ক‍্যাপুলা। ওটা নিয়ে খেলতাম। বোনকে বলতাম, এ্যাই আমার স্ক‍্যাপুলায় একটু চুলকে দে তো। মাকে বলতাম, মা – আ! আমার টিবিয়া আর ফিবুলার মাঝখান টা ধরে টিপে দাও। খুব ব‍্যথা করছে। আমার রোজ রোজ সন্ধে হলেই পা ব‍্যথা করত। মা চুল বাঁধার কালো দড়ি দিয়ে পা জড়িয়ে বেঁধে দিত। প্রথম পরীক্ষার পর রেজাল্ট বেরোলে দেখা গেল বাবা পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে। আর ফাইনালে বাবা তৃতীয় হয়েছিল। অনেক পরে যখন বাবার সঙ্গে গিয়ে কোনো অ্যালোপ‍্যাথি নামকরা ডাক্তার দেখিয়েছি, তখন দেখতাম বাবা গিয়ে প্রণাম করত। ওঁরা ছিলেন বাবার স‍্যার। যাই হোক, মা গ্র‍্যাজুয়েট হল, আর বাবা হোমিওপ্যাথিতে ডাক্তারি পাশ করল। আমি ততদিনে বাগবাজার মাল্টিপারপাসে কেজি ওয়ানে ভর্তি হলাম।

স্কুলের দিন গুলো খুবই আনন্দে কাটত। কিন্তু বাড়ি এসে চাপা টেনশন। বাবা ফিরত রাত দশটা পার করে। আমাদের খাইয়ে দাইয়ে, শুইয়ে দিয়ে মা ঘরবার করতো। ঘুম আসতোনা আমার। খালি চোখ পিটপিট করে দেখতাম।  শুনতাম কিসব জরুরী অবস্থা হয়েছে আমাদের দেশে, জরুরী মানে খুব দরকারি। তাই বাবার অফিসে ওভারটাইম হয়, বাবাকে দেশের খুব দরকার। আনন্দবাজারে রোজ হেডলাইনের নিচে বড় করে কুট্টির কার্টুন বেরোত। বাবা মা ব‍্যস্ত থাকার জন্য, আমরা প্রায়ই কাছেই মামার বাড়ি থাকতাম। মা সাতসকালে রান্না করে টিফিন গুছিয়ে দিয়ে যেত আমাদের সঙ্গে। দুটো রুটি, আধখানা ডিম সেদ্ধ, এইরকম। আর তখন মামা বসে বসে কুট্টির কার্টুনের মানে বোঝাতো আমাকে।

– এই দেখ টুম্পা, এখানে এইযে কাপড় মুড়ি দিয়ে গণতন্ত্র শুয়ে ঘুমোচ্ছে। আর এই দেখ দরজা দিয়ে সিদ্ধার্থ বেরিয়ে যাচ্ছে।

– কেন মামা?

– আরে সেদিন বুদ্ধদেবের গল্প বললাম মনে নেই?

– হ‍্যাঁ-অ্যাঁ

– যশোধরা ঘুমোচ্ছিল, আর রাজপুত্র সিদ্ধার্থ বেরিয়ে গেল না?

– হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ

– আরে সেটাই কুট্টি এঁকেছেন দেখ।

– কী?

– আরে সিদ্ধার্থের মুখটা দেখ, নাক বের করা, তোলা চুল। এটা বুদ্ধদেব নয়, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়, মুখ‍্যমন্ত্রী। এই দেখ ভেতরের পাতায় ছবি। মিল পাচ্ছিস? একে বলে কার্টুন। নামের মিল বলে এইভাবে দেখাচ্ছে।

– বুদ্ধদেব কে আঁকেনি কেন?

– আর একটু বড় হ। বুঝতে পারবি কেনো আঁকেনি।

এর মধ‍্যে আবার মায়ের এক পিস্তুত ভাই মারা গেল। কলেজে পড়ত। তার মা রান্না করে ছেলেকে ডাক দিলে। ছেলেও দুপুরে ভাত খেতে বসেছিল, বাইরে থেকে কারা ডাকল। উঠে গেল। নামতে গিয়ে সিঁড়িতেই ছেলের গলা কেটে দিল। আর তার মা মানে মায়ের মেজপিসি বোবা হয়ে গেল, আর কথা বলেনা।

– কে গলা কেটে দিল মা?

– নকশাল

– নকশাল কে? খুব দুষ্টু লোক? এখানে আসবেনা তো?

– চুপ চুপ। বাড়িতে যা বললে বললে, বাইরে, ইস্কুলে এসব কথা উচ্চারণ করবেনা।
রাস্তা দিয়ে মিছিল যেত। জানলা দিয়ে দেখে দেখে আমি আর বোন খাটের ওপরে মায়ের লাল ব্লাউজ নিয়ে মিছিল করতাম, চেঁচাতাম – ভোট দিন বাঁ-চতে, ত্-তা-রা হাতুড়ি কাস্তে। ইন -কি-লা-ব, জিন্দা-বা-দ। খাট থেকে নামা আমাদের বারণ ছিলো। কারণ ঐ খাটের পাশে মেঝেতে স্টোভ জ্বলতো, ভাত ফুটতো। আমরা মেঝেতে দৌড়োদৌড়ি করলে কি থেকে কি হয়ে যাবে, তাই এই ব‍্যবস্থা। শোবার ঘরই তখন আমাদের রান্নাঘর, বসার ঘর সবকিছু।

রান্নার সময়ে কেন আমাদের খাট থেকে নামা বারণ ছিলো, তার পেছনে একটা মজার কিন্তু নিদারুণ গল্প আছে। আমরা তখনও নিজেদের কোয়ার্টার পাইনি। দরখাস্ত করা হয়েছে সবে। একজন দিদার কোয়ার্টারে দু কামরা। আমরা তার একটা ঘরে থাকতাম। দিদা কোয়ার্টারের রান্নাঘরে রান্না করতো। মা ঘরে করতো। একদিন হয়েছে কি, দিদা ছোটো ছোটো চিতি কাঁকড়া এনেছে রান্না করবে বলে। ব‍্যাগে ছিলো। কিন্তু ওটা কাত হয়ে কাঁকড়ার দল বেরিয়ে পড়লো। মা গেছে চান করতে। জ‍্যান্ত কাঁকড়াগুলো চারদিকে ছড়িয়ে গেছে, দু চারটে হেঁটে হেঁটে আমাদের ঘরেও ঢুকছে। আমরা তো চিনিনা এটা কী জিনিস। আমাদের খাটটা তিনটে ইট দিয়ে উঁচু করা ছিলো। আমি তখন একটু বড়ো। একলাফে ইটে পা দিয়ে বেয়ে বেয়ে খাটে উঠে গেলাম, বোন পারলোনা। চিতি কাঁকড়ার দল ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে। আর যতো জোরে পারি দুজন গগন ফাটাচ্ছি। মা ঐ চিৎকার শুনে ভিজে কাপড়ে বেরিয়ে, দিগবিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে ভিলেন পোকার ওপরে মারলো ঝাঁটার মোক্ষম বাড়ি। দুটো নির্দোষ চিতি কাঁকড়া স্বর্গে গেলো। আমরা রুদ্ধশ্বাসে দেখছি লাইভ পকেমনের সঙ্গে মায়ের লড়াই। যদিও পকেমন নামটা তখন জানতাম না। নারকেল কাঠির ঝাঁটার বাড়ি মেরে মায়ের মতি আবার মাথায় ফিরে এলো। মা তো নিজেও কখনো এমন কাঁকড়া খায়নি। কিন্তু ধারণা করে ঐ দিদাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, ‘মাসিমা, আজ বাজার থেকে কী এনেছেন?’ তারপর আর কি, মা খুবই অপ্রস্তুত, ক্ষমা টমা চেয়ে নিলো। আমি সুড়সুড় করে আবার নেমে এসে দিদার রান্না দেখতে লাগলাম।

দিদা আর তার মেয়ে বেবি পিসি দুজনের মতো তরকারি হলো – চিতি কাঁকড়ার ঝাল। মা যেমন মাছের ঝাল করে, তেমন নয়, মশলাদার। প্রথমে ডুমো আলু ভেজে নিলো দিদা। তারপর নুন হলুদ মাখিয়ে চিতি কাঁকড়াগুলো ভেজে নিলো। এবারে পেঁয়াজ, আদা, রসুন, হলুদ, লঙ্কা দিয়ে কষে ঝোল বানিয়ে নিলো, তারপর আলু আর কাঁকড়া ভাজা ঝোলে দিয়ে ফুটিয়ে নিলো। শেষে মেশালো কাঁচা গরম মশলা বাটা।

বিয়ের পরে আমি চিতি কাঁকড়া খেয়েছি। এখানে তেঁতুল দিয়ে টক রান্না করা হয়। যাই হোক, ঐ ঘটনা ঘটার পরে রান্নার সময়ে আমাদের খাট থেকে নামা বন্ধ হলো। তাই ঐ জানলাই ছিল আমাদের জগৎ। আইসক্রিম ওলা, ঘুঁটে উলি, বাসন উলি যেই রাস্তা দিয়ে যেত, তাকে দুজনে ডাকতাম। কেউ হাসত, কেউ রাগ করতো। সেটা ১৯৭৫ সাল। মর্নিং ইস্কুল। ভোরবেলায় বাবার সঙ্গে পাঁচমাথার মোড় থেকে হেঁটে ইস্কুলে যেতাম। আর দোকান, দেওয়াল এসবে কি লেখা আছে ড‍্যাবডেবে চোখ দিয়ে গিলতাম। ইস্কুলে সবার নাম লেখা দুটো করে ন‍্যাপকিন, থালা, গেলাস ছিল। একটা ভাঁজ করে গলায় গুঁজে ঝোলাতে হত। আর একটা টেবিলে পেতে থালা রাখতে হত। টিফিন ইস্কুল থেকেই দিত – দুটো থিন অ্যারারুট বিস্কুট, একটা রসগোল্লা, কোনোদিন বাপুজি কেক। খেতে খুব দেরি হতো আমার, আসলে লজেন্স খেয়ে খেয়ে পাশের দাঁতে ব‍্যথা, সামনের দাঁত দিয়ে কুটকুট করে পাকলে পাকলে খেতাম। খাওয়ার পর সবার ফোল্ডিং খাট ছিল, সেখানে ঘুমোতে হত। তিনজন মিস ছিলেন, মিস চৌধুরী, মিস ব‍্যানার্জি আর মিস বোস। মাঠে খেলা, নাচ গান, ব্রাশ দিয়ে বালি খেলা আর হাতের কাজ, আঁকা, কাঁচি দিয়ে গোল কাটা, এইসব হত। কিন্তু মনে হত, ইস্কুলটা বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেত। আর বিকেলে মা যখন নিতে যেতো, ভীষণ রেগে মাকে বলতাম, আমার ওভার টাইম হবেনা মা? আমার বুঝি কিছু জরুরী নেই? আমাকে দেশের দরকার লাগবেনা! মা গম্ভীর হয়ে বলতো, সে তো বটেই, তোমাকে দেশের খুবই দরকার। একটু বড় হলেই ওভার টাইম হবে। মায়ের কথা শুনে, বড় হলে, দেশ ঠিক কী করতে বলবে, এসব আকাশ পাতাল ভাবতে বসতাম।

কে জি টু তে উঠে গেলাম। আর কতদিন লাগবে? এখনো তো দেশ কিছুই বলছেনা। বললে আমি জানবোই বা কিকরে? চিঠি দেবে? রাঁচি থেকে বড়দাদুর চিঠি আসে। আমার চিঠি বাড়িতে আসবে নাকি ইস্কুলে? আমাদের ব্লকে পোস্টম‍্যান ঢুকলেই লক্ষ্য রাখতাম, আমার নামে কোনো চিঠি এলো? কিন্তু এই চিঠির অপেক্ষায় থাকাটা কাউকেই বলিনি, মাকেও না।

আমি ওয়ানে উঠলাম। মা নিবেদিতা ইস্কুলে প্রাথমিক বিভাগে পড়ানোর চাকরি পেল। আমিও মাল্টিপারপাস ছেড়ে নিবেদিতায় ভর্তি হলাম। মায়ের চাকরি পাবার পর আমাদের রোজকার খাবারের প‍্যাটার্নে একটু বদল এলো। এই প্রথম পাঁউরুটি এসে রুটির জায়গা দখল করলো। আলুভাতে, ডিমসেদ্ধ দিয়ে ভাত খাওয়াটা ঘনঘন হতে লাগলো। খাওয়ার বদলের সঙ্গে বাইরের জগতেও অনেক কিছু পরিবর্তন হচ্ছিল। ওয়ানে ভর্তির পর থেকেই দেওয়ালের লেখাগুলো অনেক বদলে যাচ্ছিল। নিবেদিতা লেনের দেওয়ালে লেখা ছিল – বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বুঝে নিক দুর্বৃত্ত। সঙ্গে চাষীর ছবি। লাইনটা বেশ মনে ধরল, ছবিটাও। মাকে দেখালাম। মা বলল, ওটা সুকান্তের কবিতা। বাবাকে ধরলাম, সুকান্ত কে? বাবা মায়ের দিকে তাকালো। মা সংক্ষেপে দেওয়ালের কথা বলল, আরও জুড়ে দিল, কাগজ আর দেওয়াল পড়ে পড়ে এই সব রাজনীতির দিকে নজর পড়েছে মেয়ের। দিনরাত এটা ওটা প্রশ্ন। বাবা কোনো কথা বললনা। কিন্তু পরের দিন একটা বই ধরিয়ে দিল আমার হাতে। নামটা সুকান্ত সমগ্র। আবার কিছুদিনের খাদ্য পেয়ে গেলাম। মাকে সকালে সব রান্না করে, বাসন মেজে গুছিয়ে, মেঝে মুছে, আমাদের রেডি করিয়ে, নিজে রেডি হয়ে ইস্কুল বেরোতে হতো। আবার ফিরে এসে জলখাবার,  রাতের রান্না সব একাহাতে করতে হতো। মা সবসময়েই খুব তাড়াহুড়োয় থাকতো। তার মধ‍্যে আবার আমি নানান প্রশ্ন করে মাকে পাগল করে দিতাম। ইস্কুল যাবার পথে দেওয়াল জুড়ে রাক্ষসীর ছবি আঁকা থাকত, বড় বড় নখ ওলা, তাতে রক্ত পড়ছে।

– মা দেওয়ালে এত রাক্ষুসী কে আঁকে বলোতো?

– রাক্ষুসী? ও! ঐ ইন্দিরা গান্ধীকে আঁকে।

– ই-ন্দি-রা গান্ধী! সে তো দারুণ দেখতে। দিল্লীতে থাকে। সিনেমার আগে, যার সিনেমা হয়, সেই তো। তার হাতে তারা হাতুড়ি কাস্তে থাকে? রাক্ষুসীর পাশে আঁকা থাকে।

– আমি ওসব বলতে পারবোনা। বাবাকে জিজ্ঞেস কর।

বাবা ব‍্যাপারটা মোটামুটি বুঝিয়ে দিল। মাঠে ফুটবল খেলা হলে যেমন কয়েকটা দল থাকে, দেশ চালাতে গেলেও তেমন। লোকে যাতে চিনতে পারে, তাই সব দলের একটা করে ছবি আছে। যে জিতে যায়, সে দিল্লিতে থাকে। মনে মনে হিসেব কষে নিলাম। ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে থাকে, মানে জিতে গেছে। তার ছবি হল গাই বাছুর। আর তারা হাতুড়ি কাস্তে হল তার শত্রু। তাই রাক্ষুসী আঁকে। তবে কি বড় হলে ইন্দিরা গান্ধীই চিঠি দেবে আমাকে? কিন্তু হঠাৎ একদিন শুনলাম ইন্দিরা গান্ধী খেলায় হেরে গেছে। থমথমে মুখে ঘুরতে লাগলাম, আমার চিঠির কি হবে? মা লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল,

– কী হয়েছে?
আমি এবারে ভেঙে পড়লাম।
– সেই কেজি ওয়ান থেকে অপেক্ষা করছি। ভেবেছিলাম ইন্দিরা গান্ধী চিঠি দেবে ওভারটাইমের জন্য। সে হেরে গেছে। আমি তাহলে দেশের দরকারে লাগব কী করে?

চোখে জল চলে এল আমার। মা একটু সময় নিয়ে ব‍্যাপারটা বুঝল, আমার সমস‍্যাটা কী? তারপরে বলল,

– তুমি ভুল বুঝে কষ্ট পাচ্ছ। দেশ ঐভাবে চিঠি দেয়না। দেশ কি চায়, সেটা বইতে লেখা থাকে। আর খেলতে গেলে হারজিত হবেই। কখনো মোহনবাগান জিতবে, কখনো ইস্টবেঙ্গল। এতে দুঃখের কিছু নেই।
আমি কান্না ভেজা গলায় বললাম,

– তা সে কোন বইতে দেশের দরকার লেখা থাকে, সেটা কি তোমার কাছে আছে? আমি পড়তাম তবে।
মা তখন হাতের কাজ ফেলে উঠে খাটের তলায় বইয়ের পাঁজা থেকে একটা বই বার করে গল্প পড়ে শোনালো। বইয়ের নাম রামকৃষ্ণের কথা ও গল্প। ধর্মব‍্যাধের গল্প। একজন ব‍্যাধ নিজের সব কর্তব্য পালন করতো, কোনো অহঙ্কার করতোনা, অন‍্যের ক্ষতি চাইতোনা। তাই সে সত‍্যিকারের জ্ঞানী হল, সন্ন‍্যাসীকে অবধি উপদেশ দিতে পারতো। গল্প পড়া শেষ করে মা বলল, যার যা কাজ সে সেটা মন দিয়ে করলেই দেশ খুশি হয়। দেশকে খুশি রাখাটাই সবার কাজ।

– আমি এখন কী কাজ করে দেশকে খুশি করতে পারি।

– পড়াশোনা করে।

– পড়াশোনা করা দেশের কাজ? সবাই তো করেনা।

– বয়েস অনুযায়ী কাজ বদলায়। ছোটোদের কাজ পড়াশোনা। এই বলে মা আর একটা পুরোনো বই বার করলো। বলল,

– পড়ো, কি লেখা আছে।
বানান করে দেখলাম লেখা আছে- ছাত্রাণাং অধ‍্যয়নং তপঃ। মানেটা মা বলে দিল, ছোটোদের কাছে বই পড়াটাই সাধনা। দেশের জ্ঞানী ঋষির কথা। বুক থেকে পাথর নেমে গেল। বাড়িতে বসে মন দিয়ে বই পড়লেই দেশ খুশি হবে। এই এত সহজ কথাটাই জানতাম না। মায়ের সঙ্গে আগেই আলোচনা করা উচিত ছিল। মা দেখছি সবই জানে। বাবার ডাক্তারি বই অবধি ঘেঁটে ঘুঁটে দেখতে লাগলাম, বাংলায় কিছু আছে কিনা। পেয়েও গেলাম মেটেরিয়া মেডিকা। তারপর একদিন খবরের কাগজের মধ্যে একটা চকচকে বই এলো – শুকতারা। বাবা বলল, এবার থেকে তোমার জন্য প্রতি মাসে শুকতারা আসবে। এখন এটা পড়ো, মেটেরিয়া মেডিকা পরে পড়বে। সেই থেকে মা বাবার কথা মতো বই পড়ে চলেছি। বইয়ের বাইরে তেমন করে কিছু আর শেখা হলনা। ডাকঘর পড়েছি। রাজার চিঠি আসে কিনা জানিনা। ২০১২ সালে যখন কলেজের টিচার ইন চার্জ হলাম, মমতা ব‍্যানার্জির সই করা চিঠি পেয়েছিলাম নারী দিবসে। নারী প্রশাসক হিসেবে অভিনন্দনের চিঠি, সঙ্গে বড় প‍্যাকেট মিষ্টি, ফুলের বোকে। কম্পিউটারের ডাটা অ্যালগোরিদমের কারসাজিতে, জন্মদিনে নরেন্দ্র মোদীর ছবি আর সই দেওয়া ইমেলও পেয়েছি বার দুয়েক। আমি নিজের মনে হাসি, দেওরঝিকে জিজ্ঞেস করি,

– হ‍্যাঁ রে, দেশ কি সত‍্যি জানতে পারে, কী কাজ করি আমি।
– পারে জেঠিমা। এই যে আমরা জানছি। আমরাও তো দেশ। এক দেশের মধ‍্যে আছে অনেক অনেক দেশ।

বক্সি বাড়ির রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে একরত্তি মেয়ের মুখে এই কথা শুনে হতবাক হয়ে যাই। ওর গুগল গোলা মনেও কতো পরিণত চিন্তা – এক দেশের মধ‍্যে আছে অনেক অনেক দেশ।
দেওরঝি বলে,
– জেঠিমা, ছোটোবেলায় ইন্দিরা গান্ধীর চিঠি পাবে ভাবতে পেরেছিলে, বলেই না বড়োবেলায় অন্তত মমতা ব‍্যানার্জির চিঠি পেলে। ধন‍্য তোমার অধ‍্যবসায়।
আর মেয়ে মুখ টিপে হেসে বলে,
– মা তুমি জয়া ভাদুড়ি
– মানে?
– বুঝতে পারছোনা মা, তুমি ধন‍্যি মেয়ে।
– এ্যাই মার খাবি এবার।
ততক্ষণে খাওয়া শেষ। পিল পিল করে দুই মেয়ে পগার পার।

                  ———


———————————


















চাঁদ তারার ছায়া ঘেরা বিয়েবাড়ির ভোজ

কলকাতায় পড়াশোনা, রোজকার জীবন চলতো বাঁধা গতে। কিন্তু ছুটিছাঁটা পড়লে বা অনুষ্ঠান বাড়ি পড়লে আমরা আড়বালিয়ায় গ্রামের বাড়ি চলে যেতাম। আমার ঠাকুমার মেজবোনের সংসার ছিল যদুরহাটিতে। মাসি ঠাকুমা অল্পদিনই বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তাঁর এক ছেলে ছিল, বাবার মাস্তুত দাদা, আমাদের তারা জেঠু। টেলিফোন বিভাগে চাকরি করতেন। তখনকার দিনে, বাড়িতে তো টেলিফোন কারোর ছিলনা। তারা জেঠুর  ঢাউস ব‍্যাগে সবসময়ে একটা কালো ল‍্যান্ডফোনের সেট থাকতো। কলকাতায় জেঠু কোনদিন বাড়িতে এলেই আমাদের তো বিরাট আনন্দ। সেই টেলিফোন নিয়ে খেলা শুরু করে দিতাম। জেঠুকে মানুষ করেছিলেন তাঁর জ‍্যাঠাইমা। বৃদ্ধা বয়সে তাঁকে আমি দেখেছি। তারা জেঠু তাঁকেই মা ডাকতেন। আড়বালিয়ায় যখন থাকতাম, আমরা মাঝেমধ্যেই সাইকেল ভ‍্যানে করে তারাজেঠুর বাড়ি যেতাম। সেবাড়ির বড় উঠোনে একটা লম্বা পানগাছ ছিল। মাচায় লাউ, শশা, চালে চালকুমড়ো ছিল। মাটিতে কুমড়ো গাছ লতিয়ে ছিল। জেঠিমা ছিলেন সুন্দরী, নাম সুদেবী। একবার বসন্ত কালে তারা জেঠুর মেয়ের বিয়েতে আমরা চললাম সদলবলে। ও তল্লাটে যাতায়াত তখন সাইকেল ভ‍্যানে। আমরা শুধু ভ‍্যান বলতাম। কিন্তু দুটো পাওয়া গেলনা। একটা ভ‍্যানে সামনে চালকের দুপাশে পা ঝুলিয়ে বাবা আর সেজজেঠু। পিছনে পা ঝুলিয়ে মা আর সেজজ‍্যাঠাইমা। মাঝখানে জড়ামড়ি করে, আমি, বোন আর ছোড়দা, সেজজেঠুর বড়ছেলে। দশজনের সবচেয়ে ছোটো ভাই, মানে সেজজ‍্যাঠাইমার ছোটো ছেলে তখনও জন্মায়নি। আঁধার রাতে উতল হাওয়া কেটে ভ‍্যান চলেছে। আলো বলতে ভ‍্যানের সামনে ঝোলানো একটা ছোট্ট টিমটিমে লম্ফ, আমরা বলতাম কুপি। আকাশে চাঁদ ছিলনা, কিন্তু ফুটি ফুটি এত তারা, যে আকাশের কালো দেখা যাচ্ছিলনা। বাবা ভ‍্যানে যেতে যেতে আমাদের আকাশ গঙ্গা দেখিয়েছিল। আগে বাবা সপ্তর্ষি মণ্ডলও চিনিয়ে দিয়েছিল একদিন। বলেছিল সারা বছরই ওঠে, সময় আর দিক বদলায়, তাকে তাকে থাকতে হয়। দেখতে দেখতে কবে আকাশের কোনদিকে তাকাতে হবে, সেটা বুঝে নিতে হয়। ভ‍্যানে হৈ চৈ করে গল্প করতে করতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ অন্ধকারে সামনে একটা জটলা মনে হল। রাস্তা বন্ধ। দেখার জন্য বাবা আর সেজজেঠু নেমে গেল, ভ‍্যানচালকও এগিয়ে গেল হ‍্যান্ডেল ছেড়ে। আর কি যে হয়ে গেল, দেখলাম ভ‍্যানের ওপরে যে যেখানে বসেছিলাম, ঠিক তেমনি বসে আছি রাস্তায়। শুধু একটু দূরে দূরে। পিছন ভারি হয়ে, ভ‍্যান উল্টে গেছে। কোমরে ব‍্যথা লেগেছে। বোন কেঁদে উঠল। আমারও চোখ ছলছল। বাবা অন্ধকারে এগিয়ে এসে বোনকে কোলে নিল, আর আমাকে চুপিচুপি বলল,
– কালপুরুষ দেখবি?
– কোথায়? (ক্লাস থ্রিয়ের বিজ্ঞান বইতে কালপুরুষের ছবি ছিল)
– ঐ দেখ লুব্ধক।
– চকচকে বাবা।
– ঐ তারা গুলো দেখ, ধনুক।
বাবা ভ‍্যানে বসিয়ে দিল।
– তোমাকে কালপুরুষ আঁকতে শিখিয়ে দিয়েছি। বাকি গুলো খুঁজে নাও। চারপাশে আছে।
আমি কালপুরুষ কল্পনা করে করে তারা খুঁজছিলাম। ভ‍্যানটা বাকি রাস্তা পেরিয়ে গেল চুপচাপ। হঠাৎ দেখি বিয়েবাড়ি এসে গেছে।

এর অনেক বছর পর কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে পশ্চিম হিমালয়ের কৌশানিতে গিয়ে এমন তারাভরা আকাশ দেখেছিলাম। ছেলেমেয়েরা বন ফায়ার করছিল। আমি একপাশে আকাশ দেখছিলাম। বাবা পাশে ছিলনা। কোনো তারা চিনতে পারিনি।

বিয়েবাড়িতে হ‍্যাজাকের আলো। চিমনির গায়ে অনেক আলোর পোকা উড়ে বেড়াচ্ছে। একটা ছেলে সকলকে গোলাপ দিচ্ছিল। রাংতা মোড়া, ঝাউপাতা দেওয়া গোলাপ নয়। ছোটো ছোটো ডাঁটি ওলা গোলাপ, একটু আধটু পাতা আর কাঁটা লেগে ছিল। বড়দেরকে বড় ফোটা গোলাপ দিল। আমায় দিল কুঁড়ি গোলাপ। একটু রাগ হয়েছিল বা। পরে দেখলাম, হাতে হাতে বড় গোলাপের পাপড়ি ঝরে যাচ্ছে, আর আমার কুঁড়ি গোলাপ অটুট রইল। ছোটো ছিলাম তো, সব জায়গায় ঘুরঘুর করা স্বভাব ছিল। একজায়গায় দেখলাম হ‍্যাজাকের আলোয় মাখা সন্দেশ গোল গোল করে পাকানো হচ্ছে। দইয়ের হাঁড়ি কাঁথা দিয়ে চাপা দেওয়া। আর কড়া থেকে বড় ছান্তা দিয়ে বোঁদে তুলছে হালুইকর। মাকে দেখালাম। মা বলল ভিয়েন বসেছে, মানে বাড়িতে মিষ্টি বানানো হচ্ছে। সতরঞ্চি নয়, সরু লম্বা টেবিলে খেতে বসলাম। সাদা কাগজ পাতা, তার ওপর জল ছড়ানো। হাওয়া দিলে কাগজ উড়বেনা। কলাপাতার পাশে মাটির কটরা, মানে গেলাস। আমারটা ফুটো ছিল। জল পড়ে যাচ্ছিল, তাই একটা দাদা বদলে দিল। লুচি, ছোলার ডাল,  সাদা ভাত, ঘি, বোঁটাওলা বেগুনভাজা, ছ‍্যাঁচড়া, পোনা মাছের কালিয়া, চাটনি, দই, বোঁদে, সন্দেশ – এই ছিল মেনু। সেযুগে খেতে বসিয়ে মোটা নান বা বোগড়া রাধাবল্লভী খাইয়ে মুখ মেরে দেওয়ার কৌশল আবিষ্কার হয়নি। লোকে খানকয়েক ফুলকো লুচি খেয়ে পাতে ভাত নিত। কোনো অসুবিধে হতোনা। বেশ রাতেই ঐ সাইকেল ভ‍্যানে বাড়ি ফিরলাম। নিচে এত আঁধার, মাঠ, গাছ সব যেন অদৃশ্য। আর ওপরে তাকালে তারার আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। একটুখানি কুপির আলোয় আবছা পথের রেখা, চলেছি যেন তারার দেশে। মৃদু একটা হিমেল হাওয়া। বোনকে মা আঁচল দিয়ে ঢেকেছে। আমি বাবার গরম পিঠের কাছে ঘেঁষে বসি। মা আর সেজজ‍্যাঠাইমা মাঝে মাঝে বিয়েবাড়ির দু একটা গল্পগাছা করছে। সব ছাপিয়ে ভ‍্যানের প‍্যাডেল করার আওয়াজ, আর কানে তালাধরা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনতে শুনতে ঝিম ধরে। বাবার পিঠে মাথা দিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন হই।

আমার ঠাকুমা হেমনলিনীর বাপের বাড়ি আড়বালিয়ার পাশে শুকপুকুরিয়ায়। বিরাট বাড়ি, পুকুর, বাগান। যৌথ সংসার। বড়দাদু, ছোড়দাদু, আর তাদের ছেলেমেয়েরা। বাবার মামাতো ভাইবোন। ওবাড়িতে আমাদের কাকা পিসি অনেক। বড় তরফে পাঁচ পিসি সবিতা, অনিতা, সন্ধ‍্যা, রূপম, মধুমিতা আর দুই কাকা, শৈলেন আর ধনঞ্জয়। ছোটোতরফে তিন পিসি – অমিতা, গীতা, সুরূপা আর ছয় কাকা – বিপ্রদাস, কুমারেশ, সুজয়, অজয়, সুব্রত, দেবব্রত। এত লোকজন, কাজেই কিছুদিন পরপরই ও বাড়িতে কারুর না কারুর বিয়ে লাগত। আর নেমন্তন্ন হলেই আমাদের মজা। বাবার মামার বাড়ি বলে কথা। ওবাড়ি সেকালে বাদুড়িয়ার একমাত্র সিনেমা হলের মালিক ছিল। বাবার অনেক ছোটোবেলায় মানে দশ বছর বয়সে ঠাকুমা মারা গিয়েছিলেন। তাই মামার বাড়িতে মা মরা ভাগ্নে বলে বাবার খুব আদর ছিল। আমরাও তার ভাগ পেতাম। বড়দাদুকে আজও যেন পষ্টো দেখি। সাদা ধুতি পরে চৌকির ওপরে বসে আছেন। মাথায় চকচকে টাক। কিন্তু ধারে ধারে কোঁকড়া সাদা চুল। সাদা গোঁফের তলায় মিষ্টি হাসি। ছোড়দাদুকে দেখিনি, তিনি বাবার কিশোরবেলায় চলে গেছেন। তবে দুই দিদা ছিলেন ছোড়দিদা রেণুকাবালা আর বড়দিদা নির্মলাবালা।  বড়দাদু ছিলেন বাদুড়িয়া মিউনিসিপ‍্যালিটির চেয়ারম্যান, তখনকার দিনে ও তল্লাটের ডাকসাইটে কংগ্রেসি নেতা, স্বাধীনতা সংগ্রামী। পুরো বসিরহাটেই স্বাধীনতা সংগ্রামের উজ্জ্বল ইতিহাস আছে। ছোড়দাদুর রেশন দোকানের ডীলারশিপ ছিল, কিন্তু তখনকার দিনে বলা হতো কন্ট্রোলের দোকান। কাকারা ঐ দোকান চালাতেন। গল্প শুনেছি ছোড়দাদুর ছিল রান্নার নেশা। সে গ্রামে অষ্টম প্রহর সংকীর্তন হোক বা কংগ্রেসের সভা, রান্না খাওয়ার দায়িত্ব নিতেন ছোড়দাদু। তাঁর চলে যাবার পর দাদুর ছেলেরা সেই ধারা বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। যাই হোক, শুকপুকুরে খাওয়া দাওয়ার সংস্কৃতি ছিল বেশ জম্পেশ। ওবাড়ি গেলেই অনেকটা করে তালের ফোঁপল পেতাম।  বিয়েবাড়িতে সেযুগের তুলনায় বেশ বাহারি খাওয়াদাওয়া হতো। মাছের সঙ্গে খাসির মাংস হতো, মিষ্টিতে বোঁদে, দই না হয়ে, রাজভোগ আর আইসক্রিম হতো। বিয়েবাড়িতে ঢুকলে সরবত দিতো। লুচির সঙ্গে ডাল না হয়ে, বাহারি আলুরদম হতো। ঝুরো আলুভাজা হতো। শেষে মিষ্টি মশলার পান থাকতো। আমি মাছ এলেই হাত নাড়তাম। কাঁটা বাছতে পারিনা। দু হাত দিয়ে কাঁটা বেছে নাকাল হই। তাই খালি ডাল নিতাম। ওটাই নিরাপদ। সেজজেঠু অট্টহাসি হেসে বলতো, এ মেয়ের মেছোর ঘরে বিয়ে হবে। পরে অবশ্য একথা সত‍্যি হয়েছে। ফেরার সময়ে ভ‍্যান থাকতোনা। হেঁটে ফিরতাম।ঘুটঘুটে অন্ধকারে সব গাছগুলোই শ‍্যাওড়া গাছ মনে হতো। মেঠো পথদিয়ে চলতে চলতে মাঝেমাঝেই মোটা গাছের শিকড়ে হোঁচট খেতে হতো। সবার হাতে তো আলো থাকতোনা। দু একজনের হাতে টর্চ, তাও আবার একটানা জ্বলেনা। যতক্ষণ টিপে থাকা যায়, ততক্ষণ আলো। অগত্যা চাঁদের আলোতেই পথ চলতে হতো। আমি বাবার হাত ধরে যেতাম। ঘন ঝুপসি গাছ এলে চোখ বন্ধ করে হাঁটতাম। কারণ চাঁদের আলোয় বড় গাছের ছায়া আরও ঘোর হয়ে ঘিরে ধরতো।  আর যখন নাগচৌধুরীদের বিশাল সিংহওলা গেটের পাশ দিয়ে যেতাম, তখন তো আর তাকানোর কোনো প্রশ্নই ছিলনা। কারা যেন সিংহের হাঁ মুখে একটা ছোটো হলুদ বাল্ব জ্বালিয়ে দিতো। তার আলোয় গেটের মাথায় চার কোণে চার আবছা প্রহরী দাঁড়িয়ে থাকতো। গেটের গায়ে খোদাই করা ছিল ‘এক টাকা’। বাবা বলতো একমণ চালের দাম যখন একটাকা ছিল, সেই ইংরেজ আমলে ও গেট তৈরি হয়েছে। আমি বয়সে দশ বছরের বড় মেজদাদাকে একবার বলতে গিয়েছিলাম এসব কথা। মেজদাদা গম্ভীর হয়ে বলেছিল,

– ঠিক বলেছিস, রাত বাড়লেই ঐ সিংহ জ‍্যান্ত হয়ে যায়। আর চারজন ইংরেজ সৈন‍্যও নেমে আসে। তারা পুরো আড়বালিয়ায় টহল দেয়। ঐজন‍্য কলকাতা থেকে কোনো ছোটো ছেলেমেয়ে গ্রামের বাড়ি এলে রাতে একা পথে বেরোতে নেই। সকালেও কোনো বাচ্ছা যদি একা বেরোয়, ওরা চিনে রাখে। সুবিধেমতো ধরে নিয়ে যায়। অনেক ওপরে তো, বহুদূরে দেখতে পায়।

– ধরে কোথায় নিয়ে যায়?

– ও মা, চোখ বুজে থাকিস নাকি? উল্টো দিকে এক রাত্তিরের বাড়ি দেখিসনি। ইট বার করা অত বড় দালানকোঠা। ছাদ ঢালাইয়ের সময়ে সূর্য উঠে গেল। তাই আর হলোনা। সেই থেকে ওখানে অন্ধকারে তেনারা সভা করেন। নাম করতে নেই। ওবাড়ির অত্তো থাম, বারান্দার অলিগলি, কত সুড়ঙ্গ আছে জানিস? হুঁঃ, বলে ধরে কোথায় নিয়ে যায়। কেউ জানেনা, ওসব সুড়ঙ্গের ওপারে কি আছে।

– পু মানে পু-লিশ নেই? থানা কি অনেক দূরে?

– পুলিশ? (মেজদাদার বড় চোখ রসগোল্লার মতো আরও বড় হল)। সিংহের সঙ্গে পুলিশ? অদৃশ্য হয়ে ঘাড় মটকালে পুলিশের ক্ষমতা আছে কিছু করার?

অকাট্য যুক্তি। তাছাড়া মেজদাদা ভালো গান করে, পুজোয় বেরোনো নতুন গান, আধুনিক, সিনেমার, সব গানের কথাগুলো জানতে পেরে যায়। বললেই খাতার পাতায় পুরো গানটা মন থেকে লিখে দেয়। কোনো কিছু দেখে লিখতে হয়না। বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় মহলে ওর কতো সুনাম। তাছাড়া এখানে থাকে। ও কী আর না জেনে বলছে? 

সকালে অবিশ্যি ওসব কথা সবসময়ে মনে থাকেনা। কেউ যখন দেখেনি, আমি অনেকবার বটতলার পুকুর পেরিয়ে একা একা ঘুরেছি। আমায় সিংহরা চেনে। তাই দূর থেকে ঐ গেটের আভাস পেলেই চোখ একেবারে টাইট বন্ধ, আর বাবার হাত যত জোরে ধরা যায়, চেপে ধরতাম। জানি সিংহ এলেও বাবা লড়াই করবে, আমায় কিছুতেই ছাড়বেনা। তবু আমার তো হাত আলগা করলে চলবেনা। কেউ বুঝতে পারতোনা, আমি চোখ বুজে বাবার হাত ধরে পাড়ি দিই সাত সমুদ্র তেরো নদীর পথ।

অন্ধকারে হাত ধরে থাকার এই অভ‍্যেস অবচেতনে থেকে গেছে এটা জানলাম অনেক পরে। একবার কলেজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে মহাকাল পর্বতের অমরকন্টকে ফিল্ড সার্ভেতে গিয়েছিলাম। সন্ধ‍্যেবেলা ছেলেমেয়েদের হোটেলে রেখে আমি আর সহকর্মিনি বল্লরীদি গিয়েছিলাম, স্থানীয় মন্দিরের সেলস কাউন্টারে, যদি স্থান মাহাত্ব‍্য নিয়ে পুরাণের গল্পের বই পাওয়া যায়, সেই খোঁজ করতে। হেঁটে ফিরতে হবে, হঠাৎ লোডশেডিং। পুরো পাহাড়, বিশ্ব চরাচর যেন এক অখণ্ড অন্ধকারের অস্তিত্ব। আমার চেতনা দুলে গেল। বেশ কয়েক মূহুর্ত পর যেন কোন প্রান্ত থেকে বল্লরীদির গলা ভেসে এল। শারদা হাতটা ছাড়ো এবার, আমি ব‍্যাগ থেকে টর্চ বের করবো। তখনও মোবাইল ফোনের যুগ আসেনি। তাই টর্চই ভরসা। আজও ডিপার্টমেন্টে ঐ কথা নিয়ে হাসাহাসি হয়। যাই হোক,আজ অর্ধ শতক পার করে যখন পিছন ফিরে তাকাই, সেই হ‍্যাজাকের আলো, ভিয়েন, তারাভরা আকাশ, ঝুপসি গাছ, বিয়েবাড়ির ভোজ সব পেরিয়ে বাবার ছোঁয়াটাই বেশি ঘিরে ধরে।

পাকশালার গুরুচণ্ডালি

পর্ব এক: বাপের বাড়ি – মামার বাড়ি

খাতি নাতি বেলা গেল
শুতি পালাম না।
দুয়ার দিয়া হাতি গেল
দেখতি পালাম না।

ছড়াটা ছোটোবেলায় শুনেছিলাম মায়ের মুখে। সত‍্যি সত‍্যি ঘর বার সব কিছু সামলাতে সামলাতে মেয়েদের জীবনে সময় বড় আক্রা, তাই দুয়ার দিয়ে হাতি চলে গেলেও দেখতে যাবার সময় হয়না। আর ঘর বার সব কাজের আসল উদ্দেশ্য হল পেট পুজো। এ পুজোয় ত্রুটি চলেনা। হেঁশেলের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলে ব‍্যক্তির, পরিবারের, এলাকার,  জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি। আর টা়ঁকশাল, হাতিশাল, ঘোড়াশালের মতো পাকশালের গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। সেখানে উচ্চকোটির ব্রাহ্মণ‍্য রান্নার সঙ্গে ব্রাত‍্যজনের চন্ডালি রান্না অনায়াসে সহাবস্থান করে। সেজন্য আজ একটু পাকশালার গল্প বলি।

রোজকার পাঁচালি

আমি বড় হয়েছি পাতিপুকুরের সরকারি আবাসনে। ছোটবেলায় আমাদের মতো কোয়ার্টার গুলোতে চৌকো চৌবাচ্ছার মতো মাটির উনুন করা ছিল। উনুনের মুখে দেওয়ালে ছিল ধোঁয়া বেরোনোর পাইপ। উনুন ধরানোর সময়ে একটা মোটা লোহার ঢাকনা দিয়ে চাপা দেওয়ার নিয়ম ছিল, যাতে উনুনের ধোঁয়া বাইরে না গিয়ে, পাইপ দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু পাইপ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তাই ঢাকনাটা কোনো কাজে আসতোনা। আমার কাছে মায়ের রোজ সকালে উনুন ধরানোটা ছিল ভীষণ কষ্টের। কারণ আমি কোনোরকম ধোঁয়া সহ‍্য করতে পারিনা, ভীষণ শ্বাসকষ্ট হয়। তবে একবার উনুন ধরে গেলে আর চিন্তা নেই। একটা পিঁড়িতে উবু হয়ে বসে মা রান্না করত। রান্না হয়ে গেলে ভিজে ন‍্যাকড়া দিয়ে উনুন নিকোনো হত আর উনুন থেকে একটা সুন্দর সোঁদা গন্ধ উঠত, ঠিক বৃষ্টি পড়লে যেমন হয়, তেমন। আমার বোন ঐ গন্ধের লোভে উনুন চাটতো। অনেক বারণ বকাঝকা করলেও তাকে থামানো যেতনা। উনুনে সোঁদা গন্ধ উঠলেই, পিলপিল করে দৌড়ে ছোট্ট জিব বার করে উনুন চেটে দিত। ভাঁড়ে রসগোল্লা বা দই এলেও সেই সব ভাঁড় কামড়াতো। এত দুরন্ত, সামলানো যেতনা – বাবা ওর নাম দিয়েছিল বিলবিলে বাহাদুর। সকলে যখন জিজ্ঞেস করতো, বাবা কি নাম দিয়েছে? – গরবিনী উচ্চ কন্ঠে ঘোষণা করতো – বিব্বিলে ভা-দুর। আমি বইপত্র নিয়ে থাকতাম, রান্নাঘরের দিকে অত নজর ছিলনা, কিন্তু বোনের ছিল। দুপুরবেলা যখন কেউ দেখতোনা, ঐ গিয়ে শিক দিয়ে, বড়দের মতো উনুন খোঁচাতো। একবার ড্রয়ারে লাল নিল ক‍্যাপসুল দেখে টুক করে জল দিয়ে খেয়ে নিয়েছিল। বাড়িতে বস্তা করে কয়লা, ঘুঁটে দুই ই থাকতো। পরের দিকে অবশ্য কোক কয়লা এল। সব বাড়িতেই কয়লা ভাঙা হাতুড়ি থাকতো। গুঁড়ো কয়লা মেখে গুল দেওয়া হত।

সকালের মূল রান্নার পর্ব মিটে গেলে বিকেলের চা জলখাবার, রাতের রান্না সব কেরোসিনের স্টোভে হত। আমার বাবা রোজ সন্ধ‍্যেবেলায় স্টোভ খুলে মুছে পলতে পরিয়ে পরদিনের জন্য রেডি করতো। আর খবরের কাগজ দিয়ে, হারিকেনের চিমনিও মুছে রাখতে হতো, কারণ বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও লোডশেডিংটাই ছিল স্বাভাবিক ব‍্যাপার। প্রদীপের, হারিকেনের সলতে আর স্টোভের পলতে – বারবার জেনে নিতাম মায়ের কাছে। পলতে সলতে গুলিয়ে যেত আমার।

কোয়ার্টারের দেওয়ালে সিমেন্টের তাকে মা ঠাকুর পেতেছিল। রোজ সন্ধ‍্যেবেলা ধূপ দেখিয়ে এলাচদানা আর জল দিত ঠাকুরকে। ধূপ দেওয়ার সময় হলেই একলাফে মায়ের সামনে সামনে ঘুরতাম, – ওমা ওমা আমায় একটু পুজো কর। মা ও হেসে আমার আর বোনের সামনে ধূপ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লক্ষ্মী সরস্বতী পুজো করত। পুজো শেষ হওয়ার পর মিনিট পাঁচেক গেলেই দুজনে এলাচদানাগুলো পেটে পুরতাম। কিন্তু বৃহস্পতিবারের পর্ব একটু দীর্ঘ ছিল। সেদিন এলাচদানার বদলে ঠাকুরের থালায় গুড়ের বাতাসা আয় আয় করে ডাকত। মা আসন পেতে, লাল পাড় ছালের কাপড় পরে লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়তে বসত। সন্ধ‍্যেগুলোয় কারেন্ট থাকা ছিল ভাগ্যের ব‍্যাপার। বেশিরভাগ দিনই হারিকেনের আলোয় মায়ের দুপাশে ঘেঁষে বসে পাঁচালি শুনতাম। গরম, ঘাম মশা এগুলো কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হতো। চারিপাশে মন্দ মন্দ মলয় বাতাস বইত। ঘরের আকাশে অকাল পূর্ণিমার জোছনার সিঁড়ি নেমে আসত। সেই সিঁড়ি বেয়ে লক্ষ্মী ঠাকরুণকে পিঠে নিয়ে নেমে  আসত   ধবধবে সাদা প‍্যাঁচা। 

রান্নার প‍্যাঁচ

বাবা রোজ সকালে বাজারে যেত, কখনও আমি ও সঙ্গে যেতাম। বাবা ঘুরে ঘুরে বাজার করতো। পোনা মাছের ঝোল বা ঝালটাই বেশি হত। তবে ইলিশ, ট‍্যাংরা, পার্শে, চিংড়ি, তেলাপিয়া এগুলোও বাদ যেতনা। মায়ের ইস্কুল যাবার তাড়াহুড়ো থাকত। বাবা আমাদের ইস্কুলের বই আর টিফিন গুছিয়ে, ভাত খেয়ে নটার মধ্যে বেরিয়ে যেত। মা রান্না করে, বাসন ধুয়ে আমাদের রেডি করতো। তারপর তিনজন একসঙ্গে ইস্কুলের উদ্দেশে পাড়ি দিতাম। তাও এক একদিন ব‍্যাজ, বেল্ট কিছু পরতে ভুল হয়ে গেলে প্রার্থনার সময়ে শাস্তির লাইনে দাঁড়াতে হতো। খুব তাড়া থাকত বলে মা প্রেসার কুকারে রান্না পছন্দ করতো। কুকারে দুপলা সর্ষের তেল গরম করে পাঁচফোড়ন, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে তাতেই আলু পটল নেড়ে নিয়ে হলুদ, নুন আর ধনে গুঁড়ো দিয়ে কষে জল দিয়ে প্রেসার কুকার ঢাকা দিয়ে দিত। একটা সিটি পড়লেই, ঢাকা খুলে ভাজা মাছগুলো দিয়ে ঝোলটা দু মিনিট ফুটিয়ে নামিয়ে নিত। মাছের ঝোলে মা আদাবাটা বা জিরে গুঁড়ো ব‍্যবহার করতনা। পটলের বদলে কাঁচকলা, সজনে ডাঁটা, বেগুন যখন যেমন থাকতো, তাই দিয়েই মাছের ঝোল হত। আর মাছের ঝাল করতে গেলেও ঐ পাঁচফোড়ন, কাঁচালঙ্কাই দেওয়া হত, কিন্তু তারপর ঐ তেলেই একটিপ হলুদ, নুন আর জল দিয়ে দেওয়া হত। আর তাতে ভাজা মাছ দিয়ে ফোটানো হত। ছুটির দিনে মাছের ঝালে সর্ষে বাটা বা পোস্ত বাটা পড়ত। কখনো ক্বচিৎ সর্ষে পোস্ত  মিশিয়েও দেওয়া হত। মাছের ঝোল আর ঝালের তফাৎ হল ঝালে কোনো জিরে ধনে পড়তোনা। আর বেগুনের ঝোলে মাঝে মাঝে হাল্কা করে সর্ষের জল দিত মা। যেদিন বাবা রান্না করত, মাছের ঝাল নামানোর আগে ফুটন্ত কড়ায় অল্প একটু রসুন বাটা দিয়ে দিত। মা কিন্তু রোজকার রান্নায় পেঁয়াজ, রসুন আর শুকনো লঙ্কার ব‍্যবহার এড়িয়ে চলত। মায়ের ধারণা ছিল ওসব বেশি খেলে আমাদের শরীর গরম হয়ে যাবে। তবে মা বলতো রান্নায় স্বাদ করতে হলে নামানোর আগে আর একবার ফোড়ন দিতে হয়। মায়ের ছোটবেলায় দিদা নাকি এভাবে দুবার ফোড়ন দিয়ে রান্না করতো। আর যেহেতু শীতকাল ছাড়া টমেটো পাওয়া যেতনা, তাই এখনকার মতো সবেতে টমেটো দেওয়ার চল ছিলনা। একটু বড় হলে আমি মাঝেমধ্যে রান্না করার চেষ্টা করতাম বটে, কিন্তু সফল হতামনা। বেগুন ডুবছেনা বলে ঝোলে একগঙ্গা জল দিয়ে ফেললাম। মাছের ঝাল করতে গিয়ে তেলে হলুদ দিয়ে খুন্তি নেড়ে যাচ্ছি, আমার বিস্ফারিত চোখের সামনে হলুদ পুড়ে কুচকুচে কালো হয়ে গেল। মাকে এসে আবার কড়া মেজে নতুন করে বসাতে হল। আবার একদিন ঢিমে আঁচে মাছ ভাজতে গিয়ে মাছ পুড়িয়ে ফেললাম।  রান্না শেখার প্রতি হতাশ হয়ে পড়ছিলাম। কিন্তু অবাক কান্ড, আমার অত দুরন্ত বোন বেশ রান্না শিখতে লাগল। মা হাসতো, কিন্তু রাগ করতোনা।

বাবা এক একদিন বাজার থেকে মোটা দাঁড়াওলা কাঁকড়া আনত। সেদিন কষিয়ে কাঁকড়ার কালিয়া রান্না হতো। মাছ বা কাঁকড়ার কালিয়া হলে পেঁয়াজ, রসুন, আদা, শুকনো লঙ্কা বাটা সবই পড়তো।  কার্পণ্য করা হতোনা। মা বলতো কাঁকড়া ভাজাও মাছের মতো হবে। গনগনে আঁচে একপিঠ লাল হলে, উল্টে দিয়ে আর এক পিঠ লাল করতে হবে। বেশি নাড়ানাড়ি বা ঢিমে আঁচ এখানে চলবেনা। কখনও আবার সর্ষে দিয়ে কাঁকড়ার ঝাল বা নারকেল দুধ দিয়ে কাঁকড়ার মালাইকারিও হতো। বাবা কইমাছ খেতে ভালোবাসত। তাই তেলকইটাও হত।

পাতিপুকুরে পাইকারি মাছের বাজার আছে। তাই বাড়িতে মাছ নানারকম আসতে কোনো অসুবিধে ছিলনা। চিংড়িটা আকার প্রকার ভেদে মা নানাভাবে রান্না করত। ঝোলের লম্বা আলু, লম্বা করে ঝিঙে, আর মোটা করে পেঁয়াজ কেটে চিংড়ি দিয়ে ঝোল করতো মা। এটা এখন আমার কর্তা খুব পছন্দ করে। ঝিঙে, পেঁয়াজ, আলু একসঙ্গে প্রথমে ভেজে নেওয়া হয়। তার পর তেল ছেড়ে গেলে, সব্জি গুলো খুন্তি দিয়ে চারপাশে সরিয়ে মাঝখানটা ফাঁকা করে দিত মা। তেল গড়িয়ে এসে মাঝখানে জড়ো হত। সেখানে জিরে, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দেওয়া হত। তারপর নুন হলুদ দিয়ে কষে জল দিয়ে ঢাকা দেওয়া হত। আলু সেদ্ধ হলে ভাজা চিংড়ি দিয়ে আরও দু তিন মিনিট ঢাকা খুলে ফোটানো হত। আমরা ঝাল খেতে পারতাম না বলে ঝোল ফোটার সময়ে মা ফোড়নের শুকনো লঙ্কা তুলে ফেলে দিত। এতে মিষ্টি পড়তোনা, তবে খেতে মিস্টি মিস্টি লাগত। মা বলেছিল ঐ মিস্টত্ব আসে পেঁয়াজ থেকে। এই রান্নায় পেঁয়াজটাকে মশলা নয়, সব্জি হিসেবে ব‍্যবহার করা হয়। এছাড়া একপলা সর্ষের তেল গরম করে তাতে পাঁচ ফোড়ন, একটু রসুন ছেঁচা আর দুটো কাঁচালঙ্কা ছেঁচা ফোড়ন দিয়ে, ঐ তেলেই নুন হলুদ মাখা ছোটো চিংড়ি ভেজে নিতো মা। তারপর জল দিয়ে ফুটিয়ে পাতলা ঝাল করত। এই রান্নাটা খুব ভালো লাগে আমার। এছাড়া শুধু পাঁচ ফোড়ন, কাঁচা লঙ্কা, টমেটো, হলুদ, নুন দিয়েও ঝাল করত। লোকজন এলে একটু তরিবত করার জন্য শুকনো লঙ্কা আর সর্ষে বাটা যোগ করে দিত। চিংড়ি মাছের মালাইকারিতে কিন্তু মা পেঁয়াজ দিতোনা, নারকেল কোরা বাটাও না। সর্ষের তেলে জিরে, শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে চিংড়ি গুলো ভেজে নিত। তারপর হলুদ আদাবাটা, জিরেবাটা, নুন, মিষ্টি দিয়ে কষে  নারকেল দুধ দিয়ে ফোটাত। কাঁচালঙ্কা দিয়ে মাছের ঝাল বা ঝোলে মা নামানোর দুমিনিট আগে ফুটন্ত কড়ায় একটু কাঁচা তেল ছড়িয়ে দিত। ঐ ঝাঁঝটা রান্নায় মিশে গিয়ে বেশ ভালো লাগত। এইসব রান্নায় মিষ্টি পড়তনা। কিন্তু কালিয়া বা মালাইকারি জাতীয় তরিবতের রান্নায় মিষ্টি পড়ত আর নামানোর আগে কাঁচা তেল দেওয়া হতনা। আমি বিয়ের পরে রান্না ক‍রতে গিয়ে, ল‍্যান্ডলাইনে ফোন করে করে মায়ের কাছ থেকে পদ্ধতি জেনে নিতাম। নিজের মনে একটা ব‍্যাকরণ ঠিক করে নিয়েছিলাম।
১। যে কোনো মাছের ঝোল সব্জি দিয়ে করতে হলে, উপকরণ পাঁচ ফোড়ন, কাঁচালঙ্কা, হলুদ, ধনেগুঁড়ো, নুন
২। গুলে মাছের ঝোলে কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন, হলুদ, আদাবাটা, কালোজিরে বাটা
৩। বেগুন দিয়ে মাছের ঝোলে ১ নম্বর উপকরণের সঙ্গে পাতলা সর্ষেবাটার জল যুক্ত হবে
৪। ট‍্যাংরা মাছের ঝোলে টমেটো বাটা আর ধনেপাতা বাটা দিয়ে কষলে রান্না প্রথম বিভাগে পাশ হবে।
৫। ভেটকি মাছের ঝোল ৩ নম্বর নিয়মে বেশি ভালো হয়।
৬। কালিয়া হলে প্রথমে গরমমশলা, তেজপাতা ফোড়ন, ফোড়ন ভাজা হয়ে গন্ধ বেরোলে তেলে চিনি দিয়ে ক‍্যারামেল করে গলিয়ে নিতে হবে। চিনি লালচে তরল হবার সঙ্গে সঙ্গে কড়ায় পেঁয়াজ কুচো দিয়ে দিতে হবে। চিনি চিটচিটে হবার আগে দিলে ভালো।
৭। মাছের ঝাল আগে যেমন বলা হয়েছে তেমন।
৮। টাটকা ইলিশ হলে মাছ ভাজা হবেনা। কাঁচা ইলিশের ঝাল হবে। কিছুদিনের পুরোনো হলে ইলিশ হাল্কা ভেজে নিতে হবে। এতে কালোজিরে কাঁচালঙ্কা চলে, তবে মা পাঁচফোড়ন কাঁচালঙ্কাই দিত। হলুদ, নুন, অল্প টক দই, দু চার দানা চিনি কাঁচাতেল ছড়িয়ে, কাঁচা মাছ দিয়ে ফুটবে। পাতলা সর্ষে ধোয়া জল দিত মা। আর ইলিশ ভাপা করতে হলে উপকরণ একরকম, কেবল অনুপাত আলাদা। ভাপায় ফোড়ন পড়বেনা। জল পড়বেনা, সর্ষে বাটার অনুপাত বেশি হবে। চিংড়ি ভাপাতে দই আর চিনি পড়বেনা, কিন্তু একটু আদাবাটা যোগ করতে হবে।

রাতের দিকে মা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ডালনা করত। নানারকম উপকরণ দিয়ে ডালনা হত, যেমন – পাঁপড়ের ডালনা, পেঁপের ডালনা, পটলের ডালনা, কাঁচকলার ডালনা, শীতকাল হলে ফুলকপির ডালনা, গ্রীষ্মের শুরুতে এঁচোড়ের ডালনা, ছুটি থাকলে ছানার ডালনা এইরকম হতো। আর সবযুগের হিট আইটেম ডিমের ডালনা তো ছিলই। কখনও সখনও আলু কড়াইশুঁটির দমও বানানো হত। তবে ডিমের ডালনা বাকি পৃথিবী আলু সেদ্ধ করে করলেও, বাড়িতে মা জিরে, তেজপাতা, গরম মশলা ফোড়ন দিয়ে আলু ভেজে করত।

আলুর দম আর ধোঁকার ডালনা আমাদের বাড়িতে রান্না হতনা। তার কারণ হল, বাগবাজারে একটা ছোট্ট দোকান ছিল। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে শালপাতার খুরিতে গোল গোল ছোটো আলুর লাল টকটকে দম বিক্রি হত। কাঠি ফুটিয়ে আলু তুলে খেতে হত। আর ফড়িয়াপুকুরে টকিশো হাউসের রাস্তায় আর একটা ছোটো দোকানে ধোঁকার ডালনা বিক্রি হত। ও দুটো জিনিস খেতে ইচ্ছে হলে বাবা দোকান থেকেই আনত। আমরাও ইস উস করে নালে ঝোলে হয়ে উদরপূর্তি করতাম। এছাড়া ঘুগনি আর ছোলার ডাল নিয়েও একই কথা। ইস্কুল থেকে ফেরার পথে বাগবাজার স্ট্রিটে একটা ছোটো দোকানের বেঞ্চে বসে আমরা মানে মা, আমি, বোন প্রায়ই ঘুগনি খেতাম। আর শ‍্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় থেকে দীনেন্দ্র স্ট্রিটের মুখের দিকে হেঁটে এলে বাঁদিকের ফুটপাতের ধারে বেশ কিছু মিষ্টির দোকান ছিল। ওখানে আমরা কচুরী আর ছোলার ডাল খেতাম। ছোটবেলায় যখন প্রেশার কুকার ছিলনা, তখন বাড়িতে ঘুগনির মটর, ছোলার ডাল সেদ্ধ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। কারণ আবাসনে যে জল কলে আসত, তা হল লালচে, কষা ভূগর্ভস্থ জল। ঐজন‍্য বৃষ্টি নামলেই অনেক বাড়ির গিন্নি মাঠে হাঁড়ি কুড়ি বসিয়ে দিতেন। কিন্তু নিবেদিতা ইস্কুলের চাকরির জন্য মায়ের পক্ষে ওসব করা সম্ভব ছিলনা।  দোকান থেকে আর কয়েকটা জিনিস খুব খেতাম, পাঁচমাথার মোড়ের গোলবাড়ি থেকে ডিমের ডেভিল আর মুগের লাড্ডু। অন্য সব দোকানে লম্বা করে কাটা অর্ধেক ডিমের ডেভিল হত। কিন্তু গোলবাড়ির ডেভিলে আস্ত ডিম থাকত। মুগের লাড্ডু আমি এত ভালোবাসি বলে আজও আমার মেজ নন্দাই যখন পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা থেকে আমাদের বাড়িতে আসেন, তখন বড় কৌটো ভর্তি করে স্পেশাল সাইজের মুগের লাড্ডু অর্ডার দিয়ে বানিয়ে আনেন আমার জন্য। ওনার চেনা দোকানে ওটা ভালো করে। আরও একটা জিনিস ছিল। শ‍্যামবাজার আর বাগবাজারের সন্ধিস্থলে দ্বারিকের দোকানে বিরাট উনুনে ফেনা ওঠা দুধ ফুটত। লোকে এক গ্লাস দুধ কিনে খেত, আর তাতে রসগোল্লার রস মিশিয়ে পরিবেশন করা হত। ঐ দুধের গেলাস বড় প্রিয় ছিল, মাঝে মাঝে খেতাম। সেদিন বহু বছর পরে গিয়েছিলাম ঐ দোকানে – ঠাটবাট সব পাল্টে গেছে। ছানার মুড়কি আর ক্ষীরের চপ কিনলাম কন‍্যাকে খাওয়াব বলে। ছোটোবেলায় ক্ষীরের সিঙাড়া খুব ভালো লাগত। সেটা ছেলেবেলাতেই লুকিয়ে আছে। আজ আর খুঁজে পাইনা।

যাই হোক, আবার পাকশালায় ফিরে আসি। আমি আমার নিজের মতো রান্নার রুলবুক ঠিক করে নিয়েছিলাম। ঝোল আর ডালনা দুটোরই সাধারণ উপকরণ আলু। কিন্তু আলুর আকৃতি আলাদা। ঝোলের আলু লম্বা, ডালনার আলু ডুমো আলুর মতো, কিন্তু তার চাইতে আকারে বড়। মানে মাঝারি সাইজের আলু চার টুকরো করলে যেমন হয়, তেমন। দুটোর ফোড়নও আলাদা। ডালনায় মা গোটা জিরে, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিত। তার পর সব্জি ভেজে হলুদ, নুন, জিরে গুঁড়ো, কখনও গরম মশলা গুঁড়ো দিয়ে কষে জল দিয়ে ফোটাতো। রান্না নামানোর আগে হিং মরিচ ফোড়ন দিত। আর আমার ধারণা মতো ডালনার নাম দম হয়ে যেত, যখন ডালনা উনুন থেকে নামিয়ে তাতে ভাজা মশলা গুঁড়ো মেশানো হত। তবে এঁচোড়ের ডালনা না করে যেদিন পাঁঠার মাংসের মতো রান্না হত, সেদিন এঁচোড়ের নাম হতো গাছপাঁঠা। আমাদের ইস্কুলের হোস্টেলে আবার এঁচোড়ের একরকম মাখা মাখা তরকারি হতো, ঝোল থাকতোনা। ছোটো ছোটো চৌকো টুকরো করে এঁচোড় কাটা হত, কিন্তু কোনো ফিতে অংশ থাকতোনা, আলুও না। কিভাবে করা হত, সেটা তো জানিনা, তবে দারচিনি আর ঘিয়ের গন্ধ পেতাম। আর মাঝে মাঝে সয়াবিন এলে, সেটাও মাংসের মতো রান্না হতো। আমরা বলতাম সয়াবিনের মাংস। সয়াবিন যে সাধারণ ভাবে রান্না করা যায়, সেটা আমরা ছোটোবেলায় জানতাম না।

ইস্কুলের পরীক্ষার সময়ে যখন অনেক খাতা দেখা থাকত, বা মা খুব ক্লান্ত থাকত, তখন বেশি ঝামেলায় না গিয়ে মা হয় কাঁচালঙ্কার তরকারি করত নতুবা বড়ির ঝাল। পাঁচফোড়ন কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে ডুমো আলু ভালো করে হলুদ নুন দিয়ে কষে জল দিয়ে ফুটিয়ে নিত। ঝোলে কয়েকটা আস্ত কাঁচা লঙ্কা দিয়ে ঢাকা দিয়ে দিত মা। তারপর হিং ফোড়ন দিয়ে, কাঁচা তেল ছড়িয়ে নামাত। আলু হাল্কা গলে যেত। একেবারে মাখামাখাও নয়, আবার বেশি ঝোল ও থাকতোনা। কাঁচাসোনার রঙের সেই লঙ্কার গন্ধ ওলা গরম ঝোলটা যেন অমৃত লাগত খেতে। আর আলু বাড়ন্ত হলে একই রেসিপিতে আলুর বদলে বড়ি দিলে হয়ে যেত বড়ির ঝাল। আর আলু বড়ি দুটোই দিলে নাম হত বড়ির তরকারি। বেশি তো চাহিদা ছিলনা আমাদের। সন্ধ‍্যে হলে ঘুম পেয়ে যেত। রাত্তিরে বাবা ঘুম থেকে তুলে খেতে বসিয়ে দিত। মা যেদিন আর রান্না করে উঠতে পারতনা, সেদিন বাবা দুধভাত খাইয়ে দিত। সকালের তরকারির আলুর নোনতা টাকনা দিয়ে ঘুম ঘুম চোখে দুধভাত খেতাম।

সকালে তেতোর পর্ব ও ছিল ষোলো আনা। পলতা পাতা ঝুরঝুরে করে ভেজে নুন দিয়ে ভাতে মেখে খেতে বেশ লাগত, কিন্তু উচ্ছে ভাজা খেতে চাইতামনা। আর করলাভাজা হলে তো নয়ই। মা তাই উচ্ছে ঝিরিঝিরি করে কেটে বেশ পাঁপড়ের মতো ভাজত। কখনও ডুমো আলু দিয়ে উচ্ছে চচ্চড়ি করত। তবে নিম বেগুন টা একটু বেশি তেলে কচি লালচে নিমপাতা দিয়ে ভাজলে আমার ভালো লাগত। এখনও লাগে। কলেজের গাছে কচি নিমপাতা পাড়া হলে আমি আগে থেকে বলে রাখি, একটা আঁটি যেন আমার জন্য থাকে। এছাড়া হত শুক্তো। উচ্ছে, আলু, বেগুন, কাঁচকলা, গাজর, শিম, বিন যখন যেমন সব্জি বাড়িতে থাকে, সব দিয়েই শুক্তো করা যায়। পাঁচফোড়ন আর রাঁধুনি ফোড়ন দিয়ে শেষে নামানোর আগে কাঁচা আদাবাটা, কাঁচা দুধ দিয়ে দিত মা।  তারপর একটু ঘি ছড়িয়ে মিনিট দুয়েক ফুটিয়ে নামিয়ে নিত। নিমপাতা ভেজেও শুক্তো হত। আমরা বেশি তেতো খেতে চাইতামনা বলে মা উচ্ছে ভাজা অথবা নিমপাতা ভাজা রান্নার শেষের দিকে মেশাত আর অল্প মিষ্টি দিত।

অল্প মশলায় চচ্চড়ি বা সব্জি রান্নাতেও মা সিদ্ধহস্ত ছিল। আর সবকিছু খুব চটপট একাহাতে সেরে ফেলত। আমি যখন ইউনিভার্সিটি পাশ করে ওয়েটল‍্যান্ড ম‍্যানেজমেন্টে প্রোজেক্ট সায়েন্টিস্ট হলাম, তখন টিফিনে রুটির সঙ্গে লাউ বড়ি বা নারকেল কোরা দিয়ে চালকুমড়ো নিয়ে গেলে সহকর্মিনীরা হৈ হৈ করে খেয়ে নিত। মা পালংশাকের ঘন্ট আর লালশাক ভাজাটাও দারুণ করতো। সর্ষে ফোড়ন দিয়ে নুন মিষ্টি সহযোগে  একটু কাঁচা পোস্ত ছড়িয়ে অথবা চিংড়ি দিয়ে লালশাক ভাজা এখন আমার কন্যা এবং কর্তা দুজনেই খুব পছন্দ করে।

আলু, বাঁধাকপি আর কড়াইশুঁটির চচ্চড়িটা মায়ের হাতে খুব খুলত। একবার মা আমাকে আর বোনকে বাঁধাকপি আর রুটি দিয়েছিল খেতে। বোন খেতে খেতে উঠে গিয়েছিল। আর আমি নিজেরটা গবগবিয়ে খেয়ে, বোনের প্লেট থেকে একটু বাঁধাকপি খেলাম। তারপর আর একটু খেলাম, আবার একটু – এই করতে করতে বোনের থালায় শুধু রুটি পড়ে রইল। বোন ফিরে এসে, পাতে তরকারি নেই দেখে, গগন ফাটিয়ে কান্না শুরু করল। মানে গগন ফেটেছিল কিনা ঠিক দেখিনি, তবে আমাদের ঘরটা কাঁপছিল। মা বিশ্বাস করতে পারেনি, ভোলাভালা আমি বোনের বাঁধাকপি খেয়ে নিয়েছি। আর হাওয়া গরম দেখে ভয়ে আমিও স্বীকার করতে পারিনি। মা যত বোনকে বোঝায়, তুমি খেয়ে গেছ, সে কিছুতেই মানেনা আর ছোটোতো, গুছিয়ে মাকে বোঝাতেও পারেনা, শুধু চেঁচায়। শেষে মা আবার তার পাতে বাঁধাকপি দিতে সে চুপ করল।

মা মাছের মুড়ো খেতে খুব ভালোবাসত। তাই বাবা সবসময়ে মাথা সমেত গোটা পোনা মাছ কিনত। মুড়োর ডাল, মুড়ি ঘন্ট, আলু দিয়ে কানকোর তরকারি এইসব মা দারুণ করতো।  প্রথমেই মা ডুমো করে কেটে রাখা আলু ভাজতে শুরু করতো। ইত‍্যবসরে মাছের মাথা ভালো করে নুন হলুদ মাখিয়ে রাখত। আলু ভাজা হলে, ঐ তেলেই মুড়ো দিত, তবে মুড়ো ভাজতে তেল কম হলে হবেনা। যদি চাল দিয়ে মুড়িঘন্ট করতে হয়, তবে আলু কাটার আগেই গোবিন্দভোগ চাল একটা বাটিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। একটা বড় কাতলা মাছের মুড়ো হলে, ছোটো চায়ের কাপের মাপে, দু কাপ চাল দিতে হবে। তবে মায়ের ইস্কুল যাবার তাড়া থাকত বলে তরকারিটা মা চাল ছাড়াই করতো। মুড়োটা কড়কড়ে করে ভেজে, খুন্তি দিয়ে টুকরো টুকরো করে ভেঙে দিতে হবে। মুড়ো নামিয়ে রেখে, তেলে শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা, গরমমশলা ফোড়ন দিতে হবে। তারপর পেঁয়াজ কুচো লাল করে ভেজে নিয়ে, আদাবাটা, রসুন বাটা, লঙ্কা বাটা বা গুঁড়ো, হলুদ, জিরে গুঁড়ো, নুন, মিষ্টি দিয়ে কষতে হবে। ইচ্ছে হলে সঙ্গে টমেটো কুচিও দেওয়া যায়। মশলা মিশে তেল ছেড়ে গেলে এবারে ভাজা মুড়ো আর ভাজা আলু দিয়ে কষতে হবে। যদি চাল না দেওয়া হয়, তবে এইসময়ে একটু জল দিয়ে কড়ায় ঢাকা দিয়ে ভাপিয়ে নিতে হবে। তারপর ঢাকা খুলে রান্নাটা জল মেরে শুকনো করে নিতে হবে। ঘি, গরমমশলা গুঁড়ো ছড়িয়ে রান্না নাবাতে হবে। আর চাল দিতে হলে, শুধু জল না দিয়ে, ভেজানো চালটা ঢেলে দিতে হবে। চালটা কড়ায় একটু নাড়াচাড়া করে, তারপর জল দিতে হবে। বাকি প্রক্রিয়া একরকম। চালটা নরম ভাত হয়ে গেলেও খেতে ভালো লাগবেনা। আবার শক্ত চাল থাকলেও চলবেনা। মাঝামাঝি থাকবে।

মুড়োর ডাল হলে কোনো আলুর ব‍্যাপার নেই। শুকনো মুগের ডাল শুকনো প্রেশার কুকারে প্রথমে ভেজে নিতে হবে। খুন্তি থামালে চলবেনা। কয়েক মিনিট পরে ডালের রং বদল হবে, একটা ভাজা গন্ধ উঠবে। তবে লাল, বাদামি হয়ে পুড়ে না যায়। সেই সময়ে একবাটি জল ঢেলে দিতে হবে। এবারে পাত্রটা নাড়িয়ে জলটা ফেলে দিতে হবে‌। আগে তো ডাল ধোওয়া হয়নি। এইভাবে ভাজার পরে মা ডাল ধুয়ে নিত। নইলে জলে ভেজা ডাল ভাজতে গেলে বেলা পুইয়ে যাবে। গরম ভাজা ডাল ধোওয়া হয়ে গেলে, আবার জল দিয়ে প্রেশার কুকার ঢাকা দিয়ে সিটি দিতে হবে। তবে ভাজা ডাল সেদ্ধ হতে দু তিনটে সিটি লাগতে পারে। কাঁচা ডালের মতো তাড়াতাড়ি সেদ্ধ হয়না। ডাল সেদ্ধ হয়ে গেলে, কড়ায় মশলা কষে ডাল ঢেলে দিতে হবে। মশলা কষার উপকরণ এবং নিয়ম মুড়িঘন্টের মতোই।

শীতকালে মা করতো বিট ভাজা। ঝিরিঝিরি করে বিট কেটে নুন মিষ্টি দিয়ে ভেজে, তাতে পোস্ত ছড়িয়ে দিত, আর পাতিলেবুর রস ছড়িয়ে দিত। টক মিষ্টি মুচমুচে বিটভাজা বেশ খেতে। কচি ঢেঁড়স দিয়ে আর একটা খুব সাধারণ রেসিপি ছিল, ওটা বাবা খেতে ভালোবাসত, আর এখন করলে মেয়ে প্রায় পারলে পুরোটাই খেয়ে নেয়। ঢেঁড়স গুলোর মুখ কেটে, কড়ায় অল্প জলে মা সেদ্ধ বসাতো। ঐ জলে নুন আর এক টিপ হলুদ দিয়ে দিত। ঢেঁড়স নরম হলে জল ফেলা হতনা। ঢেঁড়সের ক্বাথ মিশে একটা বেশ সবজেটে পিচ্ছিল কাই তৈরি হত। আলাদা ফোড়ন কড়ায় এক চামচ সর্ষের তেলে হিং আর মরিচ গুঁড়ো ফোড়ন দিয়ে ঢেঁড়সের ওপরে ঢেলে ঢাকা দিয়ে দুমিনিট ফোটাতো মা। তারপর লেবুর রস ছড়িয়ে নামিয়ে দিত।

বাবা পেঁপে খেতে ভালো বাসত বলে মাঝেমধ্যেই গোটা সর্ষে ফোড়ন দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি পেঁপে ছেঁচকি করত। আর বাবা তো খুব ভোরবেলায় বাজার যেত, তখন আমরা সবসময়ে ঘুম থেকে উঠতাম না। টাটকা পেঁপের বোঁটা থেকে আঠা ঝরত, সেই আঠা চামচে কাচিয়ে বাতাসায় দিয়ে মা বিছানায় এসে আমাদের মুখে পুরে দিত। বলতো পেঁপের আঠায় নাকি লিভার ভালো হয়। সত‍্যি ভালো হয় কিনা জানিনা, তবে ভোরবেলার সেই অদ্ভুত স্বাদ মনে করতে ভারি ভালো লাগে।

ডাল রান্নায় মায়ের একটা বেশ হাতযশ ছিল। তখনকার দিনে বাড়িতে ফোন ও ছিলনা, আর আত্মীয় স্বজনের জানিয়ে আসার বালাই ছিলনা। বেলা, অবেলায় যখন তখন বাড়িতে আত্মীয় বন্ধু এসে পড়ত। আর মা রান্না করতে বসত। কিন্তু তারা খোঁজ নিত, ডাল করেছো তো? সপ্তাহের সাত দিন মা সাত রকম ডাল করত। ডাল রিপিট হতনা। ভাজা মুগ, কাঁচা মুগ, মুগ মুসুর মিশিয়ে বা শুধু মুসুর ডাল – এইভাবে হতো। সর্ষের তেলে ফোড়নে কখনও জিরে, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা,কখনও পাঁচফোড়ন কাঁচালঙ্কা, কখনও বা গোটা সর্ষে, কারিপাতা ফোড়ন, অথবা ঘিয়ে পেঁয়াজ ফোড়ন, নতুবা রসুন ফোড়ন দিয়ে মা ডাল করত। উচ্ছে দিয়ে তেতোর ডাল, কাঁচা আম বা আমড়া দিয়ে টক ডাল, নানারকম সব্জি দিয়ে ডাল, ঢেঁড়সের ডাল, মুলোর ডাল ইত্যাদি নানারকম ডাল করত মা। তবে ডালে মা মিষ্টি দিত। তাই আমিও দিই। তবে মধুমেহর জন্য চিনি দিতে পারিনা আজকাল। আখের গুড়ের গুঁড়ো, স্টিভিয়া গুঁড়ো, বাজারি সুগার ফ্রি সবই রেখেছি পাকশালায়। যখন যেমন, তখন তেমন ব‍্যবহার করি। যেদিন মা বিউলির ডাল আর আলুভাতে করতো, সেদিন ওটা দিয়েই প্রায় সব  ভাত খাওয়া হয়ে যেত। শিলে মা বেশ খানিকটা, বলা যেতে পারে তাল খানিক কাঁচা মৌরি আর আদা বাটত। সেই গন্ধে বাড়ি ম ম করত। সবাই বুঝে যেতাম আজ বিউলির ডাল হবে। মৌরি আর শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে আগে থেকে সেদ্ধ করা ডালটা জল সমেত কড়ায় ঢেলে দিত মা। এই ডালে কিন্তু মিষ্টি পড়তনা। ডাল ফুটে উঠলে শেষের দিকে ঐ পুরো আদা মৌরি বাটাটা কড়ায় দিয়ে দিত। তারপর মিনিট তিন চার ফুটিয়ে নামিয়ে নিত। ডালে মা হলুদ দিতনা, তাই আমিও দিইনা।

আমাদের গ্রামের বাড়ি বসিরহাটের আড়বালিয়ায়। সেখানে একরকম ছোটো দানা লালচে কমলা রঙের পাতলা পাতলা ভাঙা মুসুর ডাল পাওয়া যেত। দোকানে বলতো মারুতি ভাঙা ডাল। ঐ ডালে মা ফোড়ন না দিয়ে, শুধু ডালসেদ্ধ করতো। কাঁচা ডালে জল দিয়ে, তাতে কাঁচা সর্ষের তেল, নুন, মিষ্টি, কাঁচা লঙ্কা দিয়ে বসিয়ে দিত। সে ডালে কি ছিল। ঐ সেদ্ধ ডাল যেন অমৃত লাগত খেতে। আমার বিয়ের পরেও কিছু বছর আড়বেলেতে ঐ ডাল পেয়েছি। আমার কর্তাও ঐ ডালসেদ্ধর প্রেমে মজেছিলেন। কিন্তু এখন আর পাইনা। আর মাঝে মাঝে মা রাতে সাদা কাপড়ে ডাল বেঁধে ফুটন্ত ভাতের হাঁড়িতে ফেলে দিত। তারপর সেই টাইট ডালের বল কাঁচা সর্ষের তেল আর নুন দিয়ে মাখা হত। বেশ খেতে লাগত।

যতদিন আমাদের উনুনে রান্না হত, মাকে দেখতাম কড়া থেকে পাত্রে তরকারি ঢালার সময়ে খুন্তি দিয়ে উনুনের আঁচে তরকারির ছিটে দিত। জিজ্ঞেস করলে বলতো, উনুন তো আমাদের খেতে দেয়, তাই উনুনকেও খেতে দিতে হয়। এটা হল অগ্নিদেবকে সম্মান জানানোর প্রথা। তবে বাড়িতে কুকিং গ‍্যাস আসার পর এই প্রথার অবলুপ্তি ঘটল। 

হিট আইটেম

রান্নার গল্পই যদি বলতে বসেছি, তবে স্পেশাল আইটেম খাসির মাংসের কথা তো বলতেই হয়। মাছ যেমন কলের তলায় খুব ভালো করে ধোওয়া হত, মাংস কিন্তু ওভাবে মোটেই ধোওয়া হতনা। মা বলতো
মাছ ধুলে মিঠে
মাংস ধুলে সিঠে।
যদি দেখে মনে হয় মাংস ধুতে হবে, তবে জল গরম করে ঢেলে দিতে হবে। মোদ্দা কথা হল, শুরু থেকে শেষ খাসির মাংস রান্নার কোনো পর্বেই ঠান্ডা জলের স্পর্শ চলবেনা। মা যখন রান্না করতো, তখন, পেঁয়াজবাটা, আদাবাটা, রসুনবাটা, দই, হলুদ গুঁড়ো, সর্ষের তেল, লঙ্কা বাটা সবকিছু মাংসে মেখে নিয়ে ঘন্টা দু তিন রেখে দিত। তারপর কষতে শুরু করতো। মাংসে বড় বড় পিস আলু দেওয়া হত। মা পাতলা ঝোলটাই বেশি করতো। আর বাবার রান্নার পদ্ধতি ছিল আলাদা। বাবা মাংসে আলু দিতনা। আমরা খুব চেঁচামেচি করলে, মাংস নামানোর আগে ওপর থেকে লম্বা মুচমুচে আলুভাজা করে ছড়িয়ে দিত। বাবা মাংসটা শুধু সর্ষের তেল, হলুদ, দই, একটু পাতিলেবুর রস আর লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে ম‍্যারিনেট করতো। বাকি মশলা কড়ায় কষতো। বাবার অফিস কলকাতার ডালহৌসিতে ছিল। অফিস পাড়ায় অজস্র স্ট্রিট ফুডের দোকান থেকে বাবা নানারকম আইডিয়া নিয়ে আসত, আর মাংস রান্নায় নানাভাবে পরীক্ষা নীরিক্ষা করতো। বাবাই প্রথম বাড়িতে মাটন দোপেঁয়াজা রান্না করেছিল। ঐ অফিস পাড়া থেকেই বাবা বিরিয়ানি রান্না শিখেছিল, আর খুব সহজ উপায়ে আমাকে বিরিয়ানি রান্না শিখিয়ে দিয়েছিল। মাংসটা বাবা প্রথমে আগের বলা উপায়ে ম‍্যারিনেট করত, আর তার সঙ্গে আদা রসুন বাটাটাও মিশিয়ে দিত। মাংস যতক্ষণে ম‍্যারিনেট হচ্ছে, সেই সময়ে বড় বড় আলুর টুকরো নুন হলুদ মাখিয়ে ভেজে নিত। যতজন খাবে, ততগুলো ডিম সেদ্ধ করে নিত। ইচ্ছে হলে কেউ ডিমটাও নুন হলুদ, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো মাখিয়ে নেড়ে নিতে পারে। দেখতে সুন্দর লাগবে। এবারে ভাতটা রেডি করার পালা। একটা ডেকচিতে ফুটন্ত জলে লম্বা কাঁটার মতো বাসমতী চাল দিয়ে দিতে হবে। তবে বেশি তরিবত চাইলে আখনির জলে চাল ফোটানো যেতে পারে। আখনির জল মানে গরম মশলার ফ্লেভারওলা জল। একটা পরিষ্কার কাপড়ে বেশ খানিকটা গরম মশলা বেঁধে জলে ফেলে ঢিমে আঁচে ঢাকা দিয়ে ফোটাতে হবে। যদি কারোর কাছে টি পটে চা ভেজানোর জন্য চেন দিয়ে ঝোলানো ঢাকা ছাঁকনি থাকে, তার মধ্যে গরমমশলা দিয়ে ফোটানো যেতে পারে। জল ধীরে ধীরে লালচে হয়ে আসবে। জল থেকে দারুণ গরমমশলার ফ্লেভার পাওয়া যাবে। আশপাশের বাড়িতেও সে গন্ধ ঢুকবে। সেই জলে চাল দিয়ে ভাত করতে হবে। তবে খুব সতর্ক থাকতে হবে। অন‍্য কাজে মেতে গেলে চলবেনা। বাসমতী চাল পুরো সেদ্ধ হবার আগে একটু শক্ত অবস্থায় নাবাতে হবে। বেশি সময় লাগেনা। ফ‍্যান গালার আগে দুহাতা ফ‍্যান একটা বাটিতে তুলে রাখতে হবে। পরে কাজে লাগবে। আমি অবশ্য বাসমতী চালের এই ফ‍্যান এক ফোঁটাও নষ্ট করিনা। ফ্রিজে রেখে দিই। পরে এই ফ‍্যান দিয়ে মেয়েকে স‍্যুপ বানিয়ে দিই। দারুণ হয়। এবারে ভাতটা থালায় থালায় রেখে পাখা চালিয়ে একটু শুকোতে দিতে হয়। এইসব করতে করতে মাংস ম‍্যারিনেট হয়ে গেছে। মাংসটা এক্ষেত্রে রেওয়াজি হতে হবে, নইলে তুলতুলে হবেনা। এবারে একটা বড় সাইজের প্রেশার কুকারে প্রথমে সাদা তেল আর ঘি দিত বাবা। তাতে গরম মশলা থেঁতো ফোড়ন দিয়ে ভালো করে ভাজা ভাজা করে গন্ধ উঠলে, তাতে ম‍্যারিনেট করা মাংস দিয়ে হাল্কা কষে বাবা প্রেশারে সিটি দিয়ে মাংস গলিয়ে নিত। এবারে বিরিয়ানি সাজানোর পালা। নিচে মাংস তো প্রেশার কুকারে আছেই। তার ওপরে একস্তর ভাত, একটু ঘি, কয়েকটা আলু আর ডিম দিতে হবে। আর গুঁড়ো মশলা ছড়াতে হবে, এক দু ফোঁটা করে জাফরানের জল দিতে হবে। এই গুঁড়ো মশলা আগে থেকে করে রাখতে হবে। শা জিরে, শা মরিচ, জায়ফল, জয়িত্রী, কাবাব চিনি শুকনো তাওয়ায় নেড়ে গুঁড়িয়ে রাখতে হবে। আর একটা বাটিতে জাফরান কয়েকদানা ভিজিয়ে রাখতে হবে। আমরা কোনোদিন দোকানের রেডিমেড বিরিয়ানি মশলা ব‍্যবহার করিনি আর গোলাপ জল বা ক‍্যাওড়ার জল কখনও দিইনি। বাবা পছন্দ করতোনা। এখন আমার কর্তাও পছন্দ করেনা। যাই হোক, এইভাবে স্তরে স্তরে সব কিছু সাজিয়ে ওপর থেকে ঐ দুহাতা ফ‍্যান ভাতে দিয়ে দিত বাবা। এবারে প্রেসার কুকারের ঢাকা বন্ধ করে আঁচ কমিয়ে পুরো জিনিসটা দমে বসিয়ে রাখতে হবে। মিনিট দশেক যথেষ্ট। এবারে আঁচ থেকে প্রেশার কুকার নাবানোর পরে আর একটা কৌশল আছে। আমার তো অত গায়ের জোর নেই। যারা হাঁড়িতে বা ডেকচিতে বিরিয়ানি করে, তাদের গরম পাত্রটা তুলে ধরে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে মাংস মেশাতে হয়। বিয়ের আগে খাওয়াটাই মুখ‍্য ছিল, কিভাবে কি হচ্ছে, অত কিছু তো দেখতাম না। বিয়ের পর আমি বাবাকে বলেছিলাম, কি করে করব, আমি তো পারবোনা বাবা। বাবা বলেছিল, তোকে এমন কৌশল শিখিয়ে দেব যে খুব ভালো ভাবে পারবি। শুধু একটা বড় সাইজের প্রেশার কুকারে রান্না করবি, হাঁড়িতে বা ডেকচিতে নয়। দরকার হলে, মানে একবারে না ধরলে দমটা দুবারে দিবি। সেই কৌশলটাই এখন বলছি। দমে বসানো প্রেশার কুকার আঁচ থেকে নামিয়ে ভাপ বের করা যাবেনা। প্রেশার কুকারটা উল্টে দিয়ে কিছুক্ষণ রাখতে হবে। এতে নিচের মাংসের ঝোল আর টুকরো ওপরদিকে উঠে আসবে। কিন্তু এই ওল্টানোটা দুদিকে দুবার হবে, যোগ চিহ্নের মতো। প্রথম অভিমুখটা হল, একবার ডানহাতে হাতল আর বাঁহাতে সাপোর্ট ধরে ফরোয়ার্ড – ব‍্যাকোয়ার্ডে রোল করে উল্টে রাখতে হবে, আর মিনিট তিন চার পরে  একবার হাতলের দিক দিয়ে সাইড ওয়ার্ড ওল্টাতে হবে। এবারও কয়েক মিনিট ওভাবে রেখে, তারপর সোজা করে রাখলে, বিরিয়ানি পরিবেশনের জন্য রেডি হয়ে যাবে।
আমার মা মাখনে গোটা গোলমরিচ, তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে আর আস্ত পেঁয়াজ দিয়ে মাটন স্টু আর ভেজিটেবল স্টু খুব ভালো করত। একটু ধনে গুঁড়ো দিতো। সব্জির স্টু হলে মা বিট দিত।  সামান্য উপকরণে কিভাবে যে অমন স্বাদ হত, কি জানি? আমার মেয়ে খুব ছোটো বয়সে খেলেও এখনো তার দিদার স্টুয়ের কথা মনে আছে। তখন মাংস বলতে পাঁঠার মাংসই আমরা জানতাম। মুরগি খাওয়ার চল ছিলনা। মাঝে মাঝে বিবেকানন্দের বাড়ির পাশে চাচার দোকানে আমরা দেবভোগ‍্য মাটন শিক কাবাব খেতে যেতাম। আজ ঐ দোকান রাস্তার উল্টো দিকে চলে গেছে। ছোটোবেলার স্বাদেরও ভরাডুবি হয়েছে।

বনেদী পরিবারের গুহ‍্য শৈলী

এবারে মায়ের একটা স্পেশাল আইটেমের কথা বলি। আমার মা একরকম দইমাছ বানাতো, সেটা অন‍্যান‍্য পরিবারের দইমাছের সঙ্গে মিলতোনা। অন‍্য বাড়িতে দইমাছের রং হতো সাদাটে, কিন্তু মায়ের দইমাছ ছিল টকটকে লাল। ঐ দইমাছ আমার কর্তা আর কন‍্যারও ভীষণ পছন্দ। পদ্ধতিটা বলি তাহলে। বড় পাকা রুই মাছ লাগবে। মাছটা যদি আকারে ছোটো হত, তাহলে মা ভীষণ রেগে যেত। বলতো এটাতে কোনো কম্প্রোমাইজ চলবেনা। এই রান্না মা শিখেছিল মায়ের মা লাবণ‍্যপ্রভার কাছ থেকে। লাবণ্য ছিলেন খানাকুলের ঘোষ বংশের মেয়ে। তিনি শিখেছিলেন তাঁর মা যূথিকারানীর কাছে। যূথিকারানী বেতড়ের কর বাড়ির মেয়ে, চিকিৎসক আর জি করের ভাইঝি। এই দইমাছ যদি করবাড়ির রেসিপি হয়, তবে তা খানাকুলের ঘোষ, বসিরহাটের মণ্ডল হয়ে এখন রামনগরের দাসমহাপাত্র পরিবারে চলে এসেছে। মাছে শুধু নুন মাখিয়ে রাখতে হবে, হলুদ পড়বেনা। মাছ ভাজা হবেনা, কাঁচা থাকবে। কড়াতে সর্ষের তেল আর ঘি সমপরিমাণে নিতে হবে। গরম হলে তাতে গরমমশলা আর চিনি দিতে হবে। গরমমশলা ভাজার গন্ধ উঠবে, চিনি গলে যাবে, তারপর মিহি পেঁয়াজ বাটা দিয়ে কষতে হবে। ভালো করে কষা হলে এবারে নুন আর শুকনো লঙ্কা বাটা দিতে হবে। কষতে কষতে তেল ছেড়ে যাবে। এবারে অল্প জল দিতে হবে। জল দিলে কড়ার উষ্ণতা কমে যাবে। এবারে মিষ্টি দই ফেটিয়ে কড়ায় ঢেলে দিতে হবে। ফেটানোর সময়ে একচিলতে ময়দা মিশিয়ে ফেটালে ভালো। কড়ায় কম উষ্ণতা আর দইয়ে একচিলতে ময়দা থাকলে দই ফেটে যাবার সম্ভাবনা আর থাকেনা। এই গ্রেভিতে এবারে নুন মাখানো কাঁচা মাছগুলো ফুটবে। মাছ ভালো ভাবে সেদ্ধ হয়ে গেলে ঝোলের নুন মিষ্টি দেখে রান্না নামাতে হবে।

বোসবাড়িতে একরকম মাছের ঝাল রান্না হতো, তাতে কোনোরকম ফোড়ন পড়তোনা। এই রান্নাটা একদম ঠিকঠাক করতে পারতেন আমার এক মামীমা। সম্পর্কে তিনি আমার দাদু বিকাশ বোসের বড়দা সতীশ বোসের বড়বৌমা। তাঁর এখন চুরানব্বই বছর বয়স। আমার মা কিন্তু এটা ঠিক ভাবে রপ্ত করতে পারেনি। সর্ষের তেল আর ঘি মিশিয়ে, তাতে শুকনো লঙ্কা আর হলুদ বাটা দিয়ে কষতে হতো। তেল ছেড়ে গেলে, তাতে অল্প জল, নুন দিয়ে পাকা রুই মাছের টুকরো ফেলে ফোটাতে হয়। এখানেও মাছটা ভাজা হয়না।

মা গল্প করতো যে মায়েদের ছোটবেলায় পোস্ত রান্না হতো একেবারে ঝুরঝুরে, বাদামি রঙের। প্রথমে পাঁচফোড়ন, কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে, মুচমুচে আলু ভেজে, তাতে পোস্ত বাটা দেওয়া হতো। আর কষে কষে সেই পোস্ত বাদামি রং হয়ে তেল ছেড়ে যেত। আমার দাদুভাই নাকি এই মুচমুচে, ঝুরঝুরে পোস্ত ছাড়া মুখে তুলতোনা। একবার রাঁচিতে শ্বশুরবাড়ির এক জ্ঞাতির বাড়িতে নরম আলুপোস্ত খেয়ে তাঁর মন ঘুরে যায়। তেল জবজবে ঝুরো আলুপোস্ত বন্ধ হয়। এখন দাদুর শ্বশুরবাড়ির তরফে, মানে লাবণ‍্যর বাপের বাড়িতে যদি এই ঝুরো পোস্ত না হয়, সেক্ষেত্রে আমার ধারণা, এই রেসিপি শোভাবাজার রাজবাড়ির। দাদুভাইয়ের ছেলেবেলা ওখানেই কেটেছে, কারণ আমার দাদুভাই বিকাশচন্দ্র বোসের ঠাকুরদা মহেশচন্দ্র বোস ছিলেন রাধাকান্ত দেব বাহাদুরের ঘরজামাই। তাই দাদুভাই মনে হয় অমন খেতে শিখেছিল।

মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনী বসুর হাতের আনারসের সরবতের কথা শুনেছি। কুমুদিনীর মা লীলাবতী মিত্র ছিলেন ঋষি রাজনারায়ণ বসুর কন্যা। লীলাবতীর মা ছিলেন হাটখোলা দত্ত বাড়ির মেয়ে। আর কুমুদিনীর বাবা হলেন ব্রাহ্ম নেতা কৃষ্ণকুমার মিত্র, যিনি প্রথম স্বদেশী ও বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর আদিবাড়ি ছিল বাংলাদেশের ময়মনসিংহ। বসু, দত্ত নাকি মিত্র কোন বাড়ি থেকে কুমুদিনী এই সরবৎ শিখেছিলেন, সে তো আজ আর জানার উপায় নেই। তখনকার দিনে তো মিক্সার গ্রাইন্ডার ছিলনা, হাতেই খুব ঝিরিঝিরি করে আনারস কাটা হতো। এবারে ডালের কাঁটা দিয়ে ভালো ভাবে মেড়ে, তাতে নুন, মিষ্টি, বিটনুন, গোল মরিচের গুঁড়ো, লেবুর রস আর জল দিয়ে ঐ সরবৎ বানানো হতো। কুমুদিনীর হাতের ঐ সরবৎ কেউ একবার খেলে নাকি ভুলতোনা।

আর মা বলতো, মায়েদের বাড়িতে নানারকম নিমকি, এলোঝেলো, জিরে চিঁড়ে, ক্ষীর কমলা এইসব নাকি সবসময়ে বানানো হতো। আমার বোন শ‍্যামবাজারের এক রান্না শেখার ইস্কুলে এলোঝেলো বানাতে শিখেছিল। পরিমাণ মতো ময়ান, নুন আর কালোজিরে দিয়ে ঠেসে ময়দা মাখতে হবে। এবারে লম্বাটে লুচির মতো বেলে তার সেন্ট্রাল পজিশনে খুন্তি দিয়ে তিনটে সমান্তরাল ভাবে জানলা করে দিতে হবে, মানে কেটে দিতে হবে। লুচিতে ফুটো হয়ে গেলে ভাজলে সে আর ফুলবেনা, কিন্তু মচমচে নিমকির মতো হবে। ঐ জানলাওলা লুচিটা দুপাশে ধরে টফির কাগজের মতো পেঁচিয়ে দিতে হবে। মাঝখানটা কাটা থাকার জন্য ফিতে পেঁচানোর মতো দেখতে লাগবে। এটাই এলোঝেলো। এটাকে এবার ছাঁকা তেলে বা ঘিয়ে মচমচে করে ভাজতে হবে। তারপর এলোঝেলোগুলো জাল দেওয়া চিনির রসে ফেলে দিতে হবে। চিনিটা গায়ে গায়ে লেগে শুকোবে। চিনির রস জ্বাল দেবার সময়ে যদি মনে করে লবঙ্গ ফেলে দেওয়া হয় তো কেল্লা ফতে। 

আর জিরেচিঁড়েতে চিঁড়ে থাকেনা। নারকেলকে চিঁড়ের মতো ঝিরিঝিরি করে কাটা হয়। মায়ের কাছে শুনে যা বুঝেছি, তা হল জিরে চিঁড়ে বাংলার ট্র‍্যাডিশনাল নারকেলের টুটিফ্রুটি। সাদা চিঁড়ের মতো ফাইন স্লাইজ করা নারকেল আর প্রায় সমপরিমাণ সাদা চিনি ঠান্ডা কড়ায় ঢেলে নিয়ে, তারপর ঢিমে আঁচে বসাতে হবে। খুন্তি নাড়া ছাড়া যাবেনা, অন‍্যকাজে মন দেওয়া যাবেনা। ধৈর্য হারিয়ে আঁচ বাড়ানো যাবেনা। ধীরে ধীরে নারকেলের তেল ছাড়বে, চিনি গলবে, কিন্তু লাল হবেনা। চিনির চিটচিটে ভাব চলে গিয়ে নারকেলের গায়ে শুকিয়ে যখন আটকে যাবে, তৈরি জিরেচিঁড়ে। ঠান্ডা করে কৌটোয় ভরে রাখতে হবে, অনেক দিন থাকবে। এতসময় নিয়ে আমি যদি এটা সত্যি সত্যি বানাতে পারতাম, আমার মেয়ে ভাত বাদ দিয়ে এটাই সারাদিনে খেয়ে শেষ করে দিত, বেশি দিন রাখার অবকাশ থাকতোনা।
ক্ষীর কমলা, আতার পায়েস এসব আমি নিজে করেছি। মূল ব‍্যপারটা হল, চিনি, এলাচ, জাফরান, এসব দিয়ে ক্ষীর যেমন বানায়, তেমন হবে। এবারে ঠান্ডা করার পর ফলের শাঁস সে কমলালেবু হোক বা অন্য কিছু সেটা মেশাতে হবে। আঁচে থাকাকালীন মেশালে ছানা কেটে যাবে। এখন ফ্রিজ আছে ঠান্ডা করা কোনো ব‍্যাপার নয়। মা বলতো আগের দিনে যেকোনো ঠান্ডা খাবার শ্বেত পাথরের বাসনে রাখা হতো, আর পাথরের বাসনেই খেতে দেওয়া হত। মায়ের ভাগে বংশের যেসব বাসন পড়েছিল, সেসব এখন আমার কাছে আছে।

এবারে শেষপাতের চাটনির কথা কি না বললে চলে? মায়ের চাটনি করার বেশ স্টাইল ছিল। আমার শ্বশুরবাড়িতে টমেটোর চাটনিতে জল পড়েনা। ভুরি পরিমাণ ফোড়ন, মশলা, লঙ্কা দিয়ে ঘন বড়ের আঠা চাটনি করে রাঁধুনিরা। কিন্তু মা কখনও পাঁচফোড়ন, কখনও সর্ষে ফোড়ন দিয়ে টমেটোর পাতলা চাটনি করতো। পেঁপের চাটনির নানান রকমফের ছিল। সর্ষে ফোড়ন দিয়ে পেঁপে হাল্কা তেলে নেড়ে আমাদা বাটা দিয়ে চাটনি যেমন হত, আবার পেঁপে কুরে লেবু চিনির রসে ফেলা চাটনিও হত। আর একরকম ছিল যেখানে পেঁপে এত পাতলা করে স্লাইজ করা হত, যে রান্নার পরে স্বচ্ছ হয়ে যেত। আমরা বলতাম প্লাস্টিকের চাটনি। সেকালে বিয়েবাড়িতে প্রায়শই এই প্লাস্টিকের চাটনি হত। এখন ক‍্যাটারিংয়ের বিস্বাদ ফ্রুট চাটনির ঠেলায় এসব তরিবত উঠে গেছে। আমড়া আর জলপাই দিয়েও মা পাতলা চাটনি করত। আমার শ্বশুরবাড়িতে পাকা তেঁতুলের চাটনি বা সরবৎ খুব চলে। কিন্তু মা করতো আমাদা দিয়ে কাঁচা তেঁতুলের চাটনি। খুব ভালো লাগত। বিয়ের পর এক ভাইফোঁটায় আমার মামাতো ভাই অতিথি ছিল। আমি তো সাধ‍্যমতো টমেটোর চাটনি করেছি। ওকে খেতে দিয়েছি, জিজ্ঞেস করছি কেমন হয়েছে। ভাই হেসে ঘাড় নাড়ছে। পরে আমি খেতে গিয়ে দেখি, চাটনি কি কিড়কিড়ে মিষ্টিরে বাবা, টকের ট নেই। আমি নিজেই মুখে তুলতে পারছিনা। তারপর ল‍্যান্ডফোনে মায়ের কাছে অনুযোগ জানালাম, এমন কেন হল। মা বললো টমেটো নিশ্চয়ই দিশি ছিলনা, মিষ্টি হাইব্রিড টমেটো ছিল। চেখে দেখা উচিত ছিল আমার। সবকিছু ওভাবে শেখানো যায়না। পরিস্থিতি বুঝে নিজের বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হয়। এরকম ক্ষেত্রে পাতিলেবুর রস বা পাকা তেঁতুল মিশিয়ে দিলে এমন ম‍্যাসাকার হতনা। আজকাল ক‍্যাডবেরির একটা বিজ্ঞাপন দেখায়, দিদি ভুল করে চিনির বদলে নুন দিয়ে পায়েস করে ফেলেছে, আর ভাই কেউ যাতে না বুঝতে পারে বলছে পুরোটা আমি খাব। ওটা দেখলে আমার নিজের সেই চাটনির কথা মনে পড়ে যায়। তবে নতুন গিন্নিদের বোধ করি সকলেরই এমন কিছু না কিছু ঘটে। আমার এক পিস্তুত বোন নুনের বদলে সোডা দিয়ে ডাল করে ফেলেছিল। যাক এসব দুঃখের কথা, মিষ্টি মিষ্টি চাটনির কথায় ফিরে আসি।  

কাঁচা আম দিয়ে মা নানা রকম চাটনি করতো। পাঁচ ফোড়ন গোটা শুকনো লঙ্কা দিয়ে আমের টুকরো ভেজে, ওপরে ভাজা মশলা দিয়ে চাটনি করতো। তবে আমি ভালোবাসতাম গোটা সর্ষে ফোড়ন দিয়ে আমের একেবারে পাতলা চাটনি। মা বলতো আমের ঝোল। আর বাবা পোনা মাছের ডিম দিয়ে আমের চাটনি খেতে ভীষণ ভালোবাসত। মাঝেমধ্যে আম থেঁতো করা হত। থেঁতোতে নুন, মিষ্টি, এক ফোঁটা সর্ষের তেল আর ভাজা মশলা দিয়ে মাখা হতো। আম ছাড়া আর একটা দারুণ জিনিস ছিল কয়েৎবেল মাখা। কয়েৎবেল ভেঙে ভিতরটা যদি কালো পাওয়া যায়, মানে রসস্থ পাকা ফল, তাহলে তো কেল্লা ফতে। সর্ষের তেল, নুন, চিনি, ঝিরিঝিরি কাঁচা লঙ্কা কুচি দিয়ে খুব ভালো ভাবে মাখতে হতো, যাতে চিনি গলে যায়। এখন সুগার ফ্রি মিশিয়ে সেই স্বাদ জমেনা। হাহুতাশ করতে হয়।

মা রকমারি সরবৎ বানাতে পারত। দেশি লেমোনেড – লেবু চিনির সরবৎ তো ছিলই, এছাড়া কাঁচা আমপোড়া সরবৎ, পাকা আমের ভাজা মশলা দেওয়া সরবৎ, রোজ সিরাপ মিশিয়ে তরমুজের সরবৎ, মিষ্টি দইয়ের ঘোল, টক দই আর পুদিনার সরবৎ এইসব। হাতিবাগানে সিনেমা দেখতে গেলে বাবা একটা দোকানে গুঁড়ো বরফ দেওয়া আম আর দইয়ের সরবৎ খাওয়াতো। আর ধর্মতলায় গেলে প‍্যারামাউন্টের সরবতের ভান্ডার তো ছিলই। সর্দি কাশি হলে মা মিছরি, গোলমরিচ, তেজপাতা আর আদা ফুটিয়ে গরম সরবৎ বানিয়ে কাপে করে নিয়ে এসে বলতো খেয়ে নে। গলায় খুব আরাম হতো।

ছোটোবেলায় সবারই মাঝে মাঝে জ্বর হয়, আমাদেরও হত। জ্বর হলে খুব বিধিনিষেধ মেনে চলতে হত। চান করা যাবেনা। ঈষদুষ্ণ জলে গা মুছতে হবে। জ্বর বাড়লে মা মাথা ধুইয়ে দিত। দুধে ফুটিয়ে দুবেলা রবিনসন বার্লি গিলতে হত। ভাতের জন্য প্রাণ আকুলি বিকুলি করলেও, ভাত পাওয়া যাবেনা। জ্বরে নাকি রুটি খেতে হয়। বয়স বাড়তে জানলাম, এগুলো ওভাবে অত না মানলেও চলত। আর একটা নিয়ম ছিল, জ্বর যেদিন ছাড়বে, মানে যেদিন চান করে প্রথম ভাত খাবো, সেদিন দুপুরে ঘুমোনো যাবেনা। অথচ সেদিন মাথায় তেল জল আর পেটে ভাত পড়ে দুপুরে পাগলপারা ঘুম পেত। পাশে সব নাক ডাকাচ্ছে, আর জ্বর থেকে ভালো হওয়া রুগী ড‍্যাবডেবিয়ে বসে আছে – উফফ, কি অত‍্যাচার। ভাবলে এখনও গায়ের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। তবে জ্বর থেকে ওঠার পর মা পাতলা মাছের ঝোলভাত দিত, খুব ভালো লাগত। বড় হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কি যাদু করতে বলোতো মা? মা হেসে বলেছিল, ঝোলে তখন ঘি আর গোটা গোলমরিচ ফোড়ন দিতাম। ওতে অরুচি কাটে। আর বাড়িতে কারোর অরুচি হলে মেথি শাক রান্না করবি, দেখবি ভালো হয়ে যাবে। একবার বাবা ওরকম জ্বর থেকে উঠেছিল। আমি সাধ‍্যমতো গুছিয়ে খেতে বেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু জ্বোরো রুগীর মুখ তো বাবা তেমন কিছু খেতে পারেনি। মা বুঝিয়ে বলেছিল, এটা আমার খেতে দেওয়ার ভুল। রুগীকে স্বাভাবিক পরিমাণে খেতে দিতে নেই। থালায় অল্প করে বাড়তে হয়। তাতে পুরোটা খেতে পারলে সে খুশি হবে। আর থালার খাবার পড়ে থাকলে সে একই পরিমাণ খেয়ে ভাববে, কিছুই খেতে পারলাম না। যে রান্না করে আর খেতে দেয়, তাকে শুধু রান্না জানলে চলেনা, যে খায়, তার মন বুঝতে হয়। আর রুগীকে এমনভাবে কৌশলে খেতে দিতে হয়, যাতে তার মনোবল বাড়ে।

মা খুব সুন্দর সুর করে আদ‍্যাস্তোত্র পাঠ করত। স্নান করে, কোঁকড়া চুলে গামছা জড়িয়ে স্তোত্র পাঠ করতে করতে মা রোজকার পুজোর যোগাড় করতো। শিবরাত্রি আর ফলহারিণী কালীপুজোয় মা উপোস করতো। কিন্তু নির্জলা উপোস পারতোনা। ফল, মিষ্টি আর পুজোর পরে উপোস ভাঙলে খেত সাবুর খিচুড়ি বা সাবু মাখা। কখনো বা সাবু সেদ্ধ। আমরাও তার ভাগ পেতাম। ছোটোদানা  সাবু ভিজিয়ে তাতে পরিমাণ মতো দুধ, আম, কলা, বেদানা এবং অন‍্যান‍্য ফলের টুকরো একটু মিষ্টি দিয়ে মিশিয়ে খেতে খুব ভালো লাগত। আর সাবুসেদ্ধ হলেও পছন্দ করতাম। বড়দানা সাবু একটা মাঝারি পাত্রে জল দিয়ে ফোটাতে হবে আর সমানে নাড়তে হবে। নুন মিষ্টি দিতে হবে। সেদ্ধ হয়ে গেলে ঢেকে রেখে ঠান্ডা করতে হবে। সাবু ঠান্ডা হলে ঘন হয়ে স্বচ্ছ জেলির মতো পাত্রের মধ্যে বসে যাবে। তখন চামচে কেটে কেটে খেতে হবে। আমার এই খাবারটার ওপরে বাড়তি আগ্রহ ছিল, কারণ মা আমার বাটিতে এই সাবুর জেলির ওপরে বড় বড় দুচামচ চিনি দিয়ে দিতো। ঐ চিনির লোভে সাবু সেদ্ধ আরও স্বাদু হয়ে উঠতো। আর সাবুর খিচুড়ি হলে, কড়ায় থাকা অবস্থাতেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম, মা কখন বেড়ে দেবে। ছোটোদানা সাবু আগে ভিজিয়ে রাখা হতো। বড় টুকরো আলু, গাজর, ফুলকপি, কড়াইশুঁটি, বরবটি, বীন হাতের কাছে যা থাকে তেমন আনাজ নিয়ে তেলে নেড়ে হাল্কা ভাপিয়ে রাখতে হবে। এবারে মুগের ডাল ভেজে আনাজ সমেত সেদ্ধ করে নিতে হবে। তারপর কড়ায় জিরে, লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে আদাবাটা, টমেটো কুচি, হলুদ, ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, নুন, মিষ্টি দিয়ে মশলা কষতে হবে। কষা হয়ে গেলে কড়ায় ডাল ঢেলে দিতে হবে আর ভেজানো সাবুটাও ঢেলে দিতে হবে। নাড়তে হবে, সাবু যাতে বসে না যায়, আর সাবু ঘন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে বলে, জলের পরিমাণটা নজরে রাখতে হবে। জল কম হলে চলবেনা।

সরস্বতী পুজোর সময়ে অনেক বাড়িতেই গোটা সেদ্ধ হত। প্রতিবেশীরা দিত অনেক সময়ে। মা গোটা সেদ্ধ খেতে খুব ভালোবাসত। কিন্তু নিজে কখনও করতনা। মাকে করতে বললে, বলতো আমাদের গোটার নিয়ম নেই। যেবছর কেউ দিতনা, সেবছর খুব হাহুতাশ করত। মাকে বোঝাতাম, নিয়মের কি আছে? ভালো লাগলে করতে ক্ষতি কি? আজ আমি ছোটো বেগুন, শিম, রাঙাআলু, কড়াইশুঁটি, টক পালং আর গোটা মুগ দিয়ে গোটা সেদ্ধ বানাতে শিখেছি। কিন্তু সেটা চেখে দেখার জন্য মা আজ আর বেঁচে নেই।

ইস্কুলের দিন সকালে জলখাবার ছিল পাঁউরুটি টোস্ট আর আলু চচ্চড়ি। টিফিনেও তাই নিতাম। সঙ্গে আমার আর বোনের জন্য ভাগ করে একটা ডিমসেদ্ধ হাফ হাফ। আর কোনোদিন পাঁউরুটির কাগজে মুড়ে একটা রসগোল্লা। সকালে মা খুব তাড়াহুড়ো করে রান্না সারত। বাবা  টিফিন গুছিয়ে দিত। পাঁউরুটি ছাড়া অন্য কিছু করে দেওয়ার উপায় বা সময় কোনোটাই ছিলনা। বছরের পর বছর পাঁউরুটি খেয়ে আমি ঠিক করেছিলাম, পৃথিবী থেকে পাঁউরুটি ধ্বংস করব। কিন্তু তা আর হল কই। কিছুদিন আগে বুড়ো বয়সে ইস্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে শুনি, যে রোজ রুটি আর ঢেঁড়স ভাজা আনত, সে বলে তুই কি সুন্দর পাঁউরুটি আনতিস। একজন বলে, আমার ঠাকুমা বই খাতার সঙ্গে ডিম নিতে দিতনা, আর তুই রোজ হাফ ডিম আনতিস, আমার খুব রাগ হত। পাকা চুলে কলপ করা বুড়িরা হেসে কুটিপাটি হই। ইস্কুল শেষ হবার তিরিশ বছর পরে সকলে জানতে পারলাম, টিফিন নিয়ে যার যার নিজের কষ্ট ছিল। যাই হোক ছুটির দিন রুটি, লুচি, পরোটা সব কিছুই হত। আর মাঝে মাঝে গোলা রুটি হত। আলুভাজা মোটা লম্বা, ঝিরিঝিরি, কাঠি কাঠি, ডুমো ডুমো, গোল গোল সবরকম হত। পটল ভাজা, গোল গোল বেগুন ভাজা, ঝিরিঝিরি ঢেঁড়স ভাজা, কপিভাজাও হতো। মাঝে মাঝে মোটা করে খোসা ছাড়িয়ে আলুর খোসা ভাজা হত। তবে আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল, যখন মা ডুমো আলু অল্প ভাপিয়ে সাদা তেলে নুন মরিচ দিয়ে কষে দিত। শীতকালে এতে ফুলকপির টুকরো আর কড়াইশুঁটি পড়ত। এই রান্নাটার নাম আলু মরিচ। তবে মা যতই করুক, আমার দেখা জলখাবারের রানী ছিল আমার একমাত্র পিসিমণি।

আমরা যেমন পাতিপুকুরে থাকতাম, আমার একমাত্র পিসি থাকত দত্তবাগানে। সে বাড়িতে চন্দনা ছিল। আমি আর বোন পিসির কাছ থেকে ধানের শিষ নিয়ে তাকে খাওয়াতাম। পিসি লক্ষ্মী ঘিয়ে লুচি ভাজত। সেই লুচি ভাজার গন্ধ ছিল পিসির বাড়ির গন্ধ। আর বড়দের মতো আমাদেরও একরকম ভাবে বাটি বাটি করে তরকারি, বোঁটা সমেত বেগুনভাজা, মিষ্টি সাজিয়ে দিত। বড় ছোট আলাদা করতোনা। এটা ছিল একটা বিরাট সম্মানের ব‍্যাপার। বাড়িতে বাবা মাকে ভয় করতাম। কিন্তু পিসির সামনে বাবা মা জবুথবু। যতই দৌরাত্ম্য করি, কেউ কিছু বলতে পারতনা। বকার চেষ্টা করলেই  পিসি কড়া ধমক দিত বাবা মাকে। এই ব‍্যাপারটা দারুণ লাগত, তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতাম। শীতের শুরুতে মাঝে মাঝে ঐ আবাসনে নীচ থেকে হাঁক শোনা যেত – টু-ম্পা, ঝু-ম্পা! আর জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালেই মনটা নেচে উঠত। দেখতাম অনেক ব‍্যাগ নিয়ে, দশাসই পিসিমণি সাইকেল রিক্সায় বসে আছে। আমরা তিনতলার কোয়ার্টার থেকে ছুট্টে নিচে গিয়ে ব‍্যাগগুলো ধরলে পিসি রিক্সো থেকে নামত। ঘরে এসে সেই ব‍্যাগ থেকে থরে থরে বেরোতো – তুলতুলে দুধপুলি, নারকেল – গুড়ের পাক ভরা সেদ্ধ পুলি, সরুচাকলি, পাটিসাপটা দুরকম, একটা চিকণ, অন‍্যটা ক্ষীরের মধ্যে ভাসমান। সেদ্ধ পুলিটা ডুবিয়ে খাওয়ার জন্য আড়বেলে স্পেশাল মৌঝোলা গুড়। বাবা পাটিসাপটা খেতে ভালোবাসত, আমার আর মায়ের প্রিয় ছিল রসবড়া। চিনির রসে টোপা টোপা দেবভোগ‍্য রসবড়া ভাসতো। পড়তে পেতোনা, সব খেয়ে ফেলতাম। আর তারপরে দুতিন দিন প্রাতরাশ হতো পুলি দিয়ে। পিসি চলে যাওয়ার পর পিঠে পুলিও গল্প হয়ে গেল। পিসির মুখে হিমালয় কোম্পানির স্নো, তার সঙ্গে পাউডার আর ঘামের গন্ধ মিশে একটা ছোটোবেলার গন্ধ ছিল। ঐ গন্ধটা আজকাল মাঝে মাঝে স্বপ্নে আসে।
বারাসাতে তখন সদ‍্য পৌর জনবসতির সলতে পাকানো চলছে। পিসিমনাই ছিল করিতকর্মা মানুষ। বারাসাতে ধীরে ধীরে পিসিমনাই একটা বড় বাড়ি করল। সে বাড়িতে বাগান ছিল, বাঁধানো ঘাটওলা পুকুর ছিল। পুকুরের ঘাটের দুপাশে লাল সিমেন্টের বসার জায়গা করা ছিল। চারিদিকে ফাঁকা মাঠ। দূরে ধানজমি আর হু হু হাওয়া। চিলেকোঠার ঠাকুরঘরে পিসি পুজো করত, আমরা চারপাশে ঘুরঘুর করতাম। আমাদের সব জায়গায় ছিল অবাধ গতিবিধি। চানঘরে বড় চৌবাচ্চা ছিল। আমরা দু বোন পুকুরের মতো একসঙ্গে চৌবাচ্চায় নামতাম স্নান করতে। দুজন দুজনকে জল ছুঁড়তাম,  ভীষণ মজা হত।  আড়বেলেতেও মেজজেঠুদের চৌবাচ্চা ছিল। কিন্তু সেটায় একজন করে নামা যেত। পিসির বাড়িতে যখন থাকতাম, বাবা ওখান থেকে অফিস করতো। ফিরতে অনেক রাত হত। একবার মাথায় রোখ চাপল, পিসির বাগানে গাছ লাগাবো। বাবাকে বলে দিলাম, বাবা অফিস থেকে গাছ আনবে, আমি পুঁতব। রাত অবধি চোখ ভরা ঘুম তাড়িয়ে বসে ছিলাম বাবা কখন আসবে। বাবা ফিরলে দেখলাম গাছ আনেনি। ব‍্যাস, শুরু হল কান্না। হঠাৎ দেখি হারিকেন আর খুরপি হাতে পিসি আসছে, বাগান থেকে। হাতে দুটো গাছের চারা। নিজের বাগানের দুটো গাছ কুপিয়ে তুলে ফেলেছে, আমরা লাগাবো বলে। বাবার বিরক্তি, বকুনিকে দশ গোল দিয়ে, দুটো গাছ আমরা পুঁতে দিলাম। মানে আমরা ছুঁয়েছিলাম, পিসি পুঁতে দিল। আর গাছদুটোর নামকরণও হয়ে গেল – টুম্পার গাছ আর ঝুমুর গাছ। আমার গাছটা ছিল মৌরি গাছ। সে গাছ বড় হয়ে ফল ধরেছিল। মিষ্টি মিষ্টি কচি সবুজ মৌরি তুলে খেয়েছিলাম। আজ স্বপ্নের মধ্যে সেই মৌরির স্বাদ ফিরে আসে। ছুটির দিন দুপুর বেলা সেই পুকুর ঘাটে বাবা ডলে ডলে সর্ষের তেল মাখাতো, মাথায় এক আঁজলা নারকেল তেল দিয়ে দিত, খেতে বসার সময়ে রগ দিয়ে তেল গড়াতো। বড় বাড়ি ধুয়ে মুছে রান্না বসাতে পিসির দেরি হয়ে যেত। মাংস সেদ্ধ হয়নি, এদিকে আমাদের খিদে পেয়ে গেছে। পিছনের টানা দালানে আসন পেতে বসে পড়তাম, পিসিমনাই বলে দিত, খুব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বল, আমাদের ভাত দাও, মাংস দাও। আমরাও যথাসাধ্য নির্দেশ পালন করতাম। তার পরেই ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালা আর অন‍্য থালায় অনেক বাটি সাজিয়ে পিসির প্রবেশ ঘটত। আর বড়দের যতগুলো বাটি, আমাদের দুবোনকেও তত গুলো বাটি সাজিয়ে দিত। পিসি কোনদিন কোলে নিয়ে সোনামনা বলে আদর করেনি। বাবা মাকে কড়া শাসনে রেখে, আমাদের সর্ববিধ প্রশ্রয় দেওয়াটাই ছিল পিসির আদর। সে আদর শেষ হল, ক্লাস এইটে। আমরা স্কুল থেকে মায়ের সঙ্গে আর জি কর হাসপাতালে গিয়ে দেখি দাপুটে পিসি শুয়ে আছে নিশ্চুপ। এত কাছে দাঁড়িয়ে আছি, তবু একবারও ডাকেনা – টুম্পা ঝুম্পা এলি! নাকে নিশ্বাস পড়েনা। আর ও কিছুদিন থেকে গেলে কি এমন ক্ষতি ছিল। যেবার টুসি সিনেমা এসেছিল হলে সেবছর পিসি আমাকে আর বোনকে টুসি জামা কিনে দিয়েছিল, লেসের ফ্রিল দেওয়া। আমার হলুদ আর বোনের নীল। পুজোয় গান বাজছিল তোমার নীল দোপাটি চোখ আর শ্বেত দোপাটি হাসি। পিসি গম্ভীর ছিল, বড় একটা হাসতনা। আড়বালিয়ায় পুজো হলে, পিসি সব প্রসাদ ভাগ করত। দিদির ওপরে বাবা, বা জেঠুদের কোনো কথাই চলতনা। আমি একবার দাদাদের সঙ্গে ভিড়ে, শয়তানি করে ফাঁকা মিষ্টির বাক্স ঢিল পাটকেল পুরে, গার্ডার লাগিয়ে সুন্দর করে পিসিকে দিলাম – যেন মিষ্টিটা একপাশে পড়ে আছে, কেউ দেখেনি। পিসি নির্বিকার বাক্সটা নিল, আর আমাদের সামনেই ফেলে দিয়ে মুচকি হাসল। আমরা হাসি দেখব কী, তখন সব একছুটে পগার পার। আমার মা বলত, দিদির যা বুদ্ধি আর স্মরণশক্তি, লেখাপড়া করার সুযোগ পেলে জজ ব‍্যারিস্টার হত।

পর্ব দুই – দেশের বাড়ি

গরমের ছুটিতে বসিরহাটের আড়বালিয়াতে থাকতাম। আমরা বলতাম দেশে যাওয়া। সকালে বড়জেঠুর সঙ্গে দুধ আনতে যেতাম। বড়জেঠু বণিক পাড়ায় বাজার করত। আমরা বলতাম বেনেপাড়া। দুপুরে বড়জেঠু গোল ল‍্যাংড়া গাছে উঠত, লম্বা বাঁশের ডগায় তিনকোণা জাল। জায়গা মতো টান দিতে পারলেই জালের মধ্যে চার পাঁচটা আম চলে আসত। নিচে আমি ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, অনেক উঁচুতে আমের ডাল আর পাতার আড়ালে বড়জেঠু অদৃশ‍্য, খসখস আওয়াজ, পাতার ফাঁকে রোদ্দুর চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মনে একটু একটু ভয় হত, বড়জেঠু কই? তারপরই পাতার আড়াল থেকে ডাক পড়ত, মনা ধরবি। ওপর থেকে নামছে প্রতিবারে পাঁচ ছটা আম। ঝুড়িতে ক‍্যাচ লুফতে পারলে আম ফাটবেনা। মাটিতে পড়ে গেলে দৌড়ে দৌড়ে কুড়িয়ে নিতাম। নাতনি হবার আগে অবধি আমি ছিলাম, বড়জেঠুর মনা। যখন বড় হয়ে গেলাম, আর বড়দিদির কোলে আমাদের পরের প্রজন্মের প্রথম কন‍্যা এল, সেই স্বাতীই  হল পরিবারের নতুন নক্ষত্র, ঐ মিষ্টি তারাকে মনা নামটা ছেড়ে দিয়ে আবার হলাম টুম্পা। আমার বোনের ঝুম্পা নামটা অনেক দিন আগেই ঝুমু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার নাম বদলায়নি। শুধু বড়দাদা টুমু বলে ডাকত।
ভাইবোন প্রায় সবারই বিভিন্ন নাম ছিল। যেমন সেজ তরফে ছোড়দার নাম মৃণাল, কিন্তু সেজজেঠু ডাকত ঝুকু। বড়তরফে সেজদা, নদা ছিল সুজিত আর অভি। কিন্তু আমার বাবা ডাকত ভুটে আর ভোকো। আর সবচেয়ে ছোটো ভাই – তার প্রতি বাড়িতেই আলাদা নাম। বড় তরফে রিন্টু, মেজতরফে ভন্টা, নিজের বাড়িতে বাবু আর ছোটো তরফে বুকু।

চার বাড়ির রঙতামাশা
সবাই চেয়ে দ‍্যাখ।
বাড়ি যখন চারটে,
তবে নাম কি হবে এ্যাক? – কক্ষনো হবেনা।

সেজদা আর নদা আমাকে সুপুরি পাতায় বসিয়ে টেনে নিয়ে যেত। দাওয়ার সামনে ঝাঁকড়া খেজুর গাছ। সকালে তার তলাটা খেজুর বিছিয়ে গদি হয়ে যেত। পাতার গাড়ি থেকে কুড়িয়ে নিতাম একমুঠো, ছোট্ট হাতে যে কটা ধরে।  উঠোন থেকে বেরোনোর মুখে ভাঙা পাঁচিলে একটা দরজা ছিল, সেই জায়গাটা পাতা সমেত কোলে করে দাদারা পার করে দিত। বাজারেও নিয়ে যেত, কোলে করে, কারণ আমায় হাঁটিয়ে নিয়ে গেলে ওদের দেরি হয়ে যাবে। বিশুর মিষ্টির দোকানের সামনে এলেই বায়না করতাম। দাদারা পকেট থেকে নয়া পয়সা গুনে গেঁথে হিসেব কষে তিলকাঠি কিনে দিত। চুষতে চুষতে বাড়ি আসতাম, দাঁতে চিটচিটে তিল আটকে যেত। আর একটা খুব বায়নার জিনিস ছিল, কাঠির মাথায় গোল ফ্রেমে ঘোরা লাল অনচ্ছ কাগজ মোড়া কটকটি বাজনা।

বিকেল হলে ছোড়দিদি আর ছোড়দার সঙ্গে বাড়ির পিছনে জমিতে নামতাম। ছোড়দিদি আমাদের খেজুর পাতার ঘূর্ণি বানিয়ে দিত। কখনও ঢেসকুমড়ো হয়ে ছোড়দিদির পিঠে চড়তাম। তারপর একটা খেজুর ছড়ি হাতে, মরা গাছের গুঁড়িতে ছোড়দিদি শিবাজী হত। রোজ রোজ শিবাজীই বা হত কেন, সেটা অবিশ‍্যি আজও জিজ্ঞেস করা হয়নি। যাই হোক, আমরা হতাম শিবাজীর বিশ্বস্ত অনুচর। কোনো কোনোদিন দলবেঁধে সব ভাইবোন বড়পোলে যেতাম। জলকড়ের মধ্যে দিয়ে আলপথে সাবধানে লাইন করে জলের মাঝখানে চওড়া জায়গা দেখে পশ্চিম মুখে বসে সবাই গল্প করতাম। জলের মধ্যে সূর্য ডুবত। লাল কমলা আকাশের ছায়া পড়ে জলে, তার সঙ্গে মিশে যেত দিনের শেষ রোদ্দুরের সোনালি। কোনদিন আবার আইসক্রিম ওলা আসত মাথায় বাক্স নিয়ে। বরফের মধ্যে কাঠি হিসেবে গাছের নরম ডাল, বা ডাবের খোলার সরু অংশ লাগানো থাকত। ছোড়দিদি শিখিয়ে দিয়েছিল, আইসক্রিমের শেষটা খাবিনা। ঘষে ঘষে ঘামাচিতে লাগাবি। খুব আরাম।

সারাদিন হুটোপাটি করে সন্ধ‍্যেবেলায় ঘুম আসত। দাদারা পড়তে বসত। আমি আর বোন তো ছুটিতে গেছি, লেখাপড়ার বালাই ছিলনা। তবে মাঝে মাঝে সেজজেঠুর ঘরে, অঙ্কের শিবির বসতো। এক মাদুরে যে যার লেভেলে অঙ্ক কষতো। আমার তো খাতা নেই। ছোড়দা ওর খাতার মাঝখান থেকে পাতা ছিঁড়ে আমায় দিল। আর তাতে কী অঙ্ক করছি, নষ্ট করছি কিনা নজর রাখতে লাগল। আমিও যতটুকু জানি, যোগ বিয়োগ বানিয়ে নিয়ে করছি। ছোড়দা বলল, ও! শুধু যোগ বিয়োগ জানিস, আয় তোকে সরল শিখিয়ে দিচ্ছি। সরল আবার কি? যা শেখাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ব‍্যাপারটা বেশ জটিল। ইস্কুলে শেখায়নি, আমি তো কিছুতেই শিখবোনা। শেষে ছোড়দা নিরস্ত হল, কারণ রাত্তিরে খাবার ডাক পড়ে গেল। বড়জ‍্যাঠাইমার বাঁশে ঘেরা রান্নাঘর, মাটির মেঝে নিকোনো। মাটির মধ‍্যে গর্ত করে উনুন। শুকনো কাঠ আর পাতার জ্বালানে রান্না হত। মা বলতো কাঠে রান্না শহরের কুকিং গ‍্যাসে রান্নার মতো, এমন আঁচের তেজ খুব তাড়াতাড়ি রান্না হয়। আর অদ্ভুত নৈপুণ্যে বড়জ‍্যাঠাইমা আঁচ কমা বাড়া নিয়ন্ত্রণ করতো। সবাই আসন পেতে খেতে বসতাম, থালার পাশে মাটিতে নুন নিতাম। যেদিন বড়জ‍্যাঠাইমা আস্ত কাঁচালঙ্কা দিয়ে গরম গরম বড়ি সেদ্ধ করতো, সেদিন ভাতের স্বাদ ডবল হয়ে যেত। আমি এখনও বড়ি সেদ্ধ করি, লোক দিয়ে বড়ি করাতে হয়। তবে স্বাদে বড়জ‍্যাঠাইমার মতো হয়না। আর আড়বেলের ঐ বড়ি ছাড়া দোকানের কেনা বড়ি দিয়ে বড়ি সেদ্ধ করা যায়না। প্রথমে বড়ি হাল্কা ভেজে নিতে হয়। তারপর তেলে অল্প পাঁচফোড়ন আর কয়েকটা কাঁচালঙ্কা দিই। ঐ তেলে হলুদ নুন জল দিয়ে ঝোল ফুটলে, তাতে বড়িগুলো দেওয়া হয়। ঝোলের রং কাঁচা সোনার মতো হবে। বড়ি ফুটে ঝোলে বেশ টোপলা হবে। খুব বেশি ঝোল থাকবেনা, আবার শুকনো ও হবেনা। নুনের স্বাদ দেখে কাঁচা তেল ছড়িয়ে নামাতে হয়। বাজারের কেনা বড়ির সহ‍্যক্ষমতা কম। ফুটলে ভেঙে যায়। ছোটবেলায় শীতকালে আমাদের বাড়িতেই বড়ি হত। সে এক যজ্ঞ। পুরোনো বাড়ির টালির চালে চালকুমড়ো থাকত। সব বাড়ির কোটা হিসেব করে বিউলির ডাল আসত। ডাল বাটতে বড়ি দেওয়ার আগের রাতে লোক আসত। তাকে কেজি প্রতি টাকা দিতে হত। আমাদের ঠাকুরদার আদি বাড়ি ছিল টালির চালের। সেই চালে প্রচুর চালকুমড়ো হত। কিছু চালকুমড়ো রেখে দিয়ে পাকানো হত। বড়ি দেওয়ার আগের দিন সেই শুকনো বুড়ো চালকুমড়োগুলো খুব ভালো করে কোরানো হত। ডালবাটার পরে প্রথম পর্যায়ে ডালটা ফেটানো চলতো বেশ কিছুক্ষণ। রাতে ভালো করে কাপড় ঢাকা দিয়ে ডালবাটা আর চালকুমড়ো কোরা রেখে দেওয়া হত।  খুব ভোরে মেজজেঠুদের ছাদে বাড়ির সব মেয়েরা বড়ি দিতে বসত। কাঁসিতে ভাগ ভাগ করে মন্ড নিয়ে সব মেয়েরা একেবারে মেশিনের মতো হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ডাল ফেটাতো আর একটু একটু করে চালকুমড়ো কোরা মেশানো হত। সবার পাশে একটা জলের বাটি থাকত। ঐ বাটির দুটো কাজ। হাত শুকিয়ে গেলে হাতটা জলে ভিজিয়ে নেওয়া যেত, আর ডাল ফেটাতে ফেটাতে একটুসখানি জলে ফেলে দেখতে হত মন্ডটা ঠিক মতো জলে ভাসছে কিনা। ফেটানো ঠিকমতো হলে ডালের মন্ড চোখে পড়ার মতো সাদা হয়ে যেত। প্রতিবারই আমি যখন চোখ মুখ ধুয়ে ছাদে উঠি, তখন অর্ধেক কাজ শেষ। হাত ধুয়ে শখ করে বড়ি দিতে বসি। বড় বড় ধুতি টানা লম্বা করে পেতে, তার নানাদিকে মেয়েরা বড়ি দিচ্ছে। আমি খুঁজে পেতে সেজজ‍্যাঠাইমার পাশে একটু জায়গা করি। কিন্তু ঐ পিচ্ছিল মন্ড বাগে আনা কি অতই সোজা। যতই চেষ্টা করি, হাতে মাখামাখি হয়ে যায়, আর বড়ি শুয়ে পড়ে। কিছুতেই মাথা ওঠেনা। সেজজ‍্যাঠাইমা চোখ টিপে বলে, এ্যাই টুম্পা, তুই ওদিকটায় বড়ি দে। এদিকে তো ভরে এল। আমি অগত্যা ঠেলেঠুলে আবার ছোড়দিদির পাশে যাই। অবাক হয়ে দেখি বড়জ‍্যাঠাইমা তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুলের মাঝখান দিয়ে পুটুর পুটুর করে একবারে ছোট্ট ছোট্ট বড়ি দিয়ে যাচ্ছে, সব এক মাপে। ছোড়দিদি কিছুক্ষণ চেষ্টা চালায়, যাতে আমি একটু একটু মন্ড নিয়ে বাটির কানায় আকৃতি টা আনতে পারি, তবু ঠিক হয়না। শেষে হাল ছেড়ে বলে, তুই ওখানটায় বড়ি দে। আমার দেওয়া চ‍্যাপ্টা বোতাম বড়িগুলো যার কাজের পাশে থাকবে, তারই বদনাম। ঘুরে ঘুরে যে বড়ি দেখব, তার উপায় নেই, কারণ বড়িতে ছায়া পড়বে। বড়িতে ছায়া দিতে নেই। দুপুরের ঝনঝনে রোদ খাওয়ানোর পর, বড়ি সমেত ধুতি গুলো টাঙিয়ে দেওয়া হত, যাতে উল্টো দিকটাও শুকিয়ে যায়। বিকেলের রোদ ঢলে যাবার আগে ধুতি গুলো নামিয়ে এনে দাওয়ায় কাপড় শুকোনো দড়িতে টাঙিয়ে দেওয়া হত। শিশির লেগে গেলে বড়ি ঘেমে যাবে। রোদ খেয়ে ঝকঝকে সাদা বড়িগুলো যেন জুঁই ফুল। আমি আর বড়জেঠু পুট পুট বড়ি ছাড়িয়ে কৌটোয় পুরতাম। তখন আর কেউ বারণ করতোনা। ঐ কাজটায় শিশুর আঙ্গুল সুবিধেজনক।
সকলে টানা বারান্দায় আসন করে খেতে বসতাম। দাদারা খাওয়া হয়ে গেলে পরিবেশন করত। আমি ঘুরঘুর করতাম, কিন্তু কেউ ডাকতোনা। শেষে একদিন মেজজ‍্যাঠাইমা বলল, দাদা জল চাইছে, জল দে দেখি কেমন পারিস। মনের আনন্দে পেতলের সরু মুখ জলভরা জগ থেকে জল দিলাম মাটির গেলাসে। সে দেওয়ার এমনই বেগ, যে গেলাস থেকে জল ঠিকরে বড়দাদার কোলে পড়ে গেল। মা তো রৈ রৈ করে উঠেছে। আর আমি লজ্জায় মৃত। কিন্তু বড়দাদা বলল, টুমু ঠিকই দিয়েছে। জল প্রথমে গেলাসেই পড়েছিল, এভাবেই হবে। যাই হোক মায়ের শাসনে সে যাত্রা পরিবেশনের ইতি হল। এইভাবে ঠোক্কর খেয়ে খেয়ে ঘরের কাজ কিছু শিখলাম বটে, তবে প্রশ্রয়ের চোটে আজও দড় হতে পারলাম না।
একদিন হল কি, বিকেল বেলা শিবাজীর রাজসভার কাজ সেরে বিকেল গড়িয়ে আমরা বাড়ি ফিরছিলাম। ফেরার পথে লেবু গাছের তলায় কুড়িয়ে পেলাম বেশ বড় সাইজের রসে টাপুটুপু পাতিলেবু। আর আমার আনন্দ দেখে কে। কালবোশেখির ঝড় উঠলে দাদারা আম কুড়োতো। মা আটকে রাখত, আমায় যেতে দিতনা। ঝড়ের পরে গেলেও আমি একটাও পেতাম না। সব দাদারা কুড়িয়ে নিত, আর আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ঘরে ফিরতাম। শেষে নদা নিজের থেকে একটা আম নিয়ে বলল এটা তুই নে। কিন্তু ওভাবে নিলে প্রেস্টিজ থাকেনা। তাই আমি বললাম, তুই মাটিতে ফেল, আমি কুড়োবো। নদা তখন ধুপ করে আমটা মাটিতে ফেলল, আমিও কুড়িয়ে নিয়ে নাচতে নাচতে ঘরে গেলাম। হরির লুঠের বাতাসাও পেতাম না। পরে যোগাড় করতে হত। সবাই হাসত। সেজজেঠুর বাড়ির গৃহপ্রবেশেও আমি খুচরো পয়সা কুড়োতে পারলাম না। সেজজেঠু সেটা দেখে আমার জন্য আলাদা করে ঝুরঝুর করে পয়সা ফেলল, আর আমি ফ্রকের কুঁচি পেতে নয়া পয়সা গুলো ধরে নিলাম। সামনে যারা ছিল সবাই হো হো করে হাসতে লাগল। সেজজেঠু চোখ পাকিয়ে সবার হাসি থামালো। আমি খুব সাবধানে ফ্রকের মধ‍্যে পয়সা ধরে মাকে দিয়ে দিলাম। পয়সার দরকার ছিল না, কুড়োতে পেরেছি – সেটাই আনন্দ। এ হেন আমি সেদিন কারোর সাহায্য ছাড়াই লেবু কুড়িয়ে পেলাম। সে এক রাজ‍্যজয়ের সামিল। কিন্তু যেই মেজজেঠুদের খিড়কি দরজা এল, ছোড়দিদি একটানে আমার হাত থেকে লেবু ছাড়িয়ে, দে ছুট। একলাফে ঘরে ঢুকে গেল। আর সেই অপ্রত্যাশিত আঘাতে খিড়কি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি ফোঁপাতে লাগলাম। মেজজ‍্যাঠাইমা তখন বাঁশে ঘেরা রান্নাঘরে রান্না চাপিয়েছে। বাঁশের ফাঁকে ফাঁকে বেশ দেখা যায়। কতক্ষণ সময় গেল। মনের কালি বাইরে ছড়িয়ে ঝুপসি গাছগুলোতে আঁধার করে এল। এমন সময়ে হাতে অ্যাটাচি নিয়ে ধোপদুরস্ত মেজজেঠু অফিস থেকে ফিরল। আমাকে দেখেই টপ করে কোলে নিয়ে বলল
– কাঁদছ কেন?
এতক্ষণে সহানুভূতির ছোঁয়া পেয়ে আমার কান্নার উচ্ছ্বাস প্রবল হয়ে উঠল। কোনোক্রমে বললাম
– ছোড়দিদি আমার লেবু নিয়ে নিয়েছে।
– লেবু নিয়ে নিয়েছে? ভারি অন‍্যায়। আজই ছোড়দিকে কেটে ফেলব। ক – ই – গো, দা টা দেখি।
রান্নাঘর থেকে আওয়াজ আসে
– কেন? রাতবিরেতে দা নিয়ে কি হবে?
– এই যে, মমকে কাটব। ম-ম!
ফ্রক পরা মম এসে দাঁড়ায় মাটির দাওয়ায়। আর লেবুটা ছুঁড়ে দিয়েই পালিয়ে যায়। লেবু আবার আমার হয়। মেজজেঠু বলে – ছোড়দিতো লেবু দিয়ে দিয়েছে, এবারে আর ওকে কাটার দরকার নেই। আমিও লেবু যুদ্ধে জিতে ঘরে ফিরে যাই। মায়ের হাত ঘুরে বড়জ‍্যাঠাইমার রান্নাঘরে সেটার সদগতি হয়।

গরমকালে কাঠফাটা রোদে পাকা পাকা আম পাড়া হত। জ‍্যাঠাইমারা উঠোনে পা ছড়িয়ে বসে আমের শাঁস ছাড়াত। ছোটো চটের টুকরোর এক প্রান্ত বাঁশে বাঁধা থাকত। চটের তলায় চওড়া কানা উঁচু অ্যালুমিনিয়ামের কাঁসি থাকত। বাঁহাতে চটের অন‍্যপ্রান্ত ধরে ডানহাতে টুসটুসে আম সেই চটে ঘষত বড়জ‍্যাঠাইমা, আমি দেখতাম। রসগুলো চটের নিচে কাঁসিতে জমা হত, আর শোঁয়াগুলো চটে আটকে যেত। বড় বড় চাটাইয়ের আসন ধুয়ে মুছে রোদে শুকিয়ে তেল মাখিয়ে রাখা থাকত। যেমন যেমন কাঁসিতে শাঁস জমত, তেমন তেমন চাটাইয়ে একস্তর করে মাখানো হত। ঐ স্তরটা কিছুটা শুকোলে আবার পরের স্তর চাপানো হত। কাজ শুরু হত সকাল সকাল। উঠোনে সারা দুপুর ঝনঝনে রোদ খাওয়ানোর পরে চাটাইগুলো তুলে ছাদের আলসেতে কাপড় শুকোনোর মতো টাঙিয়ে দেওয়া হত। কারণ দুপুর ঢলে গেলে রোদ উঠোনে আর থাকতোনা, ছাদে উঠতো। আর একটা কারণ হল আমসত্ত্ব পাহারা না দিলে কাক, চড়াই, কুকুর, বিড়াল, ছাগল আর যে যে আছে, সব ঝাঁপিয়ে পড়ে শেষ করবে। আর সারাদিন আমসত্ত্বের জন্য ছাদে বসে থাকাটা খুব চাপের। বিকেলের রোদ পড়ে এলে শুকনো কাপড় তোলার মতো আমসত্ত্ব তোলা হত। তারপর শুধু মিনিট গোনা, কখন চার বাড়ির ভাগে ভাগে আমসত্ত্ব পড়বে। আর ছিঁড়ে ছিঁড়ে মুখে পুরব। এখন দিনকাল বদলেছে।  মেজজ‍্যাঠাইমা বলে দিয়েছে যে আমসত্ত্ব খেতে ইচ্ছে হলে পাকা আমের শাঁস মিক্সার গ্রাইন্ডারে ভালো করে পিষে কড়ায় আঁচে একটু পাক করে নিতে হবে। তাহলে শুকোতে সুবিধে হবে। থালায় তেল মাখিয়ে আমের শাঁসের স্তর মাখানোর নিয়মটা একই। রোদে শুকনো হবে। কিন্তু থালার সমস্যা হল পিছনদিকটায় হাওয়া লাগেনা। তাই তোলার মতো হলে উল্টে নিয়ে আবার শুকোতে হবে। ফ্ল‍্যাটের জানলায় বা বারান্দায় সারাদিন তো রোদ আসেনা। কাজেই বেশ কয়েকদিন লাগবে শুকোতে। মেজজ‍্যাঠাইমা আমের জেলিটা ভীষণ ভালো করে। আমার কাছে পৃথিবীর সব জেলির চেয়ে ভালো ওই জেলি। কাঁচা আম ছাড়িয়ে প্রথমে ভালো করে সেদ্ধ করে নিতে হয়। এবারে সেদ্ধ আম একটু ঠাণ্ডা করে চটকে নিতে হবে। তার পর কড়ায় চিনির রস পাক করে তাতে পরিমাণ মতো আদার রস আর নুন মেশাতে হবে। এই রসে এবার আমের শাঁসটা দিয়ে ফোটাতে হবে। ব‍্যাস তৈরি আমের জেলি।
বড়জ‍্যাঠাইমা খুব ভালো গুড় আমের মোরব্বা করতে পারত আর সেজজ‍্যাঠাইমার মা দারুণ চিনি দিয়ে আমের মোরব্বা করতে পারতেন। মোরব্বার ক্ষেত্রে কাঁচা আমের নির্বাচন যদি ঠিক না হয়, তবে ব‍্যর্থ হতে হবে। আমের আঁটি হয়নি, এতটা কচি আম যেমন চলবেনা, তেমন আঁটি শক্ত হয়ে গেছে এমন আমও নিলে হবেনা। দুইয়ের মাঝামাঝি দরকার, মানে নরম আঁটি যুক্ত আম চাই। এবারে আঁটির কষি বাদ দিয়ে আমগুলোকে লম্বায় চারফালি বা ছয়ফালি করতে হবে। কয়ফালি কাটা হবে, সেটা আমের আকারের ওপর নির্ভর করবে। এবারে বড়জ‍্যাঠাইমা আমগুলো নুনে জরিয়ে রোদে শুকিয়ে নিত। এবারে কড়াতে পরিমাণ মতো ঘি দিয়ে ঐ শুকনো আমগুলো ভাজত। ভাজা হয়ে গেলে গাঢ় চিনি বা গুড়ের রসে আমগুলো ফুটবে। কারোর ইচ্ছে হলে ঐ পাকে আদার রস মেশানো যায়। মোরব্বা তৈরি হলে আঁচ থেকে নামিয়ে এলাচ গুঁড়ো মেশাতে হবে।

আড়বালিয়ার নিজস্ব কিছু স্বতন্ত্র রান্না ছিল। যেমন টুসটুসে লাল পাকা পুঁই মিটুলির চচ্চড়ি। স্বাদেও যেমন, আর ভাতটা রসে পুরো লাল হয়ে যেত বলে, এই তরকারিটা আরও বেশি বেশি ভালোবাসতাম। শীতকালে কাঁচা টমেটো দিয়ে পুকুরের টাটকা মৌরলার বাটি চচ্চড়ি হত। আর সজনে গাছ যখন ফুলে ফুলে ভরে যেত, তখন আমি, বোন, ছোড়দিদি আর ছোড়দা সজনে অভিযানে বেরোতাম। আগান বাগান ঘুরে একটা ঠিক ঠাক সজনে গাছ খুঁজে বের করা ছিল প্রথম কাজ। তারপর ছোড়দা একটা কচা গাছের ডাল যোগাড় করে সজনে গাছের উঁচু ডালগুলোতে নাড়া দিত। ফুল পড়ে গাছের তলা সাদা হয়ে যেত। ছোড়দিদির হাতে সাজি থাকত। আমি আর বোন ছুটে ছুটে সব ফুল কুড়িয়ে সেই সাজিতে জমা করতাম। ঐ টাটকা ফুল, ডুমো আলু আর টমেটো, জিরে ফোড়ন, হলুদ, নুন, মিষ্টি দিয়ে চচ্চড়ি হত। সজনে ফুলে একটু তিতকুটে স্বাদের রেশ আছে। তবে কুঁড়িতে ঐ স্বাদটা বেশি, ফোটা ফুলের স্বাদ বেশি ভালো। আজকাল তো বিদেশে এই সজনে বা মোরিঙ্গাকে উপকারিতার জন্য সুপার ফুড আখ‍্যা দেওয়া হয়। সজনে শাক ফোটানো জল ভেষজ পানীয় হিসেবে খাওয়া যায়। সজনে শাক, ডাঁটা, ফুল সবকিছুই ভীষণ উপকারী। আমার কর্তা কাঁচা সবুজ টমেটো, সজনে ফুল এগুলো খেতে জানতেন না। এখন সবই শিখিয়ে নিয়েছি। আর একটা সব্জি ছিল, ইংরেজিতে যাকে বলে টিপিক্যাল ভিলেজ ফুড – সেটা হল বিচিওলা কাঁচকলা বা ডয়রা কলার তরকারি। ঝোলের কাঁচকলার মতো প্রথমে কলাগুলো লম্বায় চিরে তারপর ছোটো ছোটো লম্বা টুকরো কেটে নিতে হয়। কলার মাঝখানে লম্বা অক্ষ বরাবর বিচিগুলো সাজানো থাকে। লম্বায় চিরলে কলার সেই বিচিওলা অঞ্চলটা বেরিয়ে পড়ে। এবারে সাবধানে বিচিগুলো ছাড়িয়ে নিতে হয়। কোনো চচ্চড়িতে ডয়রা কলা যোগ করলে, স্বাদে একটা আলাদা মাত্রা যোগ হয়। এছাড়া আমাদের বাড়িতে ঘিয়ে জিরে, মরিচ ফোড়ন দিয়ে শুধু ডয়রা কলার সব্জি তরকারি বানানো হতো, বেশ ভালো লাগত খেতে।

লক্ষ্মী পুজো

মা বৃহস্পতিবার করে লক্ষ্মীপুজো করতো বটে, কিন্তু আমাদের বাড়িতে কোনদিন কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো হয়নি। মা বলতো ও পুজো ঘটি বাড়ির নয়, বাঙাল বাড়িতে হয়। আমাদের বছরে চারবার লক্ষ্মীপুজো – ভাদ্রলক্ষ্মী, দীপান্বিতা, পৌষলক্ষ্মী আর চৈত্রলক্ষ্মী। তার মধ্যে আড়বালিয়ায় কালীপুজোয় মানে দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজোটাই খুব জোরদার হতো। মায়ের ঠাকুর ঘর চিলেকোঠায়। সদর থেকে ঠাকুরের আসন পর্যন্ত দু বোন আল্পনা দিতাম – লক্ষ্মীঠাকুরের ডান পা, বাঁ পা, পাশে পাশে ধানের ছড়া। সিঁড়ির ল‍্যান্ডিংয়ে মা দাঁড়িয়ে একটুক্ষণ বিশ্রাম নেবেন, তাই জোড়া পা পাশাপাশি। দুয়ারে বড় করে লতাপাতা আর কল্কা দিয়ে আল্পনা। ওটা হল অভ‍্যর্থনা। ওখানকার মানুষের কথায় অদ্ভুত টান আছে। আমাদের ঐ বাড়িজুড়ে আলপনা দেখে আশপাশের জেঠিমা, কাকিমারা এসে বলতেন, সেই তো, বাড়ি বন্ধ থাকে, মেয়িরা বাড়ি না এলি অয়? বাবার কড়া নির্দেশ ছিল, অতি উৎসাহে আবার আমরা যেন, ঠাকুরের জলচৌকির নীচের আলপনা দিয়ে না বসি। ও আলপনা শুধু বড়জ‍্যাঠাইমা দেবে, আর কেউ নয়। বড়জ‍্যাঠাইমা হাজার কাজের ফাঁকে চালবাটায় কাপড়মোড়া আঙ্গুল চুবিয়ে কি নিঁখুত আলপনা দিতো জলচৌকির তলায়। যেন সরু তুলির টান। কোথাও এতটুকু চওড়ার ফারাক নেই, হাত কাঁপা নেই। প্রথমে মাঝখানে একটা ঘূর্ণি, তারপর ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে কাল্পনিক বৃত্তে পরপর সাজানো শঙ্খ, গদা, পদ্ম, প‍্যাঁচা। পজিশন অনুযায়ী প‍্যাঁচা পড়ত জলচৌকির সামনের দিকে বাঁদিকে। সামনে ডানদিকে শঙ্খ দিয়ে শুরু হত। ঘূর্ণির বৃত্তগুলোর মাঝখানে ফোঁটা ফোঁটা দিয়ে সাজিয়ে দিতো বড়জ‍্যাঠাইমা। ওটা হল চক্র। শঙ্খ, গদা, পদ্ম, প‍্যাঁচার বৃত্তের বাইরের দিকে আর একটা কাল্পনিক বৃত্তে থাকতো আয়না, চিরুনি, বালাজোড়া, দুলজোড়া। আজ যখন আমি নিজের বাড়িতে লক্ষ্মীপুজো করি, তখন মার্বেলের মেঝেতে আল্পনা ভালো ফোটেনা। জলচৌকির নিচে আল্পনা দিতে ভয় ভয় করে। আমার তো দেবার কথা নয়, বাবা বারণ করেছে। বড়জ‍্যাঠাইমা কোথায়? যাই আঁকিনা কেন, বড়জ‍্যাঠাইমার মতো হয়না। ধ‍্যাবড়া হয়ে যায়, আর বারবার মুছে দিই। হাতে ধরে তো শিখিনি, খালি দেখেছি। যখন দেখেছি, তখন বড়রা যে থাকবেনা সেটা মাথায় আসেনি।নিজের ওপরে ভীষণ রাগ হয়। কান্না পেয়ে যায়। মন পোড়ে, সব কান্না দেখানো যায়না।

আড়বালিয়ায় খিচুড়ি, লাবড়া, পাঁচরকম ভাজা, আলু পটলের তরকারি আর টমেটোর চাটনি হতো লক্ষ্মীপুজোর ভোগ হিসেবে। চারবাড়ি মিলে লোক তো কম নয়, তাই হাঁড়িতে আগে গোবিন্দ ভোগ চাল আর ভাজা মুগ ডাল মিশিয়ে ফুটিয়ে রাখা হত। আর আলু, ফুলকপি আগে নুন হলুদ মাখিয়ে ভেজে রাখা হত। এরপর কড়ায় সর্ষের তেলে জিরে, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে, আদাবাটা, টমেটো বাটা, হলুদ, নুন, অল্প মিষ্টি দিয়ে কষে হাঁড়িতে ঢেলে দেওয়া হত। এইসময়েই ভাজা আলু আর ফুলকপিগুলোও হাঁড়িতে দিয়ে ঢাকা দিয়ে দেওয়া হত। জলের পরিমাণটা দেখে নিয়ে ঘি, গরমমশলা আর ভাজা জিরে গুঁড়ো ছড়িয়ে নামিয়ে নেওয়া হত।

লাবড়াতে আমাদের বাড়িতে তেলে পাঁচফোড়ন, কাঁচা লঙ্কা ফোড়ন দেওয়া হত। তারপর ডুমো করে কেটে রাখা আলু, বেগুন, কুমড়ো, রাঙাআলু, কাঁচকলা কড়ায় দেওয়া হতো ভাজার জন্যে। কখনও বা ডয়রা কলা, থোড় কুচিও পড়তো। নুন দিয়ে ঢাকা দিয়ে দিলে সব্জিগুলো মজে যায়। এবারে হলুদ, জিরে, ধনে গুঁড়ো, একটু মিষ্টি আর জলের ছিটে দিয়ে ভাপিয়ে নেওয়া হতো। নামানোর আগে ঘি, আর ভাজা মশলা মিশিয়ে নামানো হতো। বাড়িতেই খাওয়া তো, ভোগের খিচুড়ি হলেও খুব মাখামাখা করা হতনা। একটু পাতলার দিকেই রাখা হত।

ফলপ্রসাদের সঙ্গে সুজি, পায়েস, নারকেল নাড়ু, তিলের নাড়ু, মুড়কি, খই, মুড়ির মোয়া, চিঁড়ের মোয়া আর ক্ষীর দেওয়া হতো। বাবা মোটা লাল রঙের মোমবাতি আনত। সেটা সারারাত জ্বলত। লক্ষ্মীপুজোর  আগে ভূতচতুর্দশীর দিন বাড়ির বাইরে বড় বড় প‍্যাকাটির গোছা দুহাতে দুটো ধরিয়ে দিতো বাবা। তার একদিকে আগুন ধরিয়ে ফুলঝুরির মতো ঘোরাতাম বাবা, আমি আর বোন। বাবা ছড়া কাটতো

আলো পাকাটি দিয়ে
লক্ষ্মীর পোর বিয়ে।
আলক্ষ্মী বিদায় হয়।
ঘরের লক্ষ্মী ঘরে আয়।

আমরাও বাবার শুনে শুনে খুব জোরে জোরে চেঁচিয়ে আলক্ষ্মী  বিদায় করে দিতুম। তারপর বাবা তালপাতার পাখা আর বেতের কুলো নামিয়ে আনত। এগুলো ঠাকুরের জায়গায় তোলা থাকত। তিনজন মিলে সেগুলো নাড়িয়ে নাড়িয়ে ছড়া কেটে বাতাস দিয়ে দিয়ে রাস্তায় গিয়ে অলক্ষ্মীকে তাড়িয়ে দিতুম। কুলোর বাতাস আর পাখার বাতাস দিতে আমাদের দু বোনের এত উৎসাহ আর তিড়িং বিড়িং লাফালাফি দেখে বাবা হা হা করে হাসত। বাবা খুব শান্ত, চুপচাপ মানুষ ছিল। কিন্তু ঐ লক্ষ্মীপুজোর দিন বাবা যেন আমাদের সমবয়সী ছেলেমানুষ হয়ে যেত। এখন বুঝি ঐ সব রীতি বাবার ছোটোবেলার স্মৃতিতে মিশে ছিল। আমাদের সঙ্গে নিয়ে বাবা নিজের ছোটোবেলায় ফিরে যেত।

সকালে ভাত তরকারির সঙ্গে চোদ্দ শাকের ভাজা খাওয়া হত। একটা তিতকুটে স্বাদ থাকতো বলে খেতে চাইতাম না। কিন্তু রাঁধুনি দিদি বলতো খেয়ে নাও, খেতে হয়, নইলে ভূতে ধরবে। খাওয়া একটা আনন্দের ব‍্যাপার। তার সঙ্গে ভূত? কিন্তু মা বলতো এখানে ভূত হল অসুখ। মা খুব ভালো লিখতে পারতো। নিজে ছড়া বানিয়েছিল।

লাউ কলমি
হিঞ্চে গিমে
সর্ষে নটে শাক।
পাট কুমড়ো
মেথি ধনে
রসুন দিয়ে পাক।
সুষনি মুলো
পলতা ঘেঁটু
অসুখ দূরে যাক।

মা বলতো ছড়া বলে, চোদ্দ শাক দলা করে মুখে পুরে দাও। মা বলছে, অগত্যা তাই করতাম।

এইবার শুরু হত ভূতপোড়ানো।
সারা সকাল ধরে দাদারা খড় বিচালি, শুকনো কলাপাতা দিয়ে উঠোনের সামনে ফাঁকা জায়গায় বড় একটা ভূত তৈরি করে রাখত। সেটা ঘিরে লড়াই শুরু হত। দাদারা, দিদিরা, আমি, বোন ভূত বাঁচানোর দলে। আর বাবার নেতৃত্বে জেঠুরা ভূত পোড়ানোর দলে। বাবার হাতে অব‍্যর্থ টিপ। বাবা দূর থেকে রকেটের মতো এমন রংমশাল ছুঁড়ল, ভূতের বুক জ্বলে উঠল। আমাদের অবস্থা দেখে বড়জেঠু দল ভেঙে বিভীষণ হয়ে, একটা বড় পাতা সমেত আমগাছের ডাল পিটিয়ে পিটিয়ে সে আগুন নেভালো। কিছুক্ষণ আরো লড়াই চলার পরে ভুস ভুস করে ভূত পুড়ে গেল। রান্নাঘরে তখন, নাড়ু, মোয়া এসব তৈরি করার জন্য দক্ষ যজ্ঞ চলছে। আমাদের বাড়ির ন

বাবা জানলায় জানলায় চোদ্দ প্রদীপ জ্বালিয়ে দিত। সেদিন মায়েরা খুব ব‍্যস্ত, পরের দিনই কালীপুজোয় লক্ষ্মীপুজো। তাই জলখাবারে মুড়ি খেয়েই পেটপুজো করতে হত।

সরস্বতী পুজো

আড়বালিয়ায় সরস্বতী পুজো ছিল একটা মেগা ইভেন্ট। অথচ আমাদের বাড়িতে পুজো হতনা। আসলে পাড়ার ক্লাবের পুজোটা বাড়ির সামনে হত। বাড়িতে আমরা দশটা ভাইবোন। কাজেই ঐ পুজো অনেকটাই আমাদের পরিবারের নিয়ন্ত্রণে থাকত। ফলকাটা, প্রসাদ উপচার সব মেজজ‍্যাঠাইমার বারান্দায় হত। কাগজের শিকল তৈরি করে আমরা প‍্যান্ডেল সাজাতাম। পিসি আসত রেকর্ড প্লেয়ার নিয়ে। সেই লং প্লেয়িং রেকর্ডে সারা দিন নবদ্বীপ হালদার, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কমিক বাজানো হত। রানীমা ঘটক এয়েছেন, ফটক খুলে দাও, অথবা রসগোল্লায় ইঁদুর, কিংবা নব রামায়ণ। প‍্যান্ডেলের পাশে ছোট্ট তেরপল ঢাকা ঘরে মাদুর পেতে এইসব কীর্তি করা হতো। দাদারা ঠাকুরের হাতের সন্দেশটা খেয়ে নেবার প্ল‍্যান করতো। লক্ষ্মীপুজোর মতোই খিচুড়ি হত। লাবড়াও প্রায় এক, তবে তফাৎটা হচ্ছে, এই লাবড়ায় বাকি সব্জির মানে আলু, বেগুন ও অন‍্যান‍্যর সঙ্গে নটেশাক, গাজর, কড়াইশুঁটি পড়তো।  আর চাটনিটা হতো কুলের চাটনি। কালো সর্ষে আর শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে পাকা পাকা টোপা কুল ভাজা হত। নুন দিয়ে ঢাকা দিয়ে কড়ায় ভাপিয়ে নেওয়া হত। তার পর জল, এক টিপ হলুদ, আর পরিমাণ মতো চিনি দিয়ে ফোটানো হত। এসময়ে কুলগুলো ফাটিয়ে দিলে সেগুলোর মধ্যে মিষ্টি রসটা ভালো করে ঢুকে যায়। ঝোলটা এমন পিচ্ছিল হয় যে গলা দিয়ে বেশ গ্লাইড করে নেমে যায়। এখন অবশ‍্য আমার বাড়িতে সরস্বতী পুজোয়, আমি পালংশাকের লাবড়া করি। লাবড়া রান্নায় কাজুবাটা, আমুল দুধ, ঘি দিলে স্বাদ খোলে। এই টুইস্টটাই হল রোজকার ঘন্ট আর বচ্ছরকার লাবড়ার তফাৎ।

অন্য ঠাকুরের মানে সচরাচর দুর্গা অষ্টমীতে অঞ্জলি দিতে দেরী হলে অনেক সময়ে কিছু খেয়ে নিতাম। মা বলতো আত্মাকে কষ্ট দিতে নেই। কিন্তু আজ অবধি এই একজন ঠাকুরের অঞ্জলি উপোস করেই দিয়েছি। খেয়ে নেবার সাহস হয়নি। বিসর্জনের আগে, মায়েরা আর পাড়ার কাকিমা, জ‍্যেঠিমারা মিলে ঠাকুর বরণ করতো। দুহাতে পানপাতা নিয়ে, ঠাকুরের পায়ের দিক থেকে দুই হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বুকে ঠেকানো, তারপরে কপালে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত প্রদীপ আর ধূপ ঘুরিয়ে আরতি করা, গালে পানপাতা দিয়ে মাকে আদর করা। মুখে জল মিষ্টি আর কপালে সিঁদুর ছুঁয়ে দেওয়া আর সব শেষে ডানহাতে মায়ের গলা জড়িয়ে কানে কানে বলা, আবার এসো – বরণের ঘটা চলতো দীর্ঘক্ষণ। হাঁসকেও একইভাবে বরণ করা হত। তারপর বাড়ির পাশে বটতলার পুকুরে ঠাকুর বিসর্জন হতো, আর খুব কান্না পেয়ে যেত।

সতীমায়ের পুজো

আমার পরিবারের গ্রামের বাড়িতে বছরে একদিন ঘট প্রতিষ্ঠা করে  সতীমায়ের পুজো হত। আবার আমার মামার বাড়িতে সতীমায়ের ঘট বংশপরম্পরায় নিত‍্যপূজা হত। কিন্তু দুই পূজার রীতিনীতি ছিল একদম আলাদা। শুধু মিল বলতে দুই বাড়িতেই দোলযাত্রার দিনটা সতীমায়ের দিন ভেবে ভক্তি ভরে পালন করা হত। বড় হয়ে জানতে পারলাম বৈষ্ণব ধর্মের এক শাখা কর্তাভজা সম্প্রদায়ের সাধক আউলচাঁদের কথা। তাঁর স্ত্রী হলেন সাধিকা সতীমা। নদীয়ার ঘোষপাড়ায় এই সম্প্রদায়ের মূল আশ্রম। শুনেছি অন্য অনেক বিষয়ে খামখেয়ালি হলেও আমার দাদু বিকাশচন্দ্র বোস গৃহদেবতার পুজো করতেন নিয়মিত ও খুব নিষ্ঠা ভরে। মাতামহের বংশের সেই ঠাকুর এখনও আমার মামা সুজিতচন্দ্রের পুত্র মনোজিতের কাছেই আছে। একটি শ্বেত পাথরের শিবলিঙ্গ আছে, আজকাল যেমন দেখা যায় তেমন নয়। বেশ বড়, ডিম্বাকৃতি। তেপায়া স্ট‍্যান্ডের ওপরে থাকে। ওটি যে শ্বেত পাথরের তা আমরা জানতাম না। কারণ দেবতার রং ছিল গাঢ় বেগুনি বর্ণের। মামার বিয়ের পরে, মামীমা সরস্বতী ঐ শিবলিঙ্গ ধুয়ে মাজতে গিয়ে অবাক হয়ে যান। পরে দোকানে দিয়ে মাজিয়ে ভিতরের শ্বেত পাথর বেরিয়ে পড়ে। একশো বা হতে পারে দুশো বছরের রক্তচন্দনের প্রলেপ পড়ে শিবঠাকুর অমন রূপ নিয়েছিলেন। এটি আবিষ্কার হতে মামীমা শখ করে ঐ শিবলিঙ্গের গায়ে রুপোর চোখ নাক বসিয়ে দেন। এখনো তেমনি আছে। এগুলো ১৯৭৭ এর ঘটনা। শিবলিঙ্গের পাশেই আছে সতীমার ঘট। প্রায় দশ ইঞ্চি উঁচু, ভারি একটি পেতলের ঘট। ঘটটি ছোটবেলা থেকে আমাকে খুব আকর্ষণ করতো। কারণ ঐ ঘট বংশের অদ্ভুত নিয়মের জন্য আমি কোনদিন স্পর্শ করতে পারিনি। পুরুষ সদস্য ছাড়া নারী সদস্যদের ঐ ঘট ছোঁবার অধিকার নেই। তাছাড়া ঐ ঘটের জল পুরো ফেলে কোনোদিন জলশূন‍্য করতে নেই। আর ঘট সবসময়ে সিঁদুর লেপে রাখতে হয়। তাই পেতলের ঘট বলে চেনা যায়না। একটা কালো পাথরের বাটি দিয়ে সেই ঘটের জল চাপা দেওয়া থাকে। দোলের দিন বড় করে সতীমার ঘট পুজো হয়। দাদু ঐ দিন নিজে হাতে দধিকর্মা মাখতেন। মামা সুজিতচন্দ্র যতদিন বেঁচে ছিলেন, মানে ২০১৮ পর্যন্ত এই বিশেষ পুজো করেছেন। মামার হাতের দধিকর্মা খাব বলে আমরা দোলের দিন হাপিত‍্যেস করে বসে থাকতাম, কখন মামা আসবে। বিকাশ চন্দ্রের বড় মেয়ে কৃষ্ণা (আমার মা) ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন আমার বাবা আড়বালিয়ার বাসিন্দা সমীর কুমার মন্ডলকে।  আড়বালিয়া আর লাগোয়া ধান‍্যকুড়িয়া হল বসিরহাটের ট‍্যুরিস্ট প্লেস – অসংখ্য জমিদার বাড়ি আর প্রাসাদ দিয়ে সাজানো। এ অঞ্চলের ইতিহাস ও অতি প্রাচীন এবং সমৃদ্ধ। বসু, নাগ চৌধুরী, সাউ, গাইন এইসব বড় বড় জমিদারের ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে আছে স্বাধীনতা সংগ্রাম। বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায়ের জন্ম ও আড়বালিয়াতে। সে যাই হোক, আমার ঠাকুর্দা জমিদার ছিলেন না। তিনি ছিলেন নাগচৌধুরীদের পারিবারিক চিকিৎসক। আমার বাবা কলকাতা বন্দরের হেড অফিসে ক্লার্ক ছিলেন এবং হোমিওপ্যাথি পাশ করেছিলেন। অবসরের পরে পাইকপাড়ায় চুটিয়ে প্র‍্যাকটিস করতেন। অনেক সময়ে এমন হতো রোগীরা ঐ সামান্য ভিজিট দিতে না পারলে ডাক্তার বাবু নিজের খরচে চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন। ২০২১ এর ২ রা ফেব্রুয়ারি বাবা মারা যাবার পরে চল্লিশ বছরের ভাড়ার চেম্বার টি যখন আমার স্বামী ছাড়তে গেলেন, তখন লকডাউনের ভিতরেও এলাকার লোক ভিড় করে এসেছিল। বাড়িওলা আর এলাকাবাসীর কান্না দেখে আমার স্বামী ও চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। যাক গে, কথা হচ্ছিল সতীমার ঘট নিয়ে। বলছি আমাদের আড়বেলের বাড়িতে কিন্তু  সতীমার পুজো এমন নয় মোটেই। নদীয়ার ঘোষপাড়ায় সতীমার যে মন্দির ও আশ্রম আছে, সেখানেও দোলের দিন উৎসব হয়। বাড়িতে একটা ছবি আছে সতীমার। ঘোষপাড়া থেকে কেনা। বহুদিন আগের, ভিতরে পোকায় কেটেছে। আমাদের গ্রামের বাড়িতে বছরের যেকোনো একদিন সকলের সুবিধা মতো সতীমার পুজো হতো। আমরা বলি সতীমার কাজ। বড়জেঠু, মেজজেঠু, সেজজেঠু আর আমার বাবা, চারভাই আর আমার পিসি এই পাঁচটি পরিবার এক হতাম। ঠাকুমার বাপের বাড়ি ও বিরাট যৌথ পরিবার। সেখান থেকে কাকা পিসিরা আসতেন। কিন্তু সেখানে পুরোহিত ডেকে পুজো হতনা। মেজ জ‍্যাঠাইমা ঘট প্রতিষ্ঠা করতেন। বড় জ‍্যাঠাইমা আল্পনা দিতেন। মা আর সেজ জ‍্যাঠাইমা হাতে হাতে এগিয়ে দিতেন। আমরা চার বোন ফুল তুলতাম, মালা গাঁথতাম, চন্দন পাটায় চন্দন বাটতাম, সতীমার ছবি, আর ঠাকুমা, ঠাকুরদার ছবিতে চন্দন পরিয়ে মালা দিয়ে সাজাতাম। ঝুরি নামা তেঁতুল গাছের তলায় বেদী ছিল। বড় জ‍্যাঠাইমার আলমারিতে বোনা আসন থাকত। সেগুলো পাতা হত। এবারে দাদাদের যোগাড় করা ইট পিছনে দিয়ে আসনে ছবি বসানো হত। পুরো বেদী আমরা ফুল দিয়ে সাজাতাম। পুরোহিত ডাকা, যাগযজ্ঞ, অংবং মন্ত্রোচ্চারণ কিছুই হতোনা। সতীমাকে সামনে রেখে এ যেন পরিবারের এক মিলনোৎসব, সেই সঙ্গে পূর্বপুরুষকে শ্রদ্ধাপূর্ণ স্মরণ।

সেদিন বাড়িতে ফলকাটা আর রান্নার বিরাট পর্ব চলত। সারা সকাল বিকেল চলত ফল কাটা আর কুটনো কোটা। বড় বড় কাঁসার বগি থালায় পাঁচ রকম বা সাত রকম ফল কাটা হত। শসা, কলা, আখ, বাতাবি লেবু, খেজুর, আম, লিচু – যখন যেমন পাওয়া যেত। বাড়িতে কোটা লাল চিঁড়ে আর আখের গুড় মিশিয়ে একরকম শুকনো শুকনো মিষ্টি চিঁড়ে বানানো হত। আর দুরকমের নারকেল নাড়ু হত। গুড়ের আর চিনির দুরকম নাড়ুই হত বেশ বড় বড়। কিন্তু গুড়ের বা চিনির পাক চিটচিটে হতনা, বেশ শুকনো। দাঁতে আটকাতোনা। বসিরহাটের বিখ্যাত মাখা সন্দেশ দেওয়া হত। আর অতিথি অভ‍্যাগতরা যদি কোনো মিষ্টি নিয়ে আসতেন, তো সেগুলোও ভোগে সাজিয়ে দেওয়া হত। মটর, পাঁচ কড়াই, গোটা মুগ ভেজানো থাকত। সন্ধ‍্যের মুখে বড় বড় কাঁসার বাসনে এই শীতল ভোগ সতীমায়ের থানে নিবেদন করা হত। সঙ্গে চারটে কাঁসার গেলাসে জল দেওয়া হত। মা আর সেজজ‍্যাঠাইমা মাথায় ঘোমটা দিয়ে, ডানহাতের পাতা কাঁধের কাছে তুলে বড় পাথরের থালার তলায় দিয়ে, আর বাঁহাতে থালাটাকে ধরে ঠাকুরের কাছে নিয়ে আসছে, এই ছবিটা চোখে ভাসে। এই পুরো নিবেদনটিকে বলা হত জলসেবা।

কর্তারা বাজার করতেন, বাড়ি বাড়ি নিমন্ত্রণ করতেন। পিসি সবার বড়, সব ফল প্রসাদ আর ভোগের বিলি ব‍্যবস্থার  তদারকি করতেন। তাঁর নজর এড়িয়ে কুটো নড়ার উপায় থাকতোনা। দাদারা বড়দের কিছু দরকার হলে দোকান ছুটতো। আর আমাদের টুকিটাকি প্রয়োজনে আগানে বাগানে দৌড়াদৌড়ি করতো। সন্ধ‍্যে হলে হ‍্যাজাক জ্বালতো। প্রসাদ খাবার কলাপাতা কাটত মাপ করে। ফল খাওয়ার জন্য ছোটোছোটো। আর ভাত খাওয়ার জন্য বড়ো। সবার কাজের আলাদা ভাগ ছিল। উঠোনে সতরঞ্চি পাতা হত। ঠাকুরদার পুরোনো বাড়ির লম্বা টানা দাওয়ায় আমরা অতিথিদের নিয়ে মাদুর পেতে বসতাম। সন্ধ‍্যের মুখে কীর্তনের দল আসতো হারমোনিয়াম নিয়ে। মা যখন বৌ হয়ে এবাড়িতে আসে, তখন শুনেছি সরাসরি ঘোষপাড়া থেকেই প্রায় পঞ্চাশ জন গায়ক এবং বাজনদার আসতেন। একদল শেষ করে যখন চায়ের বিরতি নিতেন, তখন অন‍্যদল গেয়ে যেত। গান থামতনা। সঙ্গে তবলা আর খঞ্জনিও থাকতো। প্রায় সারারাত সতীমার কীর্তন গান হতো। একদিকে বারবাড়িতে কীর্তন চলত, আর অন্দরে জোরকদমে চলত অন্নভোগ তৈরি। এই ভোগ কিন্তু নিরামিষ ছিলনা, আমিষ। শুক্তো প্রথম পাতে, তারপর মুড়োর ডাল, পাঁচ রকম ভাজা, ছ‍্যাঁচড়া, আলুপটল বা আলু ফুলকপির তরকারি, পোনা মাছের কালিয়া, চাটনি, মিষ্টি, দই। এই অন্ন ভোগ নিবেদনের জন্য বড় বড় পাথরের থালা ছিল। সেগুলোকে বলা হত ভোগের পাথর। রান্না শেষ হলে রাতের বেলা মা জ‍্যাঠাইমারা সেই ভারি ভারি থালা বয়ে এনে, সতীমায়ের থানে এনে রাখতো। এই প্রক্রিয়ার নাম ছিল অন্নসেবা। একটা পাত্রে ভোগের সবরকম তরকারি একটু একটু নিয়ে তার সঙ্গে অন্ন মেখে রাখা হতো, আর পরিবেশনের সময়ে সকলের হাতে একহাতা করে দেওয়া হত, পাতে নয়। একে বলা হত ভোগের “পারস”।

মায়ের কাছে জেনেছি যে ঘন্ট আর ছ‍্যাঁচড়ার মধ‍্যে তফাৎ হল, দুটোই শাক আর সব্জির উপকরণ দিয়ে রান্না হয়, কিন্তু ঘন্ট নিরামিষ, ছ‍্যাঁচড়া আমিষ। এতে মাছের মাথা আর মাছের তেল পড়ে। সব্জি সব লম্বা করে কাটা হয়। মাছের মাথা আর তেল নুন হলুদ মাখিয়ে রাখা হয়। একটু বেশি তেল লাগে। প্রথমে সর্ষের তেলে মাছের মাথাটা খুব কড়া করে ভাজা হত। কড়কড়ে হয়ে গেলে খুন্তি দিয়ে মাথাটা টুকরো করে ভেঙে দেওয়া হত। এবারে ঐ তেলেই শাক বাদে সব সব্জি ভেজে তুলে নেওয়া হত। এবার কড়ায় আবার নতুন করে তেল দিয়ে, তাতে চিনি গলিয়ে ক‍্যারামেল করে নেওয়া হয়। চিটচিটে হবার আগে, চিনি তরল হলেই,  পাঁচফোড়ন, শুকনো লঙ্কা, রসুন কুচি ফোড়ন দিয়ে, পেঁয়াজ কুচো লাল করে ভেজে নেওয়া হত। এবারে কড়ায় নুন হলুদ মাখানো মাছের তেল দিয়ে খুব ভালো ভাবে ভাজতে হব। মাছের তেল গলতে শুরু গেলে, তাতে রসুন বাটা, হলুদবাটা, জিরেবাটা, ধনেবাটা আর শুকনো লঙ্কা বাটা দিয়ে কষা হত। একটু একটু জলের ছিটে দিয়ে কষতে হবে, যাতে পুড়ে না যায়, বা কড়ায় লেগে না যায়। এখন অবশ্য এসব মশলা বাটার ব‍্যাপার নেই, সব গুঁড়ো ব‍্যবহার করি। এই সময়ে কেটে রাখা শাক মিশিয়ে দিতে হবে। পরিমাণ মতো নুন মিশিয়ে, নাড়াচাড়া করে, কয়েকটা আস্ত কাঁচালঙ্কা দিয়ে আঁচ কমিয়ে ঢাকা দিয়ে দিতে হবে। মাঝে মাঝে নেড়ে দিতে হবে। শাক সব্জি সব সিদ্ধ হয়ে গিয়ে তেল ছেড়ে দিলে ছ‍্যাঁচড়া তৈরি। আস্ত কাঁচালঙ্কায় ঝাল হবেনা, কিন্তু একসঙ্গে ভাপানোর ফলে খুব সুন্দর কাঁচালঙ্কার একটা সুবাস হয়। আমি এখন মাঝে মাঝে ফোড়ন দেওয়ার সময়ে শুকনো লঙ্কা না দিয়ে, তিন চারটে কাঁচালঙ্কা শিলে ছেঁচে  তেলে দিয়ে ভাজি। ঐ সুবাসটা আমার ভালো লাগে। আসলে মা শুকনো লঙ্কা খুব একটা পছন্দ করতনা তো, সেই প্রভাবে কাঁচালঙ্কার প্রতি আমার একটু টান আছে। ছ‍্যাঁচড়ায় সব্জির তালিকাতো বলিনি এখনও। আলু, বেগুন এই দুটো দিতেই হবে। আর বাকি সব্জি যে ঋতুতে যেমন পাওয়া যায়, কুমড়ো, ঝিঙে, বরবটি, বা শিম, মুলো সবই দেওয়া যায়। শাক শীতকাল হলে পালং, নতুবা নটে। 

আমরা রাত বাড়লেই ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যেতাম। গভীর রাতে বাবা তুলে নিয়ে যেত কীর্তনের ভূমে প্রণাম করার জন্য। ততক্ষণে কীর্তন শেষ হয়েছে। এরপর বিজয়ার মতো বাড়ির সব বড়োকে প্রণাম করতে হত। তারপর মেজজেঠুদের পাকা ছাদে আসন পেতে সকলের খাবার জায়গা করা হত। আমাদের পরে মায়েদের খেয়ে উঠতে ভোর হয়ে যেত।

বড় হয়ে আমি মেজজ‍্যাঠাইমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে, আমাদের বাড়িতে এই সতীমায়ের পুজোর রীতি কিভাবে এল? উত্তরে যা শুনলাম, তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। মেজজ‍্যাঠাইমা বলেছিল যে, আমার ঠাকুরদার মা সতীমায়ের বংশের মেয়ে ছিলেন। তিনি সাধিকার জীবন যাপন করতেন। তিনিই এই বাড়িতে সতীমায়ের বেদী প্রতিষ্ঠা করেন। আমার ঠাকুমার বিয়ে হয়েছিল ১৯০৬ এ পাঁচ বছর বয়সে। ঠাকুরদা তখন বারো। তার মানে ঠাকুরদার মায়ের এই বেদী প্রতিষ্ঠার সময়টা উনিশ শতকের শেষে বা বিশ শতকের শুরুতে ধরে নেওয়া যায়। তিনি দীর্ঘজীবী ছিলেন। ১৯৫৬য় কিশোরী বেলায় মেজজ‍্যাঠাইমা যখন এবাড়িতে বৌ হয়ে আসে, তখন তাঁকে দেখেছিল। তিনি নানারকম গাছ গাছড়ার ওষধি বিদ‍্যা জানতেন। সেসময়ে বয়সের কারণে গ্রামের লোক তাঁকে ভালোবেসে বুড়ো দি বলে ডাকত। কিন্তু তাঁর আসল নাম কি, সেটা মেজজ‍্যাঠাইমা জানেনা। ঐ বুড়োদির জন্য, গ্রামের লোক যখন আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যেত, তখন মন্দিরের মতো কপালে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করত। বুড়োদির ঐতিহ্য অনুসারে আমার ঠাকুমা হেমনলিনী সতীমায়ের পুজো করেছেন, আবার হেমনলিনীর ধারা বজায় রাখার জন্য মা জ‍্যাঠাইমারা করেছে। এটা এই পরিবারের শাশুড়ি বৌমাদের পরম্পরা। এখানে বাড়ির পুরুষদের সরাসরি সম্পর্ক নেই। আমি আশ্চর্য হয়ে আমার প্রপিতামহী বুড়োদিকে মনে মনে প্রণাম জানাই। তবে একটা খটকা পরিষ্কার হলনা। সাধক আউলচাঁদের ধারা যদি বৈষ্ণব ধারা হয়, অন্তত অন্তর্জালে তেমন লেখা আছে, তবে আমাদের সতীমা মাছে ভাতে ভোগ গ্রহণ করেন কি করে? তবে আয়োজন, খরচখরচা ছাড়া, পুজোর সব কর্তৃত্বই কেন মেয়েদের হাতে ছিল এবং ছেলেরা কেন ছিল মেয়েদের হুকুম বরদার সেটা একেবারে জলের মতো পরিষ্কার।

নিজের বাড়িতে এমন দেখতাম, অথচ মামার বাড়িতে সতীমার ঘটে কেন মেয়েরা হাত দিতে পারেনা, পুজো করতে পারেনা, আর তাছাড়া পুজোর ঘট অতো বড়ই বা কেন – এসব প্রশ্ন মনে উঠতো। কেন ওটা খুব একটা নাড়ানো হয়না, জল ফেলা হয়না, চকচকে করে মেজে স্বস্তিকা, আর সিঁদুর পুতুল আঁকা হয়না, সেটাও আশ্চর্য লাগত। মা বা দুই মামা এসব বিষয়ে কিছুই আমাকে বলে যাননি। আজ এতদিন পরে, যখন তিনজনেই নেই, জানতে পারলাম সেই ঘটের রহস্য, বাবলিদির কাছে। বাবলি দি হল আমার দাদু বিকাশ চন্দ্রের বড়দা সতীশ চন্দ্র বোসের নাতনি। শুনলাম, মামার বাড়ির সতীমার ঘট আর আমাদের বাড়ির সতীমা সম্পূর্ণ আলাদা। দুই ক্ষেত্রেই দোলের দিনে উৎসব হয় বটে, কিন্তু সেটা কাকতালীয়। মানে ঠিক কাকতালীয় নয়, আসলে কৃষ্ণ সম্পর্কিত। বুঝিয়ে বলতে হবে, এক কথায় হবেনা। আমার মায়ের ঠাকুমা লেখিকা, স্বাধীনতা সংগ্রামী কুমুদিনী বসুর শাশুড়ি ছিলেন শোভাবাজারের রাধাকান্ত দেবের সেজ মেয়ে । শ্বশুর হলেন মহেশচন্দ্র বসু। কিন্তু এই মহেশচন্দ্রের  পরিচয় এখনও খোলসা হয়নি। কারণ বংশলতিকা হারিয়ে গেছে। তবে সেটা ছোটবেলায় আমি দেখেছি। মহেশচন্দ্র রামরাম বসুর প্রপৌত্র।  বাবলিদির কাছে সতীমায়ের ঘটের রহস্য শুনে আমি কেঁপে উঠলাম। তবে বাবলিদির কাহিনী পারিবারিক শ্রুতি নির্ভর। এর কোনো প্রামাণ্য নথি বা তথ্য প্রমাণ নেই। মহেশচন্দ্ররা তিন ভাই। কাজের সূত্রে রাধাকান্ত দেবের সঙ্গে পরিচয় ছিল তাঁর এবং কর্মকুশলতার জন্য তিনি রাধাকান্তের স্নেহভাজন ছিলেন। মহেশচন্দ্রের অজান্তে তাঁর মা পিতার চিতায় সহমৃতা হন। মহেশচন্দ্র একথা জানতে পেরে রাগে অভিমানে সতীর মৃত্যুর ঘট মাথায় নিয়ে গৃহত্যাগ করেন। বৃদ্ধ রাধাকান্ত মহেশচন্দ্রকে ডেকে নেন, আশ্রয় দেন এবং নিজের সেজমেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে ঘরজামাই করে নেন। কুমুদিনীকে ধরে পরবর্তী চতুর্থ পুরুষ আমি এবং মনোজিত। কুমুদিনীর শাশুড়ির মানে আমাকে ধরে ছয় পুরুষ আগের এক বধূর সতী হওয়ার বা জীবন্ত পুড়ে মৃত্যুর ঘটের জল আর সিঁদুর আমার মামার বাড়িতে পুজো হতো। দোলের দিন পুজো হওয়ার কারণ একটু অন্য। মামার বাড়ির গৃহদেবতা হলেন শ্রী রাধারমণ জীউ। (আশ্চর্য এখানেও কৃষ্ণ)।  যদিও গৃহদেবতা  এখন আর বোসবাড়ির কাছে নেই। কুমুদিনী স্বামী মারা যাবার পর, শোভাবাজার রাজবাড়ি ত‍্যাগ করেন। নাবালক পুত্রদের নিয়ে তৃতীয় পুত্র সুরেন্দ্র নাথের আশ্রয়ে চলে যান। এই সুরেন্দ্রনাথ মানে আমার সেজদাদুকে বাল‍্যকালে দত্তক নিয়েছিলেন হাটখোলার দত্ত বাড়ির দয়াল দত্ত। কুমুদিনীর দাদু ঋষি রাজনারায়ণ বসু এবং দিদা আবার হাটখোলার দত্ত বাড়ির মেয়ে। হয়তো দয়াল দত্ত সম্পর্কে কুমুদিনীর মামা অথবা ভাই – সেটা এখনও নিশ্চিত জানিনা। সুরেন্দ্রনাথের স্ত্রী ছিলেন আন্দুল রাজবাড়ির মেয়ে। তিরিশ বছর বয়সে কোনো কারণে এই আন্দুল রাজবাড়িতেই সুরেন্দ্রের অপঘাত মৃত্যু হয়।  নানা পারিবারিক দুর্যোগে গৃহদেবতার নিত‍্যসেবায় বিঘ্ন উপস্থিত হওয়ায়, আমার দাদু কিশোর বয়সে সমস্ত অলঙ্কার সমেত রাধারমণ জীউয়ের বিগ্রহ দান করে দিতে বাধ্য হন।  তথাপি সেই রাধারমণকে মনে রেখে দোলের দিন ছয় পুরুষ আগের মাকে স্মরণ করা হয়। এবং বিসর্জনের দধিকর্মা মাখা হয়।

মনে অনেক কথা ভিড় করে আসে। কুমুদিনী বসুর শতবর্ষ পরের নারী আমি, খুঁজে বেড়াচ্ছি পরিবারের ইতিহাস, তার রীতি নীতি। আমার নিজের বিবাহ হয়েছে পূর্ব মেদিনীপুরের দাসমহাপাত্র ওরফে বক্সি পরিবারে। এবংশের পূর্ব পুরুষ কৃষ্ণনগরের রাজার দেওয়ান বা বক্সি ছিলেন। আমাদের বাড়িতে শ্রী গোপীনাথ জীউ আর রাধারানীর মন্দির আছে। মন্দিরের রান্নাঘরে নিত্য ভোগ বিতরণ আজও হয়। আমি যে ইতিহাস সন্ধান করছি তা কি নিয়তির পূর্ব নির্ধারিত? জানিনা মাতুল বংশের রাধারমণ কার কাছে পূজিত হন। রাধারমণকে হারিয়েছি বলেই কি, গোপীনাথ হয়ে তিনি আমার কাছে ফিরে এলেন? আর পৃথিবীতে এত জায়গা থাকতে, আমি চাকরিটাও এমন কলেজে পেলাম, যেটা আন্দুল রাজবাড়ির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। যাক সে কথা সতীমার ঘটে ফিরে আসি।
প্রাণকৃষ্ণ দত্তের কলিকাতার ইতিবৃত্ত বইতে পড়লাম কলকাতার বহু প্রাচীন পরিবারে এখনও সতীর সিঁদুর পুজো করা হয়। তার অর্থ আমার মামার বাড়ির পরিবার বইয়ে বর্ণিত তেমনই একটি পরিবার। জেনে ইস্তক আমার শরীরের শিরা উপশিরা কাঁপছে। চোখে ভাসছে সেই দৃশ্য, বইতে যেমন পড়েছি, সালঙ্কৃতা, মাথায় সিঁদুর, পায়ে আলতা, আলুলায়িত কেশ, খালি পা, বধূকে পথ দিয়ে ধরে নিয়ে চলেছে নাপিতানীরা। সিদ্ধি জাতীয় কিছু খাইয়ে চেতনা কিছুটা বিস্রস্ত করে দেওয়া হয়েছে। পথে মাঝে মাঝেই লোকেরা এসে সতীর সিঁদুর নিয়ে যাচ্ছে। চিতার ওপরে মৃত স্বামীর মাথা কোলে নিয়ে চিতায় বসেছেন বধূ, ডালপালা দিয়ে ঢাকা দেওয়া হল। অগ্নি সংযোগ করা হল, লোক ভেঙে পড়েছে, চারিদিকে ঢাক ঢোল বাজছে, জয়ধ্বনি উঠেছে – লেলিহান আগুনের শিখায় জ্বলে যাচ্ছে বাংলার উজ্জ্বল ইতিহাস, চৈতন্যের ভক্তিবাদ, সন্ন‍্যাসীদের শিবজ্ঞানে জীবসেবা – কান মাথা ফেটে যাচ্ছে আমার। ছি ছি ছি। আর আমি ভাবতে পারছিনা। ছয় প্রজন্ম আগে, কে মা তুমি প্রাণ দিয়েছ? তোমার মৃত্যু নয়, জীবন জানতে চাই আমি। তুমি কোন বাড়ির মেয়ে, কি তোমার নাম? কোনো সূত্র তো নেই। শুধু শুনেছি, তোমার পুত্র মহেশচন্দ্র মামার বাড়ির সূত্রে কৃষ্ণনগরের রাজার ভূসম্পত্তি পেয়েছিলেন। তবে তোমার পরিচয়ের সূত্র কি কৃষ্ণনগরে লুকিয়ে আছে? মামাতো ভাই বেসরকারি চাকুরে। কাজের দিন, ছুটির দিন আলাদা করতে পারেনা। দাদুর পরে, মামা আমৃত্যু দোলের দিন দধিকর্মা মাখতেন। কিন্তু মামাতো ভাইয়ের পক্ষে সেটা সম্ভব হচ্ছেনা, সে বিয়ে থাও করেনি। আমি ভাইকে বলে দিয়েছি, দধিকর্মা মেখে সতীর পরের চারপ্রজন্ম – মহেশচন্দ্র, শরৎচন্দ্র – বিকাশচন্দ্র – সুজিৎচন্দ্র যদি প্রায়শ্চিত্ত করে থাকেন, তবে আমরাও করব। তুই তোর বাড়িতে ফুল দিয়ে সাজিয়ে দিস। আমি আমার বাড়িতে দধিকর্মা মাখব। নিয়ম বজায় থাকবে, চিন্তা করিসনা।  সরু চিঁড়ে, মিষ্টি দই, রাবড়ি, বাতাসা, গুঁজিয়া, পেঁড়া আর আঙুর – যেভাবে মাতুল বংশের রীতি, সেটাই বজায় রাখব আমি, নড়চড় করবনা।