আড়বালিয়ার কথা
বসিরহাট মহকুমার এক গ্রাম হল আড়বালিয়া। পরিবেশে বাংলার সবুজ মখমলে মোড়া গ্রাম হলেও সেটা আসলে বাদুড়িয়া পৌরসভার মধ্যে। ও তল্লাটে এককালে কু ঝিকঝিক মার্টিনের রেল চলত। ও পাড়ায় আছে এক বিশাল ঝুপসি বটতলা, তার বয়স দেড় দু শতক হবেও বা। বটের ধারে এক পুকুর। সেখানে সব নাইতে আসে। ঝুরি আর জেগে ওটা শিকড় ধরে জলে আনকোরারাও দিব্যি চান করে। বটতলার ঝুরি নেমে আজ অনেক গুলো গুঁড়ি। বড় দুটো প্রধান গুঁড়ির মধ্যে দিয়ে চলার রাস্তা। ও গাছে লাখ লাখ পাখি আর লক্ষ কোটি বাদুড়ের আস্তানা। দিনের বেলা বাদুড়গুলো লম্বা হয়ে ঝোলে। আর বিকেল হলে ঘুরে ঘুরে টহল দেয়। গেলবারের উম্পুন ঝড়ের মাথা যখন ঝুঁটি নাড়া দিল, বুড়ো বট টাল খেয়েও সামলে নিল। কিন্তু যখন ঝড়ের লেজ আছড়ালো তখন আর পারলেনা। পুকুর পাড়ের গুঁড়িটা গেল উল্টে। সে কি দৃশ্য, শিকড়ের বিরাট দেয়াল, যেন তিনতলা বাড়ি। পাখি, বাদুড় কত যে মরল, তার ঠিকানা নেই। এখনো ওভাবেই আছে। আসুন হেঁটে যাই বটতলার পাশ দিয়ে। কলেজ স্ট্রিটের মর্ডান বুক যাদের, তাদের ভিটে ছিল পথের ডানদিকে। একটা ঠাকুর দালান ছিল। কালীপুজো হত। এখন আর হয়না। এবার একটা মাঠ। রাস্তা গেছে বেঁকে, ডানদিকে গেলে সিংহদুয়ার আর বাঁদিকে শুকপুকুরের রাস্তা। ডানদিকে একটু এগোলে পথের ওপর আছে এক বিরাট সিংহওলা গেট। গেটের মাথায় সিংহের চারপাশে পাহারায় আছে চার সেপাই। ঐ দরজায় ওপরদিকে খোদাই করে লেখা আছে এক টাকা। আমার বাবা বলতো, একমণ চালের দাম যখন এক টাকা ছিল, তখন ঐ গেট তৈরি হয়েছিল। গেট দিয়ে ঢুকলে পথের দুপাশে আমবাগান। পথ শেষ হয় এক বিশাল পুষ্করিণীতে। সেখানে ছেলেদের আর মেয়েদের স্নানের ঘাট আলাদা। আর আছে একটা বিশাল সুড়ঙ্গ। জমিদারির সময়ে কী কাজে লাগতো কি জানি। সিংহওলা গেটের উল্টোদিকে আছে তিনশিবের মন্দির। মন্দিরের চাতালের পাশে আছে একরাত্তিরের বাড়ি। একরাতে তৈরি বাড়ি ছাদ ঢালাইয়ের আগে সুয্যি উঠে গেল। আর ছাদ হলনা। ওভাবেই রয়ে গেল। পিছনে নাগচৌধুরীদের অট্টালিকা। আর একটু এগোলে বাজার। ডানদিকে হাঁস ঠাকুরের বাড়ি আর ঠাকুর দালান। একটা প্রাচীন মিষ্টির দোকান আর পাঠশালার সামনেই অগ্নিযুগের বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায়ের বাড়ি। আড়বালিয়ার মাটি অনেক বিপ্লব আর স্বাধীনতা সংগ্রামের আঁতুড়ঘর। ডানদিকের পথ ধরলে বণিক পাড়ার বড় বাজার। আর বাঁদিক ধরে এগিয়ে গেলে আদি বসুবাড়ির প্রাচীন প্রাসাদ। ওবাড়ির ছেলে কৌশিক অর্থনীতিতে বিশ্বজয় করেছে। আর এক ছেলে বিশ্বনাথ আজ বাংলার আমজনতার মন চুরি করেছে। কাছেই আর এক শরীক মাঠের বসুবাড়ির অট্টালিকা ও ঠাকুর দালান। আরো এগোলে চার শিবের মন্দির। ছোটো বর্গাকার ক্ষেত্রের দুই বাহুতে পাশাপাশি দুটি করে মোট চারটি ইট রঙা মন্দির। মাঝখানে চাতাল। চাতাল নেমে গেছে এক গভীর পুকুরে। মন্দিরের উঁচু ভিতে পা ঝুলিয়ে বসলে ভেজা বাতাসে কেমন যেন ঝিম ধরে। ও পুকুরের জল বড়ো স্থির। তল কোথায় থৈ কই? শহুরে মত্ত পিকনিক পার্টির অনেককে শাস্তি দিয়েছে ঐ জল। দুই বসু আর হাঁস ঠাকুরের বাড়ি দুর্গা পুজো হয় দালানে আর বণিক পাড়ায় বারোয়ারী। আরো সাত গাঁয়ের ঠাকুর এসে তিনশিবের মন্দিরের মাঠে বিজয়াদশমীর মেলা হয়। ও মন্দির গুলো এক সারিতে পাশাপাশি, সাদা কালো পাথরে বাঁধানো চকমকে। ঘুরতে ঘুরতে বেলা হল। আবার ফিরি বটতলায়। নাকবরাবর পুকুর ধারে শুরুতে ডানদিকে মণ্ডলদের ভিটে আর একটু এগিয়ে বাঁদিকে মিত্তিরদের। আরো আরো অনেকটা এগিয়ে গেলে বড়পোল, ইছামতীর খাল, চারিপাশে জলকর, মানে মাছের ভেড়ি। আরো এগোলে ধান্যকুড়িয়া, নেহালপুর। ধান্যকুড়িয়ার গাইন, সাউ, সমাদ্দারদের প্রাসাদ, মন্দির, রাসমঞ্চ।
পাল্কি চলে
আঠেরো শতকের শেষ দিকে আড়বালিয়া গ্রামের জনৈক লক্ষ্মণচন্দ্র মণ্ডল ছিলেন নাগচৌধুরী জমিদারির গোমস্তা। জাতিতে সৎচাষী হলেও তাঁর পেটে কিছু বিদ্যে ছিল। ভিটে আর চাষজমি মিলিয়ে তাঁর কয়েক বিঘা জমিজিরেতও ছিল। সেযুগে পাকা সড়ক গল্প কথা। খাজনা আদায়ে জলকাদার পথ গোমস্তা মশাই পাল্কি চড়েই যেতেন। অবসর সময়ে তাঁর পাল্কিটা মাটির ঘরের একপাশে রাখা থাকত। সাত গাঁয়ের মানুষ চিনলেও লক্ষ্মণ বাবুর মনে সোয়াস্তি নেই। তাঁর মনের মধ্যে সূঁচ বেঁধায় এক গোপন ইচ্ছে। জমিদার বাড়ির মতো, অন্য বামুন কায়েতের ঘরের মতো তাঁর ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখাবেন। কিন্তু বিধি যে বাম। বেলা যায়, এখনো ছেলেপুলের মুখ দেখতে পেলেননা। গাঁয়ের সব পরিবারকে চেনেন। অনেক ভেবে বুঝে শুনে এক পাল্টিঘরের দরিদ্র প্রতিবেশীর কাছ থেকে তার বড় ছেলেটিকে চেয়ে নিলেন মানুষ করবেন বলে। কৃষ্ণভক্ত লক্ষ্মণ সে ছেলের নতুন নাম দিলেন রাধারমণ। দিনে দিনে রাধারমণ ঊজ্জ্বল, বুদ্ধিমান, ঝকঝকে হয়ে বেড়ে উঠছিল। লম্বা ফর্সা চেহারা, পড়াশোনায় ভালো রাধারমণকে চোখে পড়ে গেল শুকপুকুরিয়ার সম্পন্ন গৃহস্থ গোষ্ঠগোপাল কাবাসীর। নিজের বড়মেয়ের সম্বন্ধ নিয়ে এলেন লক্ষ্মণ বাবুর ঘরে। এবাড়িতে অমত হলনা। লোকতো বেশি নেই। ঘরে বৌ এলে তো ভালোই। ছোটোবয়সে এলে শউরঘরে মিলমিশ ভালো হয়, একথা কে না জানে। সনটা ১৯০৬। চারপাশ অশান্ত। বাদুড়িয়া আর আড়বালিয়ায় তখন স্বদেশী আর বয়কট চলছে পুরোদমে। কখন কী হয় কে জানে। তাই শুভস্য শীঘ্রম। পাঁজিতে দিন দেখে সানাই, উলু, শাঁখ বাজিয়ে পাঁচ বছরের হেমনলিনী আর বারো বছরের রাধারমণের বিয়ে হয়ে যায়। ছেলের তখনও লেখাপড়া চলছে। পরীক্ষায় ভালো ফল, ভালো ঘরে বিয়ে! শুদ্দুরের পো আবার পাশ দিয়ে আরো পড়তে চায়। যুগটায় তখন ভারি জাতের বিচার। এ অনাচার কি ধম্মে সয়? ধর্ম বাঁচাতে গিয়ে আড়বালিয়ার বামুন কায়েতের কিছু দুষ্ট ছেলেপুলে শলা করে একদিন রাধাকে বিষ খাইয়ে দেয়……
বিষহরি
লক্ষ্মণচন্দ্রের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তাঁর বংশে কাকা জ্যাঠা জ্ঞাতিতো কেউ নেই। অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে প্রতিবেশীদের শত্রুতা সামলাবেন কি করে? হেমনলিনীর বাপের ঘরে খবর যায়। তার বাবা কাকারা ঝাঁপিয়ে পড়েন রাধাকে বাঁচাতে। হেমের দুই দাদাও তখন বড় হয়েছে। বাপের বাড়ির তাগদ আর হেমের সিঁদুরের জোর – রাধারমণ সে যাত্রা বেঁচে গেলেন, আর হিংসুকের মাথায় তবলা বাজিয়ে হয়ে গেলেন ও তল্লাটের প্রথম পাশ করা ডাক্তার। ঐ নাগচৌধুরীরাই তাঁকে গৃহচিকিৎসক নিয়োগ করল। সাত গাঁয়ের লোক দেখাতে আসত। এক রাত্তিরের বাড়ির পাশেই ডাক্তারখানা। ডাক্তার বাবুর বাড়ি বললেই গরুর গাড়ি নিয়ে আসত আত্মীয় স্বজনকে।
তুলসী তলায় পিদিম দিয়ে, ঘরে প্রথম সন্তান এল কন্যা সতীরানী। তারপর একে একে আমোদ, রণজিত, নীরোদ, সমীর। দু তিন বছরের বড় ছোট সব। রাধারমণ অনেক রোগী দেখলেও গাঁয়ের লোকের তেমন পারিশ্রমিক দেবার ক্ষমতা নেই। আর ডাক্তার বাবু মানুষের কষ্ট বোঝেন। প্রায়ই পয়সা মাপ হয়। এদিকে লক্ষণ চন্দ্র বিদায় নিয়েছেন। রাধার মা রয়েছেন এখনো। গাঁয়ের লোক ডাকে বুড়োদি। এতগুলো ছেলেমেয়ে। অনেকগুলো পেট চালাতে কষ্ট। টেনেটুনে চলে। ছোটোছেলেটা জন্মানোর আগেই ডাক্তার বাবুর নামযশে বড় মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ আসে ধান্যকুড়িয়ার বিখ্যাত জমিদার গাইন বাড়ি থেকে। মামাবাড়ির সাহায্যে বিয়েও হয়ে যায় ধুমধাম করে। দিদির বিয়ের পর ছোটোছেলেটা জন্মায়। মেলানো ডাকনাম। বেণু, রেণু, ধেণু, ভানু। সব ঠিকঠাকই চলছিল। ভানুর যখন আড়াই বছর বয়স, হেমের বয়স দুকুড়ি পাঁচ। রাধা ডাক্তার হলেও যুগটা বড় বালাই। মেয়েদের গর্ভ ফাঁকা যায়না। হেমও রেহাই পেলোনা। এবার কন্যা বিয়োতে গিয়ে হেম সংসার থেকে একেবারে ছুটি নিল। মা – খাকি ঐ মেয়েটা বেঁচে রইল। দাদারা মায়ের স্মৃতিতে একরত্তি বোনটার নাম রাখল স্মৃতি। ভানু আর স্মৃতিকে দেখাশোনার জন্য এবার মণ্ডল পরিবারে পা রাখল হেমের আদুরী পিসি। সে যুগে প্রায় ঘরেই বালবিধবা, নিঃসন্তান, ফাইফরমাসখাটা নারীরা থাকতেন। আত্মীয় স্বজনের যার যেমন দরকার পড়ত, পেটভাতায় সেখানে খাটুনি খেটে তাঁদের দিন যেত। এই আদুরীও
তেমন। যে কোনদিন আদর পায়না সেই আদুরী। তবে বিধাতা দেখলেন একরত্তিটা আগের জন্মে অনেক পুণ্যি করেছে। মা খাকি, অপয়া এসব শোনার দুঃখু দেওয়া একে উচিত হবেনা। তাই জ্ঞান হবার আগেই, বছর খানেকের মধ্যে তাকে নিজের কাছে ফিরিয়ে নিলেন গলায় দুধ আটকানোর ছুতো করে। স্মৃতির স্মৃতি বাড়িতে মুছে গেল। তবে ভানুটা রোগাসোগা হলেও, আদুরী তাকে বাঁচিয়ে দিল। দেশ যখন স্বাধীন হল, খোকার বয়স চার।
জীবন সংগ্রাম
ভায়েদের জীবন সংগ্রাম শুরু হয়। তাদের ডাক্তার বাবা ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে কোনো আপস করতে চাননা। কিন্তু এতগুলো ছেলেকে পড়ানোর সামর্থ্য কোথায়? শ্বশুরমশাই গোষ্ঠগোপালতো তখন আর নেই। কিন্তু দুই শ্যালক ততদিনে সাব্যস্ত হয়েছে। বড় গুরুদাস বাদুড়িয়া মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান। জাতীয় কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা। পারিবারিক জমিজিরেতের সঙ্গে ছিল বাদুড়িয়ার সিনেমা হলের মালিকানা। ছোটো রবীন্দ্রনাথ চাষবাস দেখেন। তাঁর নেশা আবার রান্না করা। এলাকায় কোনো বড় অনুষ্ঠান হলে খাওয়াদাওয়ার তদারকিতে তিনি – তা সে অষ্টম প্রহর কীর্তন হোক, বা কংগ্রেসের সভা। মামারা ভাগ্নেদের পড়াশোনার খরচ যোগান সাধ্যমতো। বড় হলে ভাগ্নেরা নিজেরা টিউশনি করে পড়ার খরচ জোটানো শুরু করে। বড় আমোদ কুমার কলকাতায় ট্রাম কোম্পানির চাকরি পায় আর শ্যামবাজারে মেসবাড়িতে আস্তানা খুঁজে নেয়। মেজ রণজিত কিছুদিন আড়বেলেতে মর্ডান বুক এজেন্সির মালিক পরিবারে গৃহশিক্ষক হয়ে থাকে। কাজ হল সে বাড়ির ছেলেমেয়েদের পড়ানো আর অন্য সময়ে বাজার করা, টুকিটাকি সাহায্য করে দেওয়া। এ ব্যবস্থায় খাওয়ার খরচটা বেঁচে যায় আর সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের পড়াটা চালানো যায় কোনোক্রমে। এ যেন শরৎবাবুর বলা এক জীবন। রণজিতের লড়াই সাফল্যের মুখ দেখে। সে এম কম পাশ করে, কলকাতায় পেটেন্ট অফিসে একটা চাকরি পায়। হেমের বোনের ছেলে তারাপদও জীবিকার টানে কলকাতায় গিয়ে ওঠে। ভায়েরা বাড়িভাড়া নেয় কলকাতার লকগেট রোডে। মামারা বড় আর মেজ ভাগ্নের পাত্রীর খোঁজ করেন। ১৯৪৫ এ সংসার ফেলে চলে গিয়েছিলেন হেমনলিনী। আবার ১৯৫৪ তে বাড়ির চৌহদ্দিতে নতুন বৌয়ের আলতা পরা পায়ের ছাপ পড়ে। হরিশপুরের গোলদার বাড়ির সুমিত্রাকে মামারা বড় বৌ করে নিয়ে আসেন। দেড় বছর বাদে রঘুনাথপুরের খ্যাতনামা কবি বিজয়মাধব মণ্ডলের মেজ মেয়ে মঞ্জুলিকাকে পছন্দ করেন ছোটোমামা রবীন্দ্রনাথ, মেজ ভাগ্নে রণজিতের জন্য।
আদুরী দিদমা তখনও বেঁচে। বিজয়মাধবেরা আট ভাই, তবে বিজয় কেমনধারা অন্যরকম। গদ্য পদ্য এসব লিখে খাতা ভরায়। ধানকুড়ের যশোদা দুলাল মণ্ডল আছে, গান লেখে, পত্রিকা চালায়। তার সাথে ভাব। যশোদা বিজয়ের কবিতা ছাপায়। বিজয় রঘুনাথপুরে ইস্কুল করেছে। নিজে আবার তার সেক্রেটারি। কি কান্ড সেখানে প্রাথমিকে ছেলে মেয়ে একসঙ্গে পড়ে। মেজ মেয়েটার খুব স্মৃতি শক্তি। বিজয় তাকে ইস্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। লুকিয়ে রবিঠাকুরের কবিতা শেখায়, নিজের লেখা কবিতাও শেখায়। বাকি ভাই ভাজেরা দুচক্ষে দেখতে পারেনা বিজয়ের এই অনাসৃষ্টি কান্ড। কিন্তু শত বোঝালেও সে বাগ মানেনা। মেয়েকে নিয়ে নিয়ে, এ গাঁয়ে সে গাঁয়ে ঘোরে। যার বাড়িতে মেয়ে আছে, সেখানে নিজের মেয়েকে দেখিয়ে ধরাধরি করে। কবিতা বলায়। আরও কিছু প্রাথমিকে পাশ দেওয়া মেয়ে যোগাড় করে সে মেয়েদের সেকেন্ডারি ইস্কুল করতে চায়। মঞ্জুটাও হয়েছে তেমনি। বাপে যা বলে তাই করে। আরে বাবা, মেয়ে নিজে যদি বাধা দিত, বাপে কি এত এগোয়? প্রথমটায় কেউ তেমন পাত্তা দেয়নি। কিন্তু ও মা! পাঁচ পাঁচটা মেয়ে যোগাড় করে বিজয় একদিন সত্যি সত্যি মেয়েদের ক্লাস ফাইভ খুলে ফেলে। খোলাপোতা থেকে এক দিদিমণি ও আসতে রাজি হয়ে যান। মঞ্জুও টকটক করে ক্লাস সেভেনে উঠে যায়। বাড়ির লোক প্রমাদ গোণে। পড়ার নেশা চড়ে গেলে, শেষে যে বে হবেনা। দেশ গাঁয়ের অরক্ষণীয়া মেয়ে ঘরে রাখা বড় বালাই। মঞ্জুকে লুকিয়ে শলা চলে। তার ঠাকুমার জায়ের নাতনি সুমিত্রার বিয়ে হয়েছে আড়বেলের মণ্ডল বাড়িতে। সে বাড়ির মেজ ছেলের জন্যে পাত্রী খুঁজছে। সে কলকাতায় ভাড়া ঘরে থেকে চাকরি করে। খাওয়া পরা জুটে যাবে। সুমিত্রার মামাশ্বশুরদেরও কানে ওঠে কথাটা। ছোটোমামা পাত্রী দেখতে আসেন। রণজিতকুমারের গায়ের রং টুকটুকে ফর্সা, প্রায় ছফুট। সিনেমায় নামলে নায়ক হতে পারত। মঞ্জু লম্বা বটে, তবে ছেলের তুলনায় বেশ কালো। মামা ভাগ্নের মন জানেন। পড়াশোনার চাষ আছে। সব দেখে কালো মেয়েকেই পছন্দ করে যান।
বিজয়মাধবের বই বেরোয়। সে সাহিত্য সরস্বতী উপাধি পায়। তার নিয়ম-ছাড়া মেজ মেয়েটার ইস্কুল কামাই হয়। খাতার নাম পড়ে থাকে। ভরা শ্রাবণে স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন তার পায় বেড়ি পড়ে। রণজিতের সঙ্গে মালাবদল করে সে নৌকা করে ইছামতীর খালপাড়ি দেয়। ইছামতীর হাওয়ায় তার বইয়ের পাতাগুলো ওড়ে। সেটা সন ১৯৫৬, দিনটা ১৫ই আগস্ট। মঞ্জুর নৌকো বড়পোলের ঘাটে ভেড়ে। সামনে পথ নেই, হাঁটু পেরিয়ে কাদা। সাবধানে বর বৌ গরুর গাড়িতে চলে। শ্রাবণ ধারায় খাল বিল পথ একাকার। সে জলে মঞ্জুর চোখেরও দুফোঁটা জল মিশে যায় আর সব মিলে গাড়ির গরুর পেটের তলায় ছলাৎ ছলাৎ করে। এ কি দেশ রে বাবা, ছোটোমামা ভরসা দেন, সবুর কর, এখুনি বাড়ি এসে যাবে। একটু পরে উঁচু ভিটে দেখা যায়। দুই মামীমা নির্মলাবালা আর রেণুকাবালা দাঁড়িয়ে আছেন বরণডালা নিয়ে। পিছনে উঁকিঝুঁকি দেয় সুমিত্রা।
মঞ্জুলিকার বয়স তখন
সবে ভরা ষোলো।
অষ্টাদশী সুমিত্রার
সঙ্গে দেখা হল।
তারপর সংসারের ফলা
দুরন্ত তার ধার,
একসঙ্গে করবে তারা
চারটি দশক পার।
সুমিত্রা আর মঞ্জুলিকা তখন তো ভাবতেও পারেনি, দূরের ঐ কলকাতা শহরের সিমলে পাড়ায় রয়েছে এক বারো বছরের মেয়ে বিজলী। আর বাগবাজারের ৫০ নং রামকান্ত বোস স্ট্রিটের বাড়িতে বড় হচ্ছে আর এক মেয়ে কৃষ্ণা, যার ডাকনাম খুকু। বয়স এখন মোটে দশ। সে নিবেদিতা ইস্কুলে পড়ে আর ইস্কুলের শ্রদ্ধাপ্রাণাজী তার নাম দিয়েছেন কৃষ্ণকুমারী। এই দুজনেরও চাল দেওয়া আছে এই আড়বেলের হাঁড়িতে। বিধাতা হাসেন। যাদের হাত ধরে তারা আসবে, সেই সেজকুমার আর ছোটোকুমার যে এখনও ছোটো। সেজকুমার তো বৌদিদের পিঠোপিঠি, খেলার সাথী। আর ছোটোকুমার সবে ক্লাস সেভেন। মিহি স্বর, তখনও গলা ভাঙেনি। বৌদি বৌদি ডেকে দুই বৌয়ের পায়ে পায়ে ঘোরে। রাধারমণের ডাক্তার খানা থেকে রুগী দেখে ফিরতে বেলা গড়িয়ে যায়। বাবা ঢুকতেই সেজ হাঁকডাক জোড়ে, বাবা, দেখো বৌরা কি রান্না করেছে, গালে দেওয়া যায়না। আসলে বকা খাওয়ানোর তাল। বাবা বাইরে থেকেই বলেন, গালে না দিতে পারিস ভাতে জল ঢেলে নুন মেখে খা। বৌদিরা মুখ টিপে হাসে। আহা রে! চেষ্টাটা মাঠে মারা গেল। তবু সে কি বাগ মানে? আবার আসে – মেজবৌদি! তুমি বেশি কালো না আমি, পরীক্ষা করে দেখি তো! খোকার আবার খেলার নেশা। মাঠে মাঠে ঘুরে ফুটবল খেলে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে করে ফেরে। বাবার আর দাদা বৌদির বকুনির চোটে পড়তে বসে। সকালে আবার ইস্কুলের আগে ব্যয়ামের আখড়ায় যায়। দেশ অল্পদিন হল স্বাধীন হয়েছে। সমাজে শরীর চর্চা আর ফুটবলের নেশা জোরদার। বড়বৌদি ঠান্ডা মানুষ, এদের সঙ্গে অত এঁটে উঠতে পারেনা। তার গর্ভে এখন এই প্রজন্মের প্রথম সন্তান আসছে।
ধান্যকুড়িয়া থেকে সতীরানী শ্বশুর ঘর সামলায় আবার বাপের বাড়ি ও দেখাশোনা করে। হেমনলিনীর মেজ বোনের বিয়ে হয়েছে যদুরহাটিতে আর ছোটোবোন ছিল ঈশ্বরীগাছায়। তাদের পরিবার আবার এবাড়িতে যাতায়াত শুরু করে। সংসারে শ্রী ফিরেছে। সুমিত্রার বাপের বাড়ির লোকেরা, বোনেরা শঙ্করী, লক্ষ্মী, শীলাও আসে দিদির কাছে, কিছুদিন থেকে যায়। মঞ্জুর বোনেদেরও কাছাকাছি বিয়ে হয়। বড় হেনার বাড়ি পাশে ধান্যকুড়িয়ায়, ছোটোর বাড়ি নেহালপুরে। তারাও আসে যায়। হেমনলিনীর জ্যেঠতুত ভাইবোনেরা ছিল – মল্লুক মামা, সুশান্ত মামা লক্ষ্মীমাসি – এতদিন পরে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়। অনেকদিন পরে উৎসবে, আত্মীয়তায় বাড়ি আবার গমগমিয়ে ওঠে। মেজকুমার কিন্তু মঞ্জুকে বলে, তুমি খোকার সঙ্গে আবার পড়া শুরু কর। তবে সংসারের ডামাডোলে সে আর হয়ে ওঠেনা। জীবনে সুখ দুঃখ পাশাপাশি চলে। একদিন ডাক্তার খানা থেকে ফিরে রাধারমণ খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছেলেরা কলকাতা থেকে ডাক্তার আনায়। পরীক্ষায় জানা যায়, অসুখটা কঠিন – লিউকেমিয়া। সক্ষম মানুষটি হঠাৎই বিদায় নেন। এদিকে শুকপুকুরে বিদায় নেন ছোটমামা সকলকে হতবাক করে দিয়ে। দুটো ঝড় এসে সংসারটা ঘুরে দাঁড়ানোর মুখে আবার টালমাটাল করে দেয়। খোকা আরও বেশি করে বৌদিদের আঁচল জড়িয়ে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে আবার সবাই শুরু করে নতুন পর্বের লড়াই।
সমুদ্র মন্থন
সংসারের সরোবরে পদ্ম ফোটান যিনি,
আড়বেলিয়ার ঘরের মাথায় ছাতা ধরেন তিনি।
বড়রানীর কোলে দোলে ছোট্ট কমলিনী।
সেজকুমারও পাশ দেবার পর কলকাতায় কলেজ স্ট্রিট বাটায় চাকরি পেয়ে এবারে কলকাতাবাসি হয়। মেজকুমারের সংসারে রাজপুত্র আর রাজকন্যা আসে – মলয় আর শুভ্রা। সংসারের বাড়তি খরচ চালানোর জন্য সে ছাত্র পড়ানো শুরু করে। টালায় একবাড়িতে টিউশনি করতে গিয়ে শোনে গৃহকর্ত্রীর নাতনির জন্য পাত্রী দেখা চলছে। গৃহকর্ত্রী আবার তার একমাত্র দিদি সতীরানীর আত্মীয়। পরিবার জানাশোনা, তাই ঐ নাতনির সঙ্গে সেজভাইয়ের সম্বন্ধ করা হল। আর কি? – সিমলের বিজলি আর নীরোদের মিলন হল আড়বালিয়ার আকাশের নিচে। নীরোদ – বিজলীর কলেজ স্ট্রিটের সংসারে নেমে এল দুটি বৃষ্টি ফোঁটা, মৃণাল আর কুনাল।
ছোটোকুমার ইস্কুল পাশ করে কলকাতায় পড়তে আসে। ইচ্ছে ছিল বাবার মতো ডাক্তারিতে ভর্তি হওয়া। কিন্তু একা একা অজানা শহরে ঠোক্কর খেতে খেতে হঠাৎ নতুন বন্ধুদের পরামর্শে পলিটেকনিক কলেজে ভর্তি হয়ে যায়। পাশ করে সে পোর্ট কমিশনের হেড অফিসে চাকরি পায়। আর লকগেট রোডের সেই বাসাবাড়িতে মাথা গোঁজে। তারপর পড়ার নেশায় বি এস সিও পাশ দিয়ে দেয়। এদিকে তো সেই বাগবাজারের কৃষ্ণা অশোকনগর ঘুরে এখন লকগেট রোডে ভাড়া থাকে। তার দাদা সুজিতচন্দ্র টালিগঞ্জের সিনেমা পাড়ার কাজ ছেড়ে এখন কাশিপুর গান শেল ফ্যাক্টরিতে একটা চাকরি পেয়ে গেছে। ঐ লকগেট রোডে আড়বেলের খোকা সমীর কুমার আর কলকাতার খুকু কৃষ্ণকুমারীর চার চোখ এক হল। গল্পের নটেগাছ কিন্তু মুড়োলোনা বরং দিন কে দিন আরো ডালপালা বিস্তার করল। আড়বেলেতে তখন ভরা সংসার। কমলিনীর পরে সুমিত্রার কোলে এসেছে আরও তিনটি পুত্র – বিশ্বজিত, সুজিত আর অভিজিত। মঞ্জুলিকারও এক পুত্র এক কন্যা মলয় আর শুভ্রা। বিজলীর কোলে আছে ছোট্ট মৃণাল। এই অসবর্ণ বিয়ের সম্ভাবনায় দুই পরিবারেই ঝড় উঠল। কৃষ্ণার আত্মীয় স্বজন বেঁকে বসলেন। এখন হোকনা যতই অবস্থা পড়তি, তবু কুলীন কায়েত বোস বংশ বলে কথা, নামজাদা বনেদী পরিবারগুলির সঙ্গে আত্মীয়তা। হোকনা পাত্র সুদর্শন, মেধাবী, চাকরি ওলা। মণ্ডল আর বোসের বিয়ে হতে পারে কোনোদিন? তাছাড়া যে মেয়ে কোনোদিন গ্রাম দেখেনি সে কিকরে ঐ অজ পাড়া গাঁয়ে সংসার করবে? আর আড়বালিয়ায়তেও সবার কপালে ভাঁজ।
কৃষ্ণাতীরে সমীর বহে
মনে তাদের ফাগুন
আড়বালিয়ার সংসারে কি
জ্বলবে এবার আগুন?
মেনে নেওয়া কিকরে যায়?
যদিও ওরা ঘটি,
মাটির ঘরে মানিয়ে নেবে
কলকেতার ঐ বেটি?
সম্বন্ধ নয় ভালোবাসা –
ভে-ন্নজাতে বিয়ে!
সুমিত্রা আর মঞ্জুলিকা
উঠল ঘেমে নেয়ে।
কিন্তু কন্দর্পের বাণ যে কোনো বাধাই মানেনা। তাই কলকাতার খুকু একদিন শুভক্ষণে পায়ে আলতা পরে ঘোমটা মাথায় খোকার মতোই সুমিত্রা আর মঞ্জুলিকার আঁচলের তলায় ঢুকলো। সনটা ১৯৬৯। খোকার মাইনে তখন বেশি তো নয়। বড়দি সতীরানী ভাড়া থাকত পাইকপাড়ায়। সেই বাসায় বড়দির ঘরের পাশে ঢাকা বারান্দায় তাদের প্রথম সংসার। এরপর ওদের জন্য পাইকপাড়ায় একটা আলাদা বাসাবাড়ি নেওয়া হল। আর যুগটা হাঁটি হাঁটি পা পা করে বিক্ষুব্ধ সত্তরের দশকে ঢুকে পড়ল।
জলছবি
উনিশশ ষাট পেরিয়ে
সত্তর যেই এল,
খোকা খুকুর ঘরে
একটা মেয়ের জন্ম হল।
এমন তো কতই হয়,
ঘটনার কি গুণ?
আরে এই মেয়েটাই,
এ গপ্পের – কথক ঠাকরুণ।
তার মানে হল, এই যে আমি কলকাতার মেডিকেল কলেজে কেঁদে উঠলাম – তার ফলে গল্পটা আর প্রথম পুরুষে লেখার কোনো হেতু রইলনা। এবার থেকে সব উত্তম পুরুষেই চলবে।
আমার বোন সর্বানী আমার থেকে প্রায় দুবছরের ছোট। তবে বোনের জন্মের আগের বেশ কিছু স্মৃতি এখনো আমি স্পষ্ট মনে করতে পারি। পাইকপাড়ায় যে বাড়িতে আমি শিশুকালে থাকতাম, সেই পরিবারের সঙ্গে এতটাই ভালো সম্পর্ক ছিল, যে বড়বেলাতেও সে বাড়ি যেতাম। গৃহকর্ত্রীকে পিসিমণি ডাকতাম। একজন দিদিভাই ছিল ব্রততী, ডাকনাম বনি, পিসিমণির মেয়ে। মাঝখানে একটি খোলা উঠোন, চারপাশে রেলিং দেওয়া বারান্দা মোজেইক করা। একতলায় আমরা থাকতাম, আর দোতলায় পিসিমণিরা। সেই দোতলার বারান্দাতেই একটি ছবি ভেসে আসে – আপাদমস্তক উলের পোষাকে ঢেকে আমি একটা নীল প্লাস্টিক ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে দাঁড়াচ্ছি আর মা একটা লাল টুকটুকে বল ছুঁড়ে দিচ্ছে। আমি একবারও ব্যাটে বলে সংযোগ করতে পারছিনা কিন্তু বারান্দার ব্যাটিং পিচে খুব দৌড়োদৌড়ি করছি, এদিক থেকে ওদিক আবার ওদিক থেকে এদিক। আচ্ছা! ব্যাটের দিকে বল ছুঁড়লে যে এদিকে ওদিকে দৌড়তে হয়, একথা কে শিখিয়ে দিয়েছিল – বাবা? আবার কখনও মনে পড়ে সরস্বতী পুজো হচ্ছে, সদর দরজার কাছে বাঁদিকে প্রথম ঘরে ঠাকুর। ঘর জুড়ে অনেক কিছু সাজানো। দূরে ঠাকুরের পাশে কয়েকটা বই রাখা, ওপরেরটা আমার। নীল মলাটের ওপর লাল আর সাদা দিয়ে লেখা। আমার বইটা নিয়ে নিয়েছে সবাই। এত জিনিস টপকে আমি যেতেও পারছিনা যে তুলে আনব। মা সমানে বোঝাচ্ছে, যে ঠাকুরের কাছ থেকে বই তুলে নিতে নেই। কিন্তু আমার ভবি ভোলার নয়। বারবার দরজা দিয়ে বইটা দেখছি, সদর দরজা অবধি দৌড়োচ্ছি আর প্রচন্ড চেঁচিয়ে কাঁদছি। আচ্ছা কি বই ছিল ওটা? দেওয়ালে ক্যালেন্ডার, মা কোলে করে ক্যালেন্ডারের সামনে আমায় নিয়ে গিয়ে বলছে এটা কে? আমি বলছি বিবেকান্দ-নন্দ। মা হাসছে, আমি হাততালি দিচ্ছি। মনে পড়ে রাস্তার উল্টো দিকে অল্প দূরে পিসির বাড়ি যেতাম। পিসির বাড়ির লম্বা জানলা, উঁচু খাট। মাদুর পেতে খাটের তলায় লাল সিমেন্টের মেঝেতে শুতাম। লম্বা জানলার নিচের অংশ দিয়ে বিকেলের রোদ ঢুকে খাটের তলায় আঁকিবুকি কাটত। আমি দেখতাম। দুবছরের শিশুর পক্ষে এতগুলো স্মৃতি অনেক। করোনা অনবসরের গৃহবন্দী জীবনে মেজজ্যাঠাইমা মানে মঞ্জুলিকা আর আমি মানে টুম্পা ফোনে ফোনে গল্প করি। পিসির বাড়ির খাটের তলায় শোয়ার কথা বলতেই, মঞ্জু বলে, আরে ঐ খাটের তলায় তো আমি ও শুয়েছি। পিসির বাড়ি ছোটো হলেও তকতকে। খাটের তলাতেও কোনো ঝুল বা ধুলোর প্রবেশাধিকার ছিলনা। আর মা বলতো আমার পিসি ঘরে ম্যানেজার রাখলেও স্টিলের, এ্যালুমিনিয়ামের আর হিন্ডালিয়ামের বাসনগুলো রুপো আর পিতল কাঁসার বাসনগুলো সোনা করে রাখতো ঘষে ঘষে। বাসনে কোনদিন কোনো দাগ ধরতে দেয়নি। বয়সকালে এই পরিষ্কার করাই বাতিক হয়ে কিছুটা শুচিবাইগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল। পিসির গল্প করতে গিয়ে একাশি বছরের মঞ্জু আর একান্নর টুম্পা হাসে ফোনের দুপাশে। কথা বলতে বলতে মঞ্জু বলে এজীবনে অনেক কিছুই দেখলাম। ছেলে মেয়েরা প্রতিষ্ঠিত হল, নাতি নাতনিরাও সাব্যস্ত হল, শুধু লেখাপড়াটা হলনা রে টুম্পা। আজ এই শেষের দিনে বসে চুপচাপ ভাবি, বড় খেদ রয়ে গেল। মঞ্জু কাঁদে, টুম্পা ওপাশে মুখে হাতচাপা দেয়। চেষ্টা করে গলাটা যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার। মঞ্জু সোনার তরী আবৃত্তি করে, বিজয়মাধবের কাছে শেখা। টুম্পা এপাশে ফোনের কল রেকর্ডার অন করে দেয়
ঐ কচি বয়সের স্মৃতি আমার আড়বেলেতেও আছে। বিকেলের হলুদ আলো, উঁচু অবধি বাঁশের ভারা, অনেক বাচ্চা সেই উঁচুতে বাঁশে দাঁড়িয়ে। নিচে অনেকে মিলে একটা বড় জাল টেনে ধরে রেখেছে। ঐ জালে একটা করে বাচ্চা লাফ দিচ্ছে। বাবার কোল থেকে আমি অবাক হয়ে দেখছি। তারপরে রোদের মধ্যেই গায়ে জল পড়ল। বৃষ্টি নামল। বাবা একটু ঝুঁকে আমাকে দুটো হাত দিয়ে আড়াল করল। বাবা দৌড়োচ্ছিল। আমি বাবার ওমে ছিলাম, তখন আমার গায়ে জল পড়ছিলনা। তারপরে কি ঘুমিয়ে গেলাম? স্মৃতিটা আর নেই। পরে বড় হয়ে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
– মা, এমন কিছু কি ঘটেছিল, নাকি স্বপ্ন?
মা অবাক হয়ে বলেছিল
– আড়বেলের চড়কের মেলা, বাঁশে বাঁধা চড়কগাছ। বৃষ্টি এল, তোর বোন তখন পেটে। হিসেব মতো তোর তখন একবছর চার মাস। এসব কথা বলছিস কি করে রে?
– মনে যে ছবি ভেসে আসে, মা।
– এ কি অদ্ভুত রে?
– আচ্ছা মা, বিয়েবাড়ি, উঠোনে ইংরেজি এইচের মতো কমলা রঙের কাঠের চেয়ার, সামনে সাইকেল ভ্যান, তাতে অনেক কলাপাতা, কাপড় দিয়ে ঢাকা, এমন কিছু হয়েছিল?
– হ্যাঁ, সে তো বকুলদার মেয়ে বাবলির বিয়ে, দমদমে।
– মা শোনোনা, একটা সিনেমা হচ্ছে, একজন লোক, দরজার পর দরজা পেরিয়ে যাচ্ছে, ওটাও তাহলে সত্যি!
– ওটা তো প্রমথেশ বড়ুয়ার মুক্তি।
– প্রমথেশ বড়ুয়া! উত্তম কুমারের আইডল – পি সি বি?
– হ্যাঁ, সেই পি সি বি। বাবা ধন্যি তোর মনের ছবি।
নতুন সূর্য
বোন হবার পরে পাইকপাড়া ছেড়ে আমরা পাতিপুকুরের সরকারি আবাসনে উঠে এলাম। পাতিপুকুরে এসে মা বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনে বি এ তে ভর্তি হল। আর বাবার তো ঠাকুরদার মতো ডাক্তার হবার ইচ্ছে ছিল। সে তো হলনা। বাবা সেই আশা কিছুটা হলেও পূরণ করার জন্য সরকারি হোমিওপ্যাথি কলেজে ভর্তি হল। শুরু হল সংসার, চাকরি আমাদের বড় করে তোলা আর সঙ্গে পড়াশোনা। আমরা একটা ঘরে থাকতাম। খাটটা ছিল উঁচু, তার তলায় সর্বস্ব। পাঁচ সাত খাটের মাঝখানে আমি আর বোন দুদিকে মাথা করে, পায়ে পা ঠেকিয়ে শুতাম। দুপাশে বাবা মা। বাবা আমার দিকে মাথা করে শুত আর মায়ের মাথা বোনের দিকে। গভীর রাতে যদি ঘুম ভেঙে যেত, দেখতাম খাটের একপাশে বা মেঝেতে হারিকেন জ্বালিয়ে বাবা মা পড়াশোনা করছে। আলোটা এপাশে খবরের কাগজ দিয়ে আড়াল করা, যাতে আমাদের চোখে না পড়ে।
উঠতি ঘরের ছেলে
আর পড়তি ঘরের মেয়ে,
বিদ্যেদেবী থাকেন তাদের
সারা জীবন ছেয়ে।
বাবা মা দুজনেই খুব মেধাবী ছিল। কিন্তু মা যেকোনো বিষয়ে খুব উদ্বেগে ভুগত, আর বাবা নিরুত্তাপ। মা পার্ট ওয়ান পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগের দিন হয়তো ঠিক মতো প্রস্তুতি হয়নি, সেই ভেবে ভেবে বমি টমি করে একশা। পরীক্ষার দিন বাবাকে ছুটি নিতে হল, অসুস্থ মাকে নিয়ে যাবার জন্য। বাবা কিন্তু অফিস, সংসার সামলেও চুপচাপ প্রথম পরীক্ষা দিয়ে দিল, তেমন কোনো ঢেউ উঠলোনা। শুধু প্র্যাকটিকাল খাতার আঁকাগুলো আমার মাসি, কাবেরীকে দিয়ে আঁকাতো। মাসিমণি খুবই ভালো আঁকত। বাবা সন্ধ্যেবেলায় বাড়ি ফিরে ঐ আঁকার উপর বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো ঠিক করে নিত আর স্কেল দিয়ে লাইন টেনে লেবেলিং করতো। আমি চুপচাপ একটু দূর থেকে ড্যাবডেবিয়ে দেখতাম, বাবা কি করছে। বাবার একটা ট্রাঙ্ক ভর্তি করে হাড় থাকত। সেই হাড় গুলো নিয়ে বাবা পড়াশোনা করত। ঐ হাড়ের বাক্স চানঘরের ওপরে লফ্টে রাখা থাকত। আমার প্রচন্ড আকর্ষণ ছিল ঐ ট্রাঙ্কের ওপর। ট্রাঙ্ক নামলে আমি আর দূরে থাকতে পারতাম না। বাবার পিঠের ওপর দিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে দেখতাম। এটা ওটা জিজ্ঞেস করতাম। ঐ দেখে দেখে চিনে গিয়েছিলাম, কোন হাড়টা শরীরের কোথায় থাকে। নিজের শরীরে স্পর্শ করে ঐ হাড়গুলো অনুভব করতাম। তবে সবচেয়ে ভালো লাগত ওপরের পিঠে, কাঁধের নিচের তিনকোণা স্ক্যাপুলা। ওটা নিয়ে খেলতাম। বোনকে বলতাম, এ্যাই আমার স্ক্যাপুলায় একটু চুলকে দে তো। মাকে বলতাম, মা – আ! আমার টিবিয়া আর ফিবুলার মাঝখান টা ধরে টিপে দাও। খুব ব্যথা করছে। আমার রোজ রোজ সন্ধ্যে হলেই পা ব্যথা করত। মা চুল বাঁধার কালো দড়ি দিয়ে পা জড়িয়ে বেঁধে দিত। প্রথম পরীক্ষার পর রেজাল্ট বেরোলে দেখা গেল বাবা পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে। আর ফাইনালে বাবা তৃতীয় হয়েছিল। অনেক পরে যখন বাবার সঙ্গে গিয়ে কোনো অ্যালোপ্যাথি নামকরা ডাক্তার দেখিয়েছি, তখন দেখতাম বাবা গিয়ে প্রণাম করত। ওঁরা ছিলেন বাবার স্যার। যাই হোক, মা গ্র্যাজুয়েট হল, আর বাবা হোমিওপ্যাথিতে ডাক্তারি পাশ করল। আমি ততদিনে বাগবাজার মাল্টিপারপাসে কেজি ওয়ানে ভর্তি হলাম। সালটা উনিশশ পঁচাত্তর। স্কুলের দিন গুলো খুবই আনন্দে কাটত। কিন্তু বাড়ি এসে চাপা টেনশন। বাবা ফিরত রাত দশটা পার করে। মা ঘরবার করতো। শুনতাম কিসব জরুরী অবস্থা হয়েছে আমাদের দেশে, জরুরী মানে খুব দরকারি। তাই বাবার অফিসে ওভারটাইম হয়, বাবাকে দেশের খুব দরকার। আনন্দবাজারে রোজ হেডলাইনের নিচে বড় করে কুট্টির কার্টুন বেরোত। বাবা মা ব্যস্ত থাকার জন্য, আমরা প্রায়ই কাছেই মামার বাড়ি থাকতাম। আর তখন মামা বসে বসে কুট্টির কার্টুনের মানে বোঝাতো আমাকে।
- এই দেখ টুম্পা, এখানে এইযে কাপড় মুড়ি দিয়ে গণতন্ত্র শুয়ে ঘুমোচ্ছে। আর এই দেখ দরজা দিয়ে সিদ্ধার্থ বেরিয়ে যাচ্ছে।
- কেন মামা?
- আরে সেদিন বুদ্ধদেবের গল্প বললাম মনে নেই?
- হ্যাঁ-অ্যাঁ
- যশোধরা ঘুমোচ্ছিল, আর রাজপুত্র সিদ্ধার্থ বেরিয়ে গেল না?
- হ্যাঁ হ্যাঁ
- আরে সেটাই কুট্টি এঁকেছেন দেখ।
- কী?
- আরে সিদ্ধার্থের মুখটা দেখ, নাক বের করা, তোলা চুল। এটা বুদ্ধদেব নয়, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়, মুখ্যমন্ত্রী। এই দেখ ভেতরের পাতায় ছবি। মিল পাচ্ছিস? একে বলে কার্টুন। নামের মিল বলে এইভাবে দেখাচ্ছে।
- বুদ্ধদেব কে আঁকেনি কেন?
- আর একটু বড় হ। বুঝতে পারবি কেনো আঁকেনি।
এর মধ্যে আবার মায়ের এক পিস্তুত ভাই মারা গেল। কলেজে পড়ত।দুপুরে ভাত খেতে বসেছিল, বাইরে থেকে কারা ডাকল। উঠে গেল। নামতে গিয়ে সিঁড়িতেই গলা কেটে দিল। আর তার মা মানে মায়ের মেজপিসি বোবা হয়ে গেল, আর কথা বলেনা।
- কে গলা কেটে দিল মা?
- নকশাল
- নকশাল কে? খুব দুষ্টু লোক? এখানে আসবেনা তো?
- চুপ চুপ। বাড়িতে যা বললে বললে, বাইরে, ইস্কুলে এসব কথা উচ্চারণ করবেনা।
রাস্তা দিয়ে মিছিল যেত। জানলা দিয়ে দেখে দেখে আমি আর বোন খাটের ওপরে মায়ের লাল ব্লাউজ নিয়ে মিছিল করতাম, চেঁচাতাম – ভোট দিন বাঁ-চতে, ত্-তা-রা হাতুড়ি কাস্তে। ইন -কি-লা-ব, জিন্দা-বা-দ। ঐ জানলাই ছিল জগৎ। আইসক্রিম ওলা, ঘুঁটে উলি, বাসন উলি যেই রাস্তা দিয়ে যেত, তাকে দুজনে ডাকতাম। কেউ হাসত, কেউ রাগ করতো। পাঁচমাথার মোড় থেকে হেঁটে ইস্কুলে যেতাম। আর দোকান, দেওয়াল এসবে কি লেখা আছে ড্যাবডেবে চোখ দিয়ে গিলতাম। ইস্কুলে সবার নাম লেখা দুটো করে ন্যাপকিন, থালা, গেলাস ছিল। একটা ভাঁজ করে গলায় গুঁজে ঝোলাতে হত। আর একটা টেবিলে পেতে থালা রাখতে হত। টিফিন ইস্কুল থেকেই দিত। খাওয়ার পর সবার ফোল্ডিং খাট ছিল, সেখানে ঘুমোতে হত। তিনজন মিস ছিলেন, মিস চৌধুরী, মিস ব্যানার্জি আর মিস বোস। মাঠে খেলা, নাচ গান, ব্রাশ দিয়ে বালি খেলা আর হাতের কাজ, আঁকা, কাঁচি দিয়ে গোল কাটা, এইসব হত। কিন্তু মনে হত, ইস্কুলটা বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেত। আর ভীষণ রেগে মাকে বলতাম, আমার ওভার টাইম হবেনা মা? আমার বুঝি কিছু জরুরী নেই? আমাকে দেশের দরকার লাগবেনা! মা গম্ভীর হয়ে বলতো, সে তো বটেই, তোমাকে দেশের খুবই দরকার। একটু বড় হলেই ওভার টাইম হবে। মায়ের কথা শুনে, বড় হলে, দেশ ঠিক কী করতে বলবে, এসব আকাশ পাতাল ভাবতে বসতাম। কে জি টু তে উঠে গেলাম। আর কতদিন লাগবে? এখনো তো দেশ কিছুই বলছেনা। বললে আমি জানবোই বা কিকরে? চিঠি দেবে? রাঁচি থেকে বড়দাদুর চিঠি আসে। আমার চিঠি বাড়িতে আসবে নাকি ইস্কুলে? আমাদের ব্লকে পোস্টম্যান ঢুকলেই লক্ষ্য রাখতাম, আমার নামে কোনো চিঠি এলো? কিন্তু এই চিঠির অপেক্ষায় থাকাটা কাউকেই বলিনি, মাকেও না।
আমি ওয়ানে উঠলাম। মা নিবেদিতা ইস্কুলে প্রাথমিক বিভাগে পড়ানোর চাকরি পেল। আমিও মাল্টিপারপাস ছেড়ে নিবেদিতায় ভর্তি হলাম। ওয়ানে ভর্তির পর থেকেই দেওয়ালের লেখাগুলো অনেক বদলে যাচ্ছিল। মাল্টিপারপাসের পাশে একটা দেওয়ালে বিরাট হাত, হাতের তালুতে গরাদ, গরাদের আড়ালে ছেলে। পাশে লেখা – একটি ভোট দিলে হাতে, মরবে পচে জেল হাজতে। ছি ছি কি বিচ্ছিরি ছবি। আর নিবেদিতা লেনের দেওয়ালে লেখা ছিল – বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, বুঝে নিক দুর্বৃত্ত। সঙ্গে চাষীর ছবি। লাইনটা বেশ মনে ধরল, ছবিটাও। মাকে দেখালাম। মা বলল, ওটা সুকান্তের কবিতা। বাবাকে ধরলাম, সুকান্ত কে? বাবা মায়ের দিকে তাকালো। মা সংক্ষেপে দেওয়ালের কথা বলল, আরও জুড়ে দিল, কাগজ আর দেওয়াল পড়ে পড়ে এই সব রাজনীতির দিকে নজর পড়েছে মেয়ের। দিনরাত এটা ওটা প্রশ্ন। বাবা কোনো কথা বললনা। কিন্তু পরের দিন একটা বই ধরিয়ে দিল আমার হাতে। নামটা সুকান্ত সমগ্র। আবার কিছুদিনের খাদ্য পেয়ে গেলাম। ইস্কুল যাবার পথে দেওয়াল জুড়ে রাক্ষসীর ছবি আঁকা থাকত, বড় বড় নখ ওলা, তাতে রক্ত পড়ছে। - মা দেওয়ালে এত রাক্ষুসী কে আঁকে বলোতো?
- রাক্ষুসী? ও! ঐ ইন্দিরা গান্ধীকে আঁকে।
- ই-ন্দি-রা গান্ধী! সে তো দারুণ দেখতে। দিল্লীতে থাকে। সিনেমার আগে, যার সিনেমা হয়, সেই তো। তার হাতে তারা হাতুড়ি কাস্তে থাকে? রাক্ষুসীর পাশে আঁকা থাকে।
- আমি ওসব বলতে পারবোনা। বাবাকে জিজ্ঞেস কর।
বাবা ব্যাপারটা মোটামুটি বুঝিয়ে দিল। মাঠে ফুটবল খেলা হলে যেমন কয়েকটা দল থাকে, দেশ চালাতে গেলেও তেমন। লোকে যাতে চিনতে পারে, তাই সব দলের একটা করে ছবি আছে। যে জিতে যায়, সে দিল্লিতে থাকে। মনে মনে হিসেব কষে নিলাম। ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে থাকে, মানে জিতে গেছে। তার ছবি হল হাত। আর তারা হাতুড়ি কাস্তে হল তার শত্রু। তাই রাক্ষুসী আঁকে। তবে কি বড় হলে ইন্দিরা গান্ধীই চিঠি দেবে আমাকে? কিন্তু হঠাৎ একদিন শুনলাম ইন্দিরা গান্ধী খেলায় হেরে গেছে। থমথমে মুখে ঘুরতে লাগলাম, আমার চিঠির কি হবে? মা লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল, - কী হয়েছে?
আমি এবারে ভেঙে পড়লাম। সেই কেজি ওয়ান থেকে অপেক্ষা করছি। ভেবেছিলাম ইন্দিরা গান্ধী চিঠি দেবে ওভারটাইমের জন্য। সে হেরে গেছে। আমি তাহলে দেশের দরকারে লাগব কী করে? চোখে জল চলে এল আমার। মা একটু সময় নিয়ে ব্যাপারটা বুঝল, আমার সমস্যাটা কী? তারপরে বলল, - তুমি ভুল বুঝে কষ্ট পাচ্ছ। দেশ ঐভাবে চিঠি দেয়না। দেশ কি চায়, সেটা বইতে লেখা থাকে। আর খেলতে গেলে হারজিত হবেই। কখনো মোহনবাগান জিতবে, কখনো ইস্টবেঙ্গল। এতে দুঃখের কিছু নেই।
আমি কান্না ভেজা গলায় বললাম, - তা সে কোন বইতে দেশের দরকার লেখা থাকে, সেটা কি তোমার কাছে আছে? আমি পড়তাম তবে।
মা তখন খাটের তলায় বইয়ের পাঁজা থেকে একটা বই বার করে গল্প পড়ে শোনালো। বইয়ের নাম রামকৃষ্ণের কথা ও গল্প। ধর্মব্যাধের গল্প। একজন ব্যাধ নিজের সব কর্তব্য পালন করতো, কোনো অহঙ্কার করতোনা, অন্যের ক্ষতি চাইতোনা। তাই সে সত্যিকারের জ্ঞানী হল, সন্ন্যাসীকে অবধি উপদেশ দিতে পারতো। গল্প পড়া শেষ করে মা বলল, যার যা কাজ সে সেটা মন দিয়ে করলেই দেশ খুশি হয়। দেশকে খুশি রাখাটাই সবার কাজ। - আমি এখন কী কাজ করে দেশকে খুশি করতে পারি।
- পড়াশোনা করে।
- পড়াশোনা করা দেশের কাজ? সবাই তো করেনা।
- বয়েস অনুযায়ী কাজ বদলায়। ছোটোদের কাজ পড়াশোনা। এই বলে মা আর একটা পুরোনো বই বার করলো। বলল,
- পড়ো, কি লেখা আছে।
বানান করে দেখলাম লেখা আছে- ছাত্রাণাং অধ্যয়নং তপঃ। মানেটা মা বলে দিল, ছোটোদের কাছে বই পড়াটাই সাধনা। দেশের জ্ঞানী ঋষির কথা। বুক থেকে পাথর নেমে গেল। বাড়িতে বসে মন দিয়ে বই পড়লেই দেশ খুশি হবে। এই এত সহজ কথাটাই জানতাম না। মায়ের সঙ্গে আগেই আলোচনা করা উচিত ছিল। মা দেখছি সবই জানে। বাবার ডাক্তারি বই অবধি ঘেঁটে ঘুঁটে দেখতে লাগলাম, বাংলায় কিছু আছে কিনা। পেয়েও গেলাম মেটেরিয়া মেডিকা। তারপর একদিন খবরের কাগজের মধ্যে একটা চকচকে বই এলো – শুকতারা। বাবা বলল, এবার থেকে তোমার জন্য প্রতি মাসে শুকতারা আসবে। এখন এটা পড়ো, মেটেরিয়া মেডিকা পরে পড়বে। সেই থেকে মা বাবার কথা মতো বই পড়ে চলেছি। বইয়ের বাইরে তেমন করে কিছু আর শেখা হলনা। ডাকঘর পড়েছি। রাজার চিঠি আসে কিনা জানিনা। ২০১২ সালে যখন কলেজের টিচার ইন চার্জ হলাম, মমতা ব্যানার্জির সই করা চিঠি পেয়েছিলাম নারী দিবসে। নারী প্রশাসক হিসেবে অভিনন্দনের চিঠি, সঙ্গে বড় প্যাকেট মিষ্টি, ফুলের বোকে। কম্পিউটারের ডাটা অ্যালগোরিদমের কারসাজিতে, জন্মদিনে নরেন্দ্র মোদীর ছবি আর সই দেওয়া ইমেলও পেয়েছি বার দুয়েক। নিজের মনে হাসি, দেশ কি জানতে পারে, কী কাজ করি আমি।
পিসিমণি
আমরা যখন পাতিপুকুরে এলাম, তখন পিসিও চলে এল দত্তবাগানে। সে বাড়িতে চন্দনা ছিল। আমি আর বোন পিসির কাছ থেকে ধানের শিষ নিয়ে তাকে খাওয়াতাম। পিসি লক্ষ্মী ঘিয়ে লুচি ভাজত। সেই লুচি ভাজার গন্ধ ছিল পিসির বাড়ির গন্ধ। আর বড়দের মতো আমাদেরও একরকম ভাবে বাটি বাটি করে তরকারি, বেগুনভাজা, মিষ্টি সাজিয়ে দিত। বড় ছোট আলাদা করতোনা। এটা ছিল একটা বিরাট সম্মানের ব্যাপার। বাড়িতে বাবা মাকে ভয় করতাম। কিন্তু পিসির সামনে বাবা মা জবুথবু। যতই দৌরাত্ম্য করি, কেউ কিছু বলতে পারতনা। বকার চেষ্টা করলেই পিসি কড়া ধমক দিত বাবা মাকে। এই ব্যাপারটা দারুণ লাগত, তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতাম। শীতের শুরুতে মাঝে মাঝে ঐ আবাসনে নীচ থেকে হাঁক শোনা যেত – টু-ম্পা, ঝু-ম্পা! আর জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালেই মনটা নেচে উঠত। দেখতাম অনেক ব্যাগ নিয়ে, দশাসই পিসিমণি সাইকেল রিক্সায় বসে আছে। আমরা তিনতলার কোয়ার্টার থেকে ছুট্টে নিচে গিয়ে ব্যাগগুলো ধরলে পিসি রিক্সো থেকে নামত। ঘরে এসে সেই ব্যাগ থেকে থরে থরে বেরোতো – তুলতুলে দুধপুলি, নারকেল – গুড়ের পাক ভরা সেদ্ধ পুলি, পাটিসাপটা দুরকম, একটা চিকণ, অন্যটা ক্ষীরের মধ্যে ভাসমান। সেদ্ধ পুলিটা ডুবিয়ে খাওয়ার জন্য আড়বেলে স্পেশাল মৌঝোলা গুড়। বাবা পাটিসাপটা খেতে ভালোবাসত, আমার আর মায়ের প্রিয় ছিল রসবড়া। চিনির রসে টোপা টোপা দেবভোগ্য রসবড়া ভাসতো। পড়তে পেতোনা, সব খেয়ে ফেলতাম। আর তারপরে দুতিন দিন প্রাতরাশ হতো পুলি দিয়ে। পিসি চলে যাওয়ার পর পিঠে পুলিও গল্প হয়ে গেল। পিসির মুখে হিমালয় কোম্পানির স্নো, তার সঙ্গে পাউডার আর ঘামের গন্ধ মিশে একটা ছোটোবেলার গন্ধ ছিল। ঐ গন্ধটা আজকাল মাঝে মাঝে স্বপ্নে আসে।
বারাসাতে তখন সদ্য পৌর জনবসতির সলতে পাকানো চলছে। পিসিমনাই ছিল করিতকর্মা মানুষ। বারাসাতে ধীরে ধীরে পিসিমনাই একটা বড় বাড়ি করল। সে বাড়িতে বাগান ছিল, বাঁধানো ঘাটওলা পুকুর ছিল। পুকুরের ঘাটের দুপাশে লাল সিমেন্টের বসার জায়গা করা ছিল। চারিদিকে ফাঁকা মাঠ। দূরে ধানজমি আর হু হু হাওয়া। চিলেকোঠার ঠাকুরঘরে পিসি পুজো করত, আমরা চারপাশে ঘুরঘুর করতাম। আমাদের সব জায়গায় ছিল অবাধ গতিবিধি। চানঘরে বড় চৌবাচ্চা ছিল। আমরা দু বোন পুকুরের মতো একসঙ্গে চৌবাচ্চায় নামতাম স্নান করতে। দুজন দুজনকে জল ছুঁড়তাম, ভীষণ মজা হত। আড়বেলেতেও মেজজেঠুদের চৌবাচ্চা ছিল। কিন্তু সেটায় একজন করে নামা যেত। পিসির বাড়িতে যখন থাকতাম, বাবা ওখান থেকে অফিস করতো। ফিরতে অনেক রাত হত। একবার মাথায় রোখ চাপল, পিসির বাগানে গাছ লাগাবো। বাবাকে বলে দিলাম, বাবা অফিস থেকে গাছ আনবে, আমি পুঁতব। রাত অবধি চোখ ভরা ঘুম তাড়িয়ে বসে ছিলাম বাবা কখন আসবে। বাবা ফিরলে দেখলাম গাছ আনেনি। ব্যাস, শুরু হল কান্না। হঠাৎ দেখি হারিকেন আর খুরপি হাতে পিসি আসছে, বাগান থেকে। হাতে দুটো গাছের চারা। নিজের বাগানের দুটো গাছ কুপিয়ে তুলে ফেলেছে, আমরা লাগাবো বলে। বাবার বিরক্তি, বকুনিকে দশ গোল দিয়ে, দুটো গাছ আমরা পুঁতে দিলাম। মানে আমরা ছুঁয়েছিলাম, পিসি পুঁতে দিল। আর গাছদুটোর নামকরণও হয়ে গেল – টুম্পার গাছ আর ঝুমুর গাছ। ছুটির দিন দুপুর বেলা সেই পুকুর ঘাটে বাবা ডলে ডলে সর্ষের তেল মাখাতো, মাথায় এক আঁজলা নারকেল তেল দিয়ে দিত, খেতে বসার সময়ে রগ দিয়ে তেল গড়াতো। বড় বাড়ি ধুয়ে মুছে রান্না বসাতে পিসির দেরি হয়ে যেত। মাংস সেদ্ধ হয়নি, এদিকে আমাদের খিদে পেয়ে গেছে। পিছনের টানা দালানে আসন পেতে বসে পড়তাম, পিসিমনাই বলে দিত, খুব চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বল, আমাদের ভাত দাও, মাংস দাও। আমরাও যথাসাধ্য নির্দেশ পালন করতাম। তার পরেই ধোঁয়া ওঠা ভাতের থালা আর অন্য থালায় অনেক বাটি সাজিয়ে পিসির প্রবেশ ঘটত। আর বড়দের যতগুলো বাটি, আমাদের দুবোনকেও তত গুলো বাটি সাজিয়ে দিত। পিসি কোনদিন কোলে নিয়ে সোনামনা বলে আদর করেনি। বাবা মাকে কড়া শাসনে রেখে, আমাদের সর্ববিধ প্রশ্রয় দেওয়াটাই ছিল পিসির আদর।
সে আদর শেষ হল, ক্লাস এইটে। আমরা স্কুল থেকে মায়ের সঙ্গে আর জি কর হাসপাতালে গিয়ে দেখি দাপুটে পিসি শুয়ে আছে নিশ্চুপ। এত কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছি, তবু একবারও ডাকেনা – টুম্পা ঝুম্পা এলি! নাকে নিশ্বাস পড়েনা। আর ও কিছুদিন থেকে গেলে কি এমন ক্ষতি ছিল। ছোটোবেলায় গল্প পড়েছিলাম, বুদ্ধ বলছেন এক মাকে, যে বাড়িতে মৃত্যু ঢোকেনি সেখান থেকে চাল নিয়ে এস, বাঁচিয়ে দেব, তোমার ছেলেকে। আমি ভাবতাম, আমাদের বাড়ি থেকে চাল নিলে বেঁচে যেত ছেলেটা। সেই ভাবনাটা কেউ ছিঁড়ে দিল কুচি কুচি করে। যেবার টুসি সিনেমা এসেছিল হলে সেবছর পিসি আমাকে আর বোনকে টুসি জামা কিনে দিয়েছিল, লেসের ফ্রিল দেওয়া। আমার হলুদ আর বোনের নীল। পুজোয় গান বাজছিল তোমার নীল দোপাটি চোখ আর শ্বেত দোপাটি হাসি। পিসি গম্ভীর ছিল, বড় একটা হাসতনা। আড়বালিয়ায় পুজো হলে, পিসি সব প্রসাদ ভাগ করত। দিদির ওপরে বাবা, বা জেঠুদের কোনো কথাই চলতনা। আমি একবার দাদাদের সঙ্গে ভিড়ে, শয়তানি করে ফাঁকা মিষ্টির বাক্স ঢিল পাটকেল পুরে, গার্ডার লাগিয়ে সুন্দর করে পিসিকে দিলাম – যেন মিষ্টিটা একপাশে পড়ে আছে, কেউ দেখেনি। পিসি নির্বিকার বাক্সটা নিল, আর আমাদের সামনেই ফেলে দিয়ে মুচকি হাসল। আমরা হাসি দেখব কী, তখন সব একছুটে পগার পার। আমার মা বলত, দিদির যা বুদ্ধি আর স্মরণশক্তি, লেখাপড়া করার সুযোগ পেলে জজ ব্যারিস্টার হত।
গরমের ছুটিতে আড়বেলেতে থাকতাম। আমরা বলতাম দেশে যাওয়া। সকালে বড়জেঠুর সঙ্গে দুধ আনতে যেতাম। বড়জেঠু বণিক পাড়ায় বাজার করত। আমরা বলতাম বেনেপাড়া। দুপুরে বড়জেঠু গোল ল্যাংড়া গাছে উঠত, লম্বা বাঁশের ডগায় তিনকোণা জাল। জায়গা মতো টান দিতে পারলেই জালের মধ্যে চার পাঁচটা আম চলে আসত। নিচে আমি ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম, অনেক উঁচুতে আমের ডাল আর পাতার আড়ালে বড়জেঠু অদৃশ্য, খসখস আওয়াজ, পাতার ফাঁকে রোদ্দুর চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। মনে একটু একটু ভয় হত, বড়জেঠু কই? তারপরই পাতার আড়াল থেকে ডাক পড়ত, মনা ধরবি। ওপর থেকে নামছে প্রতিবারে পাঁচ ছটা আম। ঝুড়িতে ক্যাচ লুফতে পারলে আম ফাটবেনা। মাটিতে পড়ে গেলে দৌড়ে দৌড়ে কুড়িয়ে নিতাম। নাতনি হবার আগে অবধি আমি ছিলাম, বড়জেঠুর মনা। যখন বড় হয়ে গেলাম, আর বড়দিদির কোলে আমাদের পরের প্রজন্মের প্রথম কন্যা এল, সেই স্বাতীই হল পরিবারের নতুন নক্ষত্র, ঐ মিষ্টি তারাকে মনা নামটা ছেড়ে দিয়ে আবার হলাম টুম্পা। আমার বোনের ঝুম্পা নামটা অনেক দিন আগেই ঝুমু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার নাম বদলায়নি। শুধু বড়দাদা টুমু বলে ডাকত।
ভাইবোন প্রায় সবারই বিভিন্ন নাম ছিল। যেমন সেজ তরফে ছোড়দার নাম মৃণাল, কিন্তু সেজজেঠু ডাকত ঝুকু। বড়তরফে সেজদা, নদা ছিল সুজিত আর অভি। কিন্তু আমার বাবা ডাকত ভুটে আর ভোকো। আর সবচেয়ে ছোটো ভাই – তার প্রতি বাড়িতেই আলাদা নাম। বড় তরফে রিন্টু, মেজতরফে ভন্টা, নিজের বাড়িতে বাবু আর ছোটো তরফে বুকু।
চার বাড়ির রঙতামাশা
সবাই চেয়ে দ্যাখ।
বাড়ি যখন চারটে,
তবে নাম কি হবে এ্যাক? – কক্ষনো হবেনা।
সেজদা আর নদা আমাকে সুপুরি পাতায় বসিয়ে টেনে নিয়ে যেত। দাওয়ার সামনে ঝাঁকড়া খেজুর গাছ। সকালে তার তলাটা খেজুর বিছিয়ে গদি হয়ে যেত। পাতার গাড়ি থেকে কুড়িয়ে নিতাম একমুঠো, ছোট্ট হাতে যে কটা ধরে। উঠোন থেকে বেরোনোর মুখে ভাঙা পাঁচিলে একটা দরজা ছিল, সেই জায়গাটা পাতা সমেত কোলে করে দাদারা পার করে দিত। বাজারেও নিয়ে যেত, কোলে করে, কারণ আমায় হাঁটিয়ে নিয়ে গেলে ওদের দেরি হয়ে যাবে। বিশুর মিষ্টির দোকানের সামনে এলেই বায়না করতাম। দাদারা পকেট থেকে নয়া পয়সা গুনে গেঁথে হিসেব কষে তিলকাঠি কিনে দিত। চুষতে চুষতে বাড়ি আসতাম, দাঁতে চিটচিটে তিল আটকে যেত। আর একটা খুব বায়নার জিনিস ছিল, কাঠির মাথায় গোল ফ্রেমে ঘোরা লাল অনচ্ছ কাগজ মোড়া কটকটি বাজনা।
বিকেল হলে ছোড়দিদি আর ছোড়দার সঙ্গে বাড়ির পিছনে জমিতে নামতাম। ছোড়দিদি আমাদের খেজুর পাতার ঘূর্ণি বানিয়ে দিত। কখনও ঢেসকুমড়ো হয়ে ছোড়দিদির পিঠে চড়তাম। তারপর একটা খেজুর ছড়ি হাতে, মরা গাছের গুঁড়িতে পা রেখে ছোড়দিদি শিবাজী হত। রোজ রোজ শিবাজীই বা হত কেন, সেটা অবিশ্যি আজও জিজ্ঞেস করা হয়নি। যাই হোক, আমরা হতাম শিবাজীর বিশ্বস্ত অনুচর। কোনো কোনোদিন দলবেঁধে সব ভাইবোন বড়পোলে যেতাম। জলকড়ের মধ্যে দিয়ে আলপথে সাবধানে লাইন করে জলের মাঝখানে চওড়া জায়গা দেখে পশ্চিম মুখে বসে সবাই গল্প করতাম। জলের মধ্যে সূর্য ডুবত। লাল কমলা আকাশের ছায়া পড়ে জলে, তার সঙ্গে মিশে যেত দিনের শেষ রোদ্দুরের সোনালি। কোনদিন আবার আইসক্রিম ওলা আসত মাথায় বাক্স নিয়ে। বরফের মধ্যে কাঠি হিসেবে গাছের নরম ডাল, বা ডাবের খোলার সরু অংশ লাগানো থাকত। ছোড়দিদি শিখিয়ে দিয়েছিল, আইসক্রিমের শেষটা খাবিনা। ঘষে ঘষে ঘামাচিতে লাগাবি। খুব আরাম।
সারাদিন হুটোপাটি করে সন্ধ্যেবেলায় ঘুম আসত। দাদারা পড়তে বসত। আমি আর বোন তো ছুটিতে গেছি, লেখাপড়ার বালাই ছিলনা। তবে মাঝে মাঝে সেজজেঠুর ঘরে, অঙ্কের শিবির বসতো। এক মাদুরে যে যার লেভেলে অঙ্ক কষতো। আমার তো খাতা নেই। ছোড়দা ওর খাতার মাঝখান থেকে পাতা ছিঁড়ে আমায় দিল। আর তাতে কী অঙ্ক করছি, নষ্ট করছি কিনা নজর রাখতে লাগল। আমিও যতটুকু জানি, যোগ বিয়োগ বানিয়ে নিয়ে করছি। ছোড়দা বলল, ও! শুধু যোগ বিয়োগ জানিস, আয় তোকে সরল শিখিয়ে দিচ্ছি। সরল আবার কি? যা শেখাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ব্যাপারটা বেশ জটিল। ইস্কুলে শেখায়নি, আমি তো কিছুতেই শিখবোনা। শেষে ছোড়দা নিরস্ত হল, কারণ রাত্তিরে খাবার ডাক পড়ে গেল। বড়জ্যাঠাইমার বাঁশে ঘেরা রান্নাঘর, মাটির মেঝে নিকোনো। মাটির মধ্যে গর্ত করে উনুন। সবাই আসন পেতে খেতে বসতাম, থালার পাশে মাটিতে নুন নিতাম। যেদিন বড়জ্যাঠাইমা আস্ত কাঁচালঙ্কা দিয়ে গরম গরম বড়ি সেদ্ধ করতো, সেদিন ভাতের স্বাদ ডবল হয়ে যেত। আমি এখনও বড়ি সেদ্ধ করি, লোক দিয়ে বড়ি করাতে হয়। তবে স্বাদে বড়জ্যাঠাইমার মতো হয়না। ছোটবেলায় শীতকালে আমাদের বাড়িতেই বড়ি হত। সে এক যজ্ঞ। পুরোনো বাড়ির টালির চালে চালকুমড়ো থাকত। সব বাড়ির কোটা হিসেব করে বিউলির ডাল আসত। ডাল বাটতে বড়ি দেওয়ার আগের রাতে লোক আসত। তাকে কেজি প্রতি টাকা দিতে হত। ডাল বাটার পর ছিল ফেটানোর পর্ব। তার সঙ্গে সাবধানে একটু একটু করে চালকুমড়ো কোরা মেশাতে হত। আর যতক্ষণ না মন্ড জলে ভাসবে, ততক্ষণ ফেটানো চলবে। খুব ভোরে মেজজেঠুদের ছাদে বাড়ির সব মেয়েরা বড়ি দিতে বসত। আমি যখন চোখ মুখ ধুয়ে ছাদে উঠি, তখন অর্ধেক কাজ শেষ। হাত ধুয়ে শখ করে বড়ি দিতে বসি। বড় বড় ধুতি টানা লম্বা করে পেতে, তার নানাদিকে মেয়েরা বড়ি দিচ্ছে। আমি খুঁজে পেতে সেজজ্যাঠাইমার পাশে একটু জায়গা করি। কিন্তু ঐ পিচ্ছিল মন্ড বাগে আনা কি অতই সোজা। যতই চেষ্টা করি, হাতে মাখামাখি হয়ে যায়, আর বড়ি শুয়ে পড়ে। কিছুতেই মাথা ওঠেনা। সেজজ্যাঠাইমা চোখ টিপে বলে, এ্যাই টুম্পা, তুই ওদিকটায় বড়ি দে। এদিকে তো ভরে এল। আমি অগত্যা ঠেলেঠুলে আবার ছোড়দিদির পাশে যাই। অবাক হয়ে দেখি বড়জ্যাঠাইমা তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুলের মাঝখান দিয়ে পুটুর পুটুর করে একবারে ছোট্ট ছোট্ট বড়ি দিয়ে যাচ্ছে, সব এক মাপে। ছোড়দিদি কিছুক্ষণ চেষ্টা চালায়, যাতে আমি একটু একটু মন্ড নিয়ে বাটির কানায় আকৃতি টা আনতে পারি, তবু ঠিক হয়না। শেষে হাল ছেড়ে বলে, তুই ওখানটায় বড়ি দে। আমার দেওয়া চ্যাপ্টা বোতাম বড়িগুলো যার কাজের পাশে থাকবে, তারই বদনাম। ঘুরে ঘুরে যে বড়ি দেখব, তার উপায় নেই, কারণ বড়িতে ছায়া পড়বে। বড়িতে ছায়া দিতে নেই। দুপুরের ঝনঝনে রোদ খাওয়ানোর পর, বড়ি সমেত ধুতি গুলো টাঙিয়ে দেওয়া হত, যাতে উল্টো দিকটাও শুকিয়ে যায়। বিকেলের রোদ ঢলে যাবার আগে ধুতি গুলো নামিয়ে এনে দাওয়ায় কাপড় শুকোনো দড়িতে টাঙিয়ে দেওয়া হত। শিশির লেগে গেলে বড়ি ঘেমে যাবে। রোদ খেয়ে ঝকঝকে সাদা বড়িগুলো যেন জুঁই ফুল। আমি আর বড়জেঠু পুট পুট বড়ি ছাড়িয়ে কৌটোয় পুরতাম। তখন আর কেউ বারণ করতোনা। ঐ কাজটায় শিশুর আঙ্গুল সুবিধেজনক।
সকলে টানা বারান্দায় আসন করে খেতে বসতাম। দাদারা খাওয়া হয়ে গেলে পরিবেশন করত। আমি ঘুরঘুর করতাম, কিন্তু কেউ ডাকতোনা। শেষে একদিন মেজজ্যাঠাইমা বলল, দাদা জল চাইছে, জল দে দেখি কেমন পারিস। মনের আনন্দে পেতলের সরু মুখ জলভরা জগ থেকে জল দিলাম মাটির গেলাসে। সে দেওয়ার এমনই বেগ, যে গেলাস থেকে জল ঠিকরে বড়দাদার কোলে পড়ে গেল। মা তো রৈ রৈ করে উঠেছে। আর আমি লজ্জায় মৃত। কিন্তু বড়দাদা বলল, টুমু ঠিকই দিয়েছে। জল প্রথমে গেলাসেই পড়েছিল, এভাবেই হবে। যাই হোক মায়ের শাসনে সে যাত্রা পরিবেশনের ইতি হল। এইভাবে ঠোক্কর খেয়ে খেয়ে ঘরের কাজ কিছু শিখলাম বটে, তবে প্রশ্রয়ের চোটে আজও দড় হতে পারলাম না।
একদিন হল কি, বিকেল বেলা শিবাজীর রাজসভার কাজ সেরে বিকেল গড়িয়ে আমরা বাড়ি ফিরছিলাম। ফেরার পথে লেবু গাছের তলায় কুড়িয়ে পেলাম বেশ বড় সাইজের রসে টাপুটুপু পাতিলেবু। আর আমার আনন্দ দেখে কে। কালবোশেখির ঝড় উঠলে দাদারা আম কুড়োতো। মা আটকে রাখত, আমায় যেতে দিতনা। ঝড়ের পরে গেলেও আমি একটাও পেতাম না। সব দাদারা কুড়িয়ে নিত, আর আমি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে ঘরে ফিরতাম। শেষে নদা নিজের থেকে একটা আম নিয়ে বলল এটা তুই নে। কিন্তু ওভাবে নিলে প্রেস্টিজ থাকেনা। তাই আমি বললাম, তুই মাটিতে ফেল, আমি কুড়োবো। নদা তখন ধুপ করে আমটা মাটিতে ফেলল, আমিও কুড়িয়ে নিয়ে নাচতে নাচতে ঘরে গেলাম। হরির লুঠের বাতাসাও পেতাম না। পরে যোগাড় করতে হত। সবাই হাসত। সেজজেঠুর বাড়ির গৃহপ্রবেশেও আমি খুচরো পয়সা কুড়োতে পারলাম না। সেজজেঠু সেটা দেখে আমার জন্য আলাদা করে ঝুরঝুর করে পয়সা ফেলল, আর আমি ফ্রকের কুঁচি পেতে নয়া পয়সা গুলো ধরে নিলাম। সামনে যারা ছিল সবাই হো হো করে হাসতে লাগল। সেজজেঠু চোখ পাকিয়ে সবার হাসি থামালো। আমি খুব সাবধানে ফ্রকের মধ্যে পয়সা ধরে মাকে দিয়ে দিলাম। পয়সার দরকার ছিল না, কুড়োতে পেরেছি – সেটাই আনন্দ। এ হেন আমি সেদিন কারোর সাহায্য ছাড়াই লেবু কুড়িয়ে পেলাম। সে এক রাজ্যজয়ের সামিল। কিন্তু যেই মেজজেঠুদের খিড়কি দরজা এল, ছোড়দিদি একটানে আমার হাত থেকে লেবু ছাড়িয়ে, দে ছুট। একলাফে ঘরে ঢুকে গেল। আর সেই অপ্রত্যাশিত আঘাতে খিড়কি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমি ফোঁপাতে লাগলাম। মেজজ্যাঠাইমা তখন বাঁশে ঘেরা রান্নাঘরে রান্না চাপিয়েছে। বাঁশের ফাঁকে ফাঁকে বেশ দেখা যায়। কতক্ষণ সময় গেল। মনের কালি বাইরে ছড়িয়ে ঝুপসি গাছগুলোতে আঁধার করে এল। এমন সময়ে হাতে অ্যাটাচি নিয়ে ধোপদুরস্ত মেজজেঠু অফিস থেকে ফিরল। আমাকে দেখেই টপ করে কোলে নিয়ে বলল
– কাঁদছ কেন?
এতক্ষণে সহানুভূতির ছোঁয়া পেয়ে আমার কান্নার উচ্ছ্বাস প্রবল হয়ে উঠল। কোনোক্রমে বললাম
– ছোড়দিদি আমার লেবু নিয়ে নিয়েছে।
– লেবু নিয়ে নিয়েছে? ভারি অন্যায়। আজই ছোড়দিকে কেটে ফেলব। ক – ই – গো, দা টা দেখি।
রান্নাঘর থেকে আওয়াজ আসে
– কেন? রাতবিরেতে দা নিয়ে কি হবে?
– এই যে, মমকে কাটব। ম-ম!
ফ্রক পরা মম এসে দাঁড়ায় মাটির দাওয়ায়। আর লেবুটা ছুঁড়ে দিয়েই পালিয়ে যায়। লেবু আবার আমার হয়। মেজজেঠু বলে – ছোড়দিতো লেবু দিয়ে দিয়েছে, এবারে আর ওকে কাটার দরকার নেই। আমিও লেবু যুদ্ধে জিতে ঘরে ফিরে যাই।
















