অনবসরের মেদুর কাহন

আড়বালিয়ার কথা

বসিরহাট মহকুমার এক গ্রাম হল আড়বালিয়া। পরিবেশে বাংলার সবুজ মখমলে মোড়া গ্রাম হলেও সেটা আসলে বাদুড়িয়া পৌরসভার মধ্যে। ও তল্লাটে এককালে কু ঝিকঝিক মার্টিনের রেল চলত। ও পাড়ায় আছে এক বিশাল ঝুপসি বটতলা, তার বয়স দেড় দু শতক হবেও বা। বটের ধারে এক পুকুর। সেখানে সব নাইতে আসে। ঝুরি আর জেগে ওটা শিকড় ধরে জলে আনকোরারাও দিব‍্যি চান করে। বটতলার ঝুরি নেমে আজ অনেক গুলো গুঁড়ি। বড় দুটো প্রধান গুঁড়ির মধ্যে দিয়ে চলার রাস্তা। ও গাছে লাখ লাখ পাখি আর লক্ষ কোটি বাদুড়ের আস্তানা। দিনের বেলা বাদুড়গুলো লম্বা হয়ে ঝোলে। আর বিকেল হলে ঘুরে ঘুরে টহল দেয়। গেলবারের উম্পুন ঝড়ের মাথা যখন ঝুঁটি নাড়া দিল, বুড়ো বট টাল খেয়েও সামলে নিল। কিন্তু যখন ঝড়ের লেজ আছড়ালো তখন আর পারলেনা। পুকুর পাড়ের গুঁড়িটা গেল উল্টে। সে কি দৃশ্য, শিকড়ের বিরাট দেয়াল, যেন তিনতলা বাড়ি। পাখি, বাদুড় কত যে মরল, তার ঠিকানা নেই। এখনো ওভাবেই আছে। আসুন হেঁটে যাই বটতলার পাশ দিয়ে। কলেজ স্ট্রিটের মর্ডান বুক যাদের, তাদের ভিটে ছিল পথের ডানদিকে। একটা ঠাকুর দালান ছিল। কালীপুজো হত। এখন আর হয়না। এবার একটা মাঠ। রাস্তা গেছে বেঁকে, ডানদিকে গেলে সিংহদুয়ার আর বাঁদিকে শুকপুকুরের রাস্তা। ডানদিকে একটু এগোলে পথের ওপর আছে এক বিরাট সিংহওলা গেট। গেটের মাথায় সিংহের চারপাশে পাহারায় আছে চার সেপাই। ঐ দরজায় ওপরদিকে খোদাই করে লেখা আছে এক টাকা। আমার বাবা বলতো, একমণ চালের দাম যখন এক টাকা ছিল, তখন ঐ গেট তৈরি হয়েছিল।  গেট দিয়ে ঢুকলে পথের দুপাশে আমবাগান। পথ শেষ হয় এক বিশাল পুষ্করিণীতে। সেখানে ছেলেদের আর মেয়েদের স্নানের ঘাট আলাদা। আর আছে একটা বিশাল সুড়ঙ্গ। জমিদারির সময়ে কী কাজে লাগতো কি জানি। সিংহওলা গেটের উল্টোদিকে আছে তিনশিবের মন্দির। মন্দিরের চাতালের পাশে আছে একরাত্তিরের বাড়ি। একরাতে তৈরি বাড়ি ছাদ ঢালাইয়ের আগে সুয‍্যি উঠে গেল। আর ছাদ হলনা। ওভাবেই রয়ে গেল। পিছনে নাগচৌধুরীদের অট্টালিকা। আর একটু এগোলে বাজার। ডানদিকে হাঁস ঠাকুরের বাড়ি আর ঠাকুর দালান। একটা প্রাচীন মিষ্টির দোকান আর পাঠশালার সামনেই অগ্নিযুগের বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায়ের বাড়ি। আড়বালিয়ার মাটি অনেক বিপ্লব আর স্বাধীনতা সংগ্রামের আঁতুড়ঘর। ডানদিকের পথ ধরলে বণিক পাড়ার বড় বাজার। আর বাঁদিক ধরে এগিয়ে গেলে আদি বসুবাড়ির প্রাচীন প্রাসাদ। ওবাড়ির ছেলে কৌশিক অর্থনীতিতে বিশ্বজয় করেছে। আর এক ছেলে বিশ্বনাথ আজ বাংলার আমজনতার মন চুরি করেছে। কাছেই আর এক শরীক মাঠের বসুবাড়ির অট্টালিকা ও ঠাকুর দালান। আরো এগোলে চার শিবের মন্দির। ছোটো বর্গাকার ক্ষেত্রের দুই বাহুতে পাশাপাশি দুটি করে মোট চারটি ইট রঙা মন্দির। মাঝখানে চাতাল। চাতাল নেমে গেছে এক গভীর পুকুরে। মন্দিরের উঁচু ভিতে পা ঝুলিয়ে বসলে ভেজা বাতাসে কেমন যেন ঝিম ধরে। ও পুকুরের জল বড়ো স্থির। তল কোথায় থৈ কই? শহুরে মত্ত পিকনিক পার্টির অনেককে শাস্তি দিয়েছে ঐ জল।  দুই বসু আর হাঁস ঠাকুরের বাড়ি দুর্গা পুজো হয় দালানে আর বণিক পাড়ায় বারোয়ারী। আরো সাত গাঁয়ের ঠাকুর এসে তিনশিবের মন্দিরের মাঠে বিজয়াদশমীর মেলা হয়। ও মন্দির গুলো এক সারিতে পাশাপাশি, সাদা কালো পাথরে বাঁধানো চকমকে। ঘুরতে ঘুরতে বেলা হল। আবার ফিরি বটতলায়। নাকবরাবর পুকুর ধারে শুরুতে ডানদিকে মণ্ডলদের ভিটে আর একটু এগিয়ে বাঁদিকে মিত্তিরদের। আরো আরো অনেকটা এগিয়ে গেলে বড়পোল, ইছামতীর খাল, চারিপাশে জলকর, মানে মাছের ভেড়ি। আরো এগোলে ধান‍্যকুড়িয়া, নেহালপুর। ধান‍্যকুড়িয়ার গাইন, সাউ, সমাদ্দারদের প্রাসাদ, মন্দির, রাসমঞ্চ।

পাল্কি চলে

আঠেরো শতকের শেষ দিকে আড়বালিয়া গ্রামের জনৈক লক্ষ্মণচন্দ্র মণ্ডল ছিলেন নাগচৌধুরী জমিদারির গোমস্তা। জাতিতে সৎচাষী হলেও তাঁর পেটে কিছু বিদ‍্যে ছিল। ভিটে আর চাষজমি মিলিয়ে তাঁর কয়েক বিঘা জমিজিরেতও ছিল। সেযুগে পাকা সড়ক গল্প কথা। খাজনা আদায়ে  জলকাদার পথ গোমস্তা মশাই পাল্কি চড়েই যেতেন। অবসর সময়ে তাঁর পাল্কিটা মাটির ঘরের একপাশে রাখা থাকত। সাত গাঁয়ের মানুষ চিনলেও লক্ষ্মণ বাবুর মনে সোয়াস্তি নেই। তাঁর মনের মধ্যে সূঁচ বেঁধায় এক গোপন ইচ্ছে। জমিদার বাড়ির মতো, অন্য বামুন কায়েতের ঘরের মতো তাঁর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাবেন। কিন্তু বিধি যে বাম। বেলা যায়, এখনো ছেলেপুলের মুখ দেখতে পেলেননা। গাঁয়ের সব পরিবারকে চেনেন। অনেক ভেবে বুঝে শুনে এক পাল্টিঘরের দরিদ্র প্রতিবেশীর কাছ থেকে তার বড় ছেলেটিকে চেয়ে নিলেন মানুষ করবেন বলে। কৃষ্ণভক্ত লক্ষ্মণ সে ছেলের নতুন নাম দিলেন রাধারমণ। দিনে দিনে রাধারমণ ঊজ্জ্বল, বুদ্ধিমান, ঝকঝকে হয়ে বেড়ে উঠছিল। লম্বা ফর্সা চেহারা, পড়াশোনায় ভালো রাধারমণকে চোখে পড়ে গেল শুকপুকুরিয়ার সম্পন্ন গৃহস্থ গোষ্ঠগোপাল কাবাসীর। নিজের বড়মেয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এলেন লক্ষ্মণ বাবুর ঘরে। এবাড়িতে অমত হলনা। লোকতো বেশি নেই। ঘরে বৌ এলে তো ভালোই। ছোটোবয়সে এলে শউরঘরে মিলমিশ ভালো হয়, একথা কে না জানে। সনটা ১৯০৬। চারপাশ অশান্ত। বাদুড়িয়া আর আড়বালিয়ায় তখন স্বদেশী আর বয়কট চলছে পুরোদমে। কখন কী হয় কে জানে। তাই শুভস‍্য শীঘ্রম।  পাঁজিতে দিন দেখে সানাই, উলু, শাঁখ বাজিয়ে পাঁচ বছরের হেমনলিনী আর বারো বছরের রাধারমণের বিয়ে হয়ে যায়। ছেলের তখনও লেখাপড়া চলছে। পরীক্ষায় ভালো ফল, ভালো ঘরে বিয়ে! শুদ্দুরের পো আবার পাশ দিয়ে আরো পড়তে চায়। যুগটায় তখন ভারি জাতের বিচার। এ অনাচার কি ধম্মে সয়? ধর্ম বাঁচাতে গিয়ে আড়বালিয়ার বামুন কায়েতের কিছু দুষ্ট ছেলেপুলে শলা করে একদিন রাধাকে বিষ খাইয়ে দেয়……

বিষহরি

লক্ষ্মণচন্দ্রের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তাঁর বংশে কাকা জ‍্যাঠা জ্ঞাতিতো কেউ নেই। অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে প্রতিবেশীদের শত্রুতা সামলাবেন কি করে? হেমনলিনীর বাপের ঘরে খবর যায়। তার বাবা কাকারা ঝাঁপিয়ে পড়েন রাধাকে বাঁচাতে। হেমের দুই দাদাও তখন বড় হয়েছে। বাপের বাড়ির তাগদ আর হেমের সিঁদুরের জোর – রাধারমণ সে যাত্রা বেঁচে গেলেন, আর হিংসুকের মাথায় তবলা বাজিয়ে হয়ে গেলেন ও তল্লাটের প্রথম পাশ করা ডাক্তার। ঐ নাগচৌধুরীরাই তাঁকে গৃহচিকিৎসক নিয়োগ করল। সাত গাঁয়ের লোক দেখাতে আসত। এক রাত্তিরের বাড়ির পাশেই ডাক্তারখানা। ডাক্তার বাবুর বাড়ি বললেই গরুর গাড়ি নিয়ে আসত আত্মীয় স্বজনকে।

তুলসী তলায় পিদিম দিয়ে, ঘরে প্রথম সন্তান এল কন্যা সতীরানী। তারপর একে একে আমোদ, রণজিত, নীরোদ, সমীর। দু তিন বছরের বড় ছোট সব।  রাধারমণ অনেক রোগী দেখলেও গাঁয়ের লোকের তেমন পারিশ্রমিক দেবার ক্ষমতা নেই। আর ডাক্তার বাবু মানুষের কষ্ট বোঝেন। প্রায়ই পয়সা মাপ হয়। এদিকে লক্ষণ চন্দ্র বিদায় নিয়েছেন। রাধার মা রয়েছেন এখনো। গাঁয়ের লোক ডাকে বুড়োদি। এতগুলো ছেলেমেয়ে‌। অনেকগুলো পেট চালাতে কষ্ট। টেনেটুনে চলে। ছোটোছেলেটা জন্মানোর আগেই ডাক্তার বাবুর নামযশে বড় মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ আসে ধান‍্যকুড়িয়ার বিখ্যাত জমিদার গাইন বাড়ি থেকে। মামাবাড়ির সাহায্যে বিয়েও হয়ে যায় ধুমধাম করে। দিদির বিয়ের পর ছোটোছেলেটা জন্মায়। মেলানো ডাকনাম। বেণু, রেণু, ধেণু, ভানু। সব ঠিকঠাকই চলছিল। ভানুর যখন আড়াই বছর বয়স, হেমের বয়স দুকুড়ি পাঁচ। রাধা ডাক্তার হলেও যুগটা বড় বালাই। মেয়েদের গর্ভ ফাঁকা যায়না। হেমও রেহাই পেলোনা। এবার কন্যা বিয়োতে গিয়ে হেম সংসার থেকে একেবারে ছুটি নিল। মা – খাকি ঐ মেয়েটা বেঁচে রইল। দাদারা মায়ের স্মৃতিতে একরত্তি বোনটার নাম রাখল স্মৃতি। ভানু আর স্মৃতিকে দেখাশোনার জন্য এবার মণ্ডল পরিবারে পা রাখল হেমের আদুরী পিসি।  সে যুগে প্রায় ঘরেই বালবিধবা, নিঃসন্তান, ফাইফরমাসখাটা নারীরা থাকতেন। আত্মীয় স্বজনের যার যেমন দরকার পড়ত, পেটভাতায় সেখানে খাটুনি খেটে তাঁদের দিন যেত। এই আদুরীও
তেমন। যে কোনদিন আদর পায়না সেই আদুরী। তবে বিধাতা দেখলেন একরত্তিটা আগের জন্মে অনেক পুণ‍্যি করেছে। মা খাকি, অপয়া এসব শোনার দুঃখু দেওয়া একে উচিত হবেনা। তাই জ্ঞান হবার আগেই, বছর খানেকের মধ্যে তাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিলেন গলায় দুধ আটকানোর ছুতো করে। স্মৃতির স্মৃতি বাড়িতে মুছে গেল। তবে ভানুটা রোগাসোগা হলেও, আদুরী তাকে বাঁচিয়ে দিল। দেশ যখন স্বাধীন হল, খোকার বয়স চার।

জীবন সংগ্রাম

ভায়েদের জীবন সংগ্রাম শুরু হয়। তাদের ডাক্তার বাবা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে কোনো আপস করতে চাননা। কিন্তু এতগুলো ছেলেকে পড়ানোর সামর্থ্য কোথায়? শ্বশুরমশাই গোষ্ঠগোপালতো তখন আর নেই। কিন্তু দুই শ‍্যালক ততদিনে সাব‍্যস্ত হয়েছে। বড় গুরুদাস বাদুড়িয়া মিউনিসিপ‍্যালিটির চেয়ারম্যান। জাতীয় কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা। পারিবারিক জমিজিরেতের সঙ্গে ছিল বাদুড়িয়ার সিনেমা হলের মালিকানা। ছোটো রবীন্দ্রনাথ চাষবাস দেখেন। তাঁর নেশা আবার রান্না করা। এলাকায় কোনো বড় অনুষ্ঠান হলে খাওয়াদাওয়ার তদারকিতে তিনি – তা সে অষ্টম প্রহর কীর্তন হোক, বা কংগ্রেসের সভা। মামারা ভাগ্নেদের পড়াশোনার খরচ যোগান সাধ‍্যমতো। বড় হলে ভাগ্নেরা নিজেরা টিউশনি করে পড়ার খরচ জোটানো শুরু করে। বড় আমোদ কুমার কলকাতায় ট্রাম কোম্পানির চাকরি পায় আর শ‍্যামবাজারে মেসবাড়িতে আস্তানা খুঁজে নেয়। মেজ রণজিত কিছুদিন আড়বেলেতে মর্ডান বুক এজেন্সির মালিক পরিবারে গৃহশিক্ষক হয়ে থাকে। কাজ হল সে বাড়ির ছেলেমেয়েদের পড়ানো আর অন্য সময়ে বাজার করা, টুকিটাকি সাহায্য করে দেওয়া। এ ব‍্যবস্থায় খাওয়ার খরচটা বেঁচে যায় আর সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের পড়াটা চালানো যায় কোনোক্রমে। এ যেন শরৎবাবুর বলা এক জীবন। রণজিতের লড়াই সাফল্যের মুখ দেখে। সে এম কম পাশ করে, কলকাতায় পেটেন্ট অফিসে একটা চাকরি পায়।  হেমের বোনের ছেলে তারাপদও জীবিকার টানে কলকাতায় গিয়ে ওঠে। ভায়েরা বাড়িভাড়া নেয় কলকাতার লকগেট রোডে। মামারা বড় আর মেজ ভাগ্নের পাত্রীর খোঁজ করেন। ১৯৪৫ এ সংসার ফেলে চলে গিয়েছিলেন হেমনলিনী। আবার ১৯৫৪ তে বাড়ির চৌহদ্দিতে নতুন বৌয়ের আলতা পরা পায়ের ছাপ পড়ে। হরিশপুরের গোলদার বাড়ির সুমিত্রাকে মামারা বড় বৌ করে নিয়ে আসেন। দেড় বছর বাদে রঘুনাথপুরের খ‍্যাতনামা কবি বিজয়মাধব মণ্ডলের মেজ মেয়ে মঞ্জুলিকাকে পছন্দ করেন ছোটোমামা রবীন্দ্রনাথ, মেজ ভাগ্নে রণজিতের জন্য।

আদুরী দিদমা তখনও বেঁচে। বিজয়মাধবেরা আট ভাই, তবে বিজয় কেমনধারা অন‍্যরকম। গদ্য পদ‍্য এসব লিখে খাতা ভরায়। ধানকুড়ের যশোদা দুলাল মণ্ডল আছে, গান লেখে, পত্রিকা চালায়। তার সাথে ভাব। যশোদা বিজয়ের কবিতা ছাপায়। বিজয় রঘুনাথপুরে ইস্কুল করেছে। নিজে আবার তার সেক্রেটারি। কি কান্ড সেখানে প্রাথমিকে ছেলে মেয়ে একসঙ্গে পড়ে। মেজ মেয়েটার খুব স্মৃতি শক্তি। বিজয় তাকে ইস্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। লুকিয়ে রবিঠাকুরের কবিতা শেখায়, নিজের লেখা কবিতাও শেখায়। বাকি ভাই ভাজেরা দুচক্ষে দেখতে পারেনা বিজয়ের এই অনাসৃষ্টি কান্ড। কিন্তু শত বোঝালেও সে বাগ মানেনা। মেয়েকে নিয়ে নিয়ে, এ গাঁয়ে সে গাঁয়ে ঘোরে। যার বাড়িতে মেয়ে আছে, সেখানে নিজের মেয়েকে দেখিয়ে ধরাধরি করে। কবিতা বলায়। আরও কিছু প্রাথমিকে পাশ দেওয়া মেয়ে যোগাড় করে সে মেয়েদের সেকেন্ডারি ইস্কুল করতে চায়। মঞ্জুটাও হয়েছে তেমনি। বাপে যা বলে তাই করে। আরে বাবা,  মেয়ে নিজে যদি বাধা দিত, বাপে কি এত এগোয়? প্রথমটায় কেউ তেমন পাত্তা দেয়নি। কিন্তু ও মা! পাঁচ পাঁচটা মেয়ে যোগাড় করে বিজয় একদিন সত‍্যি সত‍্যি মেয়েদের ক্লাস ফাইভ খুলে ফেলে। খোলাপোতা থেকে এক দিদিমণি ও আসতে রাজি হয়ে যান। মঞ্জুও টকটক করে ক্লাস সেভেনে উঠে যায়। বাড়ির লোক প্রমাদ গোণে। পড়ার নেশা চড়ে গেলে, শেষে যে বে হবেনা। দেশ গাঁয়ের অরক্ষণীয়া মেয়ে ঘরে রাখা বড় বালাই। মঞ্জুকে লুকিয়ে শলা চলে। তার ঠাকুমার জায়ের নাতনি সুমিত্রার বিয়ে হয়েছে আড়বেলের মণ্ডল বাড়িতে। সে বাড়ির মেজ ছেলের জন‍্যে পাত্রী খুঁজছে। সে কলকাতায় ভাড়া ঘরে থেকে চাকরি করে। খাওয়া পরা জুটে যাবে। সুমিত্রার মামাশ্বশুরদেরও কানে ওঠে কথাটা। ছোটোমামা পাত্রী দেখতে আসেন। রণজিতকুমারের গায়ের রং টুকটুকে ফর্সা, প্রায় ছফুট। সিনেমায় নামলে নায়ক হতে পারত। মঞ্জু লম্বা বটে, তবে ছেলের তুলনায় বেশ কালো। মামা ভাগ্নের মন জানেন। পড়াশোনার চাষ আছে। সব দেখে কালো মেয়েকেই পছন্দ করে যান।

বিজয়মাধবের বই বেরোয়। সে সাহিত্য সরস্বতী উপাধি পায়। তার নিয়ম-ছাড়া মেজ মেয়েটার ইস্কুল কামাই হয়। খাতার নাম পড়ে থাকে। ভরা শ্রাবণে স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন তার পায় বেড়ি পড়ে। রণজিতের সঙ্গে মালাবদল করে সে নৌকা করে ইছামতীর খালপাড়ি দেয়। ইছামতীর হাওয়ায় তার বইয়ের পাতাগুলো ওড়ে। সেটা সন ১৯৫৬, দিনটা ১৫ই আগস্ট। মঞ্জুর নৌকো বড়পোলের ঘাটে ভেড়ে। সামনে পথ নেই, হাঁটু পেরিয়ে কাদা। সাবধানে বর বৌ গরুর গাড়িতে চলে। শ্রাবণ ধারায় খাল বিল পথ একাকার। সে জলে মঞ্জুর চোখেরও দুফোঁটা জল মিশে যায় আর সব মিলে গাড়ির গরুর পেটের তলায় ছলাৎ ছলাৎ করে। এ কি দেশ রে বাবা, ছোটোমামা ভরসা দেন, সবুর কর, এখুনি বাড়ি এসে যাবে। একটু পরে উঁচু ভিটে দেখা যায়। দুই মামীমা নির্মলাবালা আর রেণুকাবালা দাঁড়িয়ে আছেন বরণডালা নিয়ে। পিছনে উঁকিঝুঁকি দেয় সুমিত্রা।

মঞ্জুলিকার বয়স তখন
            সবে ভরা ষোলো।
অষ্টাদশী সুমিত্রার
            সঙ্গে দেখা হল।
তারপর সংসারের ফলা
            দুরন্ত তার ধার,
একসঙ্গে করবে তারা
             চারটি দশক পার।

সুমিত্রা আর মঞ্জুলিকা তখন তো ভাবতেও পারেনি, দূরের ঐ কলকাতা শহরের সিমলে পাড়ায় রয়েছে এক বারো বছরের মেয়ে বিজলী। আর বাগবাজারের ৫০ নং রামকান্ত বোস স্ট্রিটের বাড়িতে বড় হচ্ছে আর এক মেয়ে কৃষ্ণা, যার ডাকনাম খুকু। বয়স এখন মোটে দশ। সে নিবেদিতা ইস্কুলে পড়ে আর ইস্কুলের শ্রদ্ধাপ্রাণাজী তার নাম দিয়েছেন কৃষ্ণকুমারী। এই দুজনেরও চাল দেওয়া আছে এই আড়বেলের হাঁড়িতে। বিধাতা হাসেন। যাদের হাত ধরে তারা আসবে, সেই সেজকুমার আর ছোটোকুমার যে এখনও ছোটো। সেজকুমার তো বৌদিদের পিঠোপিঠি, খেলার সাথী। আর ছোটোকুমার সবে ক্লাস সেভেন। মিহি স্বর, তখনও গলা ভাঙেনি। বৌদি বৌদি ডেকে দুই বৌয়ের পায়ে পায়ে ঘোরে। রাধারমণের ডাক্তার খানা থেকে রুগী দেখে ফিরতে বেলা গড়িয়ে যায়। বাবা ঢুকতেই সেজ হাঁকডাক জোড়ে, বাবা, দেখো বৌরা কি রান্না করেছে, গালে দেওয়া যায়না। আসলে বকা খাওয়ানোর তাল। বাবা বাইরে থেকেই বলেন, গালে না দিতে পারিস ভাতে জল ঢেলে নুন মেখে খা। বৌদিরা মুখ টিপে হাসে। আহা রে! চেষ্টাটা মাঠে মারা গেল। তবু সে কি বাগ মানে? আবার আসে – মেজবৌদি! তুমি বেশি কালো না আমি, পরীক্ষা করে দেখি তো! খোকার আবার খেলার নেশা। মাঠে মাঠে ঘুরে ফুটবল খেলে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ‍্যে করে ফেরে। বাবার আর দাদা বৌদির বকুনির চোটে পড়তে বসে। সকালে আবার ইস্কুলের আগে ব‍্যয়ামের আখড়ায় যায়। দেশ অল্পদিন হল স্বাধীন হয়েছে। সমাজে শরীর চর্চা আর ফুটবলের নেশা জোরদার। বড়বৌদি ঠান্ডা মানুষ, এদের সঙ্গে অত এঁটে উঠতে পারেনা। তার গর্ভে এখন এই প্রজন্মের প্রথম সন্তান আসছে।

ধান‍্যকুড়িয়া থেকে সতীরানী শ্বশুর ঘর সামলায় আবার বাপের বাড়ি ও দেখাশোনা করে। হেমনলিনীর মেজ বোনের বিয়ে হয়েছে যদুরহাটিতে আর ছোটোবোন ছিল ঈশ্বরীগাছায়। তাদের পরিবার আবার এবাড়িতে যাতায়াত শুরু করে। সংসারে শ্রী ফিরেছে। সুমিত্রার বাপের বাড়ির লোকেরা, বোনেরা শঙ্করী, লক্ষ্মী, শীলাও আসে দিদির কাছে, কিছুদিন থেকে যায়। মঞ্জুর বোনেদেরও কাছাকাছি বিয়ে হয়। বড় হেনার বাড়ি পাশে ধান‍্যকুড়িয়ায়, ছোটোর বাড়ি নেহালপুরে। তারাও আসে যায়। হেমনলিনীর জ‍্যেঠতুত ভাইবোনেরা ছিল – মল্লুক মামা, সুশান্ত মামা লক্ষ্মীমাসি – এতদিন পরে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়। অনেকদিন পরে উৎসবে, আত্মীয়তায় বাড়ি আবার গমগমিয়ে ওঠে। মেজকুমার কিন্তু মঞ্জুকে বলে, তুমি খোকার সঙ্গে আবার পড়া শুরু কর। তবে সংসারের ডামাডোলে সে আর হয়ে ওঠেনা। জীবনে সুখ দুঃখ পাশাপাশি চলে। একদিন ডাক্তার খানা থেকে ফিরে রাধারমণ খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছেলেরা কলকাতা থেকে ডাক্তার আনায়। পরীক্ষায় জানা যায়, অসুখটা কঠিন – লিউকেমিয়া। সক্ষম মানুষটি হঠাৎই বিদায় নেন। এদিকে শুকপুকুরে বিদায় নেন ছোটমামা সকলকে হতবাক করে দিয়ে। দুটো ঝড় এসে সংসারটা ঘুরে দাঁড়ানোর মুখে আবার টালমাটাল করে দেয়। খোকা আরও বেশি করে বৌদিদের আঁচল জড়িয়ে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে আবার সবাই শুরু করে নতুন পর্বের লড়াই।

সমুদ্র মন্থন

সংসারের সরোবরে পদ্ম ফোটান যিনি,
আড়বেলিয়ার ঘরের মাথায় ছাতা ধরেন তিনি।
বড়রানীর কোলে দোলে ছোট্ট কমলিনী।

সেজকুমারও পাশ দেবার পর কলকাতায় কলেজ স্ট্রিট বাটায় চাকরি পেয়ে এবারে কলকাতাবাসি হয়। মেজকুমারের সংসারে রাজপুত্র আর রাজকন্যা আসে – মলয় আর শুভ্রা। সংসারের বাড়তি খরচ চালানোর জন্য সে ছাত্র পড়ানো শুরু করে। টালায় একবাড়িতে টিউশনি করতে গিয়ে শোনে গৃহকর্ত্রীর নাতনির জন্য পাত্রী দেখা চলছে। গৃহকর্ত্রী আবার তার একমাত্র দিদি সতীরানীর আত্মীয়। পরিবার জানাশোনা, তাই ঐ নাতনির সঙ্গে সেজভাইয়ের সম্বন্ধ করা হল। আর কি? – সিমলের বিজলি আর নীরোদের মিলন হল আড়বালিয়ার আকাশের নিচে। নীরোদ – বিজলীর কলেজ স্ট্রিটের সংসারে নেমে এল দুটি বৃষ্টি ফোঁটা, মৃণাল আর কুনাল।

ছোটোকুমার ইস্কুল পাশ করে কলকাতায় পড়তে আসে। ইচ্ছে ছিল বাবার মতো ডাক্তারিতে ভর্তি হওয়া। কিন্তু একা একা অজানা শহরে ঠোক্কর খেতে খেতে হঠাৎ নতুন বন্ধুদের পরামর্শে  পলিটেকনিক কলেজে ভর্তি হয়ে যায়। পাশ করে সে পোর্ট কমিশনের হেড অফিসে চাকরি পায়। আর লকগেট রোডের সেই বাসাবাড়িতে মাথা গোঁজে। তারপর পড়ার নেশায় বি এস সিও পাশ দিয়ে দেয়। এদিকে তো সেই বাগবাজারের কৃষ্ণা অশোকনগর ঘুরে এখন লকগেট রোডে ভাড়া থাকে। তার দাদা সুজিতচন্দ্র টালিগঞ্জের সিনেমা পাড়ার কাজ ছেড়ে এখন কাশিপুর গান শেল ফ‍্যাক্টরিতে একটা চাকরি পেয়ে গেছে। ঐ লকগেট রোডে আড়বেলের খোকা সমীর কুমার আর কলকাতার খুকু কৃষ্ণকুমারীর চার চোখ এক হল। গল্পের নটেগাছ কিন্তু মুড়োলোনা বরং দিন কে দিন আরো ডালপালা বিস্তার করল। আড়বেলেতে তখন ভরা সংসার। কমলিনীর পরে সুমিত্রার কোলে এসেছে আরও তিনটি পুত্র – বিশ্বজিত, সুজিত আর অভিজিত। মঞ্জুলিকারও এক পুত্র এক কন্যা মলয় আর শুভ্রা। বিজলীর কোলে আছে ছোট্ট মৃণাল। এই অসবর্ণ বিয়ের সম্ভাবনায় দুই প‍রিবারেই ঝড় উঠল। কৃষ্ণার আত্মীয় স্বজন বেঁকে বসলেন। এখন হোকনা যতই অবস্থা পড়তি, তবু কুলীন কায়েত বোস বংশ বলে কথা, নামজাদা বনেদী পরিবারগুলির সঙ্গে আত্মীয়তা। হোকনা পাত্র সুদর্শন, মেধাবী, চাকরি ওলা। মণ্ডল আর বোসের বিয়ে হতে পারে কোনোদিন? তাছাড়া যে মেয়ে কোনোদিন গ্রাম দেখেনি সে কিকরে ঐ অজ পাড়া গাঁয়ে সংসার করবে? আর আড়বালিয়ায়তেও সবার কপালে ভাঁজ।

কৃষ্ণাতীরে সমীর বহে
মনে তাদের ফাগুন
আড়বালিয়ার সংসারে কি
জ্বলবে এবার আগুন?

মেনে নেওয়া কিকরে যায়?
যদিও ওরা ঘটি,
মাটির ঘরে মানিয়ে নেবে
কলকেতার ঐ বেটি?

সম্বন্ধ নয় ভালোবাসা –
ভে-ন্নজাতে বিয়ে!
সুমিত্রা আর মঞ্জুলিকা
উঠল ঘেমে নেয়ে।

কিন্তু কন্দর্পের বাণ যে কোনো বাধাই মানেনা। তাই কলকাতার খুকু একদিন শুভক্ষণে পায়ে আলতা পরে ঘোমটা মাথায় খোকার মতোই সুমিত্রা আর মঞ্জুলিকার আঁচলের তলায় ঢুকলো। সনটা ১৯৬৯। খোকার মাইনে তখন বেশি তো নয়। বড়দি সতীরানী ভাড়া থাকত পাইকপাড়ায়। সেই বাসায় বড়দির ঘরের পাশে ঢাকা বারান্দায় তাদের প্রথম সংসার। এরপর ওদের জন্য পাইকপাড়ায় একটা আলাদা বাসাবাড়ি নেওয়া হল। আর যুগটা হাঁটি হাঁটি পা পা করে বিক্ষুব্ধ সত্তরের দশকে ঢুকে পড়ল।

জলছবি

উনিশশ ষাট পেরিয়ে
সত্তর যেই এল,
খোকা খুকুর ঘরে
একটা মেয়ের জন্ম হল।
এমন তো কতই হয়,
ঘটনার কি গুণ?
আরে এই মেয়েটাই,
এ গপ্পের – কথক ঠাকরুণ।

তার মানে হল, এই যে আমি কলকাতার মেডিকেল কলেজে কেঁদে উঠলাম – তার ফলে গল্পটা আর প্রথম পুরুষে লেখার কোনো হেতু  রইলনা। এবার থেকে সব উত্তম পুরুষেই চলবে।

আমার বোন সর্বানী আমার থেকে প্রায় দুবছরের ছোট। তবে বোনের জন্মের আগের বেশ কিছু স্মৃতি এখনো আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি। পাইকপাড়ায় যে বাড়িতে আমি শিশুকালে থাকতাম, সেই পরিবারের সঙ্গে এতটাই ভালো সম্পর্ক ছিল, যে বড়বেলাতেও সে বাড়ি যেতাম। গৃহকর্ত্রীকে পিসিমণি ডাকতাম। একজন দিদিভাই ছিল ব্রততী, ডাকনাম বনি, পিসিমণির মেয়ে। মাঝখানে একটি খোলা উঠোন, চারপাশে রেলিং দেওয়া বারান্দা মোজেইক করা। একতলায় আমরা থাকতাম, আর দোতলায় পিসিমণিরা। সেই দোতলার  বারান্দাতেই একটি ছবি ভেসে আসে – আপাদমস্তক উলের পোষাকে ঢেকে আমি একটা নীল প্লাস্টিক ক্রিকেট ব‍্যাট নিয়ে দাঁড়াচ্ছি আর মা একটা লাল টুকটুকে বল ছুঁড়ে দিচ্ছে। আমি একবারও ব‍্যাটে বলে সংযোগ করতে পারছিনা কিন্তু বারান্দার ব‍্যাটিং পিচে খুব দৌড়োদৌড়ি করছি, এদিক থেকে ওদিক আবার ওদিক থেকে এদিক। আচ্ছা! ব‍্যাটের দিকে বল ছুঁড়লে যে এদিকে ওদিকে দৌড়তে হয়, একথা কে শিখিয়ে দিয়েছিল – বাবা? আবার কখনও মনে পড়ে সরস্বতী পুজো হচ্ছে, সদর দরজার কাছে বাঁদিকে প্রথম ঘরে ঠাকুর। ঘর জুড়ে অনেক কিছু সাজানো। দূরে ঠাকুরের পাশে কয়েকটা বই রাখা, ওপরেরটা আমার। নীল মলাটের ওপর লাল আর সাদা দিয়ে লেখা। আমার বইটা নিয়ে নিয়েছে সবাই। এত জিনিস টপকে আমি যেতেও পারছিনা যে তুলে আনব। মা সমানে বোঝাচ্ছে, যে ঠাকুরের কাছ থেকে বই তুলে নিতে নেই। কিন্তু আমার ভবি ভোলার নয়। বারবার দরজা দিয়ে বইটা দেখছি, সদর দরজা অবধি দৌড়োচ্ছি আর প্রচন্ড চেঁচিয়ে কাঁদছি। আচ্ছা কি বই ছিল ওটা? দেওয়ালে ক‍্যালেন্ডার, মা কোলে করে ক‍্যালেন্ডারের সামনে আমায় নিয়ে গিয়ে বলছে এটা কে? আমি বলছি বিবেকান্দ-নন্দ। মা হাসছে, আমি হাততালি দিচ্ছি। মনে পড়ে রাস্তার উল্টো দিকে অল্প দূরে পিসির বাড়ি যেতাম। পিসির বাড়ির লম্বা জানলা, উঁচু খাট। মাদুর পেতে খাটের তলায় লাল সিমেন্টের মেঝেতে শুতাম। লম্বা জানলার নিচের অংশ দিয়ে বিকেলের রোদ ঢুকে খাটের তলায় আঁকিবুকি  কাটত। আমি দেখতাম। দুবছরের শিশুর পক্ষে এতগুলো স্মৃতি অনেক। করোনা অনবসরের গৃহবন্দী জীবনে মেজজ‍্যাঠাইমা মানে মঞ্জুলিকা আর আমি মানে টুম্পা ফোনে ফোনে গল্প করি। পিসির বাড়ির খাটের তলায় শোয়ার কথা বলতেই, মঞ্জু বলে, আরে ঐ খাটের তলায় তো আমি ও শুয়েছি। পিসির বাড়ি ছোটো হলেও তকতকে। খাটের তলাতেও কোনো ঝুল বা ধুলোর প্রবেশাধিকার ছিলনা। আর মা বলতো আমার পিসি ঘরে ম‍্যানেজার রাখলেও স্টিলের, এ্যালুমিনিয়ামের আর হিন্ডালিয়ামের বাসনগুলো রুপো আর পিতল কাঁসার বাসনগুলো সোনা করে রাখতো ঘষে ঘষে। বাসনে কোনদিন কোনো দাগ ধরতে দেয়নি। বয়সকালে এই পরিষ্কার করাই বাতিক হয়ে কিছুটা শুচিবাইগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। পিসির গল্প করতে গিয়ে একাশি বছরের মঞ্জু আর একান্নর টুম্পা হাসে ফোনের দুপাশে। কথা বলতে বলতে মঞ্জু বলে এজীবনে অনেক কিছুই দেখলাম। ছেলে মেয়েরা প্রতিষ্ঠিত হল, নাতি নাতনিরাও সাব‍্যস্ত হল, শুধু লেখাপড়াটা হলনা রে টুম্পা। আজ এই শেষের দিনে বসে চুপচাপ ভাবি, বড় খেদ রয়ে গেল। মঞ্জু কাঁদে, টুম্পা ওপাশে মুখে হাতচাপা দেয়। চেষ্টা করে গলাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার। মঞ্জু সোনার তরী আবৃত্তি করে, বিজয়মাধবের কাছে শেখা। টুম্পা এপাশে ফোনের কল রেকর্ডার অন করে দেয়

ঐ কচি বয়সের স্মৃতি আমার আড়বেলেতেও আছে। বিকেলের হলুদ আলো, উঁচু অবধি বাঁশের ভারা, অনেক বাচ্চা সেই উঁচুতে বাঁশে দাঁড়িয়ে। নিচে অনেকে মিলে একটা বড় জাল টেনে ধরে রেখেছে। ঐ জালে একটা করে বাচ্চা লাফ দিচ্ছে। বাবার কোল থেকে আমি অবাক হয়ে দেখছি। তারপরে রোদের মধ্যেই গায়ে জল পড়ল। বৃষ্টি নামল। বাবা একটু ঝুঁকে আমাকে দুটো হাত দিয়ে আড়াল করল। বাবা দৌড়োচ্ছিল। আমি বাবার ওমে ছিলাম, তখন আমার গায়ে জল পড়ছিলনা। তারপরে কি ঘুমিয়ে গেলাম? স্মৃতিটা আর নেই। পরে বড় হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

– মা, এমন কিছু কি ঘটেছিল, নাকি স্বপ্ন?
মা অবাক হয়ে বলেছিল
– আড়বেলের চড়কের মেলা, বাঁশে বাঁধা চড়কগাছ। বৃষ্টি এল, তোর বোন তখন পেটে। হিসেব মতো তোর তখন একবছর চার মাস। এসব কথা বলছিস কি করে রে?
– মনে যে ছবি ভেসে আসে, মা।
– এ কি অদ্ভুত রে?
– আচ্ছা মা, বিয়েবাড়ি, উঠোনে ইংরেজি এইচের মতো কমলা রঙের কাঠের চেয়ার, সামনে সাইকেল ভ‍্যান, তাতে অনেক কলাপাতা, কাপড় দিয়ে ঢাকা, এমন কিছু হয়েছিল?
– হ‍্যাঁ, সে তো বকুলদার মেয়ে বাবলির বিয়ে, দমদমে।
– মা শোনোনা, একটা সিনেমা হচ্ছে, একজন লোক, দরজার পর দরজা পেরিয়ে যাচ্ছে, ওটাও তাহলে সত্যি!
– ওটা তো প্রমথেশ বড়ুয়ার মুক্তি।
– প্রমথেশ বড়ুয়া! উত্তম কুমারের আইডল – পি সি বি?
– হ‍্যাঁ, সেই পি সি বি। বাবা ধন‍্যি তোর মনের ছবি।

নতুন সূর্য

বোন হবার পরে পাইকপাড়া ছেড়ে আমরা পাতিপুকুরের সরকারি আবাসনে উঠে এলাম। পাতিপুকুরে এসে মা বিবেকানন্দ বিদ‍্যাভবনে বি এ তে ভর্তি হল। আর বাবার তো ঠাকুরদার মতো ডাক্তার হবার ইচ্ছে ছিল। সে তো হলনা। বাবা সেই আশা কিছুটা হলেও পূরণ করার জন্য সরকারি হোমিওপ্যাথি কলেজে ভর্তি হল। শুরু হল সংসার, চাকরি আমাদের বড় করে তোলা আর সঙ্গে পড়াশোনা। আমরা একটা ঘরে থাকতাম। খাটটা ছিল উঁচু, তার তলায় সর্বস্ব। পাঁচ সাত খাটের মাঝখানে আমি আর বোন দুদিকে মাথা করে, পায়ে পা ঠেকিয়ে শুতাম। দুপাশে বাবা মা। বাবা আমার দিকে মাথা করে শুত আর মায়ের মাথা বোনের দিকে। গভীর রাতে যদি ঘুম ভেঙে যেত, দেখতাম খাটের একপাশে বা মেঝেতে হারিকেন জ্বালিয়ে বাবা মা পড়াশোনা করছে। আলোটা এপাশে খবরের কাগজ দিয়ে আড়াল করা, যাতে আমাদের চোখে না পড়ে।

উঠতি ঘরের ছেলে
আর পড়তি ঘরের মেয়ে,
বিদ‍্যেদেবী থাকেন তাদের
সারা জীবন ছেয়ে।

বাবা মা দুজনেই খুব মেধাবী ছিল। কিন্তু মা যেকোনো বিষয়ে খুব উদ্বেগে ভুগত, আর বাবা নিরুত্তাপ। মা পার্ট ওয়ান পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগের দিন হয়তো ঠিক মতো প্রস্তুতি হয়নি, সেই ভেবে ভেবে বমি টমি করে একশা। পরীক্ষার দিন বাবাকে ছুটি নিতে হল, অসুস্থ মাকে নিয়ে যাবার জন্য। বাবা কিন্তু অফিস, সংসার সামলেও চুপচাপ প্রথম পরীক্ষা দিয়ে দিল, তেমন কোনো ঢেউ উঠলোনা। শুধু প্র‍্যাকটিকাল খাতার আঁকাগুলো আমার মাসি, কাবেরীকে দিয়ে আঁকাতো। মাসিমণি খুবই ভালো আঁকত। বাবা সন্ধ‍্যেবেলায় বাড়ি ফিরে ঐ আঁকার উপর বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো ঠিক করে নিত আর স্কেল দিয়ে লাইন টেনে লেবেলিং করতো। আমি চুপচাপ একটু দূর থেকে ড‍্যাবডেবিয়ে দেখতাম, বাবা কি করছে। বাবার একটা ট্রাঙ্ক ভর্তি করে হাড় থাকত। সেই হাড় গুলো নিয়ে বাবা পড়াশোনা করত। ঐ হাড়ের বাক্স চানঘরের ওপরে লফ্টে রাখা থাকত। আমার প্রচন্ড আকর্ষণ ছিল ঐ ট্রাঙ্কের ওপর। ট্রাঙ্ক নামলে আমি আর দূরে থাকতে পারতাম না। বাবার পিঠের ওপর দিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে দেখতাম। এটা ওটা জিজ্ঞেস করতাম। ঐ দেখে দেখে চিনে গিয়েছিলাম, কোন হাড়টা শরীরের কোথায় থাকে। নিজের শরীরে স্পর্শ করে ঐ হাড়গুলো অনুভব করতাম। তবে সবচেয়ে ভালো লাগত ওপরের পিঠে, কাঁধের নিচের তিনকোণা স্ক‍্যাপুলা। ওটা নিয়ে খেলতাম। বোনকে বলতাম, এ্যাই আমার স্ক‍্যাপুলায় একটু চুলকে দে তো। মাকে বলতাম, মা – আ! আমার টিবিয়া আর ফিবুলার মাঝখান টা ধরে টিপে দাও। খুব ব‍্যথা করছে। আমার রোজ রোজ সন্ধ‍্যে হলেই পা ব‍্যথা করত। মা চুল বাঁধার কালো দড়ি দিয়ে পা জড়িয়ে বেঁধে দিত। প্রথম পরীক্ষার পর রেজাল্ট বেরোলে দেখা গেল বাবা পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে। আর ফাইনালে বাবা তৃতীয় হয়েছিল। অনেক পরে যখন বাবার সঙ্গে গিয়ে কোনো অ্যালোপ‍্যাথি নামকরা ডাক্তার দেখিয়েছি, তখন দেখতাম বাবা গিয়ে প্রণাম করত। ওঁরা ছিলেন বাবার স‍্যার। যাই হোক, মা গ্র‍্যাজুয়েট হল, আর বাবা হোমিওপ্যাথিতে ডাক্তারি পাশ করল। আমি ততদিনে বাগবাজার মাল্টিপারপাসে কেজি ওয়ানে ভর্তি হলাম। সালটা উনিশশ পঁচাত্তর। স্কুলের দিন গুলো খুবই আনন্দে কাটত। কিন্তু বাড়ি এসে চাপা টেনশন। বাবা ফিরত রাত দশটা পার করে। মা ঘরবার করতো। শুনতাম কিসব জরুরী অবস্থা হয়েছে আমাদের দেশে, জরুরী মানে খুব দরকারি। তাই বাবার অফিসে ওভারটাইম হয়, বাবাকে দেশের খুব দরকার। আনন্দবাজারে রোজ হেডলাইনের নিচে বড় করে কুট্টির কার্টুন বেরোত। বাবা মা ব‍্যস্ত থাকার জন্য, আমরা প্রায়ই কাছেই মামার বাড়ি থাকতাম। আর তখন মামা বসে বসে কুট্টির কার্টুনের মানে বোঝাতো আমাকে।

  • এই দেখ টুম্পা, এখানে এইযে কাপড় মুড়ি দিয়ে গণতন্ত্র শুয়ে ঘুমোচ্ছে। আর এই দেখ দরজা দিয়ে সিদ্ধার্থ বেরিয়ে যাচ্ছে।
  • কেন মামা?
  • আরে সেদিন বুদ্ধদেবের গল্প বললাম মনে নেই?
  • হ‍্যাঁ-অ্যাঁ
  • যশোধরা ঘুমোচ্ছিল, আর রাজপুত্র সিদ্ধার্থ বেরিয়ে গেল না?
  • হ‍্যাঁ হ‍্যাঁ
  • আরে সেটাই কুট্টি এঁকেছেন দেখ।
  • কী?
  • আরে সিদ্ধার্থের মুখটা দেখ, নাক বের করা, তোলা চুল। এটা বুদ্ধদেব নয়, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়, মুখ‍্যমন্ত্রী। এই দেখ ভেতরের পাতায় ছবি। মিল পাচ্ছিস? একে বলে কার্টুন। নামের মিল বলে এইভাবে দেখাচ্ছে।
  • বুদ্ধদেব কে আঁকেনি কেন?
  • আর একটু বড় হ। বুঝতে পারবি কেনো আঁকেনি।

এর মধ‍্যে আবার মায়ের এক পিস্তুত ভাই মারা গেল। কলেজে পড়ত।দুপুরে ভাত খেতে বসেছিল, বাইরে থেকে কারা ডাকল। উঠে গেল। নামতে গিয়ে সিঁড়িতেই গলা কেটে দিল। আর তার মা মানে মায়ের মেজপিসি বোবা হয়ে গেল, আর কথা বলেনা।

  • কে গলা কেটে দিল মা?
  • নকশাল
  • নকশাল কে? খুব দুষ্টু লোক? এখানে আসবেনা তো?
  • চুপ চুপ। বাড়িতে যা বললে বললে, বাইরে, ইস্কুলে এসব কথা উচ্চারণ করবেনা।
    রাস্তা দিয়ে মিছিল যেত। জানলা দিয়ে দেখে দেখে আমি আর বোন খাটের ওপরে মায়ের লাল ব্লাউজ নিয়ে মিছিল করতাম, চেঁচাতাম – ভোট দিন বাঁ-চতে, ত্-তা-রা হাতুড়ি কাস্তে। ইন -কি-লা-ব, জিন্দা-বা-দ। ঐ জানলাই ছিল জগৎ। আইসক্রিম ওলা, ঘুঁটে উলি, বাসন উলি যেই রাস্তা দিয়ে যেত, তাকে দুজনে ডাকতাম। কেউ হাসত, কেউ রাগ করতো। পাঁচমাথার মোড় থেকে হেঁটে ইস্কুলে যেতাম। আর দোকান, দেওয়াল এসবে কি লেখা আছে ড‍্যাবডেবে চোখ দিয়ে গিলতাম। ইস্কুলে সবার নাম লেখা দুটো করে ন‍্যাপকিন, থালা, গেলাস ছিল। একটা ভাঁজ করে গলায় গুঁজে ঝোলাতে হত। আর একটা টেবিলে পেতে থালা রাখতে হত। টিফিন ইস্কুল থেকেই দিত। খাওয়ার পর সবার ফোল্ডিং খাট ছিল, সেখানে ঘুমোতে হত। তিনজন মিস ছিলেন, মিস চৌধুরী, মিস ব‍্যানার্জি আর মিস বোস। মাঠে খেলা, নাচ গান, ব্রাশ দিয়ে বালি খেলা আর হাতের কাজ, আঁকা, কাঁচি দিয়ে গোল কাটা, এইসব হত। কিন্তু মনে হত, ইস্কুলটা বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেত। আর ভীষণ রেগে মাকে বলতাম, আমার ওভার টাইম হবেনা মা? আমার বুঝি কিছু জরুরী নেই? আমাকে দেশের দরকার লাগবেনা! মা গম্ভীর হয়ে বলতো, সে তো বটেই, তোমাকে দেশের খুবই দরকার। একটু বড় হলেই ওভার টাইম হবে। মায়ের কথা শুনে, বড় হলে, দেশ ঠিক কী করতে বলবে, এসব আকাশ পাতাল ভাবতে বসতাম। কে জি টু তে উঠে গেলাম। আর কতদিন লাগবে? এখনো তো দেশ কিছুই বলছেনা। বললে আমি জানবোই বা কিকরে? চিঠি দেবে? রাঁচি থেকে বড়দাদুর চিঠি আসে। আমার চিঠি বাড়িতে আসবে নাকি ইস্কুলে? আমাদের ব্লকে পোস্টম‍্যান ঢুকলেই লক্ষ্য রাখতাম, আমার নামে কোনো চিঠি এলো? কিন্তু এই চিঠির অপেক্ষায় থাকাটা কাউকেই বলিনি, মাকেও না।
    আমি ওয়ানে উঠলাম। মা নিবেদিতা ইস্কুলে প্রাথমিক বিভাগে পড়ানোর চাকরি পেল। আমিও মাল্টিপারপাস ছেড়ে নিবেদিতায় ভর্তি হলাম। ওয়ানে ভর্তির পর থেকেই দেওয়ালের লেখাগুলো অনেক বদলে যাচ্ছিল। মাল্টিপারপাসের পাশে একটা দেওয়ালে বিরাট হাত, হাতের তালুতে গরাদ, গরাদের আড়ালে ছেলে। পাশে লেখা – একটি ভোট দিলে হাতে, মরবে পচে জেল হাজতে। ছি ছি কি বিচ্ছিরি ছবি। আর নিবেদিতা লেনের দেওয়ালে লেখা ছিল – বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বুঝে নিক দুর্বৃত্ত। সঙ্গে চাষীর ছবি। লাইনটা বেশ মনে ধরল, ছবিটাও। মাকে দেখালাম। মা বলল, ওটা সুকান্তের কবিতা। বাবাকে ধরলাম, সুকান্ত কে? বাবা মায়ের দিকে তাকালো। মা সংক্ষেপে দেওয়ালের কথা বলল, আরও জুড়ে দিল, কাগজ আর দেওয়াল পড়ে পড়ে এই সব রাজনীতির দিকে নজর পড়েছে মেয়ের। দিনরাত এটা ওটা প্রশ্ন। বাবা কোনো কথা বললনা। কিন্তু পরের দিন একটা বই ধরিয়ে দিল আমার হাতে। নামটা সুকান্ত সমগ্র। আবার কিছুদিনের খাদ্য পেয়ে গেলাম। ইস্কুল যাবার পথে দেওয়াল জুড়ে রাক্ষসীর ছবি আঁকা থাকত, বড় বড় নখ ওলা, তাতে রক্ত পড়ছে।
  • মা দেওয়ালে এত রাক্ষুসী কে আঁকে বলোতো?
  • রাক্ষুসী? ও! ঐ ইন্দিরা গান্ধীকে আঁকে।
  • ই-ন্দি-রা গান্ধী! সে তো দারুণ দেখতে। দিল্লীতে থাকে। সিনেমার আগে, যার সিনেমা হয়, সেই তো। তার হাতে তারা হাতুড়ি কাস্তে থাকে? রাক্ষুসীর পাশে আঁকা থাকে।
  • আমি ওসব বলতে পারবোনা। বাবাকে জিজ্ঞেস কর।
    বাবা ব‍্যাপারটা মোটামুটি বুঝিয়ে দিল। মাঠে ফুটবল খেলা হলে যেমন কয়েকটা দল থাকে, দেশ চালাতে গেলেও তেমন। লোকে যাতে চিনতে পারে, তাই সব দলের একটা করে ছবি আছে। যে জিতে যায়, সে দিল্লিতে থাকে। মনে মনে হিসেব কষে নিলাম। ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে থাকে, মানে জিতে গেছে। তার ছবি হল হাত। আর তারা হাতুড়ি কাস্তে হল তার শত্রু। তাই রাক্ষুসী আঁকে। তবে কি বড় হলে ইন্দিরা গান্ধীই চিঠি দেবে আমাকে? কিন্তু হঠাৎ একদিন শুনলাম ইন্দিরা গান্ধী খেলায় হেরে গেছে। থমথমে মুখে ঘুরতে লাগলাম, আমার চিঠির কি হবে? মা লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল,
  • কী হয়েছে?
    আমি এবারে ভেঙে পড়লাম। সেই কেজি ওয়ান থেকে অপেক্ষা করছি। ভেবেছিলাম ইন্দিরা গান্ধী চিঠি দেবে ওভারটাইমের জন্য। সে হেরে গেছে। আমি তাহলে দেশের দরকারে লাগব কী করে? চোখে জল চলে এল আমার। মা একটু সময় নিয়ে ব‍্যাপারটা বুঝল, আমার সমস‍্যাটা কী? তারপরে বলল,
  • তুমি ভুল বুঝে কষ্ট পাচ্ছ। দেশ ঐভাবে চিঠি দেয়না। দেশ কি চায়, সেটা বইতে লেখা থাকে। আর খেলতে গেলে হারজিত হবেই। কখনো মোহনবাগান জিতবে, কখনো ইস্টবেঙ্গল। এতে দুঃখের কিছু নেই।
    আমি কান্না ভেজা গলায় বললাম,
  • তা সে কোন বইতে দেশের দরকার লেখা থাকে, সেটা কি তোমার কাছে আছে? আমি পড়তাম তবে।
    মা তখন খাটের তলায় বইয়ের পাঁজা থেকে একটা বই বার করে গল্প পড়ে শোনালো। বইয়ের নাম রামকৃষ্ণের কথা ও গল্প। ধর্মব‍্যাধের গল্প। একজন ব‍্যাধ নিজের সব কর্তব্য পালন করতো, কোনো অহঙ্কার করতোনা, অন‍্যের ক্ষতি চাইতোনা। তাই সে সত‍্যিকারের জ্ঞানী হল, সন্ন‍্যাসীকে অবধি উপদেশ দিতে পারতো। গল্প পড়া শেষ করে মা বলল, যার যা কাজ সে সেটা মন দিয়ে করলেই দেশ খুশি হয়। দেশকে খুশি রাখাটাই সবার কাজ।
  • আমি এখন কী কাজ করে দেশকে খুশি করতে পারি।
  • পড়াশোনা করে।
  • পড়াশোনা করা দেশের কাজ? সবাই তো করেনা।
  • বয়েস অনুযায়ী কাজ বদলায়। ছোটোদের কাজ পড়াশোনা। এই বলে মা আর একটা পুরোনো বই বার করলো। বলল,
  • পড়ো, কি লেখা আছে।
    বানান করে দেখলাম লেখা আছে- ছাত্রাণাং অধ‍্যয়নং তপঃ। মানেটা মা বলে দিল, ছোটোদের কাছে বই পড়াটাই সাধনা। দেশের জ্ঞানী ঋষির কথা। বুক থেকে পাথর নেমে গেল। বাড়িতে বসে মন দিয়ে বই পড়লেই দেশ খুশি হবে। এই এত সহজ কথাটাই জানতাম না। মায়ের সঙ্গে আগেই আলোচনা করা উচিত ছিল। মা দেখছি সবই জানে। বাবার ডাক্তারি বই অবধি ঘেঁটে ঘুঁটে দেখতে লাগলাম, বাংলায় কিছু আছে কিনা। পেয়েও গেলাম মেটেরিয়া মেডিকা। তারপর একদিন খবরের কাগজের মধ্যে একটা চকচকে বই এলো – শুকতারা। বাবা বলল, এবার থেকে তোমার জন্য প্রতি মাসে শুকতারা আসবে। এখন এটা পড়ো, মেটেরিয়া মেডিকা পরে পড়বে। সেই থেকে মা বাবার কথা মতো বই পড়ে চলেছি। বইয়ের বাইরে তেমন করে কিছু আর শেখা হলনা। ডাকঘর পড়েছি। রাজার চিঠি আসে কিনা জানিনা। ২০১২ সালে যখন কলেজের টিচার ইন চার্জ হলাম, মমতা ব‍্যানার্জির সই করা চিঠি পেয়েছিলাম নারী দিবসে। নারী প্রশাসক হিসেবে অভিনন্দনের চিঠি, সঙ্গে বড় প‍্যাকেট মিষ্টি, ফুলের বোকে। কম্পিউটারের ডাটা অ্যালগোরিদমের কারসাজিতে, জন্মদিনে নরেন্দ্র মোদীর ছবি আর সই দেওয়া ইমেলও পেয়েছি বার দুয়েক। নিজের মনে হাসি, দেশ কি জানতে পারে, কী কাজ করি আমি।

পিসিমণি

আমরা যখন পাতিপুকুরে এলাম, তখন পিসিও চলে এল দত্তবাগানে। সে বাড়িতে চন্দনা ছিল। আমি আর বোন পিসির কাছ থেকে ধানের শিষ নিয়ে তাকে খাওয়াতাম। পিসি লক্ষ্মী ঘিয়ে লুচি ভাজত। সেই লুচি ভাজার গন্ধ ছিল পিসির বাড়ির গন্ধ। আর বড়দের মতো আমাদেরও একরকম ভাবে বাটি বাটি করে তরকারি, বেগুনভাজা, মিষ্টি সাজিয়ে দিত। বড় ছোট আলাদা করতোনা। এটা ছিল একটা বিরাট সম্মানের ব‍্যাপার। বাড়িতে বাবা মাকে ভয় করতাম। কিন্তু পিসির সামনে বাবা মা জবুথবু। যতই দৌরাত্ম্য করি, কেউ কিছু বলতে পারতনা। বকার চেষ্টা করলেই  পিসি কড়া ধমক দিত বাবা মাকে। এই ব‍্যাপারটা দারুণ লাগত, তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতাম। শীতের শুরুতে মাঝে মাঝে ঐ আবাসনে নীচ থেকে হাঁক শোনা যেত – টু-ম্পা, ঝু-ম্পা! আর জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালেই মনটা নেচে উঠত। দেখতাম অনেক ব‍্যাগ নিয়ে, দশাসই পিসিমণি সাইকেল রিক্সায় বসে আছে। আমরা তিনতলার কোয়ার্টার থেকে ছুট্টে নিচে গিয়ে ব‍্যাগগুলো ধরলে পিসি রিক্সো থেকে নামত। ঘরে এসে সেই ব‍্যাগ থেকে থরে থরে বেরোতো – তুলতুলে দুধপুলি, নারকেল – গুড়ের পাক ভরা সেদ্ধ পুলি, পাটিসাপটা দুরকম, একটা চিকণ, অন‍্যটা ক্ষীরের মধ্যে ভাসমান। সেদ্ধ পুলিটা ডুবিয়ে খাওয়ার জন্য আড়বেলে স্পেশাল মৌঝোলা গুড়। বাবা পাটিসাপটা খেতে ভালোবাসত, আমার আর মায়ের প্রিয় ছিল রসবড়া। চিনির রসে টোপা টোপা দেবভোগ‍্য রসবড়া ভাসতো। পড়তে পেতোনা, সব খেয়ে ফেলতাম। আর তারপরে দুতিন দিন প্রাতরাশ হতো পুলি দিয়ে। পিসি চলে যাওয়ার পর পিঠে পুলিও গল্প হয়ে গেল। পিসির মুখে হিমালয় কোম্পানির স্নো, তার সঙ্গে পাউডার আর ঘামের গন্ধ মিশে একটা ছোটোবেলার গন্ধ ছিল। ঐ গন্ধটা আজকাল মাঝে মাঝে স্বপ্নে আসে।
বারাসাতে তখন সদ‍্য পৌর জনবসতির সলতে পাকানো চলছে। পিসিমনাই ছিল করিতকর্মা মানুষ। বারাসাতে ধীরে ধীরে পিসিমনাই একটা বড় বাড়ি করল। সে বাড়িতে বাগান ছিল, বাঁধানো ঘাটওলা পুকুর ছিল। পুকুরের ঘাটের দুপাশে লাল সিমেন্টের বসার জায়গা করা ছিল। চারিদিকে ফাঁকা মাঠ। দূরে ধানজমি আর হু হু হাওয়া। চিলেকোঠার ঠাকুরঘরে পিসি পুজো করত, আমরা চারপাশে ঘুরঘুর করতাম। আমাদের সব জায়গায় ছিল অবাধ গতিবিধি। চানঘরে বড় চৌবাচ্চা ছিল। আমরা দু বোন পুকুরের মতো একসঙ্গে চৌবাচ্চায় নামতাম স্নান করতে। দুজন দুজনকে জল ছুঁড়তাম,  ভীষণ মজা হত।  আড়বেলেতেও মেজজেঠুদের চৌবাচ্চা ছিল। কিন্তু সেটায় একজন করে নামা যেত। পিসির বাড়িতে যখন থাকতাম, বাবা ওখান থেকে অফিস করতো। ফিরতে অনেক রাত হত। একবার মাথায় রোখ চাপল, পিসির বাগানে গাছ লাগাবো। বাবাকে বলে দিলাম, বাবা অফিস থেকে গাছ আনবে, আমি পুঁতব। রাত অবধি চোখ ভরা ঘুম তাড়িয়ে বসে ছিলাম বাবা কখন আসবে। বাবা ফিরলে দেখলাম গাছ আনেনি। ব‍্যাস, শুরু হল কান্না। হঠাৎ দেখি হারিকেন আর খুরপি হাতে পিসি আসছে, বাগান থেকে। হাতে দুটো গাছের চারা। নিজের বাগানের দুটো গাছ কুপিয়ে তুলে ফেলেছে, আমরা লাগাবো বলে। বাবার বিরক্তি, বকুনিকে দশ গোল দিয়ে, দুটো গাছ আমরা পুঁতে দিলাম। মানে আমরা ছুঁয়েছিলাম, পিসি পুঁতে দিল। আর গাছদুটোর নামকরণও হয়ে গেল – টুম্পার গাছ আর ঝুমুর গাছ। ছুটির দিন দুপুর বেলা সেই পুকুর ঘাটে বাবা ডলে ডলে সর্ষের তেল মাখাতো, মাথায় এক আঁজলা নারকেল তেল দিয়ে দিত, খেতে বসার সময়ে রগ দিয়ে তেল গড়াতো। বড় বাড়ি ধুয়ে মুছে রান্না বসাতে পিসির দেরি হয়ে যেত। মাংস সেদ্ধ হয়নি, এদিকে আমাদের খিদে পেয়ে গেছে। পিছনের টানা দালানে আসন পেতে বসে পড়তাম, পিসিমনাই বলে দিত, খুব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বল, আমাদের ভাত দাও, মাংস দাও। আমরাও যথাসাধ্য নির্দেশ পালন করতাম। তার পরেই ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালা আর অন‍্য থালায় অনেক বাটি সাজিয়ে পিসির প্রবেশ ঘটত। আর বড়দের যতগুলো বাটি, আমাদের দুবোনকেও তত গুলো বাটি সাজিয়ে দিত। পিসি কোনদিন কোলে নিয়ে সোনামনা বলে আদর করেনি। বাবা মাকে কড়া শাসনে রেখে, আমাদের সর্ববিধ প্রশ্রয় দেওয়াটাই ছিল পিসির আদর।

সে আদর শেষ হল, ক্লাস এইটে। আমরা স্কুল থেকে মায়ের সঙ্গে আর জি কর হাসপাতালে গিয়ে দেখি দাপুটে পিসি শুয়ে আছে নিশ্চুপ। এত কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছি, তবু একবারও ডাকেনা – টুম্পা ঝুম্পা এলি! নাকে নিশ্বাস পড়েনা। আর ও কিছুদিন থেকে গেলে কি এমন ক্ষতি ছিল। ছোটোবেলায় গল্প পড়েছিলাম, বুদ্ধ বলছেন এক মাকে, যে বাড়িতে মৃত্যু ঢোকেনি সেখান থেকে চাল নিয়ে এস, বাঁচিয়ে দেব, তোমার ছেলেকে। আমি ভাবতাম, আমাদের বাড়ি থেকে চাল নিলে বেঁচে যেত ছেলেটা। সেই ভাবনাটা কেউ ছিঁড়ে দিল কুচি কুচি করে। যেবার টুসি সিনেমা এসেছিল হলে সেবছর পিসি আমাকে আর বোনকে টুসি জামা কিনে দিয়েছিল, লেসের ফ্রিল দেওয়া। আমার হলুদ আর বোনের নীল। পুজোয় গান বাজছিল তোমার নীল দোপাটি চোখ আর শ্বেত দোপাটি হাসি। পিসি গম্ভীর ছিল, বড় একটা হাসতনা। আড়বালিয়ায় পুজো হলে, পিসি সব প্রসাদ ভাগ করত। দিদির ওপরে বাবা, বা জেঠুদের কোনো কথাই চলতনা। আমি একবার দাদাদের সঙ্গে ভিড়ে, শয়তানি করে ফাঁকা মিষ্টির বাক্স ঢিল পাটকেল পুরে, গার্ডার লাগিয়ে সুন্দর করে পিসিকে দিলাম – যেন মিষ্টিটা একপাশে পড়ে আছে, কেউ দেখেনি। পিসি নির্বিকার বাক্সটা নিল, আর আমাদের সামনেই ফেলে দিয়ে মুচকি হাসল। আমরা হাসি দেখব কী, তখন সব একছুটে পগার পার। আমার মা বলত, দিদির যা বুদ্ধি আর স্মরণশক্তি, লেখাপড়া করার সুযোগ পেলে জজ ব‍্যারিস্টার হত।

গরমের ছুটিতে আড়বেলেতে থাকতাম। আমরা বলতাম দেশে যাওয়া। সকালে বড়জেঠুর সঙ্গে দুধ আনতে যেতাম। বড়জেঠু বণিক পাড়ায় বাজার করত। আমরা বলতাম বেনেপাড়া। দুপুরে বড়জেঠু গোল ল‍্যাংড়া গাছে উঠত, লম্বা বাঁশের ডগায় তিনকোণা জাল। জায়গা মতো টান দিতে পারলেই জালের মধ্যে চার পাঁচটা আম চলে আসত। নিচে আমি ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, অনেক উঁচুতে আমের ডাল আর পাতার আড়ালে বড়জেঠু অদৃশ‍্য, খসখস আওয়াজ, পাতার ফাঁকে রোদ্দুর চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মনে একটু একটু ভয় হত, বড়জেঠু কই? তারপরই পাতার আড়াল থেকে ডাক পড়ত, মনা ধরবি। ওপর থেকে নামছে প্রতিবারে পাঁচ ছটা আম। ঝুড়িতে ক‍্যাচ লুফতে পারলে আম ফাটবেনা। মাটিতে পড়ে গেলে দৌড়ে দৌড়ে কুড়িয়ে নিতাম। নাতনি হবার আগে অবধি আমি ছিলাম, বড়জেঠুর মনা। যখন বড় হয়ে গেলাম, আর বড়দিদির কোলে আমাদের পরের প্রজন্মের প্রথম কন‍্যা এল, সেই স্বাতীই  হল পরিবারের নতুন নক্ষত্র, ঐ মিষ্টি তারাকে মনা নামটা ছেড়ে দিয়ে আবার হলাম টুম্পা। আমার বোনের ঝুম্পা নামটা অনেক দিন আগেই ঝুমু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার নাম বদলায়নি। শুধু বড়দাদা টুমু বলে ডাকত।
ভাইবোন প্রায় সবারই বিভিন্ন নাম ছিল। যেমন সেজ তরফে ছোড়দার নাম মৃণাল, কিন্তু সেজজেঠু ডাকত ঝুকু। বড়তরফে সেজদা, নদা ছিল সুজিত আর অভি। কিন্তু আমার বাবা ডাকত ভুটে আর ভোকো। আর সবচেয়ে ছোটো ভাই – তার প্রতি বাড়িতেই আলাদা নাম। বড় তরফে রিন্টু, মেজতরফে ভন্টা, নিজের বাড়িতে বাবু আর ছোটো তরফে বুকু।

চার বাড়ির রঙতামাশা
সবাই চেয়ে দ‍্যাখ।
বাড়ি যখন চারটে,
তবে নাম কি হবে এ্যাক? – কক্ষনো হবেনা।

সেজদা আর নদা আমাকে সুপুরি পাতায় বসিয়ে টেনে নিয়ে যেত। দাওয়ার সামনে ঝাঁকড়া খেজুর গাছ। সকালে তার তলাটা খেজুর বিছিয়ে গদি হয়ে যেত। পাতার গাড়ি থেকে কুড়িয়ে নিতাম একমুঠো, ছোট্ট হাতে যে কটা ধরে।  উঠোন থেকে বেরোনোর মুখে ভাঙা পাঁচিলে একটা দরজা ছিল, সেই জায়গাটা পাতা সমেত কোলে করে দাদারা পার করে দিত। বাজারেও নিয়ে যেত, কোলে করে, কারণ আমায় হাঁটিয়ে নিয়ে গেলে ওদের দেরি হয়ে যাবে। বিশুর মিষ্টির দোকানের সামনে এলেই বায়না করতাম। দাদারা পকেট থেকে নয়া পয়সা গুনে গেঁথে হিসেব কষে তিলকাঠি কিনে দিত। চুষতে চুষতে বাড়ি আসতাম, দাঁতে চিটচিটে তিল আটকে যেত। আর একটা খুব বায়নার জিনিস ছিল, কাঠির মাথায় গোল ফ্রেমে ঘোরা লাল অনচ্ছ কাগজ মোড়া কটকটি বাজনা।

বিকেল হলে ছোড়দিদি আর ছোড়দার সঙ্গে বাড়ির পিছনে জমিতে নামতাম। ছোড়দিদি আমাদের খেজুর পাতার ঘূর্ণি বানিয়ে দিত। কখনও ঢেসকুমড়ো হয়ে ছোড়দিদির পিঠে চড়তাম। তারপর একটা খেজুর ছড়ি হাতে, মরা গাছের গুঁড়িতে পা রেখে ছোড়দিদি শিবাজী হত। রোজ রোজ শিবাজীই বা হত কেন, সেটা অবিশ‍্যি আজও জিজ্ঞেস করা হয়নি। যাই হোক, আমরা হতাম শিবাজীর বিশ্বস্ত অনুচর। কোনো কোনোদিন দলবেঁধে সব ভাইবোন বড়পোলে যেতাম। জলকড়ের মধ্যে দিয়ে আলপথে সাবধানে লাইন করে জলের মাঝখানে চওড়া জায়গা দেখে পশ্চিম মুখে বসে সবাই গল্প করতাম। জলের মধ্যে সূর্য ডুবত। লাল কমলা আকাশের ছায়া পড়ে জলে, তার সঙ্গে মিশে যেত দিনের শেষ রোদ্দুরের সোনালি। কোনদিন আবার আইসক্রিম ওলা আসত মাথায় বাক্স নিয়ে। বরফের মধ্যে কাঠি হিসেবে গাছের নরম ডাল, বা ডাবের খোলার সরু অংশ লাগানো থাকত। ছোড়দিদি শিখিয়ে দিয়েছিল, আইসক্রিমের শেষটা খাবিনা। ঘষে ঘষে ঘামাচিতে লাগাবি। খুব আরাম।

সারাদিন হুটোপাটি করে সন্ধ‍্যেবেলায় ঘুম আসত। দাদারা পড়তে বসত। আমি আর বোন তো ছুটিতে গেছি, লেখাপড়ার বালাই ছিলনা। তবে মাঝে মাঝে সেজজেঠুর ঘরে, অঙ্কের শিবির বসতো। এক মাদুরে যে যার লেভেলে অঙ্ক কষতো। আমার তো খাতা নেই। ছোড়দা ওর খাতার মাঝখান থেকে পাতা ছিঁড়ে আমায় দিল। আর তাতে কী অঙ্ক করছি, নষ্ট করছি কিনা নজর রাখতে লাগল। আমিও যতটুকু জানি, যোগ বিয়োগ বানিয়ে নিয়ে করছি। ছোড়দা বলল, ও! শুধু যোগ বিয়োগ জানিস, আয় তোকে সরল শিখিয়ে দিচ্ছি। সরল আবার কি? যা শেখাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ব‍্যাপারটা বেশ জটিল। ইস্কুলে শেখায়নি, আমি তো কিছুতেই শিখবোনা। শেষে ছোড়দা নিরস্ত হল, কারণ রাত্তিরে খাবার ডাক পড়ে গেল। বড়জ‍্যাঠাইমার বাঁশে ঘেরা রান্নাঘর, মাটির মেঝে নিকোনো। মাটির মধ‍্যে গর্ত করে উনুন। সবাই আসন পেতে খেতে বসতাম, থালার পাশে মাটিতে নুন নিতাম। যেদিন বড়জ‍্যাঠাইমা আস্ত কাঁচালঙ্কা দিয়ে গরম গরম বড়ি সেদ্ধ করতো, সেদিন ভাতের স্বাদ ডবল হয়ে যেত। আমি এখনও বড়ি সেদ্ধ করি, লোক দিয়ে বড়ি করাতে হয়। তবে স্বাদে বড়জ‍্যাঠাইমার মতো হয়না। ছোটবেলায় শীতকালে আমাদের বাড়িতেই বড়ি হত। সে এক যজ্ঞ। পুরোনো বাড়ির টালির চালে চালকুমড়ো থাকত। সব বাড়ির কোটা হিসেব করে বিউলির ডাল আসত। ডাল বাটতে বড়ি দেওয়ার আগের রাতে লোক আসত। তাকে কেজি প্রতি টাকা দিতে হত। ডাল বাটার পর ছিল ফেটানোর পর্ব। তার সঙ্গে সাবধানে একটু একটু করে চালকুমড়ো কোরা মেশাতে হত। আর যতক্ষণ না মন্ড জলে ভাসবে, ততক্ষণ ফেটানো চলবে। খুব ভোরে মেজজেঠুদের ছাদে বাড়ির সব মেয়েরা বড়ি দিতে বসত। আমি যখন চোখ মুখ ধুয়ে ছাদে উঠি, তখন অর্ধেক কাজ শেষ। হাত ধুয়ে শখ করে বড়ি দিতে বসি। বড় বড় ধুতি টানা লম্বা করে পেতে, তার নানাদিকে মেয়েরা বড়ি দিচ্ছে। আমি খুঁজে পেতে সেজজ‍্যাঠাইমার পাশে একটু জায়গা করি। কিন্তু ঐ পিচ্ছিল মন্ড বাগে আনা কি অতই সোজা। যতই চেষ্টা করি, হাতে মাখামাখি হয়ে যায়, আর বড়ি শুয়ে পড়ে। কিছুতেই মাথা ওঠেনা। সেজজ‍্যাঠাইমা চোখ টিপে বলে, এ্যাই টুম্পা, তুই ওদিকটায় বড়ি দে। এদিকে তো ভরে এল। আমি অগত্যা ঠেলেঠুলে আবার ছোড়দিদির পাশে যাই। অবাক হয়ে দেখি বড়জ‍্যাঠাইমা তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুলের মাঝখান দিয়ে পুটুর পুটুর করে একবারে ছোট্ট ছোট্ট বড়ি দিয়ে যাচ্ছে, সব এক মাপে। ছোড়দিদি কিছুক্ষণ চেষ্টা চালায়, যাতে আমি একটু একটু মন্ড নিয়ে বাটির কানায় আকৃতি টা আনতে পারি, তবু ঠিক হয়না। শেষে হাল ছেড়ে বলে, তুই ওখানটায় বড়ি দে। আমার দেওয়া চ‍্যাপ্টা বোতাম বড়িগুলো যার কাজের পাশে থাকবে, তারই বদনাম। ঘুরে ঘুরে যে বড়ি দেখব, তার উপায় নেই, কারণ বড়িতে ছায়া পড়বে। বড়িতে ছায়া দিতে নেই। দুপুরের ঝনঝনে রোদ খাওয়ানোর পর, বড়ি সমেত ধুতি গুলো টাঙিয়ে দেওয়া হত, যাতে উল্টো দিকটাও শুকিয়ে যায়। বিকেলের রোদ ঢলে যাবার আগে ধুতি গুলো নামিয়ে এনে দাওয়ায় কাপড় শুকোনো দড়িতে টাঙিয়ে দেওয়া হত। শিশির লেগে গেলে বড়ি ঘেমে যাবে। রোদ খেয়ে ঝকঝকে সাদা বড়িগুলো যেন জুঁই ফুল। আমি আর বড়জেঠু পুট পুট বড়ি ছাড়িয়ে কৌটোয় পুরতাম। তখন আর কেউ বারণ করতোনা। ঐ কাজটায় শিশুর আঙ্গুল সুবিধেজনক।
সকলে টানা বারান্দায় আসন করে খেতে বসতাম। দাদারা খাওয়া হয়ে গেলে পরিবেশন করত। আমি ঘুরঘুর করতাম, কিন্তু কেউ ডাকতোনা। শেষে একদিন মেজজ‍্যাঠাইমা বলল, দাদা জল চাইছে, জল দে দেখি কেমন পারিস। মনের আনন্দে পেতলের সরু মুখ জলভরা জগ থেকে জল দিলাম মাটির গেলাসে। সে দেওয়ার এমনই বেগ, যে গেলাস থেকে জল ঠিকরে বড়দাদার কোলে পড়ে গেল। মা তো রৈ রৈ করে উঠেছে। আর আমি লজ্জায় মৃত। কিন্তু বড়দাদা বলল, টুমু ঠিকই দিয়েছে। জল প্রথমে গেলাসেই পড়েছিল, এভাবেই হবে। যাই হোক মায়ের শাসনে সে যাত্রা পরিবেশনের ইতি হল। এইভাবে ঠোক্কর খেয়ে খেয়ে ঘরের কাজ কিছু শিখলাম বটে, তবে প্রশ্রয়ের চোটে আজও দড় হতে পারলাম না।
একদিন হল কি, বিকেল বেলা শিবাজীর রাজসভার কাজ সেরে বিকেল গড়িয়ে আমরা বাড়ি ফিরছিলাম। ফেরার পথে লেবু গাছের তলায় কুড়িয়ে পেলাম বেশ বড় সাইজের রসে টাপুটুপু পাতিলেবু। আর আমার আনন্দ দেখে কে। কালবোশেখির ঝড় উঠলে দাদারা আম কুড়োতো। মা আটকে রাখত, আমায় যেতে দিতনা। ঝড়ের পরে গেলেও আমি একটাও পেতাম না। সব দাদারা কুড়িয়ে নিত, আর আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ঘরে ফিরতাম। শেষে নদা নিজের থেকে একটা আম নিয়ে বলল এটা তুই নে। কিন্তু ওভাবে নিলে প্রেস্টিজ থাকেনা। তাই আমি বললাম, তুই মাটিতে ফেল, আমি কুড়োবো। নদা তখন ধুপ করে আমটা মাটিতে ফেলল, আমিও কুড়িয়ে নিয়ে নাচতে নাচতে ঘরে গেলাম। হরির লুঠের বাতাসাও পেতাম না। পরে যোগাড় করতে হত। সবাই হাসত। সেজজেঠুর বাড়ির গৃহপ্রবেশেও আমি খুচরো পয়সা কুড়োতে পারলাম না। সেজজেঠু সেটা দেখে আমার জন্য আলাদা করে ঝুরঝুর করে পয়সা ফেলল, আর আমি ফ্রকের কুঁচি পেতে নয়া পয়সা গুলো ধরে নিলাম। সামনে যারা ছিল সবাই হো হো করে হাসতে লাগল। সেজজেঠু চোখ পাকিয়ে সবার হাসি থামালো। আমি খুব সাবধানে ফ্রকের মধ‍্যে পয়সা ধরে মাকে দিয়ে দিলাম। পয়সার দরকার ছিল না, কুড়োতে পেরেছি – সেটাই আনন্দ। এ হেন আমি সেদিন কারোর সাহায্য ছাড়াই লেবু কুড়িয়ে পেলাম। সে এক রাজ‍্যজয়ের সামিল। কিন্তু যেই মেজজেঠুদের খিড়কি দরজা এল, ছোড়দিদি একটানে আমার হাত থেকে লেবু ছাড়িয়ে, দে ছুট। একলাফে ঘরে ঢুকে গেল। আর সেই অপ্রত্যাশিত আঘাতে খিড়কি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি ফোঁপাতে লাগলাম। মেজজ‍্যাঠাইমা তখন বাঁশে ঘেরা রান্নাঘরে রান্না চাপিয়েছে। বাঁশের ফাঁকে ফাঁকে বেশ দেখা যায়। কতক্ষণ সময় গেল। মনের কালি বাইরে ছড়িয়ে ঝুপসি গাছগুলোতে আঁধার করে এল। এমন সময়ে হাতে অ্যাটাচি নিয়ে ধোপদুরস্ত মেজজেঠু অফিস থেকে ফিরল। আমাকে দেখেই টপ করে কোলে নিয়ে বলল
– কাঁদছ কেন?
এতক্ষণে সহানুভূতির ছোঁয়া পেয়ে আমার কান্নার উচ্ছ্বাস প্রবল হয়ে উঠল। কোনোক্রমে বললাম
– ছোড়দিদি আমার লেবু নিয়ে নিয়েছে।
– লেবু নিয়ে নিয়েছে? ভারি অন‍্যায়। আজই ছোড়দিকে কেটে ফেলব। ক – ই – গো, দা টা দেখি।
রান্নাঘর থেকে আওয়াজ আসে
– কেন? রাতবিরেতে দা নিয়ে কি হবে?
– এই যে, মমকে কাটব। ম-ম!
ফ্রক পরা মম এসে দাঁড়ায় মাটির দাওয়ায়। আর লেবুটা ছুঁড়ে দিয়েই পালিয়ে যায়। লেবু আবার আমার হয়। মেজজেঠু বলে – ছোড়দিতো লেবু দিয়ে দিয়েছে, এবারে আর ওকে কাটার দরকার নেই। আমিও লেবু যুদ্ধে জিতে ঘরে ফিরে যাই।

মায়েরা ডাকে


মায়েরা ডাকে (পর্ব ১)

করোনা লকডাউনে মা বাবা দুজনকেই হারালাম। কোনো কাজে শ‍্যামবাজারে এলে মনটা ভারি হু হু করে। এখান থেকে একটা যাবার জায়গা ছিল, আর নেই। একা বসে থাকলেই স্মৃতি গুলো ভিড় করে আসে।
ইস্কুলে ছুটি হতো বিকেল সাড়ে চারটে। মায়ের সঙ্গে নিবেদিতা লেন থেকে শ‍্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় অবধি হেঁটে যেতাম। সেখান থেকে বাস। গিরিশ এভিনিউ আড়াআড়ি পেরিয়ে শ‍্যামপার্কের গলি, একটু এগিয়ে নববৃন্দাবন। তার পর ডানদিকে শ‍্যামপার্ক, বাঁদিকে সেনবাড়ি ছাড়িয়ে মণীন্দ্র কলেজের পাশ দিয়ে ভূপেন বোস এভিনিউয়ে পড়ে মোড় অবধি হাঁটা লাগাতাম। নববৃন্দাবনের পথে ঝুলনের আগে মাটির পুতুলের পশরা বসতো। আর দেখলেই আমি খুব বায়না করতাম। আইসক্রিম ওলা, নাড়ুগোপাল, পুলিশ, ঘড়া কাঁখে ঘোমটা মাথায় মেয়ে, গোরু, হাতি, বর বৌ। এক একদিন বায়নায় পাগল হয়ে মা পুতুল কিনে দিত। দুহাতে দুটো পুতুল নিয়ে রানীর মতো বাড়ির পথ ধরতাম। কিন্তু যেদিনই শিকে ছিঁড়ত, সেদিনই কেমন করে জানি বৃষ্টি এসে যেত। প্রাণপণ নিজে ভিজে পুতুল বাঁচাতাম। কোনোদিন হয়তো শ‍্যামবাজারের কোনো সহৃদয় দোকানি একটা প্লাস্টিকের প‍্যাকেট দিয়ে পুতুল মুড়ে দিতেন। যখন সেগুলো বাড়ি আসত, কোনোটার অভ্র ঝরে গেছে, অথবা কাঁচা মাটির ওপর রঙ চটে গেছে। তবু আনন্দের ঘাটতি ছিলনা। হোকনা ছাল ওঠা, নাক ভাঙা, আমার ভান্ডার কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। সেগুলো সাজিয়ে ঝুলন করতাম। সেদিন এমনই এক বর্ষার বিকেল, মার সঙ্গে আমি সেনবাড়ির সামনে দিয়ে চলেছি, বৃষ্টিটা খুব জোর এল। মা বলল, এখন হাঁটা যাবেনা। চল মামার বাড়ি ঢুকে যাই। সেনবাড়ির ঘরে ঘরে আমার অনেক মামা – মামী থাকতেন। তার মধ্যে বাচি মামা, নারান মামা – এঁদের বেশি চিনতাম। নারান মামা বাসে উঠতে পছন্দ করতেন না। বাগবাজার থেকে হেঁটে হেঁটে পাতিপুকুরে আমাদের বাড়ি যেতেন। মাকে ডেকে বলতেন, রাজকুমারী একটু ভালো করে ডাল করো তো। ও বাড়িতে কত লোক। চৌবাচ্ছায় ডাল ঢালা হয়। ফোড়নের গন্ধ পাইনা। সেনবাড়ির যৌথ পরিবারের সদস্য অনেক। তাছাড়াও অতিথি অভ‍্যাগতের ঢল লেগে থাকত। রান্নার ঠাকুরেরা শেষের দিকে উপায়ান্তর না দেখে ডালে ভাতের ফ‍্যান মেশাতো। আর সেটাই নারান মামার রাগ। নারান মামা সেনবাড়ির হেঁশেলের গল্প করতেন। আমরা অবাক হয়ে শুনতাম। মা বলতো নারান মামা বিদ্বান মানুষ। কিন্তু এমন থাকেন। নমে মামাকে যখন দেখেছি, তখন তাঁর অনেক বয়স। খাটে শোয়াই দেখেছি বেশি। আর বাকিদের বেশি চিনতাম না। সেদিন গিয়ে বসলাম হুঁকুজ মামার ঘরে। মামা মামী ঘরে নেই, কোথাও বেরিয়েছেন। অন‍্যরা বললেন এখনই এসে পড়বেন। লম্বাটে পুরোনো নকশার জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম আনমনে। এমন সময়ে কাক ভেজা, হেলমেট পরা লম্বা চওড়া হুঁকুজ মামা ঢুকলেন ঘরে। আমি খাটে পা ঝুলিয়ে বসা। চোখাচোখি হয়ে গেল। হেলমেট খোলা থমকে গেল। আমার দিকে কয়েক মূহূর্ত তাকিয়ে বললেন, মাইমা! পাশ থেকে মায়ের হাসির শব্দ শুনলাম। এ মাইমার নাতনি গো হুঁকুজদা, আমার মেয়ে। মায়ের গলা শুনে সম্বিৎ ফিরে হুঁকুজ মামা বললেন, রাজকুমারী, তুমি! এ তোমার মেয়ে? তারপর কিছুক্ষণ পরে স্বাভাবিক হয়ে বললেন, হঠাৎ দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। এতদিন পরে লাবণ্য মাইমা কোথা থেকে এল? সেদিনই জানতে পারলাম, আমি আমার দিদিমা লাবণ‍্যপ্রভার দ্বিতীয় সংস্করণ। মুখ, চুল, গায়ের রং সবই এক। আমার নিজের তো স্মৃতি নেই। যাঁরা দুজনকেই দেখেছিলেন, তাঁরা বলতেন। তখন থেকেই লাবণ‍্যর কথা জানতে ইচ্ছে করতো।

এ কি লাবণ‍্য পূর্ণ প্রাণে

আমার বইয়ের নেশা ছিল। এখনো আছে। মনীন্দ্র কলেজের পাশ দিয়ে বড় রাস্তায় পড়ে শ‍্যামবাজারের দিকে বা বাগবাজারে বইয়ের দোকান ছিল। এখনো আছে কিনা জানিনা। ঐ দোকানের সামনে গেলে আবার বায়না শুরু হত। কখনো মা কিনেও দিত। চটি চটি বই, রঙিন মলাট, উপনিষদের গল্প, অন্নদা মঙ্গল, বাইবেলের গল্প। মনীষীদের জীবনী। বাবাও অনেক বই আনত। আমার জন্য শুকতারা নেওয়া হত। বাবার পায়ে ব‍্যথা হলে, বাবা শুয়ে থাকত। আমি একহাতে খাটের ছত্রি আর এক হাতে শুকতারার খোলা পাতা পড়তে পড়তে বাবার পায়ে হাঁটতাম। বাড়িতে আলমারি ভর্তি বই। আলমারির দখল নিয়েছি আমি, সেই আমার সাম্রাজ্য। বহু খন্ডের কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত, শরৎ রচনাবলী, বঙ্কিম রচনাবলী, শতরূপে সারদা, শিশুসাথী, বাঁকুড়া জেলার পুরাকীর্তি, ব্রতকথা, দীনবন্ধু সমগ্র – আরও কত। সব বই নামাতাম। ইচ্ছে মতো পড়তাম। আবার নতুন করে গোছাতাম। এমন করতে করতে হঠাৎ অনেক সরু মোটা বই পেয়ে গেলাম, বইয়ের ভিতরে আমার ইস্কুলের লেবেল দেওয়া, কিন্তু সেখানে মায়ের নাম লেখা আর লেখা শ্রেণীতে প্রথম পুরস্কার। কোনোটা চতুর্থ শ্রেণী, কোনোটা, ষষ্ঠ, সপ্তম, নবম, আবার কোনোটা সংস্কৃতে সর্বোচ্চ নম্বর, কোনোটা ইংরেজিতে, বিভিন্ন শ্রেণীতে। অবাক হয়ে মাকে ডাকি,

– মা – আ! মা হলুদ হাত আঁচলে মুছে এসে দাঁড়ালে মাকে জড়িয়ে ধরে বলি, মা তুমি ইস্কুলে ফার্স্ট হতে? তোমার এত্তো প্রাইজ? মা হাসে। সব নাড়াচাড়া করি। শ্রেণী ধরে বইগুলো সাজাই।
– নবম শ্রেণীর পরে আর কৈ মা?
– আর নেই।
– কেন?
– সে অনেক কথা পরে বলব।
– এখনই বলো না।
– সময় নেই।
ঐ বই নাড়াচাড়া করতে করতে একদিন পেলাম ছবি দেওয়া, সাদা কালো উলবোনার বই। মলাটে কালো কালিতে সুন্দর টানা হাতে লেখা আছে লাবণ‍্যরানী বসু। মাকে দেখাই।
– ও মা, দেখো।
– একিরে! এটা কোথায় পেলি?
এটাতো আমার মার উলবোনার বই।
– কিন্তু তুমি যে বলেছিলে, দিদার নাম লাবণ‍্যপ্রভা। এখানে তো লাবণ‍্যরানী লেখা আছে।
– আগের দিনে শ্বশুর বাড়িতে নাম বদলে দেওয়া হত।
– উল কি করে বোনে মা? আমায় শেখাবে না?
– আমি অত পারিনা। সোজা উল্টো শিখিয়ে দেবোখন।
– মলাটে এটা দিদার নিজের হাতের লেখা?
– হ‍্যাঁ।

পরদিনই অফিস যাবার সময়ে বাবাকে অর্ডার দিয়ে দিলাম – বাবা! অফিস থেকে উলের কাঁটা আর উল নিয়ে আসবে। আমার ধারণা ছিল, বাবার অফিসে সব পাওয়া যায়। আর বাবা যা আনে, সব অফিস থেকেই আনে। আর ছোটো মামা বলে দিয়েছিল, ভুলেও বাড়িতে দুষ্টুমি করার কথা চিন্তা করিসনা। তোর বাবা অফিস থেকে সব দেখতে পায়। খুবই ছোটো ছোটো দেখে। তবে দেখতে পায় নিশ্চিত। লুকিয়ে আমূল স্প্রে খেতে গিয়ে, চারদিক পরীক্ষা করতাম, বাবা কোথা দিয়ে দেখছে? বাবা কিছু বলতনা। কিন্তু মা বুঝে যেত। বাবাই বলে দিত নিশ্চয়ই। কি যে মুশকিল ছিল, কহতব‍্য নয়। যাই হোক, উল কাঁটা চলে এল। আর লাবণ‍্যর বই থেকে আমি নানা প‍্যাটার্ন রপ্ত করতে শুরু করলাম। চুপি চুপি বলি, পরে আমার কন‍্যাকেও বলেছিলাম, দুষ্টুমি কোরোনা, লক্ষ্মী হয়ে থাকবে। আমি কিন্তু কলেজ থেকে সব দেখতে পাই। সে কোঁকড়া চুল নাড়িয়ে, বড় বড় চোখ করে, আমার দিকে দেখেছিল, তবে বিশ্বাস করেনি। দুষ্টুমিও থামায়নি। কি আর করি, এ তো আর আমার দোষ নয়, যুগের দোষ।

একদিন বড়মামা এসে বলে, মাম আসছে রবিবার চলো সব আমার বাড়ি।
– কেন গো, ব‍্যাপার কি?
– হারমোনিয়াম কিনেছি। তোর মাইমার অনেক দিনের শখ।
বড়মামার কাছে ছুটে আসতে গিয়ে
অসাবধানে হাত থেকে সঞ্চয়িতা পড়ে যায় আমার। বড়মামা হাঁ হাঁ করে ওঠে।
– আঃ মাম। সাবধানে চল। বইটা নমো কর। রবিঠাকুরের বই বলে কথা। মাটিতে ফেলতে নেই। তোমার দিদা রবি ঠাকুরের বই বুকে নিয়ে ঘুমোতে যেত।
মনে ভাবি, তাই বুঝি! ছোটোমামার বাড়ি আমাদের হাউজিংয়েই, ওপাশের ব্লকে। একবার বাবার হাত ধরে ঠাকুমার ঝুলি নিয়ে ওবাড়ি যাচ্ছিলাম। ব্লকের মুখে এসে যেই বাবা হাত ছেড়ে এগিয়ে গেছে, অমনি আমিও ওখানেই দাঁড়িয়ে বই খুলেছি। ব্লকের দরজায় নেড়িকুকুর বসে ছিল, দেখিনি। হোঁচট খেয়ে কুকুরের কোলে বইটা পড়ে গিয়েছিল। সাবধানে তুলে নিয়েছি। কুকুরটা কিছু বলেনি, আর বাবাও বকেনি। তাহলে রবিঠাকুরের বই হাতে থাকলে বেশি সাবধান হতে হয়! তাছাড়া দিদা সম্পর্কে ঝুলিতে নতুন তথ্য জমা হল। লাবণ্য রবি ঠাকুরের লেখা ভালো বাসত।

মায়েরা ডাকে (পর্ব দুই)

দিনগুলি কুড়োতে
কত কি তো হারালো।

সেই রবিবার বি টি রোড ধরে, ডানলপ ফেলে, সুখচর গীর্জার পাশ দিয়ে গেলাম বড়মামার বাড়ি। মা হারমোনিয়ামটা দেখে উচ্ছল হয়ে ওঠে। নিজের মনে নানা স্কেলে হরেক রকম সারেগামা বাজাতে থাকে। দেখে অবাক হয়ে যাই। মা শিখল কোথায়? আমাদের বাড়িতে তো হারমোনিয়াম নেই।

– মা, তুমি গান জানো, আমাকে তো কোনদিন বলোনি।
– গান জানিনা তো।
– তাহলে বাজাচ্ছো কি করে?
– আমার মায়ের কাছে শিখেছি। শুরু করেছিলাম। তারপর আর হলনা।
– হলনা কেন?
– হারমোনিয়াম টা হারিয়ে গেল।
– কিকরে?
– সে অনেক কথা, পরে বলব।

ছোটো করে একটা ধাক্কা লাগল মনে। লাবণ‍্যর হারমোনিয়াম হারিয়ে গিয়েছিল? কি এমন কথা আছে, মা বুকে চেপে আছে?

লাবণ‍্যর হারমোনিয়াম

কখনো অবসর পেলে, মা আমাকে খালিগলায় গান শেখাতো, যে গানগুলো লাবণ‍্যর কাছে শিখেছিল, যেগুলো দিদার প্রিয় গান। দু একটা বলি, তুমি কেমন করে গান করো যে গুণী, কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো। এছাড়া মেঘের কোলে, আজ ধানের ক্ষেতে, কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা – এগুলো তো ছিলই।

গরমের ছুটির দুপুরে ন‍্যাশনাল চ‍্যানেলে ছোটদের অনুষ্ঠান শুরু হল। আর সকাল এগারোটায় কলকাতা দূরদর্শনের ছুটি ছুটি। যেদিন জিনিস বানানো শেখানো হত, খবরের কাগজ নিয়ে বসে যেতাম। কাগজ মুড়ে ওরিগ‍্যামি, শ‍্যাম্পুর শিশি দিয়ে পুতুল, এরকম কতো। ইস্কুলেও ওয়ার্ক এডুকেশনের প্রদর্শনীর সময়ে পুতুল বানানোর যজ্ঞ বসে যেত। সেই থেকে জিনিস বানানোর নেশা চেপে বসল। মা দেখে আর হাসে, বলে

– জানিস, আমার মায়ের ও এমন নেশা ছিল। মাছের আঁশগুলো কত কান্ড করে হাঁস বানাতো, আরও কত কিছু। সব মনে নেই। তখন তো আর পাত্তা দিতাম না। এখন ভাবি, মায়ের হাতের কয়েকটা জিনিস ও যদি রাখতে পারতাম। কিন্তু কি সব হয়ে গেল, সব হারিয়ে গেল।

– হারমোনিয়ামটা তো হারিয়ে গেছিল। জিনিসগুলো হারালো কেন? আমি বেশ দেখতাম।

– এই যে তুই বানাচ্ছিস, আমি দেখছি। তুই তো আমার মা।

– ধুর, মায়েরটা দেখবে, মেয়েরটা দেখবে, সব দেখা শুধু তোমার ভাগে। আমি দেখবোটা কি?

– কত বয়স হল রে তোর, সব দেখবি? অপেক্ষা কর। জীবন কত কিছু দেখাবে তোকে, আমি দেখতে পাবোনা।

– আমি দেখবো, আর তুমি দেখতে পাবেনা, সেটা হয়?

– আমি কি চিরদিন থাকব পাগলি? আমার মা কি এখন আছে?

– তুমি থাকবে। আমি ধরে রাখব।

– জানিস, আমি এসব হাতের কাজ এতো পারিনা। ভাল্লাগেনা। মা বলতো, কিছু সৃজন করা ভালো রে খুকু। যার হাত সৃজন করেনা, সে বাঁধা গতে চলা, বোকা হাতের মানুষ। আমি পারিনি। কিন্তু তুই যখন পারছিস, লেখাপড়া বাঁচিয়ে যা প্রাণে চায় কর।

– আচ্ছা মা, মাসিমণি যে এত সুন্দর রথ সাজিয়ে দেয়, ঝুলন করে, এটাও কি সৃজন?

– অবশ্যই।

– আর ছোটোমামা যে যাত্রা করে। সেটাও সৃজন?

– হ‍্যাঁ, নিশ্চয়ই চরিত্র কে ফুটিয়ে তোলাও সৃজন। তোর দাদুও অভিনয় করত সিনেমায়, থিয়েটারে।

– তাই নাকি?

– হ‍্যাঁ, আমার আর ছোড়দার দুজনেরই গলায় সুর ছিল, মায়ের কাছে শিখতাম। আর হলনা। ছোড়দা এখন মঞ্চে ওর ঐ না পাওয়া গুলো পুষিয়ে নেয়।

বাড়িতে সোভিয়েত নারী পত্রিকা আসত, মোম মোম পাতা, পাতায় পাতায় উজ্জ্বল রঙিন ছবি। সেখানে এক ধারাবাহিক পড়তে পড়তে মাকে বলে দিলাম, আজ থেকে তুমি ইভদোকিয়া আর আমি নাতালিয়া। মা মেনে নিল। ইস্কুলের লাইব্রেরিতে পেলাম ম‍্যাক্সিম গোর্কির “মা”, সহজ বাংলা অনুবাদ। তারপরই নতুন ঘোষণা করে দিলাম,

– মা! এবার থেকে মা নয়, তোমাকে নেনকো বলে ডাকব।

– আবার বই পড়ে ডাক বদলাচ্ছিস?

– ডা, মানে হ‍্যাঁ।

বাড়িতে বাংলা ইংরেজি মিলিয়ে অনেক গুলো ডিক্শনারী ছিল। সেখান থেকে এ টি দেবের ইংরেজি থেকে বাংলা ডিকশনারির শেষে দেখলাম গ্রিক আর রুশ বর্ণমালা রয়েছে। ব‍্যাস আর আমায় পায় কে? দিনরাত নতুন বর্ণমালা মকশো চলল রাফ খাতায়। প্রগতি প্রকাশনের রুশ গল্পের বাংলা অনুবাদ যত আছে, সব নিয়ে খাটে ছড়িয়ে বসলাম। মলাটের পরের পাতায় বাংলার নিচে ছোট ছোট করে রুশ ভাষাতেও লেখা থাকত। উভচর মানুষ বইটার লেখক আলেকজান্ডার বেলায়েভ। রুশ বর্ণমালা মিলিয়ে দেখলাম, লেখা আছে, এ বেলায়েভ। বাংলায় মস্কোর নিচে যা লেখা আছে, তা বাংলা মতে উচ্চারণ করলে দাঁড়ায় মস্কভা – মানে মস্কো। হায় কপাল! ইস্কুলের ভূগোল বইতে লেখা আছে, মস্কো শহর মস্কোভা নদীর ধারে। ভুল, এ যা দেখছি, তাতে মস্কো শহর মস্কো নদীর ধারে। দৌড়োলাম, মাকে এই নতুন আবিষ্কার জানানোর জন্য। মা শুনে বেশ অবাক হল।

– বাবা! পড়ে ফেললি তুই।

– তুই যেমন রুশ ভাষা শেখার চেষ্টা চালাচ্ছিস, আমার মাও এভাবে ইংরেজি শেখার চেষ্টা করত।

– তাই নাকি, বলো বলো গল্পটা।

– এই হল রে! আমার এখন অনেক খাতা দেখা বাকি পড়ে রয়েছে।

– না মা, এরকম আধখানা কথা বললে হয়না। সবসময় পরে পরে করলে, আমার তো জানা হচ্ছেনা। বলো শিগগির। প্রথমে বলো, দিদা কেন ইংরেজি শিখতে চাইতো। কারণটা কি?

– তুই কেন রাশিয়ান শেখার চেষ্টা চালাচ্ছিস?

– সিম্পল। কিছু শিখলে ভালো লাগে।

– আমার মায়ের ও তাই। সবসময়ে প্রয়োজন থাকবে সেটা কেন?

– আচ্ছা, মানলাম। বাকিটা বলো।

– ছোটবেলায় বড়দা, ছোড়দা ইস্কুলে যেত। আমাকে কেউ ভর্তি করতনা। একদিন সেনবাড়িতে খেলছিলাম। দাঁতিদার বৌ ফুল বৌদি বললেন, সবসময় খেলা! বাবাকে বলে দেব, এবারে ইস্কুলে ভর্তি করে দেবে। সেই ধমক খেয়ে বাবা আমায় নিবেদিতায় ভর্তি করে দিল। কিন্তু ছোট ছিলাম, কেউ কিছু বলতোও না। বছরের শেষে অঙ্ক পরীক্ষায় দেখলাম, প্রশ্নে কত কিছু লেখা। কে করে ওসব! যা খুশি অঙ্ক বসিয়ে দিলাম। যোগ বিয়োগ কিছুই করলাম না। ব‍্যাস ক্লাস ওয়ানে ফেল ক‍রে গেলাম। বাবা গেল বলতে, যাতে ক্লাসে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু ইন্দিরাদি খাতা দেখিয়ে বললেন, দেখুন লিখতে দিয়েছি ডুমুর, লিখেছে গুমুর। একটাও অঙ্ক করেনি। বড় গীতাদি মানে তোদের ত‍্যাগপ্রাণাজী বললেন, থাক একবছর। ওর ভালোই হবে। তখন উনি ব্রহ্মচারিণী ছিলেন, সন্ন‍্যাসিনী হননি।

আমি হা হা করে হাসি।
– মা, তোমার এত প্রাইজ। ক্লাস ওয়ানে ফেল? ওটা ফেল করার মতো কোন ক্লাস হল?

– তার পর সংসারে কাজের ফাঁকে ফাঁকে, মা আমার পড়া দেখাশোনা করা শুরু করল। আমিও টকটক করে ক্লাসে উঠতে লাগলাম। কিন্তু যখনই মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যেত, দেখতাম, ছোটো একটা আলো জ্বালিয়ে মা আমার ইস্কুলের ইংরেজি বই পড়ছে আর ট্রান্সলেশন করছে। যখন আটকে যেত, তখন খুকু খুকু করে ডেকে আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিত। কোনো শব্দের মানে জিজ্ঞেস করতো।

– তুমি কি করতে?

– ঘুমের ঘোরে কিছু একটা বলে দিতাম।

– কিন্তু তুমি তো তখন ছোটো মা। সবকিছু ঠিকঠাক বলতে পারতে?

– না, সব তো পারতাম না। তাই মা সেগুলো নিজের মতো করে লিখতো, তারপর সংশোধনের জন্য ইনল‍্যান্ড লেটারে ছোট্ট ছোট্ট হাতের লেখায় সব ধরিয়ে রাঁচিতে আমার বড়মামার কাছে পাঠিয়ে দিত। বড়মামা আবার ইংরেজি শুধরে, ব‍্যাখ‍্যা লিখে পাঠিয়ে দিত।

– কি বলছো মা! রাঁচি থেকে চিঠি যাওয়া আসা – সে তো অনেক সময়ের ব‍্যাপার। বাড়িতে কেউ ছিলনা, যে একটু বলে দিতে পারে?

– কেউ জানতো নাকি? বাড়ির বৌ, কেউ যদি ছোটো বড় কথা বলে দেয়। মানে লাগবে। খুব অভিমানী ছিল তো।

মায়ের কথা শুনে অবাক হয়ে যাই। মা যা বলছে, তার অর্থ হল বেশি লেখাপড়া শেখা হয়নি বলে আক্ষেপ ছিল লাবণ‍্যর। বাড়ির লোক, স্বামীকে গোপন করে, বড় মেয়ে, আর প্রবাসী ভাইয়ের সাহায্যে লেখাপড়া শেখার প্রাণান্তকর চেষ্টাটা বুঝলাম। কিন্তু স্বামীকে গোপন করা কেন? দাদু জানতে পারলে কি পড়া বন্ধ হয়ে যেত? মায়ের কাছে প্রশ্নটা উথ্থাপন করলাম। মা ধীরে ধীরে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগল।

– আমাদের বইয়ের আলমারিতে দুটো খুব পুরোনো বই দেখেছিস, নীল আর সবুজ মলাট, ওপরে সোনার জলে নাম লেখা?

– দেখেছি, পূজার ফুল, কবিতার বই, আর বোঝবার ভুল, উপন্যাস। লেখিকা কুমুদিনী বসু।

– হ‍্যাঁ, আমার ঠাকুমার লেখা। আরও অনেক বই ছিল। গ্রহের ফেরে সব উইয়ে কেটেছে। রক্ষা করতে পারিনি। ঠাকুমা ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। খুব ব‍্যস্ত থাকতেন, সংসার দেখতে পারতেন না। তিনি ঐ যুগের গ্র‍্যাজুয়েট ছিলেন। আমার বাবা খুব কান পাতলা লোক ছিল। মা ঘর দুয়ার দেখতে পারেনা, সব ঠাকুর চাকরের ওপর নির্ভর। তাই আমার বাবার তার মায়ের ওপরে রাগ ছিল। আত্মীয় স্বজন হয়তো কিছু বুঝিয়ে ছিল। মায়ের ওপর রাগ করে বাবা ম‍্যাট্রিক পরীক্ষাটাও দেয়নি। পরে বড় হয়ে বাবা বিলিতি স‍্যাক্সবি কোম্পানিতে চাকরি পায়। অনেক টাকা রোজগার করত। আর পুরোটাই ওড়াত। ঠকেও যেত। বেলা করে বাজারে গিয়ে, শুকনো শাক, বরফের মাছ কাঁড়ি দাম দিয়ে, টাটকা বলে কিনে আনত। মা আবার লুকিয়ে, পরিচারক কাউকে বাজারে পাঠাত। এবেলার লুচি ওবেলা কেউ খাবেনা বলে ফেলে দেওয়া হত। সন্ধ‍্যে হলেই বাড়িতে তাস খেলার আসর বসত। কেটলি কেটলি চা আর থালা থালা জলখাবার উড়ে যেত। বাবা ব্রিজ খেলত। নিউ মার্কেটের নামী দোকান থেকে দর্জি আসত জামাকাপড় আর সুটের মাপ নিতে। জুতোও অর্ডারি বানানো হত। তার ওপর অভিনয়ের নেশা। থিয়েটারের মহলা চলত। বাবা একবার মঞ্চে রামকৃষ্ণ চরিত্রও করেছিল, আর কয়েকটা সিনেমাতেও অভিনয় করেছে।

– খরুচে দাদু রামকৃষ্ণ? হবে বা, টাকা মাটি, মাটি টাকা! তা সিনেমাগুলো কি?

– বড় চরিত্র পশুপতি চ‍্যাটার্জির ষোড়শীতে। ছবি বিশ্বাস ছিলেন। ১৯৫৪ তে মুক্তি পেয়েছিল। অন্য গুলো ছোটখাটো রোল, অত মনে নেই। যাই হোক। বাবা মানুষ হিসেবে খুব যে খারাপ ছিল, তা নয়। কোনো ম – কারের নেশা ছিলনা। হাসলে বাড়ি কাঁপিয়ে হা হা করে হাসত। কিন্তু, ভীষণ বদরাগী। চন্ডাল রাগ। একবার আমার এক দাদাকে দোতলার বারান্দা দিয়ে ফেলে দিতে গিয়েছিল। অন্য লোকে কোনোক্রমে বাঁচায়। মা অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল। ঐ দাদার হার্টে ফুটো ছিল। তখন তো তেমন চিকিৎসা ছিলনা, যত্নে রাখতে হত। কিন্তু রাগলে বাবার জ্ঞান থাকতোনা। পরে ঐ দাদা মারা যায়। যদি কোনো বিষয়ে বাবা জেদ ধরে বসত, তবে কোনো উপায়েই তাকে ফেরানো যেতনা। কারোর কথা শুনতোনা। যদি একবার পড়তে বারণ করে দেয়, আর পড়া হবেনা। তাই মা ভয় পেত। লুকিয়ে পড়াশোনা করত।

– নিকুচি করেছে দাদুভাইয়ের রাগের। দিদা রাগ করতোনা?

– মা ছিল খুব ঠান্ডা ধৈর্যশীল মানুষ। সবদিক সামাল দেবার চেষ্টা ক‍রতো। এক দুবার মাকে রেগে যেতে দেখেছি।

– বাপরে বাপ! কিন্তু এযে ভয়ে ভয়ে বাঁচা। ভারি জ্বালা ছিল তো লাবণ‍্যর!

– এই ! দিদার নাম ধরছিস।

– তাতে কি? আমিই তো লাবণ্য, আবার ফিরে এসেছি, তোমার কাছে।

– জানিস, আমার বাবার এই উড়নচন্ডীপনা আর বিলিতি জিনিসের ওপর আসক্তির জন্য ঠাকুমা শেষ বয়সে ছেলের মুখ দেখতেন না। ছুঁতে দিতেন না, প্রণাম নিতেন না। ঠাকুমার আয়া, চিকিৎসা, সব কিছুর খরচ দিতেন, আমার বড় পিসেমশাই শ্রীশ চন্দ্র সেন বা ভুতি বাবু।

– মা, তুমি তোমার ঠাকুমাকে দেখেছ?

– না রে মা। ছোড়দা জন্মানোর আগে বা পরে তিনি মারা যান। আমি দেখিনি। মায়ের কাছে সব শুনেছি।

– মা, তোমার ঠাকুমার খুব তেজ ছিল, তাই না?

– হ‍্যাঁ। মায়ের ও ছিল। কিন্তু অন‍্যরকম। একটা শান্ত গাম্ভীর্য। মাও তো কম বড়বাড়ির মেয়ে ছিলনা। আর জি করের ছোটো ভায়ের নাতনি, বালির ঘোষবংশের মেয়ে। খুব মানী ছিল।

– এত বড়ো বংশের মেয়ে সব। বড় ঘরের বৌ! গয়না ছিলনা মা? বন্ধুরা সব গল্প করে, ঠাকুমার বালা, দিদার বিছে হার। তোমার তো কিছু নেই। তোমাকে দেয়নি।

– সব গেছে, দেবে কিকরে?

– প্রথমে বললে হারমোনিয়াম গেছে, তারপর বললে, দিদার হাতের কাজগুলো গেছে। এখন বলছ গয়না গাঁটি গেছে। কিকরে গেল সেটা তো বলো।

– আজ কথায় কথায় অনেক বেলা হয়ে গেল মা, আবার একদিন হবে। মেলা কাজ পড়ে আছে।

তখন যে কোনো উপলক্ষে আত্মীয় স্বজন মিলে সিনেমা দেখতে যাবার চল ছিল। আমরা একবার দেখতে গিয়েছিলাম তপন সিংহের হারমোনিয়াম। একটা হারমোনিয়াম হাত ফেরতা হয়ে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে, আর গল্প ও বদলে যাচ্ছে। ছবি দেখে মা আর ছোটোমামা, দুজনের চোখে জল। হল থেকে বেরিয়ে মামাকে ধরি,

– মামা, কাঁদছিলে কেন গো? কত হাসির সিন ছিল।

– ও কিছু না। আমাদেরও হারমোনিয়াম ছিল। হারিয়ে গেল। আবার যদি পেতাম।

– যা গেছে, তা গেছে। আবার কিনতে পারতে।

– বাবা আর কিনলোনা। খামখেয়াল। মা গুমরে মরতো। আমার গান শেখা হলনা। তোর মায়ের ও হলনা। খুব দামী বিলিতি কোম্পানির অর্গ‍্যান রিডের হারমোনিয়াম।

– ঐ হারমোনিয়ামটা কে কিনেছিল?

– বিয়ের পরে, মায়ের গানের শখ দেখে বাবা কিনেছিল, মানে ঠাকুমা তখন বেঁচে ছিল তো। খুব তেজীয়ান মহিলা। মায়ের জন্য হারমোনিয়াম কিনিয়েছিল ছেলেকে দিয়ে।

(মস্তিষ্কের অদৃশ্য ডায়েরিতে নোট করি নতুন তথ্য। কুমুদিনী পুত্রবধূ লাবণ‍্যর জন্য দামী হারমোনিয়াম কিনিয়েছিলেন।)

– তারপর?

– ঐ হারমোনিয়াম মায়ের শান্তির জায়গা ছিল। কাজ শেষ করে নিয়ে বসত। রবিঠাকুরের গান গাইত।

– হারালো কি করে?

– বাবা অভিনয় করতো। সেনবাড়িতে হৈ হৈ ক্লাব ছিল। এন্টালিতে থ‍্যাটাব‍্যাটা ক্লাব ছিল। দিনরাত নাটক, থিয়েটারের মহলা চলত। ঐসব করতে গিয়েই বাবা কাউকে দিয়েছিল, কাকে আমরা জানিনা। আর ফেরত পাওয়া গেলনা। তারপর সব গোলমাল হয়ে গেল। আমরা খুব গরীব হয়ে গেলাম। ভাত জোটানোর লড়াই করতে করতে বুড়ো হয়ে গেলাম। মা চলে গেল। হারমোনিয়াম মরীচিকা হয়ে গেল।

এটুকু আলোচনা হচ্ছিল হাতিবাগানের ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে। তারপর বাস এসে গেল। যে যার বাড়ি চলে গেলাম। হারমোনিয়াম রহস্যটা উদ্ঘাটন হল বটে, কিন্তু নতুন জট পড়ল। মায়েরা গরীব হয়ে গেল কি করে? লাবণ‍্যর হারমোনিয়াম নিয়েও একটা ছায়াছবি হতে পারত মনে হয়।

মায়েরা ডাকে (পর্ব তিন)

জেনে কি বা প্রয়োজন
অনেক দূরে বন
রাঙা হ’ল কুসুমে, না,
বহ্নিতাপে ?

ক্লাস টেনে আমি সংস্কৃত ঐচ্ছিক নিলাম। আসলে এমনিতেই আমাদের ইস্কুলে ক্লাস ফাইভ থেকে সংস্কৃত পড়ানো হত। শ্লোকের ছন্দ খুব ভালো লেগে গেল। মা ইস্কুলে বাংলা পড়াত। সংস্কৃতেও দখল ছিল। মায়ের কাছে সংস্কৃত পড়তাম। আন্তঃশ্রেণী প্রতিযোগিতা এসে গেল। দীপ্তিদি আমাদের একটা সংস্কৃত রামায়ণের অধ‍্যায়ের অংশ আবৃত্তির জন্য দিলেন। রাবণকে হারিয়ে দিয়েছেন রামচন্দ্র। সীতাকে অশোকবন থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু রাম সীতার সতীত্বের পরীক্ষা নেবেন। অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে। কুন্ডে আগুনের লেলিহান শিখার সামনে সীতা একের পর এক প্রশ্নে ফালাফালা করে দিচ্ছেন পিতৃতন্ত্রকে। মা আমাকে স্বরের ওঠানামা করে বলতে শিখিয়ে দিয়েছিল। ঐ অংশটা আবৃত্তি অভ‍্যাস করতে করতে শিরায় আগুন ধরে যেত আমার। মাধ‍্যমিকের আগে একদিন পড়তে ভালো লাগছিল না। গল্পের বইগুলো আলমারি থেকে নামিয়ে নাড়াচাড়া করছিলাম। মায়ের নবম শ্রেণীর প্রাইজের বইটা বেরিয়ে পড়ে। সালের দিকে নজর পড়ল, ১৯৬৩ সাল।

– মা – আ! তুমি ১৯৬৪ সালে মাধ্যমিক পাশ করেছিলে?

– না। আমাদের মাধ্যমিক নয় হায়ার সেকেন্ডারি। একেবারে ইস্কুলেই ইলেভেন অবধি পড়ে, তারপর কলেজ।

– ও তার মানে ১৯৬৫ সাল।

– না রে আমি পাশ করেছি ১৯৬৭ সালে। তুই ৮৭ তে পরীক্ষা দিবি। আমি ঠিক কুড়ি বছর আগে পরীক্ষা দিয়েছি।

– মাথাটা গেছে তোমার মা। নবম শ্রেণীতে এই তো লেবেলে লেখা আছে ১৯৬৩।

মায়ের হাসিটা খুব করুণ দেখায়।
– দুবছর পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আমার।

– এ্যাঁ, ওহ্ তোমরা যখন গরীব হয়ে গিয়েছিলে, তখন? পরে বলব করে করে তো ক্লাস টেনে উঠে গেলাম। কি হয়েছিল খুলে বলবে এবার? একটু শুনি।

– শুনবো বললেই তো শোনা যায়না মা। তার জন্য মন প্রস্তুত করতে হয়।

– আমি বড় হয়ে গেছি মা। কি বুকে চেপে রেখেছ, নিঃসঙ্কোচে বলো। আমি শুনতে প্রস্তুত।

– তোর দিদা হল দাদুর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী ভারতী তোর বড়মামার জন্মের একবছরের মাথায় মারা যায়। ছোট বাচ্ছা দেখবে কে? দাঁতিদা তখন আমার মায়ের সঙ্গে সম্বন্ধ করে বাবার আবার বিয়ে দেয়। তার পরে মা বাবার একে একে এগারোটি সন্তান হয়। কিন্তু বেশিরভাগ সন্তান শিশু বয়সে মারা যায়। ছোড়দা, আমি আর তোর দুই মাসি – এই চারজনই বেঁচে রইলাম। আর বড়দা ছিল, আমাদের সৎ দাদা। মা শোকে তাপে পাথর হয়ে গিয়েছিল। গান, হাতের কাজ, পড়াশোনা এগুলোকে আঁকড়ে ধরেছিল। সংসারে থেকেও অন‍্যরকম মানুষ ছিল। আমরা বড় হচ্ছিলাম। বড়দার বিয়ে হল। তারপর বাবার যে কি হল। কান পাতলা লোক ছিল। কেউ কানে ফুসমন্তর দিয়েছিল হয়তো। বাবার হঠাৎ ধারণা হল, সৎ ছেলে বলে মা বড়দার দেখাশোনা করছেনা। কিন্তু মা অমন মানুষ ছিলনা। চিরকাল মুখ বুজে বাবার সব তান্ডব সয়ে এসেছে। এবারে মা প্রতিবাদ করল। কিন্তু ফল হল সাংঘাতিক। বাবা মায়ের হাত থেকে ভাঁড়ারের চাবি কেড়ে নিল। চাল, ডাল সব একটা ভাঁড়ারের আলমারিতে ঢুকিয়ে তালা চাবি দিল। আমরা না খেয়ে রইলাম।

– সে কী! এমন ও হয়?

– হয়। আমাদের জীবনে হয়েছিল। তোর মাসিরা তখন ছোট। খিদেতে কান্নাকাটি করত। ছোড়দা পাশ দিয়েছে। আর আমি নাইনে পড়ি। রোজ অফিস যাবার আগে, আমরা চার ভাইবোন আর মা বাদে, যতজন ছিল, তাদের মতো চাল বার করে দিয়ে, চাবি নিয়ে বাবা অফিস চলে যেত। কয়েকদিন পরিচারিকারা বাড়ি থেকে কিছু খাবার এনে খাইয়েছিল।

– দাদুভাই কী চাইছিল? অপবাদ স্বীকার করে নিয়ে আত্মসমর্পণ?

– হ‍্যাঁ, নিশ্চয়ই তাই। ভুল স্বীকার করলে নিজে হেরে যাবে। বাবা হার স্বীকার করতে জানতোনা।

– তারপর? পাশে তো সেনবাড়ি ছিল, তাঁরা কিছু বলেননি?

– সেনবাড়ি জানতে পারেনি। মায়ের মনে অভিমানের পাহাড় জমেছিল। তাই মনে হয়, কিছু বলেনি। তবে আমার এখন মনে হয় বললে ভালো হত। ওবাড়িতে গুরুজনেরা ছিলেন।বাবাকে শাসন করতে পারতেন। তবে ঐ সময়ে সেনবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কটা একটু টাল খেয়ে গিয়েছিল।

– কেন?

– আমরা তো দাঁতিদার বাড়ি ভাড়া থাকতাম, বাবা অত টাকা ওড়াতো, কিন্তু বাড়ি ভাড়া দিতনা। শেষে যখন অনেক টাকা বাকি পড়ল, তখন মায়ের হাতের ভারি ভারি চুড়ি গুলো বেচে বাড়িভাড়া দিয়ে দিল। মা তাতে খুবই দুঃখ পেয়েছিল। গয়না যে শুধু সম্পদ তা তো নয়। অনেক স্মৃতি থাকে। হয়তো মায়ের মায়ের, বা দিদার, ঠাকুমার বা অন্য কারোর স্মৃতি ছিল। আর কি একটা ছুতোয় বাবা দাঁতিদার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে দিল। ও বাড়ি ডাকসাইটে জজ, ব‍্যারিস্টার, অ্যাটর্নিদের বাড়ি। সবসময়ে আমাদের উপকার করেছে।আত্মীয়দের মধ্যে ছুটকো কারণে এই মামলা করাতে সেনবাড়ির লোকেরা খুব অসন্তুষ্ট হয়েছিল। আর অন্দরে মেয়েতে মেয়েতে তো সম্পর্ক থাকে। বাবার এই মামলা করার জন্য মা সেনবাড়িতে মরমে মরে গিয়েছিল।

– দাদুভাই কি পাগল ছিল? এমন কেউ করে? ছি ছি।

– হ‍্যাঁ তা ছিটগ্রস্ত তো ছিল, একথা হলপ করে বলা যায়।

– তারপর?

– তারপর মা চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। আসলে মা তখন সহ‍্যের শেষ সীমায় চলে গিয়েছিল।

– কি সে সিদ্ধান্ত?

– আমাদের বাড়ির এক রাঁধুনির কাছ থেকে খোঁজ পেয়ে, মা আমাদের চার ভাইবোনকে নিয়ে, বাগবাজার থেকে অনেক দূরে অশোক নগরের উদ্বাস্তু কলোনিতে চলে যায়।

– কিন্তু সংসার চলল কিকরে? আর দাদুভাই খোঁজ করেনি?

– যেদিন আমরা বাড়ি থেকে চলে যাই, সেদিন অফিস থেকে ফিরে, নাকি কাউকে দেখতে না পেয়ে আমাদের নাম ধরে অনেক ডাকাডাকি করেছিল। পরে শুনেছি।

– আচ্ছা, সংসার খরচটা?

– আমার মেজপিসির বাড়ির ছেলে হলেন চিত্র পরিচালক সলিল দত্ত। তাঁকে ধরে ছোড়দা টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায় সহকারী পরিচালকের কাজ জুটিয়ে নেয়। কোনো মাস মাইনে ছিলনা। যেদিন কাজ, সেদিন পয়সা। কতদিন হয়েছে, সারাদিন হাঁড়ি চড়েনি। ছোড়দা রাতে চাল কিনে এনেছে, তখন সবাই খেয়েছি। এইসময়েই আমাদের তিন বোনের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়।

– আবার শুরু হল কি করে?

– ইস্কুলে শ্রদ্ধাপ্রাণাজী খোঁজ করছিলেন, আমরা তিনবোন গেলাম কোথায়। বছর দুয়েক বাদে খোঁজ পেয়ে তিনি বাড়িতে লোক পাঠান। ট্রেনে করে অনেক দূরের পথ। কিন্তু তিনি বাধ্য করেন আবার পড়াশোনা শুরু করতে। ভোরে বেরোতে হত। ইস্কুলে হোস্টেলে ভাত খেতাম। লক্ষ্মীদি মানে শ্রদ্ধাপ্রাণাজী সব ব‍্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু রোজ রোজ খেতে লজ্জা করত। মাঝে মাঝে বলে দিতাম খেয়ে এসেছি।সেদিন সারাটা দিন উপোস।

– বুঝলাম, এইজন্য তোমাদের সব বোনেদের, মামার গ‍্যাস্ট্রিক আলসার ধরেছে। তারপর?

– তারপর আর কি, ইস্কুলের দিদিদের একটা আশা ছিল যে, আমি স্কুলের শেষ পরীক্ষাতেও ফার্স্ট হব। কিন্তু হতে পারলাম না। যা হোক একটা ফল হল।
জানিস পাশ করার পর বাবার অফিসে ফোন করেছিলাম স্টেশন থেকে। বাবা একটা কথা বলল, ফার্স্ট হয়েছ? আমি যেই বললাম না, অমনি ফোন কেটে দিল। হ‍্যাঁ রে, ফার্স্ট হতে গেলে বাড়িতেও একটা পরিবেশ দিতে হয়, বাবা কি জানতোনা?

মায়ের গলা বুজে আসে, মায়ের মাথায় হাত বোলাই। বলি,

– যা গেছে তা গেছে মা, ক্ষমা করে দাও।

মা চোখ মোছে। বলে

– ক্ষমা করে দিয়েছি রে মা। বাবা স‍্যাক্সবি থেকে অবসর নেবার পর, কপর্দক শূন্য হয়ে তো আমাদের কাছেই চলে এসেছিল। সঞ্চয় তো করেনি কোনদিন। বলতো, টাকা যে কোনদিন না থাকতে পারে, এমন কথা কখনো মাথায় আসেনি। বড়দা তখন ফায়ার ব্রিগেডের চাকরি নিয়ে উত্তর বঙ্গে। দেখার ও কেউ ছিলনা। শেষ বয়সে রাতে গেট ধরে দাঁড়িয়ে থাকত, ছোড়দা কখন ফিরবে‌। কিন্তু ছেলের মন তখন বাবার থেকে একসমুদ্র দূরে।

আমার মাধ‍্যমিকের প্রস্তুতি চলে জোর কদমে। পড়তে পড়তে একটু তন্দ্রা মতো চলে এসেছিল একদিন। চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা রেখে অদ্ভুত স্বপ্ন দেখি। অগ্নি কুন্ডে ধু ধু আগুন জ্বলছে। শিখা উঠেছে লকলকিয়ে। একপাশে রামচন্দ্র নয়, আমার দাদু বিকাশচন্দ্র, আর অন‍্যপাশে মুখোমুখি সীতা নয় লাবণ্য। বিকাশচন্দ্রের গমগমে গলা শুনি,

– এই শেষ সুযোগ। দোষ স্বীকার করো, সৎ ছেলেকে দেখোনি। স্বীকার করে করুণা ভিক্ষা করো, তবেই প্রাণভিক্ষা দিতে পারি আমি।

লাবণ‍্যর মনের কথা শুনতে পাই আমি। দুধের শিশুকে দেখাশোনার জন্য ঘরে এনেছিলে, বুকে করে মানুষ করেছি। কিন্তু আশ্চর্য, মুখে লাবণ্য একথা বলেনা। নতমুখ তুলে বিকাশের চোখে চোখ রাখে। এতকাল গোপনে ইংরেজি চর্চা করা লাবণ্য আজ প্রকাশ‍্যে শুধু বলে

– আই কুইট। গুড বাই।

তারপর দুজোড়া লবকুশকে নিয়ে সীতা নয় লাবণ্য এগিয়ে যায় অশোক বন নয় তপোবন মানে অশোক নগরের দিকে।

পায়ে পায়ে চলতে চলতে মাধ‍্যমিক পরীক্ষা এসে গেল আমার – ১৯৮৭ সাল। ফলও বেরোল। মাধ‍্যমিকে যে ইস্কুল থেকে ফার্স্ট হয়, সে একটা চ‍্যালেঞ্জ কাপ পায়। কুড়ি বছর আগে ওটা মঞ্চে উঠে মায়ের নেওয়ার কথা ছিল। বিধির বিধানে হয়নি। কুড়ি বছর পরে কাপটা আমি পেলাম।নিবেদিতা ইস্কুলের যেসব দিদিরা মাকে আর আমাকে, দুজনকেই পড়িয়েছেন, তাঁরা আমাকে উপলক্ষ করে ওটা মাকেই দিলেন। অন্তত তাঁদের শরীরী ভাষায় সে কথাটা প্রকাশ পাচ্ছিল।

মায়েরা ডাকে (পর্ব চার)

সোনার কাঠি রুপোর কাঠি

মা বোধহয় ভেবেছিল, এই যে বড়মামা এত হৈ হৈ করে, আমায় ছুরি দিয়ে সব্জি কাটা শেখায়, আর বড়মামা এলেই আমি ছিনেজোঁক হয়ে বসি, ফায়ার ব্রিগেডের রোমহর্ষক সব গল্প শুনব বলে – সেই মামা সৎ শুনে আমার মনে কোনো প্রতিক্রিয়া হবে। অথবা লাবণ্য, দাদুর ঘর ছেড়ে উদ্বাস্তু কলোনিতে গিয়েছিলেন শুনে আমি শ্রদ্ধা হারাব। তাই কথাগুলো বলতে চাইতোনা। কিন্তু মা সেই সীতার কাল থেকে আজ পর্যন্ত কোন মেয়েটা উদ্বাস্তু নয়? মা তুমি ন হন‍্যতে পড়োনি। আমি ইস্কুলের লাইব্রেরি থেকে এনেছিলাম। পড়লে বুঝতে ঐ বইতে মৈত্রেয়ী দেবী কিভাবে নতুন যুগ আর মুক্ত চিন্তাকে কুর্নিশ করেছেন। মা বি এ পাশ করেছিল বিয়ের পরে, কিন্তু আরও পড়া হলনা বলে হাহুতাশ করত। মাকে সান্ত্বনা দিতাম। এই লকডাউনে সব ফাঁকা হয়ে যাবার পরে মায়ের স্মৃতিগুলো বড় বেশি ভিড় করে আসে আজকাল। যে প্রশ্নগুলো ভুলে গিয়েছিলাম সেগুলো আবার ফিরে আসে। লাবণ‍্যর হারমোনিয়ামটা কোথায় গেল? লাবণ‍্যর উলবোনার বইটা কোথায় গেল? মেয়েদের ঠিকানা বদলায়, তাই সব গুছিয়ে রাখা যায়না। আচ্ছা, লাবণ‍্যর রুপোর সিঁদুর কাঠি দিয়ে মা চিরকাল সিঁদুর পরত। উল্টো দিকে টিপের গোলটা সিঁদুরে ডুবিয়ে টিপ পরত। একটু খানি নাকে ঝরে পড়ত। আমার বিয়েতে ঐ সিঁদুর কাঠি মা আমাকে দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু পরে বাড়ি বদল করতে গিয়ে ঐ সিঁদুর কাঠিটা হারিয়ে গেছে। তাহলে কি লাবণ‍্যর কোনো কিছুই আমার কাছে রইলনা? বুক ঠেলে কান্না আসে। কিন্তু চোখটা শুকনো রাখতে হয়। কান্নার কারণ জানলে বাড়িতে সকলে হয়তো হাসবে। লকডাউন একটু শিথিল হতেই পাগল হয়ে রুপোর দোকানে দোকানে ঘুরি।

– দাদা আমি একটা রুপোর সিঁদুর কাঠি করাব।

– অনেক আছে, নিন না, কোনটা নেবেন।

– এরকম এতো হাল্কা নয়। আমি ছবি এঁকে দেব। সেই রকম বানিয়ে দিতে হবে।

– সম্ভব নয়।

– কেন সম্ভব নয়?

– আপনি ক্ষেপেছেন দিদি? একটা সিঁদুর কাঠি অর্ডার নিয়ে কোনো কারিগর করতে চাইবেনা। সেই সময়ে ওর একশোটা ছাঁচে ঢালা বানানো হয়ে যাবে। কেউ যদি করেও, সে এত মজুরি চাইবে, আপনার পোষাবে না।

– পোষাবে, দেখুন না যদি হয়।

– যা হবেনা, তা কিকরে আশ্বাস দিই দিদি। আপনি অন্য কোথাও দেখুন।

ব‍্যর্থ মনোরথ হয়ে ঘুরে মরি। বাড়িতে সবাই জিজ্ঞেস করে, কোথায় গিয়েছিলে? কিছু বলতে পারিনা। কর্তা বলেন, দেখছ একটা অতিমারী চলছে। ল‍্যাপটপে বসে ছাত্রছাত্রীদের বড় বড় কথা বলছ, আর নিজে ঘুরে বেড়াচ্ছ? ডিসগাস্টিং। উত্তর নেই আমার। পূর্ণ থাকলে মন সব ছেড়ে দিতে পারে, উদার হয়, আর শূন্য হয়ে গেলে আঁকড়াতে চায়। রাতে ঘুম আসেনা, এপাশ ওপাশ করি। ছেঁড়া তন্দ্রায় আবার স্বপ্ন দেখি। একটা সোনার সিঁদুর কাঠি পালকের মতো ভেসে চলেছে, তার পিছনে ভেসে যায় মায়ের প্রাইজের বইগুলো। তন্দ্রা কেটে যায়। অন্ধকারে ধড়মড় করে উঠে বসি। হঠাৎ মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন আসে। আচ্ছা! মায়েরা যখন অশোক নগর গেল, তখন এবাড়িতে সব পড়ে রইল। কিন্তু প্রথম শ্রেণী থেকে মায়ের প্রাইজের বইগুলো থেকে গেল কি করে? মার নিশ্চয়ই পেটে খিদের জ্বালা নিয়ে ওসব মনে ছিলনা। তার মানে লাবণ‍্যই হাজার ঝড়ে ওগুলো বাঁচিয়ে রেখেছিল। ঐ বইগুলো মা আর দিদা দুজনের স্মৃতি। সবকিছু হারায়নি তবে। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে আলো জ্বেলে মুখে ঘাড়ে জল দিই। ডিভানে মেয়ের হারমোনিয়ামটা পড়ে আছে আলগোছে। আমার বাবা নাতনির জন্য কিনে দিয়েছিল। বাবার এক পেশেন্টের বাজনার দোকান ছিল। তার কাছ থেকে কিনেছিল ভালো হারমোনিয়াম,তবে সেকেন্ড হ‍্যান্ড। আবার ঐ সোনার কাঠিটা উড়ে বেড়ায়। আরে এটাও তো হাত ঘোরা হারমোনিয়াম। আমার লাবণ‍্যর না হলেও অন্য কোনো লাবণ‍্যর ছোঁয়া আছে এতে। তার মানে সিনেমার মতো হারমোনিয়াম আবার আমার কাছে ফিরে এসেছে সেই কবে, এতদিন বুঝতে পারিনি, অন্ধ হয়ে ছিলাম। দেয়ালে বাবার ছবিটা ঝোলে। বাবার তো মা ছিলনা। জ্ঞান হবার আগে মা মারা গেছে, বড়মামার মতো। কিন্তু বড়মামার লাবণ্য ছিল। ঠাকুরদাতো আর বিয়ে করেনি। তারপরে নিজেরই হাসি পেয়ে যায়। বড়মামা তো প্রথম সন্তান, আর বাবা সবচেয়ে ছোট। বাবার জন্য বৌদিরা মানে আমার জ‍্যাঠাইমারা ছিল। আর ভগবান সব তুল‍্যমূল‍্য করে দেন। ঐ জন‍্যই বাবার ছেলে নেই শুধু মেয়ে। ঠাকুমার নামটা জানি, হেমনলিনী। একটাই ছবি আছে। বাবার মামার বাড়ি যেতাম, আড়বালিয়ার পাশে শুকপুকুরিয়ায়। মা মরা ভাগ্নের আর তার পরিবারের খুবই আদর ছিল ওখানে। আচ্ছা ঠাকুমা স্থূল দেহে ছিলনা ঠিকই, তবে আদর যা পেলাম, সে তো হেমনলিনীর ভাগেরই। লকডাউনে বাবা মারা যাবার পর শুকপুকুরে যাই। আধখানা চাঁদের মতো সেই উঁচু লাল দালান আগে খোলা ছিল, এখন গ্রিল বসেছে। এমাথা, ওমাথা সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে দালানে উঠি হাঁটুর ব‍্যথা ভুলে। এঘর ওঘর থেকে কাকা কাকিমারা বেরিয়ে আসে। অন্তরঙ্গ গল্পগাছা চলে, যেমনটা চলত বাবা মায়ের সাথে। যেন আমিই বার্তালাপ চালিয়েছি এতকাল, কয়েক দশকের অদর্শন কিছু নয়। কাকা কাকিমাদের আছে আজ আমিই দাদা বৌদি। বাবার বড়মামা একটা পারিবারিক রুপোর পকেট ঘড়ি উপহার দিয়েছিলেন বাবাকে। বাবা লেখাপড়ায় ভালো ছিল, জলপানি পেত। ডবল প্রমোশন পেয়েছিল পাঠশালায়। তেমন কোনো উপলক্ষে হবে হয়তো। সেই ঘড়ির রুপো দিয়ে বাবা একটা হার করে দিয়েছিল মাকে, সেটাতো আছে আমার কাছে। বলা যেতে পারে, ওটা হেমনলিনীর স্মৃতির একটা সূত্র। এতদিন তো এভাবে ভাবিনি। স্বপ্নে একটা সোনার কাঠি এসে কি যে করে দিল, বহু প্রজন্মের মায়েদের অনুভব করতে পারছি এখন। বংশলতিকাতে মেয়েদের নাম তো থাকেনা তেমন। যেন তাঁদের অস্তিত্বই নেই। কিন্তু বাবাদের মতোই তাঁরা আমাদের মধ্যে বেঁচে রয়েছেন প্রবলভাবে।

কার চোখে কত জল কে বা তা মাপে

মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনীর বইগুলো আজকাল বার করে প্রায়ই পড়ি। আমারও এমন লিখতে ইচ্ছে করে। এও বিশ্বাস করি আমার মা কৃষ্ণা আর লাবণ‍্যর আরও বেশি লেখাপড়া হলনা – এই আক্ষেপটাই আমাকে এম এস সি, এম ফিল, পি এইচ ডি পার করিয়ে অধ‍্যাপিকা করেছে। হেমনলিনীর বাপের বাড়ির রুপোয় গড়া হারটা পরি। আয়নায় চোখ পড়ে যায়। দেখি আমার পিছনে দেওয়ালে কৃষ্ণা, গলায় হেমনলিনী, হাতে কুমুদিনী, আর আয়নায় লাবণ্য। সব শূন্যতা ঢেকে গিয়ে, নিজেকে ভীষণ পূর্ণ লাগে। কন‍্যার ডাক ভেসে আসে।

– কি বলছিস? তোর ক্লাস চলছে তো।

– আরে মিসের ওখানে বৃষ্টি হচ্ছে, কানেকশন কেটে গেছে। আজ আর ক্লাস হবেনা।

– হবেনা তুই জানিস? ওয়েট কর।

– হ‍্যাঁ রে বাবা, হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে মিস বলে দিয়েছে কাল নেবে। ওমা! একটু ছাদে চলনা।

– এখন? ঐ উঁচু ফ্ল‍্যাটের ছাদে, অন্ধকারে?

– মা, প্লিজ প্লিজ, মোবাইলে তাকিয়ে তাকিয়ে চোখ টনটন করছে।

– আচ্ছা চল।

আঁধার ছাতে চুল এলোমেলো করা হাওয়া দেয়। এখানে আকাশে আজ মেঘ কম। কৃষ্ণপক্ষের মৃদু চাঁদ আর অজস্র তারার মেলা। কন‍্যা হঠাৎ পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আমায়, ওপরে আঙ্গুল দেখিয়ে নতুন শেখা কবিতা বলে – দেখো মা –

হাওয়া বয় শনশন তারারা কাঁপে
হৃদয়ে কি জং ধরে পুরোনো খাপে

কি বললি বাবু! মনে হঠাৎ একটা ফুলঝুরি জ্বলে ওঠে। মেয়েকে আঁকড়ে ধরে ওর কাঁধে চিবুক রেখে আকাশে চোখ পেতে দিই। ওগো প্রেমেন বাবু আজ নতুন করে তোমার কথার মানে বুঝেছি আমি।

হাসিখেলা দুখমেলা স্মৃতির বাঁকে,
আঁখিতারা তারা জুড়ে মাকেই আঁকে।
হৃদপাতে সরোবর – হোথা মায়েরা থাকে।

সমাপ্ত

আমি মোহনবাগানের মেয়ে

ড. শারদা মন্ডল

বিভাগীয় প্রধান, ভূগোল বিভাগ, প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজ।

১৯৭৭ সালের এক সকালের কথা মনে পড়ে, তখন আমি ক্লাস ওয়ানে পড়ি। দিনটা ছিল ২৪ শে সেপ্টেম্বর। তখন রেডিও তে বর্ণালী আর মঞ্জুষা শুনতে শুনতে সকালের রান্নার তোড়জোড় শুরু হত। তখন পুজোর ছুটি চলছিল। সবে  বসিরহাটের আড়বালিয়ায় বিজয়া দশমী কাটিয়ে দ্বাদশীর দিন মানে ২৩ তারিখ রবিবার আমরা কলকাতা ফিরেছি। গ্রামের বাড়িতে খেলাধুলোয় মেতে ছিলাম, হাত পায়ের ব‍্যাথা মরেনি। ইস্কুলও নেই।  অথচ ঐ সোমবার খুব তাড়াতাড়ি আমাকে আর বোনকে  ঘুম থেকে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ঐ দিন ছুটির পরে বাবা অফিস জয়েন করবে, সেজন্য কি? বাড়ির বাজার, রান্না, খাওয়া সবেতেই একটা তাড়াহুড়ো হচ্ছিল। হাতের সব কাজ গুছিয়ে ফেলতে হবে। কারণটা মাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম। ফুটবলের মণি, ব্রাজিলের কালোমাণিক  পেলে এসেছেন কলকাতায় নিউ ইয়র্কের কসমস দলের হয়ে। আজ খেলা হবে মোহনবাগানের সঙ্গে। সকলে উত্তেজনায় ফুটছে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হল। সবাই অধীর আগ্রহে ঘড়ি দেখছে। অন্যদিন হলে দুপুর গড়ালেই পাতিপুকুর হাউজিংয়ের মাঠে খেলা শুরু হয়ে যেত। আজ সব শুনশান। খেলা শুরু হল ইডেনে। আশপাশের সব রেডিওই আজ চলছে। আমরাও গোল হয়ে রেডিওর চারপাশে বসে গেছি। মানে বড়রা বসেছে বলে আমরাও জুটে গেছি। বল এ পায়ে ও পায়ে ঘুরছে, কিন্তু বেশ কয়েক মিনিট কেটে গেলেও, কই পেলের নাম শোনা গেলনা এখনও। অধীর আগ্রহে সকলে অপেক্ষা করছি। হঠাৎ কানে ভেসে এল, বল ধরেছেন পেলে। কিন্তু পেলের শট বারপোস্টের ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। আমাদের বাড়িতে তো বটেই, আশপাশের বাড়ি থেকেও একটা হুল্লোড় উঠল। যদিও ১৯৭৫ এ টিভি সম্প্রচার শুরু হয়েছিল কলকাতায়, ৭৭ এর সেপ্টেম্বরে আশেপাশে কারোর বাড়িতেই টিভি ছিলনা। কিন্তু তাতে আফশোষও ছিলনা। কারণ রেডিওর ধারাবিবরণীতেই মাঠ, গ‍্যালারি, সব আমরা দেখতে পেতাম। আমাদের লাগোয়া কোয়ার্টারে পূববাংলার একটি পরিবার থাকত। সেখান থেকে শুনলাম এবারটা উড়ে গেল তো কি? শিবাজী আজ দশ বারোটা খাবে। কিন্তু ওদের দুয়ো দিয়ে আমার মনের চোখের সামনে মোহনবাগান বাঘের মতো খেলতে লাগল। আর একটু খেলা এগোতেই মোহনবাগানের জালে বল জড়িয়ে দিলেন কসমসের কার্লোস। আমার মেজ মাসি ককিয়ে উঠল, ওরে পেলে হারলেও কষ্ট আর মোহনবাগান হারলে আমি শেষ। আমার মাসি নিপুণ ভাবে ঘরের কাজ করতো, রথ সাজাতো, ঝুলন করতো, সিনেমায় উত্তম কুমারের প্রতি কিছু খারাপ ঘটলে ফোঁপাত। সে হঠাৎ মোহনবাগান হারলে শেষ হবে কেন, বেশ একটু অবাক হলাম। যাই হোক খেলা চলছে। হাবিব, আকবর, শ‍্যাম – গো – ও – ও – ল। মা আমাকে জাপটে ধরে বলল, ওরে পেলের দলকে থাবড়া দিয়েছে শ‍্যাম থাপা। মায়ের কথা ডুবে গেল বাইরে পটকার আওয়াজে। মার মুখে এমন ভাষা আর আচরণ আমি এর আগে বা পরে কখনোই দেখিনি বা শুনিনি। মা বাগবাজারের নিবেদিতা ইস্কুলের শিক্ষিকা, সংযমী, রাশভারী। তখন অবশ্য এসব ভাবিনি। ছ বছরের আমি আর চারবছরের বোন, শ‍্যাম থা – পা, শ‍্যাম থা – পা বলে বলে তিড়িং বিড়িং নেচে নিলাম খানিকটা। রেডিওর ওধারে ইডেনেও মারকাটারি যুদ্ধ চলছে, আর এধারে দুই নারী, দুই শিশুর হৃদপেশীর কম্পন চলছে সেই যুদ্ধের তালে। একটু পরে আবার মোহনবাগানের গোল। এবারে গোল করেছেন হাবিব। বাইরে বাজির আওয়াজে কান পাতা দায়। আধঘণ্টাটাক কাটার পরে হঠাৎ মোহনবাগানের গোলের সামনে ফ্রিকিক নিতে আসেন পেলে। বোন কিছু ঘ‍্যানঘ‍্যান শুরু করেছিল। ওর গালে পড়ল মায়ের এক চড়। কিন্তু সে বল আটকে যায়। মা আবার বোনকে আদর করে দিল। একটু পরে হাফটাইম হয়ে গেল। কিন্তু ঐ সময়টা কাটছিল না। এমন একটা উত্তেজনা, খেলাটা টানা হয়ে গিয়ে ফলটা জানা গেলে বাঁচা যেত। আবার দ্বিতীয়ার্ধে খেলা শুরু হল সেয়ানে সেয়ানে। না আর কোনো গোল হয়নি। মোহনবাগানের লিড। মা আর মেজ মাসি যেন পালকের মতো ভাসছিল। আমি আর বোনও তাই। কিন্তু শেষরক্ষা হলনা। কসমস পেনাল্টি পেয়ে গেল। ২ – ২  হয়ে খেলা শেষ হল। মন্দের ভালো হল। আমার মেজমাসি বেঁচে গেল। বাইরে বাজিও কমলো। কিছুক্ষণ পরে আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম, মোহনবাগান জিতলে কি হয়? মা বলল, মোহনবাগান একটা আদর্শ, আমাদের পূর্বপুরুষদের অনেক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে গড়া যখের ধন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক, আমাদের অস্তিত্ব। মোহনবাগানের হারজিত, আর আমাদের জেতা হারা এক। আমি শুধোলাম, মানে? উত্তর হল, বড় হলে বুঝবে। শুনলাম উত্তরটা কিন্তু সন্তুষ্ট হলাম না, আবার মায়ের কথার মানেটাও বুঝলাম না। কিন্তু মোহনবাগান আসলে কি, সেটা জানার ইচ্ছে প্রবল হয়ে উঠল। এটা জানতাম মোহনবাগান ফুটবল খেলে। ফুটবল কি সেটাও জানতাম। হাউসিংয়ের মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলত। মা আমাদের নামতে দিতনা। বলত মেয়েরা ওসব খেলেনা। আমি জানতাম মা মাঠে খেলার বিরোধী। কিন্তু এখন ভিতরে দেখছি উল্টো। মোহনবাগানে কি জাদু আছে? এতদিন রেডিও তে সবাই দুপুর থেকে খেলা শুনতো, তাই আমি ও শুনতাম। এবারে আরও বেশি করে রেডিওর দিকে ঝুঁকে গেলাম। পুষ্পেন সরকার, কমল ভট্টাচার্য এবং অবশ‍্যই অজয় বসুর গলা চিনে ফেললাম। ঠিক যেমন চিনতাম বেতার নাটকে জগন্নাথ বসু বা অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলা। আসলে ঐ ধারাবিবরণী মানে যাকে আমরা বলতাম রিলে, তার মধ্যে দিয়ে খেলার ব‍্যাকরণটা বোঝার চেষ্টা করতাম। শেখানোর কেউ ছিলনা। দাদাদের বললে ক্ষ‍্যাপাবে। থ্রো -ইন আর থ্রু পাস দুটোর তফাৎ কি? কাকে বলে ফ্রি কিক আর কোনটাই বা গোল কিক? স্কোয়ার পাস কি, পেনাল্টি কখন হয়? কর্নার মারার নিয়ম কি? ব‍্যাক, হাফব‍্যাক, উইং, ফরোয়ার্ড পজিশন কি? এগুলো কল্পনা করে করে বোঝার চেষ্টা করতাম। অবশ্য শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেটও এইভাবেই শিখতাম। শ‍্যাম থাপা একবার বাইসাইকেল কিক মেরেছিলেন। আমি আনন্দ বাজারে ছবি দেখেছিলাম। তখন আমি টু তে পড়ি। কিকটা কিভাবে হয়, ছবি দেখে ঠিক বুঝতে পারিনি। পরে টিভিতে পেলের বাইসাইকেল কিক দেখেছি। সিলভেস্টার স্ট‍্যালোনের একটা সিনেমা দেখেছিলাম – এসকেপ টু দ‍্য ভিক্ট্রি। তখন ন‍্যাশনাল চ‍্যানেলে মাঝে মাঝে রাত্তিরে ইংরেজি ছবি দেখানো হত। সেখানেও পেলের বাইসাইকেল কিক ছিল।  আমার সবচেয়ে আনন্দ হতো, যখন অজয় বসুর সঙ্গে বিশেষজ্ঞ হিসেবে পি কে ব‍্যানার্জি আসতেন। কারণ খেলার সঙ্গে সঙ্গে উনি নানান খেলার অভিজ্ঞতা আর ইতিহাস দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন। তাতে আমার খুব সুবিধে হত। আমার এক পিস্তুত দাদা একবার বলেছিল, দূর দূর পি কে ব‍্যানার্জি এলে ভীষণ অন্য কথা বলেন। আসলে ছেলেরা কোনদিনই বুঝবেনা মেয়েদের কতরকম জ্বালা। ক্লাস সিক্সে যখন উঠলাম, মানে ঐ ১৯৮২ সালটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।  ঐ বছরে স্পেনের বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল ইতালি আর জার্মানি। ঐ ফাইনাল খেলা গভীর রাতে আমি একজন প্রতিবেশীর বাড়িতে দেখতে গিয়েছিলাম। ঐ প্রথম পাওলো রসির গোল আমি রেডিওতে না শুনে টিভিতে দেখেছিলাম। ইতালি থ্রি টু ওয়ান জিতেছিল। ঐ খেলা দেখে রেডিও আর টিভির একটা মূল পার্থক্য বুঝতে পারলাম। টিভিতে স্লো মোশনে রিপ্লে দেখানো হয়। রেডিওতে সে সুযোগ নেই। টিভিতে কথা বলা হয় কম। তাই বিশ্লেষণটা রেডিওতে ভালো হয়। ঐ বছরে দিল্লিতে এশিয়ান গেমস হয়েছিল। একটা নাচুনি হাতির ছানা আপ্পু  ছিল তার ম‍্যাসকট। আর লোগোতে ছিল যন্তর মন্তর। আমার কাছে এখনো ঐ যন্তর মন্তর ছাপওলা কয়েন আছে। গেমসের অনেক আগে থেকে সাজো সাজো রব পড়ে গিয়েছিল। দিল্লিতে গেমস ভিলেজ তৈরি হচ্ছিল। রোজ রুদ্ধশ্বাসে গেমসের খবর পড়তাম। ঐ খেলার রঙিন ছবি নাকি সরাসরি দেখা যাবে। কাগজে দূরদর্শনের নতুন মোবাইল ভ‍্যানের ছবি বেরোলো। ভারত নিজের প্রযুক্তিতে দেখাবে। কৃত্রিম উপগ্রহ যাবে। কিন্তু সব তছনছ করে যার সাহায্যে খেলা সম্প্রচারের কথা, সেই ইনস‍্যাট ওয়ান এ ভেঙে পড়ে যায়। তবে ভারত সরকার পিছু হটেনি। মার্কিন উপগ্রহ ভাড়া করে টিভিতে রঙিন ছবি দেখানো শুরু হয়। এক দুবার প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে দেখেছি। তখন মাঝেমধ্যে হাউসিংয়ের মাঠে বাঁশ আর পর্দা বেঁধে সিনেমা দেখাতে লোক আসত। আমরাও পড়ি কি মরি করে ছুটতাম। পর্দার সামনের দিকে দাঁড়ানোর জায়গা না পেলে উল্টো দিক থেকে দেখতাম। ছবিও ডান বাঁ উল্টে যেত। একবার এইভাবে ১৯৮০র মস্কো অলিম্পিক দেখাতে লোক এসেছিল। মাঠে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলাম। পৃথিবীতে শুধু ফুটবল আর ক্রিকেট নয়, আরো কত খেলা, সে কথাটা এই ১৯৮২ সালটাই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল। যাকগে আবার ফুটবলে ফিরে আসি।১৯৮৪ তে নেহেরু কাপে আর্জেন্টিনার রিকার্ডো গারেকাকে আমার খুব ভালো লেগে গিয়েছিল।  না টিভিতে দেখে নয়। রেডিওর রিলে আর খবরের কাগজে ছবি দেখে। ইস্কুলে টিফিনের সময়ে এক বন্ধু বলল, না না শারদা, গারেকাকে তুই নিসনা, ওকে আমি নেব। আমি বললাম, আচ্ছা নে। আমার তো স্টেডি হিরো একজন অলরেডি আছে। শ‍্যাম থাপা। আজ প্রায় চার দশক পরে প্রৌঢ় গারেকাকে আবার দেখলাম টিভিতে কোপা আমেরিকায় পেরু দলের সঙ্গে। ছিয়াশিতে মারাদোনার স্বপ্নমাখা বিশ্বকাপের আগে বাবা একটা ফিলিপসের বারো ইঞ্চি টিভি কিনে এনেছিল আর মারাদোনা আমার মা আর আমি – দুজনের চোখেই ঘোর লাগিয়ে দিয়েছিল। তবে বিশ্বকাপ এলেও ঘরের মাঠে বাবলু, বিকাশ, কৃষাণু চর্চাও সমানতালে চলছিল। যদিও একই যুগে বেঁচে থেকেও ওদের কাউকেই আমি চোখে দেখতে পেলামনা। বাবা আমাকে অনেক ছোটবেলায় ইডেন গার্ডেনে নিয়ে গিয়েছিল মিলিটারি টাট্টু দেখতে। আমি রেডিওতে চেনা ইডেনের সবুজ গ‍্যালারিতে বসেছিলাম। বাবা প্রায়ই খেলা দেখতে যেত। একবার পড়ে গিয়ে কালশিটে নিয়ে, কাদা মেখে ঘরে ফিরেছিল। একটু বড় হতে, আমিও চাপাচাপি করতাম, যাতে আমাকেও নিয়ে যায়। কিন্তু বাবা বলেছিল ফুটবল মাঠে মেয়েরা যায়না। মনের কষ্ট মনেই চেপে রাখতাম। না ঠিক মনে নয়, ততদিনে আমি ডায়েরি লেখা ধরেছি, তাই ডায়েরিতে লিখে সেটা লুকিয়ে রাখতাম। একবার জার্মানি থেকে বখুম বলে একটা দল এসেছিল ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে খেলতে। আমার পরিবার মোহনবাগানী হলেও কখনও চাইনি ঐ খেলায় ইস্টবেঙ্গল হেরে যাক। কিন্ত পোড়া কপাল ইস্টবেঙ্গল সেদিন ৬ -০ হেরে যায়। পরেরদিন আমার মামা এসে বলে, জানিস, ভোরবেলা অফিস যাচ্ছি, দেখি ভাস্কর গাঙ্গুলি যাচ্ছে। একদম মুখোমুখি পড়ে গেছি। আর চেপে রাখতে পারিনি। কাল ছটা গোল খেয়েছে, দুকথা পাশ দিয়ে শুনিয়ে দিয়েছি। ১৯৮৭ তে মিরিকে প্রশ্ন লুঠ হয়ে, আমাদের মাধ্যমিক পরীক্ষা পিছিয়ে গিয়েছিল। আর ঐ বছরে মাধ্যমিক দিয়েছিল তারকা সাঁতারু বুলা চৌধুরী। সেবার বাংলা ভাষা পরীক্ষায় চৈতন্য দেবের পাঁচশো বছর ইত্যাদি রচনা ইমপর্ট‍্যান্ট ছিল। কিন্তু মাধ‍্যমিকে এসেছে দেখি তোমার দেখা একটি খেলা। অন্য কি এসেছে আর দেখিনি। বখুমের খেলা রিলে শোনার পর, কেন বাংলার দল এভাবে হারবে, এই সব জ্বালাময়ী বক্তব্য দিয়ে একটা অনুপুঙ্ক্ষ বর্ণনা ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলাম। ঐ খেলাটাই যেন দেখেছি, এভাবে পরীক্ষার খাতায় ঝেড়ে দিলাম। নিবেদিতা ইস্কুলের সন্ন‍্যাসিনী দিদিরা জানতে পেরে তো অজ্ঞান হবার যোগাড়। বার বার বলতে লাগলেন, তুমি খেলার রচনা লিখেছ? কেন এ ভুল করলে, খেলা নিয়ে কি জানো তুমি। মূল‍্যবান নম্বর হারালে। একথা ঠিক খেলা নিয়ে বেশি জানা বোঝার সুযোগ হল কই? শুধু মোহনবাগান কিসের আদর্শ, কেন সে আমার পূর্ব পুরুষের যখের ধন, সেই সন্ধানটুকু সম্বল করেই তো আমার পথ চলা। আসলে ঐ রচনা লেখাটা ছিল, সমাজ যে সুযোগ আমাকে দেয়নি, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ইস্কুলের দিদিরা তো আমার এই সাধনার কথা জানতেন না। ভয় হওয়াটাই স্বাভাবিক। শুধু আমার মা শুনে হেসেছিল। কারণ পৃথিবীতে ঐ একজনই আমার সব লেখালেখি আর পেপার কাটিংয়ের সম্ভারের কথা জানতো। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যাই করে থাক, খেলার দেবী বা মোহনবাগানের দেবতা বিমুখ করেননি। মাধ‍্যমিকের ফল বেরোতে দেখলাম, না বাংলায় নম্বর কমেনি, পশ্চিম বঙ্গে আমার র‍্যাঙ্ক ৩৫, আর ইস্কুলের মধ্যে প্রথম। সব ঠিকঠাকই চলছিল। গোল বাধল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরে। ঐ সময়ে অমল দত্ত আবার মোহনবাগানের কোচিং করাতে এলেন। এলেন ভালো কথা, এসেই ইস্টবেঙ্গলের বাইচুংকে চুংচুং, শোশোকে শসা বলা শুরু করলেন। আমার বন্ধুদের ভিতর দুই দল মেয়ের মধ্যে লড়াই বাধার উপক্রম হল। এমনিতে আনন্দ বাজার মাঝেমাঝেই নামের বানান বদলে দেয়। সবাই লিখছে গাভাস্কার। আনন্দ বাজার লিখছে গাওস্কর। সঙ্গে আবার পদবীটি গাঁও থেকে এসেছে ইত্যাদি ব‍্যাখ‍্যা। আমাদের যখন বাইচুং বলে অভ‍্যেস হয়ে গেছে, তখন আনন্দ বাজার শুরু করল ভাইচুং। ছোটবেলা থেকে শুকতারায় অনিল ভৌমিকের হীরের পাহাড়, সোনার ঘন্টা, রূপোর নদী এইসব গল্প পড়ে বড় হয়েছি। সেই গল্পের নায়ক ছিল ভাইকিংদের রাজার মন্ত্রীর ছেলে ফ্রান্সিস। ভাইচুং শুনলে সেই ভাইকিংদের কথা মনে পড়ে। এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। তা বলে চুংচুং? খেলার আগে বিপক্ষকে এভাবে অপমান করা কি ভালো? আমি সাবধানে আমার কট্টর মোহনবাগানী মামার কাছে এই কথা বলতে গেলাম। কারণ এই অপমান আবার মোহনবাগানের দিকে উল্টে যাবে না তো! মামা আমাকে অবাক করে অট্টহাসি হেসে উঠল। বলল, আরে পাগলি ও সব কোচের স্ট্র‍্যাটেজি। নেহেরু কাপ, বিশ্বকাপ এসবের স্বাদ পেয়ে লোকের কাছে ইস্ট – মোহনের আবেদন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। অমলদা যে হাইপ তুলেছে, আবার দেখবি মাঠ ভরে যাবে। মামার ব‍্যাখ‍্যা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হল। তাহলে তো অমল দত্ত ভালো কাজই করেছেন। ইস্ট মোহনের আবেদন তো ফিকে হতে দেওয়া যায়না। মোহনবাগান আমার পূর্ব পুরুষের আশা আর স্বপ্নের যখের ধন। আমি নিজেও তার সৈনিক। কিন্তু পূর্ব পুরুষের সঙ্গে সংযোগটা কি? ততদিনে আমি একটু বড় হয়ে গেছি। আনন্দবাজার খুঁটিয়ে পড়ি। অন্য পত্র পত্রিকা যা পাই, মায় ঠোঙা পর্যন্ত গিলে খাই। ১৯১১ এ খালি পায়ে গোরা সাহেবদের হারানোর গল্প জেনে গেছি। স্বাধীনতার আগে মোহনবাগানের আরও কাপ, টুর্নামেন্টে জয়ের খবরও জেনেছি। প্রথম দিকে মোহনবাগানের আদর্শের সঙ্গে ঘটি বাঙালের কোনো সম্পর্ক ছিলনা। ১৮৮৯ সালে মানে মোহনবাগানের প্রতিষ্ঠাকালে, যখন বিবেকানন্দের বয়স মাত্র ছাব্বিশ বছর, তখন বাংলায় এসব কনসেপ্ট আসা সম্ভবও নয়। ১৯১১ এর দলের অনেক খেলোয়াড় পূর্ব বঙ্গীয় ছিলেন।  ওই আবেগটা দেশভাগের পরে আরোপিত, একথাও জেনেছি। মোহনবাগান কেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই আর জাতীয়তার প্রতীক, তা একটু একটু বুঝতে শুরু করেছি। এমনকি ভবানীপুরের উত্তম কুমার আর পাবনার সুচিত্রা সেনের কালজয়ী বন্ধনের পিছনে ঐ ঘটি বাঙাল আবেগের ইন্ধন আছে, এসব জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও পড়েছি। কিন্তু পূর্বপুরুষের ব‍্যাপারটা স্পষ্ট হলো আরও পরে।

মায়ের কাছে কীর্তি মিত্তিরের বাড়ির গল্প শুনতাম, সেনবাড়ির গল্প শুনতাম। এও শুনেছিলাম বোসেরা, সেনেরা আর মিত্রেরা মিলে মোহনবাগান তৈরি করেছে। মায়েরা ছোটোবেলায় বাগবাজারে থাকত। মামারা সকলে বাগবাজারী শৈলীতে লুচিকে নুচি, লেবুকে নেবু, ঘড়িতে দেড়টাকে ডেড্ডা বলতো। মুষলধারে বৃষ্টিকে উপঝ্ঝান্তে বৃষ্টি বলা হত। জানিনা কী শব্দ থেকে কথাটা এসেছে। আর সেনেদের বাড়ি উচ্চারণে হত স‍্যানেদের বাড়ি।  দিনরাত দাঁতি দা, মাল দা, বাচি দা, ভাউ দার গল্প হতো। মা বলতো, জানিস সবাই মোহনবাগানের। আর মায়ের পূর্বপুরুষেরা মানে বোসেরা মোহনবাগানের তৈরির সময়ে মোটা অনুদান দিয়েছিল। শ‍্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় পেরিয়ে, মনীন্দ্র কলেজের লাগোয়া গলি দিয়ে শ‍্যাম পার্কের পাশ দিয়ে, আমি, মা আর বোন ভূপেন বোস এভিনিউ এ পড়তাম। বলরাম মন্দির, বোরোলীন হাউস আর গিরিশ ঘোষের বাড়ির পাশে নিবেদিতা লেন। সেই গলিতে আমাদের ইস্কুল। ফেরার পথে সেনবাড়িতে যেতাম মাঝে মাঝে।

পরিণত বয়সে যখন আমার কম্পিউটার হল, অন্তর্জাল সংযোগ হল, আর সবচেয়ে বড় কথা লকডাউনে গৃহবন্দী হলাম, মনপ্রাণ দিয়ে আমার অনুসন্ধান শুরু করলাম। মানে টুকরো স্মৃতি, টুকরো কথা, কিছু পাঠ সূঁচ সুতো দিয়ে জুড়তে শুরু করলাম। শোভাবাজারের রাজা রাধাকান্ত দেব তাঁর পালক পিতা গোপীমোহন দেবের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ফড়িয়াপুকুরে এক বিরাট বাগান পেয়েছিলেন। সেই বাগানই মোহনবাগান, যা কিনে নেন প্রখ্যাত পাট ব‍্যবসায়ী কীর্তি মিত্র এবং মোহনবাগান ভিলা নামে এক বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করে  সেখানে বসবাস শুরু করেন। এই মোহনবাগান ভিলার লাগোয়া মাঠে খেলা ছেলেদের নিয়ে নতুন দল গঠন করা হয়। সেই দলই আজকের “এ.টি.কে. মোহনবাগান”। রাধাকান্তের তৃতীয়া কন্যার স্বামী মহেশচন্দ্র বোস রাজবাড়িতেই ঘরজামাই হয়ে সংসার পাতেন। মহেশের পুত্র শরৎচন্দ্র বসু ইংরেজদের সঙ্গে বস্ত্র ঊপকরণ রপ্তানি এবং বস্ত্র ও কাগজ আমদানির ব‍্যবসা করতেন। তাঁর স্ত্রী কুমুদিনী বসু লেখিকা, সমাজসেবী, সম্পাদিকা, স্বাধীনতা সংগ্রামী, ভগিনী নিবেদিতার সহযোগী। শরৎ – কুমুদিনীর কনিষ্ঠ পুত্র আমার মাতামহ। এই দম্পতির পাঁচ পুত্র, তিনকন‍্যা। জ‍্যেষ্ঠা লীলার বিবাহ হয় বাগবাজারের সেন পরিবারের অন‍্যতম প্রতিষ্ঠাতা ভবনাথ সেনের পুত্র শ্রীশচন্দ্র সেনের সঙ্গে আর কনিষ্ঠা ইন্দিরার বিবাহ হয় প্রখ‍্যাত পাট ব‍্যবসায়ী কীর্তি মিত্রের পৌত্র রবীন মিত্রের সঙ্গে। ভবনাথ সেন ইংরেজদের কাছ থেকে ধাপা লিজ নিয়ে, জঞ্জালের ওপরে ফসল ফলাতে সফল হন। আজ যে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি কলকাতার কিডনি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, তার সূত্রপাত ভবনাথ সেনের হাত ধরে। ভবনাথ সেনের দাদা ব্রহ্মনাথ সেন ছিলেন আইনজ্ঞ। তাঁর পুত্র মণিলাল সেনের সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল আর এক খ‍্যাতনামা আইনজীবী ভূপেন্দ্রনাথ বসুর কন্যা নীরোদবালার। রামরতন বসু ও দয়াময়ী দেবীর পুত্র ভূপেন্দ্রনাথ পরে আইন সভার সদস্য, জাতীয় কংগ্রেসের নেতা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। আইন ব‍্যবসার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন নিখাদ ক্রীড়াপ্রেমী। মণিলাল সেন মোহনবাগানের ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটো দলেরই প্রথম অধিনায়ক। বাংলায় তিনি প্রথম রাউন্ড দ‍্য আর্ম বোলিং শুরু করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি নামকরা অ্যাটর্নি হন। মণিলাল – নীরোদবালার পুত্র দীনবন্ধু সেন বা দাঁতি সেন। মণিলাল সেনের খুড়তুতো ভাই ভবনাথ সেনের এক পুত্র হেমচন্দ্র সেনও মোহনবাগানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। দাঁতি সেন আমার মাতামহের বিবাহের সম্বন্ধ করেন তাঁর শ‍্যালিকার সঙ্গে। দাঁতি সেনের স্ত্রী চিকিৎসক আর জি করের ভাই রাধামাধব করের দৌহিত্রী। আর আমার মাতামহী হলেন আর জি করের ছোটো ভাই রাধাকিশোর করের দৌহিত্রী এবং ধীরেন্দ্রনাথ ঘোষের কন্যা। সেন পরিবার খেলাধূলায় খুবই উৎসাহী ছিল। দাঁতি সেন পরিণত বয়সে খ‍্যাতনামা অ্যাটর্নি হন। কিন্তু প্রথম জীবনে তিনি মোহনবাগানের খেলোয়াড় এবং পরবর্তীতে কর্মকর্তা। স্বাধীনতার পরে বেশ কিছু বছর তিনি মোহনবাগানের সহসভাপতি ছিলেন। এই দলে সেন পরিবারের অবদান শুধু ফুটবলে নয়, ক্রিকেট, হকি এবং টেনিস সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। মণিলালের আর এক পুত্র কানাই সেন ওরফে রবীন্দ্রনাথ সেনও ফুটবল এবং ক্রিকেট দুটি দলেরই অধিনায়ক হয়েছিলেন। এঁদের এক ভাই সত‍্যেন্দ্রনাথ সেন বা মাল সেন মোহনবাগানে টেনিস বিভাগের প্রবর্তন করেন এবং ঐ বিভাগের সচিব ছিলেন। শুনেছি ছায়াছবির প্রয়োজনে উত্তম কুমার তাঁর কাছে টেনিসের কৃৎকৌশল শিখতে এসেছিলেন। উত্তম কুমার আমার কাহিনীতে বারবার ফিরে আসেন। তবে সেটা শরৎ – কুমুদিনীর মেজমেয়ের মানে আমার মেজপিসিদিদার বাড়ির গল্প। এখন তো বড় আর ছোটো পিসিদিদার বাড়ির গল্প বলছি। আসলে আমার পরিবারের ইতিহাস তো আর বাংলার ইতিহাস থেকে আলাদা কিছু নয়। যাক সে কথা। সেনবাড়িতে ফিরে আসি। যাঁদের কথা বললাম, তাঁরা ছাড়াও ছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র সেন বা কেষ্ট সেন, খগেন্দ্রনাথ সেন বা মন্টু সেন, মন্টু সেনের দাদা দীপেন সেন। এঁরা প্রত‍্যেকেই খেলোয়াড় এবং সংগঠক হিসেবে মোহনবাগানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর একজনের কথা না বললেই নয়। সম্পর্কে তিনি মায়ের পিস্তুত দাদাদের জেঠতুত দাদা, মায়ের পিসেমশাই শ্রীশচন্দ্রের দাদা প্রিয়নাথ সেনের পুত্র। যৌথ পরিবার তো। দাদাদের তুতো দাদারাও নিজের দাদার মতো। তিনি ভাউ সেন বা জিতেন্দ্রনাথ সেন। ভাউমামাও দীর্ঘদিন মোহনবাগানের সহ সভাপতি ছিলেন। মা ভাউদা বলতে অজ্ঞান ছিল। মা লেখাপড়ায় ভালো, দেখতে সুশ্রী, পুতুল পুতুল। সেনবাড়িতে মায়ের খুবই আদর ছিল। ও বাড়িতে মায়ের স্নেহের নাম ছিল রাজকুমারী। আসল নাম কেউ মনে রাখেনি। 

কীর্তি মিত্রের পুত্র প্রিয়নাথ মিত্রও  খেলা নিয়েই বেশি মেতে থাকতেন। প্রিয়নাথের তিন পুত্র। তার মধ্যে কনিষ্ঠ রবীন মায়ের ছোটো পিসেমশাই। তিনি পারিবারিক কারবার দেখাশোনা করতেন। বাকিরা হলেন শিশিল মিত্র এবং মলয় মিত্র। মা ডাকতেন শিলি কাকা আর মন্টি কাকা। শিলি দাদুও আইনজ্ঞ। তাঁর কন‍্যা দীপ্তির সঙ্গে বিবাহ হয় মায়ের বড় পিসির ছেলে বাচি সেনের। মন্টি দাদু অবিবাহিত ছিলেন। দীপ্তি মামীমার মাকে আমার মা ডাকত পেনি খুড়িমা বলে। তাঁর বিবাহ পূর্ব নাম অম্বালিকা দত্ত। আর এই মামীমা যেহেতু মিত্র বাড়ির সূত্রে আমার মাসি, মা এবং মামারা ওনাকে খুকুদি বলে ডাকত। বাচি সেনের বড়দা নমে সেনের স্ত্রী রেখা সেন ছিলেন এন্টালির দেব বাড়ির মেয়ে। ঐ বংশের প্রথিতযশা কন্যা নবনীতা দেবসেন। মায়ের বড় পিসির আর এক পুত্র হুঁকুজ সেনের বিবাহ হয় চিকিৎসক আর জি করের আর এক ভাই রাধারমণ করের দৌহিত্রী এবং জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসুর কন্যা পূরবীর সঙ্গে।  রাধাগোবিন্দ কর বা আর জি কর নিজে নিঃসন্তান ছিলেন। যদিও এইসব প্রজাপতি নির্বন্ধ ঘটেছিল, মোহনবাগানের জন্মের পরে। বোস, সেন আর মিত্র পরিবারের নেতৃত্বে মোহনবাগানের জন্ম হয়। এঁদের সঙ্গে লতায় পাতায় ছিল কর এবং দেব পরিবার। এমনিতেই প্রভাবশালী কায়স্থদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মোহনবাগানের জন্মের পরে দেখছি এই পরিবার তিনটি বৈবাহিক প্রজাপতির পাখায় পাখায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী প্রজন্মের এই বাড়তি বন্ধুত্ব বা ভরসা হয়তো তৈরি হয়েছিল এই মোহনবাগান আবেগকে কেন্দ্র করে। আমি ভাবি, যেহেতু আমার মাতামহীও আর জি করের নাতনি এবং দাদু দিদার বিয়ের ঘটকালি করলেন দাঁতি সেন, তার মানে আমার এই অস্তিত্বটা মনে হয় মোহনবাগানের কাছে ঋণী।

বাংলায় ফুটবলের জনক নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারীও শোভাবাজার রাজবাড়ি মানে দেববংশের জামাই, যাঁকে দেখে স্বামী বিবেকানন্দের ফুটবলের প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল। ১৮৮৯ সালে ভূপেন বসুর বাড়িতে যখন মোহনবাগানের জন্মমূহূর্তের সভা বসে, ভূপেন্দ্রনাথ তখন  তিরিশ বছরের যুবক। বয়সে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের থেকে দু বছরের আর স্বামী বিবেকানন্দের থেকে চার বছরের বড়। কলকাতা হাইকোর্টের নথি বলছে, বছরখানেক বিবেকানন্দ মানে নরেন্দ্রনাথ দত্ত এবং ভূপেন্দ্রনাথ বসু দুজনে নিমাইচরণ বসুর এজলাসে আর্টিকেল ক্লার্ক হিসেবে কাজ করতেন। সময়টা সম্ভবত ১৮৮১। নিমাইচরণ বসু সেযুগের একজন মহানুভব ব‍্যক্তিত্ব। জ্ঞানেন্দ্রনাথ কুমারের বংশপরিচয় ষষ্ঠ খন্ডে তাঁর কথা পড়লাম। নরেন্দ্রের বাবা বিশ্বনাথ দত্ত ও নামী অ্যাটর্নি ছিলেন।  ১৮৮০ তে নরেন্দ্রনাথ কেশব সেনের ব্রাহ্ম সমাজে যোগ দেন এবং ধর্মালোচনা ও ব্রহ্মসঙ্গীতের সুবাদে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়। তবে ১৮৮১ সালে শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবার পরে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। এজলাসে আইনের কাজ শেখাতেও অনিয়মিত হয়ে পড়েন। তবে লেখাপড়া চলছিল, ১৮৮৪ সালে যে বছর তিনি বি এ পাশ করলেন, ঐ বছরই বাবা বিশ্বনাথ দত্তের তিরোধান হয়। তবে আজন্ম খেলাধূলা প্রিয় বিবেকানন্দ যে ফুটবল ভোলেননি, তার পরিচয় পাওয়া যায় সাধন জীবনে বিভিন্ন বক্তৃতায়। ১৮৮৯ তে যখন মোহনবাগানের জন্ম হয়, বিবেকানন্দ তখন দেশকে চিনতে ভারত পরিভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছেন। একথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে জাগে, ১৮৯৭ তে কলকাতায় ফেরার পরে নিশ্চয়ই এই দলের কথা তাঁর গোচরে আসে। ১৮৯৩ এ বম্বে থেকে তিনি শিকাগো ধর্ম মহাসভায় যান এবং বিশ্বজয় করেন। ১৮৯৮ সালে বিনয়কৃষ্ণ দেবের সভাপতিত্বে শোভাবাজার রাজবাড়িতে তাঁকে যখন সংবর্ধনা দেওয়া হয়, সেই বক্তৃতাতেও তিনি ফুটবলের উল্লেখ করেছিলেন।
এছাড়া কলকাতার এই কুলীন পরিবার গুলির মধ্যে যেহেতু অন্দরে বাহিরে লেখাপড়ার চর্চা ছিল, কোনো না কোনো সদস্যের হাত ধরে ব্রাহ্ম সমাজ সংস্কারক ভাবনা গুলি ঢুকে পড়েছিল। শোভাবাজার রাজবাড়িতে আমার মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনী ব্রাহ্ম পরিবারের কন্যা ছিলেন। তাঁর কবিতা ও উপন‍্যাসের বইগুলিতে প্রকাশ কালের জায়গায় ব্রাহ্ম সম্বৎ ছাপা আছে। কুমুদিনী ঋষি রাজনারায়ণ বসুর নাতনি। রাজনারায়ণের আত্মচরিতে লেখা আছে, তিনি রাধাকান্ত দেবের দৌহিত্রকে ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। সমাজ রাধাকান্ত দেবের সতীদাহের পক্ষে আর বিধবা বিবাহের বিপক্ষে দাঁড়ানোটাই বেশি করে মনে রেখেছে। তাঁর শব্দকল্পদ্রুম, স্কুল কলেজ স্থাপনগুলি মনে রাখেনি। একথাও মনে রাখেনি যে রামমোহনের পরিবারেও সতীদাহ হয়েছে, দেব পরিবারে একটিও হয়নি। যাকগে ঐ রাজবাড়ির কথা এখানে উঠছে, কারণ ওখানে শোভাবাজার ফুটবল ক্লাব স্থাপিত হয়েছিল এবং সাহেবদের বিরুদ্ধে খেলে নামডাক ও হয়েছিল। অন্তর্জালে লেখা আছে, ধনাঢ্য ব‍্যক্তিরা ব্রিটিশ আমোদের অঙ্গ হিসেবে ফুটবলের প্রতি আগ্রহী হয়ে পড়েন। তবে মোহনবাগানের জন্মটা কেবল বৃটিশ আমোদের অনুকরণ একথা আমার সত্যি বলে মনে হয়না, কারণ ভূপেন বোস ও সেন পরিবারের উপস্থিতি। সেন পরিবার অত্যন্ত সংস্কৃতিমনস্ক এবং মানবিক। গত দেড়শো বছরে, কোনদিনই ঐ পরিবার বিরাট কোনো ব‍্যয়বাহুল‍্য করেনি, আবার ভয়ঙ্কর আর্থিক দুর্দশাতেও পড়েনি, যেটা কীর্তি মিত্রের পরিবারে হয়েছে। এই যাদুবলে আজও ঐ পরিবার তাদের যৌথ বাড়িতে বাস করছে এবং মণিলাল সেনের পৌত্র, দাঁতি সেনের পুত্র প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি ও রাজ‍্যপাল শ‍্যামল সেনের মতো বংশের কৃতি সন্তানেরা বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছেন‌। পারিবারিক শ্রুতিতে জেনেছি যে আমার মায়ের ঠাকুরদা শরৎচন্দ্র বোস ও মোহনবাগানের জন্মে যুক্ত ছিলেন এবং অর্থসাহায্য করেছিলেন। হয়তো এমন আরো মানুষ আছেন। মোহনবাগানের প্রথম কমিটিতে তাঁদের নাম নথিভুক্ত নয় বলে মোহনবাগানের ইতিহাস থেকে তাঁরা আজ হারিয়ে গেছেন। আমার মনে হয়, প্রধান পরিবারগুলি তাঁদের জীবিকার জন্য ইংরেজ সরকারের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। তাই সরাসরি বিরোধিতা করা সম্ভব ছিলনা।  যদিও এর ব‍্যতিক্রম ভূপেন বোস। বঙ্গভঙ্গের পর প্রথম সঞ্জীবনী পত্রিকায় স্বদেশী ও বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন ব্রাহ্ম নেতা কৃষ্ণকুমার মিত্র। তিনি আমার মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনীর বাবা, রাজনারায়ণ বসুর জামাই, অরবিন্দ ঘোষের মেশোমশাই। ভূপেন বোস সরাসরি বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। কুমুদিনী শোভাবাজার রাজবাড়িতে বসেই কলম দিয়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে আগুন ঝরিয়েছেন। এতে অবশ‍্যই স্বামী শরৎচন্দ্রের পূর্ণ সমর্থন ছিল, নইলে তাঁর পক্ষে এসব কাজ সম্ভব ছিলনা। আরও একটা বিষয় আমাকে খুবই অবাক করেছে। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময়ে কৃষ্ণকুমারের কারাদন্ড হয়। তিনি আগ্রা ফোর্টে বন্দী হন। অথচ একই পথের পথিক কন্যা কুমুদিনীর গায়ে পুলিশের আঁচ লাগেনা কেন? শ্বশুরবাড়ি মানে শোভাবাজার রাজবাড়ি এবং বাকি ক্ষমতাবান পরিবারগুলির অক্ষ বা জোট কি তাঁর নিরাপত্তার ঢাল হয়ে দাঁড়ায়? দেড়শ বছর পরে ইতিহাস পুনর্গঠন খুবই কঠিন। অনেক সময়েই অনুমানের ভিত্তিতে তথ্য হাতড়াতে হয়। যদিও ১৮৮৯ সালে মোহনবাগানের জন্মের সময়ে তিনি নববধূ, কোলে সদ‍্যজাত জ‍্যেষ্ঠপুত্র সতীশ চন্দ্র। তবে পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ প্রমাণ করে মোহনবাগানের জন্মকালে জাতীয়তাবাদের ক্ষেত্র প্রস্তুত ছিল। এরপরেও সেকালে লেখাপড়া জানা কলেজের গন্ডিতে  পৌঁছনো মানুষজনের ওপরে ছিল ডিরোজিওর প্রভাব। এইসব কারণে আমার মনে হয় লেখাপড়া, ডিরোজিও এবং ব্রাহ্ম সংস্কারের সান্নিধ্যে এসে এই পরিবারগুলির মনে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হয়। সেই আবেগ ফুটবল দলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হতে থাকে, যা পূর্ণতা পায় ১৯১১ সালে, খেলার মাঠে ইংরেজকে হারিয়ে। 
মায়ের কথাগুলো মনে পড়ে – মোহনবাগান একটা আদর্শ, আমাদের পূর্বপুরুষদের অনেক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে গড়া যখের ধন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক, আমাদের অস্তিত্ব। মোহনবাগানের হারজিত, আর আমাদের জেতা হারা এক। সেদিন না বুঝলেও, এবারে একটু একটু বুঝতে পারছি।

বিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে আমার মাতামহের পরিবার, আর ছোটোপিসিদিদার পরিবারে শনির দশা শুরু হয়। ১৯২১ এ আমার বড়দাদু মানে শরৎ – কুমুদিনীর জ‍্যেষ্ঠপুত্র সতীশচন্দ্রের  তেত্রিশ বছর বয়সে স্প‍্যানিশ ফ্লুতে অকস্মাৎ মৃত্যু থেকে এই বিপর্যয়ের শুরু। এর পর পুত্র শোকে শরতের মৃত্যু এবং আমার সেজদাদু সুরেন্দ্রনাথের অপঘাত মৃত্যু পরিবারটিকে দিশেহারা করে দেয়। স্বামী শরতের মৃত্যু কুমুদিনীর মাথা থেকে শোভাবাজার রাজবাড়ির ছায়া কিছুটা হলেও সরিয়ে দেয়, নাকি মুক্তি দেয়। কারণ রাজবাড়ির বিধবা ভাতা নামক মোটা মাসোহারা গ্রহণ করতে তিনি অস্বীকার করেছিলেন। কুমুদিনী স্বাধীন ভাবে ছোটোজামাইয়ের বাড়ির কাছে ফড়িয়াপুকুরে বাড়ি কিনে বসবাস শুরু করেন। পারিবারিক জীবনের বাইরে ততদিনে তিনি কামিনী রায়, লেডি অবলা বসুর সহযোগিতায় তৈরি করেছেন বঙ্গীয় নারী সমাজ। কামিনী রায় সভানেত্রী। আলোকপ্রাপ্ত ঐ মেয়েদের দল তখন নারীদের ভোটাধিকারের জন্য ইংরেজ সরকারের সঙ্গে লড়ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের অবসান হয়না। মৃত্যু মিছিল চলতে থাকে। পুত্রবধূ সতীশ জায়া প্রতিমার মৃত্যু, সতীশের জ‍্যেষ্ঠ পুত্র মুকুল চন্দ্রের কৈশোরে অকাল মৃত্যু কুমুদিনীর মতো যোদ্ধাকে অন্তরে ক্ষইয়ে দেয়। খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে কনিষ্ঠ পুত্র বিকাশচন্দ্রের বিবাহ দিয়েছিলেন। সেই বধূ ভারতীরও একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়ে মৃত্যু হয়। এই অবস্থায় খবর আসে ছোটো জামাই রবীন মিত্রের পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে অকাল মৃত্যু ঘটেছে। রবীনের বাবা প্রিয়নাথ মিত্র ব‍্যবসা বিষয়ে ছেলের ওপরে খুবই ভরসা করতেন। কারণ অন্য পুত্রদের একজন আইনজীবী। একজন ছোটোখাটো জীবনবীমা জাতীয় কাজে ব‍্যস্ত থাকতেন।  রবীনের মৃত্যুর পরে কীর্তি মিত্রের ব‍্যবসার সাম্রাজ্য ধসে পড়ে। পাওনাদারেরা ছেঁকে ধরে এবং তারাই মোহনবাগান ভিলা নীলামে তুলে দেয়। শেষে ভূপেন বসু এবং নিমাইচরণ বসু ঐ সম্পত্তি কিনে নেন। রবীন মিত্রের এক পুত্র অশোক এবং এক কন্যা বিবি। কন‍্যাটি অ্যাপেন্ডিসাইটিসের বিষক্রিয়ায় বালিকা বেলায় মারা যায়। সব মিলিয়ে প্রিয়নাথ খুবই ভেঙে পড়েন। মোহনবাগান ভিলার একপাশে একটি ছোটো বাড়ি ছিল। ওখানে অফিস ছিল, খেলোয়াড়েরা চুক্তি পত্রে সই করতো, দরকার হলে থাকতো। সেই বাড়িতেই প্রিয়নাথ থাকতে শুরু করেন। শেষ জীবন তিনি ওখানেই অতিবাহিত করেন। শিলি দাদু বাকিদের নিয়ে বিডন স্ট্রিটের একটি বাড়িতে উঠে আসেন। ছোটো পিসিদিদা ওখানেই থাকতেন। দুটি পরিবারের এই বিপর্যয়ে মোহনবাগানের আকাশেও মেঘ জমে ওঠে। বৃহৎ সেন পরিবার এই বিপর্যয় কাটাতে তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করে। মোহনবাগান আগেই লাহাবাবুদের মাঠ ছেড়ে সেনবাড়ির লাগোয়া শ‍্যাম স্কোয়ারে উঠে এসেছিল। শুনেছি ঐ মাঠ প্রতিষ্ঠায় শোভাবাজার রাজবাড়ির কিছু ভূমিকা ছিল। এরপর সেনবাড়ি অর্থাৎ ৪৪ নং রামকান্ত বোস স্ট্রিট হয়ে ওঠে মোহনবাগানের তৃতীয় অফিস। একদিকে ঐ বংশের ছেলেরা খেলা, সংগঠন, প্রশাসন সবেতে জড়িয়ে পড়েন, অন্য দিকে বড়জামাই শ্রীশচন্দ্র ওরফে ভূতনাথ সেন বা ভূতি বাবু কুমুদিনী কে তাঁর পরিবার সমেত নিজের আওতায় নিয়ে আসেন। পরিবারটি সেনবাড়ি লাগোয়া দাঁতি সেনের একটি বাড়িতে ভাড়ায় উঠে আসে। কুমুদিনী তখন কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলর। ঐসময়েই দাঁতি সেন নিজের শ‍্যালিকা লাবণ‍্যপ্রভার সঙ্গে কুমুদিনী পুত্র বিকাশ চন্দ্রের পুনর্বিবাহ দিয়ে সংসারটা আবার বসিয়ে দেন। বিকাশ – লাবণ্য আমার মায়ের বাবা মা। বিকাশের প্রথম পক্ষের স্ত্রী ভারতীর পুত্র বিমানচন্দ্র তখন শিশু। দাঁতি সেনের বাড়িতেই আমার মামা সুজিতচন্দ্র, মা কৃষ্ণা (রাজকুমারী), দুই মাসি কাবেরী ও সুরভির জন্ম হয়। মোহনবাগান হারলেই মরে যাবে, যে বলতো, সে হল আবার মাসি কাবেরী। বিকাশচন্দ্রের পাঁচ সন্তান সেন বাড়ির ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বড় হতে থাকে। এই কারণেই তাদের জগৎটা মোহনবাগানময় হয়ে যায়। আমার সেজদাদুকে হাটখোলার দত্ত পরিবারে দত্তক নেওয়া হয়েছিল। সেই সূত্রে ওটা আমার আর এক দাদুর বাড়ি। সেজদাদু যখন মারা যান, দিদা তখন কিশোরী, কোলে সদ‍্যজাত কন্যা। তিনিও এই সেনবাড়িকেই ভরসা মনে করতেন। একদিকে এই পরিবার মোহনবাগানকে বাঁচিয়ে যেমন বাংলার ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে, তেমনি জ্ঞাতিদের শত্রু না মনে করে, আপন করেছে। দত্ত, মিত্র, বোস সবাইকে বিপদের দিনে মানসিক আশ্রয় দিয়েছে। এই সুকৃতির ফলও এই বংশ পেয়েছে। বাকিরা যে যার মতো ছিটকে পড়লেও, আজও বাগবাজারের সেনেদের যৌথ পরিবারের মহিমা অক্ষুন্ন আছে। আমি ঠিক জানিনা, বাংলার আর কোন পরিবারের এতজন কর্তা ডাকনামে সুপরিচিত কিনা। কলকাতা হাইকোর্টের নথিতে দীনবন্ধু সেন ব্র‍্যাকেটে দাঁতি লেখা দেখে আমি তো তাজ্জব। এখন ঐ পরিবারের লোকসংখ্যা বেড়ে গেছে। অনেকেই অন‍্যত্র বাসস্থান ক্রয় করতে বাধ্য হয়েছেন। তবু আমি চাই ঐ সেনবাড়ি যেন স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে থাকে।

পাকেচক্রে আমার বিয়ে হল পূর্ব মেদিনীপুরে। পরিবারটি বাসুদেবপুর রাজার দেওয়ান বংশ। পাকেচক্রে শব্দটি ব‍্যবহার করলাম, কারণ আমাদের চার চোখ এক হল ওয়েটল‍্যান্ড ম‍্যানেজমেন্টে চাকরি করতে গিয়ে। ছোটবেলা থেকে মায়ের কাছে ধাপার সব্জি আসার গল্প শুনতাম। কলকাতার জঞ্জাল নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষার কাহিনী শুনতাম। আমি পড়লাম ভূগোল। আর কর্তা পড়লেন ভূতত্ব। বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের পাঁচতলা আর একতলা। সমকালে পড়াশোনা করলেও দুজনে দুজনকে চিনতাম না। নিয়তি দুজনকেই চাকরি দিল ঐ এলাকার গবেষণা নিয়ে গঠিত সরকারি অফিসে। শ‍্যামল সেন শুনে হাসছিলেন, শেষ পর্যন্ত ওয়েটল‍্যান্ডেই বরের সঙ্গে আলাপ হল! আমি বললাম, হ‍্যাঁ। আমার শ্বশুরবাড়ির পরিবার ইংরেজ আমলে বহু অত‍্যাচার সহ‍্য করেছে।  ইংরেজদের বিরুদ্ধে মেদিনীপুরের আন্দোলনের উত্তাল সময়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য তৈজসপত্র সমেত সর্বস্ব পুলিশ লুঠ করে, এবং বাকি তছনছ করে পুরোনো জমিদার বাড়িটিতে অগ্নিসংযোগ করে। বিয়ের পর পুরোনো একটি মাত্র কাঠের আলমারি দেখেছি, সেকালের স্মৃতি, তার গায়ে শাবলের কোপের দাগ। আমার শ্বশুরমশায়ের বাবা তারিনীপ্রসাদ বক্সি (দাসমহাপাত্র) জমিদার হলেও গান্ধীবাদী সমাজ সংস্কারক। ইংরেজ আমলে অনশন ও কারাবরণ করেন। যদিও স্বাধীনতার পর স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি পেনশন তিনি গ্রহণ করেননি। এলাকায় শিক্ষা বিস্তার এবং নারী শিক্ষায় এই পরিবারের বিরাট ভূমিকা আছে। ওখানকার একমাত্র বালিকা বিদ্যালয়টি আমার শ্বশুর বাড়িতে শাশুড়ির তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছিল। বয়েজ এবং গার্লস স্কুল দুটি এখন সরকার অধিগৃহীত এবং আয়তনে বিশাল হয়ে উঠেছে। এই পরিবারটিও বংশ পরম্পরায় মোহনবাগানী। আমি হাসি মোহনবাগানের সঙ্গে আদর্শের যোগ আছে, মায়ের এই কথাটা মোটেই ভুল নয়। বিয়ের পরে কর্তার মোহনবাগান পাগলামি দেখে তো আমি অবাক। তাঁর কাছে খেলা সংক্রান্ত অজস্র গল্পের ঝুলি আছে। একবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে আসন সংখ্যা বেশি বলে, সদস্য কার্ডে দুজন করে খেলা দেখতে যাবার অনুমতি পাওয়া গেল। ওয়েটল‍্যান্ডের এক বিজ্ঞানী ইস্টবেঙ্গল সদস্য। তাঁর সময় নেই, তাই অফিস থেকে আমার কর্তা সঙ্গে আর একজন কর্মী খেলা দেখতে গেলেন। ইস্ট – মোহন ডার্বি। এই ডার্বি শব্দটা কিন্তু ছোটোবেলায় জানতাম না। পরে এর প্রচলন হয়। বিজ্ঞানী প্রবর পই পই করে সাবধান করে দিয়েছিলেন, দেখিস বাবা, ইস্টবেঙ্গলের কার্ড। বুকে ছুরি বিঁধলেও ইস্টবেঙ্গল গোল দিলে খুব নাচবি। নতুবা লাইফ রিস্ক হয়ে গেলে আমি বাঁচাতে পারবো না। সে যাত্রা খুব অভিনয় করে কর্তা বেঁচে গেলেন। এই গল্প আমার বাবা শুনে নিজের কাহিনী শোনাল, যা বহু বছর গোপন করে রেখেছিল। বাবা চাকরি করত পোর্ট ট্রাস্টের হেড অফিসে। সেখান থেকে ইডেনে খেলা দেখতে গিয়েছিল। গল্প একই। সহকর্মীর থেকে ইস্টবেঙ্গল গ‍্যালারির পাশ নিয়ে গেছে, এমন নেশা। চেষ্টা করেও মোহনবাগান গ‍্যালারির পাশ যোগাড় করতে পারেনি। খেলা চলছে। সাবধানে চেপেচুপে বসেছিল। হঠাৎ মোহনবাগান গোল মিস করাতে অজান্তে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে, ইশশ। ব‍্যাস, আর যায় কোথা। গ‍্যালারিতে রব উঠল, ওরে ছারপোকা ঢুকেছে। বাবাকে মেরে ধরে গ‍্যালারির নিচে ফেলে দিল। হায় ভগবান। ছোটোবেলায় বাবা একবার কালশিটে নিয়ে কাদা মেখে বাড়ি ফিরেছিল, আর বলেছিল পড়ে গেছি। তার মানে ঐ দিনই খেলা দেখার নেশায় মাঠে গিয়ে, বাবা ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের হাতে মার খেয়েছিল। কর্তা শুনে বললেন, কমন ব‍্যাপার। ওনার কাছেই শুনেছি ময়দানে ঘোড়পুলিশ তাড়া করলেই পাঁই পাঁই করে দৌড়ে পিচ রাস্তায় উঠে যেতে হয়। কারণ পুলিশের ঘোড়া পিচ রাস্তায় হেঁটে হেঁটে যায়, দৌড়োয়না। আর গ‍্যালারিতে মারপিট লাগলে পুলিশ যখন ঠ‍্যাঙাতে ঠ‍্যাঙাতে ওপর দিকে ওঠে, তখন খুব কায়দা করে একপাশে সরে, সুড়ুৎ করে গ‍্যালারির ফাঁক গলে নিচে ঝাঁপ দিতে হয়। মোহনবাগান মাঠের তিন দিকে গ‍্যালারি, এক দিক ফাঁকা। কাঁটাতারের বেড়া আছে। সুযোগ বুঝে হাওয়া হয়ে যেতে হয়। মাঠের ভিতর বলের লড়াই, আর মাঠের বাইরে পুলিশের ঘা এড়ানোর লড়াই হল আসল মজা। একবার কর্তার আশুতোষ কলেজের এক সিনিয়র দাদা কলেজে এল লেংচে লেংচে। প্ল‍্যান ছিল, তার ডাক্তার বাবা চেম্বার থেকে এসে খেলা দেখবেন। ছেলে যাবে কলেজ কেটে। বাবার মোহনবাগান সদস্য কার্ড ছিল। বাবা কার্ড দেখিয়ে মাঠে ঢুকে গেলেন। প্ল‍্যান মাফিক কার্ডটি গ‍্যালারির ওপর থেকে পিছন দিকে ফেলে দিলেন। ছেলে ঠিক জায়গা মতো দাঁড়িয়ে ছিল। সেও ঐ কার্ড দেখিয়েই ঢুকে যাবে। কার্ডটা নিচু হয়ে যখন কুড়োচ্ছে, হাঁটুর পিছনে পড়ল পুলিশের সপাং লাঠি। অতঃপর চার হাত পা তুলে পতন, পুলিশ কর্তৃক সদস্য কার্ড বাজেয়াপ্ত করণ এবং পরে বাবা কর্তৃক বিস্তর ফোনাফুনি পূর্বক কার্ড উদ্ধার করণ। একবার কর্তা সায়েন্স কলেজ কেটে ইস্ট – মোহন খেলা দেখতে গেছে। টিকিট পায়নি। র‍্যামপার্টের নালার ওপাশ থেকে দাঁড়িয়ে খেলা দেখবে। দর্শকদের একটা বড় দল এল। তার মধ্যে কয়েকজনের মাথায় বা কোমরে বেশ ভালো ভালো গামছা বাঁধা। বাকিদের গামছা নেই। গামছা বাঁধারা হম্বিতম্বি করে টিকিট দেখিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল। গামছা না বাঁধারা বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আসল খেলা শুরু হল এর পরে। মাঠে বল দৌড়তে শুরু করে দিয়েছে। র‍্যামপার্টের কোনায় গ‍্যালারির যে কর্নার আছে, তার পিছন থেকে নেমে এল গিঁট বাঁধা গামছার লম্বা দড়ি। এবারে টারজানের ডাকের মতো একটা তীক্ষ্ণ ডাক শোনা গেল হ – রি – ই – ই – ই। অমনি হরি এসে গামছা ধরে ঝুলে পড়ল। গ‍্যালারির মাথা থেকে চার পাঁচ জন তাকে হেঁইও হেঁইও করে তুলছে। বোঝা গেল ওয়ান বাই ওয়ান দলের বাকি সকলকেই তুলে নেওয়া হবে।  র‍্যামপার্টের নালার ওপাশের দর্শক মাঠের ভিতরে বাইরে দুটো খেলাই প্রচন্ড মনোযোগ দিয়ে দেখছে।    কিছুদূর উঠে হঠাৎ হরি পপাত চ। ব‍্যাপার কি? আসলে ঘোড়ায় বসা উঁচু পুলিশ দৌড়ে এসে হরিকে সপাং সপাং দিয়ে দিয়েছে। হরি গোল খেয়ে, মাটিতে পড়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। এবারে তড়িৎ গতিতে হরি পুলিশের ঘোড়ার মুখের লোহার জালটা মুচড়ে দিয়ে কি যে করল ভালো বোঝা গেলনা। ঘোড়াটা মাটিতে পড়ে গেছে। ঘোড় পুলিশ ছিটকে পড়েছে। গোল শোধ। পুলিশ হেরে যেতে, নালার ওপাশ আর গ‍্যালারির মাথা থেকে চটর পটর হাততালির আওয়াজ ভেসে আসছে। আরও কয়েকজন ঘোড়পুলিশ টগবগিয়ে আসছে। তারা আসার আগেই হরির বন্ধুরা হরিকে টেনে তুলে নিয়েছে। কিন্তু বাকি পুলিশদের জন্য, গামছা বাহিনীর বাকি বন্ধুদের আর খেলা দেখা হলনা। তার পোঁ পাঁ দৌড় দিয়ে পিচ রাস্তায় উঠে গেল। এখন কর্তার দায়িত্ব, বয়স দুই ই বেড়েছে। তাই খেলা দেখতে যাওয়া আর হয়না। আমার ইস্টবেঙ্গল গ‍্যালারিতে মার খাওয়া বাবা, মোহনবাগানের হারজিতকে নিজের হারজিত ভাবা মা, মোহনবাগান বিষয়ে কট্টরপন্থী মামারা সকলেই পৃথিবী থেকে ছুটি নিয়েছেন। স্মৃতির ঝাঁপিটা নিয়ে আমি বসে আছি মোহনবাগানের মেয়ে। এই নাম দিয়ে সত্যি সত্যি একটা বাংলা সিনেমা হয়েছিল। মজার ছবি। আমরা সকলে মিলে দেখতে গিয়েছিলাম। বেশি কিছু মনে নেই। রবি ঘোষ একটা ঠেলা করে ঢিল পাটকেল বিক্রি করছিলেন, যাতে মারপিটের সময়ে সকলের হাতে অস্ত্র থাকে। বাবার কোলে বসে ধন‍্যি মেয়েও দেখেছি। আসলে মেয়েরা ফুটবল খেলার অনুষঙ্গে এলে সমাজে সেটা একটা হাসির ব‍্যাপার হয়। তাই দুটো সিনেমাই খুব হাসির। ফুটবল নিয়ে সাহেব সিনেমাটা সিরিয়াস, কারণ ওটা ছেলেদের ছবি, নাম ভূমিকায় ছেলে আছে। এখন আমাদের বাড়িতে রেডিও নেই। মোবাইলে এফ এম শোনা যায়। আমার ছোটবেলার জবাব দেওয়া, চাপড় মেরে মেরে চালানো রেডিওটার কথা মনে পড়ে। জীবনে অন্তত একবার মাঠে বসে খেলা দেখতে যেতে ইচ্ছে করে। জানি এই বয়সে সেটা আর কোনদিনই সম্ভব নয়। জানিনা আমার মতো প্রমীলা সমর্থক, যারা মাঠে গিয়ে গলা ফাটাতে পারেনা, তাদের কোনো মূল্য সত‍্যিকারের মোহনবাগানের কাছে আছে কিনা।  

মামার বাড়ি ও উত্তম সুচিত্রা

ড. শারদা মন্ডল

আমার মায়ের মেজপিসি মানে আমার মেজ পিসি দিদার বিয়ে হয়েছিল হাটখোলা দত্তদের এক শরীক শোভারাম দত্তের ছেলের সঙ্গে। শোভারাম দত্তও বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু ওনারা হলেন বিডন স্ট্রিটের দত্ত। ওনাদের বাড়ি ছিল এখন যেটা রবীন্দ্র  কানন বা বিডন স্কোয়ার,  ঠিক তার উল্টো দিকের বাড়িটা। এখনো কলকাতার ইহুদি মার্কেট মানে কলেজ স্ট্রিট এর বড়ো বাটার পিছনে যে দোকান গুলো রয়েছে সেগুলোর মালিকানা  ওনাদের। তাছাড়া কলেজ স্ট্রিট এবং রবীন্দ্র সরণীর মার্কেটের ভিতর কিছু দোকান, বাড়ির মালিকানা ও  আছে।  কলকাতায় ওনাদের বেশ কিছু বাড়িতে অনেক অফিস ভাড়ায় আছে। ছোটপিসি দিদার একটি মাত্র ছেলে। তার নাম  প্রতুলচন্দ্র দত্ত। আমার মামাদের সঙ্গেও ওনার ভালোই যোগাযোগ ছিল। আমার ছোটোমামা সুজিতচন্দ্র অভিনয় ও লেখালেখি করতেন, ওবাড়িতে সাহিত্য সভা হত। সেখানে উনি যোগ দিতেন।  চিত্র পরিচালক সলিল দত্ত ঐ বাড়ির  ছেলে।

উত্তম কুমারের ত্রিযামা, আর খোকাবাবুর প্রত‍্যাবর্তন ছবিতে অ্যাসিস্ট‍্যান্ট ডিরেক্টর এবং স্ক্রিন রাইটার হিসেবে তিনি ফিল্মে কেরিয়ার শুরু করেছিলেন। তবে পরিচালক হিসেবে তাঁর স্বাধীন ভাবে তৈরি করা প্রথম ছবি হল সূর্য শিখা।  উত্তম সুপ্রিয়া জুটির ঐ ছবি ১৯৬৩ তে হিট হবার পরে চিত্র পরিচালক হিসেবে ওঁর খ‍্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। উত্তম কুমারের প্রথম দিকের ছবি মোমের আলো, কলঙ্কিত নায়ক এও তিনি পরিচালক, আবার আমাদের বুক ভাঙা শেষ ছবি ওগো বধূ সুন্দরীতেও ক‍্যামরার পিছনে তিনি। উত্তম – সৌমিত্র দুই প্রতিস্পর্ধী নায়ককে নিয়ে করেছেন স্ত্রী, আবার সৌমিত্র – সন্ধ্যা জুটিকে নিয়ে করেছেন প্রস্তর স্বাক্ষর। মোট বাইশটি বাংলা চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন উনি।  আমার ছোটোমামা সুজিতচন্দ্র ষাটের দশকে টালিগঞ্জের ফিল্ম স্টুডিওতে অ্যাসিস্ট‍্যান্ট ডিরেক্টরের কাজ করতেন। মামা ১৯৬৭ তে মুক্তিপ্রাপ্ত মিস প্রিয়ংবদাতে শেষ কাজ করেন। তারপরে তিনি কাশীপুর গান সেল ফ‍্যাক্টরিতে চাকরি পেয়ে যান। সেই কাজের সূত্রে মামা প্রায়ই ঐ বিডন স্ট্রিটের দত্ত বাড়িতে যাতায়াত করতেন। তবে চাকরির পরে স্টুডিওর কাজ ছাড়লেও মামা নিয়মিত অফিসের পরে যাত্রা করতেন।

ঐতিহাসিক যাত্রা পালায় আমার ছোট মামা সুজিত চন্দ্র বসু

মামার দল ছিল অনামী যাত্রা ইউনিট। বিশ্বরূপা থিয়েটার হলে মামার যাত্রাপালা দেখেছি হ‍্যানিম‍্যান। সারকারিনায় দেখেছি কালকেউটের বিষ। এছাড়া খুব জনপ্রিয় হয়েছিল লালকুঠি।

লালকুঠি যাত্রা পালায় পাগলের ভূমিকায় আমার ছোট মামা, সংলাপ ছিল, ‘নিরূপমাকে আমি খুন করিনি’।

হ‍্যানিম‍্যান পালা হোমিওপ্যাথির জনকের জীবনী নিয়ে তৈরি। সেখানে হ‍্যানিম‍্যানের মেয়ে এমিলির চরিত্রে অভিনয় করতো দুটি মেয়ে। একজন বড় বয়সের, একজন ছোটো বয়সের। ছোটো এমিলি করতো সাহেব মামা বা নীলোৎপল দের মেয়ে। মামা আমাকে ছোটোবেলায় বলেছিলেন আমাকে দিয়ে ছোট এমিলির চরিত্র করাবেন। সে অবশ্য আর হয়ে ওঠেনি। তবে আমার আক্ষেপ থেকে গেছে। কালকেউটের বিষে মামা একাই তিনটি ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। প্রথমজন অ্যাটাচি নিয়ে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ, একটা সংলাপ মনে পড়ে, “শুধু নুন জলেই যদি হত গলা পরিষ্কার, ট‍্যাবলেট, সিরাপ, ডিসপিরিনের হতো না আবিষ্কার” – আসলে যাত্রার আগে মামা বাড়িতে এইসব সংলাপ মহড়া দিত। আর আমার মুখস্থ হয়ে যেত।  আমি ও নিজের ঘরে, নিজের মতো যাত্রা করতাম। দ্বিতীয় চরিত্র মনে হয় সার্কাসের জোকার তৃতীয় জন চানাচুর ওয়ালা যে নেচে গেয়ে চানাচুর বিক্রি করে। ঐ যাত্রায় মামাকে নাচতে দেখেছি।

কাল কেউটের বিষ যাত্রা পালায় চানাচুর ওয়ালার ভূমিকায় আমার ছোট মামা, এই চানাচুর খেলে জীবনের সর্ব কষ্ট দূর হবে এমন বেশ কিছু চার লাইনের ছড়া ছিল সংলাপে

পুলিশ অফিসার নীলোৎপল দে ঐ দলে যাত্রা করতেন। ওনার ডাকনাম ছিল সাহেব। ওনাকে সুপ্রিয়া চৌধুরীর সিস্টার সিনেমায় পুলিশ অফিসারের ভূমিকায় দেখেছি। ওটা ছাড়াও উনি বহু বাংলা ছবিতে পুলিশ সেজেছেন। এমনকি সত‍্যজিতের একমাত্র ব‍্যোমকেশ – ছবি চিড়িয়াখানায় সেজেছিলেন ইনস্পেক্টর বরাট।

চিড়িয়াখানা ছায়াছবিতে ইন্সপেক্টর বরাটের ভূমিকায় নীলোৎপল দে

মামা পুজোতে যাত্রা পালার দল নিয়ে কয়েকবার বম্বে গিয়েছিল। প্রথমবার গিয়ে বম্বে থেকে মামা সকলের জন্য কিছু না কিছু এনেছিল। আমার জন্য এনেছিল আপেল বীজের লম্বা মালা। ওটা ছিল আমার কাছে মুক্তোমালার সমান। তখনকার দিনে আকাশ বাণী কলকাতা ক-এ সন্ধ‍্যে ছটা আটত্রিশ মিনিটে যাত্রা সম্প্রচার হতো। বেশ কয়েকবার মামার অভিনীত যাত্রাপালা সম্প্রচারিত হয়েছিল। আমরা শুনেছি। বিডন স্ট্রিটের ঐ দত্ত বাড়িতে একটি সাহিত্য সভা ছিল। কিন্তু সে সভা সলিল দত্তই চালু করেছিলেন কিনা সেটা নিশ্চিত জানিনা, তবে মামা সুজিতচন্দ্র ঐ সাহিত‍্য সভার সদস্য ছিলেন। শুধু যে ঐ দত্ত বাড়িতেই সভা বসত, তা নয়, বিভিন্ন জেলায় জেলায় নানা জায়গায় হত। মামা এসে এসে গল্প করত। সাহিত্য আর অভিনয় চর্চা বোস বাড়ির রক্তে। ঐ সাহিত্য সভার দুজন বয়স‍্যর সঙ্গে মিলে মামা একটি ছড়ার বই প্রকাশ করেছিল – ছড়া দিলুম ছড়িয়ে।

মামার কাছে মঞ্চ আর সিনেমার প্রযুক্তির খুঁটিনাটি শিখেছি আমি। আমার মাসিরা সবসময়ে উত্তম কুমারের শ‍্যুটিং দেখতে যেতে চাইতো। কিন্তু মামা বারণ করত। বলত যে সাদা কালো ছবির মেকআপ বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে অবাস্তব মনে হয়।কাজল পরা, ঠোঁটে লিপস্টিক দেওয়া উত্তম কুমারকে সামনে থেকে দেখলে স্বপ্ন ভঙ্গ নিশ্চিত। ওসব করা হয় সাদা কালো পর্দায় স্পষ্ট দেখানোর জন্য। ১৯৮৬ সালে মারাদোনার স্বপ্ন মাখা বিশ্বকাপ শুরুর আগে আমার বাবা বাড়িতে একটা বারো ইঞ্চি ফিলিপস টিভি কিনে এনেছিল। মামা একটা চারটে পায়া ওলা দরজা খোলা টিভি কিনেছিল টেলেরামা সুপ্রিম। ঐ দুটো টিভি ছিল আমার শিক্ষার মাধ্যম। আজকে কোভিড ১৯ অতিমারীতে ছেলেমেয়েরা টিভিতে, ফোনে, কম্পিউটারে ক্লাস করছে। চার দশক আগেই টিভি থেকে আমার শিক্ষা শুরু হয়েছে। যখন হাঁ করে নায়ক নায়িকার দিকে তাকিয়ে থাকতাম, মামা বলে দিত, পাশে সহ অভিনেতার অভিব‍্যক্তি দেখ। সাথীহারা সিনেমায় নায়িকা মালা সিনহা যখন বাঁদরের খেলা দেখান, তখন মামা বলে দেয়, এই দেখ এখন শুধু মালা সিনহার মুখে ক‍্যামেরা। স্টুডিওতে রাস্তা সাজিয়ে গান গাওয়ার দৃশ্য তোলা হয়েছে। আসল রাস্তায় বাঁদর খেলা যেখানে হচ্ছে, সেখানে নায়িকা নেই, নিপুণ ভাবে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। বেশি জানার অসুবিধেও কম নয়। মায়ামৃগ ছবিতে বিশ্বজিত আর সন্ধ্যা রায় যখন গাড়ি নিয়ে কলকাতার রাস্তায় ঘুরে বেড়ান আর বিশ্বজিত মেটেরিয়া মেডিকার কাব‍্য গেয়ে ওঠেন, তখন কি ভালোই না লাগে। যেদিন জানলাম স্টুডিওর অচল গাড়িতে বসে ওঁরা অভিনয় করছেন, পিছন থেকে স্টুডিও কর্মীরা হেঁইও হেঁইও করে গাড়িটাকে  দোলাচ্ছে, আর পাশ থেকে রাস্তার দৃশ্য গতিশীল করে গাড়িটা চলমান দেখানো হচ্ছে সেদিনই ভালোলাগা মাঠে মারা গেল। তখন শনিবার সন্ধ‍্যেয় একটি বাংলা ছবি,  রবিবার ইউ জি সি র ওপেন ক্লাসের পর আঞ্চলিক ছবি, আর রবিবার সন্ধ‍্যেয় হিন্দি ছবির সম্প্রচার হত। ইউ জি সির ক্লাসগুলো খুব ভালো লাগত আমার। ওর দর্শক বাড়িতে আমি একাই ছিলাম। বেশ কিছু অসামান্য আঞ্চলিক ছবি দেখেছি। কৃষ্ণের বেশে এন টি রামা রাওয়ের ভ্রূভঙ্গি দেখে আমি প্রচন্ড অবাক হয়েছিলাম। একমাত্র ক্লাসিকাল নৃত্যশিল্পীরাই অমন পারেন। শনিবারের বাংলা ছবি শুরু হওয়ার আগে পরিবারের সকলে মিলে গুছিয়ে বসা হত। প্রায় প্রতিটা সিনেমার আগে বড়রা একটা ইনট্রোডাকশন দিয়ে দিত যে ছবিটিতে কি কি খেয়াল করতে হবে। যেমন বেশ মনে পড়ে সুচিত্রা সেনের শ্রাবণসন্ধ‍্যার কথা। মা পাখি পড়া করিয়ে দিয়েছিল, ঐ ছবির প্রথমদিকে দেখবি সুচিত্রা সেন রোগা, খুব অল্প বয়স, শুধু বড় বড় করে তাকাচ্ছে। আর পরিবর্তনটা বুঝতে হবে, সিনেমার মাঝামাঝি সময়ে, যখন সাদা (হালকা রঙের) শাড়ি পরা রোগা সুচিত্রা সেন দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাবে আর ঘরে ঢুকবে কালো (গাঢ় রঙের) শাড়ি পরা পরিণত দোহারা সুচিত্রা সেন। বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সুচিত্রা যখন কাঁদবে, তখন আগের অপরিণত অভিব‍্যক্তি আর কান্নার পরিণত অভিব‍্যক্তির তফাৎ বুঝতে হবে। আবার শেষে শমিত ভঞ্জ যখন দিদি দিদি করে সংলাপ বলছে, ওপাশে সুচিত্রা সেন নেই, ডেট পাওয়া যায়নি। ও ছবি কুড়ি বছর আগে শুরু হয়েছিল, আর রিলিজ করেছে অনেক পরে। মেন পয়েন্টগুলো খেয়াল করার সময়ে গল্প করা যাবেনা, বাথরুমেও যাওয়া যাবেনা। শ্রাবণ সন্ধ্যার গল্পের নির্যাসটা ভুলে গেছি। কিন্তু যা যা খেয়াল করানো হয়েছিল, সেগুলো দিব‍্যি পষ্টো দেখতে পাচ্ছি। আজ এত বছর পরে অন্তর্জাল খুলে দেখলাম, ১৯৫২ সালে শ‍্যুটিং শুরু হয়েছিল শেষ কোথায় ছায়াছবির। তখন মুক্তি পায়নি। সেই ছবি কেটে জুড়ে ১৯৭৪  সালে মানে বাইশ বছর পরে শ্রাবণসন্ধ‍্যা নাম নিয়ে মুক্তি পায়। দীপ জ্বেলে যাই ছায়াছবিতে মানসিক ভাবে অসুস্থ চরিত্র দেবাশিসকে নার্স সুচিত্রা ভালোবাসার অভিনয় করে ভালো করে তোলেন, কিন্তু অভিনয় করতে গিয়ে নিজেই ভালোবেসে মানসিক ভারসাম্য হারান। ঐ ছবিতে দেবাশিসের মুখ দেখানো হয়নি। পিছন থেকে বা ছায়া দেখানো হয়েছিল। আমার স্কুলের বন্ধু অঞ্জনার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল দেবাশিস আসলে উত্তম কুমার। কিন্তু মা আমাকে বলে দিয়েছিল, ঐ ছায়া পরিচালক অসিত সেনের।

ছায়াছবি দীপ জ্বেলে যাই, এই রাত তোমার আমার গানের দৃশ্যে অসিত সেন

সলিল দত্ত থেকে অসিত সেন, মায় সত‍্যজিত পর্যন্ত রূপ বা কন্ঠস্বর পরিচালকদেরও কিছু কম ছিলনা। কিন্তু অঞ্জনাকে আমি বিশ্বাস করাতে পারিনি। ওর যুক্তি ছিল সুচিত্রা যাকে ভালোবাসে, সে উত্তম কুমার ছাড়া আর কেউ হতে পারেনা। মুখ দেখায়নি বলে, শিল্পী তালিকায় নাম নেই। অবশ্য এতে অবাক হবার কিছুই নেই। সেই ছোটবেলা থেকেই তো আমরা ছড়া জানতাম,
পেন পেন পেন।
সিঁড়ি দিয়ে নামছেন সুচিত্রা সেন।
সুচিত্রা সুচিত্রা তোমার ব‍্যাগে কী?
“উত্তম খাবে বলে পরোটা এনেছি।”

অসিত সেন ১৯৬৯ সালে দীপ জ্বেলে যাই চলচ্চিত্রটি হিন্দি ভাষায় খামোশি নামে পুনর্নির্মাণ করেন। জীবনতৃষ্ণা ছায়াছবিতে ভূপেন হাজারিকার কন্ঠে একটি আবহসঙ্গীত ছিল – বিখ্যাত গান, সাগরসঙ্গমে সাঁতার কেটেছি কত। ঐ গানটি দ্বিতীয় বার আছে যেখানে উত্তম কুমার ওয়াশরুমে ফ্রেশ হচ্ছেন আর গুনগুনিয়ে ঐ গানটিই গাইছেন। ছবি দেখতে বসার আগেই মামা আমাকে সাবধান করে দিয়েছিল, দেখবি উত্তম কুমারের লিপে ভূপেন হাজারিকার গানটা কি অড।

ছায়াছবির পোস্টার, এ ছবির সঙ্গীত পরিচালক ভূপেন হাজারিকা

না না ভূপেন হাজারিকার ওপরে কারোর বিরূপ ভাব ছিলনা, বরং শ্রদ্ধা ছিল।  আসলে উত্তম-হেমন্ত, উত্তম-শ‍্যামল, উত্তম-মান্না, পরের দিকে উত্তম-কিশোরকুমার শোনা আমার মামার বাড়ির কানগুলো উত্তম-ভূপেন হাজারিকা যুগলবন্দীটা মেনে নিতে পারেনি। একবার শুধু একটি বছর দেখতে বসেছি সকলে মিলে। অমন শেখানোর গুণে আমার চোখে একটা জিনিস ধরা পড়ে গেল। উত্তম কুমার পাহাড়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছেন। গাড়ি হেয়ার পিন বাঁক ঘুরছে, অথচ স্টিয়ারিং সে অনুপাতে ঘুরছেনা। যে রবিবারে ছোটি সি মুলাকাত দেখানো হল, সেদিন বাড়িতে তুমুল আলোচনা শুরু হল, বম্বেতে (তখনও মিডিয়া বলিউড শব্দ সৃষ্টি করেনি) উত্তম কুমার কে লস খাওয়ানোর জন্য কে কিভাবে অসহযোগিতা করেছিল। এই নিয়ে কিছুদিন চলল। আমি ও পরিষ্কার দেখলাম উত্তম কুমার বৈজয়ন্তীমালার পাশে নাচে ফেল। আর সেটা ঢাকতে নাচের সময়ে উত্তমের মুখের উপর ক‍্যামেরা, তবে সেই ভুবন ভোলানো হাসিও আড়ষ্ট। বাংলা অগ্নি পরীক্ষা দেখেছিলাম। ইস্কুলের লাইব্রেরিতে অগ্নি পরীক্ষা পড়েওছিলাম। বয়ঃসন্ধিতে সেই পাঠ মনে ঝড় তুলেছিল, বাংলা ছবিটা ঐ উপন‍্যাসের পুরোটা না হলেও পাশে রাখা যায়, তবে ঐ গল্পে ছোটি সি মুলাকাত পাতে দেবার যোগ্য মনে হয়নি। আজ মধ‍্যবয়সে কন্যাকে নিয়ে ঐ ছবি দেখতে বসি। চল্লিশের উত্তমকে দেখে ছোটোবেলার সমালোচক মন পিছিয়ে যায়। পঞ্চাশের আমি বড় মায়া অনুভব করি। ঐ মুখের ওপরে মামার বাড়ির ছায়া ভাসে।  মেয়েকেও এসব গল্প শোনাতে যাই। মেয়ে বিরক্ত হয়ে বলে, চুপ করোতো মা। বেশি বকবক করলে মোবাইলে হৃতিক রোশন নিয়ে বসে যাব। চুপ করে যাই। মনে মনে লাবণ্য, কৃষ্ণা, শারদা, মানে দিদা, মা আর আমি এক দোলনায় দুলি। উত্তম ম‍্যাজিক চতুর্থ প্রজন্মে কাজ করেনা, মনে হয় কারণটা প্রযুক্তি গত।  এখানে একটা কথা আছে। আমাদের বাড়িতে যদিও অভিনয় কলা নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা সবসময়েই চলতো, তবু নবকল্লোল বা পরে আনন্দলোকের মতো সিনেমা পত্রিকার কোনো প্রবেশাধিকার ছিলনা। বড়দের ধারণা ছিল, ওসব পড়লে আমরা মানে আমি আর বোন খারাপ হয়ে যাব। বাড়িতে প্রথম আনন্দলোক ঢোকে, উত্তমকুমার মারা যাওয়ার পরে, খবর জানার জন্য। ঐ প্রথম আর ঐ শেষ। আমাদের কলকাতায় টেলিভিশন আসে ১৯৭৫ সালে। তার আগে তুমুল আলোচনা শুনছিলাম, সাহেবরা ঘরে বসে সিনেমা দেখে। এবার আমাদের দেশেও এমন হবে। ঐ বছরে মানে চার বছর বয়সে আমি বাগবাজার মাল্টিপারপাস স্কুলে কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হই। আমার প্রথম মঞ্চাভিনয় ঐ স্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠানে সমাজবন্ধু নাটকে। ওখানে আমি আর ক্লাসমেট সৈকত হয়েছিলাম ছুতোর মিস্ত্রি। আমি মঞ্চে প্রথম ঢুকেছি, পিছনে সৈকত। বেরোনোর সময়ে ও আগে বেরোবে, পিছনে আমি। গান হয়ে যাচ্ছে। এদিকে সৈকত বেরোয়না। শেষে আমি এক হাতে নেচে নেচে অন্যহাতে সৈকতকে ধরে বার করলাম। অভিভাবকে পূর্ণ রঙ্গনা প্রেক্ষাগৃহ অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল। মায়ের কাছে গল্প শুনে মামা আমাকে কোলে নিয়ে ধেই ধেই করে নাচতে শুরু করল, আর বলছিল, দেখ খুকু, তোর মেয়ে কেমন স্টেজ ফ্রি। কোন মামার ভাগ্নি দেখতে হবে তো। আর আমাকে বলছিল, ওরে তোর আগের চার পুরুষ অভিনয় করেছে, তুই তো পারবি। তোর দিদার দাদু আর জি কর ডাক্তার হলেও নামকরা মঞ্চাভিনেতা, তোর নিজের দাদু মঞ্চে রামকৃষ্ণ করেছে, সিনেমা করেছে। আমি যাত্রা করি। তোর মধ্যে রক্ত কথা বলছে। মামা আমাকে অভিনয় ও শিখিয়েছে। ক্লাস ওয়ানে আমি নিবেদিতা ইস্কুলে ভর্তি হই। মা তখন ওখানেই প্রাথমিক বিভাগের শিক্ষিকা। নিয়তি কেন বাধ‍্যতে। আমার নিয়তি টেনে নিয়ে গেল সেই ইস্কুলে যেখানে চার পুরুষ আগে আমার মায়ের ঠাকুমা কুমুদিনী বসু ভগিনী নিবেদিতার সহযোগী হয়েছিলেন। ক্লাস টেনে বার্ষিক অনুষ্ঠানে স্কুলে গৈরিক পতাকা নাটকে আমি হয়েছিলাম শিবাজীর গুরু সন্ন‍্যাসী রামদাস স্বামী। সেখানে স্কুলের দিদি ভজনের সময়ে আমাকে লিপ দেওয়ার যে ডিরেকশন দিয়েছিলেন, মামার সেটা শুনে পছন্দ হয়নি। শুধরে দিয়ে কি করতে হবে শিখিয়ে দিয়েছিল। আমি চুপচাপ ড্রেস রিহার্সালের দিন সেটাই করলাম। মানে ঐ নতুন অভিব‍্যক্তিটা দেখালাম। সবাই তো আপ্লুত। তাছাড়া ড্রেস রিহার্সালের দিন আমাকে বাঙালিদের মতো করে গেরুয়া ধুতি পরানো হয়েছিল। মামা জেনে বলল যে মারাঠি সাধু ওভাবে ধুতি পরবেনা। ধুতি দুভাঁজ করে সামনে বড় কুঁচি দিয়ে লুঙ্গির মতো করে পরতে হবে। ফাইনাল স্টেজের দিন আমি কারোর কাছে না গিয়ে ওভাবেই ধুতি পরেছিলাম। যাই হোক নাটক ভালো ভাবেই উৎরে গিয়েছিল। প্রাইজও পেয়েছিলাম। আজ মাও নেই, মামাও নেই। শুধু স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে। আমি আমার দাদুকে চোখে দেখিনি। কিন্তু একটি সিনেমায় দেখেছি। ১৯৫৪ সালে রিলিজ করেছিল পশুপতি চ‍্যাটার্জির পরিচালনায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে ষোড়শী। জমিদার জীবানন্দের ভূমিকায় ছিলেন ছবি বিশ্বাস। আর নাম ভূমিকায় দীপ্তি রায়। সেই ছায়াছবি আমার ছোটবেলায় মানে যতদূর মনে পড়ছে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮০ র মধ্যে কোনো সময়ে লেকটাউনের জয়া সিনেমা হলে দেখেছি আমি। পরিবারের সকলে মিলে দেখতে গিয়েছিলাম। প্রায় পুরো ছায়াছবি জুড়ে আমার দাদুকে দেখেছি ছবি বিশ্বাসের পাশে পাশে গ্রামের কর্তাব্যক্তির ভূমিকায়। ছ, সাত বছর বয়সে দেখেছি। বাকি সিনেমা খুব একটা মনে নেই। শুধু বিকাশচন্দ্রের মুখ, দরাজ হাসিটি মনের পটে আঁকা হয়ে আছে। সালটা ১৯৮০ র আগে। কারণ প্রমথেশ বড়ুয়ার মুক্তি থেকে অসিতবরণের মায়ার সংসার সবই উত্তম কুমারের মৃত্যুর আগে হলে আসত। তার পরে আর আসতনা। ১৯৮০ সালে উত্তম কুমারের মৃত্যুর সময়ে আমি ক্লাস ফোরে পড়ি। রেডিওতে সব বাড়িতে উত্তমের শেষ যাত্রায় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের ধারাবিবরণী গম গম করে বাজছিল। আর বাড়িতে লোডশেডিংয়ের মধ্যে মা, মাসিদের সঙ্গে আমি হাউ হাউ করে কাঁদছি – এটা আজও মনে পড়ে। এই জন্য ২০১৯ সালে মহালয়া সিনেমার শেষ দৃশ্যে ও আমার চোখে জল এসে গিয়েছিল। শৈশবের স্মৃতি মনে পড়ে গিয়েছিল। ১৯৭৬ সালে মহিষাসুরমর্দিনীর বদলে দুর্গা দুর্গতি নাশিনীর সম্প্রচার ও মনে পড়ে। মানে গান আর ভাষ‍্য নয়, দিনের আলো বেড়ে উঠতে বাড়িতে বাড়িতে জানলা দিয়ে উচ্চস্বরে পরস্পর উষ্মা প্রকাশ আর নিন্দার বাজার বসে গিয়েছিল। সঠিক সময়ে রান্না হয়নি সেদিন, দেরি হয়ে গিয়েছিল। হাসির স্মৃতি ও আছে। সুচিত্রার কোলে উত্তমের মাথা, তন্ময় হয়ে দেখছি, তুমি যে আমার, ছবি হারানো সুর। পাশ থেকে কানে এল, পিছনের চাঁদ আর ফুলগাছটা আসল নয়, পর্দায় আঁকা। এতো ভারি মুশকিল। এরকম করলে হয়? এ তো রসভঙ্গ। পরে অনেক বাংলা ছবি দেখতে গিয়ে চোখ পিটপিট ক‍রেছি। পর্দাটা যেন চেনাচেনা। আবার এটাও মনে পড়ে ধনরাজ তামাং ছবিতে উত্তম কুমারকে চাবুক মারা হচ্ছে দেখে আমি আর বোন উচ্চৈস্বরে সিনেমা হলে বসে কাঁদছি। পরে হাতিবাগান ঘুরে চাচার হোটেলে শিককাবাব খেয়ে বাড়ি এসে শুনলাম, আমার মাসি প্রথম দৃশ্য থেকেই ফোঁপাচ্ছিল। কারণ প্রথম দৃশ্যে উত্তম কুমারের হাতে হাতকড়া ছিল। আজ বসে বসে এসব কথা মনে করে পেটে খিল ধরে যাচ্ছে।

ছোটবেলা থেকে আমি বিভিন্ন লোককে নকল করতে পারতাম। তবে বন্ধুরা সবচেয়ে পছন্দ করতো যখন আমি সুচিত্রা সেনের নকল করতাম। আমার সবচেয়ে প্রিয় ছিল উত্তর ফাল্গুনীর সংলাপ – মনীশ আমার ঘর চাই, তোমাকে চাই, আমার সূপর্ণাকে বুকের পাশটিতে চাই। আমার এম এস সির এক বন্ধু অশোক বলতো, কেন ভূগোল নিয়ে সায়েন্স কলেজের দেওয়ালে মাথা কুটছিস। তোর জায়গা মঞ্চে। ওখানে যা। বুড়ো বয়সে একবার কন্যাকে নিয়ে সায়েন্স কলেজে রি ইউনিয়নে গিয়েছিলাম। বন্ধুদের নজর আমার ওপর পড়তেই তারা হৈ হৈ করে উঠল। ওরে বাবা আমাদের ছুছিত্রা সেন এসে গেছে রে। নে কোনো কথা নয় শুরু কর, মনীশ – শুরু কর, শুরু কর, জলদি। মেয়ে চুপ করে শুনছিল। বাড়িতে এসে ফেটে পড়ল, মা! তুমি তোমার বন্ধুদের সুচিত্রা সেন? আর আমাকে কোনদিন বলোনি? আমি হাসি, বলবো কাকে? শুনতে চেয়েছে কেউ? শোনার লোক নেই, তাই লিখে চলি।

ছেলেমেয়েদের মন ভালো নেই – মনোবিদরা এগিয়ে আসুন

কলেজে উইমেন্স সেলের তরফ থেকে একটি সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং এর আয়োজন করা হয়েছিল কিছুদিন আগে। আমরা ছেলেমেয়েদের হোয়াটসয়্যাপ গ্রুপে লিখে পাঠালাম যে মনোবিদের কাছে যদি তাদের কোনো জিজ্ঞাস্য থাকে তারা যেন আলাদা করে লিখে পাঠায়। কে প্রশ্ন করেছে তা প্রকাশ করা হবেনা। বেশ কিছু প্রশ্ন জমা পড়ে। অনুষ্ঠানে মনোবিদ যথাসাধ্য উত্তরও দিয়েছেন। কিন্তু তাতেও প্রশ্নগুলোর মধ্যে যে সামাজিক, পারিবারিক ও ব্যাক্তিপরিসরের সমস্যাগুলি প্রতিভাত হয়, তা নিয়ে সকলের ভাবা প্রয়োজন। ২০২০ সালের মার্চ মাসের পর থেকে লকডাউন আজ একবছর পেরিয়েছে। ইভেন এবং অড দুটি সেমেসটারের অনলাইন পরীক্ষা সমাপ্ত। শিক্ষা জগত অনেকটাই অনলাইন ব্যাবস্থায় সড়গড় হয়ে উঠেছে। তবু প্রচুর ছাত্রছাত্রী লিখেছে যে, অনলাইন পরীক্ষায় বই দেখে লেখা যায়। তাই পড়ার উৎসাহ থাকছেনা। নিজেকে মোটিভেট করতে পারছিনা। ভবিষ্যতে সবাই বলবে আমরা করোনা ব্যাচ। তাই কিছু শিখিনি। কর্ম জগতে ইন্টারভিউয়ের সময়ে প্রথমেই আমাদের বাদ দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। এইসব ভাবতে ভাবতে শেষ পর্যন্ত তুচ্ছ ব্যাপারেও বেশি চিন্তার স্রোত এসে যাচ্ছে। নিজেকে থামাতে পারছিনা। আমাদের ভবিষ্যৎ কী? আমরা কি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবোনা?
দ্বিতীয় যে সমস্যাটি উঠে এলো, সেটি হল লকডাউনে পরিবারে চরম অর্থকষ্ট। ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের ভাষায় কথাগুলি যদি তুলে ধরি, তবেই বোঝা যাবে পরিস্থতি কতটা জটিল হয়ে পড়েছে। কেউ লিখেছে, “লকডাউনে পরিবার অর্থকষ্টের মধ্যে পড়েছে। কলেজে ভর্তি শুরু হওয়ার সময়ে টাকা যোগাড় করে ওঠা যায়নি। অনেক পরে ভর্তি হয়েছি। অনেক নম্বর থাকলেও কাছাকাছি কলেজে পছন্দের বিষয়ে তখন অনার্সের সিট আর খালি ছিলনা। তাই বাধ্য হয়ে ঐ বিষয়ে পাশ কোর্সে পড়ছি। স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। ভবিষ্যতে কী ভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াব, এই ভেবে ভেবে রাতে ঘুম আসেনা”। কয়েকজনের বক্তব্য, “বাড়ির লোক পড়া ছেড়ে দিতে বলছে, এত দিন লড়াই করেছি। আর মনের জোর নেই। এবারে হয়তো সত্যি সত্যি ছেড়ে দেব”। কারোর বক্তব্য, “বাবা মা খুব কষ্ট করে কলেজের ফি যোগাড় করছে। এই কষ্ট দেওয়া কি উচিত হচ্ছে? পড়া ছেড়ে দিয়ে রোজগারের চেষ্টা করব? মাঝে মাঝে মনে হয় আমিই যত নষ্টের মূল। এমনকি কখনও নিজেকে শেষ করে দেব এমনও ভাবি। আবার নিজেকে বোঝাই। মনের মধ্যে বড্ড টানাপোড়েন। ভীষণ কষ্ট হয়”।
অধ্যাপিকা হিসেবে দেখেছি, এই পড়া ছেড়ে দেওয়ার চাপটি বহু মাত্রিক। কেউ থ্যালাসেমিয়ার মতো দুরারোগ্য অসুখে আক্রান্ত। লকডাউনের দীর্ঘ সময়ের মধ্যে কিছু সময়ে সরকারী হাসপাতালে বিনামূল্যের ইঞ্জেকশন অমিল হয়েছিল। টাকা দিয়ে ইঞ্জেকশন কিনতে গেলে পরিবারে হাঁড়ি চড়বেনা। জীবন যখন থাকবেনা, পড়ার খরচেরও আর দরকার নেই। চুপচাপ ক্লাসের হোয়াটসয়্যাপ গ্রুপ ছেড়ে দিল। কোনো বিবাহিতা ছাত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়েছে। পারিবারিক চাপে পড়া ছেড়ে দেবে। এমন অজস্র ঘটনা সব কলেজেই ঘটছে। কে গ্রুপে চুপচাপ, কে গ্রুপ ছেড়ে দিল, ফোনের মধ্যে দিয়ে গোয়েন্দাগিরি করে করে বহুজনকে ফেরানো গেছে। কখনও অধ্যাপক অধ্যাপিকারা চাঁদা তুলেছেন। আবার অনেকের কথা হয়তো জানতেই পারিনি। সব চেয়ে বেশি সমস্যা হয়েছে, প্রথম বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। তাদের পড়িয়েছি। পরীক্ষা নিয়েছি, কিন্তু চোখে দেখিনি। ছাত্রছাত্রীদের নিজের ভাষায় তাদের প্রশ্নগুলো দেখলেই সমস্যার স্বরূপটা অনেকটা বোঝা যাবে। কেউ কেউ লিখেছে, “কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ি। এখনো কলেজের মুখ দেখিনি। তাই অধ্যাপকদের সঙ্গে পরিচয় বা অন্তরঙ্গতা নেই”। কারোর অভিভাবকেরা অসুস্থ, কারোর বা বয়স হয়েছে। ছোটো ভাইবোনও আছে। বর্তমানে অর্থনৈতিক অবস্থা নিম্নবিত্ত। কাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালাচ্ছে বা ভবিষ্যতে চালাতে চায়। তারা লিখেছে, “এইসব কারণের জন্য পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে বা ভবিষ্যতে ঘটবে। অনলাইন ক্লাসে নিয়মিত নই বলে অধ্যাপকেরাও খুশি নন, কিন্তু তাঁদের ঠিকমতো চিনিনা বলে সব কথা খুলে বলতে পারছিনা। একই সঙ্গে মনের মধ্যে লড়াই, কাজ আর পড়ার মধ্যে সময়ের ব্যালান্স, আর আর্থিক প্রতিকূলতা – এই তিনটে বাধার সামনে দিশাহারা অবস্থা। কী যে করব, কিছু বুঝতে পারছিনা। আর এই নিয়ে সব সময় একটা মানসিক অস্থিরতা কাজ করে। সবাই পাশে থাকলেও নিজেকে বড্ড একা মনে হয় । কীভাবে মুক্তি পাবো এই সমস্যা থেকে”? এইরকম পরিস্থিতি চিরকালই কারোর না কারোর হয়। ভবিষ্যতের চিন্তা ভাবনা করাটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু কলেজে এসে, হৈ হৈ করে, দুটো বকুনি খেয়ে, বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি, মজা করে, দুষ্টুমি করে, ক্যান্টিনে বসে, রাস্তায় ফুচকা খেয়ে যে চাপ হাল্কা হয়ে যায়, বা অন্যদিকে সরে যায়, সেইটা এখন অনুপস্থিত। তাই একটা একাকীত্বের অনুভব যেন টুঁটি টিপে ধরছে। অনেকেই লিখেছে, ”মনে হয় যেন আমায় কেউ কোনো গুরুত্ব দেয় না.. আমার মা বাবা যেন আমার থেকে বোন ভাই কে বেশি ভালোবাসে” । কেউ লিখেছে, “আমি বেশি ইমোশনাল। অল্পে রেগে উঠি। যেখানে বেশি রিঅ্যাকশন দেখানোর দরকার ছিলনা, সেখানেও দেখিয়ে ফেলি। আগে সমস্যাটা কম ছিল। খুব একটা অসুবিধে হতনা। লকডাউনে এই সমস্যাটা খুব বেড়ে গেছে। নিজেকে একদম সামলে রাখতে পারছিনা। পরে যখন বুঝছি, তখন ভীষণ কষ্ট হচ্ছে”।
তৃতীয় সমস্যা হল চারিপাশে অসংখ্য মৃত্যু। কারোর পরিবারেই প্রিয়জন মারা গিয়েছেন। শোক সামলাতে পারছেনা। কারোর বা সরাসরি আত্মীয়ের মৃত্যু না হলেও চারিপাশের অসংখ্য মৃত্যুর চাপ নিতে পারছেনা। একটু বড় হয়ে গেছে বলে পরিবারের সবার কাছে প্রকাশ করতে পারছেনা। প্রিয়জনের, নিজের মৃত্যুভয় গ্রাস করছে। সব মিলিয়ে এক চূড়ান্ত হতাশা এদের মনের আকাশ ঢেকে দিচ্ছে। লকডাউনের প্রথম দিকে গ্রুপে অনেকে রান্নার ছবি দিত, হাতের কাজের, বা আঁকা ছবি পাঠাত। কোনো বিষয়ের ওপরে লেখা পাঠাতো। গ্রুপে মেসেজ লিখতো খালি ঘুমোচ্ছি ম্যাডাম। প্রথম দিকের ঘুমোনো এখন একঘেয়ে হয়ে গেছে। তারপর ঘুমের রুটিন বদলে গেছে। এই মুহূর্তে নানা দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম আসছেনা। মন ভালো নেই বলে অনেক ছাত্রীর ঋতুচক্র অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু এরা বড় মেয়ে, কলেজ পেরিয়ে বৈবাহিক জীবনে প্রবেশ করবে, তাই এই ব্যাপারটা একটা বাড়তি চিন্তার সৃষ্টি করছে। ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে মাথার যন্ত্রণার সমস্যা বাড়ছে।
এর থেকে এই মুহূর্তে বাঁচার রাস্তা কী? আমার মনে হয় অবিলম্বে রেডিও, টিভিতে কাউন্সেলিং সেশন শুরু হওয়া দরকার। যে আলোচনাগুলো শুনে ছেলেমেয়েরা নিজেদের সামলে নিতে পারবে, অভিভাবকেরা আরও বেশি সচেতন হতে পারবেন। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যারা সরাসরি সংযোগে আছেন সেই শিক্ষক শিক্ষিকাদের প্রাথমিক কিছু টেকনিক শিখিয়ে দেওয়া দরকার যাতে তাঁরা চট করে চিনতে পারেন, কোন ছাত্রের এই মুহূর্তে কী ধরণের সাহায্য লাগবে। আজকাল ইউটিউব, ফেসবুক লাইভ কত কি সুযোগ রয়েছে। টিভি চ্যানেল, সংবাদপত্র, সমাজ মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে মনোবিদেরা যদি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন, ঈশ্বর তাঁদের মঙ্গল করবেন। আমাদের শিক্ষাজগৎ এবং অন্যান্য পেশাদারি ক্ষেত্রে হয়তো অনেকেই আছেন, যাঁরা সাহায্য করতে পারেন। এমন একটা সমন্বয় কি তৈরি করা যায়না, যেখান থেকে এই ওপেন কাউন্সেলিং গুলি আয়োজন করা যায় বা অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য ট্রেনিং ওয়ার্কশপ আয়োজন করা যায়? অতিমারী একদিন কেটে যাবে, কিন্তু যে অন্ধকার ক্ষত তৈরি হচ্ছে, কচি মনের মধ্যে, তার অনেক গুলিই হয়তো ভবিষ্যতে বড় সমস্যার দিকে গড়িয়ে যাবে। তাই আসুন না সকলে মিলে, আরও একটু দায়িত্বশীল হই।
শারদা মণ্ডল,
বিভাগীয় প্রধান, এসোসিয়েট প্রফেসর, ভূগোল বিভাগ, প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজ

বড় গীতাদি

স্কুলে আমাদের দুজন বড় গীতাদি ছিলেন। আবার দুজনেই আমার মায়ের শিক্ষয়িত্রী। একজন ছোটোবাড়ির মানে প্রাথমিক বিভাগের, আরএকজন বড়বাড়ির মানে মাধ্যমিক বিভাগের। ছোটোবাড়িতে দুই গীতাদি। সন্ন‍্যাসিনী প্রব্রাজিকা ত‍্যাগপ্রাণা – প্রাথমিকের অধ‍্যক্ষা – তিনি ছোটোবাড়ির বড় গীতাদি। আর যিনি অঙ্ক করান, তিনি হলেন ছোটো গীতাদি। বড় বাড়িতে উল্টো। ব্রহ্মচারিনী গীতাদি গম্ভীর হয়ে অঙ্ক করান তিনি ছোটো গীতাদি। বোর্ডে কিছু লেখার আগে একেবারে ওপরে তিনি কিছু চিহ্ন আঁকতেন বা হয়তো মন্ত্র লিখতেন, সেটা যে কী আমরা বুঝিনি‌। জিজ্ঞাসা করলেও তিনি বলেননি। একবার আমরা যখন সিক্সে পড়ি আমাদের ক্লাসের শর্বরী হোস্টেলে ওনার খাটে উঠে নেচেছিল। আসলে শর্বরী তো ছোটো থেকে এই ইস্কুলে পড়েনি। ভর্তি হয়ছিল ফাইভ সি তে। সিক্সে বাড়ির লোক ওকে হোস্টেলে ভর্তি করে দিলেন। রাগে দুঃখে সে একবার খালি পায়ে ছুটির পর বাড়ির দিকে হাঁটা দিয়েছিল। জুতো পরতে গেলে যে চোখে পড়ে যাবে।  সে যাত্রা অনেক খোঁজাখুঁজি করে দারোয়ান দাদারা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে এল। এরপরে তার মন ভালো করার জন্য হোস্টেলের সিনিয়র দিদিরা বলল, তোকে একটা চকলেট দেব, কিন্তু ঐ খাটে উঠে নাচতে হবে। চকলেটের জন্য শর্বরী চোখ বুজে খাটে উঠে নেচে চলেছে, হঠাৎ চোখ খুলে দেখে ঘরে সিনিয়র দিদিরা কেউ নেই, ভোঁ ভা। খালি যাঁর খাট, সেই ছোটোগীতাদি একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। ক্লাসের ফা়ঁকে এই রুদ্ধশ্বাস গল্প শুনতে গিয়ে আমাদের প্রাণবায়ুতো গলায় উঠে এসেছে, আর হৃদপিণ্ড এমন লাফালাফি করছে, যে বুকের খাঁচাটা ফাটোফাটো। কেউ আমরা খেয়ালই করিনি, যে বড় গীতাদি ক্লাসে ঢুকে পড়েছেন। ক্লাস বা শুরু হল। ঐ গল্পের হ‍্যাং ওভার কাটলোনা। সেদিন ভয়েস চেঞ্জ, ট্রান্সলেশন সব ভুলভাল হয়ে গেল।ঝুলিভরা বকুনিও পেলাম।  সে যা হোক। হ‍্যাঁ, বড়বাড়ির বড় গীতাদি ইংরেজি পড়াতেন। তাঁকে নিয়েই আজ গল্প বলতে বসেছি। ছোটোখাটো মানুষটি ফিটফাট। শাড়ির প্লিট কোনদিন অগোছালো দেখিনি। মূলত  সাদা বা হাল্কা বেসের শাড়িগুলি, কিন্তু সাধারণ ছাপা নয়, বেশ অভিজাত ঘরানার। গীতাদির গায়ের রঙটি নজরকাড়া ফর্সা। মাথার পিছনে কাঁচা পাকা চুলে ছোটো একটি বেণী। মুখের সামনের দিকের চুলে পাক ধরলেও ঘন এবং কোঁকড়া। পাকা চুলের মাঝখানে সিঁথিতে চওড়া করে সিঁদুর দিতেন। কিন্তু টিপ পরতেন খুব ছোটো। চশমাটি মোটা কাচের, কিন্তু ফ্রেমটি সেই হাল্কা বেসের। সব মিলিয়ে ওনার চেহারায় একধরণের অভিজাত সৌন্দর্য ফুটে উঠত। সবচাইতে আকর্ষণীয় ছিল চশমার কাচের আড়ালে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, আর অননুকরণীয় বাচনভঙ্গি। আমাদের পাংচুয়েশন শিখিয়ে শিখিয়ে তিনি নাজেহাল হয়ে যেতেন। বলতেন যাই শেখাইনা কেন, খাতার পাতায় দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনগুলো তোমরা একমুঠো মৌরির মতো ছিটিয়ে দাও। একমুঠো বলার সময়ে ডানহাতটি মুঠি করে তুলে ধরে আঙুলগুলি খুলে ছড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গি করে দেখিয়ে দিতেন। ছিটিয়ে শব্দটিতে জোর দিতেন। আসলে লিখে তো আর অভিনয় করা যায়না। তাঁর বক্তব্যগুলি ছিল রসবোধ, স্লাইডিং স্ট্রেস, ভয়েস মডিউলেশন আর শারীরিক অভিনয়ের সমাহার।  প্রতিটি বাক‍্য আজও পাঁজরে খোদাই করা আছে। মুছে দেয়, কালের সাধ‍্যি কি? ওঁর ক্লাসে আর একটা জিনিষ ছিল বোর্ডে গিয়ে ক্লাস ওয়ার্ক করা, যেটাকে আমরা যমের মতো ভয় পেতাম। কারণ নিজের ডেস্কে বসে এর ওর খাতা দেখাদেখি, জিজ্ঞেস করে জেনে নেওয়ার উপায় থাকতনা। বোর্ডে গিয়ে পরাস্ত হলে গীতাদি সুর করে ছড়া কাটতেন – ‘সর্ব্ব অঙ্গে ব‍্যথা! ওষুধ দেব কোথা?’ অবস্থা অনুযায়ী আরো কিছু বলতেন, যা শুনে বন্ধুদের বিরিঞ্চিবাবার সত‍্যব্রতের মতো কানের ভেতর গঙ্গা ফড়িং আর নাকের ভেতর গুবরে পোকা কুরে কুরে খেত। নইলে হাসি চেপে নির্বিকার থাকা সম্ভব হতনা। আর যে বেচারা বোর্ডে যেত, সে প্রাণপনে কল্পনা করতো, যে সে ইনভিসিবল ম‍্যানের মতো অদৃশ্য হয়েছে। আমার অনেকবার এমন হয়েছে। রোজ গ্রামার ক্লাসের পরে, ইংরেজি বিশ্বসাহিত্য থেকে মণিমুক্তা খুঁজে একটি করে কোটেশন রাফ খাতায় লেখাতেন। একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এতদিন ধরে লেখাচ্ছি, একটা অন্তত বলো দেখি। কিছুই বলতে পারিনি আমি। সেভাবে পড়িনি কোনদিন। ওগুলির মূল্য বোঝার মতো মনের পরিণতি ছিলনা। দুঃখ পেয়েছিলেন। পরে আবার যদি ধরেন, সেই ভয়ে, ছোটো দেখে একটা মুখস্থ করে রেখেছিলাম –  ‘Distant hills are always blue’। আমার মা গীতাদির লজিক পড়ানোর ফ‍্যান ছিল। মার সময়ে 10 +2 ব‍্যবস্থা ছিলনা। একাদশ পাশ করে একেবারে কলেজ। নাইনে শাখা ভাগ হয়ে যেত। মা কলাবিভাগের ছাত্রী তো, লজিক ছিল।

ক্লাস এইটের টিফিনের পরে ফিফ্থ পিরিয়ডে ইংরেজি ক্লাস। সেদিন মাধ‍্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে। আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, এবারে কেমন হল। বড় গীতাদি আমাদের মন বুঝে, কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সেই অনন্য ভঙ্গিতে ফল ঘোষণা করে দিলেন, ‘ফিজিকাল সায়েন্সে লেটার এসেছে একঝুড়ি, লাইফ সায়েন্সে লেটার এসেছে দুঝুড়ি। লজিকেও ঝুড়ি পাঠানো হয়েছিল, খালি ফেরত এসেছে’। টেন পর্যন্ত দেখেছি, সিলেবাসের সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি গল্প, কবিতা, নাটক পড়ে শোনাতেন। সব কিছু ভালো করে শুনিওনি। আজ দেখি মেয়েদের শেখানোর ঐ চেষ্টাটা মনের মধ্যে গভীর রেখায় আঁকা আছে। বসে ভাবি, ‘ছোটো হাসির ছোটো খুশির ফেলে দেওয়া’ দিনগুলি যদি ফিরে পেতাম, কোটেশন লেখা রাফ খাতাটি যদি মন্ত্রবলে আবার ফিরে আসত, সত্যি বলছি দিদি, বুকে করে তুলে নিতাম। মুঠোফোনে খবর এলো গীতাদি আর নেই, শুধু RIP লিখে ছাড়তে পারলাম না। পঞ্চাশ পেরিয়ছি। কিছু প্রায়শ্চিত্ত তো করার দরকার আছে নাকি। দিদির উদ্দেশে কলমের নৌকোয় ভাসালাম আমার প্রণাম।

শারদা।

রামনবমী

আজ রামনবমী। নিবেদিতা ইস্কুলে তখন আমি প্রাইমারি বিভাগে মানে নিবেদিতা লেনের ছোটোবাড়িতে পড়ি। মনে হয় তখন একটু বড় হয়েছি, মানে এই ক্লাস টু হবে। রামনবমীর একটি স্মৃতি আজও মনের মণিকোঠায় অমলিন। বড়বাড়িতে মানে সেকেন্ডারি কবে যাব এমন একটা ইচ্ছে মনের মধ্যে বেশ জোরালো হয়েছে তখন। আমার বন্ধুরা বড়বাড়ির ভিতরটা কেমন তখন হয়তো সকলে জানতোনা। আমি ছোটো থেকে জানতাম। কারণ আমি ছিলাম কৃষ্ণকুমারীর মেয়ে। সেই ওয়ানে পড়া থেকেই মাঝে মাঝে বড়বাড়িতে আমার ডাক পড়ত। ইস্কুলে ভর্তি হওয়ার পরে কোনো শিক্ষিকা কৃষ্ণকুমারীর মেয়েকে এখনো দেখেননি একথা জানাজানি হলেই মনে হয় আমার ডাক পড়ে যেত। আমি বেণুমাসির পিছন পিছন বড়বাড়িতে স্টাফরুমে যেতাম। সেখানে দেখতাম গম্ভীর হয়ে মায়ের শিক্ষিকারা বসে আছেন। আমি গেলেই যিনি দেখেননি, তাঁর সঙ্গে পরিচয় সারা হত। তারপরে বিভিন্ন জন বিভিন্ন প্রশ্ন করতেন। কয়েকটি উদাহরণ দিই। বাংলা কবিতা বল একটা। আজ কি দিয়ে ভাত খেয়েছ? কে রান্না করেছিল? বাবা বেশি বকে না মা? কে বেশি ভালোবাসে? ইস্কুলে কিভাবে এলে আজ? বোনের সঙ্গে ঝগড়া করো? কে বেশি দুষ্টু? ছুটির দিন কি করো? কটা গল্পের বই পড়া হয়েছে? বইগুলো কী নাম বলো। আমাদের পড়তে দেবে? একটা গল্প বলো। আমি ভয় পেতাম না। সাধ‍্যমতো উত্তর দিতাম। কেবল গল্পের বই দিতে সম্মত হতামনা। ওঁরাও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটা অন্তত বই চাইতেন। আর একটা কমন প্রশ্ন ছিল, তুমি কি মা সারদা? আমি প্রবল বেগে মাথা নেড়ে প্রমাণ করতাম, মোটেই না। আমি তালব‍্য শ এ শারদা। দিদিরা মুখ ঘুরিয়ে নিতেন, বা বই খাতা দেখতেন। আজ নিজের বয়স অর্ধশতক পার। আমার ছাত্রীরাও ছেলেমেয়ে নিয়ে কলেজে আসে। সেদিনের দৃশ‍্যটি কল্পনা করি। স্নেহের ছাত্রীর কন্যা – বেঁটেখাটো বাচ্ছা, মুরুব্বির মতো উত্তর দিচ্ছে – এটা ছিল ক্লাসের ফাঁকে অনাবিল আনন্দ। দিদিদের গম্ভীর মুখ আসলে ছিল ছদ্ম গাম্ভীর্য। প্রবল হাসির দমক চাপতে গেলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়া ছাড়া উপায়ই বা কী? এমন সুযোগ এখন পেলে আমিই কি ছাড়ব?

ক্লাস টুতে পড়ি যখন, একদিন মা ইস্কুল ছুটির পরে বাড়ি না গিয়ে কাজ করছিল। ছোটোবাড়ির ছুটি আগে হয়ে যেত। বড়বাড়িতে দেরি করে হত। আমি মাকে বললাম, বাড়ি যাবেনা? মা খাতা থেকে মুখ না তুলে ছোট্ট উত্তর দিল, ‘দেরি হবে। আজ রামনবমী’। ছুটির পরে মায়ের জন্য অপেক্ষা করা আমার কাছে ছিল সাধারণ ব‍্যাপার। কারণ আমার ছুটি মার অনেক আগেই হয়ে যেত। কিন্তু মার কাজ থাকত বলে আমি বসে থাকতাম। কোনো কোনোদিন খুব দেরি হলে, বড় গীতাদি মানে ত‍্যাগপ্রাণা মাতাজী বেণু মাসিকে বলতেন ওকে ছাদে নিয়ে যাও। তিনতলার ছাদ ছিল একমানুষ সমান দেওয়াল, সরু থাম আর জাল দিয়ে ঘেরা। আর মাথায় টিনের চাল। ওখানে রোজ সকালে আমাদের প্রার্থনা হত। বেনু মাসি ছাদের এক কোণে দুই হাঁটু মুড়ে, হাঁটুর দুপাশে দুই হাত বেড় দিয়ে বসে থাকত। কখনো মাথাটা দুই হাঁটুর মাঝে ডুবিয়ে রাখতো। মনে হত কীযেন আকাশ পাতাল ভাবছে। আর আমি একা একাই সেখানে ছুটোছুটি করতাম। ছাদের ভিতরের থামগুলো নিয়ে আমরা বন্ধুরা একটা খেলা বানিয়েছিলাম – থাম থাম খেলা। চারটে থাম ছুঁয়ে আমরা কজন থাকতাম আর একজন চোর মাঝখানে থাকতো। আমরা কেবলই এথাম থেকে ওথাম ছুটে বেড়াতাম। ঐসময়ে চোর যাকে ছুঁয়ে দেবে সে চোর। কিন্তু থাম ছুঁয়ে ফেললে আর চোর হবনা। আমি একটু নিটির পিটির ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ে পারতাম না, তাই এথাম ওথাম বেশি করতামনা।  সাহস সঞ্চয় করতে করতে টিফিনের ঘন্টা পড়ে যেত। কিন্তু একা একা ছাদে তো আর চোর হবার ভয় নেই। তাই কেবলই ছুটতাম। ছাদের জাল দিয়ে বড়বাড়ির জানলা দিয়ে ক্লাস দেখার চেষ্টা করতাম। বড়বাড়ির পাশেই ছিল পদ্মাদের বাড়ি। আমার মামারা আর পদ্মার বাবা কাকা সব ছোটোবেলার পাড়ার বন্ধু ছিল। পদ্মার চেহারা বড়সড় ছিল। সে ঘোষণা করত যে অন্য স্কুলে ফোর অবধি পড়ে নাকি এখানে ভর্তি হয়েছে। তাই আমরা যেন তার কথা সব মেনে চলি। আমি বিশ্বাস করে তার নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলাম। নিজে এতটাই ছোটোখাটো ছিলাম, সে এক ক্লাসে পড়লেও অবলীলায় আমায় কোলে তুলত। আমি একাএকা ছাদের জাল দিয়ে পদ্মার বাড়িতে কে কি করছে, পদ্মা তার বড় চুলে শ‍্যাম্পু মাখছে, এসব লক্ষ‍্য করতাম। বেণুমাসি দুই হাঁটুতে থুতনি ডুবিয়ে বসে আছে দেখলে মাঝে মাঝে ও বেণুমাসি বলে চমকে দিতাম। কখনও ছোটোছাদ খুলে দাও না, বলে বায়না করতাম। ছোটোবাড়ির ছাদের যে ধারটা নিবেদিতা লেনের দিকে, তার উল্টো দিকে, মানে বাড়ির পিছনের ধারে ছাদের কোণে লাগোয়া একটা ছোট বারান্দা ছিল। সেটায় টিনের চাল, ঘেরা জাল কিচ্ছু ছিলনা। রোদ পড়ত। দু চারটে ফুলের টব ছিল। ফুল ফুটতো। কিন্তু সেখানে আমাদের ছাত্রীদের যাওয়ার উপায় ছিলনা। একটা জালের দরজা দিয়ে আলাদা করা ছিল। তালা দেওয়া থাকত। আমরা বলতাম ছোটো ছাদ। স্কুলের সময়ে ওখানে যাওয়া মানা ছিল। কিন্তু স্কুলের পরে? খুব বায়না করলে কখনো সখনো বেণুমাসি ছোটোছাদ খুলে দিত। সেই নিষিদ্ধ এক চিলতে জায়গায় পা রাখা ছিল, একটা সাম্রাজ্য পাওয়ার সমান। আমি যে ছোটোছাদে গেছি, একথা বন্ধুদের কখনো বলিনি।

সেই রামনবমীর দিন কিন্তু আমার ছাদে যাওয়া হলনা। বদলে বড় গীতাদি, আমাদের বড়দি ওনার কাঠের দেরাজ থেকে একটা বই বার করে আমাকে বললেন ‘পড়’। দেখলাম সেটা ছোটোদের রামায়ণ। আমি পড়তে বসে গেলাম। এটাও খুবই স্বাভাবিক ব‍্যাপার ছিল। কেন বলি। এই স্কুলে ক্লাস ওয়ানে আমি কিছুটা পরে ভর্তি হয়েছিলাম। কারণ কিন্ডারগার্টেন থেকে আমি আসলে বাগবাজার মাল্টিপারপাস স্কুলের ছাত্রী ছিলাম। ওয়ান থেকে ওখানে মর্নিং স্কুল। মর্নিং স্কুল ছুটি হলে, মা আমাকে নিয়ে নিবেদিতায় আসত। বিকেলে মার সঙ্গে বাড়ি যেতাম। সারাটা দিন বড় গীতাদি আমাকে নানা রকম বই দিতেন। কখনো কী পড়লাম জিজ্ঞাসা করতেন, গল্পের কোনো ঘটনা বা চরিত্র ভালো না মন্দ সেবিষয়ে আমার মতামত জানতে চাইতেন। কখনো রিডিং পড়তে দিতেন। আবার কখনো কোনো বিষয় নিয়ে লিখতে বলতেন। এক একদিন এক একরকম। একদিন আমাকে শ্রদ্ধাপ্রাণা মাতাজী ডেকেছিলেন। বড়বাড়ির তিনতলায়। স্কুলে ভর্তির আগে। তাঁর সাধনজগতের নাম আমি জানতাম না। মা নিজের ক্লাসের ফাঁকে বলে গিয়েছিল, লক্ষ্মীদি তোকে ডেকেছেন। খুব সাবধান, উনি গুণী মানুষ, প্রণাম করবি। সামনে যেতেই গম্ভীর স্বরে বললেন, তুমিই কৃষ্ণকুমারীর মেয়ে? ফর্সা পায়ে জুতোর বেল্টের দাগ হয়ে গেছে, মোজা পরবে। ছোটো মানুষ হলেও, জলদ স্বরের পিছনে একটা স্নেহের ফল্গু অনুভব করতে পেরেছিলাম।  তিনি আমায় গল্পের ছলে নানা কথা জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন লিখতে পারি দেখাতে বললেন। তারপরেতো চলে এসেছি। সপ্তাখানেক পর একদিন মা আমাকে সকালে ঘুম থেকে ওঠায়নি। বেলায় উঠে আমি তো অবাক। মা বলল আজ থেকে আমার সঙ্গে বেরোবি। আমার ইস্কুলেই পড়বি। আমি বললাম পরীক্ষা দিতে হবে? মা চুল আঁচড়ে দিতে দিতে বলল, তোর পরীক্ষা দুজন নিয়ে নিয়েছেন। তোর অনেক ভাগ্য, লক্ষ্মীদি মর্নিং স্কুল করে সারাদিন বসে থাকিস বলে নিজে তোর পরীক্ষা নিয়েছেন, বলে দিয়েছেন, যে আর মাল্টিপারপাসে যেতে হবেনা। শারদা তালব‍্য শ হলেও নিবেদিতাতেই পড়বে। যাই হোক ছুটির পরে বসে বসে বই পড়াটা স্বাভাবিক ছিল। সেদিন খুব একটা মন বসছিলনা। ওয়ানে আমাদের ছড়া ও ছবিতে রামায়ণ ছিল। সেই সূত্রে রাম লক্ষ্মণ, তাড়কা রাক্ষসী হনুমান সবার সাথে পরিচয় হয়েছিল। সেদিন বইয়ে মন বসছিলনা কারণ, ঐ যে মা বলল আজ রামনবমী। দেরি হবে। মানে কিছু ঘটবে। সেটা কী? রামনবমী কী? – বসে বসে এসব ভাবনার জাল বুনছিলাম। একসময়ে বড়বাড়ির ছুটির ঘন্টা শোনা গেল। মাও ব‍্যাগ গুছিয়ে বলল, ওবাড়ি চল। ওবাড়ির দেউড়ি পেরিয়ে প্রশস্ত ঠাকুরদালান। মাঝখানে দন্ত‍্য স- এ সারদা মায়ের সিংহাসন। বুদ্ধমূর্তির সামনে কিছুটা এগিয়ে একটি চেয়ারে বসে আছেন লক্ষ্মীদি। সামনে প্রশস্ত সতরঞ্চিতে হোস্টেলের মেয়েরা, দিদিরা বসে আছে। সময় কিভাবে কেটেছে জানিনা, মাতাজী রাম লক্ষ্মণের গল্প বলছেন। আজ শ্রীরামের জন্মদিন। আমি দেখছি অযোধ্যার রাজবাড়িতে কত তোড়জোড়। বিশ্বামিত্রের সঙ্গে দুই ভাই বেরিয়ে পড়েছেন, দশরথের চোখে জল। তিন মাতা বিলাপ করছেন। রাক্ষসের সঙ্গে লড়াই করে বীরপুরুষেরা ফিরবে তো? পাশে দেখি বেণুমাসি বসে কাঁদছে। একটু বড় হলে পরে মা বলেছিল, একাত্তরে বাংলাদেশ যুদ্ধের সময়ে বেণুমাসি আর তার ছেলেকে শেয়ালদা স্টেশনে বসিয়ে দিয়ে আসছি বলে, বেণুমাসির বর আর ফিরে আসেনি। লক্ষ্মীদি আশ্রয় দিয়েছেন। ১৯৭৮ এর রামনবমী আর আজ ২০২১। জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি আরো তিন। মোট তেতাল্লিশ বছরের পার। শ্রদ্ধাপ্রাণাজীর করুণা আমি পেয়েছিলাম। আজকের ‘জয় শ্রীরাম’ এর যুগে সেই রামনবমী স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে ভেসে ভেসে আসে।

শারদা মন্ডল

কলেজ বাড়ির রহস্য

শারদা মন্ডল

প্রথম পর্বঃ হাতেনাতে প্রমাণ?

কলেজে নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা চলছে। আমি এই সেন্টারের অ্যাসিস্ট‍্যান্ট কোঅর্ডিনেটর। তাই তদারকিতে থাকতে হবে। মূল কোঅর্ডিনেটর সুমনদা আজ আসবেনা। তাই আমার দায়িত্ব বেশি। আন্দুল বাজার স্টপেজে বাস থেকে নেমে গোলাপ বাগান দিয়ে হেঁটে আসছি। চোখে পড়ল কালার জেরক্সের দোকানটা খোলা আছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল অনার্স ক্লাসের জন্য কয়েকটা ম‍্যাপ জেরক্স করানোর ছিল। ঘড়িতে দেখলাম দেড়টা বাজে। এন এস ও ইউ এর পরীক্ষা শুরু হতে এখনও আধঘণ্টা বাকি। কাজটা সেরে নিই তাহলে। বাসুবাবু মানে বাসুদেব চ‍্যাটার্জি আছেন। পাঁচমিনিট পৌঁছতে যদি দেরীও হয় সামলে নেবেন। পদে তিনি এই দূরশিক্ষা কেন্দ্রের অফিস অ্যাসিস্ট‍্যান্ট বটে, আসলে তিনি আমাদের সকলের অভিভাবক। এই কেন্দ্র তাঁর হাতে তৈরি, আর সব কিছুই তাঁর নখদর্পণে। কাজ সেরে কলেজে যখন ঢুকছি, পরীক্ষা শুরু হতে আর পাঁচ সাত মিনিট বাকি। আজ প্রথমার্ধে পরীক্ষা ছিলনা। দুটো থেকেই শুরু। দিনটা রবিবার। ভর দুপুর বেলা, পরীক্ষার্থীরা দোতলায় হলে ঢুকে পড়েছে। হৈ চৈ নেই। একতলাটা একেবারে শুনশান। পুরোনো বাড়ির মাঠের দিকের বারান্দা দিয়ে টানা হেঁটে এলাম। অফিস আর অ্যাকাউন্টসের মাঝখানে একটা সরু গলি। ওখান দিয়ে রাস্তার দিকের বারান্দায় যেতে হবে। ঐ বারান্দায় পড়লে, সামনে দোতলার সিঁড়ি। বাঁদিকে শিক্ষাকর্মীদের কমন রুম। ডানদিকে আমাদের স্টাফরুম। ছুটির দিন আমি কোন কাজে এলে কেউ না কেউ খুলে দেয়। নইলে বন্ধ থাকে। আনমনে বাঁদিকে তাকালাম। শিক্ষাকর্মীদের কমনরুমে পর্দার ওপাশে কেউ রয়েছে, প‍্যান্ট, জুতো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ওটা বেচুদা নাকি গোপাল দা? চেঁচিয়ে না ডেকে, তিন চার পা এগিয়ে গেলাম, সরাসরি কথা বলার জন্য। পর্দা সরিয়ে চমকে উঠলাম। এখানে কেউ নেই। এক মূহূর্ত আগে এখানে কেউ ছিল, আমি নিজে দেখেছি। এপাশ ছাড়া বেরোনোর ও রাস্তা নেই। আমি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। স্টাফ রুম খোলানো যাবেনা তাহলে। উপায়ান্তর না দেখে সিঁড়ি দিয়ে আমাদের কেন্দ্রের অফিসে গিয়ে বসলাম। ঘটনাটা হজম করতে পারছিলাম না। আমি বাস্তববাদী মানুষ, কল্পনায় ভাসা একেবারেই নাপসন্দ। সই সাবুদ সারতে সারতে একটু থিতু হই। কাজের ফাঁকে মাথায় ভাবনার স্রোত চলে।

ফ্ল‍্যাশ ব‍্যাক

কলেজের এই অঞ্চলটা নিয়ে অনেক কাহিনী আগে শুনেছি। এক এক করে সেগুলো মনে মনে সাজাতে থাকি। যখন এই কলেজে যোগ দিই, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অঙ্কের অধ‍্যাপক হরিবাবু বলেছিলেন শোন প্র‍্যাকটিকাল শেষ করাতে তোদের দেরি হয়ে যায়। সন্ধ‍্যের মুখে কখনো বারান্দার এই কোণে আসবিনা। আমরা মানে আমি আর বল্লরীদি, ভূগোল বিভাগের প্রথম যোগদানকারী দুই ফুলটাইমার হেসে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেন? তিনি উত্তর দিলেন, অনেকে অনেক কিছু দেখেছে। তোরা এখন বুঝবিনা। এখানে কেউ যাতায়াত করে। আমাদের চোখে অবিশ্বাস দেখে, কপট রাগে তিনি বললেন, পুঁচকে মেয়ে সব জেনে গেছে, যা বলব শুনবি, যাঃ। আমরা হাসতে হাসতে বলেছিলাম, কলেজে ভুত আছে বুঝি? হরিবাবু বলে চলেন, আন্দুল প্রাচীন জনপদ – দক্ষিণের নবদ্বীপ। সামনে রাজবাড়ী। নবাবী আমল, ইংরেজ আমল সব কিছুর সাক্ষী। কত যুদ্ধ, শত্রুতা, গুম খুন, তার ইয়ত্তা আছে? কলেজ বেড় দিয়ে এই যে সরস্বতী খাল দেখছিস, একি চিরকাল এমন ছিল? বিশাল চওড়া নদী। আমরা যখন কলেজে আসি, তখনও এ নদী দিয়ে মালবাহী নৌকো যেত। কত মানুষের অকালে জলসমাধি হয়েছে এখানে কোনো ধারণা আছে তোদের? ফচকে মেয়ে সব। কলেজের এই মাঠ এককালে তো নদী ছিল। নদীর ওপরে দাঁড়িয়ে আছিস তোরা, ভূগোল পড়াস, এগুলো বুঝিসনা। কি দাম আছে তোদের ভারি ভারি মার্কশিটের? অবাক হয়ে হরিদার কথা শুনি। এই অকুণ্ঠ শাসন প্রাণভরে উপভোগ করি, এমন তো বাড়িতে হয়। বকুনি শুনে অজান্তেই কলেজটা দ্বিতীয় বাড়ি হয়ে ওঠে। আমার স্বভাবটা হল একটা কথা শুনলে ছেড়ে দিইনা। গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করি। শেষ দেখে ছাড়ি। একদিন কলেজ ছুটির সময়ে হিসাবরক্ষক তাপসদার ঘরে ঢুকে পড়ি।
– তাপসদা, সন্ধ‍্যের মুখে বারান্দার এই কোণে কি কিছু দেখা যায়, বুদ্ধিতে যার ব‍্যাখ‍্যা মেলেনা।

– শুধু সন্ধ‍্যে কেন দিদি দুপুরেও হয়।

– মানে?

– একদিন দুপুরে সুনীলদা কলঘরে যেতে গিয়ে দেখল, অন্য কেউ ঢুকে গেল। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরেও সে বেরোচ্ছে না। শেষে সুনীলদা দরজায় ধাক্কা দিতে গিয়ে দেখে দরজা খোলা। কেউ নেই। একজন ঢুকেছিল কিন্তু কেউ বেরোয়নি।

– বলেন কী? এযে অবিশ্বাস্য।

– হ‍্যাঁ দিদি, প্রথম প্রথম অসুবিধে হয় বটে, পরে সব সয়ে যায়।

হায় ভগবান, এ কি কান্ড রে বাবা, ভাবতে ভাবতে বাড়ির পথে হাঁটা দিই।

কলেজের নানা ব‍্যস্ততায় দিন কাটে। সহকর্মীরা নতুন থেকে পুরোনো হয়ে ওঠে। ছাত্রছাত্রীরা জীবনের সব ফাঁক ভরাট করে বসে পড়ে। অতিপ্রাকৃত সঙ্গীদের কথা আর মনে পড়েনা। একবছর নবীন বরণের পরদিন কলেজে ঢুকতেই ইউনিয়নের জি এস দৌড়ে আসে। সঙ্গে আরও কিছু ছেলেমেয়ে। প্রথমে ছেলেদের কথা শুনি।

– কী হয়েছে?

-কাল অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে ম‍্যাডাম।

– সব ঘর সাজানোর জন্য আমরা কয়েকজন তো রাতে কলেজে ছিলাম।

– হ‍্যাঁ জানি তো।

– ওদিক থেকে একুশ, কুড়ি, উনিশ নম্বর ঘরে বোর্ডে স্বাগতম লিখে আমরা এন ইলেভেনে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ঢুকতে পারিনি। ঐ ঘরের সামনের বারান্দায় একটা অদ্ভুত গরম হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল। অন্য কোথাও কিছু নেই। ভয়েতে আমরা ওঘরে আর ঢুকিনি। এমনিতে তো সন্ধ‍্যে হলে এই কোণে কলঘরে আমরা দল বেঁধে যাই। একা যাওয়া যায়না। নিজে নিজে কলে জল পড়ে। এবারে মেয়েদের পালা।

– ম‍্যাডাম ওপাশের বারান্দায়
আমাদের কমনরুমে একটা আয়না আছে।

– হ‍্যাঁ দেখেছি তো।

– ওটা আমরা সরিয়ে দেব।

– কেন?

– প্রোগ্রামের সময়ে যারাই বিকেলে ঐ আয়না দেখে সাজে, তারা সব অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। সকালে কিছু হয়না।

– ধ‍্যাৎ। এসব আবার হয় নাকি?

– হচ্ছে তো ম‍্যাডাম।

– আচ্ছা ঠিক আছে, তোমরা এবার ক্লাসে যাও।

আমি নির্বিকার মুখে ওদের কথা শুনি, আর মনে মনে আঁক কষি। তাপসদার বলা কর্মীদের কলঘর হল উত্তর পূর্ব কোণে, আর ছাত্ররা যেটার কথা বলছে, ওটা দক্ষিণ পশ্চিম কোণে। মাঠের মাঝ বরাবর ধরলে একেবারে ব‍্যাস বরাবর বিপরীত দিকে। কলেজ বেড় দিয়ে যে সরস্বতী নদীর ধারা রয়েছে, দুটো কলঘর তার দুই প্রান্ত সীমায়। যে বারান্দাগুলির কথা হল, সেগুলি সব নদীর পাড় বরাবর। সব অভিজ্ঞতাই হরিদার নদীর গল্পের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

ছিন্ন চিন্তা সূত্র

বেল বাজছে। পরীক্ষা শেষ। বাসব আসছে খাতা গুছিয়ে। ওকে বলি আজ কী হল। বাসব মিতভাষী। মুচকি হেসে বলল, ও কিছু নয়, ডাক্তার বাবু জানান দিলেন, উনি সব নজরে রাখছেন। ডাক্তার বাবু মানে তিনকড়ি ঘোষ, যাঁর জমি, বাড়ি ভূসম্পত্তির ওপরে দাঁড়িয়ে আছে এই কলেজ। তাঁরই গুরুর নামে এই কলেজের নাম দিয়েছেন, প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজ। নিজের কথা যাতে প্রচার না হয়, একটা ছবিও তিনি রাখেননি। আমরা কেউ ডাক্তার বাবুর ছবি দেখিনি। ধুর্ বাসব তো মজা করে বলছে। যা এতকাল ধরে শুনছি, সেই অদ্ভুত অভিজ্ঞতা,আজ কি তবে আমার নিজের হল?

পর্ব দুইঃ অতীন্দ্রিয়

শেষ পর্যন্ত বেড়ালের ভাগ‍্যে শিকে ছিঁড়ল। স্থায়ী চাকরিতে যোগ দেওয়ার দশ বছর পরে অবশেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগে আমি পি এইচ ডি করার জন্য নির্বাচিত হলাম। চাকরির প্রথম দিকে ডিপার্টমেন্টটা শূন্য থেকে শুরু করে তাকে দাঁড় করাতেই মেতে ছিলাম। যখন সম্বিত ফিরল তখন অনেক বছর দেরি হয়ে গেছে। সুযোগ পাচ্ছিলাম না। যা হোক কাজটা ভালো ভাবে করার জন্য ইউ জি সি তে ফ‍্যাকাল্টি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে দুবছর ছুটির আবেদন ক‍রলাম। প্রভু জগদ্বন্ধুর কৃপায় ছুটি মঞ্জুরও হল। ২০০৮ এর ডিসেম্বরে আমার পড়ার ছুটি শুরু হল। ঐসময়ে রোজ বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে হাজিরা খাতায় সই করতে হত। শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি। তাই সপ্তাহের ঐ দিন গুলো তে কলেজে গিয়ে আমি এন এস ও ইউ এর কাজ করতাম।
দিনটা ছিল ২০০৯ সালের পাঁচই সেপ্টেম্বর। শিক্ষক দিবস। এবং অবশ্যই শনিবার। সবকিছু স্পষ্ট মনে আছে। এজীবনে ভুলতে পারবোনা। আজকাল সকলের চলভাষে ক‍্যালন্ডার থাকে, তাই যে কেউ পরীক্ষা করে দেখে নিতে পারে, আমি ভুল বলছি কিনা। মেঘলা দিন, মাঝে মাঝে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিল। বাসুবাবু খবর পাঠিয়েছেন একষট্টিটা হোম অ্যাসাইনমেন্টের খাতা দেখে দিতে হবে আমাকে। সারা সপ্তাহ জুড়ে গবেষণার নানা কাজের ধকল। ক্লান্ত ছিলাম, কিন্তু বাসুবাবুর কথা তো ফেলা যায়না। সময়ের মধ্যে করে দিতেই হবে আমাকে। শনিবার একটা পনেরোয় কলেজের ক্লাসের ছুটি হলে আমাদের দূরশিক্ষা কেন্দ্রের ঝাঁপ খোলা হত। দুপুর একটা নাগাদ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে উপস্থিত হলাম। একষট্টিটা খাতা একরকম নয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন ভূগোল অনার্সের সঙ্কেত GEOA, এখানে সঙ্কেত হল EGR। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বর্ষের দ্বিতীয়, চতুর্থ আর ষষ্ঠ সন্মাষ মিলিয়ে, হরেক মডিউলের খাতা মিলে মিশে রয়েছে। আলাদা আলাদা করে গুছিয়ে, মূল‍্যায়ন করে বেঁধে দিতে হবে, আজকের মধ‍্যেই। পুরোনো বাড়িতে দোতলায় আমাদের কেন্দ্রের অফিসটা খুব ছোট ছিল। তাই খাতাগুলো একতলায় আমাদের স্টাফরুমের টেবিলে নিয়ে এসে ছড়িয়ে বসলাম। সবরকম মডিউলের জন্য একটা করে প্রশ্নপত্র বাসুবাবু গুছিয়ে দিয়েছেন। সেগুলো সঠিক বান্ডিলে গুঁজে দিলাম। আজ দর্শন বিভাগে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানের জন্মদিন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, জিগীষা। এই দিনটা ওরাই পালন করে। ছাত্রছাত্রীরা ডাকতে এসেছে। আমার খুবই ইচ্ছে করছিল যেতে, কিন্তু বাসুদাকে আমি কথা দিয়েছি। অগত্যা আমি একাই বড় ঘরে প্রশস্ত টেবিলে খাতা দেখতে শুরু করলাম। বাকি সকলে অনুষ্ঠান দেখতে তিনতলায় সাঁইত্রিশ নম্বর ঘরে চলে গেল। সময়ের অত হিসেব ছিলনা। সহকর্মীরা যখন হৈ হৈ করতে করতে আর অনুষ্ঠান সম্পর্কে আলোচনা করতে করতে নেমে এল, তখন ঘড়িতে দেখলাম বিকেল সাড়ে তিনটে। ওরা সব যে যার ব‍্যাগ গুছিয়ে বাড়ির পথ ধরল। আমার তখনও প্রায় চল্লিশটা খাতা বাকি। বেজার মুখে টিফিনটা খেয়ে নিয়ে আবার খাতা দেখায় মন দিলাম। মাঝখানে প্রণবদা এসে জিজ্ঞেস করেছিল, দিদিমণি আর কতক্ষণ? আমি বললাম, আজ একটু সময় লাগবে।
– ঠিক আছে ওদিকটা বন্ধ করে দিচ্ছি।
– দিন, এদিকে খোলা থাকলে চলবে।

ওদিক মানে মাঠের দিকের বারান্দার দরজা, যেদিক দিয়ে ছাত্রছাত্রী এবং অন্যান্য বহিরাগত অতিথি যাতায়াত করে। এদিক মানে লাল বারান্দার দিকে দরজা, যেদিক দিয়ে আমরা যাতায়াত করি। আমাদের স্টাফরুম দুটো লাগোয়া ঘর মিলিয়ে। দুটো ঘরের মধ্যে যাতায়াতের পথ আছে, কিন্তু কোনো দরজা বসানো নেই। লাগোয়া ঘর দিয়েই মাঠের দিকে এবং  কলেজের বাইরে যাওয়া হয়। আমাদের ক‍্যান্টিন আর কলঘর দুটোই ওখানে। ওঘরের দুটো দরজা এখন বন্ধ, তাই ঘুটঘুটে অন্ধকার। পুরো একতলাটায় এখন আমি একাই আছি। শুধু মাঠে এন সি সি এর কুচকাওয়াজ চলছে। মাঠের চারিধারে মার্চ করতে করতে দলটা যখন এদিকে আসছে, তখন সেই আওয়াজ ভেসে আসছে। আমি একমনে খাতা দেখে চলেছি। হঠাৎ মনে হল পাশের ঘরে কেউ ঘড়ঘড় করে ভারি কাঠের চেয়ার টানছে। খুব অবাক হলাম, ওঘরে তো কেউ নেই। ঢুকলে এঘর দিয়ে আমার সামনে দিয়ে ঢুকতে হবে। নিজেকে বোঝালাম আমার মনের ভুল। হয়তো দোতলায় আমাদের কেন্দ্রের অফিস ঘরে কেউ চেয়ার টেনেছে। অথবা হয়তো মাঠের দিকের বারান্দায় আমাদের এন সি সি অফিসার পলাশ চেয়ার টেনে দরজার ওপাশে বসল। নিজের মন কে যতই বোঝাই আমার ভিতরে আর একটা মন স্পষ্টভাবে বলতে লাগল দোতলায় বা বাইরে নয়, পাশের ঘরে খুব কাছে চেয়ার টানা হয়েছে।

সাত পাঁচ ভাবনা সরিয়ে রেখে খাতা দেখছি। লেলো এসে স্টাফরুমে ঢুকলো। আমাদের কলেজের নাইট গার্ড হিমদা মানে হিমলাল শর্মা তিনটে নেড়িকুকুরের ছানা পুষেছিল। লালটার নাম লেলো আর কালোটা কেলো। সাদা পাটকিলে মেশানোটার যে কি নাম ছিল এখন ঠিক মনে পড়ছেনা, ধরে নিলাম ধলো। এখন তারা পূর্ণ বয়স্ক। যেমন ডাগর তেমনি নধর। কলেজে তারা রাজার মতো অবাধে ঘুরতো। লাল বারান্দায় কাউন্টার করার জন্য একটা জোড়া বেঞ্চি রাখা থাকতো। সেটার হাই বেঞ্চে তিনজন পাশাপাশি সারি দিয়ে বসে রাস্তা দেখতো। আমার সঙ্গে তাদের বিশেষ কোনো বন্ধুতা ছিলনা, শত্রুতাও না। বলা যেতে পারে একটা স্বাভাবিক মুখচেনা সৌজন‍্যের সম্পর্ক ছিল। লেলো, কেলো, ধলো তিনজনেই নিয়ম করে, বিকেলের দিকে স্টাফরুমে ঢুঁ মারতো। কখনো একসাথে আসতো বা কখনো একা। বিকেলে ঘরটা একটু ফাঁকা থাকে। টেবিলের নিচে কোনো খাবারের টুকরো পড়ে আছে কিনা সেটা নিশ্চিন্তে তদন্ত করা যায়, ভালো কিছু পাওয়া গেলে মৌজ করে খাওয়া যায়। অনেক সুবিধে আছে। আমি সচরাচর ক্লাসের পরে পাঁচটা, সাড়ে পাঁচটা নাগাদ ঐঘরে বসে টিফিন খেতাম। সারাদিন খাওয়ার সময় হতোনা। মনেও থাকতো না। তাই আমার সাথে ঐসময়ে ওদের নিয়মিত দেখা হত। শনিবারে হাফছুটি। তাড়াতাড়ি ঘর ফাঁকা হয়ে যায় বলে ওরা চারটে থেকে যাতায়াত করত। শনিবারে আমার দূরশিক্ষা কেন্দ্র চলত বলে সেদিনও দেখা হত।  একসাথে এলে ওরা একটি কর্তব্যকর্ম নিয়মিত করে যেত। পাশের লাগোয়া ঘরে ক‍্যান্টিনের খাবারের অবশিষ্টাংশ ফেলার জন্য একটা বেশ বড় সাইজের উঁচু ড্রাম রাখা থাকত। ওদের পক্ষে মুখ বাড়িয়ে সেখান থেকে খাওয়া সম্ভব হতনা। তাই একজন লাফ দিয়ে ড্রামের কানায় উঠে মুখটা ভিতরে রেখে বাকি শরীরটা বাইরে ঝুলিয়ে দিত। আর বাকি দুজন বিপরীত দিক  থেকে মাথা দিয়ে ঠেলা মারত। মিলিত প্রচেষ্টায় ড্রামটা ওরা উল্টে দিত। আর পুরো ঘরটা থৈ থৈ করত, সঙ্গে একটা মিশ্র সুবাসে চারিপাশটা ম ম ক‍রত।

কলেজের এই পুরোনো বাড়ির দেওয়ালগুলো খুব মোটা, কাদার গাঁথনি। জানালা গুলো দরজার মতো লম্বা। বাড়িটার বয়সও অনেক। কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে এখানে একটা ব‍্যাঙ্ক ছিল। সেই ব‍্যাঙ্কের কাউন্টারটাতেই এখনো কলেজের ক‍্যাশ, ফর্ম সবকিছুর দেওয়া নেওয়া হয়। ঘরগুলো খুব ঠান্ডা, একেবারে প্রাকৃতিক ভাবে যাকে বলে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত। অনেক গরমের দুপুরে স্টাফরুমে বসতে গিয়ে দেখেছি, লেলো কেলো কেউ একটা টেবিলের তলায় ঘরের লাল সিমেন্টের মেঝেতে পায়ের কাছে দিব‍্যি ঘুম দিচ্ছে। তাই লেলোর এই সময়ে এঘরে আসাটা অত‍্যন্ত স্বাভাবিক। ও প্রথমে আমার টেবিলের তলায় একটুখানি ঘুরঘুর করল। আর ওকে দেখতে গিয়ে দরজা দিয়ে লাল বারান্দার গ্রিল পেরিয়ে বাইরের রাস্তায় আমার নজর পড়ল। বাইরে একটা ঘ‍্যানঘ‍্যানে মনখারাপ করা বৃষ্টি হচ্ছে। লেলোর রুটিন পারফেক্ট। কারণ ঘড়িতে এখন বিকেল চারটে দশ। কিন্তু মেঘের জন্য বাইরেটা বেশি অন্ধকার দেখাচ্ছে। এমনদিন আমার একদম ভালো লাগেনা। লেলো বোধহয় আজ এঘরের মেঝেতে তেমন কিছু পেলোনা। ওদের প্রিয় পাশের ঘরটায় ঢুকে গেল। অন্ধকারে ওদের চোখ জ্বলে, তাই কোনো অসুবিধে নেই। শুধু দু তিন মুহূর্ত, একটা নতুন খাতা খুলেছি সবে। হঠাৎ একটা শ্বাসের শব্দ। চমকে দেখি লেলোর মুখটা একটু ওপরদিকে তোলা। পিঠ ধনুকের মতো বাঁকানো। জোড়া পায়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে লেলো ছুটে অন্ধকার ঘর পেরিয়ে আমার দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ওর ঐ অবস্থা দেখে আমি তো হতবাক। আমার এখনো কুড়ি বাইশটা খাতা বাকি আছে। ভাবলাম লেলোর কিছু মনে পড়ল বলে, হয়তো ছুটল। এরপর মিনিট দশেক ও কাটেনি। পাশের ঘরে আবার ভারি চেয়ার টানার শব্দ। এবারে আমি সতর্ক ছিলাম। তাই মন বোঝানোর মতো আমার কাছে আর কোনো যুক্তি ছিলনা। এবারে স্কুলে যেমন শিখেছিলাম, বিবেকানন্দের মুখ কল্পনা ক‍রে গভীর ভাবে শ্বাস নিয়ে কাজ শেষ করার সঙ্কল্প দৃঢ় করলাম। আধঘণ্টা পরে লেলোর মতোই কেলো এসে ঘরে ঢুকল। আমার টেবিলের তলায় ঘুরল, ওঘরে ঢুকল আর দু তিন মুহূর্ত পরে ঠিক একই ভঙ্গিতে ছুটে বেরিয়ে গেল। আমি ছবি হয়ে দেখলাম। এবারে আমার বুক কেঁপে গেল। দেওয়ালে আমার মাথার উপরে প্রভু জগদ্বন্ধুর এক বিশাল তৈলচিত্র, যেন জীবন্ত। কলেজের রজত জয়ন্তীতে তৈরি করা হয়েছিল। প্রভুর মুখের দিকে তাকাই।
তুমি তো জানো প্রভু  কর্তব‍্যে কখনো হেলা করিনি। জানিনা এখানে কী ঘটছে, আজ আমার সহায় হও।

প্রভুর মুখে স্মিত হাসি। কী হল জানিনা। মনে একটা অদ্ভুত জোর পেলাম। কিন্তু ভিতর থেকে আর একটা মন সতর্ক করছিল, এখানে একা থাকা আর উচিত হবেনা। ঠান্ডা মাথায় সব খাতা আলাদা করে বেঁধে নিলাম। লাগোয়া অন্ধকার ঘরে ঢুকে, হাতড়ে হাতড়ে সুইচ বোর্ড খুঁজে আলো জ্বালালাম। ঘরটা খুঁটিয়ে দেখলাম, না কোনো চেয়ার অগোছালো নেই। প্রণবদা যেমন সাজিয়ে রেখেছিল, ঠিক তেমন। এতটুকু এদিক ওদিক কিছু নেই। সাত আটটা খাতা বাকি ছিল। সেগুলো নিয়েই, ওপরে বাসুদার কাছে উঠে গেলাম। কিন্তু অফিসে ঢোকার সময়েই হঠাৎ ঝপ করে লোডশেডিং হয়ে গেল। নিজেকেই সাধুবাদ দিলাম ঠিক সময়ে চলে এসেছি বলে। আর একটু দেরি করলে ঐঘরে থাকাকালীন আলো নিভে যেত। আর না জানি কী হত, হার্ট অ্যাটাক ও হতে পারত হয়তো আমার।
ওখানে বসে বাকি কাজ শেষ করলাম। কিন্ত মেলাতে গিয়ে এক কান্ড। প্রায় দশটা খাতায় যোগে ভুল। বাসুবাবুর মুখ গম্ভীর। কী ব‍্যাপার দিদি, আপনার এভাবে ভুল তো হয়না। শেষের দিকে আমার মনসংযোগ নড়ে গিয়েছিল। আমি কি অবচেতনে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, একা ছিলাম বলে? সবই কি আমার মনের ভুল? আজও এর উত্তর খুঁজে বেড়াই।

এই ঘটনার পর আজ বারোবছর হল, অ্যাডমিশন বা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন যাই হোক, সন্ধ‍্যে পর্যন্ত কাজের জন্য অফিসে থাকলে, সই করার জন্য ঐ স্টাফরুমে আমি একা কখনও আর ঢুকিনি। কোনো স্টাফকে সঙ্গে নিয়ে যেতাম। স্টাফ কাউকে না পেলে ইউনিয়নের ছেলেদের কাউকে ডেকে নিয়ে যেতাম। ওরা আগে ঘরে ঢুকে আলো জ্বালিয়ে দিত, তার পরে আমি ঢুকতাম। এখন তো আর ঐ পুরোনো বাড়িতে অফিস বা স্টাফরুম কিছুই নেই। নতুন বিল্ডিং প্ল‍্যান পাশ করানো আছে। পুরোনো বাড়ির গেটের ওপরে নেতাজী সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট্ট অফিসটাও ভাঙা পড়েছে। যেকোনো দিন পুরো বাড়িটাও ভাঙা পড়ে নতুন বাড়ি উঠবে। এখন সবই চলে এসেছে, নতুন সুবর্ণ জয়ন্তী ভবনে। সেবাড়ি নিয়েও এক গল্প।

তৃতীয় পর্বঃ সুবর্ণ জয়ন্তী

আজকে যেখানে সুবর্ণ জয়ন্তী ভবন এবং অ্যানেক্স বিল্ডিং রয়েছে, সেই জায়গায় একটা বিরাট ভিত তৈরি করা ছিল। কলেজে যোগ দিয়ে শুনেছিলাম ওখানে অডিটোরিয়াম হবে। আরও শুনেছিলাম ওখানে ভিত খুঁড়তে গিয়ে সুখাসনে বসা অবস্থায় একটি মানব কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল। সম্ভাব্য কারণ হিসেবে জানতে পারলাম আন্দুল হল শাক্ত ও বৈষ্ণবদের সহাবস্থানের জায়গা, হয়তো বা সংঘাতেরও। এই সরস্বতী নদী যা কলেজ বেড় দিয়ে আছে, তাহল শাক্ত ও বৈষ্ণব প্রভাবিত অঞ্চলের সীমারেখা। এদিকটা মানে কলেজের দিকটা হল বৈষ্ণবদের। এদিকের স্থান নামেই তার পরিচয়। আ-ন-দু-ল শব্দটাই নাকি আনন্দধূলি থেকে। মহাপ্রভুর নীলাচল যাত্রাপথে নামসংকীর্তনে মাতোয়ারা  ভগবান ও ভক্তদের পদধূলিতে ধন্য এই ধূলি। প্রভু জগদ্বন্ধুও একজন বৈষ্ণব ধারার সাধক। নদীর ওপারটা যে শাক্ত প্রভাবিত, তার প্রমাণ হিসেবে কলেজের পুরোনো লোকেরা বললেন, ওপাশে আছে বাংলায় বিখ্যাত কালীকীর্তন সমিতি। ঐ সমিতির ভক্তিগীতির ক‍্যাসেট আমি রামকৃষ্ণ মিশনে দেখেছি। যাইহোক, বৈষ্ণবদের সুখাসনে বসিয়ে সমাধি দেওয়া হয়। জানিনা কার কঙ্কাল, কতদিন আগেকার মানুষ তিনি, কলেজের মাটির তলায় যিনি চিরশান্তিতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। বিভিন্ন কারণে ওখানে অডিটোরিয়াম নির্মাণ করা যায়নি। পরে অধ‍্যক্ষ কালাচাঁদ সাহা ওখানে লেডিস হোস্টেল তৈরি করতে চেয়েছিলেন। ইউ জি সি থেকে গ্রান্ট ও এসে গিয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতি এমন জটিল হয়ে ওঠে, যে সেটাও সম্ভব হয়নি। পুনর্বার চেষ্টা করতে গিয়ে ধরা পড়ে ওই জমির পড়চায় প্রাক্তন অধ‍্যক্ষ বিশ্বনাথ ঘোষের নাম আছে, কলেজের নাম নেই। সব মিলিয়ে বারবার বাধার পাহাড় তৈরি হয়ে যাচ্ছিল। কোনো ভাবেই কোনোকিছু নির্মাণ করা যাচ্ছিলনা। দিনের পর দিন বিডিও অফিসে, আর আই অফিসে, ল‍্যান্ড রেভিনিউ অফিসে ধর্না দিয়ে পড়ে থাকতাম বাসুবাবু আর আমি। শেষ পর্যন্ত কলেজের সুবর্ণ জয়ন্তীতে সীমাদি প্রস্তাব দিলেন, এত বাধা পড়ছে ঐ জমিতে,  প্রভুর পুজোর দিন একটু পুজো করে নিলে ভালো হয়। হতাশ এবং বিধ্বস্ত আমরা মেনে নিলাম এই প্রস্তাব। সীমাদি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্যা, কলেজ থেকে হেডক্লার্ক হিসেবে কিছুদিন আগে অবসর নিয়েছেন। প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবসে প্রভুর পুজো হয়। কারণ ঐদিন কলেজের প্রতিষ্ঠা দিবস। ২০১৪ সালের পনেরোই অগাস্ট প্রভুর পুজোর পরে পুরোহিত মশাই এসে এই জমিতে পুজো করেছিলেন। সকলের সম্মিলিত শুভকামনার জোরে অবশেষে মেঘ কেটে যায়। কলেজে নতুন অধ‍্যক্ষ সুব্রত বাবু যোগ দেন এবং একটি নয় দুটি নতুন ভবন ঐ জমিতে নির্মিত হয়। ২০১৭ সালে সুবর্ণ জয়ন্তী ভবনে কাজকর্ম শুরু হওয়ার পরে এখানে কারোর মুখেই কোনো অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতা আমি শুনিনি। এই ভবন আমাদের গর্ব, আমাদের সম্মিলিত সংগ্রামের প্রতিরূপ।

চতুর্থ পর্বঃ  সোনাঝরা দিন

স্টাফরুমে অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার কথা বললাম বলে পাঠক দয়া করে ভেবে নেবেননা যে  ওখানে কোনো ভয়ের ব‍্যাপার ছিল।
আমাদের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ‍্যাপক শ‍্যামল সেনগুপ্ত ছিলেন এক পন্ডিত, রসিক ও বর্ণময় মানুষ। তিনি কলেজে থাকলে হাসিগল্পে স্টাফরুম মাতিয়ে রাখতেন। গ্লকোমায় তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছিলেন বটে, কিন্তু তাঁর অনুভব আর স্মৃতিশক্তি দেখে আমাদের তাক লেগে যেত। প্রথম যেদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হল, সেদিন তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কলেজে ট্রেনে আসা হয় না বাসে? আমি বললাম বাসে। তিনি বললেন সাবধানে চলাফেরা কোরো, গীতায় বলেছে বাসাংসি জীর্ণানি। আমি রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্রী, ক্লাস ফাইভ থেকে গীতা পড়েছি। বাসাংসি জীর্ণানির অনুষঙ্গ আমার ভালোই জানা ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে যে কেউ রাস্তার লজঝড়ে বাসের প্রসঙ্গ টেনে আনতে পারে, এটা মাথায় আসেনি। প্রথম আলাপেই পক্ককেশ শ‍্যামলদার ভক্ত হয়ে গেলাম। আমি তখন উত্তর পূর্ব কলকাতা থেকে দক্ষিণ পশ্চিম হাওড়া যাতায়াত করছি। প্রথম দিকে দীর্ঘ যাত্রা শেষে কলেজে এসেই আমার খুব খিদে পেয়ে যেত। ক্লাসে যাওয়ার আগেই টিফিন বক্স খুলে খেতে বসে যেতাম। স্টাফরুমে সকলে হাসতো। আমার একমাস পরে যোগ দেওয়া বল্লরীদি নতুন এসে সবার সামনে খেতে লজ্জা পেত, আর ওর পেটব্যথা করতো। ভূগোল বিভাগের এই দুটো মেয়েকে বড়রা যেমন স্নেহ করতেন, তেমনি আমাদের নিয়ে মজাও করতেন কম নয়। স্বভাব অনুসারে, শ‍্যামলদা আমার নাম রাখলেন বৃহৎদতী আর বল্লরীদির নাম হল মৃদুদতী। কমার্স বিভাগে ছিলেন রঘুদা। স্টাফরুমে তিনি ডেকে ডেকে ইংরেজিতে কীর্তন শোনাতেন।  ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে তাঁর পাতা ফাঁদ এড়ানো খুব মুস্কিল ছিল। একটু উদাহরণ দিই।
– এ-ই যে! কলেজ চলছে বাড়ি যাচ্ছিস যে বড়।
– না মানে খেতে যাচ্ছি স‍্যার।
– কোন বিষয়ে পড়া হয়?
– বাংলা স‍্যার।
– ও – ও, বাংলা, পরীক্ষা তো এসে গেল, সাজেশন নিবিনি?
– সাজেশন! দিন না, স‍্যার, দিন না।
– কাল দেব। এখন বল দিকিনি … ঐ নামটা ধরে কোন স‍্যারকে ডাকছিলি?
অলমিতি বিস্তারেণ। ব‍্যাখ‍্যা নিষ্প্রয়োজন। আর ছিলেন সুশান্তদা, অর্থনীতিতে সুপন্ডিত। তিনি আবার আমাদের রাজ‍্যের একজন মাননীয় সাংসদ ছিলেন। কলেজে ভূগোল বিভাগ খোলার ব‍্যাপারে তিনিই ছিলেন প্রধান উদ‍্যোক্তা। আমরা এসে ঠিকঠাক পড়াচ্ছি কিনা সেবিষয়ে তিনি রীতিমতো খোঁজখবর করতেন। তখন ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাদের বয়সের তফাৎ কম ছিল, তাই সুশান্ত বাবুর সবকথাই তারা আমাদের বলে দিত। এই নিয়েও স্টাফরুমে নানা মজা হত। ইতিহাস বিভাগে ছিলেন দুই হরিহর আত্মা শান্তি বাবু আর স্নেহাদ্রি বাবু। স্নেহাদ্রি বাবুর দশাসই চেহারা, এন সি সি করাতেন, ছাত্র বিক্ষোভ একা দাঁড়িয়ে সামাল দিতেন। তাই অভিন্ন হৃদয় বন্ধু শান্তিবাবু তাঁর নাম রাখলেন পারভেজ মুশারফ। আবার অধ‍্যক্ষ কালাচাঁদবাবু আমাদের প্র‍্যাকটিকালের সুবিধে হবে বলে, ক্লাসরুমের পাশে একটা ছোট অফিস রুম করে দিয়েছিলেন। সারাদিন সেখানে কেটে গেলে, স্টাফরুমে খোঁজ পড়ত শারদা – বল্লরী কোথায় গেল? দর্শন বিভাগের নিমাইদা দুটো নাম বলতে অসুবিধে হয় বলে, ছোট করে জিজ্ঞেস করতেন শাল্লরী কই? রঘুদা একবার খবর আনলেন, সুশান্ত বাবুর মুখটা লম্বা তাই স্টুডেন্ট মহলে ওনার নতুন নাম হয়েছে ল‍্যাংচা। আর আমার মুখটা যেহেতু গোল চাকা, আমার নাম হয়েছে নান রুটি। ব‍্যাস স্টাফরুমে হুল্লোড় পড়ে গেল। শ‍্যামলদা আমার নাম দিয়ে দিলেন নান থেকে ‘নানু’। শ‍্যামলদা বহু দিন হল অবসর নিয়েছেন, অদ‍্যাবধি তাঁর ফোন পাই – নানু ভালো আছ তো?ছোট বড় সকলে মিলে স্টাফরুমে অনাবিল আনন্দ আর আন্তরিকতার স্রোত বয়ে যেত। কলেজের গন্ডির বাইরেও সেই স্রোত আগলে রাখতো। বটানি বিভাগে ছিলেন প্রজ্ঞা দি। তখন নতুন বিয়ের পরে হাওড়ায় ঘর ভাড়া নিয়েছি সদ‍্য, আপনি কোপনির সংসার। প্রজ্ঞাদি বলে রেখেছিলেন, বাড়ির বাইরে পা রাখলে আমাকে একটা টেলিফোন করবে। সেই কথা মেনে চলতে হত, নইলে জুটতো অজস্র বকুনি। বাইরের যে কাউকে কলেজের গল্প শোনালে তারা অবাক হয়ে যেত, বলতো তোদের কলেজটা এত ভালো!

পঞ্চম পর্বঃ লাইব্রেরির কথা

কলেজে স্টাফরুমের সঙ্গে সঙ্গে লাইব্রেরিও ছিল তুমুল আলাপ আলোচনার জায়গা। তখন কম্পিউটারের যুগ শুরু হয়নি। মোবাইল ফোনও ভবিষ্যতের গর্ভে। তাই নিয়মিত সকলকেই লাইব্রেরি যেতে হত। কেবল কফি কাপের বদলে সঙ্গী হত মুড়ি। প্রথমদিকে পুরোনো ভবনের দোতলায় লাইব্রেরি ছিল। এখানে আন্দুল রাজবাড়ির দুটি রাজসিক আলমারি আছে। আর তার মধ্যে আছে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিয়ার সম্পূর্ণ সংগ্রহ। প্রথম যখন এই লাইব্রেরি আমি দেখি, এর সংগ্রহ দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমি বহু কলেজে পরীক্ষা নিতে গেছি। সেখানকার লাইব্রেরি দেখেছি, কিন্তু এত বড় সংগ্রহ খুব কম জায়গায় আছে। পি এইচ ডি করার সময়ে নানারকম বইয়ের সাহায্য এখান থেকে পেয়েছিলাম। সমৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লাইব্রেরি হল এই কলেজের আর এক রহস্যময় জায়গা। কেন একথা বললাম, সেই প্রসঙ্গে আসি। এই লাইব্রেরিতেই এক ঘরোয়া আলোচনায় শুনেছিলাম, কলেজের প্রথম হিসাবরক্ষক অরুণবাবু, লাইব্রেরিয়ান বদ‍্যিনাথবাবু আর যে হেডক্লার্কের কাছে আমি জয়েন করেছিলাম, সেই অনিলবাবু তিনজনেই গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, এই লাইব্রেরিতে অতিপ্রাকৃত কিছু আছে। কোনো নিশ্চিত অনুভব তাঁদের এই বিশ্বাসের পিছনে ছিল। এমনও শুনেছিলাম লাইব্রেরি ফাঁকা থাকলে ভর্তি মনে হয়, যেন অনেকে আছে। কিন্তু খুঁজতে গেলে কেউ নেই। অরুণবাবু আর বদ‍্যিনাথবাবু আমার যোগ দেবার আগেই অবসর নিয়েছেন। তাই তাঁদের সঙ্গে মোলাকাতের সুযোগ ছিলনা। আর বড়বাবু অনিল লাহা ছিলেন রাশভারী, নিয়মানুবর্তী এবং কড়া ধাতের মানুষ। কেমন একটু উদাহরণ দিই। অরুণ বাবুর পরে যিনি হিসাবরক্ষক হলেন সেই তাপসদার কাছে গল্পটা শুনেছি। তাপসদা তখন তরুণ তুর্কি। সদ‍্য বিয়ের পরে শ্বশুর বাড়ি যেতে হবে। একদিনের জন্য ছুটি চাইতে গেছে বড়বাবুর কাছে। পাওনা ছুটি থাকলেও নেবার উপায় নেই। বড়বাবু যদি বোঝেন সত‍্যি দরকার আছে, তবেই দেবেন। বুঝিয়ে সুজিয়ে ছুটির অনুমতি মিললো বটে, কিন্তু ট্রেনের সঙ্গে সময় মিলিয়ে, নটায় তাপসদাকে কলেজে এসে সই করে যেতে হবে। তাপসদা নটায় কলেজে গিয়ে দেখে, ঘড়ি ধরে সকাল সাড়ে আটটা থেকে অনিলবাবু কলেজে বসে আছেন। পরবর্তীতে এই শাসনের ফল এমন হল যে ছুটির দিন এলেই তাপসদার টেনশন বেড়ে যেত, আবার ছুটি! বাড়িতে কী করব দিদি?  আজকাল অবশ্য এমন করে চাকরি করা শেখানো মানুষেরা অবলুপ্ত হয়েছেন। এমন শিক্ষার্থীও পাওয়া যায়না। কমার্সেও একজন সৌম‍্য শান্ত, হাসিমুখ অনিলবাবু ছিলেন। বছরের পর বছর হাসিমুখে কলেজ অ্যাডমিশনের ঝড় সামলে যেতেন। দুই অনিলের বয়স প্রায় এক। কিন্তু শিক্ষক অনিলবাবুকে আমরা অনিলদা বলে ডাকতাম, অফিসের অনিলবাবুকে বড়বাবু। তাঁকে দাদা সম্বোধনের সাহস ছিলনা। তাই কলেজের ভুতের গল্প বলুননা বড়বাবু, এমন বায়না করাও সম্ভব ছিলনা। তাবলে বায়না আমার কম ছিল এমনও নয়। ফিজিক্সের সুদেব বাবু ছিলেন কলেজের পাশেই, সরস্বতীর ওপারে আন্দুল রাজবাড়ির জামাই। ভারি ভদ্র এবং শিষ্ট মানুষ। তিনি কলেজের বার্সার ছিলেন। তাঁকে ধরতাম, রাজবাড়ির ইতিহাস বলুন, ওখানেও কি ভূত আছে নাকি? রাজবাড়ি নিয়ে চলুন, আমি দেখব ওখানে কী আছে, নাচঘরে কি নুপূরের আওয়াজ শোনা যায়? সত‍্যজিত রায়, ছবি বিশ্বাস কি জলসাঘরের সময়ে সত্যি এখানে এসেছিলেন?  রাজবাড়ির পিছনে অত থাম কিসের? সুড়ঙ্গ টা কোথায়? – ইত‍্যাদি নানা প্রশ্ন করে করে ওনাকে পাগল করে দিতুম। উনি বলতেন – উফফ্ এখন ছাড় দিকিনি, মেলা কাজ পড়ে আছে। প্রিন্সিপালকে সব কাজ শেষ করে রেডি করে দিতে হবে। যাহোক সুদেব বাবু আমাদের রাজবাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। মাঝখানে গথিক থামওয়ালা নাচঘরের দুপাশে কাছারি বাড়ি। দুই দিকে দুই তরফ থাকে। একদিকে সুদেববাবুর শ‍্যালকের পরিবার, অন‍্যদিকে ওনাদের কাকার পরিবার। এও শুনলাম রাজবাড়ি থেকে সুড়ঙ্গ গেছে উনসানির দিকে, বোধহয় উনসানিতে যেখানে জি টি এস টাওয়ার আছে, সেইদিকে। ১৮১৮ সালে ইংরেজ আমলে সার্ভেয়ার জেনারেলের তত্ত্বাবধানে সারা ভারতবর্ষের মানচিত্র নির্মাণের জন্য গ্রেট ট্র‍্যাঙ্গুলেশন সার্ভে শুরু হয়েছিল। বাংলার সমতল জায়গায় ছিল না কোনো পর্বত শৃঙ্গ, বা লক্ষ বছরেও স্থান পরিবর্তন করবেনা এমন কোনো কন্ট্রোল পয়েন্ট। উল্টে এখানকার বদ্বীপীয় নদী গুলো সব সময় স্থান পরিবর্তন করে। প্রাকৃতিক কোনো স্থায়ী কন্ট্রোল পয়েন্ট এখানে নেই, যা অনেক বছর পরেও সার্ভে রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। তাই ইঁটের টাওয়ার করে বাংলা জুড়ে কন্ট্রোল পয়েন্ট তৈরি হয়েছিল। এখনকার স্থানীয় লোকে এসব ইতিহাস ভুলে গেছে। লোকমুখে কোথাও কোথাও এই ভাঙা টাওয়ারগুলোকে  গীর্জা বলা হয়। খড়দার কাছে এমন সুখচর গীর্জা দেখেছি। বোধহয় ইংরেজরা করেছিল বলে এমন নাম। ২০১৮ তে ইংল্যান্ডের বেলফাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আর সার্ভে অফ ইন্ডিয়া মিলে ন‍্যাশানাল লাইব্রেরির ভাষা ভবনে দু’শ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেখানে আমি গিয়েছিলাম। উনসানির রাস্তায় এমন একটা টাওয়ার আছে। যদিও কোনো প্রামাণ্য নথি পাইনি, কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা মানে যাকে বলে সারকামস্ট‍্যান্সিয়াল এভিডেন্স, সেটা বিচার করে আমার এই ধারণা হয়েছে। রাজবাড়ির সুড়ঙ্গের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভিতরে নাকি লক্ষ সাপের আস্তানা। কলেজেও সাপের গল্প আছে। সুযোগ হলে পরে বলা যাবে। লাইব্রেরিতে ফিরে আসি। পুরোনো বাড়ির হালত খারাপ, তাই অত বইয়ের আলমারির চাপ রাখা ঠিক হবেনা, এই ভেবে অধ‍্যক্ষ কালাচাঁদবাবু লাইব্রেরির স্থান পরিবর্তন করলেন। তখনকার নতুন ভবনের তিনতলায়, মানে হিসেব মতো কলেজ ভবনের একেবারে উত্তর দিকে, সরস্বতীর পাড়ে। যখন আমরা প্রিজম‍্যাটিক কম্পাস সার্ভে করি, চুম্বকের কাঁটা লাইব্রেরির দিকে স্থির হয়। ঐ জায়গাটা হল চতুর্ভুজাকৃতি কলেজ ক‍্যাম্পাসের একটা কোণ। এই কোণে সরস্বতীর পাড় আর কলেজ ভবনের দূরত্ব সবচেয়ে কম। আমাদের আর একজন প্রাক্তন লাইব্রেরিয়ান মীরাদির মুখে এই স্থান পরিবর্তনের সময়ে ঘটা অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি। ২০০১ সালে যখন নতুন জায়গায় সব বইয়ের আলমারি এবং বইগুলো সরানো হচ্ছে, তখন মীরাদি সেই বই গোছানোর দায়িত্বে ছিলেন। গরমের ছুটিতেও কাজ চলত। আন্দুল রাজবাড়ির যে দুটি আলমারি কলেজে আছে, সে দুটি তখন সদ‍্য নতুন ভবনে স্থানান্তরিত হয়েছে। আলমারি দুটো দেওয়াল জোড়া, ছাদ পর্যন্ত উঁচু, আর তাদের সারা গা জুড়ে চোখ ধাঁধানো কাঠের অলঙ্করণ। ওদুটোতে সব প্রাচীন, বিরল বইয়ের সংগ্রহ রাখা হয়। এখনো আছে। তার মধ্যে কিছু বই আছে পাতলা কাঠের বোর্ড দিয়ে বাঁধানো। একদিন মীরাদি একা লাইব্রেরি তে নিজে হাতে ঐ আলমারির বই সাজাচ্ছিলেন। ঐ সংগ্রহ অন্য কোনো কর্মীর হাতে দিতে তাঁর মন সায় দেয়নি। কিন্তু অনেক সময় নিয়ে বহু পরিশ্রমে বইগুলো সাজিয়ে ফেলার পরে, একেবারে ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত সব বই ঝরঝর করে মেঝেতে পড়ে গেল। মীরাদির বয়ানে বাকিটা বলি – ‘আমি চমকে উঠলাম। এত যত্ন করে সাজালাম। প্রশস্ত তাক, বই কোনো চাপাচাপি করিনি। কোনো ঠেকনার অভাব হয়নি। ভেতর থেকে একসঙ্গে সব তাকের সব বই কিকরে পড়ে যেতে পারে? বুকটা কেঁপে উঠল। অত উঁচু তাক থেকে পুরোনো ভঙ্গুর পাতা ওলা কাঠ বাঁধাই বই – ওযে অমূল্য সম্পদ। চুরমার হয়ে গেলে কলেজের কাছে কী জবাব দেব। নিজেকে ক্ষমা করতে পারছিলামনা। আমি কি কিছু ভুল করে ফেললাম? দুরুদুরু বুকে বইগুলো পরীক্ষা করতে শুরু করি। ও মা! বই যেমনকে তেমন আছে। যেন কিছুই হয়নি। প্রভুকে মনে মনে ধন‍্যবাদ দিলাম। বইগুলো ধ্বংস হলে আমার কি রক্ষা থাকত? সেদিন আর সময় ছিলনা। বইগুলো একপাশ করে রেখে, ঘরটা চাবি দিলাম। কিন্তু পরের দিন সেই একই ঘটনা ঘটল। না এটা তো স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারেনা। কে বই ফেলে দিচ্ছে? ভয়ে সারা গা শিরশির করতে লাগল। কলেজে এসে ইস্তক অনেক কিছু শুনেছি। এখানে লাইব্রেরি আসা কি কেউ পছন্দ করছেনা, নাকি আমার সাথে মস্করা করছে। শেষে অন্য লোকজনদের ডেকে, অনেকে মিলে সেই বই সাজানো হল। তারপরে আর ঐ আলমারিতে তেমন কিছু ঘটেনি। আসলে সচরাচর ঐ আলমারি তো খোলা হয়না। অত টানাপোড়েনের জন্য কেউ কি বিরক্ত হয়েছিল। অবসর নিয়েছি, তবু আজও উত্তর পাইনি’। লাইব্রেরির ডানপাশে বি ব্লকের সিঁড়ি। দুয়ের মাঝে লাইব্রেরির লাগোয়া কোনাকুনি একটা ঘর আছে। এখন সেটা আমাদের স্মার্ট রুম। দ্বিতীয়বার ন‍্যাক অ্যাক্রেডিটেশনের সময়ে কাচের জানলা, প্রোজেক্টর, স্মার্টবোর্ড , লেখার উপযোগী হাতলওলা চেয়ার, এয়ার কন্ডিশনিং মেশিন দিয়ে সাজানো হয়েছে। ওটা এখন আমাদের ইউ জি সি নেটওয়ার্ক রিসোর্স সেন্টার। কিন্তু আগে ওটা ছিল লাইব্রেরি রিডিং রুম। ছাত্রছাত্রীদের দেখতাম ক্লাস হয়ে গেলেই লাইব্রেরি যাচ্ছি ম‍্যাম, বলে দল কে দল তিনতলায় উঠে যেত। মনে ভাবি, ওরা হঠাৎ এত সুবোধ, সুমতি হল কেমন করে। পরে বুঝলাম, ও হরি, এই সুমতির পিছনে গল্প আছে। একতলায় ছেলেদের আর মেয়েদের আলাদা আলাদা কমনরুম আছে। এমনকি ক‍্যান্টিন রুমও আলাদা। তিনতলার কোণায় সবেধন চূড়ামণি ঐ ঘরটি হল ‘কমন’ কমনরুম, মানে ছেলেরা মেয়েরা একসাথে বসতে পারে।  ছাত্রছাত্রীদের কাছে এঘরের মর্যাদাই আলাদা। এই মিষ্টি ঘরটির আরও একটি মাহাত্ম্য ছিল। যখন ক্লাসের পালা শেষ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শুরু হত, সেই সময়ে অপর গুণটি প্রকাশ পেত। কাজের ওপরে বিরক্তি ধরে গেলে, চুপিসারে ওখানে উঠে এসে দরজাটি ভেজিয়ে দিলে কলেজে আর কেউ খুঁজে পাবেনা। লাইব্রেরি তখন বন্ধ, কাজেই ওই ঘরের কথা যারা খুঁজছে, তাদের মাথায় আসতনা। আর তখন তো মোবাইলের যুগ ছিলনা। কারোর মাথায় এলেও কাজ ফেলে তিনতলায় উঠে পুলিশিগিরি করা বাকিদের পোষাতনা। উঠলে যে পাওয়া যাবেই গ‍্যারান্টি তো নেই।যে ঘটনাটা বলার জন্য এত ভণিতা, সেটাও শুনেছি মীরাদির কাছে। আমাদের রসায়ন ল‍্যাবরেটরির সহায়ক ছিলেন নিমাই কুন্ডু। তিনি কলেজেই নাইট গার্ডের পাশের কোয়ার্টারে থাকতেন। দিব‍্য রইসি মেজাজের মানুষ। একবার পুরী বেড়াতে গিয়ে তাঁর বোলচাল দেখে সহযাত্রীরা তো মুগ্ধ। নতুন বন্ধুদের সঙ্গে ঠিকানাও চালাচালি হল। কলেজেও চিঠি এল অধ্যাপক নিমাই কুন্ডুর নামে। সে চিঠি পড়বি তো পড়, একেবারে তৎকালীন ডাকসাইটে অধ‍্যক্ষ বিশ্বনাথ ঘোষের হাতে। সে যাত্রা নিমাইদা  কি বলে নিস্তার পেল, তা অবিশ‍্যি আমি বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করিনি। এসব তো আমার কলেজে যোগ দেওয়ার আগের ঘটনা। যা হোক, আমার কলেজে যোগ দেওয়ার পরে অল্প কিছুদিন নিমাইদা ছিলেন। আড়ালে ওনাকে সবাই যে প্রফেসর কুন্ডু বলে ডাকতো সেকথা আমিও জানি। আসল ঘটনায় আসি। এহেন নিমাইদা পরীক্ষা চলাকালীন ঐ মিঠেকড়া ঘরে লো বেঞ্চে শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তিনতলার সেই দরজার আকারে বড় বড় জানলা দিয়ে হাওয়া দিচ্ছিল। নিমাইদার চোখে তন্দ্রা জড়িয়ে এল। হঠাৎ একটা প্রবল অস্বস্তি। নিমাইদার ঘুমটা ভেঙে গেল। বুকের ওপরে অসহ্য ভার। নড়াচড়া করা যাচ্ছেনা। ঠিক যেন কেউ বুকের ওপরে চেপে বসে আছে। কতক্ষণ এমন কেটেছে কে জানে। বুকের ওপরে চাপ সরতে নিমাইদা নেমে এল। তারপরে ওঘরে ঘুমোনোও বন্ধ হয়ে গেল। এখন তো ওখানে অনেক আধুনিক আসবাব আর ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি আছে। ক্লাস বা সেমিনার না হলে তালা দেওয়া থাকে। তাই চুপিচুপি ঘুমোনোর উপায় নেই। তায় ঘরে একধারে হাতলওলা চেয়ার। ঐ হাতলে রেখেই লেখা যায়, সামনে টেবিল লাগেনা। শুয়ে পড়ার মতো প্রশস্ত বেঞ্চিগুলোও নেই। এই একইরকম অভিজ্ঞতা পরে একতলায় তের নম্বর ঘরে প্রণবদারও হয়েছিল।

তিনতলার ঐ কোণের ঘরের ঠিক নিচে দোতলায় উনিশ নম্বর ঘর আছে। ঘটনাটা আমি হিমদার মুখে শুনেছি। হিমদা মানে হিমলাল শর্মা ছিলেন কলেজের নাইট গার্ড, নেপালের মানুষ। খুব অল্প বয়স থেকে তিনি এই কলেজে আছেন এবং কলেজটাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন। কোভিড অতিমারীর মধ্যে তিনি কলেজ থেকে অবসর নিলেন। কোনো এক শনিবার দুপুরে কলেজ ছুটির পরে, অধ‍্যক্ষ কালাচাঁদবাবু কাজে ব‍্যস্ত ছিলেন। আর তাঁর গাড়ির চালক গোপাল থাপা উনিশ নম্বর ঘর ফাঁকা থাকায় সেখানে লো বেঞ্চিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। দুসারি হাই বেঞ্চের মাঝখানে তিনি সুরক্ষিতই ছিলেন, পড়ে যাবার অবস্থা ছিলনা। কিন্তু হঠাৎ কী হয়ে গেল, গোপাল থাপাদা দেখলেন তিনি মাটিতে পড়ে আছেন। একরকম ঘটনা ঘটেছিল আর একবার ঠিক লাইব্রেরির নিচে একতলায়, তেরো নম্বর ঘরে। তখন ঐ ভবন তৈরি হচ্ছে। দুজন রাজমিস্ত্রি কাজের ফাঁকে ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ তারা পড়ে গেল। জেগে উঠে সম্বিত ফেরার পর দুজনেই বলেছিল যে মনে হল কে যেন সজোরে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল। আরও একটা ঘটনা হিমদা বলেছিলেন, সেকথা ভাবলে আমার গায়ে কাঁটা দেয়। ঐ ভবন যখন তৈরি হচ্ছিল, তখন এক রাজমিস্ত্রি ওপরে ঢালাই ছাদে  বসে সিমেন্টের মশলা মাখছিল। ছাদের যেদিকে কলেজের মাঠ, মানে ভিতরের প্রান্তেই ছিল সে। হঠাৎ কী হল তার চেতনায় নেই। কলেজের বাইরের দিকে সরস্বতীর খালের ওপারে দোকানদারেরা চীৎকার করে ওঠাতে কলেজের লোকেরা দৌড়ে গেল। গিয়ে দেখে কলেজের পিছনে খালের পাড়ে সে পড়ে আছে। সংকীর্ণ নদীর ওপারে বাজার। সেখানে দোকানদারেরা দেখেছে একজন পড়ে যাচ্ছে। হিমদা তাকে নিয়ে হাসপাতালে যায়। কিন্তু অত ওপর থেকে পড়েও বিশেষ কিছু আঘাত তার লাগেনি। সামান্য ফার্স্ট এড করেই ডাক্তারেরা তাকে ছেড়ে দেন। হয়তো সে ওপাশে গিয়েছিল, হয়তো মাথা ঘুরে গিয়েছিল, হয়তো এমন নরম ঝোপ জঙ্গলের ওপর পড়ল যে কিছু হলনা – এসব ঘটনার যুক্তিগ্রাহ্য কার্যকারণ খুঁজতে গেলে অনেক কষ্ট কল্পনা করতে হয়। তবে এসব ঘটনা ঘটেছে কলেজে আমি যোগ দেওয়ার আগে। পুরোনো মানুষজনের কাছে শুনেছি গভীর রাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বি ব্লকের একতলার বারান্দায় নাকি নারী কন্ঠের কান্না শোনা যেত। একটু আগে যে নিমাইদার কথা বললাম সেই নিমাইদাতো কলেজেই থাকতেন। তিনিও ঐ কান্না নাকি শুনেছিলেন।

ষষ্ঠ পর্বঃ জীবন খেয়া

এই সব শুনতে শুনতে এমন একটা আকর্ষণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল, যে সময় পেলেই শ‍্যামলদাকে জপাতাম – ও শ‍্যামলদা কলেজের পুরোনো দিনের গল্প বলুন, কলেজের ভূতের গল্প বলুন, প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ। শ‍্যামলদা তাঁর সহজ মশ্করার ভঙ্গিতে বলতেন, আরে তুমি হলে তালব‍্য শ এ শারদা, মানে দুর্গা। তোমার চালচিত্রে শিবের অনুচরেরা রয়েছেন। শুধু চীৎকারকের চাকরি করলে হবে? ( উনি লেকচারারের বাংলা করেছিলেন চীৎকারক) শান্ত হয়ে অপেক্ষা কর। কলেজকে জড়িয়ে থাকো। ঠিক একদিন অনুভব করবে। হয়তো ওনার কথাই সত্যি হয়েছে।

একথা ঠিক যে ভরদুপুরে ভূতের মারা ঢেলা বা ঠেলা আমি খাইনি, তবে প্রজ্ঞাদির চাঁটি খেয়েছি প্রচুর। প্রজ্ঞাদিকে দেখতাম বয়সে অনেক বড় সহকর্মীদের দাদা তুই বলে কথা বলতেন। বাড়িতে দশ বছরের বড় জ‍্যেঠতুত দাদাদের আমিও তুই করে বলতাম। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে যে এমন হতে পারে, সেটা প্রজ্ঞাদি করে দেখালেন। কলেজে এসে ইস্তক দেখছি ওনার হাঁটুতে ব‍্যথা। অথচ কোনো কিছু পছন্দসই না হলেই তিনি যে কাউকে চাঁটা মারার জন্য দৌড়োচ্ছেন। স্টাফরুমে প্রথমে ভাববাচ‍্যে নানা কথা বলে বলে ওনাকে ক্ষ‍্যাপানো হত। কে না জানে খারাপ জিনিসটা মানুষ আগে শিখে নেয়। বড়দের দেখে দেখে যেদিন বড়রা নেই, সেদিন আমরা মানে ছোটরাই শুরু করে দিতাম। অঙ্কের প্রশান্তদার মেয়ে হবার পরে, যেই না তার নাম রাখা হয়েছে প্রজ্ঞা, তখন আর আমাদের পায় কে? প্রশান্তদা বুক ফুলিয়ে প্রজ্ঞাদির সামনে ঘুরত, প্রজ্ঞা আমার কি করবে, আমি প্রজ্ঞার বাবা। আমরাও সঙ্গে পিসির দল পোঁ ধরতাম। কিছুক্ষণ সহ‍্য করে, চাঁটি মারার জন্য প্রজ্ঞাদি উঠে দাঁড়ালেই স্টাফরুমের প্রশস্ত টেবিলটার চারিপাশে চোর – পুলিশ খেলা শুরু হয়ে যেত। আবার এমন আবদার, অল্প একটু দৌড়োদৌড়ির পরেই সকলকে মাথা আর কান বাড়িয়ে দিতে হবে, যাতে প্রজ্ঞাদির কান মুলে চাঁটি মারতে সুবিধে হয়। কারণ ওনার হাঁটুতে ব‍্যথা। বেশিক্ষণ উনি লড়তে পারবেন না। কানমলা, চাঁটি আর মিট্টি মিট্টি গালি খেয়ে যে যার ক্লাসে চলে যাবে।

একবার প্রজ্ঞাদি আমি আর কমার্সের মুকুলদা কলেজ স্পোর্টসের শেষ দিনে গো অ্যাজ ইউ লাইকে নেমে পড়েছিলাম। হঠাৎ করে সকালে কলেজে এসে মাথায় ভূত চাপল আমার। বাকি দুজনকে বলতে তারা এক কথায় রাজি। গল্পটা এমন ফাঁদা হয়েছিল, যেন প্রজ্ঞাদি আমার খান্ডারনি মা। আমি আর মুকুলদা লুকিয়ে বিয়ে করে পালাতে গিয়ে মায়ের হাতে ধরা পড়ে গেছি। আমার চুল তো চিরকালই ছোট। সেকেন্ডের মধ্যে ঐ চুলের গার্ডার খুলে আমি ছুটকু ছুটকু দুটো বিনুনি বেঁধে নিলাম। আর মুকুলদা পট করে কোনো এক ছাত্রের মাথা থেকে ক‍্যাপ তুলে নিয়ে, সেটা উল্টো করে পরে নিল, যেন পাড়ার হিরো। কলেজের মাঠে তখন ছেলেমেয়েরা আদিম মানুষ, সব্জিওয়ালি, রামসীতা, সাংবাদিক, একটি গাছ একটি প্রাণ  এসব সেজে সবে ঘুরতে শুরু করেছে।  প্রজ্ঞাদি গিয়ে বিচারকদের বেঞ্চের কাছে দাঁড়িয়ে আছে, যেন সব দেখছে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রজ্ঞাদির গাড়ি করে মাঠে এক পাক দিয়ে আমরা দুজন প্রজ্ঞাদিরই সামনে নামলাম। আর ব‍্যাস সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল অভিনয়। প্রজ্ঞাদি তো হারেরেরে করে আমাকে শাপমুন‍্যি করছে, আর হাতের সুখ করে আমাকে চাঁটি আর কানমলা দিয়ে যাচ্ছে। আমি আর মুকুলদা মাঠে নামার আগে কিছু আনতাবড়ি ডায়লগ রেডি করেছিলাম, আর প্রজ্ঞাদি বলেছিল, আমাকে কিছু ঠিক করতে হবেনা, শুরু হলে দেখবি কী করি। ফার্স্ট প্রাইজ জিতব। আমরা তাতেই বিশ্বাস করেছি। কিন্তু তিনি যে মুখের চাইতে হাত দিয়ে বেশি ডায়লগ বলবেন, সেটা তো বুঝিনি। প্রতিযোগী থেকে দর্শক, ছাত্রছাত্রী থেকে কলেজ কর্মী সবাই তখন আমাদের তিনজনকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়েছে। যেই না আমি বলেছি, দেখো মা আমার এখন আঠেরো বছর হয়ে গেছে, আমাকে আর তুমি আটকে রাখতে পারোনা, অমনি প্রজ্ঞাদির হাতের বেগও বেড়ে গেছে। মহা মুস্কিল, আমাকে সংলাপই বলতে দিচ্ছেনা। শেষে মুকুলদা বেগতিক দেখে ঠিক করে রাখা সংলাপ বাদ দিয়ে, তেড়ে উঠে বলে উঠল, এভাবে আপনি ওর গায়ে হাত তুলতে পারেন না। ব‍্যাস। গোল হয়ে থাকা ভিড়টা উল্লাসে ফেটে পড়ে, সঙ্গে চটর পটর হাততালি। এদিকে ততক্ষণে আমার গাল আর কানদুটো প্রহারের চোটে লাল টকটকে হয়ে গেছে। আজ এত বছর পরে লিখতে গিয়েও কানদুটো একটু একটু টনটন করছে। আর সেই দিন গুলো হারিয়ে ফেলেছি বুঝে গলার ভিতরটা দলা পাকিয়ে একটা চিনচিনে ব‍্যথা করছে। তবে একথা বলতে বাধা নেই, কলেজে যত ভূত আছে, তার মধ্যে সেই ভূতটা সবচেয়ে খারাপ, যেটা সেদিন আমার মাথায় চেপেছিল। আর সব ভূত ভালো। চাঁটি, কানমলা দূরের কথা, আর কোনো ভূত আমার কেশাগ্র কোনোদিন স্পর্শ করেনি। আর এই ভূতটা সবচেয়ে ভালো, যেটা আমার মাথায় বসে এখন এই লেখাটা লিখিয়ে চলেছে। এই ভূত বা অতীত অবগাহন আমার প্রাণের আরাম আর আত্মার শান্তি এনে দিচ্ছে।

আমার নামটা সাতঘাট পেরিয়ে যেমন ‘নানু’ তে  এসে থিতু হল, তেমন স্টাফরুমে বল্লরীদিরও একটা শর্ট নাম ছিল – ‘লরি’। একদিন কোনো ছাত্রকে বল্লরীদি বকাবকি করেছিল। স্টাফরুমে কিকরে যেন সব খবর চলে যেত। বল্লরীদি ক্লাস সেরে আসার পরে লরি রেগে গেছে, কি হয়েছে, এসব নিয়ে খুব হৈচৈ হচ্ছিল, যাতে ওর রাগ পড়ে যায়। হঠাৎ অধ‍্যক্ষ কালাচাঁদবাবু কোনো কাজে স্টাফরুমে এসে, কিছু শুনে জিজ্ঞেস করলেন, লরি কে? আর যায় কোথা, সবাই চমকে চুপ। ওনার একটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল, অর্ধেকের কম কথা শুনে পুরো বিষয়টা নিমেষে বুঝে ফেলতেন। কয়েক মুহূর্ত পরে নিজেই বললেন, ও বল্লরী। বলে হা হা করে হাসলেন। কলেজে যখন আমি যোগ দিই, তখনও আমার এম ফিল শেষ হয়নি। লাস্ট সেমেস্টার বাকি ছিল। কলেজ ছুটি হলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের এম ফিলের ক্লাসে যেতাম, কারণ ওটা ছিল ইভনিং কোর্স। শেষ পরীক্ষার ফল ভালোই হয়েছিল। কারণ শরীরে ক্লান্ত হলেও, সারাদিন কলেজ যে অফুরান এনার্জির যোগান দিতো, তাতে মনের ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। ফল বেরোনোর পরে বড়োরা সকলে প্রিন্সিপালকে ধরে বসলেন, শারদা কলেজ থেকে গিয়ে ক্লাস করে ফার্স্ট হয়েছে, আপনি খাওয়ান। এর আগে মুকুলদা ছিল উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আর বল্লরীদি ছিল বিশ্বভারতীর প্রথম স্থানাধিকারী। স্টাফরুমের সকলেই ওদের দুজনকে নিয়ে গর্ব করতেন। সেই তালিকায় আমার নামও উঠল। পরে আরও প্রথম স্থানাধিকারীরা এই কলেজে যোগ দিয়েছেন, কিন্তু যখনকার কথা বলছি, তখন আমি ছিলাম কনিষ্ঠতমা। খাওয়ানোর প্রস্তাব শুনে কালাচাঁদবাবু বিস্মিত হয়ে আমার দিকে নির্দেশ করে বললেন, ও খাওয়াবে না? বড়োরা তখন ভ্রূ কুঁচকে বললেন, পুঁচকে মেয়ে, কটা টাকা মাইনে পায়? সবে সংসার পেতেছে! আপনি খাওয়ান।

বছর গড়ায় নাকি জল। সেদিনের পুঁচকে মেয়ের চুলে আজ রুপোলি রেখা। জীবনে সুখ দুঃখের নৌকো পাশাপাশি চলে। অবসরের পরে রঘুদা পূর্ণাঙ্গ ভগবদ্গীতা বাংলা ছড়ায় অনুবাদ করেছিলেন। সংশোধন করেছিলেন শ‍্যামলদা। মারা যাওয়ার আগে মুদ্রিত বইটির এক কপি তিনি আমাকে পাঠিয়েছিলেন। বইটি দেখি। একা বসে থাকলে সিনেমার মতো চোখের সামনে ছবি চলে। কখনো দেখি আমি পিজি হাসপাতালের বেডে। রাত দুটোয় আধো অচেতনে প্রজ্ঞাদির মুখ। কখনো আমি গোলপার্কের এক নার্সিং হোমের বিছানায়। চোখ খুলে দেখলাম মুকুলদা আর বল্লরীদি দেওয়ালে পিঠ দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে, নিশ্চুপ। কালাচাঁদবাবুর বেড়ানোর আর ছবি তোলার শখ ছিল। নিজের তোলা একটি পদ্মফুলের ছবি আমাকে বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন, বাড়িতে এসে দিয়ে গিয়েছিলেন কোনো দুর্ঘটনা র পর মন ভালো করার জন্য। ছবিটি দেখি। টাটকা স্মৃতিও আসে। আমার বাবার বাইপাস অপারেশন চলছে, মেডিকা হসপিটালে দাঁড়িয়ে আছেন বর্তমান অধ‍্যক্ষ সুব্রতবাবু এবং তাপসদা। কখনো দেখি আমার কর্তামশাইকে নারায়না হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি, এমার্জেন্সি। তাড়াহুড়োয় কলেজের হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে শুধু একটি মেসেজ। হাওয়ার গতিতে বাইক চালিয়ে কলেজ থেকে এসে হাজির হয়েছে সন্দীপ। এত স্মৃতির ভারা বেঁধে আমি নিজেই এখন হেঁটে চলে বেড়ানো এক কলেজের ভূত।

সবে তিনবছর হল, কলেজে যোগ দিয়েছে মধুরিমা। সেদিন বলে, দিদি সকালে যখন লাইব্রেরি খুলি, নৈঃশব্দ্যটা কেমন যেন গমগম করে, যেন অনেকে আছে। শুনে নির্বিকার থাকি। মুখের হাসিটিও টাল খায়না আমার। শুধু বলি প্রথম প্রথম অসুবিধা হয় বটে, পরে সব সয়ে যায়। যাই হয়ে যাক না কেন কলেজের ট্র‍্যাডিশন বজায় থাকে।

সমাপ্ত
———



https://kinjalbose.wordpress.com/2017/01/20/semaphore-tower/।এই লিঙ্ক-এ টাওয়ারের ছবি আর গুরুত্ব দেওয়া আছে।

https://amitabhagupta.wordpress.com/2013/07/15/optical-telegraph-in-india-the-forgotten-saga/

https://rangandatta.wordpress.com/2013/07/17/semaphore-towers-a-pre-telegram-communication-system/

https://rangandatta.wordpress.com/2021/01/20/great-trigonometrical-survey-gts-towers/

আন্দুল রাজবাড়ির ইতিহাসঃ https://pritamnaskar.blogspot.com/2021/03/history-of-andul-rajbari-howrah.html?m=1

প্রকৃতি, ধর্ম ও ভোটরঙ্গ


শারদা মন্ডল

দেখিতে দেখিতে আরো একটি ভোটরঙ্গ এই পোড়া বঙ্গভূমিতে আসিয়া পড়িল। চারিদিকে নানাবিধ প্রতিশ্রুতি ও উপঢৌকনের বন‍্যা বহিয়া যাইতেছে। কথার স্রোতে ভাগীরথীর স্রোত চাপা পড়িতেছে। বিস্তর কথার মাঝে বিস্তর ভুল কথাতেও সমাজ মাধ‍্যম উপছাইয়া যাইতেছে। কেহ দিব‍্যি দিয়া স্বীকার করিতেছেন চীনদেশীয় কেদারা-আসীন নেতাকে নিজেদের  মস্তক-কেদারায় বসানো ভুল হইয়াছিল। এখন তাঁহারা একুশে শুধরাইয়া লইয়া  রাম কাঁটা দিয়া তৃণকাঁটা উৎপাটনের শলা করিতেছেন। কেহ আবার দেশ সেবার তাড়নায় জোড় হস্ত হইয়া তাড়াহুড়ায় অর্ধশতেক আগেকার জহর বাবুকে নিমন্ত্রণ করিয়া ফেলিয়াছেন, কেহ বা নিবিড় উন্নয়নে ছিদ্র না রহিয়া যায়, সেই ব‍্যাকুলতায় সিধুবাবু, কানুবাবুর তুতোভাই ডহরবাবুকে খুঁজিতে  গিয়াছিলেন। কার হাত ধরিলে বাঙালি জাতি এযাত্রা রক্ষা পাইবে এমত উপদেশ ও যুক্তি, তর্ক ইত্যাদি দিয়া সংবাদপত্র পাতা ভরাইতেছে। এইসব দেখিয়া শুনিয়া  সাধারণ মানুষ ফাঁপরে পড়িয়াছে কিনা সম‍্যক বুঝা না যাইলেও তাহারা যে জল মাপিতেছে এই কথাটি নিশ্চিত। তবে অলীক কুনাট‍্যে পন্ডিতবর্গ বিশেষভাবে চিন্তিত।

কী তাঁহাদের চিন্তার কারণ, সেই কথাটি খোলসা হওয়া প্রয়োজন।  পৃথিবীজোড়া ভয়াবহ অতিমারী এখনও শেষ হয় নাই। টীকা আবিষ্কার হইয়াছে বটে, তবে বিশ্বজুড়ে আপামর মানুষের টীকা করণ আকাশ কুসুম আশার ছলনা মাত্র।  অতিমারীর মূল কারণ যে পরিবেশ দূষণ সেই দিশায় ভারত কেন বড় বড় শক্তিধর রাষ্ট্রও বিশেষ কিছু চিন্তাশীল নয়। বিশ্বজুড়িয়াই এখন পরহিতৈষী, প্রকৃতিপ্রেমী নেতৃত্বের আকাল চলিতেছে। কেহ আমাজনের গহন অরণ্য ধূলায় মিশাইয়া  খনিজ তৈল দিয়া দেশবাসীকে মর্দন করিবেন এমন সংকল্প করিয়াছেন। কেহ বা পুরানো প্রযুক্তির বন্ধ কয়লাখনিগুলি পুনরায় বহাল করিয়া প‍্যারিস চুক্তি হইতে বাহির হইয়া গিয়াছিলেন। ঐসব দেশের সাধারণ মানুষ এসকল কর্ম ও সঙ্কল্প দর্শন ও শ্রবণ করিয়া প্রীত হইয়া উঠিলেন এবং ফলতঃ বিপুল জনাদেশ লইয়া ঐ পুরানোপন্থী  নেতারা কুর্সিতে আসীন হইলেন। আচ্ছা প্রশ্ন উঠিতেই পারে,  পুরানো পন্থায় মানুষের আস্থার কারণ কী?  পরিবেশ রক্ষা করিতে হইলে, জল, মাটি, বাতাস পরিচ্ছন্ন করিতে হইলে, যন্ত্র লাগে। যন্ত্র কাজের ভার নিলে কম সংখ্যক মানুষের দরকার পড়ে। যন্ত্র চালাইবার জন্য বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত মানুষ প্রয়োজন। এক্ষেত্রে পুত্রকন‍্যারা চক্ষু মুদিয়া পিতামাতার পেশা অবলম্বন করিতে পারেনা। বরঞ্চ পুত্রকন‍্যাদের উপার্জনের উপযোগী প্রশিক্ষণের খরচ যোগাইতে পিতামাতার নাভিশ্বাস উঠে। তাই যাঁহারা পুরানোকালের কথা বলেন, পিতামহ হইতে অতি বৃদ্ধ প্রপিতামহের মুখ নিসৃত গল্পকথাগুলির মতোন করিয়া ইস্তাহার লিখিয়া প্রচার করেন, তাঁহাদের যেন বিশ্বাস ও ভরসা করিতে ইচ্ছা যায়। বিজ্ঞানীদের শঙ্কাজাগানো তত্ত্বকথাগুলি ভারি কঠিন। বিপরীতে প্রাচীনপন্থী নেতাদের কথাগুলি যেন কবেকার চেনা আর কত সহজ। কে না জানে পৃথিবীতে লোকসংখ্যা বাড়িতেছে অথচ  সম্পদ বাড়িতেছেনা। তাই জনপ্রতি ভোগের পরিমাণ কমিতে বাধ‍্য। সাধারণজন তত্ত্ব কথা অধিক না জানিলেও, বিশেষভাবে সচেষ্ট না হইলে সন্তান দুধেভাতে থাকিবেনা – এই মূল কথাটি নিজের মতো করিয়া বুঝিয়া লইয়াছে। ফলস্বরূপ দারিদ্র্য ও দুর্নীতি হাতে হাত ধরিয়া বাড়িতেছে। সারা পৃথিবীতে মানুষের এক ভাবনা, আগে খাইয়া পরিয়া নিজে উদ্ধার হই, পরিবার রক্ষা করি, পরিবেশ রক্ষা, পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি পরে হইবে। প্রাকৃতিক পরিবেশ এই অবহেলা সহ‍্য করিতে না পারিয়া অসুখ বিসুখের ফণা তুলিয়াছে। এর সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিবেশে একশ্রেণীর নেতার আবির্ভাব হইয়াছে, যাঁহারা সুমিষ্ট পৌরাণিক গল্পে সাধারণের মন ভুলাইতেছেন, যেন পূর্ব পুরুষ যে ধীরগতির জীবন যাপন করিতেন, সেই শান্তি ফিরাইয়া দিবেন। তবে সেকালে যে রাজা ভিন্ন বিচার ছিলনা, কথায় কথায় শূলে চড়িতে হইত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবায় সাধারণের অধিকার ছিলনা, শাসনে আধুনিক মানবতাবাদের লেশ ছিলনা, নিম্নবর্গ ও নারীরা নানাবিধ অন‍্যায় বিধিনিষেধে শৃঙ্খলিত ছিল, এই তিক্ত কথাগুলি গোপন করিতেছেন। তলে তলে স্তরে স্তরে বিভেদের বীজ মহীরূহ হইতেছে। কথার জাদুতে মোহগ্রস্ত উচ্চবর্ণ পুরুষ ভাবিতেছে এই নারী, ব্রাত‍্যজন শিক্ষা ও কর্মজগৎ হইতে বাহির হইয়া গেলে আমাদের চাকুরীর পরীক্ষায় প্রতিযোগিতা কমিয়া যাইবে – আহা বড় ভালো হইবে। মহাভারতের কর্ণের মতো অপমান করিয়া হউক, বিদেশি বলিয়া বা জন্মসূত্রে অযোগ্য প্রচার করিয়াই হউক, কাহাকে কাহাকে খেলা হইতে, মাঠ হইতে বাহির করিয়া দেওয়া যায়, তাহার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলিতেছে। একথা সকলেই জানে ভালো জিনিষের কদর হইলেও, খারাপ জিনিষের জনপ্রিয়তা বেশি। বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশে দেখা গেল, প্রাচীনপন্থী নেতৃত্বের দ্বারা বেকারত্ব কমিলনা বরং ধনীদের ব‍্যবসা বাড়িল, দৈনন্দিন জিনিষের দাম বাড়িল। বেসরকারি মালিকের হস্তে নাস্তানাবুদ মানুষের সার্বিক ভাবে স্বাস্থ্যহানি ও সম্মানহানি হইতে লাগিল। কারণ ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষ আরও দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে। অর্বুদপতিদের চাপ গলায় আরও আঁটিয়া বসিয়াছে। যে সরকারকে তাহারা বিশ্বাস করিয়া আঁকড়াইয়া ধরিয়াছিল, সেও বিশ্বাসের মান রাখিলনা।  অবশেষে নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অতিমারীর কোপ আসিয়া পড়িল। পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র সম্প্রতি দীর্ঘতম নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়া, খুব সম্প্রতি এমনই এক পর্ব হইতে পরিত্রাণ হইল। পুরাপুরি নিস্তার পাইয়াছে কিনা তাহা ভবিষ্যত বলিবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে কানাচে সংবাদ পাই, পৃথিবীর বিভিন্ন বিদ্বৎসভায় সাধারণের প্রাচীনপন্থী নির্বাচন ও বিশ্বাস ভঙ্গ হইবার এই প্রবণতা লইয়া তর্ক বাধিয়া উঠিয়াছে। বাংলার তথা ভারতের নির্বাচন রঙ্গ এই প্রবণতার বাহিরে নয়। জনবহুল বাংলার দূষণক্লিষ্ট মাটি, জল, বাতাস, বনভূমি বা পশুপাখি কোনোটিই ক্ষমতা প্রার্থী দলগুলির ইস্তাহারে তেমন ভাবে স্থান পায় নাই। পাইবার কথাও নয়। পরিবেশ দপ্তর পাইয়া বাংলার মন্ত্রী ক্ষুব্ধ হইয়াছেন, একথা লোকসভা নির্বাচনের পরে প্রথম শ্রেণীর সংবাদ পত্রগুলি ফলাও করিয়া প্রকাশ করিয়াছিল। ক্ষোভের কারণ সঙ্গত। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক পান নাই। পরিবেশ মন্ত্রকের গুরুত্ব নাই, বাজেট নাই, কাজ শুধু উন্নয়নে ছাড়পত্র দেওয়া। কেবল দেশের আর্থিক উন্নয়নই উন্নয়ন বলিয়া স্বীকৃত, বাকি নিমিত্ত মাত্র। তবে আর একটি কথা আছে। অবশিষ্ট বিশ্বে নির্বাচন রঙ্গ যেমনই হউক না কেন, দ্বিতীয় বৃহত্তম গণতন্ত্রে ইহার একটি বাড়তি মাত্রা বিদ‍্যমান। তাহা হইল ধর্ম, অধুনা রাম নাম। শৈশবে মায়ের কাছে শিখিয়াছিলাম অন্ধকারে ভুতের ভয় পাইলে রামনাম করিতে হয়। দুর্গত পীড়িত প্রজার তিনি চির-আশ্রয়। ঐ নাম ভয়হারী। হায় সেকাল গিয়াছে। রাম এখন প্রজার নয় রাজার আশ্রয় হইয়াছেন। তাঁহার নাম এখন আর ভয়হারী, সঙ্গীতনিন্দিত কর্ণে মধুবর্ষনকারী নয়, বরং ভয়জাগানিয়া। বিদ‍্যালয়ে রামায়ণ মহাভারতের চর্চা হয়না। অণু পরিবারের শিশুদের গল্প শোনাইবার মতো দাদু ঠাকুরমারা বিরল।


আমার মহাবিদ্যালয়ে সাম্মানিক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে একটিকেও পাইনা যে মহাকাব্যদুটি পড়িয়াছে, এমনকী সরল শিশু সংস্করণও নয়। তাই ভারতাত্মার নিভৃত রামনামের তৃপ্তি তাহাদের অজানা। রামচন্দ্রের মৃদুণি কুসুমাদপি চরিত্র তাহাদের অচেনা। ছাত্রছাত্রীদিগকে দোষ দিয়া লাভ নাই। তাহাদের অল্পবয়স্ক পিতামাতা, গৃহশিক্ষক, এমনকি নবনিযুক্ত বিদ‍্যালয় শিক্ষকেরাও তথৈবচ। হয়তো রামের নামে ভয়জাগানো হুঙ্কার তাহাদের কর্ণে গরল ঢালেনা, হৃদয়ে বাজেনা। বিপরীতে এই অচেনা হুঙ্কার ক্রমেই যেন একপ্রকার বৈধতা পাইতেছে। আরও দেখি ছাত্রছাত্রীরা বাঙালি পরিচয় লইয়া অতিসচেতন।  এই সচেতনতা আমাদিগের কালের মতো স্বতস্ফুর্ত নহে, সযত্নে নির্মিত ও লালিত। হয়তো সমকাল এই বীজ তাহাদের মনোভূমিতে বপন করিয়াছে। এইখানে একটু ভাবনা আছে। বাঙালি চাকুরীর নিশ্চিত আশ্রয় ভালোবাসে। আবার চাকুরীর মধ্যে প্রিয়তম হইল শিক্ষকতার চাকুরী। বহুদিন ধরিয়া সে ব‍্যবসা এবং কায়িক শ্রমের ভার অবাঙালির উপরে ন‍্যস্ত করিয়া একরকম সহাবস্থানে আছে। জনবহুল বঙ্গদেশে চাকুরীর সুযোগ চাহিদার তুলনায় কম। সরকারি ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়াতে, সুযোগ আরও কমিয়া আসিতেছে, বেসরকারি ক্ষেত্রে অর্বুদপতিদের ফাঁসের বেড়ি মোটা হইতেছে। ইত‍্যবসরে রামহুঙ্কারের মধ‍্য দিয়া স্কুল সার্ভিস কমিশনের নিয়োগ তালিকায় যদি অবাঙালি নামের সংখ্যা বাড়িয়া যায়, তবে এতদিনের বাঙালি – অবাঙালি শান্তি ও সহাবস্থানের কাঠামো ভাঙিয়া পড়িতে দেরী হইবেনা। বাঙালি ও অসমীয়া মানুষের সাংস্কৃতিক মিলের কারণে তাহাদের পেশাগত পছন্দও এক – ফলত কর্মজগতে তাহারা পরস্পরের প্রতিস্পর্ধী। ভাবজগতে যত মিলই থাক, ক্ষুন্নিবৃত্তির তাগিদে অসমে বাঙালি বিদ্বেষী স্রোত চলিতে থাকে।বাংলায় রাম – হুঙ্কারের নীচে এমন বিদ্বেষ বাড়িবার সম‍্যক সম্ভাবনা রহিয়াছে।

তবে হ‍্যাঁ, আশার আলো কিছু আছে বৈকি। নবীন প্রজন্ম রামায়ণ নিয়ে যেমন ভাবিত নহে, ধর্ম নিয়েও তাহাদের শিরঃপীড়া নগন্য। মুসলিম ছাত্রী দোলের আগের দিনে হাসিয়া রং দিতে আসে। ধর্ম ভুলিয়া ছাত্রছাত্রী একত্রে গোল হইয়া বসিয়া পাঠবিরতিতে জলযোগ করে।  তাহাদের ভাবজগৎ অন্তর্জালের কল‍্যাণে প্রসারিত হইয়াছে। ভুয়া সংবাদের ঠিকুজি কুষ্ঠি বাহির করা তাহাদের বাম হস্তের ক্রীড়া। ঐ উজ্জ্বল চন্দ্রবদন মুখগুলি দেখিয়া আশায় বুক বাঁধি, পরম কারুণিক শ্রীরামচন্দ্র সহায় হইবেন। মানবের কল‍্যাণে ধর্ম জিতিবে, ধর্মবণিক নহে। এই ভারতের ইতিহাসে, পৌরাণিকতায় লুকাইয়া আছে এক সঙ্কেত – সম্ভবামি যুগে যুগে।  গত পাঁচশত বৎসরের ইতিহাস পরিভ্রমণ করিয়া দেখি, ১৪৮৬ তে অর্থাৎ পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে আসিলেন শ্রীচৈতন্য। হানাহানি বিভেদ মিটাইয়া দিলেন। ইতিহাস বাঁক লইল। ১৬০০ হইতে ১৭০০ এর মধ্যে অর্থাৎ সপ্তদশ শতকে দেখিতেছি দেশ জুড়িয়া সুফি সন্তদের প্রবেশ। ১৮০০ হইতে ১৯০০ – ঊনবিংশ শতকের এর শেষের দিকে রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দের হাত ধরিয়া ফিরিয়া আসে “যত মত তত পথ”। তবে কি এই একবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে আসিতেছে আরও একটি সামাজিক বিপ্লব! মাৎস‍্যন‍্যায় চরমে না উঠিলে সমাজ নিজেকে অতিক্রম করিতে পারেনা। সামাজিক সংকট প্রবল না হইলে মেধাবী মানুষ ক্ষুদ্র গন্ডি পার হইয়া নায়ক হইতে পারেনা। তাই যতদিন না সেই আইকন আসিতেছেন, ততদিন তাঁহার আশার পথ সুগম করিবার দায় সাধারণ মানুষের। যেদিন শিক্ষা সর্বসাধারণে ব‍্যাপ্ত ছিলনা, সেইদিন একজন রামমোহন, একজন বিদ‍্যাসাগরের প্রয়োজন হইয়াছিল। আজ তো সেদিন নাই। সন্তানকে রক্ষা করিবার জন্য আজ আমার ক্ষুদ্র গন্ডিতে আমিই মৈত্রেয়ী, গার্গী, আমিই ডিরোজিও, আর আমিই নিবেদিতা অথবা রোকেয়া। এ যুদ্ধ ভারতাত্মাকে রক্ষা করিবার, পুণ্য তীর্থে জাগরিত হইবার, মানবের মহামিলন মন্ত্রে দীক্ষিত হইবার।  পশ্চাতে আশীর্বাদী হস্ত প্রসারিত করিয়া ধনুর্ধারী শ্রীরামচন্দ্র হইতে গৈরিকধারী বিবেকানন্দ দন্ডায়মান। অপব‍্যাখ‍্যা তাঁহাদের মলিন করে নাই। অপব‍্যাখ‍্যাকারীর স্বরূপ প্রকট করিয়াছে মাত্র। জয় আমাদের সুনিশ্চিত। ভোটরঙ্গ আসিবে, চলিয়াও যাইবে। তাহার কারণে প্রাকৃতিক বা সাংস্কৃতিক কোনো পরিবেশকেই কলুষিত হইতে আমরা দিবনা।

লকডাউনের জানলা (পর্ব ২)

ড. শারদা মণ্ডল

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ভ‍্যাকসিন মানুষের হাতের মুঠোয়। আনলক চতুর্থ পর্ব চলছে। যেহেতু কলেজ এখনও খোলেনি, তাই আমার লকডাউন বহমান, থামার জোটি নেই। লকডাউনের অবসরে কর্তামশাই আমার এই একচিলতে বাসার জানলাগুলো বাগান করে ভরিয়ে দিয়েছেন। জানলা থেকে পুঁইশাক কেটে খাওয়া চলল নানারকম, কখনো শাক, কখনও শুধু ডাঁটা অথবা পুঁইমিটুলির চচ্চড়ি। বিলোনোও হল কিছু নিকট আত্মীয় আর প্রতিবেশীকে। এখন ঐ জানালার একফালি রোদে তার বীজ শুকনো হচ্ছে আবার নতুন করে বোনার জন্য। বারান্দাকে তো একটু বড়সড় জানলা হিসেবে ভাবাই যায়, সেখানে তিনি ফলিয়েছেন সূর্যমুখী লঙ্কা, ছোটো ছোটো বেগুন,  দুরকম – সাদা আর বেগনি রঙের। এখন শীতকালে দক্ষিণের জানলায় রোদ আসে বেশ। আমলকি কেটে রোদে শুকিয়ে বাবা মাকে দিয়ে আসি। প্রিয় জিনিস, স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। ছোটোবেলার স্মৃতি আর ইউ টিউবের পড়া মিশিয়ে, রান্নার মেয়েটির সঙ্গে যুক্তি করে থালায় থালায় দিলাম বড়ি। শুকোতে দিলাম সেই জানলায়।

থালায় থালায় দিলাম বড়ি।
একফালি রোদে তার বীজ শুকোনো হচ্ছে: পুঁইমিটুলি
ছোট ছোট বেগুন, দুরকম – সাদা আর বেগনি রঙের।
সূর্যমুখী লঙ্কা
জানলায় শুকোনো আমলকি আর টুটিফ্রুটি

ঠাকুর ঘরের জানলার নিচে দোতলার এজমালি একটু চাতাল। ওখানে সেদিন ম‍্যাও ম‍্যাও শুনে দেখি পাড়ার ভুলো বেড়াল দুটো ফারের বল নিয়ে শুয়ে আছে। গরমকালে ওর তিনটে ছানাকে ডেকে নিয়ে গেছে আম্ফান ঝড়ে। সেই থেকে ভুলোর দেমাক নেই, মনমরা হয়ে ঘোরে। আজ ওর পাশে দুটো তুলোর পুঁটুলি দেখে ভারি ভালো লাগে। জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ছেঁড়া গামছা পাট করে পেতে দিই। মনটা উশখুশ করে, ঠান্ডাটা খুব জোর। রেশন দোকান থেকে চেয়ে চিন্তে একটা চট যোগাড় করে জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে পেতে দিই। বান্ধবীদের উৎসাহে ওপাশের জানলায় টুটিফ্রুটি শুকোতে দিয়েছি লাল আর সাদা। ছানা গুলো একটু বড় হলে ওদের দেব। ওদের নাম ও দিয়েছি দুটো। সাদা কালোটা তুতু আর পাটকিলে হলুদটা ভুতু। ২৫ শে ডিসেম্বর আসছে। টুটিফ্রুটি দিয়ে কেক বানাবো। ইউ টিউবের জানলায় মুখ বাড়িয়ে রেসিপি খুঁজি।

দুটো ফারের বল তুতু ভুতু
ভুলু আর তুতু
ভুলু আর ভুতু

পঁচিশে ডিসেম্বরের ঠান্ডা আরো ঘন হয়ে আসে। টুটিফ্রুটি পড়ে থাকে বোতলবন্দী। কেক বানানো হয়না। বরং নিমতলা ঘাটের গ্রিলের জানলা দিয়ে দেখি মা চলেছে আগুনের সিঁড়ি বেয়ে পরমাত্মার দিকে। ঘরে ফিরে জানলা দিয়ে দেখি ভুলু তার ছানাদুটোকে মুখে মুখ, গালে গাল দিয়ে গলাগলি করে। পিছন থেকে কন্যা এসে জড়িয়ে ধরে। বলে, মা আমার দিকে দেখো, তোমার মা মরেনি। মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসি, আর নতুন উৎসাহে কাজে লেগে পড়ি। কম্পিউটারের জানলায় কতোনা দ্বায়িত্ব এসে জমে।

বাবাকে বলি বাবা আর দুটো মাস, নতুন বাড়িতে নিয়ে যাব তোমায়। তুমি সব চিকিৎসার অভিজ্ঞতা বলবে, আমি অনুলিখন করে বই ছাপাবো তোমার নামে। বাবা অল্প হেসে দুদিকে মাথা নাড়ে। সে হাসিতে কী ছিল সেদিন বুঝিনি। জানুয়ারি যায়, ফেব্রুয়ারির এক তারিখ আসে। বাড়িতে ঢুকে ডাকাডাকি করি বাবা বাবা। ঘোলা চোখের দৃষ্টি খোঁজে আমাকে, সে চোখে আলোর তারা নেই। বাবা হাত তোলে। হাত ধরে মাথায় হাত বোলাই। বাবা ঘুমোয়। আগামীকাল ভগিনী প্রতিম সহকর্মিনীর বিয়ে। তার উপহারটা প্লাস্টিক না দিয়ে জাপানি ফুরোসিকি প্রথায় কাপড়ের মোড়ক করে রাংতা বসিয়ে দিই। পরদিন নিমতলার আগুনের সুড়ঙ্গ বেয়ে বাবা, মার কাছে পাড়ি দেয়। আমার অনুলিখন বাকিই রয়ে যায়। আরও দায়িত্ব কাঁধে চাপে। পরিবর্ত মা নাহয় পেলাম যাহোক, চারপাশে বাবা খুঁজি।

জাপানি ফুরোসিকি প্রথায় কাপড়ের মোড়ক করে রাংতা বসিয়ে দিই।

একই সঙ্গে জীবনের দুরকম হিসেব নিয়ে বসি। আট তিনে বিজোড় সন্মাষ পরীক্ষা হলে সিলেবাসের ধার বাকি কত আনা, সেই সঙ্গে কত লোকের জন্য কী কী আয়োজন হলে, লাগবে কত নয়া। কি নাম দেব এই হিসেবের? ত্রৈরাশিক নাকি ভগ্নাংশ! আজকাল সব জিনিস বা জায়গার নাম বদলে বদলে যায়। শুনতে পাই ড্রাগন ফ্রুটেরও নাকি নাম বদলে গেছে। অনুষ্ঠান মিটে গেলে হাসিমুখে দা‍ঁড়াবো মঞ্চে। বিজ্ঞান পরিষদের পত্রিকার তরফে পুরষ্কার নিতে। টিভিতে আপনমনে ছবি চলে – “এন্টার দ‍্য কমলম্”। আলাদা আলাদা ছোট বড়ো সুখ দুঃখের জানলা দিয়ে সাজানো – ধন‍্য হে জীবনম্।