পাকশালার গুরু… (পর্ব আট)
আমাদের সূর্য মেরুন
দিন চলে যায় নিজের মতো। কন্যারা বড়ো হচ্ছে। দুই কন্যার আবদারে এক বিকেলে চিকেন আনা হলো বাড়িতে। খাসির মাংস তাদের ফেভারিট তালিকায় পড়েনা। আজ থেকে চল্লিশ বছর আগেও বক্সি বাড়ির রান্নাঘরে মাংস ছিল নিষিদ্ধ বস্তু। আমার শ্বশুর মশাই বাড়িতে মাংস রান্না শুরু করেন। কিন্তু দাদাশ্বশুরমশাই তারিণীপ্রসাদের আচার বিচারের জন্য অন্দরমহলে মাংস ঢুকতোনা। বাইরে রান্না হতো। কর্তা গল্প করেন,
‘রবিবার সাতমাইলের হাট থেকে বাবা লুকিয়ে বিকেলে খাসির মাংস আনতো, কিন্তু কলাপাতায় মুড়ে মাংসটা জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা হতো। বিকেলে দুধ খই খেয়ে নিলে, দাদামশাই আর হেঁশেলের দিকে আসতেন না। তখন রাতে ভিটের মধ্যেই গাছের আড়ালে বাবা মা হারিকেন জ্বালিয়ে মাংস রান্না করতো। আমি আর তপু দুপুর থেকে উত্তেজনায় ফুটতাম। কথাবার্তায় দাদামশাই যাতে কিছু বুঝতে না পারেন, তাই দু ভাই মিলে মাংসের সাংকেতিক নাম দিয়েছিলাম মাং। কেবলই খোঁজ নিতাম, “মা, বাবা মাং আনলো?” রাত্তির বেলা গরম গরম মাংস আর আলুর ঝোল দিয়ে ভাত – মনে হতো ওটাই স্বর্গ। কিন্তু তপুটা ছোটো তো, উত্তেজনায় ঘুমিয়ে পড়তো। মা ওর জন্য হাড়ওলা টুকরো বেছে বাটি করে রেখে দিতো। রাত দেড়টা, দুটো যখন খিদের চোটে ওর ঘুম ভেঙে যেতো, তখন একা একা উঠে কুড়ুর মুড়ুর করে হাড় চিবোতো। খুব ছোটো থেকেই ওর দুর্জয় সাহস। অন্ধকার বা কোনো কিছুতে ভয় পায়না। দাদামশাই মারা যাবার পর রান্নাঘরেই মাংস রান্না শুরু হলো, বাধা নিষেধ রইলোনা।’
যা হোক, এসব যেন গত জন্মের কাহিনী। বর্তমানে, সন্ধেবেলায় কন্যা এসে আগ্রহ ভরে জিজ্ঞেস করে,
– আজ চিকেনের কি প্রিপারেশন হবে মা?
– চিকেন হরিয়ালি করবো।
– সেটা কিভাবে হয়?
– চিকেনটা কিউব করে কেটে নিতে হবে। বোনলেস বা উইথ বোন যে কোনোটাই চলবে। আমি এখন হাড় সমেত করছি।
– হরিয়ালি হবে কি করে?
– চিকেনে রসুনটা বেশি লাগে আদা কম। খাসির মাংসে ঠিক উল্টো। এটা তিনকেজি চিকেন রান্না হচ্ছে। আমি দুমুঠো রসুনের কোয়া, একমুঠোর একটু কম কাঁচা লঙ্কা, তুলনায় অল্প আদা, দু আঁটি ধনে পাতা আর দু আঁটি পুদিনা পাতা একসঙ্গে মিক্সিতে পিষে নিয়েছিলাম বিকেলে। এই মশলাটা চিকেনে খুব ভালো করে মাখিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। এর সঙ্গে পরিমাণ মতো ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়ো আর টক দই মিশিয়ে মাংসে মেখে নিয়েছি। সেই বিকেল থেকে মশলা মাখা মাংস ঢাকা দিয়ে রেখে দিয়েছিলাম, এখন ঘন্টা তিনেক হয়ে গেছে। তাই সাদা তেলে গরম মশলা, গোল মরিচ আর শা জিরে ফোড়ন দিয়ে এখন পেঁয়াজ কুচো ভাজছি। ভাজা হয়ে গেলে ওতে মশলা মাখা মাংসটা ঢেলে দেব। নাড়তে নাড়তে তেল ছেড়ে যাবে। আঁচ কমিয়ে একটু ঢাকা দিয়ে দিলে, চিকেন, বাটা মশলা আর দই থেকে যে জল বেরোবে, তাতেই মাংস সেদ্ধ হয়ে যাবে।
– এই রান্নাটা কার কাছে শিখেছো?
-ইউটিউব। তবে ভেটকি মাছেও এই প্রিপারেশনটা ভালো লাগে। অবশ্য পেঁয়াজ, রসুন সব কম লাগবে মাছ দিয়ে করলে।
– আচ্ছা, করো দেখি।
বলেই সে দিদিকে হাঁক দেয়, দিদিরে আজ সবুজ রঙের তৃণমূল চিকেন রান্না করছে মা।
– এ্যাই, বদমাইশ, কোনো কিছু সবুজ হলে তৃণমূল হয়ে যায়?
– এখন হচ্ছে তো মা। দেখছো না সবুজ প্লাস্টিকের চেয়ার হলো। লাল কার্পেট উঠে চারদিকে সবুজ কার্পেট হচ্ছে ফাংশনে।
– শোন রক্ত সবুজ হয়না, গাছের পাতা লাল হয়না।
এবারে কন্যার বিজ্ঞ দিদির হাসিমুখে আবির্ভাব হয়।
– লাল সবুজ তো ঠিক আছে জেঠিমা। রং দে তু মোহে গেরুয়ার কী হবে?
– কেন, গেরুয়া রং খুব ভালো। ত্যাগের রং, জাতীয় পতাকার প্রথম রং। বিবেকানন্দের জোব্বার রং।
– বিবেকানন্দ? খুব ভালো মানুষ। আমার মতোই খেতে ভালোবাসতেন। আজও বেলুড় মঠে ওনার রেসিপিতে খিচুড়ি হয়, চাটনি হয়। কিন্তু বিবেকানন্দের সব কথা তুমি মানো জেঠিমা?
– মোটামুটি মানি। উনি আমার শক্তি। আমার ইনস্ট্যান্ট এনার্জি ট্যাবলেট।
– কিন্তু সীতা সাবিত্রীর কথাটা। মেয়েরা এখনও সীতা হবে? পিতৃতন্ত্রের তলায় পিষ্ট হয়ে থাকবে?
– সীতাকে তুই খুব দুর্বল চরিত্র মনে করিস? আমি মনে করিনা। আমি একজনের কথা জানি, যিনি সীতার মতো হয়েছিলেন।
– কে বলোতো?
– আমার দিদা, লাবণ্যপ্রভা।
– আবার গল্পরে বোনু। মাঝপথে জেঠিমা যেন না পালায় দেখ।
– আরে না না। রান্নাটা হয়ে গেলেই মাকে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে দেবো।
– দেখবি? বড্ড জ্বালাচ্ছিস তোরা।
রান্না হয়ে গেলে দুই মেয়েকে নিয়ে দাওয়ায় বসি।
– লাবণ্য দিদার সংসারের গল্প বলো মা।
– গল্পটা পুরোটা লাবণ্যপ্রভার নয় রে, বলতে পারিস মায়ের ঠাকুমা, মায়ের মা, আমার মা আর আমার গল্প মানে কুমুদিনী, লাবণ্য, কৃষ্ণা আর শারদার গল্প।
– আচ্ছা বলো।
কবে সেই চাঁদ উঠেছিল যেন,
কবে জ্বলেছিল রবি।
আঁকতে পারিনা, শুধু লিখে যাই,
স্মৃতিপটে দেখা ছবি।
ইস্কুলে ছুটি হতো বিকেল সাড়ে চারটে। মায়ের সঙ্গে নিবেদিতা লেন থেকে শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় অবধি হেঁটে যেতাম। সেখান থেকে বাস। গিরিশ এভিনিউ আড়াআড়ি পেরিয়ে শ্যামপার্কের গলি, একটু এগিয়ে নববৃন্দাবন। তার পর ডানদিকে শ্যামপার্ক, বাঁদিকে সেনবাড়ি ছাড়িয়ে মণীন্দ্র কলেজের পাশ দিয়ে ভূপেন বোস এভিনিউ। তারপর সোজা মোড় অবধি হাঁটা লাগাতাম। নববৃন্দাবনের পথে ঝুলনের আগে মাটির পুতুলের পশরা বসতো। আর দেখলেই আমি খুব বায়না করতাম। আইসক্রিম ওলা, নাড়ুগোপাল, পুলিশ, ঘড়া কাঁখে ঘোমটা মাথায় মেয়ে, গোরু, হাতি, বর বৌ। এক একদিন বায়নায় পাগল হয়ে মা পুতুল কিনে দিত। দুহাতে দুটো পুতুল নিয়ে রানীর মতো বাড়ির পথ ধরতাম। কিন্তু যেদিনই শিকে ছিঁড়ত, সেদিনই কেমন করে জানি বৃষ্টি এসে যেত। প্রাণপণ নিজে ভিজে পুতুল বাঁচাতাম। কোনোদিন হয়তো শ্যামবাজারের কোনো সহৃদয় দোকানি একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট দিয়ে পুতুল মুড়ে দিতেন। যখন সেগুলো বাড়ি আসত, কোনোটার অভ্র ঝরে গেছে, অথবা কাঁচা মাটির ওপর রঙ চটে গেছে। তবু আনন্দের ঘাটতি ছিলনা। হোকনা ছাল ওঠা, নাক ভাঙা, আমার ভান্ডার কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। সেগুলো সাজিয়ে ঝুলন করতাম।
ঐ শ্যামপার্কের পাশে সেনবাড়ি হলো আমার একরকম মামার বাড়ি। মামারা ছিলেন বয়স্ক। মাঝে মাঝে মায়ের সঙ্গে গিয়ে দেখা করে আসতাম। আর নারান মামা প্রায়ই সেনবাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে আসতেন। নারান মামা বাসে উঠতে পছন্দ করতেন না। বাগবাজার থেকে হেঁটে হেঁটে পাতিপুকুরে আমাদের বাড়ি যেতেন। মাকে ডেকে বলতেন, “রাজকুমারী একটু ভালো করে ডাল করো তো। ও বাড়িতে কত লোক। চৌবাচ্ছায় ডাল ঢালা হয়। ফোড়নের গন্ধ পাইনা।” সেনবাড়ির যৌথ পরিবারের সদস্য অনেক। তাছাড়াও অতিথি অভ্যাগতের ঢল লেগে থাকত। রান্নার ঠাকুরেরা শেষের দিকে উপায়ান্তর না দেখে ডালে ভাতের ফ্যান মেশাতো। আর সেটাই নারান মামার রাগ। নারান মামা সেনবাড়ির হেঁশেলের গল্প করতেন। আমরা অবাক হয়ে শুনতাম।
সেনবাড়িতে সকালে বিকেলে দুশো আড়াইশো করে লোকের পাত পড়তো। একে একান্নবর্তী পরিবার, তায় তার আশ্রিত, আত্মীয়, অনাহুত, রবাহূত কেউই অভুক্ত থাকতোনা। সব গিন্নিরা সকাল হলেই কাজে লেগে পড়তেন, আর তাঁদের সাহায্য করার জন্য ছিল বিহারী ঠাকুরের দল। তারা বংশ পরম্পরায় ও বাড়িতে থাকতো। সেনবাড়ির কিছু ভূসম্পত্তি আছে শিমূলতলায়। সেখান থেকেই এককালে তারা এসেছিলো।
– এখনও আছে মা?
– হ্যাঁ, এখনও আছে। মায়ের কাছে শুনেছি, আমার দাদুরও শিমূলতলায় জমি বাড়ি ছিলো।
– আমরা যাবো জেঠিমা। শুনেছি খুব সুন্দর জায়গা।
– কি করে যাবি? মায়ের ভাগের সেসব সম্পত্তি এখন কিছুই নেই। দাদু সব উড়িয়ে দিয়েছে। গেলে টুরিস্ট হয়ে যেতে হবে।
– আচ্ছা, তারপর বলো।
– সেনবাড়িতে দুটো খুব বড়ো বড়ো ঘর ছিলো। একটা ভাঁড়ার ঘর, আর একটা কুটনো কোটার ঘর। আর রান্নাঘর ও দুটো ছিলো, একটা নিরামিষের আর একটা আমিষের জন্য।
– ভাঁড়ার কি গো মা?
– ভাঁড়ার মানে ভান্ডার। সেখানে চাল ডাল তেল মশলা চিঁড়ে মুড়ি যা যা খ্যাঁটনে লাগে সব থাকতো। সেকালে সব বাড়িতেই আলাদা ভাঁড়ার ঘর থাকতো। গিন্নিরা সকালে বাসি কাপড় ছেড়ে, কাচা কাপড় পরে, তবেই রান্নাঘরের জিনিষে হাত দিতে পারতো। চুল টান করে বেঁধে রাখতে হতো, যাতে রান্নার উপকরণে চুল না পড়ে যায়। অনেক বড় বড় পরিবারে মুখে কাপড় বেঁধে রান্না করতে হতো, বাটনা বাটতে হতো, যাতে কথা বলতে গিয়ে থুতু না ছেটায়। আবার মার কাছে শুনেছি আমার দিদা ভাঁড়ার ঘরে বসে লুকিয়ে পড়াশোনা করতো।
– অতো সম্পর্ক বলতে হবেনা জেঠিমা। কুমুদিনী, লাবণ্য, কৃষ্ণা সব নাম ধরে বলো। আমরা বুঝে নেবো। লাবণ্যকে লুকিয়ে পড়াশোনা করতে হতো কেন? তাছাড়া ভাঁড়ার ঘরে তো দাসদাসী সকলেই ঢুকবে, লুকোবে কি করে?
– এই কথাটা ছোটোবেলায় আমিও কৃষ্ণাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে গল্প অন্য রামায়ণ। এখন মহাভারত শোন। মোহনবাগানের মহাভারত।
– বুঝলাম না, মোহনবাগানের মহাভারত মানে?
– মানে হলো, সেনবাড়ির সঙ্গেই জুড়ে আছে মোহনবাগান।
– কি বলছো মা! ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের মোহনবাগান? তাড়াতাড়ি বলো, ফাস্ট।
– বলছি তো রে বাবা। তোরাই তো ট্র্যাক চেঞ্জ করে গুলিয়ে দিচ্ছিস। সেনবাড়ির বিশাল ভাঁড়ার ঘরে থাকতো এক পেল্লাই দাঁড়িপাল্লা। একজন হেড গিন্নি থাকতেন। তিনি কখন কার কি দরকার বুঝে রোজকার চাল ডাল মশলাপাতি বার করে দিতেন। আর কুটনো কোটার ঘরে সব বৌদের আলাদা আসন পিঁড়ি আর নাম লেখা বঁটি থাকতো।
– নাম লেখা বঁটি?
– সেযুগে বাসন কোসনেও নাম লেখানোর খুব চল ছিলো। আমার ছোটোবেলায় মায়ের নাম লেখা গেলাস, আমার নাম লেখা থালা বাটি ছিলো।
– কিভাবে লিখতে মা? মার্কার পেন দিয়ে?
– আরে না রে পাগল, লোক আসতো বাড়িতে, যারা বাসনের গায়ে ঠুকে ঠুকে ফুট ফুট করে নাম ফুটিয়ে তুলতো।
– আচ্ছা।
– তোদের এই মৈতনার রান্নাঘরে যেমন সকাল থেকে উনুন জ্বলছে, লোক আসছে, অনেকটা এরকমই। কিন্তু এখানে যেমন রোজ পঁচিশ তিরিশ জনের ব্যাপার, সেনবাড়িতে ওটা দুশো, আড়াইশো। মানে আমাদের এখানকার সিস্টেম টাকে আটগুণ বড়ো করে কল্পনা কর।
সকালে জলখাবারে কোনোদিন ডালপুরী, কখনও লুচি, রুটি এইসব হতো। সঙ্গে মিলিয়ে আলু ছেঁচকি, চাকা চাকা করে আলু ভাজা, আলু মরিচ, সাদা আলুর তরকারি এইসব হতো এক একদিন।
– সব আলু?
– হ্যাঁ, আমাদের ছোটোবেলায় বা তার আগের যুগে লোকে খেয়ে বাঁচতো। অতো হার্টের রোগ, পেটের রোগ, ডায়াবেটিসের ভয় ছিলোনা।
– আলু ছেঁচকি কিকরে করে গো মা?
ছেঁচকি আর তরকারির মধ্যে তফাৎ কি?
– ছেঁচকিতে আলু হোক, পেঁপে হোক, অন্য সব্জি হোক একটু ছোটো করে কেটে জলে ভাপিয়ে নেওয়া হয়। তারপর অল্প তেলে হয় গোটা সর্ষে, নতুবা কালো জিরে, তার সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে ঐ তেলে ভাপানো সব্জি দিয়ে নেড়ে নিতে হবে। নুন মিষ্টি দেখে নামিয়ে নিতে হবে। সব্জি ভাপানো থাকে বলে, এতে কম তেল লাগে। অনেক সময়ে বাজারে আনা সব্জি পুরোনো হয়ে বুড়িয়ে গেলে তাই দিয়ে ছেঁচকি করা হয়। কিন্তু তরকারিতে আগে কাঁচা সব্জি ভেজে, মশলা দিয়ে কষে তারপর জল দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। এটাই তফাৎ।
– বুঝলাম, তারপর বলো।
– দুপুরে ডাল, চচ্চড়ি, চাটনি যাই হোক, পোনা মাছের পাতলা ঝোলটা হতো। ওবাড়ির লোকের এমন অভ্যেস ছিলো, যে অনেকে ঐ জিরে ধনের ঝোল ছাড়া ভাত খেতে পারতোনা। আমার মা মানে কৃষ্ণাও অমন ঝোল রাঁধতে জানতো। মা সবসময়ে জিরেও দিতোনা। বেশিরভাগ সময়ে শুধু ধনেগুঁড়ো দিয়ে ঝোল করতো। অমৃত লাগতো।
_____—-_________—–______—
সেনবাড়ি এতোবড়ো পরিবার, সবসময়েই জন্মদিন, বিয়ে, অন্নপ্রাশন কিছু না কিছু লেগে থাকতো। আর মোহনবাগান জিতলে তো আর কথাই নেই। খেলার পরে খেলোয়াড়রা আসতো। উৎসব লেগে যেতো। চপ, কাটলেট, মাছের কচুরি, মাটন রোস্ট এসব বাড়িতেই হতো। আমার মামার বাড়িতে দিন রাত সেনবাড়ির গল্প হতো। আর নারানমামা এলে নানারকম গল্প করতো।
– মাছের কচুরি কেমন গো মা? কোনোদিন তো খাইনি।
– ওসব আমাদের কালের খাবার, বাড়িতে হতো, দোকানে পাওয়া যেতো।
– এখানে তো এতো মাছ, পুকুরের মাছ, সাগরের মাছ, এখানে করো।
– সাগরের নোনা মাছে এসব হয়না। আর পুকুর? গতকাল তো উঠলো, দেখলিনা – সি-ল-ভা-র কার্প। বনেদী খাবার দাবার এসব দিয়ে হয়না। এর জন্য রইসি রুই, কাতলা বা ভেটকি লাগে।
– কীভাবে করে?
– ভেটকি হলে কাঁটা কম। যেকোনো ধরণের পিস নেওয়া যায়। আর রুই বা কাতলা হলে পেটির দিকের টুকরো নিতো মা। ওতে কাঁটা ছাড়ানো সুবিধে হয়। টুকরো গুলো জলে নুন, হলুদ, ভিনিগার আর গোল মরিচ দিয়ে আগে সেদ্ধ করে নিতে হবে। তারপর মাছটা ঠান্ডা করে কাঁটা ছাড়িয়ে নিতে হবে। এবার পেঁয়াজ, রসুন, আদা, কাঁচালঙ্কা ভালো করে বেটে নিয়ে, ঐ মশলা দিয়ে মাছ সেদ্ধটা কষে একেবারে শুকনো শুকনো ভাজা ভাজা করে ফেলতে হবে। এতে ভাজা মশলা, গরম মশলা সবই দেওয়া যায়, আপ রুচি খানা। পুরটা রেডি হয়ে গেলে ময়দার লেচিতে পুর ভরে বেলে নিয়ে ছাঁকা তেলে ভাজতে হবে। কিন্তু বেলার সময়ে বেলন টা কায়দা করে একটু পাশ দিয়ে দিয়ে বেলতে হবে। তুই যদি মাঝখান দিয়ে চেপে বেলতে যাস, কচুরি ফেটে যাবে, তখন আর তেলে দিলে ফুলবেনা।
– শুধু বললে হবেনা। করবে একদিন। আচ্ছা মা, সেন বাড়ির সঙ্গে তোমার কিরকম সম্পর্ক? মোহনবাগানই বা সেনবাড়ির সঙ্গে কিভাবে যুক্ত ?
– সেটা বলতে গেলে তো এককথায় হবেনা। অনেক কথা বলতে হবে। সেসব কি তোদের শোনার ধৈর্য্য আছে?
– আমাদের কী মনে করো বলোতো মা। ধৈর্য্য আছে, তুমি বলো।
– শোন তবে।
মায়ের কাছে কীর্তি মিত্তিরের বাড়ির গল্প শুনতাম, সেনবাড়ির গল্প শুনতাম। এও শুনেছিলাম বোসেরা, সেনেরা আর মিত্রেরা মিলে মোহনবাগান তৈরি করেছে। মায়েরা ছোটোবেলায় বাগবাজারে থাকত। মামারা সকলে বাগবাজারী শৈলীতে লুচিকে নুচি, লেবুকে নেবু, লুকোতেকে নুকুতে, ঘড়িতে দেড়টাকে ডেড্ডা বলতো। মুষলধারে বৃষ্টিকে উপঝ্ঝান্তে বৃষ্টি বলা হত। জানিনা কী শব্দ থেকে কথাটা এসেছে। আর সেনেদের বাড়ি উচ্চারণে হত স্যানেদের বাড়ি। দিনরাত দাঁতি দা, মাল দা, বাচি দা, ভাউ দার গল্প হতো।
– এনারা কারা?
– এনারা সব মায়ের দাদা। আমার মামা। মা বলতো, জানিস সবাই মোহনবাগানের সঙ্গে যুক্ত। মা আরও বলতো মায়ের পূর্বপুরুষেরা মানে বোসেরা মোহনবাগানের তৈরির সময়ে মোটা অনুদান দিয়েছিল।
শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় পেরিয়ে, ভূপেন বোস এভিনিউ বরাবর হেঁটে, মনীন্দ্র কলেজের লাগোয়া গলি দিয়ে শ্যাম পার্কের পাশ দিয়ে, আমি, মা আর বোন গিরিশ এভিনিউ এ পড়তাম। বলরাম মন্দির, বোরোলীন হাউস আর গিরিশ ঘোষের বাড়ির পাশে নিবেদিতা লেন। সেই গলিতে আমাদের ইস্কুল। কিন্তু তখন জানতাম না ভূপেন বোস কে। ফেরার পথে শ্যামপার্কের ধারে বাগবাজারের সেনবাড়িতে যেতাম মাঝে মাঝে।পরিণত বয়সে যখন আমার কম্পিউটার হল, অন্তর্জাল সংযোগ হল, মনপ্রাণ দিয়ে আমার অনুসন্ধান শুরু করলাম। মানে টুকরো স্মৃতি, টুকরো কথা, কিছু পাঠ সূঁচ সুতো দিয়ে জুড়তে শুরু করলাম।
শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেব তাঁর পিতা গোপীমোহন দেবের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ফড়িয়াপুকুরে এক বিরাট বাগান পেয়েছিলেন। সেই বাগানই মোহনবাগান। গোপীমোহনের পালক পিতা হলেন রাজা নবকৃষ্ণ দেব। হয়তো গোপীমোহন পেয়েছিলেন নবকৃষ্ণের থেকে।
– পালক পিতা মানে?
– নবকৃষ্ণের নিজের পুত্র ছিলোনা বলে, তিনি দাদা রামসুন্দরের ছেলে মানে নিজের ভাইপোকে দত্তক নিয়েছিলেন।
– নিজের দাদা?
– হ্যাঁ। ঐ বাগান পরে গোপীমোহনের উত্তরপুরুষের কাছ থেকে কিনে নেন প্রখ্যাত পাট ব্যবসায়ী কীর্তি মিত্র। তিনি ঐ বাগানে তখনকার ডাকসাইটে স্থপতি নীলমণি মিত্রকে দিয়ে নকশা করিয়ে মোহনবাগান ভিলা নামে শ্বেতপাথরের এক চোখ ধাঁধানো বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেন এবং সেখানে বসবাস শুরু করেন, যদিও বেশিদিন এই প্রাসাদ তিনি ভোগ করতে পারেননি।
– কেন?
– প্রাসাদ তৈরির কিছুদিন পরে ওনার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর মালিক হলেন তাঁর পুত্র প্রিয়নাথ মিত্র। তিনি ব্যরিস্টার হরিদাস বোস, আইনজীবী ভূপেন বোস এবং আরো কয়েকজন ক্রীড়াপ্রেমী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই মোহনবাগান ভিলার লাগোয়া মাঠে খেলা ছেলেদের নিয়ে একটা ফুটবল দল গঠন করেন। সেই দলই অনেক পথ পেরিয়ে আজকের “এ.টি.কে. মোহনবাগান”। রাধাকান্ত দেবের সেজ মেয়ের বর মহেশচন্দ্র বোস রাজবাড়িতেই ঘরজামাই হয়ে সংসার পাতেন। এই মহেশের ছেলে শরৎচন্দ্র বসু, মায়ের মানে কৃষ্ণার ঠাকুরদা ইংরেজদের সঙ্গে বস্ত্র ঊপকরণ রপ্তানি এবং বস্ত্র ও কাগজ আমদানির ব্যবসা করতেন। তাঁর স্ত্রী, কৃষ্ণার ঠাকুমা কুমুদিনী বসু লেখিকা, সমাজসেবী, সম্পাদিকা, স্বাধীনতা সংগ্রামী, ভগিনী নিবেদিতার সহযোগী। শরৎ – কুমুদিনীর ছোটো ছেলে হলেন আমার দাদু, বিকাশচন্দ্র বোস। দাদুরা পাঁচ ভাই, তিন বোন। বড়ো বোন লীলার বিয়ে হয় বাগবাজারের সেন পরিবারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ভবনাথ সেনের ছোটো ছেলে শ্রীশচন্দ্র সেনের সঙ্গে আর ছোটো বোন ইন্দিরার বিয়ে হয় প্রখ্যাত পাট ব্যবসায়ী কীর্তি মিত্রের নাতি এবং পি. মিত্রের ছেলে রবীন মিত্রের সঙ্গে।
– তার মানে সেন বাড়ি আর মিত্রবাড়ি কি তোমার পিসির বাড়ি হলো?
– আমার পিসি নয়, আমার মায়ের পিসি। আমার পিসি দিদার বাড়ি। মায়ের বড় পিসিমার শ্বশুরবাড়ি হল সেন বাড়ি আর ছোটোপিসিমণুর শ্বশুর বাড়ি হলো মিত্রবাড়ি। আমার পিসি তো ধান্যকুড়িয়ার যে গাইন গার্ডেন সবাই দেখতে যায়, সেই গাইনবাড়ির বৌ।
বড় পিসিদিদার শ্বশুর ভবনাথ সেন ইংরেজদের কাছ থেকে কলকাতার ধাপা লিজ নিয়ে, জঞ্জালের ওপরে ফসল ফলাতে সফল হন। আজ যে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি কলকাতার কিডনি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, তার সূত্রপাত ভবনাথ সেনের হাত ধরে।
– কলকাতার কিডনি কী?
– ময়দানকে বলা হয়, কলকাতার ফুসফুস। কারণ ফাঁকা জায়গা, গাছগাছালি আছে। পূর্ব কলকাতার জলাভূমিকে বলা হয় কলকাতার কিডনি। কারণ উত্তর কলকাতায় বাগজোলা খাল, মধ্যে কেষ্টপুর খাল আর দক্ষিণ কলকাতার টালি নালা – এই তিনটে প্রবাহ কলকাতার সব ময়লা জল টেনে নিয়ে ঐ জলাভূমিতে ফেলে। জলাভূমির মধ্যে মাছ চাষ হয়, মাছগুলো ঐ ময়লা জলের সঙ্গে ভেসে আসা জৈব পুষ্টিকর পদার্থ খেয়ে বেঁচে থাকে। অন্য কোনো খাবার দেওয়া হয়না। জলাভূমিগুলোর মাঝখানে মাঝখানে আবার সব্জি চাষও হয়। মাছ ময়লা খেয়ে ফেলে বলে, ঐ জলাভূমিতে কলকাতার নোংরা জল পরিষ্কার হয়ে যায়। ঐ ভালো জল জলাভূমি থেকে যায় কুল্টি গাং বলে একটা নদীতে। সেই নদী আবার মিশেছে মাতলা নদীতে। ঐ নদী পথ ধরে সুন্দরবনের ভিতর দিয়ে কলকাতার ব্যবহৃত জল চলে যায় বঙ্গোপসাগরে। যদি এতোবড়ো শহরের ময়লা জল সরাসরি যেতো, তবে সুন্দরবনের অনেক বেশি ক্ষতি হতো। মাঝখানে ময়লা টেনে পরিষ্কার করে দেয় বলে ঐ জলাভূমিকে কলকাতার কিডনি বলে।
– আচ্ছা, বুঝলাম। কিন্তু এর সঙ্গে ধাপার লিজের কি সম্পর্ক?
– এলাকাটাতো একই। জলাভূমিতে যেমন মাছগুলো জলের ময়লা খেয়ে বড়ো হয়, তেমন জমিতে কলকাতার ফেলে দেওয়া কঠিন বর্জ্যের ওপরেই চাষ হয়। কলকাতা শহর তৈরির শুরুতে শহরের নোংরা আবর্জনা সব ফেলা হোতো সোজা আমাদের ভাগীরথী – হুগলী নদীতে মানে গঙ্গার জলে। কিন্তু ইংরেজরা দেখলো নদী থেকে খাবার জলের ব্যবস্থা করতে হবে। এমনিতেই গঙ্গার ঘোলাজল পানের উপযুক্ত করতে অনেক টাকা খরচ, তার ওপর ময়লা ফেললে আরও মুশকিল হবে। তারপর বেশ কয়েক বছর ভরাট করা হোতো মজে যাওয়া খাল, নীচু জমি ওই নোংরা দিয়েই। এ ভাবেই সার্কুলার খাল বুজিয়ে সার্কুলার রোড তৈরী হয়েছে, সরু জলধারা বুজিয়ে ক্রিক রো হয়েছে। কিন্তু তারপর? কোনো স্থায়ী জায়গা তো চাই। শহর যত বপুতে বাড়ছে আবর্জনার স্তূপও বড় হয়ে যাচ্ছে।
1865 সালে পূর্ব কলকাতা জলা – ভূমির ধারে ধাপা অঞ্চলের এক (1) বর্গ মাইল অঞ্চলকে, বেছে নেওয়া হল শহরের ময়লা ফেলার জন্য। কিন্তু জঞ্জালগুলো তো কোনো কাজে লাগাতে হবে, নইলে বছরের পর বছর জমতে জমতে তো শহরটাই ঢাকা পড়ে যাবে। তাই ইংরেজরা চাইছিল, এই আবর্জনার ওপরে যেন চাষবাস করা যায়।
জঞ্জালের ওপরে চাষ করতে ভবনাথ সেন প্রথম সফল হন।
– আচ্ছা। এর সঙ্গে মোহনবাগান কীভাবে এলো?
– বলছি তো, শোন আগে।
ভবনাথ সেনের দাদা ব্রহ্মনাথ সেন ছিলেন আইনজ্ঞ। তাঁর ছেলে মণিলাল সেনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল আর এক খ্যাতনামা আইনজীবী ভূপেন্দ্রনাথ বসুর মেয়ে নীরোদবালার। রামরতন বসু ও দয়াময়ী দেবীর পুত্র ভূপেন্দ্রনাথ পরে আইন সভার সদস্য, জাতীয় কংগ্রেসের নেতা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। আইন ব্যবসার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন নিখাদ ক্রীড়াপ্রেমী। আবার মণিলাল সেন মোহনবাগানের ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটো দলেরই প্রথম অধিনায়ক। বাংলায় তিনি প্রথম রাউন্ড দ্য আর্ম বোলিং শুরু করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি নামকরা অ্যাটর্নি হন। মণিলাল – নীরোদবালার ছেলে দীনবন্ধু সেন বা দাঁতি সেন। মণিলাল সেনের খুড়তুতো ভাই ভবনাথ সেনের এক ছেলে হেমচন্দ্র সেনও মোহনবাগানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। দাঁতি সেন আমার দাদুর বিয়ের সম্বন্ধ করেন তাঁর শ্যালিকার সঙ্গে। এই শ্যালিকাই লাবণ্যপ্রভা। আমার দিদা।
– দাঁড়াও দাঁড়াও মা, সব গুলিয়ে যাচ্ছে।
– ভালো করে বোঝ, বিকাশ বোস, আমার দাদু। তার বড় ভগ্নীপতি শ্রীশ সেন বা ভূতিবাবু। এই ভূতিবাবুর জেঠতুত দাদা মণিলাল সেন। মানে আমার বড়ো পিসিদিদার ভাশুর। ব্রহ্মনাথ আর ভবনাথ তো দুই ভাই। ব্রহ্মনাথের ছেলে মণিলাল, ভবনাথের ছেলে ভূতিবাবু – মায়ের বড়ো পিসেমশাই। তাহলে ভূতিবাবুর জেঠতুত দাদা মণিলাল হলেন তো। মণিলালের ছেলে দাঁতি সেন। আর ভূতিবাবুর ছেলেরা হলো নমে সেন, হুঁকুজ সেন, বাচি সেন। এনারা তিনজন মায়ের পিস্তুত দাদা, আমার মামা। দাঁতি সেন মায়ের পিস্তুত দাদাদের জেঠতুত দাদা। একবাড়ি তো, যৌথ পরিবার। দাদার দাদাও দাদা। এবারে বুঝেছিস?
– আচ্ছা বুঝলাম। এবারে শ্যালিকার ব্যাপারটা বলো।
– দাঁতি সেনের স্ত্রী ফুলরানী সেন (বসু) চিকিৎসক আর জি করের ভাই রাধামাধব করের দৌহিত্রী এবং ফনীন্দ্রনাথ বসুর কন্যা। আর আমার দিদা লাবণ্য হলেন আর জি করের ছোটো ভাই রাধাকিশোর করের দৌহিত্রী এবং ধীরেন্দ্রনাথ ঘোষের কন্যা। ফনীন্দ্রনাথও আইনজীবী। আর ধীরেন্দ্রনাথেরা হলেন খানাকুলের ঘোষ। ইনি, এনার পরিবার সব ব্যবসায়ী।
– দৌহিত্রী মানে কি?
-দৌহিত্রী মানে মেয়ের মেয়ে, মেয়ের দিকে নাতনি। ফুলরানী আর লাবণ্য দুই ভায়ের নাতনি। মানে সম্পর্কে বোন।
সেন পরিবার খেলাধূলায় খুবই উৎসাহী ছিল। দাঁতি সেন পরিণত বয়সে খ্যাতনামা অ্যাটর্নি হন। কিন্তু প্রথম জীবনে তিনি মোহনবাগানের খেলোয়াড় এবং পরবর্তীতে কর্মকর্তা। স্বাধীনতার পরে বেশ কিছু বছর তিনি মোহনবাগানের সহসভাপতি ছিলেন। এই দলে সেন পরিবারের অবদান শুধু ফুটবলে নয়, ক্রিকেট, হকি এবং টেনিস সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। মণিলালের আর এক পুত্র কানাই সেন ওরফে রবীন্দ্রনাথ সেনও ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটি দলেরই অধিনায়ক হয়েছিলেন। এঁদের এক ভাই সত্যেন্দ্রনাথ সেন বা মাল সেন মোহনবাগানে টেনিস বিভাগের প্রবর্তন করেন এবং ঐ বিভাগের সচিব ছিলেন। শুনেছি ছায়াছবির প্রয়োজনে উত্তম কুমার তাঁর কাছে টেনিসের কৃৎকৌশল শিখতে এসেছিলেন।
– উত্তম কুমার? তোমার গল্পে উত্তম সুচিত্রাও আছে?
– আছে তো। উত্তম কুমার আমার কাহিনীতে বারবার ফিরে আসবেন। সরাসরি না হলেও লাবণ্য আর কৃষ্ণার যুগটা তো উত্তমকুমারের যুগ। তাই আসবেন। তবে সেটা শরৎ – কুমুদিনীর মেজমেয়ের মানে আমার মেজপিসিদিদার বাড়ির গল্প। এখন তো বড় আর ছোটো পিসিদিদার বাড়ির গল্প বলছি।
– তাহলে সিনেমার গল্পটা আগে হয়ে যাক জেঠিমা।
– দেখ এরকম করলে কিন্তু আমি খেই হারিয়ে ফেলবো। যা বলছি শোন। আমার পরিবারের ইতিহাস তো আর বাংলার ইতিহাস থেকে আলাদা কিছু নয়।
সেনবাড়িতে ফিরে আসি। যাঁদের কথা বললাম, তাঁরা ছাড়াও ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র সেন বা কেষ্ট সেন, খগেন্দ্রনাথ সেন বা মন্টু সেন, মন্টু সেনের দাদা দীপেন সেন। এঁরা প্রত্যেকেই খেলোয়াড় এবং সংগঠক হিসেবে মোহনবাগানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর একজনের কথা না বললেই নয়। সম্পর্কে তিনি মায়ের পিস্তুত দাদাদের জেঠতুত দাদা, মায়ের পিসেমশাই শ্রীশচন্দ্রের দাদা প্রিয়নাথ সেনের পুত্র। যৌথ পরিবার তো। দাদাদের তুতো দাদারাও নিজের দাদার মতো। তিনি ভাউ সেন বা জিতেন্দ্রনাথ সেন। ভাউমামাও দীর্ঘদিন মোহনবাগানের সহ সভাপতি ছিলেন। মা ভাউদা বলতে অজ্ঞান ছিল। মা লেখাপড়ায় ভালো, দেখতে সুশ্রী, পুতুল পুতুল। সেনবাড়িতে মায়ের খুবই আদর ছিল। ও বাড়িতে মায়ের স্নেহের নাম ছিল রাজকুমারী। আসল নাম কেউ মনে রাখেনি।
কীর্তি মিত্রের পুত্র প্রিয়নাথ মিত্রও খেলা নিয়েই বেশি মেতে থাকতেন। প্রিয়নাথের তিন ছেলে।
– দাঁড়াও দাঁড়াও মা। দুজন প্রিয়নাথ?
– হ্যাঁ, ভূতিবাবুর দাদা একজন, তিনি প্রিয়নাথ সেন। আর এখন যার কথা বলছি, তিনি কীর্তি মিত্রের ছেলে, প্রিয়নাথ মিত্র। খেলার মাঠে তাঁকে সবাই ডাকতো পি. মিত্র।
পি. মিত্রের ছোটো ছেলে রবীন মিত্র হলেন মায়ের ছোটো পিসেমশাই। তিনিই পারিবারিক কারবার দেখাশোনা করতেন। বাকি দুই ছেলে হলেন শিশিল মিত্র এবং মলয় মিত্র। মা ডাকতো শিলি কাকা আর মন্টি কাকা। শিলি দাদুও আইনজ্ঞ। তাঁর মেয়ে দীপ্তির সঙ্গে বিয়ে হলো মায়ের বড় পিসির ছেলে বাচি সেনের। মন্টি দাদু বিয়ে করেনি। দীপ্তি মামীমার মাকে আমার মা ডাকত পেনি খুড়িমা বলে। তাঁর বিবাহ পূর্ব নাম অম্বালিকা দত্ত। আর এই মামীমা যেহেতু মিত্র বাড়ির সূত্রে আমার মাসি, মা এবং মামারা ওনাকে খুকুদি বলে ডাকত। বাচি সেনের বড়দা নমে সেনের স্ত্রী রেখা সেন ছিলেন এন্টালির দেব বাড়ির মেয়ে। ঐ বংশের প্রথিতযশা কন্যা নবনীতা দেবসেন। মোহনবাগান ই – লাইব্রেরি ফেসবুক পেজে নবনীতা দেবসেনের একটা চমৎকার ছড়া পড়েছি।
‘ “যদি মোহনবাগান জেতে,
ঢাকঢোল আর সানাই নিয়ে
উঠবে শহর মেতে।
যদি মোহনবাগান হারে?
এক মিনিটে লোডশেডিং হয়
হৃদযন্ত্রের তারে।”
মায়ের বড় পিসির আর এক ছেলে হুঁকুজ সেনের বিয়ে হয় চিকিৎসক আর জি করের আর এক ভাই রাধারমণ করের দৌহিত্রী এবং জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসুর কন্যা পূরবীর সঙ্গে। রাধাগোবিন্দ কর বা আর জি কর নিজে নিঃসন্তান ছিলেন।
যদিও এইসব প্রজাপতি নির্বন্ধ ঘটেছিল, মোহনবাগানের জন্মের পরে। বোস, সেন আর মিত্র পরিবারের নেতৃত্বে মোহনবাগানের জন্ম হয়। এঁদের সঙ্গে লতায় পাতায় ছিল কর এবং দেব পরিবার। এমনিতেই প্রভাবশালী কায়স্থদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মোহনবাগানের জন্মের পরে দেখছি এই পরিবারগুলি বৈবাহিক প্রজাপতির পাখায় পাখায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী প্রজন্মের এই বাড়তি বন্ধুত্ব বা ভরসা হয়তো তৈরি হয়েছিল এই মোহনবাগান আবেগকে কেন্দ্র করে। আমি ভাবি, যেহেতু আমার দিদা লাবণ্য আর. জি. করের নাতনি এবং দাদু দিদার বিয়ের ঘটকালি করলেন দাঁতি সেন, তার মানে আমার এই অস্তিত্বটা মনে হয় মোহনবাগানের কাছে ঋণী।
দুই মেয়ে হাততালি দিয়ে ওঠে।
– তুমি মোহনবাগানের মেয়ে মা। তুমি হলে আমিও তাই।
– জেঠিমা আমার মামার বাড়ি তো অন্য। আমি কি করবো?
– এই বক্সিবাড়ি তো মোহনবাগান অন্তঃপ্রাণ। তোরও মোহনবাগানের মেয়ে হতে কোনো বাধা নেই তো।
– আচ্ছা ঠিক আছে তবে। তারপর বলো।
– বাংলায় ফুটবলের জনক নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীও শোভাবাজার রাজবাড়ি মানে দেববংশের জামাই, যাঁকে দেখে স্বামী বিবেকানন্দের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল।
– জেঠিমা, ন-গে-ন্দ্র প্রসাদ মানে গোলন্দাজ?
– হ্যাঁ, যাকে নিয়ে দেবের সিনেমা, সেই নগেন্দ্রপ্রসাদ।
১৮৮৫ সালে তখনকার ওয়েলিংটন, ফ্রেন্ডস, প্রেসিডেন্সি ও বয়েজ ক্লাবকে মিশিয়ে দিয়ে শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে তিনি তৈরি করেন শোভাবাজার ক্লাব। সঙ্গে ছিলেন রাজা জিতেন্দ্র কৃষ্ণ দেব। প্রায় একই সময়ে আরও তিনটে ক্লাবের জন্ম হয় – কুমোরটুলি ক্লাব, টাউন ক্লাব আর ন্যাশনাল ক্লাব। আর দেখ, এই ১৮৮৫ তেই প্রতিষ্ঠা হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের। ১৮৮৭ সালে নবাবজাদা আমিনুল ইসলামের পৃষ্ঠপোষণায় জন্ম নেয় জুবিলী ক্লাব। পরে (১৮৯১) এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে মহমেডান স্পোর্টিং ক্লাব। ১৮৮৯ সালে ভূপেন বসুর বাড়িতে যখন মোহনবাগানের জন্মমূহূর্তের সভা বসে, ভূপেন্দ্রনাথ তখন তিরিশ বছরের যুবক। বয়সে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের থেকে দু বছরের আর স্বামী বিবেকানন্দের থেকে চার বছরের বড়। কলকাতা হাইকোর্টের নথি বলছে, বছরখানেক বিবেকানন্দ মানে নরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং ভূপেন্দ্রনাথ বসু দুজনে নিমাইচরণ বসুর এজলাসে আর্টিকেল ক্লার্ক হিসেবে কাজ করতেন। সময়টা সম্ভবত ১৮৮১। নিমাইচরণ বসু সেযুগের একজন মহানুভব ব্যক্তিত্ব। জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুমারের বংশপরিচয় ষষ্ঠ খন্ডে তাঁর কথা পড়েছি।
– বিবেকানন্দ আইনের কাজ শিখতেন?
– তখন তো বিবেকানন্দ হননি, নরেন দত্ত। না শেখার কি আছে?
নরেন্দ্রের বাবা বিশ্বনাথ দত্তও তো নামী অ্যাটর্নি ছিলেন। তবে নরেনের মন তখন অন্যদিকে টানছিলো। ১৮৮০ তে নরেন্দ্রনাথ কেশব সেনের ব্রাহ্ম সমাজে যোগ দেন এবং ধর্মালোচনা ও ব্রহ্মসঙ্গীতের সুবাদে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। তবে ১৮৮১ সালে শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবার পরে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এজলাসে আইনের কাজ শেখাতেও অনিয়মিত হয়ে পড়েন। তবে লেখাপড়া চলছিল, ১৮৮৪ সালে যে বছর তিনি বি এ পাশ করলেন, ঐ বছরই বাবা বিশ্বনাথ দত্তের তিরোধান হয়। তবে আজন্ম খেলাধূলা প্রিয় বিবেকানন্দ যে ফুটবল ভোলেননি, তার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর সাধন জীবনের বিভিন্ন বক্তৃতায়।
– মোহনবাগান তৈরির সময়ে বিবেকানন্দ ছিলেন?
– না। ১৮৮৯ তে যখন মোহনবাগানের জন্ম হয়, বিবেকানন্দ তখন দেশকে চিনতে ভারত পরিভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছেন। তবে একথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে জাগে, ১৮৯৭ তে কলকাতায় ফেরার পরে নিশ্চয়ই এই দলের কথা তাঁর গোচরে আসে। ১৮৯৩ এ বম্বে থেকেই তিনি শিকাগো ধর্ম মহাসভায় চলে যান এবং বিশ্বজয় করেন। ১৮৯৮ সালে বিনয়কৃষ্ণ দেবের সভাপতিত্বে শোভাবাজার রাজবাড়িতে তাঁকে যখন সংবর্ধনা দেওয়া হয়, সেই বক্তৃতাতেও তিনি ফুটবলের উল্লেখ করেছিলেন।
আবার কেশব সেনের সঙ্গে যেমন বিবেকানন্দের যোগ আছে, তেমন তাঁর সঙ্গে মোহনবাগানও অদ্ভুত একটা সূত্রে জুড়ে আছে, পরে যথাসময়ে বলব। ১৮৯৮ এ বিবেকানন্দের সংবর্ধনার পরের বছরে মানে ১৮৯৯ সালে কলকাতায় ভয়াবহ ভাবে বিউবোনিক প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে।
সে এক ভয়ানক দিন। কলকাতা কাঁপছে বিউবোনিক প্লেগের আতঙ্কে। দলে দলে মানুষ বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে কলকাতা ছাড়ছেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইংরেজ সরকারের ব্যবস্থাপনার প্রতি অসন্তোষ এবং টীকার প্রতি সন্দেহ। প্লেগের টীকা দূরস্থান, বসন্ত রোগের টীকা দেয় এমন সরকারি কর্মচারীদেরও লোকে পথে মারতে তাড়া করছে। বাড়ির মেয়েদের টীকা বা চিকিৎসা করতে গেলে, অন্তঃপুরের আব্রু বা সম্ভ্রম যাবে, এই ভয়ে মানুষ কাঁটা হয়ে আছে। এইসময়ে রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে ভগিনী নিবেদিতা সেই প্লেগের বিরুদ্ধে জীবন পণ করে যুদ্ধে নামেন। আমার পারিবারিক শ্রুতি বলে, রামকৃষ্ণ মিশন ও ভগিনী নিবেদিতার সেই সেবা দলের সদস্য হয়ে প্লেগ নিবারণের মহৎ কার্যে ঝাঁপ দিয়েছিলেন কুমুদিনী, মায়ের ঠাকুমা। সেই সময়ে আরও একজন মানুষ নিজের আগ্রহে উত্তর কলকাতার প্লেগ আক্রান্তদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চিকিৎসা করছিলেন। তিনি লাবণ্যর জ্যাঠামশাই – ড. আর. জি. কর। এরপর স্বাভাবিক ভাবেই রাধাগোবিন্দ ও নিবেদিতা পরস্পরের সহযোগী হয়ে ওঠেন। কুমুদিনীর বয়স তখন আনুমানিক সাতাশ আঠাশ। তিনি ভগিনী নিবেদিতার সহযোগী হয়ে বস্তিতে বস্তিতে পরিচ্ছন্নতা আর স্বাস্থ্যরক্ষার লড়াই শুরু করেন। আসলে একাজে বেশ কিছু আলোকপ্রাপ্ত মহিলা এগিয়ে এসেছিলেন, কারণ অন্দরমহলে পুরুষদের প্রবেশাধিকার ছিলনা। লোকেরা মনে করতো অন্দরে ঢুকে কেউ টীকা দিলে, অসুস্থ মেয়েদের চিকিৎসা করলে পরিবারের আব্রু, সম্মান নষ্ট হবে। তাই তারা মরে যাবে, তাও স্বাস্থ্য কর্মী বা সমাজ কর্মীদের ঢুকতে দেবেনা। বস্তিগুলোর অবস্থা দাঁড়িয়েছিল ভয়াবহ। নর্দমাগুলো জঞ্জালে প্রায় বোজা। চারিদিকে নোংরা জল থৈথৈ। অপরিচ্ছন্নতা। তাই রোগও বাড়ছিল হু হু করে। নিবেদিতার নেতৃত্বে শিক্ষিত মেয়েরা প্লেগের লড়াইয়ে না নামলে পরিস্থিতি আরও বহুগুণ খারাপ হতে পারতো। কিন্তু যাদের জন্য করা, তারা সহজে মেনে নেয়নি। রাগের মাথায় লোকে মাথায় গায়ে ময়লা ঢেলে দিয়েছে এমনও হয়েছে। সেই ময়লাই ঝুড়ি করে তাঁরা মাথায় তুলে নিয়ে, আবার জনসচেতনতার কাজে নেমেছেন।আমার মামাতো দিদি মানে বাবলিদি বলে আমার দাদু বিকাশ বোস খুব গর্বের সঙ্গে মায়ের এসব কাহিনী ওদের শোনাতেন। আমি তো দাদুকে দেখিনি। আমার জন্মের আগের বছর তিনি মারা যান। অন্তর্জালে বিবেকানন্দের প্লেগ ম্যানিফেস্টো পড়ে আমি সত্যি অবাক হয়ে গেছি। একথা এখানে উল্লেখ করলাম, তার কারণ নিজের পারিবারিক ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে চোখের সামনে খুলে গেছে কলকাতার বা বাংলার অদেখা অধ্যায়। মহামারী অতীতে বারবার আক্রমণ করেছে, কখনো প্লেগ, তো কখনো ম্যালেরিয়া, কলেরা বা স্প্যানিশ ফ্লু – নানা রূপে। কিন্তু জাতির জীবনসংগ্রাম থেমে থাকেনি।
—––—————–/////—————–
– কলেরার মহামারী? আচ্ছা মা, তুমি যে ছোটোবেলায় গল্প বলতে, জামাই এসেছে, শাশুড়ি খেতে দিচ্ছে। জামাই একটু লেবু চেয়েছে বলে শাশুড়ি জানলা দিয়ে লম্বা হাত বাড়িয়ে থালার সামনে বসে গাছে লেবু পাড়ছে। সব কলেরায় ভুত হয়ে গেছে।
– হ্যাঁ, ঠিক মনে করেছিস। ও গল্পটার নাম গদখালির হাত। কলেরা মহামারীর গল্প।
– ওমা! আর একটা পড়ে শুনিয়েছিলে না, একজন লোক ভাবছে ম্যালেরিয়ার জ্বরে কাবু রামু আসছে পিছন পিছন কম্বল মুড়ি দিয়ে, আসলে ভালুক আসছে।
– হ্যাঁ, হ্যাঁ, নারায়ণ গাঙ্গুলির লেখা। ওটা ম্যালেরিয়ার গল্প বলা যেতে পারে।
– খুব বাজে জেঠিমা, তুমি বোনুকে সব বলে দিয়েছো, আমি শুনিনি।
– তাইতো ভারি অন্যায় হয়ে গেছে আমার। কিন্তু এগুলো এখন বলতে গেলে মোহনবাগানটা হবে না।
– হ্যাঁ হ্যাঁ ওটা আগে শেষ করো। জেঠিমা এরপরে যখন মোহনবাগান জিতবে আমরা সেনবাড়ির মতো মাটন রোস্ট খাবো, কি বলিস রে বোনু?
– সে সম্ভব হবেনা। সেই রোস্ট সেনবাড়ির পুরিয়া ঠাকুর বানাতো। তার রেসিপি আমি জানিনা।
– ইউ টিউব দেখেও হবেনা?
– তোরা শিখে করে খাওয়া তাহলেই হবে।
– এ্যাঁ!! আমরা করবো? থাক, বাকিটা বলো।
– হুঁ, যা বলছিলাম আবার সে প্রসঙ্গে ফিরি। কলকাতার এই কুলীন পরিবার গুলির মধ্যে যেহেতু অন্দরে বাইরে লেখাপড়ার চর্চা ছিল, কোনো না কোনো সদস্যের হাত ধরে ব্রাহ্ম এবং অন্যান্য সমাজ সংস্কারক ভাবনাগুলো তাদের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল। ভূপেন বসুর পুত্রবধূ মানে গিরীন্দ্রনাথ বসুর স্ত্রী মলিনা দেবী ছিলেন প্রখ্যাত আইনজীবী দ্বারকানাথ মিত্রের মেয়ে। এই দ্বারকানাথ আবার ছিলেন বিদ্যাসাগরের সহযোগী। এই গিরীন্দ্র – মলিনার পুত্র কমল বসু হয়েছিলেন কলকাতার মেয়র।
শোভাবাজার রাজবাড়িতে আমার মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনী ব্রাহ্ম পরিবারের কন্যা ছিলেন। তাঁর কবিতা ও উপন্যাসের বইগুলিতে প্রকাশ কালের জায়গায় ব্রাহ্ম সম্বৎ ছাপা আছে। কুমুদিনী ঋষি রাজনারায়ণ বসুর নাতনি। রাজনারায়ণের আত্মচরিতে লেখা আছে, তিনি রাধাকান্ত দেবের এক নাতিকে ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। সমাজ রাধাকান্ত দেবের সতীদাহের পক্ষে আর বিধবা বিবাহের বিপক্ষে দাঁড়ানোটাই বেশি করে মনে রেখেছে। তাঁর শব্দকল্পদ্রুম, স্কুল কলেজ স্থাপনগুলি মনে রাখেনি। একথাও মনে রাখেনি যে রামমোহনের পরিবারেও সতীদাহ হয়েছে, দেব পরিবারে একটিও হয়নি। অবশ্য এতে সমাজকে দোষ দেওয়া যায়না। রেঁনেশার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে রাধাকান্ত আজও ভিলেন। তবে একথা আমি মন থেকে মানি ঐ বাধার পাহাড় দাঁড়িয়ে ছিল বলেই রামমোহনের আর বিদ্যাসাগরের জয় চিরস্থায়ী। যাকগে ঐ রাজবাড়ির কথা এখানে উঠছে, কারণ ওখানে শোভাবাজার ফুটবল ক্লাব স্থাপিত হয়েছিল এবং সাহেবদের বিরুদ্ধে খেলে নামডাক ও হয়েছিল।
এবারে কেশব সেনের প্রসঙ্গে আসি। কেশব সেনের কন্যা সুনীতি দেবীর সঙ্গে বিয়ে হয় কোচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্র নারায়ণ দেবের। নৃপেন্দ্র নারায়ণ বৃটিশ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও প্রজাহিতৈষী এবং আধুনিক কোচবিহার শহরের রূপান্তর ও তাঁর হাতে হয়েছে। আবার এই বৃটিশ শিক্ষার হাত ধরেই কোচবিহারে আসে ফুটবল।
– এক মিনিট জেঠিমা। আমার একটা বন্ধু ইস্কুল ছেড়ে দিয়েছে। তার মা কোচবিহারে বদলি হয়ে গেছে। সে এখন সুনীতি অ্যাকাডেমিতে পড়ে। ফোন করেছিলো আমায়।
– আচ্ছা, এটা ঐ রানী সুনীতির নামেই ইস্কুল। রাজা রানী মিলেই তৈরি করেছেন। এই নৃপেন্দ্র নারায়ণের পুত্র রাজা রাজরাজেন্দ্র নারায়ণ মোহনবাগানের অন্যতম শুভানুধ্যায়ী হয়ে ওঠেন। তিনি মোহনবাগানের প্রথম কমিটিতেও ছিলেন। তার মানে সম্পর্কে কেশব সেন হলেন রাজরাজেন্দ্রের দাদু। এই রাজরাজেন্দ্রের এক ভাইপো মহারাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণ ফুটবল আর ক্রিকেট দুটি খেলাতেই পারদর্শী ছিলেন। বিংশ শতকের চারের দশকে রঞ্জি ট্রফিতে তিনি ছিলেন বাংলার ক্রিকেট অধিনায়ক। এই জগদ্দীপেন্দ্রের বোন হলেন জয়পুরের মহারাণী গায়ত্রী দেবী। এসব কারণেই মনে হয় মোহনবাগান নিয়মিত কোচবিহার কাপ খেলতে যেত। যা হোক, সেযুগে এত রাজা রাজড়া, ব্যবসায়ীদের সমাবেশের জন্যই বোধ হয় অন্তর্জালে লেখা আছে, ধনাঢ্য ব্যক্তিরা ব্রিটিশ আমোদের অঙ্গ হিসেবে ফুটবলের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন।
তবে মোহনবাগানের জন্মটা কেবল বৃটিশ আমোদের অনুকরণ একথা আমার সত্যি বলে মনে হয়না, কারণ ভূপেন বোস ও সেন পরিবারের উপস্থিতি। সেন পরিবার অত্যন্ত সংস্কৃতিমনস্ক এবং মানবিক। গত দেড়শো বছরে, কোনদিনই ঐ পরিবার বিরাট কোনো ব্যয়বাহুল্য করেনি, আবার ভয়ঙ্কর আর্থিক দুর্দশাতেও পড়েনি, যেটা কীর্তি মিত্রের পরিবারে হয়েছে।
গল্প শুনেছি মিত্র পরিবারে ঠাটবাট ছিলো একেবারে পাক্কা সাহেবী। খাওয়া দাওয়া হতো টেবিলচেয়ারে, একেবারে টেবিল ম্যানারস, এটিকেট সব মেনে। সেযুগে সে বাড়িতে উইক এন্ড আউটিং, হোটেল, রেস্তোরাঁয় খাওয়ার চল ছিলো। বিলাসিতা ছিলো। এর উল্টো দিকে সেন পরিবার ছিলো সংযমী। তাদেরও তো ধাপার জমিদারী ছিলো। মা গল্প করতো, ধাপা থেকে গাড়ি করে প্রচুর সব্জি, বিশেষ করে ফুলকপি আর মূলো আসতো। আত্মীয় স্বজনদের বিলোনো হতো। মায়েদের বাড়িতেও আসতো। কিন্তু ব্রহ্মনাথ, ভবনাথ এই সম্পদকে মাথায় চড়তে দেননি। এই সংস্কারে ও বাড়িতে পাঁচদিনের দুর্গাপুজো না হয়ে একদিনের অন্নপূর্ণা পুজো হয়। সেই পুজো আজও চলছে। এই যাদুবলে আজও ঐ পরিবার তাদের যৌথ বাড়িতে বাস করছে এবং মণিলাল সেনের পৌত্র, দাঁতি সেনের পুত্র প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও রাজ্যপাল শ্যামল সেনের মতো বংশের কৃতি সন্তানেরা বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। এখন শ্যামল মামাই ও বাড়ির কর্তা। আসলে সেন বাড়ির সূত্রে শ্যামল সেনের বাবা দাঁতি সেন আমার মামা। কিন্তু আর জি করের বাড়ির সূত্রে শ্যামল সেন আমার মামা। তিনি যখন রাজ্যপাল হলেন, আমরা সংবর্ধনা দিতে রাজভবনে গিয়েছিলাম।
– রাজভবনে কি আছে?
– অনেক সাজানো ঘর, মিউজিয়াম এইসব। অতিথিদের চা চক্রে চায়ে চিনি মেশানো আর নোনতায় সস মাখানোর কিংবা জামবাটি থেকে নিজের প্লেটে একটি মিষ্টি তুলে নেওয়ার চামচের মাপ যে আলাদা, অথবা কোনটার পরে কোন কাজ, এসব আদবকায়দা তো আমরা জানতুমনা। ভুলভাল হয়ে যাচ্ছিল। রাজভবনের রাজকীয় পোশাক আর পাগড়ি পরা বয়স্ক কর্মীরা মুখে কথা বলেন না। কেবল চোখের ইশারায় ঠিকটা দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। রাজভবনের অসংখ্য ঘর, কোনটায় কোন রাষ্ট্রনেতা থাকা পছন্দ করতেন, ইন্দিরা গান্ধী এসে কোন ঘরে থাকতেন, নুরুল হাসানের জন্য শয়নঘর লাগোয়া স্নানাগারের নকশা কেমন পরিবর্তন করতে হয়েছিল, সেসব মৃদুকন্ঠে কিন্তু অনর্গল বলে চলেছিলেন গাইড। এখানে উচ্চগ্রামে কথা বলা মানা। উচ্চ শব্দে কয়েক শ বছরের প্রাচীন দেওয়াল, ছাদ, আসবাব, তৈলচিত্র, প্রত্ন সামগ্রীর আঘাত লাগে। ইংরেজ আমলের স্মৃতিচিহ্নের বিশাল অংশটির তালা খুলে দেখিয়েছিলেন গাইড। আবছা আলোয় চোখ সয়ে এলে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। চোখ আটকে গেল, দেওয়ালে ঝোলানো একটি ছবিতে। দেড়শো বছর আগেকার এক তারিখে সস্ত্রীক বড়লাট রাজভবনের ফটকে নেমে আসছেন ফিটন গাড়ি থেকে। ছবিতে মানব চরিত্রগুলির তুলনায় ফিটন গাড়িটি বড় বাঙ্ময়। পিছু ফিরতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম, ঘরের মাঝসারিতে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং কালো রঙের ফিটন গাড়িটি। এও শুনলাম কর্মীরা অনেক সময়েই অতীত চরিত্রদের পদচারণা অনুভব করেন। অনেকদিন পর্যন্ত মরা আলোয় দেখা রাজভবনের জমকালো অলিগলির ঘোর কাটতেই চাইছিলনা।
– মা, তোমার কপালটা না বেশ চওড়া। অনেক কিছু দেখেছো জীবনে।
– তোরাও দেখবি, কতটুকু আর জীবন দেখেছিস।
পারিবারিক শ্রুতিতে জেনেছি যে আমার মায়ের ঠাকুরদা শরৎচন্দ্র বোসও মোহনবাগানের জন্মে যুক্ত ছিলেন এবং অর্থসাহায্য করেছিলেন। হয়তো এমন আরো মানুষ আছেন। মোহনবাগানের প্রথম কমিটিতে তাঁদের নাম নথিভুক্ত নয় বলে মোহনবাগানের ইতিহাস থেকে তাঁরা আজ হারিয়ে গেছেন। আমার মনে হয়, প্রধান পরিবারগুলি তাঁদের জীবিকার জন্য ইংরেজ সরকারের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। তাই সরাসরি বিরোধিতা করা সম্ভব ছিলনা। যদিও এর ব্যতিক্রম ভূপেন বোস। বঙ্গভঙ্গের পর প্রথম সঞ্জীবনী পত্রিকায় স্বদেশী ও বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন ব্রাহ্ম নেতা কৃষ্ণকুমার মিত্র। তিনি আমার মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনীর বাবা, রাজনারায়ণ বসুর জামাই, অরবিন্দ ঘোষের মেশোমশাই। আর ভূপেন বোস সরাসরি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। কুমুদিনী শোভাবাজার রাজবাড়িতে বসেই কলম দিয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে আগুন ঝরিয়েছেন। এতে অবশ্যই স্বামী শরৎচন্দ্রের পূর্ণ সমর্থন ছিল, নইলে তাঁর পক্ষে এসব কাজ সম্ভব ছিলনা। আরও একটা বিষয় আমাকে খুবই অবাক করেছে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে কৃষ্ণকুমারের কারাদন্ড হয়। তিনি আগ্রা ফোর্টে বন্দী হন। অথচ একই পথের পথিক কন্যা কুমুদিনীর গায়ে পুলিশের আঁচ লাগেনা কেন? শ্বশুরবাড়ি মানে শোভাবাজার রাজবাড়ি এবং বাকি ক্ষমতাবান পরিবারগুলির অক্ষ বা জোট কি তাঁর নিরাপত্তার ঢাল হয়ে দাঁড়ায়? দেড়শ বছর পরে ইতিহাস পুনর্গঠন খুবই কঠিন। অনেক সময়েই অনুমানের ভিত্তিতে তথ্য হাতড়াতে হয়। যদিও ১৮৮৯ সালে মোহনবাগানের জন্মের সময়ে তিনি নববধূ, কোলে সদ্যজাত জ্যেষ্ঠপুত্র সতীশ চন্দ্র। তবে পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ প্রমাণ করে মোহনবাগানের জন্মকালে জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল। এরপরেও সেকালে লেখাপড়া জানা কলেজের গন্ডিতে পৌঁছনো মানুষজনের ওপরে ছিল ডিরোজিওর প্রভাব। এইসব কারণে আমার মনে হয় লেখাপড়া, ডিরোজিও এবং ব্রাহ্ম ও অন্যান্য সমাজ সংস্কারের সান্নিধ্যে এসে এই পরিবারগুলির মনে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হয়। সেই আবেগ ফুটবল দলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে, যা পূর্ণতা পায় ১৯১১ সালে, খেলার মাঠে ইংরেজের দল ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে হারিয়ে।
– মা আমার ভীষণ এক্সাইটেড লাগছে। কাল জিরে ধনে দিয়ে সেনবাড়ির মতো পাতলা পোনা মাছের ঝোল করবে?
– ঘরে তো নোনা মাছ ভর্তি। বাবাকে বল তাহলে কাল হুইল ছিপ বা জাল ফেলতে। রুই বা কাতলা যদি ওঠে। পোনা মাছ না থাকলে কিকরে ঝোল খাবি?
– বাড়িতে তো কখনো সখনো ওরকম ঝোল করো, রোজ করোনা কেন?
– কি করে করবো বল? তোর বাবা পোনা মাছ আনতে চায়না, খেতে চায়না। এ বাড়িতে তো তেল মশলা, পেঁয়াজ, সর্ষেবাটা, টক এসবের চল বেশি। জিরে ধনের ঝোলকে বলে সেদ্ধ ঝোল। খেলে নাকি পেটে চড়া পড়ে যাবে।
–——————––//////////———–
যাকগে, এসব কথা ছাড়। আর একটা কথা জানিস?
মোহনবাগানের প্রথম দিকের দলের একটি নাম নিয়ে আমি খুবই আগ্রহী। ইনি কে?
সেই নামটি হল দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু। মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনী বসুর প্রথম দিককার বই ১৯০৬ এ প্রকাশিত মেরী কার্পেন্টার – এর প্রকাশকও দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু।
ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে ইংরেজ মহিলা শিক্ষাবিদ মিস মেরী কার্পেন্টার কলকাতায় আসেন। রাজনারায়ণ বসুর ও অন্যান্য পন্ডিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। কুমুদিনীর বইতে পড়লাম যে খুব অল্প বয়সে ইংল্যান্ডে তাঁর সঙ্গে রাজা রামমোহন রায়ের সাক্ষাৎ হয়েছিল। তারপর থেকে তিনি ভারতবর্ষের প্রতি কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। ১৮৭৬ সালে তিনি বঙ্গ মহিলা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। তাঁরই জীবনী এই বই।
তখনকার নব্যলেখিকা কুমুদিনী সম্ভবত সিটি কলেজের অধ্যাপক পিতা কৃষ্ণকুমার মিত্রের পরিচয়টি কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন, তাই লেখিকার নাম ছাপা আছে শ্রী কুমুদিনী মিত্র বি. এ., বিবাহিতা বলে কুমারী লিখতে পারেননি। আজও সুচিত্রা সেনের দৌহিত্রীর নাম রাইমা দেব বর্মন না হয়ে সেন হয়, এও কতকটা তেমন। যাই হোক, পিতার সঞ্জীবনী পত্রিকার সহসম্পাদক ও সহযোদ্ধা দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির শ্যালক মানে, প্রথম বাঙালিনী চিকিৎসক কাদম্বিনীর ভাইও দ্বিজেন্দ্রনাথ বসু। সমকালে এই তিন দ্বিজেন্দ্রনাথ কি এক মানুষ নাকি আলাদা? আবার এও হতে পারে তিনি ভূপেন্দ্রনাথের আত্মীয়। সন্ধান করছি এখনো, উত্তর পাইনি।
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে আমার দাদু বিকাশচন্দ্রের পরিবার, আর ছোটোপিসিদিদার পরিবারে শনির দশা শুরু হয়। ১৯২১ এ আমার বড়দাদু মানে শরৎ – কুমুদিনীর জ্যেষ্ঠপুত্র সতীশচন্দ্রের তেত্রিশ বছর বয়সে স্প্যানিশ ফ্লুতে অকস্মাৎ মৃত্যু থেকে এই বিপর্যয়ের শুরু।
– ফ্লু তে? মানে কুমুদিনীর বড়ো ছেলে জ্বর হয়ে মারা গেলো?
– হ্যাঁ, ডালহৌসি পাড়ায় মার্কেন্টাইল বিল্ডিংয়ে ওনার বড় অফিস ছিলো। বাবার কাপড়ের ব্যবসার সঙ্গে, নানা কোয়ালিটির কাগজ, তার কালি, অন্যান্য উপকরণ মানে নানারকম প্রিন্টিং গুডসের ব্যবসা ছিল। দেশে তখনও কালি কলমের উৎপাদন তেমনভাবে শুরু হয়নি। ইংল্যান্ড থেকে জাহাজে টাইপ রাইটার, নানা ধরণের কাগজ, কালি কলম, পেনসিল এসব আমদানি করা হত। আর সতীশচন্দ্র এগুলো বিভিন্ন স্তরের গ্রাহকের কাছে অর্ডার অনুযায়ী সাপ্লাই করতেন। সেই অফিসের কিছু কাগজ পত্র, তাঁর স্বহস্তে লেখা হিসেবের খাতা আজও পরিবারের কাছে আছে। যদিও কালিতে চুবিয়ে কলম দিয়ে লেখা আজ অনেকটাই আবছা হয়ে গেছে। যাই হোক, সে সময়ে ধীরে ধীরে বড়ছেলে হিসেবে তিনি বাবার সব দায়িত্ব নিচ্ছিলেন। কিন্তু ১৯২১ এর এক বিকেলে জ্বর নিয়ে বাড়ি ফিরলেন, সেই যে শুলেন, আর উঠলেন না। দুদিন ঐভাবে কাটলো। তিনদিনের দিন তাগড়া জোয়ান ছেলে শেষ হয়ে গেলো। পিছনে রয়ে গেলো বাবা মা, দুটো ছোটো ছোটো ভাই, নিজের বৌ প্রতিমা, আর তিনটে বাচ্ছা – মুকুল, বকুল আর সুকুল। মুকুলের তখন সাত আট বছর হবে, বকুল তখন আড়াই, সুকুল তখন ছ মাসের। আমার দাদু বিকাশচন্দ্রের বয়স তখন আঠেরো আর ওনার ওপরের দাদা ক্ষিতীশচন্দ্র তখন কুড়ির কোঠায়। দুজনের কারোরই সংসারের হাল ধরার বয়স হয়নি। রাজবাড়িতে আতুপুতু করে মানুষ হয়েছে। কষ্ট করে বড়ো হলে, তাও একটা ম্যাচিওরিটি থাকতো।
এই স্প্যানিশ ফ্লুতেই ১৯১৮ সালে মৃত্যু হয় চিকিৎসক আর জি করের। ১৯৯৮ সালে প্লেগ মহামারী তাঁর কাছে হার মানলেও, এবারে অন্য রূপে এসে মহামারী তাঁর প্রাণ কেড়ে নিলো।
এদিকে শোভাবাজারের বাড়িতে, বড়ো ছেলের শোক শরৎচন্দ্র সইতে পারলেন না। দুবছরের মধ্যে হৃদরোগে তাঁর মৃত্যু হলো। কুমুদিনী রাজবাড়িতে বসে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন, কিন্তু বাড়িতে মাথায় তাঁর ডাকসাইটে ব্যবসায়ী শরতের ছায়া ছিলো। সেই ছায়া সরে যেতেই নানা পারিবারিক জটিলতা শুরু হলো। কুমুদিনীর পক্ষে ঠাকুর দেবতা নিয়ে কঠোর বৈধব্য যাপন সম্ভব ছিলোনা। তিনি তখন সেজ ছেলে সুরেন্দ্রনাথের বাড়িতে থাকতে শুরু করলেন। সুরেনকে ছোটোবেলায় হাটখোলা দত্ত বাড়িতে দত্তক নেওয়া হয়েছিল।
– কঠোর বৈধব্য জীবন? কীভাবে থাকতে হতো বিধবাদের?
– সময়টা উনিশ শতক। বিধবাদের নিরামিষ খেতে হতো। অনেক সময়ে স্বামীর মৃত্যুর পর কমবয়সী বিধবাদের তাঁদের বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হত। পতিগৃহে সাধারণভাবে তাঁদের স্থান হতো না। তবে কুমুদিনী যখন বিধবা হন, তাঁর বয়স একান্ন। তাই সেরকম সম্ভাবনা হয়তো ছিলোনা। সিঁথির সিঁদুর মুছে, দেহের সব অলঙ্কার খুলে ফেলে, চুল কেটে, সাদা থান পরে, এক বেলা নিরামিষ খেয়ে খিদে চেপে তাঁদের বৈধব্য পালন করতে হত। না খাওয়া থেকে হতো অপুষ্টি। ফলে অসুখ বিসুখ শরীরে বাসা বাঁধতো। শুধু আমিষ বর্জন নয়, মুসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন ইত্যাদি খাওয়ার ব্যাপারেও বাধানিষেধ ছিল, কারণ এসব খাবারকেও আমিষকে ধরা হয়। তাদের আলাদা নিরামিষ রান্নাঘর থাকতো। আলাদা খেতে বসতো। তাদের সামনে সবাই চর্ব্য চোষ্য, লেহ্য, পেয় খেয়ে যাবে। আর তারা সেদ্ধ ভাত, শাকপাতি খাবে, এই ছিলো বিধান। বিধবারা মুখবুজে সংসারে ঝি গিরি করবে, বাকিদের সেবা করবে, করুণার পাত্র হবে। আর ঠাকুর দেবতা নিয়ে শুদ্ধমনে পবিত্র জীবনযাপন করবে এইটেই ছিল সমাজের দাবী। বহু বিধবাকে জোর করে তীর্থক্ষেত্রে রেখে আসা হত । চোখের আড়ালে কাশী, বৃন্দাবন ইত্যাদি জায়গায় তাঁরা কীভাবে জীবন-যাপন করছে – সে খবরও কেউ রাখতো না।
– কুমুদিনীকে এসব করতে হয়নি তো মা? খুব কষ্ট।
– সেটা তো বলতে পারবোনা, কতটা রীতি উনি মেনেছিলেন বা মানতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে একটা কথা আছে জানিস।
– কী কথা?
– কুমুদিনীর দুটো ছবি আছে আমার কাছে। একটা তরুণী বয়সের পোট্রেট, মেজ ছেলে জ্যোতিষের মানে আমার মেজদাদুর আঁকা। হয়তো মায়ের কোনো ফটোগ্রাফ দেখে এঁকেছিলেন। আর একটা বেশ পাশ করে মুখ, পোজ দিয়ে তোলা ফটো। তখন পূর্ণ যুবতী। দুটোর একটাতেও মাথায় সিঁদুরের রেখা নেই। সাদা কালো স্পষ্ট ছবি। সিঁথি সাদা। তার মানে কি এই, যে হিন্দু পরিবারে বিয়ের পরেও উনি নিজের ব্রাহ্ম ধর্ম ধরে রেখেছিলেন?
– বলো কি মা! এযে সিনেমার মতো। যোধা কৃষ্ণ নিয়ে আগ্রা যাচ্ছে আকবরের মহলে।
– হ্যাঁ এখানে উল্টো। ব্রহ্ম ভাবনা নিয়ে গেলেন এমন মহলে, যেখানে গৃহদেবতা রাধারমণ – কৃষ্ণ।
– ব্রাহ্ম বিয়েতে বুঝি সিঁদুর পরায় না?
– সঠিক জানিনা, তবে না পরানোই উচিত। বইতে পড়েছি, ১৮৫০ নাগাদ যে ব্রাহ্ম বিবাহ আইন হয়, তাতে আন্তর্বর্ণ বিবাহ ও বিধবা বিবাহ সমর্থন, বাল্য বিবাহ রদ, স্বামী বা স্ত্রী কর্তৃক দ্বিতীয় বিবাহ ও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ এবং বিবাহ বিচ্ছেদ স্বীকৃত ছিলো। বিবাহের রীতি হিসেবে বলা যায়, সাবালক পাত্র-পাত্রীরা ব্রাহ্ম সমাজ মন্দিরে উপস্থিত হয়ে স্ব স্ব ধর্মে বহাল থেকে ব্রাহ্ম রীতিতে সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্টে বিয়ে করতে পারতো। ব্রাহ্ম বিয়েতে সংস্কৃতের পরিবর্তে বাংলায় মন্ত্রোচ্চারণ হয় ৷ শেষে বর কনে, অভিভাবক, উপস্থিত অতিথিরা প্রার্থনা সভায় অংশ নেন এবং ব্রাহ্ম সংগীত গেয়ে বর-কনের মঙ্গল কামনা করেন। যৌতুক দেওয়া নেওয়া ও বিরাট লোক খাওয়ানো, বিলাসিতা, আড়ম্বর এসব চলেনা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, শোভাবাজার রাজবাড়িতে শরৎ বোস ১৮৮৬-৮৭ সালে এইভাবে বিয়ে করেছিলেন?
আমি একটাই সান্ত্বনা খুঁজি জানিস, কুমুদিনী যদি ব্রাহ্ম ধর্ম বজায় রাখেন, তবে একাদশী পালন, চোদ্দ গন্ডা উপোস, নির্জলা উপোস, এসব বোধহয় করতে হয়নি। সঠিক জানার তো উপায় নেই, শুধু কল্পনা।
এই শরৎ বোস চরিত্রটাকে নিয়ে এসব কথা যতো ভাবি, অবাক হয়ে যাই, অবিশ্বাস্য লাগে। নিজে ইংরেজের সঙ্গে ব্যবসা করছেন, সাহেব মেমের সঙ্গে দিবারাত্র খানাপিনা চলছে। প্রাসাদে বিলিতি জিনিস, ভোগ বিলাসের ফোয়ারা উঠছে। অথচ সন্তর্পণে বৌয়ের পত্রিকার টাকা যুগিয়ে যাচ্ছেন, বিপ্লব, সংগ্রামের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। বৌ প্লেগের লড়াইয়ে নামছেন, জাতীয় কংগ্রেসের পতাকা সেলাই করে দিচ্ছেন, সেসবে কোনো বাধা দিচ্ছেন না। আবার ইংরেজের রোষ থেকেও বৌকে নিজের প্রতিপত্তি দিয়ে রক্ষা করে যাচ্ছেন, এমন বরকে হারালে, যে কোনো মেয়েই ভেঙে পড়বে, সে যতো বড়ো নেত্রী হোক না কেন? মেয়েলি মনটা কোথায় যাবে? তাছাড়া কুমুদিনী তো শুধু যোদ্ধা নন, লেখিকা, কবি। সংবেদনশীল মন ছিলো।
– কুমুদিনী কবিতাও লিখেছেন?
– হ্যাঁ, পূজার ফুল তো কবিতার বই।
– শরৎ মারা যাওয়ার পরে, কুমুদিনী কি শোভাবাজার রাজবাড়ির পাট পুরো চুকিয়ে হাটখোলায় সেজ ছেলের বাড়িতে এলেন?
– হ্যাঁ। এমনকি রাজবাড়ির বিধবা ভাতা নামক মোটা মাসোহারাও গ্রহণ করতে তিনি পরে অস্বীকার করেছিলেন। হাটখোলার দত্ত বাড়ি আন্দুলের দত্ত চৌধুরী জমিদার বংশের একটি শাখা। অভিনেতা বসন্ত চৌধুরী এই দত্ত চৌধুরী বাড়ির ছেলে। হাটখোলার দত্তরা আবার কলকাতার অন্য জমিদারদের মতো ইংরেজ ভজা বংশ ছিলোনা। বরং এই পরিবারে দেশাত্ববোধ প্রবল ছিলো। কুমুদিনীর দিদা মানে ঋষি রাজনারায়ণ বসুর স্ত্রী নিস্তারিনী হাটখোলা দত্ত বাড়ির মেয়ে। নেতাজী সুভাষের মা প্রভাবতীও এই বংশের মেয়ে।
– তাই নাকি?
– কুমুদিনীর সেজ ছেলে সুরেন্দ্রনাথের বৌ আবার আন্দুল রাজবাড়ির মেয়ে।
– আন্দুলের দত্ত চৌধুরী?
– না না। আন্দুল রাজবাড়ি হলো কর – রায় – মিত্র বাড়ি। প্রথমে ছিলো কর, ইংরেজ ভজিয়ে উপাধি পেলো রায়, পরে ছেলে নেই, তাই জামাইয়ের হাতে জমিদারী গেছে। তারা মিত্র। এই আন্দুল রাজবাড়িতে তিরিশ বছর বয়সে সুরেনের মৃত্যু হয়।
– মানে শ্বশুরবাড়িতে ঘুরতে এসে মারা গেলো?
– হ্যাঁ। তার বৌ তখন সদ্য কিশোরী, কোলে কয়েকমাসের বাচ্ছা। কিন্তু কেন যে সুরেন মারা গেলো, সেই রহস্যের কিনারা আজও হয়নি।
– কিন্তু কেন? সেনবাড়ির অতো অ্যাটর্নি রয়েছে কুমুদিনীর হাতে, কিনারা হলোনা কেন?
– পয়েন্টটা ঠিকই রেজ করেছিস।
১৯২১ সালে স্প্যানিশ ফ্লুতে জ্যেষ্ঠ পুত্র সতীশকে হারানোর ব্যথা কুমুদিনী সামলেছিলেন স্বামী শরৎকে আঁকড়ে ধরে। ধুরন্ধর ব্যবসায়ী, ইংরেজি, ফরাসি ভাষায় সুপন্ডিত শরৎ সর্বকাজে যিনি কুমুদিনীকে আগলে রাখতেন, সংসারের আঁচটি লাগতে দেননি গায়ে, যাঁর পরম আশ্রয়ে সাহিত্য সেবা, দেশসেবা দুই ই চালিয়ে গেছেন নিশ্চিন্তে, সেই শরতের হাতটি ছেড়ে গেলো ১৯২৩ এ। পারিবারিক শ্রুতি বলে স্বামীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন কুমুদিনী। শোক ভুলতে দ্বিগুণ উদ্যমে আবার কর্মে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। তৃতীয় পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঐ তেইশ সালেই পুরো পরিবারকে শোভাবাজার রাজবাড়ি থেকে নিয়ে যান হাটখোলার দত্তবাড়িতে। এর পরে কুমুদিনী এবং তাঁর উত্তর পুরুষেরা আর কোনদিন ফিরে যাননি সেখানে। সাতবছর সেখানেই কাটে। ১৯৩০ এ শ্বশুর বাড়ি আন্দুল রাজবাড়িতে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় সুরেন্দ্রের। ওটা তো কুমুদিনীর নিজের অধিকারের বাড়ি নয়। তাই ওবাড়ি ছাড়লেন আবার। এবারে তিনি উঠে এলেন ফড়িয়াপুকুরের একটি ভাড়া বাড়িতে। তখন পরিবারে জ্যেষ্ঠ পূত্রবধূ প্রতিমা, তাঁর তিনটি কিশোর ও বালক পুত্র, মুকুল, বকুল ও সুকুল – পনেরো, তেরো আর এগারো বছর বয়স্ক। দুই পুত্র ক্ষিতীশ ও বিকাশ – তিরিশ ও সাতাশ বছর বয়স। কুমুদিনীর বয়স আটান্ন। না সুরেন্দ্রের মৃত্যুর কিনারা করতে পারেননি কুমুদিনী। কিন্তু কেন?
সেটা বুঝতে গেলে দেশের আর ওনার নিজের পরিস্থিতি বুঝতে হবে। দেশে তখন আইন অমান্য আন্দোলনের দামামা বাজছে। কয়েক বছর আগে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে, লালা লাজপত রায়ের মৃত্যু হয়েছে। সেই আগুন তখনও জ্বলছে ধিকি ধিকি। বঙ্গলক্ষ্মী, সুপ্রভাত এসব পত্রিকার কাজের আড়ালে বিপ্লবী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। সঙ্গে চলছে বঙ্গীয় নারী সমাজের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ। এই অবস্থায় ইংরেজ পুলিশের সাহায্য চাওয়া সম্ভব ছিলনা তাঁর পক্ষে।
আমার মা মানে কৃষ্ণা বলতো যে সেযুগে এতো চিকিৎসা নিয়মিত চেক আপ এসব তো ছিলোনা। উল্টে কেবল খাওয়া দাওয়ার বোল বোলাও ছিলো। তাই সেজদাদুর মৃত্যু হয়তো স্বাভাবিকই ছিলো।
– কিন্তু কিছুই কি জানা যায়নি?
– হ্যাঁ শুনেছি, খুব ভারি খাওয়াদাওয়া হয়েছিল। শরীরে অস্বস্তি হচ্ছিল। মৃত্যুর পরে ঠোঁট নাকি নীল হয়ে গিয়েছিলো। আমি ইন্টারনেটে খুঁজেছি, হার্ট অ্যাটাকেও মৃতদেহের এমন হতে পারে। সুরেন্দ্রনাথের বাবা শরৎও তো হৃদরোগে মারা গেছেন। ছেলেরও হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কোনো তদন্ত বা পোস্ট মর্টেম তো হয়নি। তখন প্রত্যক্ষদর্শীরা ঐ নীল ঠোঁট দেখে গুজব ছড়িয়েছিলো সুরেন বিষ খেয়েছে। আজ একশো বছর পরেও সেই কাঁটা আমাদের পরিবারে বিঁধে রয়েছে। যদিও আমি এসব মন থেকে মুছে ফেলেছি।
কিন্তু কুমুদিনীর কথা ভাবি। বঙ্গভঙ্গের পরে দুই মাস্তুত দাদা, অরবিন্দ আর বারীন আলিপুর বোমার মামলার আসামী। বাবাও জেলে ছিলেন। ১৯২৫ থেকে ১৯২৭ পর্যন্ত তিনি বঙ্গলক্ষী পত্রিকার সম্পাদিকা ছিলেন। আশা করা যায় হয়তো সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই এই পত্রিকার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। সঙ্গে অন্য লেখালেখিও চলছিল। কারণ আমাদের বাড়িতে যে দুটি বই আছে, তার মধ্যে কবিতার বই ‘পূজার ফুলের’ প্রকাশ কাল ১৯২৫ এবং উপন্যাস ‘বোঝবার ভুলের’ প্রকাশকাল ১৯২৭। সুপ্রভাত এবং বঙ্গলক্ষী ছাড়াও তাঁর সম্পাদিত আরও একটি পত্রিকার নাম পাচ্ছি। সেটি হল ‘অন্তঃপুর’। ১৯০০ সালে এর প্রথম সম্পাদিকা বনলতা দেবীর মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন কুমুদিনী ও হেমন্তকুমারী চৌধুরী। এবারে আসি রাজনৈতিক কার্যকলাপ বিষয়ে। ১৯২১ সালে কুমুদিনী বসু, লেডি অবলা বসু, কামিনী রায়, মৃণালিনী সেন, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী প্রভৃতি মিলে তৈরি করেন – ‘বঙ্গীয় নারী সমাজ’ নামে একটি সংগঠন, যাঁর সভাপতি হন কামিনী রায়। এঁরা মিলিত ভাবে ঐ বছরে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের নির্বাচনে মহিলাদের ভোটাধিকার পাওয়ার জন্য জোরদার সওয়াল করেন। এঁদের সমর্থন করেন, তখনকার দিনের তাবড় ব্যক্তিরা, যেমন – সুরেন্দ্র মোহন বসু, রামানন্দ চ্যাটার্জি, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি, বিপিন চন্দ্র পাল প্রভৃতি। কিন্তু ইংরেজ সরকারকে এ প্রস্তাবে রাজি করানো গেলনা। এই ব্যর্থতায় হতাশ না হয়ে আন্দোলন আরও জোরদার করার লক্ষ্যে বঙ্গীয় নারী সমাজ মাদ্রাজের উইমেনস ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে জোট বাঁধে। সেই সঙ্গে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামের মহিলা সমিতিগুলি এই আন্দোলনে যোগ দেয়। কামিনী রায়, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন এবং বেগম সুলতান মুয়াজিদজাদা তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড লিটনের সঙ্গে দেখা করেন এবং মহিলাদের ভোটাধিকারের দাবী জানান। ইংরেজ সরকার শেষ পর্যন্ত এই দাবী মেনে নিতে বাধ্য হন। এরপর ১৯২৩ সালে কলকাতার পুরভোটে এবং ১৯২৬ সালে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের নির্বাচনে মহিলারা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। বিশ্বের অনেক দেশেই মেয়েরা এর অনেক অনেক পরে ভোটাধিকার পেয়েছেন। কত আত্মবিস্মৃত জাতি আমরা যে অগ্নিশিখাসম এই নেত্রীদের সম্পূর্ণ ভাবে ভুলে বসে আছি। এইসব কারণে কুমুদিনী অনেক আগে থেকেই ইংরেজের হিট লিস্টে ছিলেন, এটাতো ধরে নেওয়াই যায়। তিনি আবার থানা পুলিশ করলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে পড়ার সম্ভাবনা ছিলো ষোলো আনা। তাই ছেলের মৃত্যুর কোনো কিনারা করতে পারলেন না। সেটা ধামা চাপা পড়ে গেলো।
ট্রাজেডি হচ্ছে বাইরে কর্মজগতে যিনি আগুন ছড়াচ্ছেন, তাঁরই প্রিয়জনেরা এক এক করে তাঁকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ঠিক এই সময়ে যখন কুমুদিনীর সবচেয়ে সাপোর্টের দরকার, তখন জানা গেলো, যে সতীশের বৌ প্রতিমা যিনি সংসারের হাল ধরে রেখেছিলেন, তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত। পরিবারের বাকিরা যাতে সংক্রমিত না হয়, তার জন্য প্রতিমা কাশীর বাড়িতে চলে যান। যাওয়ার আগে ভ্রাতুষ্পুত্রী ভারতীর সঙ্গে বিকাশের বিয়ে দিয়ে যান তিনি। এই বিয়ের সময়কাল ১৯৩১। একবছর পরে একটি পুত্র সন্তানের (বিমানচন্দ্র, আমার বড়মামা) জন্ম দেন ভারতী। কিন্তু বাড়িটি একটি পৌত্রের হাসিতে মুখরিত হতে হতেও থমকে যায়। কারণ ১৯৩৩ শে কাশীতে মারা যান প্রতিমা আর ফড়িয়াপুকুরের বাড়িতে এক বছরের পুত্র রেখে, মারা যান সদ্য মা হওয়া ভারতী। দুর্যোগের যেন শেষ হওয়ার নাম নেই। পরের বছর ১৯৩৪ শে মাংস খেতে খেতে মাড়িতে হাড় ফুটে সেপটিক হয়ে মারা যান সতীশ – প্রতিমার জ্যেষ্ঠ সন্তান উনিশ বছরের সদ্য তরুণ মুকুল চন্দ্র। কুমুদিনী তখন কলকাতা কর্পোরেশনের নির্বাচিত কাউন্সিলর। জানিনা আর সহ্য করার মতো ক্ষমতা ছিল কিনা কুমুদিনীর। দেশের জন্য জীবনটা উৎসর্গ করলেন যিনি, তাঁর ওপর একি ঈশ্বরের অবিচার নয়?
পাগলের মতো যখন কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তখন আশ্রয় দাতা হয়ে আসেন বড় জামাই ভূতিবাবু আর তাঁর দাদা দাঁতি সেন। কুমুদিনীকে পরামর্শ দেন ফড়িয়াপুকুরের বাড়ি ছেড়ে তাঁর কাছাকাছি থাকতে। বৃহৎ যৌথ সেন পরিবার যাতে ছাতা হয়ে দাঁড়াতে পারে নিয়তি তাড়িত পরিবারটির মাথায়। কুমুদিনী ফড়িয়াপুকুরের বাড়ি ছেড়ে উঠে আসেন বাগবাজারের শ্যামপার্কের ধারে। সেনবাড়ির লাগোয়া, নববৃন্দাবন মন্দিরের উল্টো দিকে দাঁতিসেনের একটি ফাঁকা বাড়ি ভাড়া নিয়ে। আসার পর দাঁতি সেন উদ্যোগী হয়ে তাঁর শ্যালিকা লাবণ্যপ্রভার সঙ্গে বিকাশের দ্বিতীয় বার বিবাহ দেন। লাবণ্যর বংশ পরিচয় আগেই দিয়েছি। যদিও আর জি কর অনেক আগে ১৯১৮ সালে মারা গেছেন, তাঁর সঙ্গে কুমুদিনীর প্লেগের লড়াইয়ের সময়ে পূর্ব পরিচয় ছিল। তাই এ সম্বন্ধে তাঁর কোনো আপত্তি হয়নি।
– জেঠিমা, একটা কথা বলছি, কংগ্রেস ও গান্ধীজীর নেতৃত্বে বৃটিশ বিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় তো ১৯২০ থেকে ২২। তার মানে স্প্যানিশ ফ্লু অতিমারীর আবহেই দেশে আন্দোলন চলছিল?
– হ্যাঁ।
– আর বঙ্গভঙ্গের সময়ে কুমুদিনীর ভূমিকা কী?
– বলছি, কুমুদিনীর কর্মজীবন সম্পর্কে খুঁজতে খুঁজতে উত্তর বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি পি এইচ ডি থিসিস (লেখক সুপ্রিয় পাঠক) পেলাম। সেখানে কিছু তথ্য পেয়েছি। ১৮৯৭ সালে শিকাগো ধর্মমহাসভা থেকে বিশ্বজয় করে দেশে ফেরার পরে কলকাতার যুবসমাজে বিবেকানন্দের প্রভাব খুব বেড়ে যায়। গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা ভালো – এই আদর্শ যুবসমাজের মর্মে প্রবেশ করে। পাড়ায় পাড়ায় ব্যায়ামাগার গজিয়ে ওঠে। ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের পরে এইসব ব্যায়ামাগারের আড়ালে কলকাতায় গোপন বিপ্লবী সমিতির কার্যকলাপ বাড়তে থাকে। কলকাতার প্রভাবশালী মহিলাদের মধ্যে ভগিনী নিবেদিতা, কুমুদিনী বসু, সরলা দেবী ঘোষাল এই সব সমিতির কাজে জড়িয়ে পড়েন। বাংলার অন্দরমহলে ইংরেজ বিরোধী বিদ্রোহের আগুন বৃহত্তর সমাজের চোখের আড়ালে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে। বিদেশি জিনিস বয়কটের ডাক দেওয়া হয়। কিন্তু বিদেশি জিনিসের স্বদেশী বিকল্প তো লোককে দিতে হবে। সেই বিকল্প সরবরাহের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয় স্বদেশী ভান্ডার, স্বদেশী মন্ডলী, মহিলা সমিতি, লক্ষীর ভান্ডার প্রভৃতি সংস্থাগুলি। এই সব সংস্থার পরিচালনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা করেছিলেন যাঁরা, তারা হলেন ভগিনী নিবেদিতা, স্বর্ণকুমারী দেবী, সরোজিনী বোস, সরলাদেবী চৌধুরানী, নবশশী দেবী, সুশীলা সেন, কমলকামিনী গুপ্ত, ড. নীলরতন সরকারের স্ত্রী নির্মলা সরকার, ড. প্রাণকৃষ্ণ আচার্যের স্ত্রী সুবলা আচার্য, ড. সুন্দরী মোহন দাসের স্ত্রী হেমাঙ্গিনী দাস এবং অবশ্যই কুমুদিনী বসু। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে এইভাবে তাঁর জড়িয়ে পড়া অবশ্যই বাপের বাড়ির প্রভাবে। কারণ বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে দেখছি দেশবাসীকে ব্রিটিশ পণ্য বয়কট ও স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের ডাক দিচ্ছেন সঞ্জীবনী পত্রিকার সম্পাদক কৃষ্ণকুমার মিত্র ১৯০৫ এর পয়লা জুলাই, যিনি কুমুদিনীর পিতা। এখানে একটি কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, সঞ্জীবনীর যুগ্ম কর্ণধার এবং কৃষ্ণকুমারের সহযোগী ছিলেন কলকাতার প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর স্বামী স্বনামধন্য দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী। পিতা আগুন ঝরাচ্ছেন সঞ্জীবনীর পাতায়। সেই আগুন অন্তঃপুরে ছড়িয়ে দিচ্ছেন কন্যা, সুপ্রভাত নামক মহিলা পত্রিকার পাতায়। এমনকি তিনি বেঙ্গল কেমিক্যাল, ওরিয়েন্টাল সোপ প্রভৃতি দিশি উৎপাদনের বিজ্ঞাপন শুরু করেন সুপ্রভাত পত্রিকায়। ইংল্যান্ডের নর্দাম্পটনের স্মিথ কলেজ থেকে ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ পড়লাম। লেখিকা এলিজাবেথ আর্মস্ট্রং। সেখানে লেখা আছে কুমুদিনী এবং তাঁর ভগ্নী বাসন্তী মিত্র মিলে সুপ্রভাত পত্রিকার সূচনা করেন। এই পত্রিকায় নানা লেখায় দেশমাতৃকা রক্ত ও জীবনের বলিদান চাইছেন, এর জন্য যোদ্ধা দরকার এসব কথা স্পষ্ট ভাবে বলা হত। এবং এর সঙ্গে শিক্ষার সুযোগ, বিবাহ প্রতিষ্ঠান ও আইনের প্রতিবিধানের মধ্যে নারীকে সমানাধিকার দিতে হবে সে দাবীও সোচ্চারে তোলা হত। লেখিকা মনে করছেন সেযুগের মহিলার পক্ষে এই ভাবনা তাঁর বিপ্লবী মনের পরিচয় দেয়। এর সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই পরবর্তী তথ্য পাই। সশস্ত্র বিপ্লবীদের আড়াল থেকে সাহায্য করেছিলেন যেসব মহিয়সীরা সেই তালিকাতে নিবেদিতা ও কুমুদিনী দুজনেই আছেন। কুমুদিনীর মাও কিন্তু বসে ছিলেন না। স্বামী বিবেকানন্দের ছোট ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ১৯০৭ সালে কারাবন্দী হন। তখন লীলাবতী মিত্রের নেতৃত্বে দুশোজন নারী ভূপেন্দ্রনাথের মায়ের কাছে সান্ত্বনা পত্র পাঠান। এমন কথাও পড়লাম যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লীলাবতীর কাছে সহায়সম্বলহীন অনাথ বিধবা বালিকাদের পাঠাতেন দেখাশুনা করার জন্য। লীলাবতী এমন অনেকগুলি বিধবা কন্যার বিবাহ দিয়েছিলেন। তাঁর নাকি আক্ষেপ ছিল বেশি লেখাপড়া শিখতে পারেননি বলে মনের কথাগুলি লিখে প্রকাশ করতে পারেননা। কন্যা কুমুদিনী ও বাসন্তীর যাতে এমন না হয়, তার জন্য কন্যাদের উচ্চশিক্ষা তিনি নিশ্চিত করেছিলেন। যা হোক, আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় ১৯১১ সালে। আর ঐ বছরেই অকালে জীবনদীপ নিভে যায় ভগিনী নিবেদিতার। এর ঠিক দশ বছরের মাথায় সতীশের মৃত্যু থেকে কুমুদিনীর পারিবারিক বিপর্যয় শুরু হয়। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বললে হয়তো খুব অপ্রাসঙ্গিক হবেনা। আমরা তো মোহনবাগানের গল্প বলতে বসেছিলাম। এইসময়ে ১৯২০ তেই বাংলায় আর একটি ইতিহাস সৃষ্টিকারী ফুটবল দল ইস্টবেঙ্গলের জন্ম হয় – যার সঙ্গে মোহনবাগানের দ্বৈরথ একদিন অমরত্ব লাভ করবে।
আর একটা কথা জানলে হয়তো তোদের ভালো লাগবে, ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাসে কুমুদিনীর নাম জুড়ে আছে।
– তাই নাকি, কী করে?
– আমি ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাস নিয়ে একটি প্রবন্ধ খুঁজে পেলাম। লিখেছেন এন. কল্যাণী। সেখানে যা লেখা আছে, সংক্ষেপে তার উপজীব্য হল – ১৯০৪ থেকে সিস্টার নিবেদিতা অনুভব করেন ভারতবাসীর একটি নিজস্ব জাতীয় পতাকা প্রয়োজন। নিবেদিতার মননে অনুপ্রাণিত বজ্র চিহ্নের জাতীয় পতাকাটি চূড়ান্ত রূপ পায় ১৯০৬ সালে। প্রথমে বিপ্লবী দল অনুশীলন সমিতির গোপন সভায়, মাঝে বজ্র দুপাশে বন্দে মাতরম লেখা পতাকাটি উত্তোলন করেন স্যার সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ১৯০৬ সালের ৭ই আগস্ট।
ঐ প্রথম পতাকাটি কলকাতার আচার্য্য ভবন মিউজিয়াম, বোস ইনস্টিটিউটে আজও রক্ষিত আছে।
– এখন গেলে দেখা যাবে মা?
– হ্যাঁ, দেখতে পাওয়া তো উচিত।
১৯০৫ এ বঙ্গভঙ্গের একবৎসর পূর্তিতে প্রতিবাদ জোরদার করার জন্য ১৯০৬ এর ডিসেম্বরে কলকাতায় কংগ্রেসের সভা বসে। সেই সভায় ঐ বজ্র চিহ্নিত পতাকাটির নক্সায় কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসেন সুকুমার মিত্র ও শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু। উইকিপিডিয়ায় বলছে সুকুমার কৃষ্ণ কুমারের পুত্র, মানে কুমুদিনীর ভাই। পতাকায় তিনটি রং ব্যবহার করা হয়। বন্দেমাতরম লেখাটি মাঝে থাকে। কিন্তু একটি বজ্রের পরিবর্তে আটটি পদ্মফুল বসানো হয়। এই নক্সা কংগ্রেস অনুমোদন করে। উত্তোলন করেন দাদাভাই নৌরোজি। পতাকাটি সেলাই করে দেন সুকুমার মিত্রের বোন কুমুদিনী বসু। ভাষা খুঁজে পাইনা। লেখিকা, সম্পাদিকা, সমাজসেবী, স্বাধীনতা সংগ্রামী কীভাবে ব্যাখ্যা করব তাঁকে? আমার মায়ের কাছে ছোটবেলায় গল্প শুনেছি, আমার দাদু কুমুদিনীর ছোটো ছেলে নয়। আর একজন ছিলো। সে মায়ের কাছে থাকবে বলে সবসময় বায়না করত। মা সময় দিতে পারতেন না, বিরক্ত হতেন। সে বলত, মা আমি বিরক্ত করবনা, তোমার গায়ে একটা কড়ে আঙ্গুল ছুঁইয়ে শোবো মা? পরে শিশু পুত্রটি মারা যায়। আমার মা কুমুদিনীকে দেখেননি। কারণ মায়ের জন্ম তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর পরে। এসব কথা শুনেছেন আমার দিদা, মানে কুমুদিনীর পঞ্চম পুত্রবধূ লাবণ্যপ্রভার কাছে। আমার মা আমাকে দেখিয়েছিলেন, শিশু পুত্রের শোকে পূজার ফুল বইয়ের কোন কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু আজ সে আমার আর স্মৃতিতে নেই। আজ পঞ্চাশ বছরে পৌঁছে মর্মে মর্মে বুঝি কর্মরতা মায়েদের বেদনা। একশ বছর আগে মায়ের ঠাকুমার নিয়তি তাড়িত মুখটি হৃদয়ে ভাসে।
———//////////————/////////—–
– মা! একটা অদ্ভুত চিন্তা মনে আসছে। কুমুদিনী কি নিয়তি মানতেন?
– কী জানি? স্বামী বিয়োগ, একের পর এক পুত্র বিয়োগে বিধ্বস্ত হলেও, দত্ত বাড়িতে ছেলের ভাগ দাবী করেননি কুমুদিনী। তাদের আশ্রিতও হতে চাননি। দেববাড়িতেও ফিরে যেতে রাজি ছিলেননা। হয়তো বিধবা হিসেবে সমাজের নানা বেড়ি পড়বে পায়ে সেই ভয় পেয়েছিলেন। তিনি স্বাধীনভাবে ফড়িয়া পুকুরে একটি বাড়ি কিনে পরিবার নিয়ে সেখানে উঠে আসেন এবং শোভাবাজার রাজবাড়িতে স্বামীর অংশের দখলীসত্ব ত্যাগ করেন। তখন গ্রাসাচ্ছাদন চলছিল রাজবাড়িরই ভাতায় এবং সম্ভবত জমিজমা থেকে আয়ও ছিল। শোভাবাজার রাজবাড়িতে একটি প্রথা আছে, বিধবা কন্যা বা পুত্রবধূ মাসিক ভাতা পেতে পারে। স্বামী ও দুইপুত্র চলে যাওয়ার পরে কুমুদিনী সেই ভাতা পেতেন। কিন্তু সেই ভাতা তিনি যে নিরুপায় হয়ে গ্রহণ করেছিলেন, তার প্রমাণ পাই, যখন বাকি দুই পুত্র রোজগার শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই রাজবাড়ির বিধবা ভাতা তিনি ত্যাগ করেন। এত শোকের সাগর, অভাব অনটন পেরিয়েও বই লেখা, পত্রিকা সম্পাদনা, দেশসেবা করে গেছেন অবিচল ভাবে। নিবেদিতা বিদ্যালয়ে পড়েছিলাম আদর্শ জ্ঞানী ব্যক্তি হন – ‘সুখেষু বিগতস্পৃহ, দুঃখেষু নিরুদ্বিগ্নমনা। কুমুদিনী এর বাস্তব প্রতিমূর্তি। একবার বাবলিদিতে আমাতে গল্প হচ্ছিল, এত বড় বড় লোকের বংশধর, আত্মীয় যদি হই, তবে আমরা গরীব হলাম কেন? কি কষ্ট করে বড়ো হয়েছি আমরা। বাবলি দি বলে, “সোজা উত্তর, আমাদের গরীব হওয়ার পিছনে একমাত্র দায়ী ঐ কুমুদিনী। কি দরকার ছিলো সর্বস্ব ত্যাগ করার? সংসার দেখেননি। সাহিত্য সেবা, দেশসেবা, সমাজসেবা করে গেছেন শুধু।” বাবলিদির কথায় পয়েন্ট আছে। স্বীকার না করে উপায় নেই। তবু আজ বেশ লাগে এক ঋজু, বিদূষী, দেশ হিতৈষিনী, নির্লোভ নারীর বংশধর আমি। নাই বা রইল টাকা। এই বংশগৌরব যে কতটা তৃপ্তির, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায়না।
– মা কামিনী রায় বললে! কোন কামিনী রায়, যার কবিতা বইয়ে পড়েছি?
– হ্যাঁ রে, সেই কামিনী রায়, কবি।
“পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি,
এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মতো সুখ কোথাও কি আছে ?
আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণেও সুখ,
‘সুখ’ ‘সুখ’ করি কেঁদো না আর,
যতই কাঁদিবে, যতই ভাবিবে,
ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার।
– শেষটা আমি বলছি মা।
“সকলের মুখ হাসি-ভরা দেখে
পার না মুছিতে নয়ন-ধার ?
পরহিত-ব্রতে পার না রাখিতে
চাপিয়া আপন বিষাদ ভার ?
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী পরে
সকলের তরে সকলে আমরা,
প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।”
তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী? এসব কথা তো বইয়ে লেখা ছিলনা। আর লেডি অবলা বসু মানে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের স্ত্রী? তিনিও বিখ্যাত?
– হ্যাঁ, খুবই বিখ্যাত। স্বাধীনতা সংগ্রাম, ইস্কুল কলেজ তৈরি সবেতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।
– কুমুদিনী এঁদের সহযোদ্ধা!! মানে ঠিক কতদিন আগে? আমার সঙ্গে কিরকম সম্পর্ক হবে?
– সহজ করে ভাব। এনারা তোর দিদার দিদার বন্ধু, সহকর্মী। এবারে বসুতে, রায়েতে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিলো কিনা, সে আমার জানা নেই।
– মা – আ! ও মা!
– কী?
– কুমুদিনীর জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কান্না এসে যাচ্ছে।
– আমারও কষ্ট হচ্ছে জেঠিমা। কিন্তু কামিনী রায়, লেডি অবলা, বেগম রোকেয়া, স্বর্ণকুমারী দেবী, সরোজিনী বোস, সরলাদেবী চৌধুরানী, নবশশী দেবী, সুশীলা, কমলকামিনী, নির্মলা, সুবলা, হেমাঙ্গিনী, মৃণালিনী, জ্যোতির্ময়ী কত নাম বললে, আর একজন কে যেন সুলতান
– বেগম সুলতান মুয়াজিদজাদা
– হ্যাঁ, এদের খুব কাছের লোক মনে হচ্ছে। দিনগুলো যেন দেখতে পাচ্ছি। খুব গর্ব হচ্ছে, ভীষণ আনন্দও হচ্ছে আমার। ভাগ্যিস আমাদের কুমুদিনী ওদের সঙ্গে ছিলো। তাই সবাই আমাদের দিদার দিদা হলো।
– কুমুদিনী আমাদের পরিবারের মানুষ যদি নাও হতেন, তাও বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা ওনাদের উত্তরসূরী। কুমুদিনীও তো শুধু আমাদের পরিবারের নন, দুই বাংলার। উনি তো ময়মনসিংহের মেয়ে।
– জেঠিমা! কুমুদিনী বাঙাল! তায় ব্রাহ্ম। শোভাবাজার রাজবাড়ি ঘটি, ওদের ঠাকুর কি ছিলো?
– বললাম যে রাধারমণ কৃষ্ণ।
– তার মানে শরৎ কুমুদিনীর লাভ ম্যারেজ। হতেই হবে। হয়তো কোনো সাহিত্য সভা টভায় চোখে চোখে কথা …..।
– সেটা অবিশ্যি আমারও সন্দেহ হয়। তবে ছবি দেখে মনে হয়, শরৎ কুমুদিনীর বয়সের তফাৎ পনের কুড়ি বছর তো হবেই। শাড়ি গয়না পরে ছোটো মেয়েকেও বড়ো দেখায়, ঠিক বোঝা যায়না।
– কুমুদিনীর ছবি কেমন?
– খুব সুন্দরী, ডিগনিফায়েড।
– দেখাবে। আচ্ছা, বিকাশ – লাবণ্যর সম্বন্ধ করে বিয়ে। তাইতো?
আর সমীর – কৃষ্ণার?
– লাভ
– তুমি আর জেঠু, তুলসী শারদা – লাভ। চার পুরুষে তিনটে লাভ ম্যারেজ। বোনু শুনে রাখ। আমাদের যেন আবার পরে সম্বন্ধ না করে।
– মা, সেনবাড়ি ভালো, কুমুদিনীকে বাঁচালো। যে দেশসেবা করছে, তার পাশে তো দাঁড়ানো উচিত। সেই সময়ে ঐ সাপোর্ট না দিলে কৃষ্ণা, তুমি, আমি কেউই এই পৃথিবীতে আসতে পারতাম না।
– সেনবাড়ি শুধু কুমুদিনীকে নয়, মোহনবাগানকেও বাঁচালো তো। কুমুদিনীকে জানতে গিয়ে, মোহনবাগানকে তোরা ভুলে যাচ্ছিস।
– ওহ। তাইতো, মোহনবাগানটা বলো।
– প্রিয়নাথ মিত্র মানে ছোটোপিসিদিদার শ্বশুরমশাই রাজা রাজবল্লভ স্ট্রিটে তৈরি করেছিলেন অ্যাশক্রফ্ট হল। সেখানে ১৯২০ সালে ইংলিশ ফার্স্ট বুক প্রণেতা প্যারীচরণ সরকারের ছোটো ছেলে শিক্ষাবিদ বাবু শৈলেন্দ্র সরকার একটি স্কুল তৈরি করেন। নাম সরস্বতী ইনস্টিটিউশন। পরে অবশ্য ঐ ইস্কুল নতুন ঠিকানায় উঠে যায়, এখন যার নাম শৈলেন্দ্র সরকার বিদ্যালয়। প্রাক্তন রাজ্যপাল ও প্রধান বিচারপতি শ্যামল সেন এই ইস্কুলে পড়েছেন। এখন তিনি ওখানকার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। কাছাকাছি এলাকায় প্যারীচরণের নিজের প্রতিষ্ঠিত একটি বালিকা বিদ্যালয়ও আছে। শরৎ কুমুদিনীর মধ্যম পুত্রবধূ মানে আমার মেজদিদা প্যারীচরণের বাড়ির মেয়ে। এই প্যারীচরণ সরকারের নাতি স্যার নৃপেন্দ্রনাথ সরকার মোহনবাগানের প্রথম কমিটির সদস্য ছিলেন। আবার প্রথম কমিটির আর এক সদস্য হলেন রায়বাহাদুর চুনীলাল বসু। তিনি ছিলেন সেযুগের থেকে একজন এগিয়ে থাকা মানুষ। স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খাদ্যে ভেজাল, সুষম আহার এইসব বিষয়ে গবেষণা করে জনসচেতনতা গড়ে তোলার কাজ করছিলেন। কলকাতার শেরিফও হয়েছিলেন।
– মধ্যম পুত্রবধূ মানে?
– মেজ বৌ।
– সতীশ বড়ো, তারপর সুরেন, ক্ষিতীশ, বিকাশ।
– সতীশ চন্দ্রের পর আর একজন মেজছেলে ছিলো জ্যোতিষচন্দ্র।
– যে মায়ের ছবি এঁকেছিলো? তার কি হলো, কিছু আগে বললেনা তো।
– বলিনি কারণ আছে। সে বাড়ি ছেড়ে, দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো।
– কোথায়?
– বর্মামুলুকে, মানে আজকের মায়ানমারে।
– কেন মা?
– মেজছেলে জ্যোতিষচন্দ্রের বিয়ে হয়েছিল ইংলিশ ফার্স্ট বুক প্রণেতা প্যারীমোহন সরকারের ভাইঝির সঙ্গে বা ভাইয়ের নাতনির সঙ্গে, সম্পর্কটা নিশ্চিত বলতে পারছিনা। সেই সূত্রে ড. মহেন্দ্রলাল সরকার সম্পর্কে আমার মেজদাদুর জ্ঞাতি শ্বশুর হন। জ্যোতিষচন্দ্র ছিলেন চিত্রশিল্পী। তাঁর শিল্পকলা, চিত্রাঙ্কনের কিছু নমুনা আজও পরিবারে রাখা আছে। বাবলিদির কাছে শুনলাম এসপ্লানেড এলাকায় ওনার একটি বড়ো স্টুডিয়ো ছিল। মেজদাদু তাঁর বাবা শরৎচন্দ্রের মতো ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় সুপন্ডিত ছিলেন। এই স্টুডিয়োতে ইউরোপিয়ানরা তো বটেই তাছাড়াও অনেক অভিজাত নামকরা লোক পোট্রেট আঁকাতে আসতেন। স্টুডিওটার নাম বাবলিদির মনে নেই। তবে ও শুনেছে ওটা তখনকার খুব নামকরা জনপ্রিয় স্টুডিয়ো ছিল। আমার এই দিদিমার বিয়ের সময় বয়স ছিল নয় বছর। ইনি খুব সুন্দরী ছিলেন। কিন্তু একটু বড় হতে বোঝা যায়, যে তাঁর মানসিক ভারসাম্যের একটু অভাব আছে। তিনি শাড়িও নিজে পরতে পারতেননা বা চাইতেন না। এই বিষয়টি জ্যোতিষ চন্দ্র মেনে নিতে পারেননি। সম্ভবতঃ পারিবারিক ব্যবসায়ও তাঁর মতি ছিলনা। এই দুই কারণে বড় ভায়ের মৃত্যুর পরে ভাগ্যান্বেষণে তিনি বর্মামুলুকে চলে যান। সুদূর বর্মাদেশে তিনি আবার এক বর্মী মেয়ে বিয়ে করেন। তাঁদের একটি কন্যা ছিল নাম মরিয়ম। জ্যোতিষচন্দ্র মাঝে মাঝে বাড়িতে আসতেন। তবে এই দ্বিতীয় স্ত্রী বা কন্যাকে তিনি দেশে কখনও আনেননি। তাঁর বাড়ি আসার স্মৃতি আমি বড়মামার মুখে শুনেছি। ওপরে ইউরোপীয়দের মতো কোট প্যান্ট, টাই আর পরনে বর্মীদের মতো সিল্কের লুঙ্গি পরে তিনি ফিটন গাড়ি করে গড়ের মাঠে বেড়াতে যেতেন। সঙ্গে বড়মামাও যেত। ঐ পোষাক দেখে অবাক হয়ে অন্যান্য লোকের কেমন প্রতিক্রিয়া হতো তা বড়মামা ছোটো হলেও মনে করে রেখে দিয়েছিল, আর আমাদের অভিনয় করে দেখাতো। আমরা হেসে গড়াগড়ি খেতাম।
আর একটা কথা বড়মামা বলেছিলো যে, মেজদাদু দেশে ফিরে চিংড়ি মাছ দিয়ে ঝাল ঝাল কেমন একটা ভাত রান্না করতেন। এটা নাকি একটা বর্মী রান্না। আর সবাইকে ধরে ধরে খাওয়াতেন। বাচ্ছা বুড়ো কারোর পালাবার জো নেই। মেজদাদু যেহেতু রান্না করেছেন, ঐ ঝাল ভাত নাকি সবাইকে খেতেই হবে। ঐ ভাতের সঙ্গে মেজদাদু নাকি পাঁপড় খেতেন।
– ঝাল ভাতটা আবার কীধরণের খাবার?
– বড়মামা ছোটো ছিলো তো, তাই রেসিপি কিছু বলতে পারেনি। শুধু বলেছিলো খুব ঝাল আর নারকেল দেওয়া। হয়তো এমন কিছু ঝাল নয়, ছোটোবেলায় খুব ঝাল লেগেছিলো।
পরে বড় হয়ে, আমি ইন্টারনেটে খুঁজে দেখেছি, সত্যিই ঝাল স্বাদের ভাত ওদেশে রান্না করে।
– কীরকম?
– প্রথমে বাসমতি চাল খুব ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। তারপর জল ঝরিয়ে, থালায় ছড়িয়ে জল শুকিয়ে নিতে হবে। এবার একটা হাঁড়িতে বেশ খানিকটা নারকেল এর দুধ নুন দিয়ে গরম করে নিতে হবে। গরম হলে শুকনো চাল ওর মধ্যে দিয়ে ফোটাতে হবে। রান্না হবে ঢিমে আঁচে, যাতে নারকেলের স্বাদ চালে ভালো ভাবে ঢুকে যায়। একটু পরে কড়াইশুঁটি আর কাজুবাদাম মেশাতে হবে। আগেই কড়ায় তেল দিয়ে চিংড়ি মাছ নুন, হলুদ ও লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে মেখে ভেজে রাখতে হবে। ভাত প্রায় হয়ে এলে হাঁড়ির ঢাকনা খুলে বেশ কয়েকটা কাঁচা লঙ্কা কুচো করে মিশিয়ে দিতে হবে। ফ্যান গালা হবেনা। পোলাওয়ের মতো জল ভাতের মধ্যেই শুকিয়ে যাবে। নারকেল ভাত হয়ে গেলে আঁচ বন্ধ করে উপরে চিংড়ি মাছ ভাজা ছড়িয়ে ঢাকনা দিয়ে রাখতে হবে। ভাত একটু নেড়ে চেড়ে দিতে হবে। ভাতের ভাপেই চিংড়ি নরম হয়ে যাবে, আর নির্যাসটাও মিশে যাবে। এই ভাতটা ঠান্ডা খাওয়ার চেয়ে গরম গরম খেলেই নাকি সঠিক স্বাদ পাওয়া যাবে। এই নারকেল ভাত ও দেশে পাঁপড় জাতীয় মচমচে খাবার দিয়ে খাওয়া হয়।
– বেশ অদ্ভুত। খেতে কেমন লাগবে কে জানে! তবে আমরা তো সর্বভুক জেঠিমা, জ্যোতিষচন্দ্রের নামে একদিন ঝাল ভাত করে খেলে হয়। সবরকম ট্রাই করলে গল্পগুলো পেটের মধ্যে দিয়ে মাথায় বসে যাবে। তারপর বলো।
– ঐ বর্মামুলুকেই মেজদাদুর জীবনাবসান হয়। মরিয়মের চিঠিতে বাড়ির লোক তাঁর মৃত্যুর খবর পায়।তখন নিয়ম মত অশৌচও পালন করা হয়েছিল। তবে এ সবই ঘটেছে আমার জন্মের অনেক আগে। জানিনা মরিয়ম বা তার পরিবার কোথায় কিভাবে আছে। জ্যোতিষচন্দ্রের প্রথম স্ত্রীকে বাবলিদি দেখেছে। কলকাতায় বিডন স্ট্রিটে কোথাও ওনার বাপের বাড়ি ছিল। ও বলেছিলো – “আমি বাবির (আমার বকুল মামা) সঙ্গে সেখানে একদিন গিয়েছিলাম। আমার কিন্তু ঠাকুমাকে দেখে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে হয়নি। অসামান্যা রূপসী। খুব ভাল ব্যবহার করেছিলেন। আমাদের দেখে খুব খুশি হয়ে ছিলেন”। হয়তো স্বামী পরিত্যাগ করার পরবর্তীকালে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। সারাজীবন স্বামী পরিত্যক্তা তকমার কাঁটার মুকুট পরে দিন কেটেছে। কুমুদিনী নিজে ঊনবিংশ – বিংশ শতকের ফেমিনিস্ট অ্যাকটিভিস্ট। তাঁর পরিবারে মেজ বৌমার এমন ভবিতব্য একটা বিরাট ট্র্যাজেডি।
– তখন ন বছর বয়সে বিয়ে হতো?
– হ্যাঁ, পাঁচ বছরেও হতো – বলা হতো গৌরীদান। কুমুদিনী ব্রাহ্ম ছিলেন, ব্রাহ্মরা খুব ছোটোবয়সে মেয়ের বিয়ে দিতোনা। ওনার নিজের তেরো চোদ্দ বছরে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু শোভাবাজার রাজবাড়িতে ব্রাহ্ম নিয়ম খাটেনি। অনেক আপস করতে হয়েছিলো। বড় মেয়ে লীলার সেনবাড়িতে বিয়ে হয়েছিলো পাঁচ বছর বয়সে। ছোটোমেয়ে ইন্দিরার বিয়েও ঐ রকম বয়সেই হয়েছিলো। মা গল্প করতো, সেন বাড়িতে বৌ নিয়ে ভূতিবাবু ফেরার কিছুক্ষণ পরে বৌকে আর কেউ খুঁজে পায়না। ছোট্ট মেয়ে নতুন বাড়িতে গেলো কোথায়? খোঁজ খোঁজ। তারপর একজন রান্নার ঠাকুর দেখে, ভাঁড়ার ঘরে দেরাজের পিছনে বৌ ঘুমিয়ে আছে। এই দেখে গিন্নিরা কোলে করে তাকে নিয়ে গেলো। বাচ্ছা মেয়ে, অতো লোকজন দেখে ভয়েতে লুকিয়ে পড়েছিলো, তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছে।
– এ বাবা!
– বাবলিদি বলেছে, ছোটোবেলায় বাবলিদিরা বাগবাজারে নিবেদিতা লেন এ থাকতো। সেইসময় বাবার (বকুলচন্দ্র – আমার দাদু বিকাশচন্দ্রের বড়দা সতীশ চন্দ্রের ছেলে, আমার বকুল মামা) সঙ্গে শোভাবাজার রাজবাড়িতে যেতো। শোভা বাজার রাজবাড়িতে ঠাকুর দালানে যেখানে দুর্গা প্রতিমা থাকে ঠিক তার ডানদিকে দোতলা যে অংশ আছে সেখানেই ছিল বসু পরিবারের বাস। রাজবাড়িতে ঠাকুর দালানের বাঁদিকে বাগানে যাওয়ার পথ। কুমুদিনী বা বাড়ির মেয়েরা গঙ্গা স্নান করতে গেলে দোতলার সিঁড়ি থেকে বাগান পর্যন্ত চিক ফেলা হতো আর পালকি করে মেয়েদের গঙ্গার পাড়ে নিয়ে গিয়ে একেকটা পালকি গঙ্গায় চোবানো হতো। বাড়িতে এসে তারা ভিজে কাপড় ছাড়ত। কুমুদিনী বিদূষী, লেখিকা হলেও এই নিয়ম মানতে হতো।
– রাজবাড়িতে লেখাপড়া শিখেও এতো আচার বিচার?
– এসব মেয়েদের জন্যে। রান্নাঘরে ছেলেদের জন্য কিন্তু, কোফ্তা, কাবাব, কাটলেট, ফ্রাই চলছে। দিনরাত সাহেব সুবো অতিথি আর সাহেবী খানাপিনাও চলছে। আর শুনেছি রাম বা ওয়াইন দিয়ে একরকম অদ্ভুত পুডিং বানানো হতো, টিপসি পুডিং, যা খেয়ে নেশা হতো। কুমুদিনী সেই যুগে কেক আর কুকিজও বানাতে পারতেন। অল্পবয়সে কুমুদিনীর জন্য মেম টিচার আসতো। মেজছেলে জ্যোতিষের আঁকা একটা পোট্রেট আছে বাবলিদির কাছে। ছবিটা কুমুদিনীর মেম টিচারের। যাকগে, মোহনবাগানের মহাভারতটা শেষ করি।
এক এক করে প্রতিমা, ভারতী আর মুকুল যখন মারা যায়, সেই সময়ে খবর আসে ছোটো জামাই রবীন মিত্রের পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে অকাল মৃত্যু ঘটেছে।
– সে কি? ছোটো জামাইও চলে গেলো?
– হ্যাঁ। রবীনের বাবা প্রিয়নাথ মিত্র ব্যবসা বিষয়ে ছেলের ওপরে খুবই ভরসা করতেন। কারণ অন্য ছেলেদের একজন আইনজীবী। একজন ছোটোখাটো জীবনবীমা জাতীয় কাজে ব্যস্ত থাকতেন। রবীনের মৃত্যুর পরে কীর্তি মিত্রের ব্যবসার সাম্রাজ্য ধসে পড়ে। পাওনাদারেরা ছেঁকে ধরে এবং তারাই মোহনবাগান ভিলা নীলামে তুলে দেয়। শেষে ভূপেন বসু এবং নিমাইচরণ বসু তখনকার দেড়লক্ষ টাকায় ঐ সম্পত্তি কিনে নেন। রবীন মিত্রের এক পুত্র অশোক এবং এক কন্যা বিবি। অশোক মামা এখন দিল্লিতে থাকে, বয়স নব্বই। বিবি মাসি অ্যাপেন্ডিসাইটিসের বিষক্রিয়ায় বালিকা বেলায় মারা যায়। সব মিলিয়ে প্রিয়নাথ খুবই ভেঙে পড়েন। মোহনবাগান ভিলার একপাশে নয়নচাঁদ দত্ত স্ট্রিটে একটি ছোটো বাড়ি ছিল। ওখানে অফিস ছিল, খেলোয়াড়েরা চুক্তি পত্রে সই করতো, দরকার হলে থাকতো। সেই বাড়িতেই প্রিয়নাথ থাকতে শুরু করেন। শেষ জীবন তিনি ওখানেই অতিবাহিত করেন। শিলি দাদু বাকিদের নিয়ে বিডন স্ট্রিটের একটি বাড়িতে উঠে আসেন। ছোটো পিসিদিদা ওখানেই থাকতেন। দুটি পরিবারের এই বিপর্যয়ে মোহনবাগানের আকাশেও মেঘ জমে ওঠে। আর বৃহৎ সেন পরিবার এই বিপর্যয় কাটাতে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে।
মোহনবাগান আগেই শ্যামপুকুরের দুর্গাচরণ লাহাবাবুদের মাঠ ছেড়ে সেনবাড়ির লাগোয়া শ্যাম স্কোয়ারে উঠে এসেছিল। শুনেছি ঐ মাঠ প্রতিষ্ঠায় শোভাবাজার রাজবাড়ির কিছু ভূমিকা ছিল। ফেসবুকের পুরোনো কলকাতার গল্প গ্রুপে একজন লিখেছেন রাধাকান্ত দেবের দৌহিত্র আনন্দ কৃষ্ণ বসু এবং তাঁর ভাই যোগেন্দ্র কৃষ্ণ বসুর তত্ত্বাবধানে শ্যাম পার্কের মাঠ প্রতিষ্ঠা হয়, তবে এবিষয়ে অন্য কোনো নথি পাইনি। এই আনন্দকৃষ্ণ বসুর কাছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আসতেন ইংরেজি শিখতে। যা হোক এইসব ঘটনার পর সেনবাড়ি অর্থাৎ ৪৪ নং রামকান্ত বোস স্ট্রিট হয়ে ওঠে মোহনবাগানের তৃতীয় অফিস। একদিকে ঐ বংশের ছেলেরা খেলা, সংগঠন, প্রশাসন সবেতে জড়িয়ে পড়েন, অন্য দিকে বড়জামাই শ্রীশচন্দ্র ওরফে ভূতনাথ সেন বা ভূতি বাবু কুমুদিনী কে তাঁর পরিবার সমেত নিজের আওতায় নিয়ে আসেন। পরিবারটি সেনবাড়ি লাগোয়া দাঁতি সেনের একটি বাড়িতে ভাড়ায় উঠে আসে। কুমুদিনী তখন কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর। ঐসময়েই দাঁতি সেন নিজের শ্যালিকা লাবণ্যপ্রভার সঙ্গে কুমুদিনী পুত্র বিকাশ চন্দ্রের পুনর্বিবাহ দিয়ে সংসারটা আবার বসিয়ে দেন। বিকাশ – লাবণ্য আমার মায়ের বাবা মা। বিকাশের প্রথম পক্ষের স্ত্রী ভারতীর পুত্র বিমানচন্দ্র তখন শিশু। দাঁতি সেনের বাড়িতেই আমার মামা সুজিতচন্দ্র, মা কৃষ্ণা (রাজকুমারী), দুই মাসি কাবেরী ও সুরভির জন্ম হয়। বিকাশচন্দ্রের পাঁচ সন্তান সেন বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বড় হতে থাকে। এই কারণে তাদের জগৎটাও মোহনবাগানময় হয়ে যায়।
সেজদাদু সুরেন্দ্রনাথ যখন মারা যান, দিদা তখন কিশোরী, কোলে সদ্যজাত কন্যা অমিয়া। তিনিও এই সেনবাড়িকেই ভরসা মনে করতেন। একদিকে এই পরিবার মোহনবাগানকে বাঁচিয়ে যেমন বাংলার ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে, তেমনি জ্ঞাতিদের শত্রু না মনে করে, আপন করেছে। দত্ত, মিত্র, বোস সবাইকে বিপদের দিনে মানসিক আশ্রয় দিয়েছে। এই সুকৃতির ফলও এই বংশ পেয়েছে। বাকিরা যে যার মতো ছিটকে পড়লেও, আজও বাগবাজারের সেনেদের যৌথ পরিবারের মহিমা অক্ষুন্ন আছে। আমি ঠিক জানিনা, বাংলার আর কোন পরিবারের এতজন কর্তা ডাকনামে সুপরিচিত কিনা। কলকাতা হাইকোর্টের নথিতে দীনবন্ধু সেন ব্র্যাকেটে দাঁতি লেখা দেখে আমি তো তাজ্জব। এখন ঐ পরিবারের লোকসংখ্যা বেড়ে গেছে। অনেকেই অন্যত্র বাসস্থান ক্রয় করতে বাধ্য হয়েছেন। তবু আমি চাই ঐ সেনবাড়ি যেন স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে থাকে।
আমার মামা বলতো অল্পবয়সে মামা মোহনবাগানের বার পুজোয় যেতো।
– বার পুজো কি? শনিবার?
– আরে নানা। পয়লা বৈশাখে ফুটবলের বারপোস্ট পুজো করা হতো। এখনও হয়। তবে আগের মতো জৌলুস নেই। ঐ দিন সেনবাড়ির কর্তারা সেজেগুজে যেতেন। মামাও যেতো। মামা বলতো, ষাট – সত্তর দশকে চৈত্র মাসের আগে শেষ হতো খেলোয়াড়দের দলবদল। পয়লা বৈশাখে নতুন মরুশুমের সূচনা হতো বারপোস্ট পুজো করে। অধিনায়কের নাম ঘোষণা হতো। নতুন ক্যাপ্টেন বার ছুঁয়ে মন্ত্র বলতো। পুজোর পর মামা সবার সঙ্গে লাইন দিয়ে লুচি, বোঁদে আর পান্তুয়া খেতো।
– মজার ব্যাপার তো। বারপোস্ট পুজো কেন? বলটাকে পুজো করা উচিত।
– আরে বোকা, বারপোস্ট রেগে গেলে গোল করার সময়ে জালে না জড়িয়ে, বলটা যদি ধাক্কা মেরে ফিরিয়ে দেয়, তখন কি হবে? বল পুজো করলে, তাকে লাথি মারবে কি করে?
– বুঝলাম। আচ্ছা জেঠিমা আমরা তিনজন যে মোহনবাগানের মেয়ে হলাম, সেটা কি ধোপে টিঁকবে?
– কেন? টিঁকবেনা কেন?
– আমরা যে খুব ইলিশ খাই।
– তাতে কি? মোহনবাগানীরাও ইলিশ খায়, ইস্টবেঙ্গলীরাও চিংড়ি খায়। তাতে ভালোবাসা কমে না।
– বাড়িতে যে নোনা মাছ আছে বলছো, তাতে ইলিশ আছে?
– আছে তো।
– উমম, কাল তবে ইলিশের কি হবে?
– লাবণ্যর হাতের একটা রেসিপি করতে পারি, খাবি? কৃষ্ণার কাছে শিখেছি, কাঁচা ইলিশের ঝাল।
– হ্যাঁ খাবো তো বটেই জেঠিমা। পুরোনো দিনের রেসিপিতে করা রান্না খেলে, তবে তো পুরোনো গল্প জীবন্ত হয়ে উঠবে।
– মা রান্নাটা কিন্তু দেখবো, কিভাবে করো। কুমুদিনী – লাবণ্য – কৃষ্ণা – শারদা – আর একটা নাম জুড়ে যাবে রঞ্জাবতী। মানুষ থাকবেনা, রান্নার ঘরানা চলতে থাকবে।
– ঠিক, ঠিক।
– কাল কাঁচা ইলিশের ঝাল করলে পরশু ডাব চিংড়ি করবে জেঠিমা।
– ঠিক হ্যায়, করতেই হবে। আজ ইস্টবেঙ্গলী ইলিশ রান্না হলে কাল তো মোহনবাগানী চিংড়ি রান্না হতেই হবে।
– রান্নাদুটো আমরা করতে পারি মা? তুমি বলে বলে দেবে।
– এতো উত্তম প্রস্তাব। তাহলে আমি ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে দিচ্ছি, কাল, পরশু বাড়িতে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের নামে ফুটবল – খাদ্য উৎসব হবে অরগানাইজড বাই আওয়ার টু প্রিন্সেসেস।
– ফুটবল – খাদ্য উৎসব কিন্তু কুমুদিনীর নামে হবে মা। কুমুদিনী স্মৃতি উৎসব।
– তথাস্তু। মোহনবাগানের যে দল ইংরেজকে হারিয়ে ছিল সেই দলে গোল করেছিলেন শিবদাস ভাদুড়ি আর অভিলাষ ঘোষ। তাহলে রঞ্জা হবে শিবদাস আর কর্ণা হবে অভিলাষ। শিবদাস বাঙাল ছিলেন। তাই ইলিশ যে রাঁধবে সে শিবদাস। আমি রেফারি। দেখি তোরা গোল করতে পারিস কিনা।
তাহলে কুমুদিনী স্মৃতি ফুটবল উৎসবে রঞ্জাবতীর করা কাঁচা ইলিশের ঝাল কেমন হলো?
পাকা বুড়ি ইলিশের টুকরোগুলো নিজে হাতে একটু সর্ষের তেল আর পরিমাণ মতো নুন মাখালো। কিন্তু হলুদ মাখালোনা। এবারে কড়ায় সর্ষের তেল ঢেলে তেলটা গরম করলো। বেশ ধোঁয়া ওঠা কষকষে গরম তেলে পাঁচফোড়ন, আর কয়েকটা চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে তেলটা ঢাকা দিয়ে গ্যাস কমিয়ে দিলো। সর্ষে আর কাঁচালঙ্কা একসঙ্গে বাটা ছিলো। খানিকটা ঐ বাটা একটা বাটিতে জলে গুলে তেলের ওপরে ঢেলে দিল। গ্যাস কমিয়ে দিয়ে জল ঢালাতে এই মূহূর্তে কড়ায় উত্তাপ কম। এবারে অল্প টক দই ফেটিয়ে তাতে চিলতে খানিক ময়দা মিশিয়ে ঐ ঝোলে মিশিয়ে দিলো। দইয়ের পরিমাণটা আমি নিক্তি মেপে দিলাম, যাতে ঝোলটা কোনোভাবেই টক না মনে হয়। দইটা ঝোলে মিশে গেলে মাছের টুকরোগুলো এক এক করে ঝোলে ছেড়ে দিলো রঞ্জা। এবারে ঝোলটা আঁচ বাড়িয়ে ফুটতে দিলো। ধীরে ধীরে মাছের তেল ছেড়ে ঝোলের ওপরে উঠে এলো। ঠিক লাবণ্যর মতোই ঝোলের নুন চেখে, কয়েক দানা চিনি ছড়িয়ে দিলো রঞ্জা। এতে ইলিশের ঝোলের স্বাদটা মিষ্টি হবেনা, কিন্তু ধারালো হবে। ইলিশ নরম মাছ বেশি ফুটবেনা। ঝোল পাতলা হবে, ঘন বা মাখামাখা নয়। হলুদ না দিলেও সর্ষের তেল আর সর্ষে বাটার জন্য ঝোলে একটা খুব হাল্কা বাসন্তী রং ধরে। নামানোর তিন চার মিনিট আগে ঝোলের ওপর কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে কয়েকটা গোটা কাঁচা লঙ্কা ফেলে ঢাকা দিতে বললাম। এতে গ্রেভি ঝাল হবেনা, কিন্তু সর্ষের তেলের ঝাঁজ আর কাঁচা লঙ্কার সুগন্ধ মিশে একটা বাড়তি মাত্রা দেবে।
পরদিন কর্ণাবতী রাঁধলো ডাব চিংড়ি। আমাদের বক্সিবাড়ির বর্তমান চৌকিদার কাম অভিভাবক রুণাদা নরম শাঁসওলা গোটা চারেক ডাবের মুখ কেটে দিলো চওড়া করে। তলাগুলোও কেটে দিলো সমান করে। কর্ণা এবার মাঝারি মাপের চিংড়িগুলো সর্ষের তেলে হাল্কা করে ভেজে নিলো। এবারে কড়ায় মাখন দিয়ে পেঁয়াজ কুচি, আদা রসুন বাটা, নুন আর লঙ্কাগুঁড়ো ছড়িয়ে ভাজা ভাজা করে নিলো। হয়ে গেলে ফ্রেশ ক্রিম মিশিয়ে আঁচ বন্ধ করলো। ডাবের শাঁস চামচ দিয়ে কুরিয়ে বার করে ভালো করে একজন বেটে দিলো। এবার কিছুটা ডাবের জল, ডাবের শাঁসবাটা, ভাজা চিংড়ি আর মাখনে নাড়া মশলা একসঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে নিতে হবে। এই পুরো জিনিসটা ডাবের মধ্যে পুরে, ডাবের মাথাটা ঢাকা দিয়ে দিলো কর্ণা। পাশে একজন আটা মেখে রেখেছিলো, সে ঐ আটা দিয়ে ডাবের মাথা, বাকি অংশের সঙ্গে চেপে আটকে দিলো। এভাবে চারটে ডাবই প্রস্তুত করা হলো। এবার রান্নাঘরের ভিতরের উনুনের পেটের ভিতর দুটো ডাব আর বাইরের উনুনের ভিতর দুটো ডাব ঢুকিয়ে রাখা হলো। নিভন্ত আঁচে, সব মশলা মিশে তৈরি হলো ডাব চিংড়ি। উপরি পাওনা হলো, একটা মৃদু ধোঁয়া ওঠা গন্ধ।
দুদিন দু মেয়ের রান্না সামলাতে গিয়ে, জনা চারেক সাহায্য কারিণী, তেল, নুন, ঝাল, বাটা, কাটা সব এগিয়ে দিতে গিয়ে এক রৈ রৈ কান্ড বেধে গেল, যেন বাড়িতেই পিকনিক হচ্ছে। তবে হ্যাঁ রান্না দুটোই উতরে গেছে। মেয়েদের হাতে খেয়ে বাবাদের মুখেও বেশ গর্বভাব ফুটে উঠেছে। আর দুদিনই খেয়ে ওঠার পর, সকলকে “জয় মোহনবাগান” ধ্বনি দিতে বাধ্য করা হয়েছে। খুব একটা বাধা আসেনি কারোর কাছ থেকেই। দেওরের এক বন্ধু এসেছিলেন বাড়িতে। কেবল তিনি সব শুনে টুনে খেয়েদেয়ে ইস্টবেঙ্গলের জয় দিয়েছেন, কারণ তিনি বাঙাল। এতে আপত্তিরও কিছু দেখিনা। কুমুদিনী বাঙাল সেটা তো জানি। আর অবিভক্ত বাংলায় আমাদের কোন পুরুষে কোন মা পুববাংলার ছিলেন, সেটাই কি জানি ছাই! দেশভাগ তো হলো এই সেদিন উনিশশো সাতচল্লিশে। ১৮৮৯ এ মোহনবাগানের ধারণায় কোনো ঘটি বাঙাল ছিলো নাকি?
পুনশ্চঃ শহর – ঘরে তো উনুন নেই। তাবলে কি ডাব চিংড়ি হবে না নাকি। মাইক্রো ওভেনে নর্মাল মোডে মশলা পোরা মাথা ঢাকা ডাব ঢুকিয়ে দশ মিনিট রেখে দিলেই কেল্লা ফতে। বের করে শুধু খাওয়ার অপেক্ষা।