শিক্ষাজগতে লকডাউনের বাস্তবতা

ড. শারদা মণ্ডল

শিক্ষাক্ষেত্রে প্রথম পর্বের লকডাউন যদি হয় থমকে যাওয়া। দ্বিতীয় পর্বে তা হয়ে দাঁড়ায় মানিয়ে নেওয়ার যুদ্ধ। এই পর্বে প্রথম আসে ওয়েবিনার, অনলাইন কুইজ ও অনলাইন কোর্সের ঢেউ। ঢেউয়ের ধাক্কায় শিক্ষা জগতের ভরকেন্দ্র পূর্বের অবস্থান থেকে নতুন সাম‍্যবিন্দুতে সরে যায়। নিউ নর্মালের এই যাত্রা শিক্ষা জগতের ভিতর থেকে কেমন, ইচ্ছে হল সেটা একটু ফিরে দেখি। নতুন ভরকেন্দ্রে উপনীত হওয়ার পথে ছাত্র ছাত্রী ও স‍্যার ম‍্যাডামেরা উভয় পক্ষই অনলাইনে কেমন করে লেখাপড়া, গানবাজনা, বকাঝকা, নজরদারি করা যাবে, সেই বিষয়ে সড়গড় হলেন সেটা বাইরে থেকে বোঝা খুব মুস্কিল। 

গুগল ক্লাসরুমের কমেন্ট সেকশনে, বা চিরচেনা ফেসবুক পেজে যে নির্দিষ্ট সময়ে টিচার স্টুডেন্ট একসঙ্গে চ‍্যাট করে ক্লাস করা যায়, একথা কি আগে কখনো ভেবেছি? ভিডিও মিট অ্যাপ ফোনে ডাউনলোড করার আগে কতরকম ভয়! ফোন হ‍্যাক হবে, ফোনের সঙ্গে যুক্ত ব‍্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খালি হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তেমন কিছু আমার বা কলিগদের কারোরই বলতে নেই, ঘটেনি। কিন্তু ঐ ভয়ের ফলেই ভিডিও বানিয়ে ইউটিউবে আপলোড করাটা শেখা হয়ে যায়। ওয়েবিনারের সার্টিফিকেটের স্বীকৃতি ইউ জি সি যদি বা নাও দেন, ওয়েবিনারগুলি ভিডিও ক্লাসের সংকোচটা কাটিয়ে দিল, একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভিডিও অ্যাপে অনলাইন ক্লাস শুরু হতে টিচার স্টুডেন্ট দুপক্ষই যেন একটু শান্তি পাই। ঐ একটু গলা শোনা। আমরা আছি পরস্পরের জন্য এইটুকু অনুভূতি – একি কম পাওয়া! ক্লাসে অফলাইনের দুষ্টুমিগুলোও ফিরে আসে প্রবল ভাবে, কেবল একটু রূপ বদল করে। বরং বোঝা যায় অনলাইন ক্লাসের সুযোগ সুবিধা কিছু কম নয়, খালি কায়দা করে ব‍্যবহার করতে হবে।

ক্লাস ফ্রম হোম

ঘরের কাজ স্নান খাওয়া দাওয়া সেরে দুপুরে ক্লাসের প্রবণতা বেড়েছে। কখনও নেটওয়ার্কের দোহাই, কখনও অবাঞ্ছিত নয়েজের দোহাই দিয়ে ভিডিও অডিও মিউট করে চমৎকার গা ঢাকা দেওয়া যায়। আহা এতকাল টিচারের চোখ এড়িয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরোনো, পড়া ধরা এড়ানোর জন্য বেঞ্চের তলায় লুকোনো, ওপরে বই ঢাকা দিয়ে, নিচে পরের ক্লাসে জমা দেওয়ার জন্য প্র‍্যাকটিকাল খাতা লেখা, কত ঝক্কিই না  পোহাতে হয়েছে। তার ওপর ধরা পড়ার অ্যাংজাইটি, বকুনি, বাপ রে বাপ। আর এখন! দিব‍্য ক্লাসে বসেও অন্য স্ক্রিনে গিয়ে সিনেমা, অনলাইন সিরিজ দেখা যায়। কোনো চাপ নেই। অ্যাটেনড‍্যান্সের সময়ে দেরি হলে বন্ধুরা অ্যালার্ট করবে। নেটওয়ার্কের প্রবলেমে সাত খুন মাপ। কথা শোনা নাই যেতে পারে। নিজের প্রোফাইল নেম বদলে গুগল মিট অথরিটি ও রাখা যেতে পারে। ক্লাসে সেই অথরিটিকে দেখে অনলাইনে নবীশ শিক্ষকের আক্কেল গুড়ুম। প্রোফাইল পিকচার যা খুশি দেওয়া যায়। ইস্কুলে নিয়ম কানুনের কড়াকড়ি থাকে। কলেজে ধরবে কে? একটু অন্যরকমও কিছু ঘটে যায়। হঠাৎ ভিডিও অন করে ছাত্রের ঠাকুমা ফোনের জানলা দিয়ে অনুযোগ করেন, নাতি কিছু খেতে চাইছেনা, স‍্যার যাতে একটু বকে দেন। বাকিরা ভিডিও, অডিও মিউট করে ছবি হয়ে থাকে। কখনও ম‍্যাডাম শোনেন,  অ্যাকসিডেন্টালি অডিও অন হয়ে যাওয়া ছাত্রীর গলা, “মা মাছের ঝোল দিয়ে যাও।” আহা দুপুরের ক্লাস, ভাত খেতে খেতেই ক্লাস করছে। বাকিদের অডিও অফ থাকলেও, ক্লাসে উপস্থিত প্রত‍্যেকেই প্রত‍্যেকের উচ্চগ্রামে হাসির আওয়াজ টের পায়। কখনও ল‍্যাপটপে ক্লাস আর ফোনে বন্ধুদের সঙ্গে কনফারেন্সে থাকা একসঙ্গেই চলতে থাকে। না, ক্লাসে মনোনিবেশ করবোনা এমন ভাবনা থেকে নয়, ভার্চুয়াল ক্লাসে অ্যাকচুয়াল অনুভূতি পাওয়ার জন্য। আর সময়ের কথা যদি ধরি, এমন ব‍্যাগভরা সময়ের থলি আর ভবিষ্যতে কখনো আসবেনা। সারাদিন কলেজ করে আবার টিউশন ছোটা। খাওয়ার সময় নেই। ধুঁকে ধুঁকে নাচের ক্লাস, গানের ক্লাস, নাটকের দল, সাঁতার। ছেলেমেয়েদের জীবনটা ছুটে ছুটে যেন লজঝড়ে লোকাল ট্রেন ছিল। এখন সবকিছুই মোটামুটি চলছে, যাতায়াতে কোনো সময় খরচ নেই। হাতে অনেক সময়, লোকাল ট্রেন থেকে ঠিক যেন প‍্যালেস অন হুইলস। 

অধ্যাপক অধ‍্যাপিকারা যোগাড় করে নিয়েছেন, নানারকম ডিভাইস, যাঁর যেটা ছিলনা: ল‍্যাপটপ, প্রিন্টার, স্ক‍্যানার, পেন ট‍্যাবলেট। রপ্ত করে নিয়েছেন মাইক্রোসফট ওয়ান নোট, জার্নাল প্লাস প্লাস বা ডব্লু পি এস টুলস। কম্পিউটার স্ক্রিনে যে নানান রঙে এত সহজে এত সুন্দর আঁকা লেখা যায়, এতো লকডাউন না হলে জানাই যেতনা। অনলাইন বোর্ডে যে কম্পাস, চাঁদা সবই থাকে, ইচ্ছে মতো বোর্ডটাকে হোয়াইট বোর্ড, ব্ল‍্যাক বোর্ড, গ্রীন বোর্ড, গ্রাফ বোর্ড কত কিছু করা যায়, আগে জানা থাকলে ক্লাসে হাত ব‍্যথা করে হাতে, মুখে, মাথায় চকের গুঁড়ো না মেখে প্রোজেক্টরে কত সুন্দর বোঝানো যেত। যে কোনো ডকুমেন্টের ওপরে যে স্ক্রিনেই সই করা যায়, অনলাইনে খাতা দেখা যায়, কলিগের বা ছাত্রের কম্পিউটারে ঢুকে লেখা কারেকশন ক‍রা যায়, এসব কথা কে জানতো? ভাগ‍্যিস লকডাউন হল। অতিমারী চলে যাবে, কিন্তু পরের প্রজন্মের ব‍্যবহার্য প্রযুক্তি এই প্রজন্মেই শুরু হল, এটা কি বিস্ময়কর নয়! উপরি পাওনা ইন্টারনেট, যেটা ক্লাসরুমে পাওয়া ভার। এখন যেটা পড়াই, সেটার ছবি, আর্টিকেল, ইউটিউব ভিডিও, মায় সিনেমার সিন পর্যন্ত দেখিয়ে দেওয়া যায়। তবে হ‍্যাঁ সারাদিন ক্লাস করার জো নেই। দিনে তিনটি ভিডিও ক্লাসেই ছেলেমেয়েদের দৈনিক ডাটা প‍্যাক শেষ হয়ে যায়। তাই খুব হিসেব করে ইউ জি, পি জি রুটিন করতে হয়েছে। তবে ক্লাসটা যেহেতু পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন করে, নানাভাবে আগে থাকতে রেডি করে রাখতে হয়, একটি করে কমপ‍্যাক্ট ক্লাস, অনেক বেশি এফেক্টিভ। আর ক্লাসগুলির স্ক্রিন শট, স্ক্রিন রেকর্ডিং বা অ্যাপ রেকর্ডিং এরও সুযোগ আছে। বেশি সুবিধে আবার নতুন দুষ্টুমির সুযোগ এনে দেয়। স‍্যারের পড়া শুনতে শুনতে ওনার ঘরে কী কী দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে। ম‍্যাডাম বরকে স্পিকার ঠিক করে দিতে ডাকছেন। তাঁর মুখটি ক‍্যামেরায় ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চটপট স্ক্রিন শট উঠে যায়। আমিও দেখেছি পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েট ডিসার্টেশনের অনলাইন ভাইভাতে, ছাত্রের হাসিমুখের পিছনে দাওয়ায় একটি বিছানার চাদর টান করে টাঙানো, উপরে টালির চাল, যত্নে নির্মিত একটি অস্থায়ী পরীক্ষাগৃহ।

অনলাইন পরীক্ষা 

লকডাউনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় সেমেস্টার। চলে আসে পরীক্ষার পালা। বাড়িতে বসে, বই দেখে পরীক্ষা আমরা দেওয়া দূরস্থান, আগে কখনো এদেশে হয়েছে বলে শুনিনি। দুপুর, বিকেল, সন্ধ‍্যে পেরিয়ে রাত – বহু অনলাইন মিটিং-এর পর ঠিক হয় পদ্ধতি। পদ্ধতি ঠিক নয়, বলা যায় চ‍্যালেঞ্জ। দুঘন্টায় একশো নম্বর। পঁচিশ নম্বর করে বড় প্রশ্ন, অথচ উত্তরের শব্দ সংখ্যা সীমিত, তিন পৃষ্ঠায় ধরাতে হবেই হবে, কিন্তু পয়েন্ট বাদ দিলে চলবে না। প্রশ্ন এমন হবে যে গুগল সার্চ করে যেন পাওয়া না যায়, অর্থাৎ প্রশ্ন হবে তথ্য নয় ধারণা ভিত্তিক। পাশে বই বা নোট খোলা থাকলে, সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, লিখতে ইচ্ছে করে। তিন পৃষ্ঠায় সারসংক্ষেপ ধরাতে গেলে, বিষয়টা গুলে না খেয়ে উপায় নেই। বাড়ি থেকে আধঘণ্টা আগে রেডি হয়ে বসার নির্দেশ, পনেরো মিনিট আগে প্রশ্নপত্র বিতরণ, দুঘন্টা পরে অনলাইনেই খাতার সফ্টকপি মিলিয়ে ইমেল থেকে ডাউনলোড করে জমা নিয়ে নেওয়া – অভূতপূর্ব সব ব‍্যপার। খাতা দেখাও হল অনলাইনে, খাতায় নম্বর বসিয়ে সই করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনলাইন পোর্টালে জমাও পড়ে গেল। পুরো পদ্ধতিতে কোথাও খাতার পাঁজা নিয়ে ছোটাছুটি করতে হলনা। যাতায়াত, স্টোরেজ এ সময় খরচ হলনা বলে, রেজাল্ট ও বেরোলো চটপট। করোনা কালের আগে সেমিনারে এসব আলোচনায় শুনতাম, যে ভবিষ্যতে এমন হয়তো হতে চলেছে। এত তাড়াতাড়ি হাতে কলমে এমন হয়ে যাবে, তা আগে কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি। আজ বাইশ বছর ধরে পড়ানোর পেশায় ও নেশায় আছি। মাইক্রোসফট ওয়ার্ড, এক্সেল শিখেছি পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে, ইমেল পাঠাতে শিখেছি চল্লিশের পরে। এহেন আমি পঞ্চাশে পৌঁছে দু তিন মাসের ভিতরে হয়েছি একজন ইউটিউবার, নিজের ভিডিও এডিট করতে শিখেছি, অনলাইন ফর্ম, কুইজ, ফাইল কনভার্ট শিখে গেলাম। ভিডিও মিট, ফেসবুক লাইভ জলভাত, লকডাউন ছাড়া এ সম্ভব ছিলনা। নিজের বিষয়ের লোকেরা তো বটেই, দেখছি অন‍্য বিষয়ের সহকর্মীরাও সাধ‍্যমতো শিখছেন এবং যিনি যেটা শিখছেন, তিনি অন‍্যকে তা শেখাচ্ছেন। শিক্ষা জগৎ মেধা ও মননের কারবারী, হয়তো এই কারণেই পট পরিবর্তন এত দ্রুত সম্ভব হয়েছে। 

অনলাইন অনুষ্ঠান 

সময় নিয়ে কি করি, কি করি ভাবতে ভাবতেই বিভাগীয় দেওয়াল পত্রিকা ডিজিটাল দেওয়ালে উঠে পড়ল। জলবিষুবের দিনে ভার্চুয়াল বার্ষিক অনুষ্ঠানও ছেলেমেয়েরা প্রাণপাত করে উৎরে দিল। স্বাধীনতা দিবস আর শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানও বাদ পড়েনি। স্নাতক তৃতীয় বর্ষের আর স্নাতকোত্তর চতুর্থ অর্ধবর্ষের বিদায় সম্মিলনী, প্রথম অর্ধবর্ষের বিভাগীয় নবীনবরণ সব ঠিক সময়েই সম্পন্ন হয়েছে। কারণ ছেলেমেয়েরা কম্পিউটার আর ফোন দিয়ে যেকোনো ম‍্যাজিক করতে পারে। তারা যে বসে নেই, তার প্রমাণ বিভাগের ফেসবুক পেজ রোজই ভরে উঠছে তাদের অঙ্কনে, লেখা কবিতায়, প্রবন্ধে, ফোনে তোলা ফটোগ্রাফে। অনেকেই নিজের ইউটিউব চ‍্যানেল খুলেছে, কেউ রান্না শেখানোর, কেউ পড়ানোর, কেউ হস্তশিল্পের। কাজেই এটা পরিষ্কার যে শিক্ষা জগতের চাকা গড়াচ্ছে। তবু কটি কথা মনে হচ্ছে। 

অনলাইনের বাস্তবতা 

প্রথমতঃ স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আমাকে যেমন অন্য কলেজে কোনো বিষয়ের মৌখিক পরীক্ষা নিতে বা কোনো আমন্ত্রিত বক্তৃতা দিতে যেতে হয়, তেমন আমাদের কলেজেও অন‍্যান‍্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অধ‍্যাপিকারা আসেন। ভিডিও মিট অ্যাপে অনলাইন ক্লাস শুরু হয়ে যাওয়াতে করোনা পরবর্তী সময়েও এই ব‍্যবস্থা চলবে। অর্থাৎ আগের পুরোপুরি অফলাইন ব‍্যবস্থা আর কোনোদিনই ফিরবেনা। একধরনের মিশ্র বা ব্লেন্ডেড ব‍্যবস্থা চলবে। এই অনলাইন ক্লাসে সুবিধা দুটি। ভিন রাজ‍্যের এবং ভিনদেশী প্রথিতযশা শিক্ষকেরা সহজলভ্য হয়ে উঠবেন। রাহা খরচ, থাকা-খাওয়ার খরচ শূন্যে নেমে আসা এবং রেকর্ডিং এর সুবিধা থাকার জন্য সরকার পোষিত, সাধারণ কলেজগুলি দামী বেসরকারি কলেজগুলির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে।  (এক্ষেত্রে কলেজের নিজস্ব ইন্টারনাল ফ‍্যাকাল্টিদের কাজ কমবেনা, কারণ একদিনের আমন্ত্রিত বক্তা যেটুকু পড়িয়ে যান, ঘরের শিক্ষকেরা সেটাকে ঘষে মেজে ছাত্রছাত্রীকে পরীক্ষা পর্যন্ত এগিয়ে দেন।) এতে বেসরকারি শিক্ষা ব‍্যবসার ওপরে খরচ কমানোর চাপ বাড়বে। সাধারণ মানুষ উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। কিন্তু এই আশা তখনই পূর্ণ হবে, যদি সরকারের সদিচ্ছা থাকে। এই ক্রান্তিকালে যদি সরকার শিক্ষা ক্ষেত্র থেকে হাত তুলে নিয়ে, বেসরকারিকরণের পথ প্রশস্ত করেন, তবে সাধারণ মানুষের এই উপকারটুকু হবেনা।

দ্বিতীয়তঃ লকডাউনে একটি বিশেষ জিনিস লক্ষ্য করলাম। যেসব ছাত্রছাত্রীরা প্রায়শই নানান অজুহাতে ক্লাস কামাই করতো, অনলাইন ক্লাসেও তারাই অনিয়মিত। আর শিক্ষক সম্প্রদায়ের ভিতর অল্প কয়েকজন উদাসীন আছেন, লকডাউনে সেই তাঁরাই চমৎকার বিশ্রাম নিচ্ছেন। শিক্ষাজগতের এই আমূল পরিবর্তন বা প‍্যারাডাইম শিফটে এই দুই প্রজাতির তেমন কোনো ভূমিকা নেই। আমাদের ছাত্রাবস্থাতেও কিছু অসাধারণ শিক্ষককে পেয়েছি, জ্ঞানে অজ্ঞানে যাঁদের অনুসরণ ও অনুকরণ করে চলেছি। এঁদের পাশাপাশি কিছু গড়পড়তা শিক্ষকও ছিলেন। কিন্তু তাঁদের বক্তৃতার মান যেমনই হোক, তাঁরা যা বলে দিতেন, যে বই দেখিয়ে দিতেন, তাকে যাচাই করার জন্য কোনো বিকল্প উৎস আমাদের হাতে ছিলোনা। এখনকার ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে এইখানেই আমাদের ছাত্রাবস্থার ফারাক। দেশবিদেশের শিক্ষকেরা আজ মুঠোফোনের জানলা দিয়ে ছাত্রদের সামনে হাজির হয়েছেন। শুধু মাত্র রেকর্ডেড বক্তৃতা নয়। ইচ্ছে হলেই বৈদ‍্যুতিন মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে প্রশ্নোত্তর, কথাবার্তাও অসম্ভব নয়। তাই ক্লাসে আজ নিম্ন বা মাঝারি মানের বক্তৃতার দিন শেষ। এইমূহূর্তে সার্বিক ভাবে শিক্ষকতার পেশাটি ভয়ংকর চ‍্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চ‍্যালেঞ্জ মূলত দুরকম। এক ব্লেন্ডেড পদ্ধতিতে মানিয়ে নেওয়া মানে, কলেজে প্র‍্যাকটিকাল, বাড়ি থেকে অনলাইনে থিওরি, চব্বিশ ঘন্টায় যেকোনো সময়ে মিটিং – এই সময়ের দাবীর সঙ্গে শারীরিক এবং মানসিক ভাবে মানিয়ে নেওয়া। আর দুই হল বিশ্বমানের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে নিজেকে তৈরি করা। তাই সংখ্যায় স্বল্প হলেও উদাসীন শিক্ষকদের সামনে এখন আশু বিপদ। ধরে নেওয়া যেতেই পারে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর কোনো দিনই প্রশ্নপত্র গাড়ি করে কলেজের কাছে পুলিশ থানাতে আসবেনা। সাতসকালে কলেজের কাউকে অথোরাইজড্ লেটার নিয়ে থানায় দৌড়াতে হবেনা। এবার থেকে পরীক্ষার নির্দিষ্ট কিছু মিনিট আগে প্রশ্নপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে আপলোড হবে। কলেজকে ডাউনলোড করে নিতে হবে, ঠিক যেমন অনলাইন পরীক্ষার সময় হয়েছে। আজকাল অ্যাডমিট কার্ড থেকে শুরু করে অনেক কিছুই বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট পোর্টাল থেকে কলেজকে ডাউনলোড করে নিতে হয়। এইভাবে ধাপে ধাপে কাজগুলো ডিজিটাল লাইন ধরছে। ফেরবার পথ নেই। এতে সুবিধা হবে ভবিষ্যতের ছাত্রছাত্রীরা খুব সহজে বিনামূল্যে প্রশ্নপত্রের আর্কাইভ পেয়ে যাবে, আর সামাজিক অসুবিধা হল, ছাপানো কোয়েশ্চেন ব‍্যাঙ্কের ব‍্যবসা বন্ধ হবে। 

তৃতীয়তঃ শুধু ব‍্যক্তি শিক্ষক নয়, অগণিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও অস্তিত্ব সংকটের সম্মুখীন হবে। কুড়ি বছর আগেও যে উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ‍্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা জেনারেল ডিগ্রি কলেজে পড়তে আসতো, আজ তারা লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে, এমনকি শিক্ষা ঋণ নিয়ে দেশের নামী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমনকি বিদেশে বৃত্তিমুখী কোর্সে ভর্তি হচ্ছে – রোজগারের সুরক্ষার জন্য। সাধারণ কলেজের আসন ভর্তি করছে মূলত প্রথম প্রজন্মের মেধাবী পড়ুয়ারা। এই কারণে এখন সাধারণ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে ছাত্রসংখ‍্যা তলানিতে, কিন্তু কলাবিভাগগুলি উপচে পড়ছে। ল‍্যাবরেটরি ফি এবং আনুষঙ্গিক খরচের জন্য বিজ্ঞান পড়া তুলনায় মহার্ঘ। ছাত্রছাত্রীরা বেশি মাত্রায় বিজ্ঞান পড়ছেনা, কারণ হল জেনারেল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের সাহসের অভাব ও আর্থিক অনটন। ফলতঃ  কলেজে এসে ল‍্যাবরেটরিতে প্র‍্যাকটিকাল করতে হবে, এমন ছাত্রসংখ‍্যা এইসব কলেজে শতাংশের হিসেবে খুব কম। আমার নিজের কলেজেই এই সংখ্যাটি চারহাজার মোট ছাত্রের মধ্যে মেরেকেটে চারশ। বঙ্গীয় শিক্ষা ব‍্যবস্থা টিউশনি নির্ভর বলে বাকি সাড়ে তিনহাজারের হাজিরা অনিয়মিত। তাছাড়া ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান প্রভৃতি যেসব বিষয়ে ছাত্রসংখ‍্যা পাঁচশোর বেশি, সেখানে সকলে হাজিরা দিলে ঘরে স্থান সংকুলান হবেনা। এই তৈরি পরিপ্রেক্ষিতে লকডাউন একটি অন্য মাত্রা যোগ করল। কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে এখন সুযোগ এসেছে সকলকে নিয়ে অনলাইন থিওরি ক্লাস করার। আবার ছাত্রছাত্রীদের জন্য সুযোগ এসেছে অনলাইন ডিগ্রি কোর্সে ভর্তি হবার। কারণ সরকারি নীতি অনুযায়ী আই আই টি, বা সমতুল্য নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইন কোর্স পড়াতে শুরু করেছে। ধরে নেওয়া যেতে পারে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলি ভারতীয় মেধা ও অর্থসম্পদ লাভের এমন সুযোগ হাতছাড়া করবেনা। লকডাউন ছাত্রছাত্রীদের ডিজিটাল ক্লাসে যোগদানের সংকোচ কাটিয়ে দিয়েছে। একথা তো সহজবোধ্য দেশবিদেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি খুবই লোভনীয়। আর একটি পয়েন্ট এখানে বলার আছে। বিগত কয়েক বছরে, কন‍্যাশ্রী ও আরো নানা স্কলারশিপ সহজলভ্য হওয়ায়, সাধারণ কলেজের শ্রেণীকক্ষের  ডেমোগ্রাফিক কম্পোজিশন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি করে অনার্স কোর্সে সংখ্যালঘু পরিবারের উজ্জ্বল ছাত্রীরা এসে উপস্থিত হচ্ছে এবং ভালো ফল করে উত্তীর্ণ হচ্ছে। সাত আট বছর আগেও এরা পাশ কোর্সে থাকতো, অনার্সে ভর্তি হতনা। তার কারণ যতটা আর্থিক, ততটাই পারিবারিক অনুশাসন (উচ্চতর শিক্ষায় যাওয়ার অনীহা, বৃহত্তর কর্মজগতে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি) লকডাউন যখন বাড়িতে বসে অনলাইন শিক্ষা বা ওয়ার্ক ফ্রম হোমের দিগন্ত খুলে দিয়েছে, তখন স্টুডেন্ট কমিউনিটির এই অংশটির সেদিকে ঝোঁকার সম্ভাবনা ষোলো আনা। এইসব কার্যকারণগুলি যে মাঝারি মাপের ও মধ‍্যমানের কলেজগুলির ছাত্রসংখ‍্যা কমাবে তা বলাই বাহুল্য, এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলির বিলুপ্ত হবার আশংকা ও উড়িয়ে দেওয়া যায়না। ইউ জি সির পরিকাঠামো উন্নয়নের গ্রান্ট আজ প্রায় দশবছর বন্ধ। রুসা গ্রান্ট কিছু আশার সঞ্চার করেছিল বটে, তার পরে আর নতুন কোনো কেন্দ্রীয় স্কিম আসেনি। আগের যুগে রাজারা পণ্ডিত, কবি, শিল্পী, সাহিত্যিকদের পোষণ করতেন, কারণ মেধার স্ফূরণে যত্ন লাগে। সেই সামাজিক নীতি আজও প্রাসঙ্গিক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে যদি নিজের চলার পাথেয় যোগাড়ের জন্য বাজারে অর্থ সম্পদ উৎপাদনে মনোযোগী হতে হয়, বা সরাসরি ছাত্রদের নিংড়োতে হয়, তা দেশের দশের জন্য কল‍্যাণকর হয়না। আবার অগণিত প্রতিষ্ঠানের তৈরি পরিকাঠামো যদি নিউ নর্মাল বাস্তবতায় স্রেফ মানিয়ে নিতে না পারার জন্য, ছাত্রসংখ‍্যা কমে যাওয়ায় ধ্বংস হয়, সেটাও দেশের অপরিমিত ক্ষতি। বাড়ি থেকে ওপেন বুক পরীক্ষা হওয়ার ফলে নম্বরের পরিসর ও পাশের হার দুই-ই অবিশ্বাস্য ভাবে বেড়েছে। ধরে নেওয়াই যায়, মাধ্যমিক/উচ্চ মাধ্যমিকে নম্বর যেমন আশি, নব্বইয়ের আশে পাশে ঘোরাফেরা করে, স্নাতকস্তরও সেই দিকে এগোচ্ছে। কাজেই কর্মক্ষেত্রে মার্কশিটের দাম কমতে বাধ্য। অদূর ভবিষ্যতে শুধু তত্ত্ব ও তথ্য নির্ভর না থেকে সিলেবাসকে ছাত্রের উদ্ভাবনী ক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যম হয়ে উঠতেই হবে। সবমিলিয়ে নতুন বাস্তবতায় শিক্ষাব‍্যবস্থাকে বাঁচাতে এক সার্বিক অ্যাকশন প্ল‍্যানের নির্মাণ ও তার সাবধানী ও সফল রূপায়ণ ভীষণ জরুরী।

চতুর্থতঃ লক্ষ্য করলাম, লকডাউন সামাজিক বৈষম্যের রূপটি আগাপাশতলা বদল করে দিল। এতকাল উন্নয়ন ও বৈষম্য বিষয়ে আমরা কিছু ক্লিশে ধারণা পোষণ করে এসেছি, যেমন – গ্রাম শহর বৈষম্য; সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু বৈষম্য। এই সবগুলো মাত্রা পিছনে সরে সামনে এগিয়ে এসেছে ডিজিটাল ডিভাইড। দেশের পরিবারগুলোকে এখন চারভাগে ভাগ করা যায়। 

ক) পরিবারের হাতে অন্তর্জাল সংযোগের মাসিক ভাড়া দেবার বা স্মার্টফোন জাতীয় যন্ত্র কেনার সামর্থ্য নেই, এলাকাতেও অন্তর্জাল পরিকাঠামো তৈরি হয়নি। 

খ) পরিবারের সামর্থ্য আছে, কিন্তু এলাকাতে এখনো যথেষ্ট অন্তর্জাল পরিকাঠামো তৈরি হয়নি। 

গ) পরিবারের হাতে অন্তর্জাল সংযোগের মাসিক ভাড়া দেবার বা স্মার্টফোন জাতীয় যন্ত্র কেনার সামর্থ্য নেই, কিন্তু এলাকায় অন্তর্জালের ভালো পরিকাঠামো আছে। 

ঘ) পরিবারের সামর্থ্য আছে, এলাকাতেও পরিকাঠামো আছে। 

শহর বা গ্রাম, সংখ্যাগুরু বা সংখ্যালঘু যেকোনো পরিবার উপরের চারটি বিভাগে পড়তে পারে। কাজেই যাঁরা ভাবছেন, আজ দেশে ধর্ম, ভাষা, জাতি বিভেদ বাড়ছে এবং ভেবে বিচলিত হচ্ছেন, তাঁদের বলি, এইসব বিভেদ তলায় তলায় ফোঁপরা হয়ে যাচ্ছে। কারণ ওগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যত প্রজন্মের পেটের ভাতের কোনো সম্পর্ক থাকবেনা। একথা বলছিনা যে এইসব লকডাউনের ফলেই হচ্ছে। এমন পরিস্থিতির পূর্বাভাস ছিল। ধীর পায়ে সমাজ ঐদিকে অগ্রসর হচ্ছিলই। লকডাউন কেবল পরের প্রজন্মের অভিজ্ঞতাকে এই প্রজন্মে তরান্বিত করে এনেছে। যাকগে মূল আলোচনায় ফিরে আসি। অন্তর্জাল পরিকাঠামো যদি সরকার নিজে করেন তাহলে এক কথা। অতিমারীকেন্দ্রিক লকডাউনে সাধারণ মানুষের সামর্থ্য এখন চরম ক্ষতিগ্রস্ত, অথচ ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য   ভালো অন্তর্জাল সংযোগ ভীষণ দরকার। ঠিক এইমূহুর্তে বেসরকারি কোম্পানিগুলি বিনিয়োগ বা অন‍্যান‍্য অজুহাতে সংযোগের মাশুল বাড়িয়েই চলেছে। একথা জানি যে খোলা বাজারের নীতি অনুযায়ী চাহিদা বাড়লে দাম বাড়ে। কিন্তু যেখানে ছাত্রদের শিক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয় জড়িয়ে আছে, সেখানে কল‍্যাণকামী রাষ্ট্রের পদক্ষেপ মানুষ আশা করেন। আমার মনে হয়, ব‍্যাঙ্কে যেমন স্টুডেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ আছে, অন্তর্জাল পরিষেবাতেও ভর্তুকি যুক্ত স্টুডেন্ট সংযোগের বন্দোবস্ত থাকার প্রয়োজন। 

সম্প্রতি যন্ত্রের ঘাটতি মেটানোর জন্য রাজ‍্যসরকার উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সাড়ে ন লক্ষ শিক্ষার্থীকে ট‍্যাবলেট প্রদান করবেন বলেছেন। অনেকেই বলতে পারেন যে, এই কয়েকলক্ষ ছাত্রছাত্রীর সকলেই সমান অসহায় নয়। অনেকেরই স্মার্টফোন আছে। কিন্তু সমাজের অপেক্ষাকৃত প্রভাবশালী মানুষ কোনো প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত হলে প্রকল্পটি সঠিক দিশায় চলছে কিনা সেবিষয়ে সামাজিক পাহারার সুযোগ বাড়ে। এটিও প্রমাণ হয় সরকারের চোখে সকলে সমান এবং গরীব মানুষ অন্যদের টীকাটিপ্পনীর সামনে নিজেকে অনুগ্রহভাজন ভেবে ক্ষুন্ন হননা। প্রকল্পের সার্বিক সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। এই ফর্মুলাতেই ‘সবুজ সাথী’ সাইকেল প্রকল্প এত সফল হয়েছে। এখন সময়ের দাবী মেনে যদি সরকার ট‍্যাবলেট বিতরণের এই ‘শিক্ষাসাথী’ প্রকল্পটিকে একটি ইউনিক ব্র‍্যান্ড নেম দিয়ে করোনা পরবর্তীতেও চালু রাখেন, তবে শিক্ষার্থীদের সার্বিক মঙ্গল। দেশে ধীরে কিন্তু অনিবার্যভাবে অদক্ষ শ্রমিকের কাজের পরিসর কমছে। কিন্তু দক্ষ হতে গেলে যে শিক্ষা দরকার, তার দামী থেকে আরও দামী হয়ে ওঠার প্রবণতা খুবই প্রকট। অফলাইন-অনলাইন ব্লেন্ডিং যখন অনিবার্য, তখন যন্ত্রটির ভার যদি সরকার নেন, তার চেয়ে ভালো আর কিছুই হতে পারেনা। 

পঞ্চমতঃ শিক্ষা জগৎ সমাজের বাইরে নয়। অতিমারীর জন্য ইচ্ছামতো যাতায়াতের, মেলামেশার  স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে। শিক্ষক ছাত্র উভয়পক্ষই কেউ পরিবারের নিকটজনকে হারিয়েছেন, কেউ হারানোর আশংকা করছেন। কেউ কোভিড পরবর্তী জটিলতার সঙ্গে শরীরে মনে যুঝছেন। রোগ থেকে বাঁচতে নৈকট্য নিষিদ্ধ, স্পর্শে অবিশ্বাস আর কথায় গল্পে মাস্কের আড়াল। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের পরিবেশটা কর্পোরেট অফিসের মতো ফর্মাল নয়, বরং আবেগ নির্ভর, ইনফর্মাল। লকডাউনের আঘাত এই পরিবেশের গভীরে প্রবেশ করেছে। আমার বেশ কিছু স্টুডেন্ট জানিয়েছে তারা পড়া ছেড়ে দেবে। সব কারণ আর্থিক নয়। আগে যে চ‍্যালেঞ্জ গুলি হেলায় হারিয়ে দেবে ভেবেছিল, আজ সে আত্মবিশ্বাস তলানিতে। এই মূহুর্তে আগের সমস্যাগুলি ওদের চোখে টিলা  থেকে প‍র্বত রূপ ধারণ করেছে।  বেশ কিছু স্টুডেন্ট হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে একেবারে চুপচাপ। ক্লাসেও কথা বলেনা। শিক্ষকেরা নিজেদের মতো চেষ্টা করছেন বোঝাতে। শরীর মন তাঁদেরও তো ভালো নেই। স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের লড়াই চলছে সামনে। শিক্ষা ক্ষেত্রের লড়াই চলছে আড়ালে। ভবিষ্যত নাগরিকদের বাঁচাতে এখন সময় এসেছে দুই ক্ষেত্রের হাত ধরার। 

ছাত্রছাত্রীদের সুরক্ষিত করতে না পারলে দেশ মায়ের চোখ আঁধার। ছাত্রছাত্রীরা অসন্তুষ্ট থাকলে সরকারের চোখে সর্ষেফুল। সবমিলিয়ে জ্ঞান জগৎ এক নতুন দিকে বাঁক নিচ্ছে। সেই শিহরণে আমরা আজ ভিতরে টালমাটাল। কম্পন বাইরেও ছড়াবে। আসুন যে যার নিজের মতো করে প্রস্তুত হই।

এই লেখাটির অংশ বিশেষ আনন্দবাজার পত্রিকায় 15, 16 ডিসেম্বর সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত।

রাখিপূর্ণিমা

রাখিপূর্ণিমার দিন ভূগোল বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের প্রতি….

রাখিপূর্ণিমা, এই দিনটির সঙ্গে আমাদের কলেজের ভূগোল বিভাগের কিছু আবেগ ও ইতিহাস জড়িয়ে আছে।

আমাদের প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজের ভূগোল বিভাগ শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। ১৯৯৯ সালে আমি আর বল্লরী ম্যাডাম  কলেজে যোগ দিই। এখন যেখানে ইতিহাস বিভাগ আছে, সেই বাড়িটি তখনও তৈরি হয়নি। বদলে একটি একতলা বাড়ি ছিল, সবাই বলত সাহেবের কোয়ার্টার। টানা বারান্দায় চারটি ঘর। বাড়ির চারপাশে পাঁচিল, পাঁচিলে একটি লোহার গেট। গেটের দুপাশে গোলাপি কাগজ ফুলের গাছ ছিল। গল্প শুনেছি, আন্দুল এলাকায় যখন ইলেকট্রিফিকেশন চলছিল, তখন সে কাজের ভারপ্রাপ্ত অফিসার ছিলেন এক ইটালিয়ান সাহেব। কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার তিনকড়ি ঘোষ সাহেবকে প্রস্তাব দেন যে, তিনি বিনি পয়সায় সাহেবের আন্দুলে থাকার বন্দোবস্ত করে দেবেন। বদলে বিনি পয়সায় কলেজের ইলেকট্রিক ব্যবস্থা  সাহেবকে করে দিতে হবে। সেই সাহেবের কোয়ার্টারে দুটি ঘরে ভূগোল এবং দুটি ঘরে ইকনমিক্সের ক্লাস হতো। এখন যেখানে আমাদের ডিপার্টমেন্টের অফিস সেই ঘরটি ও ১৬ নম্বর ঘরটি ছিল জোড়া। ওটা ছিল হায়ার সেকেন্ডারির বায়োলজি ল্যাবরেটরি। তখন কলেজে ১১/১২ ক্লাস পড়ান হতো। পরে নতুন বিল্ডিং হোল। কলেজ থেকে হায়ার সেকেন্ডারি কোর্স উঠে গেল। গোলাপি ফুলের বাগান ওয়ালা একতলার কোয়ার্টারটি ভাঙা পড়ল। বায়োলজি ল্যাবরেটরি ভাগ করে আমাদের অফিস হোল। আর তদানীন্তন প্রিন্সিপাল কালাচাঁদ সাহা মহাশয় ভুগোল বিভাগের জন্য ওই ১৫,১৬, আর ১৭ নম্বর ঘর তিনটি নির্দিষ্ট করলেন। সাহেবের কোয়ার্টারে মাথায় পাখা ছিলনা। এবারে পাখা পেলাম। সেটা ২০০২ সাল। ভূগোল বিভাগ তার বর্তমান ঠিকানা পেল। তখন ২+১ সিস্টেমে দু বছরে পাশ গ্রাজুয়েট আর তিন বছরে অনার্স গ্রাজুয়েট হতো। ২০০২ সালের অগাস্ট মাসে রাখি পূর্ণিমার দিন ভূগোলের ছাত্রছাত্রীরা ১৭ নম্বর ঘরে কলেজের সব স্যার, ম্যাম আর অন্যান্য যারা উপস্থিত ছিলেন, সকলকে রাখি পরিয়ে, ১৭ নম্বর ঘরে অনুষ্ঠান করে, ভূগোল বিভাগের এই নতুন যাত্রার শুভ উদ্বোধন করেছিল। সেই থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ডেকরেটর ডেকে ফ্রন্ট স্টেজ, ব্যাক স্টেজ বেঁধে, মাইক ভাড়া করে, খুব বড় করে রাখির দিন ভূগোল বিভাগের জন্মদিন পালন করা হতো। কলেজের পুরনো অফিস বিল্ডিঙের দোতলায় বাংলা বিভাগের একটি বড় ঘর ছিল, সেখানে সিমেন্টের স্টেজের বেসটা করা ছিল। প্রত্যেক দর্শক অনুষ্ঠান ঘরে ঢোকার মুখে তাঁকে চন্দনের টিপ পরিয়ে, হাতে রাখি বেঁধে, হাতে আঁকা কার্ড উপহার দেওয়া হত। ভূগোল বিভাগের নিজস্ব পুরস্কার বিতরণ হতো। স্টেজ সাজানো থেকে কার্ড আঁকা সব কিছু ছাত্রছাত্রীরা করত। বিশেষ আকর্ষণ ছিল প্রতি বছর নতুন নতুন নাটকের অভিনয়।

উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে, যা এই মূহুর্তে মনে পড়ছে,  একবার আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুক্তধারা নাটকটি অভিনয় করেছিলাম। দুবার জল, পাখি, গাছ, নদী সেজে পরিবেশ বাঁচানোর জন্য নাটক করা হয়েছে। আর একবার হল রবীন্দ্রনাথের অভিসার। একবার কবি সুকান্তের সংকলিতা অভিনয় হয়েছিল। আমরা টিচারেরা মিলে করেছিলাম কবিগুরুর লেখা সাধারণ মেয়ে। আমাদের সামান্য পুঁজি, ড্রেস ভাড়া করার সামর্থ্য ছিলনা। কাজেই নাটকের পোশাক ছেলেমেয়েদের বাড়ি থেকে যতটুকু যোগাড় হওয়ার হত, বাকি খামতি অধ‍্যাপিকাদের পোশাকের আলমারি থেকে পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হত। আর নাটকের চরিত্র ছাড়া, অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাকিদের জন‍্য পোশাকের কোনো একটা রং ঠিক করা হত। আর মঞ্চ সাজানো ছিল আর এক জমজমাট ব‍্যাপার। একবার এক ছাত্রী, নাম ছিল শ্রাবণী, সে সকলকে ধানের ফিতে বাঁধা শিখিয়ে দিল। রাখিপূর্ণিমার আগের পনের দিন, সব শ্রেণী ঘরে প্রতিটা বেঞ্চে কাঠের পায়াতে টান করে বেঁধে সব ছেলেমেয়ে ধানের ফিতে বাঁধতে লাগল। পুরো মঞ্চ সেবার ধানের ফিতে দিয়ে সাজানো হল। অর্ডার দিয়ে থার্মোকল কাটাতে অনেক পয়সা লাগে। একবার এক ছাত্র মুস্কিল আসান হয়ে, কয়েকটি থার্মোকল কাটা ছুরি যোগাড় করল। তার কাছ থেকে শিখে নিয়ে, বাকি ছেলেরা মিলে সব অক্ষর কেটে ফেলল। আর মেয়েরা সেগুলি মঞ্চের দেওয়ালে আঠা দিয়ে বসিয়ে, সোনালি, গোল চুমকি আলপিন দিয়ে গেঁথে দিল। আলো জ্বালিয়ে দিতে, সেই চুমকির আলোয় মঞ্চ ঝলমল করতে লাগল। আর একবারের কথা মনে পড়ছে। সেবার পুঁজির বড় টানাটানি। কি দিয়ে মঞ্চ সাজানো হবে, কোনো যোগাড় নেই। শেষে বল্লরী ম‍্যাডাম বললেন, টাকার কি দরকার? শান্তিনিকেতনে আমরা পামপাতা দিয়ে মঞ্চ সাজাতাম। পামপাতা? কলেজে তো অনেকগুলো পামগাছ। কিন্তু পাতা পাড়বে কে? যে কোনো অসম্ভব, অদ্ভুত কাজ উদ্ধার করার জন্য, কলেজে আমাদের ছিলেন হিমদা। তিনি নেপালের মানুষ। কিন্তু কলেজকে আগলে রাখাই ছিল তাঁর ধ‍্যান জ্ঞান। কলেজেই তিনি পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। ছেলেরা ছুটল হিমদাকে খুঁজতে। সেবার পামপাতা দিয়েই মঞ্চ সাজানো হল। আবার আর একবার প্ল‍্যান করেই রবার পাতা দিয়ে মঞ্চ সাজানো হয়েছিল। এক এক বছর মঞ্চে এক একরকম থীম লাইন লেখা হত। তার মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় একটি লাইন। বল্লরীদি মঞ্চ জুড়ে লিখিয়েছিল, “বাঁধিনু যে রাখি পরাণে তোমার, সে রাখি খুলনা, খুলনা।” আজ সেই নাটক, রাখিবন্ধনের আয়োজকেরা নিজেরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। যারা যোগাযোগ রাখে, তাদের খবর পাই।

অনুষ্ঠানটি এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, কখনও কখনও অন্য বিভাগের স্যার, ম্যামেরাও যোগ দিতেন। পলিটিকাল সায়েন্সের সৌমিত্র স্যার নাটকের নির্দেশনা দিতেন। আমরা টিচার স্টুডেন্ট একসঙ্গে অভিনয়, পাঠ, আবৃত্তিতে যোগ দিতাম। জুলাই থেকে কলেজ শুরু হতো। একমাস নিবিড় অনুশীলনের পর সব কিছু মঞ্চস্থ হতো। পরে ১+১+১ সিস্টেম চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জুলাই, অগাস্ট দুটি মাসই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা গ্রাস করে নেয়। রাখি বন্ধন অনুষ্ঠানটি ও বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ২৩শে সেপ্টেম্বর জলবিষুবের দিনটি বেছে নেওয়া হয়। কিন্তু একইসঙ্গে ভর্তি, সিলেবাস সব কিছুর চাপে সেই দিনগুলি হারিয়ে যায়। তবু স্মৃতি সতত সুখের। আজ রাখি পূর্ণিমা। ভূগোল বিভাগের জন্মদিন। শুধুমাত্র আমাদের ভূগোল বিভাগ নয়, রাখি পূর্ণিমা আপামর বাঙালির কাছে পূণ‍্য তিথি। কারণ এই দিন বাঙালির প্রাণের ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য নাখোদা মসজিদ থেকে পরস্পরের হাতে রাখি বেঁধে একতার ডাক দিয়েছিলেন। জোড়াসাঁকো থেকে সেই মিলন মিছিল, নাখোদা মসজিদ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল বাংলার প্রতিটি ঘরে। ইংরেজ সরকারের সিংহাসন কেঁপে উঠেছিল বাঙালির সেই একতার বলে। তখনকার মতো বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে গিয়েছিল। যে উৎসব ছিল ভায়েদের বোনকে  রক্ষা করার অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার উৎসব, এই বাংলায় তা রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে হয়ে উঠল সকলে এক হয়ে দেশমাতাকে রক্ষা করার অঙ্গীকারের উৎসব। রবিঠাকুরের যে গানটি আজ বাঙালির রাখিবন্ধনের মন্ত্র, সেটি হল, “বাংলার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল, পূণ‍্য হউক…..হে ভগবান।”

যাক, কলেজের কথায় ফিরে আসি। আজও কলেজে অনুষ্ঠান হয়, কিন্তু মঞ্চ সাজানো হয়না। কলেজ আধুনিক হয়েছে, নতুন ঘরে অনুষ্ঠান হয়। সে ঘর বাইরের অতিথি, অভ‍্যাগতদের নিয়ে সভার জন্য সজ্জিত। স্টেজে সভা করার টানা টেবিল স্থায়ী ভাবে আটকানো আছে। সেখানে ছেলেমেয়েদের নাটকের জায়গা নেই। তাই মেঝেতে অনুষ্ঠান করতে হয়। তারা ঘর সাজাবে বলে, আজও আবদার করে। কিন্তু বুকে পাথর চাপা দিয়ে বলতে হয়, দেওয়ালে বা কৃত্রিম ছাদে এতটুকু দাগ লাগবেনা এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই অনুষ্ঠানগৃহ ব‍্যবহার করার অনুমতি পাওয়া যায়। যুগ বদলের সঙ্গে নিয়ম বদলাবে এতে আক্ষেপের কিছু নেই। রাখিবন্ধনের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। কিন্তু ভূগোল পরিবারের সদস্যদের পরাণে যে রাখি বাঁধা আছে, তা আমরা খুলবোনা।

আমাদের মহাবিদ্যালয়

আজ ১৪ই আগস্ট। রাত পোহালেই আমাদের কলেজের জন্মদিন, প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজের প্রতিষ্ঠা দিবস। আজ থেকে ৫৬ বছর আগে, ১৯৬৪ সালের এই দিনটিতে এলাকার মানুষ তাঁদের স্বপ্নকে রূপ দিয়েছিলেন এই কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।

প্রথম যেদিন কলেজ সার্ভিস কমিশনের নিয়োগপত্র পেলাম, চললাম বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে স‍্যার, ম‍্যাডামদের আশীর্বাদ নিতে এবং এই অচেনা নামের কলেজ এবং জায়গাটি সম্পর্কে খোঁজ খবর করতে। সেটা ১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাস। না ছিল মোবাইল, স্মার্ট ফোন তো দূরের কথা। না ছিল ঘরে ঘরে কম্পিউটার বা ইন্টারনেট। বালিগঞ্জে ডিপার্টমেন্টে ঢুকতেই দেখা প্রখ্যাত নদী বিজ্ঞানী, ফ্লুভিয়াল জিওমরফোলজিস্ট প্রফেসর সুভাষ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।  শুনে বললেন, আন্দুল – আনন্দ ধূল। বড়ো ঐতিহাসিক স্থানে যেতে চলেছ। ও যে শ্রীচৈতন‍্যের বাংলা ছেড়ে নীলাচল যাত্রার শেষ পথ। হরিনাম সংকীর্তনে বাহ‍্যজ্ঞান রহিত ভক্তদের চৈতন্যের পদধূলিতে গড়াগড়ি দেবার পথ। তাছাড়াও প্রাচীন কাল থেকে ঐ স্থান নানাবিধ শাস্ত্রচর্চার কেন্দ্র। ও যে দক্ষিণের নবদ্বীপ। উৎসাহিত হয়ে বলি, স‍্যার, হাওড়া স্টেশনের টাইম টেবিলে আগের স্টেশন দেখলাম মৌরিগ্রাম। স‍্যার ভ্রূ কুঁচকে বলেন মৌরি নয় মৌড়ি। মহিয়াড়ি থেকে মৌড়ি। গিয়ে ভালো করে দেখবে, ও জায়গা টা সরস্বতী নদীর নিম্ন অববাহিকা। চারিপাশে নদীর ছেড়ে যাওয়া অজস্র প্রাচীন ধারা এবং নদীবাঁক ছড়িয়ে আছে। নিম্নগতিতে নদীর পলি জমে দুধারে স্বাভাবিক বাঁধ তৈরি হয়। মহী অর্থাৎ পৃথিবী বা মাটি। আড়ি হল উঁচু জায়গা, যেমন বালিয়াড়ি। আমি বলি, হ‍্যাঁ স‍্যার ইংরেজিতে লিভি। স‍্যার বলে চলেন, সরস্বতীর লিভি থেকেই মহিয়াড়ি বা মৌড়ি। পুরো হাওড়াটাই নদীর ছেড়ে যাওয়া ধারা আর মিয়েন্ডার কাট অফ বা নদী বাঁকে ভর্তি। হাওড় মানে জলাশয়। হাওড় থেকেই হাওড়া।

এসব নানা কথা, বাবা মাকে জানাতে তর সইছিলনা। তাড়াতাড়ি বাড়ির পথ ধরলাম। আন্দুল শুনে মা বলে উঠলেন, ‘আন্দুল রাজবাড়ি! রাজবাড়ির মেয়ের সঙ্গে আমার সেজজ‍্যাঠামশাইয়ের বিয়ে হয়েছিল। বললাম, তাই নাকি? আর বাবা বললেন, আন্দুল? ঐ রাজবাড়িতে মনে হয় সত‍্যজিতের জলসাঘরের শ‍্যুটিং হয়েছিল। তবে ভালো ভালো কথার মধ্যে জল ঢেলে দিল এক বান্ধবী। বলল আঁদুল? ওখানে তো আমার মামার বাড়ি। ঐ কলেজে লেখাপড়ার সঙ্গে প্রজাপতি নির্বন্ধের যোগাযোগ চলে সমান তালে। তাই আমরা প্রজাপতি কলেজ বলি।

সে রাতের স্বপ্নে জীবনের প্রথম পাকা চাকরি, সরস্বতী নদী, দুপারের মহিয়াড়ি, রহস্যময় রাজবাড়ি, প্রজাপতি সব মিলে মিশে একাকার। সারারাত এপাশ ওপাশ। ভোররাতে গাঢ়ঘুমে সকালে উঠতে দেরি হয়ে যায়। ঘুম ভাঙে, ল‍্যান্ডফোনের ঝন ঝন শব্দে। ঘুম চোখে কানে রিসিভার টা ধরি। ওপাশ থেকে ভেসে আসে, আমি প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজের প্রিন্সিপাল কথা বলছি। সার্ভিস কমিশনের খবর কলেজেও পৌঁছে গেছে। এর কিছুদিন পরে, অঙ্ক বিভাগের প্রফেসর নিশির বাবু বাড়িতে কলেজের তরফ থেকে, নিয়োগপত্র নিয়ে আসেন।

সে রাতের স্বপ্নে জীবনের প্রথম পাকা চাকরি, সরস্বতী নদী, দুপারের মহিয়াড়ি, রহস্যময় রাজবাড়ি, প্রজাপতি সব মিলে মিশে একাকার। সারারাত এপাশ ওপাশ। ভোররাতে গাঢ়ঘুমে সকালে উঠতে দেরি হয়ে যায়। ঘুম ভাঙে, ল‍্যান্ডফোনের ঝন ঝন শব্দে। ঘুম চোখে কানে রিসিভার টা ধরি। ওপাশ থেকে ভেসে আসে, আমি প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজের প্রিন্সিপাল কথা বলছি। সার্ভিস কমিশনের খবর কলেজেও পৌঁছে গেছে। এর কিছুদিন পরে, অঙ্ক বিভাগের প্রফেসর নিশির বাবু বাড়িতে কলেজের তরফ থেকে, নিয়োগপত্র নিয়ে আসেন।

আমি কলেজে যোগ দিই তৃতীয় অধ‍্যক্ষ কালাচাঁদ সাহার আমলে। এখনো কয়েকজন আছেন যাঁরা দ্বিতীয় অধ‍্যক্ষ বিশ্বনাথ ঘোষকে দেখেছেন। অল্প দিনের জন্য চতুর্থ প্রিন্সিপাল ছিলেন অজিত কুমার বেরা। বর্তমানে, সুব্রত কুমার রায় হলেন, এই কলেজের পঞ্চম অধ‍্যক্ষ। কলেজে যখন ঢুকি, চোখ টেনেছিল, স্টাফ রুমে সেগুন কাঠের পালিশ করা বিরাট গোলাকার টেবিল, কাঠের বড় বড় হাতল ওয়ালা সোফা, প্রিন্সিপাল রুমে গোলাকৃতি, নক্শাদার শ্বেতপাথরের টেবিল, আর দুটি আরাম কেদারা, লাইব্রেরি তে দেয়াল জোড়া, ছাদ পর্যন্ত উঁচু, নক্শাকাটা দুটি জমজ বইয়ের আলমারি। এগুলির প্রত‍্যেকটিই শিক্ষাঙ্গনের প্রতি আন্দুল রাজবাড়ির অর্ঘ।

ডাক্তার বাবু তিনকড়ি ঘোষ তাঁর গুরু শ্রী শ্রী প্রভু জগদ্বন্ধু সুন্দরের নামে এই কলেজের নামকরণ করেছেন। তাঁর নিজের নাম যেন কোথাও না থাকে, সেই জন্য নিজের একটি ছবিও কোথাও রাখেননি। তাই আমিও তাঁর এত কথা শুনেছি, কিন্তু ছবি দেখিনি। আর প্রথম অধ‍্যক্ষ বাণীভূষণ দাশগুপ্তের ছবি ১৯৮৯ সালে রজত জয়ন্তী এবং ২০১৪ সালে সুবর্ণ জয়ন্তীর সময়ে অনেক খোঁজা হয়েছিল। ১৪ সালে বেশ কিছু পুরোনো বনেদী পরিবারের অ্যালবাম আমি নিজে খুঁজেছি। কিন্তু পাইনি।

প্রভু জগদ্বন্ধু চৈতন্য ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত একজন বৈষ্ণব সাধক। তাঁর জন্ম হয় ১৮৭১ সালে মুর্শিদাবাদের দহপাড়ায়। পরবর্তী কালে তাঁর শিষ‍্যেরা গড়ে তুলেছেন মহানাম সম্প্রদায়। বাংলাদেশের ফরিদপুরে মূল আশ্রম। নদীয়ার কৃষ্ণ নগরে সার্ভে করতে গিয়ে আমরা প্রভুর মন্দির দেখেছি। কলকাতায় রঘুনাথপুরে ওঁদের আশ্রম আছে। সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠানে আশ্রমিকদের নিমন্ত্রণ করতে আমি নিজে গিয়েছিলাম। রামকৃষ্ণ মিশনে আশ্রমিক সাধুদের নামের সঙ্গে যেমন আনন্দ যোগ হয়, এই সম্প্রদায়ের সাধুদের নামের সঙ্গে বন্ধু যোগ হয়।

প্রভুর শিষ‍্যবর শ্রী শ্রী মহানাম ব্রত ব্রহ্মচারী এই কলেজ ভবনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। সন্ন্যাস গ্রহণের আগে তাঁর গৃহী নাম ছিল বঙ্কিম দাশগুপ্ত। বিদ‍্যালয় শিক্ষা শেষ হলে ১৯২৩ সালে তিনি ফরিদপুরে সন্ন্যাস নেন। সন্ন্যাসী জীবনেও বিদ‍্যাচর্চায় ছেদ টানেননি। ১৮৯৩ সালে স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো জয়ের চল্লিশ বছর পরে ১৯৩৩ সালে তিনি দ্বিতীয় বিশ্ব ধর্ম মহাসভায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ১৯৩১ এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে তিনি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলেন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ধর্মতত্ত্বে তিনি ডক্টরেট উপাধি লাভ করেন। মনে ভাবি এক নির্মোহ জ্ঞান চর্চার আবেগ এবং প্রতিষ্ঠাতাদের বিদ‍্যালাভ ও তার ব‍্যাপনের তীব্র আকাঙ্ক্ষার উত্তরাধিকার বহন করছি আমরা সকলে। গায়ে কাঁটা দেয়।

সপ্তাহ কয়েক আগে এই লকডাউনে এক গভীর রাতে চলভাসে আড্ডা দেওয়ার সময়ে ছেলেমেয়েরা জিজ্ঞেস করে, ম‍্যাম, প্রভু জগদ্বন্ধু কে? অফিসে একটা মূর্তি আছে, উনি কি কোনো দেবতা? ইন্টারনেটে সার্চ করেছি, তেমন কিছু পাচ্ছি না। চমকে উঠি। আমার কুঁড়ি ফোটা ভৌগোলিকেরা কলেজের ইতিহাসের খোঁজ করছে? সত্যিই তো একথা গুলি ওদের জানার পূর্ণ অধিকার আছে। ওদের ই আগ্রহে আমার এই কলম ধরা।

আটাশ বছর বয়সে ভূগোল বিভাগের ভার নিয়ে এই কলেজে এসেছিলাম। সুখে দুখে কেটে গেছে বাইশটা বছর। রাত পোহালেই স্বাধীনতার উদযাপন। আমাদের ছাত্রছাত্রীদের ভাবনার জগৎ উন্মুক্ত হোক। এটুকুই প্রার্থনা।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল

চার ইয়ারি কথা

বিবাহ পর্ব

আমার জন্ম কলকাতা মেডিকেল কলেজে। কর্ম ধর্ম এই শহরেই। তবে বাপ-ঠাকুর্দার ভিটে ছিল বসিরহাটের আড়বালিয়ায়। স্কুলের ছুটি পড়লেই চলে যেতাম দেশের বাড়ি। বড়জেঠু, মেজজেঠু, সেজজেঠু, তিন জ‍্যাঠাইমা, ভাইবোন মিলে পুরো দশ। আনন্দেই কেটে যেত দিনগুলো। দোর্দণ্ড প্রতাপ পিসি ছিল। কেবল বাবা সবার ছোট বলে নিজের কাকু ছিলনা আমার। বাবাই ছিল সবার ছোটকা। তাই আমার বড় হওয়া গ্রাম শহর মিশিয়ে।

বি. এ, এম. এ পাশ দেবার পর বাবা ভাবলেন সম্বন্ধ খুঁজবেন আমার জন্য। লাল কলম হাতে পরীক্ষার খাতা থেকে মুখ তুলে মা বললেন, সাত জন্মের বেড়ি। যে হাঁড়িতে চাল দিয়েছে, সে বাড়ি ঠিক খুঁজে নেবে ওকে। মায়ের বিশ্বাসের ছিলায় বিধির বিধান – তীর ছুটল এঁটেল মাটির দেশ থেকে গঙ্গা পেরিয়ে আড়াআড়ি দক্ষিণ মুখে। গাঁথল গিয়ে বঙ্গোপসাগরের পারে বালিয়াড়ির দেশে। কোষ্ঠীবিচারের বালাই নেই, তবু অবাক হলাম। এপারে বাবা সমীর, আর ওপারে বাবা অমর। আবার দুজনেই ডাকনামে ভানু। এপারে মা নদীর নামে কৃষ্ণা, তো ওপারে মা সাগরবেলায় বেলারানী। এপারে জেঠতুত খুড়তুতো মিলিয়ে দশ, ওদিকে ওরা একবাড়িতে নিজেরাই ছয়। রাঙামাথায় চিরুনি দিয়ে, আর একরাশ কৌতূহল নিয়ে মৈথুনা গ্রামের বালিয়াড়িতে পা রাখলাম। গাড়ি থেকে নামতেই গোপীনাথের মন্দির। মন্দিরের দাওয়ায় শাশুড়ি কোলে বসিয়ে মধু খাইয়ে দিলেন। কিন্তু বরণডালা, দুধে আলতায় পা এসব কিছু হলনা। জ‍্যান্ত মাছ ধরতে হবেনা তো, মনে ভয় ছিল ভীষন, সেসব ও হলনা, বেঁচে গেলাম। বাড়িতে ওঠার সময়ে দেখলাম চওড়া ঢালা কাঠের এক চেয়ার, দুপাশে হাতল। তাতে বসে আছেন হাসিমুখে তিন বৃদ্ধ। মাঝের জনকে চিনি, আমার শ্বশুর বাবা। কিন্তু পাশের দুজন? পিঠোপিঠি এক ননদ আছে,  পরিচয় করিয়ে দিল। আমার কাকুর জায়গা ফাঁকা ছিল। এবার আমার কাকু হল। অখিল কাকু, শচীন কাকু।

অন্তরঙ্গ

শ্বশুর বাড়ি ঢুকে তো রৈরৈ, সকলে অনেক কিছু জানতে চায়। গাছে উঠতে পারি কিনা।পুকুরে সাঁতার দিতে পারি কিনা, ছিপে মাছ ধরতে পারি কিনা। মাছ কুটতে পারি কিনা। গ্রামে থাকতে পারব কিনা। আমি শুধু হাসি, আসলে কাজ কর্ম কিছুই পারিনা। দোষ দিতেও পারিনা। মহানগরিনী নায়িকা আর অজ গ্রামের নায়ক নিয়ে নাটকটা ফ্লপ হবে কিনা এনিয়ে অতিথি কেউ চিন্তিত হতেই পারেন। আমারও যে গ্রাম-যোগাযোগ আছে, সেটা তাঁদের অজানা। তবে দশকথার আটকথাই মাছ নিয়ে হচ্ছে। মাছ আমার প্রিয় নয়। ছোটবেলায় সেজ জ‍্যাঠামশাই অট্টহাসি হেসে বলতেন এ মেয়ের মেছোর ঘরে বিয়ে হবে। তা কি এমনভাবেই সত্যি হল! ভারি বিপন্ন হই। শুধু দশজোড়া চোখের বৃত্তের বাইরে সেই ঢালা চেয়ারে তিনজোড়া দৃষ্টি প্রসন্ন প্রশ্রয় দেন। ইশারায় কিছু কাজ হল কিনা বুঝিনি, শাশুড়ি একটানে উদ্ধার করে দোতলায় নিয়ে চলে গেলেন। সেযাত্রা স্বস্তি পেলাম।

নতুন দিন

ছিলাম সুন্দরবনের উত্তর দিশায়, ইছামতীর পাড়ে, বাংলাদেশের সাতক্ষীরার ধারে। এসে পড়লাম কর্ণ বরাবর উল্টো মুখে উড়িষ‍্যার পারে। রন্ধন আর ভাব প্রকাশের ভাষা, দুটি ব‍্যাকরণই অচেনা।
“হেথা গড়িয়ায় চান হয়, মাড়ায় মশারি,
দুর্গা পুজা ঘরে হয়, রথ বারোয়ারি।
কত রঙ্গ বঙ্গদেশে আহা বলিহারি।
প‍্যাকেট(র) মিষ্টি নিয়ে যাউচে ফটক
ট‍্যাংরায় কালিয়া হয়, রুই মাছে টক
জেনে নব বৌএর চক্ষু চড়ক।”

(গড়িয়া মানে পুকুর, মশারি মাড়ানো মানে মশারি তোষকের চারপাশে গুঁজে দেওয়া, ‘র’ হল অব‍্যয় – যার অর্থ থেকে)

বিয়ের চারদিনের দিন এক ঘটনা ঘটল। এখানে বাসি বিয়ে হয়না। চৌথী হয়। মানে চারদিনের দিন মন্দিরে আবার বিয়ে হয়। কিন্তু মুস্কিল অন্য জায়গায়। ঐদিন রাতে শাড়ির আঁচলে পাঁচটা ফল বেঁধে ঘুমোতে হয়। ভোরে পুকুরে ডুব দিয়ে বিয়ে সম্পন্ন হয়। ভোররাতে বর ঘুম থেকে ডেকে বলে, নিচে কলটানার আওয়াজ। মা উঠে পড়েছে। তুমি উঠে পড়। আমার আর হুঁশ নেই। চিরকাল রাতে পড়াশোনা করি, আমি লেট রাইজার। শেষে দরজায় ঠকঠক। নভেম্বরে বালির ঠান্ডা, হু হু করে কাঁপতে কাঁপতে খিল খুললাম। দেখি বাইরে মোটা শাল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শাশুড়ি মা। পুকুরে নামা অভ‍্যেস নেই। এই ঠান্ডায় শাল জড়িয়ে…. বলির পাঁঠা হয়ে চললাম। সূর্য উঠতে এখনো দেরি। পুকুরের সামনে শাশুড়ি বললেন,   গাছের আড়ালে জামা বদলে নাও। বলে আমার পরনের শাড়িটা পুকুরে কেচে মেলে দিলেন। আর বললেন, চুপচাপ ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়। কাউকে কিচ্ছু বলার দরকার নেই। আমার ওপরে যা চলেছে তা বৌয়ের ওপর হতে দেবনা। মনে ভাবি আড়বালিয়ায় যদি এমন হতো, জ‍্যাঠাইমারা বলতেন একটা দিন মানতে হয়। ওষুধ খেয়ে নেবে। মায়ের বুক ফাটলেও জ‍্যাঠাইমাদের ওপরে কথা বলতেন না। ছোট বেলায় হাঁপের টান উঠত আমার। এখনও পান থেকে চুন খসলে সর্দি কাশি। এসব না জেনেও, রীতি রেওয়াজ এক ফুঁয়ে উড়িয়ে আমার প্রাণ রক্ষা করলেন ইনি। নাহলে হাসপাতালের শয্যা অপেক্ষায় ছিল। চিরঋণী হয়ে গেলাম। দিন গেলে বুঝলাম গ্রাম‍্যতার মাঝে তিনি মূর্তিমতী বিদ্রোহিনী। একশো বছর আগে সেই যিনি আয়ার্ল‍্যান্ড থেকে এসে গুরু বিবেকানন্দের কথায় মেয়েদের ইস্কুল করেছিলেন, আমি সেই স্কুলের ছাত্রী। ফেমিনিস্ট চিনতে ভুল আমার হয়নি। ক্রমে এই গাঁয়ে মেয়েদের ইস্কুল খোলা, আরও নানা সমাজ সংস্কারে শাশুড়ি মায়ের অবদান জানলাম। যত চিনলাম মনের দিক থেকে ততই তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে পড়লাম। এও বুঝলাম, তাঁর মনের জোরের নৌকোর হাল বাঁধা আছে তিন খুঁটিতে। বাবা আর দুই কাকা। শহরে আমরা রোদ বেরোলেই ছাতা, সানগ্লাস, এয়ার কন্ডিশনার কতো আড়াল খুঁজি। আর এখানে গায়ে রোদ লাগানোর রীতি। ঢালা চেয়ারটা লোক দিয়ে উঠোনে বার করে, তিন বৃদ্ধ বসে থাকতেন আয়েশে। কাজ সেরে মা এসে বসতেন মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে। কখনো বা মাদুরে। গল্প গাছা কতকিছু হতো। দোতলা থেকে দেখি আর হাসি। মনে মনে নাম দিয়েছি “চার ইয়ার”। কাকারা যে রক্তের সম্পর্কের নন, তা আমি বহুদিন জানতাম না। ভাবতাম অন‍্য বাড়িতে থাকেন শুধু। জানার পর মনে ভাবি, সত্যিই তো।

“রক্তের মিল আর স্বার্থের অমিল।
চুম্বকের দুই মেরু, বড় গরমিল।।
পরস্পরকে টানে, তবু দ্বন্দ্ব-বর্গীয়।
সখ্যতা অমৃত বটে, তাই স্বর্গীয়।।”

সিঁড়ির যেমন ধাপ আছে, বন্ধুতার ও ক্রম আছে। সবচেয়ে ওপরে, এ বাড়িতে অমর-বেলা তো ওবাড়িতে শচীন-অখিল। পরের ধাপে, এ বাড়িতে বাপু-তপু তো ওবাড়িতে তুলু-পিপলু। দিন যায়। এ বাড়িতে রঞ্জা-কর্ণা, তো ওবাড়িতে সোহম, মাম্পি, ভোম্বল।

এবাড়িতে বাবা সবচাইতে মজার মানুষ। অষ্টপ্রহর তাঁর হা হা হাসিতে ঘর ভরে থাকে। অখিল কাকু খুব চুপচাপ, তিনি আমাদের লেভেলে তেমন মেশামেশি করেননা। শচীন কাকু তেমন না। প্রণাম করলে লাজুক হাসেন। আবার গল্প ও করেন। শুনতে পাই তিনি পণ্ডিত মানুষ। অনেক বই লেখেন। অনেক ইস্কুলে তাঁর লেখা বই পড়ানো হয়। তবে আমার চোখে তিনি লাজুক কিন্তু মিশুক, ভারি মিষ্টি একজন মানুষ।

দুর্গায় দুর্গতি

বিয়ের পর প্রথম দুর্গা পুজোয় এক গোল বাধল। যবে থেকে হাঁটতে শিখেছি, তবে থেকে বিয়ের বছর পর্যন্ত দুর্গাপুজোয় আমাদের বাঁধা রুটিন ছিল। ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী তিন দিন আলোয় আর পুজোর গানে ভাসা কলকাতায় বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঠাকুর দেখা, চপ, কাটলেট, ফুচকা যা পাওয়া যায় খাওয়া। নবমীতে সোজা সোদপুর – বড়মামার বাড়ি। ফিরে হাতিবাগানে নতুন কোন থিয়েটার দেখা। আর দশমীতে ভোরে উঠে আড়বালিয়ায়। সেখানে ছিল বিরাট আকর্ষণ। তিন মন্দিরের মাঠে মেলা, এলাকার যত দুর্গাঠাকুর আসত বরণ হবার জন্য। সব গ্রামের বৌরা আসত বরণডালা নিয়ে। সিঁদুর খেলা হত। এতকাল শুধু দেখেছি। এবারই প্রথম আমার এন্ট্রি পাবার কথা। বাড়ি ফিরে বেলপাতায় শ্রী শ্রী দুর্গা সহায় লেখা। সেই লেখার জন্য দুপুর থেকে প্রস্তুতি। কঞ্চির কলম কাটা, আলতা গুছিয়ে রাখা, লক্ষ্মীপুজোর জলচৌকি নামিয়ে সাজানো। অনেক কাজ। লেখা হয়ে গেলে, মূল আকর্ষণ ছিল বড়দের প্রণাম করে পার্বণী পাওয়া। শেষে ভাইবোনেরা বসে কার কত আয় হল, তার হিসেব কষা। অলিখিত নিয়ম ছিল, বিয়ে হয়ে গেলে সে আর পার্বণী পাবেনা। তাকে দিতে হবে। আমার বাবা সবার ছোট। তাই আমি ও দশজনের মধ্যে ছোটোর দিকে। আমার ওপরে সাতজন। গতবছর আমি হায়েস্ট পেয়েছিলাম। আমার নিচে, দুজন দুধেভাতে। তারা একটু কম পেয়েছিল। আসলে যখন যে হায়েস্টে ওঠে, তার পরে তার বিয়ে হয়ে যায়। ছোটোদের আর একটু লাভ বাড়ে। এবার আমি ডোনার হব। মনে মনে অনেক জাল বুনে রেখেছিলাম। বিজয়া পালন হতো ঘটা করে। স্পেশাল আইটেম ছিল মেজজ‍্যাঠাইমার মাংসের ঘুগনি। আমাদের এক এক বাড়িতে এক এক রকম মিষ্টির রকমারি বাহার থাকতো। বিজয়ার পরে কয়েকদিন সব বাড়িতে খেতে খেতে রাতে আর খেতে হতনা। আর অষ্টমী বাদে অন্তত দুদিন পাঁঠার মাংস হবেই। বাকি দিন চিকেন বা রুই কাতলা হত।

এবছর শুনলাম পঞ্চমীতেই চলে যাব শ্বশুর বাড়ি। ফিরব লক্ষ্মীপুজোর পর। সেখানে বাড়িতে পুজো। আড়বেলে যাবার কোনো গল্প নেই। যত জাল বুনেছিলাম, এক কোপে ফালাফালা। কলেজের এক রসিক প্রবীণ সহকর্মী বলেন, দুর্গাপুজো তো মেয়েদের বাপের বাড়ি যাবার উৎসব। তুমি উল্টো দিকে শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছ, কলকাতা ছেড়ে পুজোয় প্রথমবার। পারবে তো? তাঁকে বলি, বাড়িতে তো পুজো হয়। আসলে বাড়ির পুজো সম্পর্কে আমার একটা ধারণা ছিল, সিনেমা আর উপন্যাসে যেমন হয়, অথবা অন্তত খবরের কাগজে যেমন পড়া যায়।

কিছু অন‍্য পাওয়া

প্রত‍্যাশা পূর্ণ হলনা। শ্বশুর বাড়ি গিয়ে দেখলাম, মন্দিরে নিত্য পূজার সাথে একপাশে ঘট পেতে, পিছনে একটা পট রেখে দুর্গাপুজো হচ্ছে। তিন দিন হবে। বৈষ্ণব মতে পুজো, তাই পুরোটাই নিরামিষ। ষষ্ঠীর বোধন আর দশমীতে বিসর্জন নেই, তাই বিজয়া পালন, কোলাকুলি, মিষ্টি মুখের পর্ব ও নেই। মৃন্ময়ী মা নেই। কোনোদিনই ছিলেন না। আমাদের বিয়ের এক বছর আগে, কষ্টি পাথরের গোপীনাথ, ছশো বছরের পুরনো রাধা, অষ্ট ধাতুর অ্যান্টিক বৈষ্ণবী স্টাইলের দুর্গামূর্তি, মায় ঘন্টা কাঁসর, বাসন কোসন সব চুরি হয়ে গেছে। এখন নিমকাঠের মূর্তিতে গোপীনাথ রাধারানী পূজিত হচ্ছেন। দোষ লাগার নিদান হয়েছে, তাই ঘটে পুজো। শাক্ত দেবীর যে বৈষ্ণবমতে পুজো হতে পারে, এ বিষয়ে কোনো পূর্ব জ্ঞান ছিলনা আমার। বিয়ের সময়ে ডায়নামো আলো ছিল, ভিড় ছিল, কিছু বুঝিনি। অন্য সময় হলে হয়তো ভালো লাগত। দুর্গাষষ্ঠী, সপ্তমীতে মন্দিরের প্রদীপ, হারিকেনের টিমটিমে আলো, আর দেবদারু জঙ্গলের নিশ্ছিদ্র আঁধার আমাকে যেন গিলে খেতে এল। এবাড়ির ছেলে মেয়েরা লেখাপড়ার জন্য সব ছোট থেকে হোস্টেলে। পুজো হল ছুটিতে বাড়ি ফিরে আড্ডা দেওয়া, আরাম করা। আমার আটাশ বছরের ঝোড়ো দুর্গাপুজো নিম্নচাপের স্থির কেন্দ্রে এসে পড়ল। তার চেয়ে বেশি ভয়, বাকি পুজোগুলো ও এমন কাটবে। বাড়ির লোকে ছেলে বউ, মেয়ে জামাই বাড়ি আসাতে এতই মশগুল, মেজোবৌয়ের মনখারাপের খবর কারো কাছে পৌঁছলনা। রুমমেট যাঁর কাছে খবর পৌঁছতে পারত, তাঁর টিকি পাওয়া গেলোনা। তিনি বন্ধু বান্ধব নিয়ে ব‍্যস্ত রইলেন।

পঞ্চমীতে আসার পর আজ তিনদিন। খাঁচায় বন্দী পাখি হয়ে আনমনে বসেছিলাম। বিকেলে শচীন কাকু এলেন।
“কি বৌমা, কলকাতায় তো খুব ঘুরুথায়। এঠি কিছি নাই।”

“ঠাকুরের মুখ দেখা হয়নি কাকু”।

“এখানে দুটো পুজো তো হয়। মাইতি হাট আর রথতলা।”

“তাই নাকি?”

“তুমি বাপুকে (আমার বরকে) ধরো বৌমা। নতুন সংসার তো। এখনো ব‍্যাচেলরের মতো টো টো কোম্পানি করছে। একান্ত যদি না নেয়, আমাকে বোলো। আমি রথতলার প্রেসিডেন্ট। হাঁটতে পারো তো?”

“আচ্ছা। হ‍্যাঁ তা পারি। ….আজ আসুক, মজা দেখাচ্ছি”।

পরের সন্ধ‍্যেয় বাপু বন্ধুর বাইক ধার নিয়ে, আমাকে ঠাকুর দেখাতে বেরোলো। মাইতি হাট, রথতলা পেরিয়ে হিরাকনিয়া। পুজোর মেলা। বক্সিগঞ্জের হাটের মতো বেতের বোনা ধামা কুলো থেকে শীতের র‍্যাপার নক্সা কাটা; পিতলের বাসন থেকে লোহার ছুরি কাঁচি – খুব মজা হচ্ছিল। একটা মেলা থেকে আর একটা মেলা পর্যন্ত ছমছমে অন্ধকার পথ, কিছুটা পাকা, বেশিটাই কাঁচা রাস্তা। রথতলায় ম‍্যারাপ বেঁধে পুতুল নাচ হচ্ছে। হিরাকনিয়ায় বিরাট বটগাছ। মাইতিহাটের মেলা সবচেয়ে বড়।  শহরে ফিরে বলার মতো কিছু তো হল। আর কী? শচীন কাকু আমারও বন্ধু হয়ে গেলেন।

সংসার বহতা নদী

জীবন চলে গেল কুড়ি কুড়ি বছরের পার। চার ইয়ারের তিন ইয়ার অমর, বেলা, অখিল তিনজনই ছুটি নিয়েছেন। মেয়েরা বড় হয়ে মায়ের জায়গা নিয়েছে। সুবর্ণলতার দক্ষিণের বারান্দা হয়েছিল। আমারও দুর্গাদালান হয়েছে। মৃন্ময়ী মা আসেন। নিরামিষের পর্ব একই আছে। তবে বিজয়ায় দর্পণে বিসর্জন হয়ে গেলে অতিথি ডেকে খাওয়া দাওয়া চালু হয়েছে, এমনকি পাঁঠার মাংস ও হয়। বিকেলে বিগ্রহ বিসর্জন দিয়ে ফিরে সেই জলচৌকি তে দুর্গাসহায় আর পার্বণী পর্ব ও শুরু করেছি। বাড়িতে কারেন্টের ভোল্টেজ বেড়েছে। তা সত্ত্বেও পুরো সময় জেনারেটর ভাড়া ক‍রা থাকে। সেই ঢালা চেয়ারটায় শচীন কাকু একাই বসে থাকেন। পুজোর আগে আমাদের গাড়িটা জিনিসপত্র নিয়ে যখন গ্রামের পথে ঢোকে, রথতলার মাঠ পেরোয়, খেয়াল করি কাকু বসে আছেন কিনা। বসে থাকলে নিশ্চিন্ত।

অকস্মাৎ কি ঝড়ের ডাক?

নিশ্চিন্তি আর দুশ্চিন্তা এ দুটোর পাল্লা কবে কোনদিকে ঝোঁকে তা বোঝা ভারি মুস্কিল। হঠাৎ সেদিন চেনা দাঁড়িপাল্লা গুলো গোলমাল করে সাগরের ঢেউ পেরিয়ে এল ভয়ানক উম্পুন ঝড়। আড়বেলে আর মৈথুনা দুটোই তছনছ। হিরাকনিয়ার বিরাট গাছটাও উপড়ে গেল। ঐ ঝড় কাকুর কাছে চিঠি দিয়েছিল। আমরা টের পাইনি। দিন পনেরোর মধ্যেই খবর পেলাম কাকু তাঁর কলমটি রেখে, বাকি তল্পিতল্পা নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন আকাশের ওপারে। আচ্ছা চেয়ারটা পাঠানো যাবে? বা মাদুরটা? চার ইয়ারের দল পূর্ণ হল। আচ্ছা থাক। যেখানে ওঁরা গেছেন, সেখানে আসন আছে। ঝড়বৃষ্টি কেটে গেলে, আকাশ ভরা তারা উঠবে। ভালো করে খুঁজলে চার ইয়ারের আড্ডা ঠিকই দেখতে পাব।

পুনশ্চঃ দুই বাড়ির ইয়ারানা আমার মধ্যে ও সংক্রামিত হয়েছে একটু একটু। তুলুদা যদি বলে, কলম না ধরে কি পারি?

“যদি বুকের মাঝে অঝোর ধারা, মেঘ ছেয়ে যায় মনটা;

হার মানিনা, আঁকড়ে থাকি রোদ ওঠাবোই পণ টা।”

অথ চার ইয়ারি কথা সমাপ্ত, দুই ঘরের ইয়ারি নয়। ওটা চলছে।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল

লেখাটি ড. শচীন্দ্রনাথ বড়পণ্ডা – একটি যাপন চিত্র নামক মনোগ্রাফে মুদ্রিত। প্রকাশকাল ৬ই জুলাই, ২০২১

কোথায় পাড়ি? দারিংবাড়ি!

কয়েক বছর ধরেই উড়িষ্যার দার্জিলিং, দারিংবাড়ি নাম টা শুনছিলাম। গতবছর আমাদের প্রাক্তন ছাত্র প্রদীপ এসে বলল, বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে ও ফিল্ডে গিয়েছিল দারিংবাড়ি।  জায়গাটার যা বর্ণনা ও দিল, ঠিক করলাম এবারে যেতেই হবে।

চারমাস আগে রেলের বুকিং শুরু হয়ে যায়। সময়মতো তারিখ না বেছে রাখলে বুকিং পাবোনা। দলবল তো কম নয়। পঁয়ত্রিশ জন ছাত্রছাত্রী। সঙ্গে আমরা মিলে মোট ঊনচল্লিশ। কিন্তু এতদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সূচী স্পষ্ট নয়।  হাজারো চিন্তা ভাবনা, ঝক্কি শেষে একটা দিন নির্দিষ্ট করা গেল। জানুয়ারির শেষে।

দারিংবাড়ির অদ্ভুত বাড়ি

হাওড়া স্টেশন থেকে রাতে ট্রেন। সকালবেলা ব্রহ্মপুর। সেখান থেকে প্রাতরাশ সেরে পাহাড়ি রাস্তায় ঘন্টা চারেকের পথ। আমি এর আগে বিশাখাপত্তনম, আরাকু ঘুরেছি, তাই পূর্বঘাট পর্বতমালা আমার একেবারে অচেনা নয়। কিন্তু এদিকের ভূদৃশ‍্য বেশ কিছুটা আলাদা। রাস্তা কিছুটা ভালো, কিছুটা আবার খুবই এবড়ো খেবড়ো। তবে দুপাশের অপরূপ সবুজে চোখ জুড়িয়ে যায়। ব্রহ্মপুর থেকে পুরো রাস্তায় একটা বিশেষ ব‍্যপার নজরে পড়ছিল। সেটা হল প্রতিটি বসতিতে বাড়ির অদ্ভুত নক্সা। আমরা দারিংবাড়ি পৌঁছলাম দুপুর দুটো নাগাদ। অবাক হয়ে লক্ষ‍্য করলাম যে হোটেলের সামনে আমাদের বাসটা দাঁড়ালো, সেই হোটেলের সামনের বিল্ডিং টাও ঐ একই নক্সায় তৈরি। নক্সাটা হল বাড়িগুলি আয়তাকার। অনুপাতে প্রস্থ খুব কম আর লম্বায় খুব বেশি। বাড়িগুলোর সামনের অংশ হল আয়তক্ষেত্রের প্রস্থ। এখানে একটি দরজা ও সরু জানলা থাকে। লম্বায় টানা দেওয়াল এবং সেই দেওয়ালে কোনো জানলা নেই। নেই মানে নেই। আমি এর আগে কখনো এমন বাড়ি দেখিনি। দরজার সোজাসুজি করিডোর উলটোদিকে মুখোমুখি আর একটি দরজা পর্যন্ত। বাকি অংশে পাশাপাশি ছোট ছোট ঘর। করিডোরের দিকে তাদের দরজা খুলছে। দরজার মাথায় করিডোরের দিকে জালকাটা ভেন্টিলেশন। বাইরের দিকে কোনো জানলা নেই। আর কোনো দিক দিয়ে বাইরের আলো বাতাস ঢোকার পথ নেই।
হোটেলের সামনের দিকের বিল্ডিংটা এমন হলেও পিছনের নতুন বিল্ডিং যেখানে আমরা ছিলাম, সেটার প্ল‍্যান আধুনিক। কিন্তু প্রথম দর্শনে খারাপ লাগলো, হোটেলের ক‍্যাম্পাসের ভিতরের জমিটা আগাছা, জঙ্গল আর সিমেন্ট বালির রাবিশে ভর্তি। এতটা জায়গা সুন্দর বাগান করা যেত। তবে ঘরগুলো সুন্দর। আমাদের জানলা দিয়ে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। ডাইনিং হলটাও প্রশস্ত, আর বেশ সাজানো। আশপাশের ছোটোখাটো হোটেলগুলোর নক্সাও আয়তাকার।

কাজ শুরু

বেলা হয়ে গিয়েছিল, সবার খিদে পেয়ে গেছে। দেড়ঘন্টায় খেয়ে দেয়ে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে কাগজপত্র নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। হাতে সময় কম, জায়গাটা চিনতে হবে, সার্ভের কাজ শুরু করতে হবে।

একটাই ঢালু রাস্তা নেমে গেছে। দুপাশে কয়েকটি হোটেল, দোকান। পাকা দোকান কিছু আছে। বেশিরভাগ দোকান বেড়া, খড় আর টালি দিয়ে তৈরি। আনাজ, খাবার জিনিস খোলা রাস্তার ধারে মাটিতে বসে বিক্রি হচ্ছে। আদিবাসী মহিলারা নানা রঙের, নানা রকমের বীজ আর ডালের পসরা সাজিয়ে বসেছেন, বেশিরভাগই অচেনা।
উৎরাই পথে নামতে নামতে  সরকারি অফিসও দেখলাম। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি দুরকম ব‍্যাঙ্কেরই বেশ কয়েকটি শাখা রয়েছে। এ টি এম কাউন্টার ও আছে। নিচের দিকে জিপ আর অটো রিক্সা স্ট‍্যান্ড রয়েছে বটে। বহুক্ষণ অপেক্ষা করে ভর্তি হলে তবে রওনা দেবে। দেখে মনে হল সবই দূরের যাত্রী। কাজ শেষে হোটেলে ফিরতে হলে, যতটা উৎরাই নেমেছি, ততটাই চড়াই পার হতে হবে। মাঝপথে পা ব‍্যথা করলে, বাস, অটো, জিপ কিছুই পাওয়ার জো টি নেই। সাইকেল রিক্সাও চোখে পড়লনা। বেশ কিছুটা নেমে চারমাথার মোড় দেখতে পেলাম। এবারে সামনে বেশ ফাঁকা। চারিদিকে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। পূর্ব দিকে ঢালু পথ গড়িয়ে গেছে এলাকার একমাত্র বাস ডিপোর দিকে। খবর পেলাম ওদিকেই বনবিভাগ ও ব্লকের অফিস আছে। আজ আর যাওয়ার সময় নেই। পশ্চিমের আকাশে লাল ফাগের হোলি। লালচে সোনালি রোদের আভায় লাল মাটি আর বাদামি ঘাস জ্বলজ্বল করছে। দূরে পাহাড়ের রং লালে, ধূসরে মাখামাখি। আমার প্রিয় রং নীল। লাল নয়, তবু মাটি থেকে আকাশ সবার এই রংখেলা দেখে কেমন নেশা ধরে যায়। কীকাজে এসেছি ভুলে যেতে ইচ্ছে করে।

ছেলেমেয়েদের ট্রাফিক সার্ভে, রোড মরফোলজি ড্রয়িং, হোটেল সার্ভে আর মার্কেট সার্ভে শেষ হল। ক্লাসে টেকনিক যতই শেখানো হোক, তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে সাহস আর উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োজন হয়। এখানে গ্রুপে ভাগ করে দিতে, ওরা বেশ সুচারু ভাবে চারটে কাজই সম্পন্ন করেছে। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা গ্রামের ছেলেমেয়ে হলেও, বেশ স্মার্ট আর বুদ্ধিমান। ওদের দলে দলে হোটেলের দিকে রওনা করিয়ে দিলাম। কাউকে একা না ফিরতে হয়। পায়ে হেঁটে ফিরতে হবে চড়াই এর দিকে। চারমাথা থেকে পশ্চিম দিকে রাস্তা উঁচু। ওদিকে সামনেই উৎকল সরকারের ট‍্যুরিস্ট বাংলো। লোহার গেটের আড়ালে বড় সাজানো ক‍্যাম্পাস। দেখে খুব লোভ হচ্ছিল একবার ঢোকার জন্য। কিন্তু হলনা। মনের কথা মনেই রাখাই বেস্ট, কারণ কাজে এসেছি, আর কাজের নাইকো শেষ। ট‍্যুরিস্ট বাংলো পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে জঙলা মেঠো পথ দিয়ে ঢুকলে জাগ্রুতি NGOএর অফিস। এঁদের কাজ সম্পর্কে অনেক কিছু শুনে এসেছি, একবেলা সময় করে যেতেই হবে। আজ পথটা চিনে রাখলাম। ধীরে ধীরে আমি অগ্নিশা আর সৌরভ উপরে উঠছি। মানে আমার জন্য ওরা ধীরে উঠতে বাধ্য হচ্ছে। অগ্নিশা আজ কলিগ হলেও আসলে প্রাক্তন ছাত্রী। আর সৌরভও কলিগ এবং ছাত্রসম। পথটা দেখে আরাকুর সঙ্গে খুব মিল পাচ্ছি, তবে ওখানে রাস্তা তুলনায় চওড়া আর জমজমাট। লোকসংখ্যা, যানবাহন সবই বেশি। দুদিকে দেখতে দেখতে মন থেকে যেটা খুঁজছিলাম, সেটা দেখতে পেলাম। একটি বাড়ির ছোট রকে তিনটি ছোট, মাঝারি সরস্বতী প্রতিমা। আসলে চারমাস আগে যখন অনেক হিসেব কষে দিন ঠিক করা হয়েছিল, তখন কারোরই খেয়াল হয়নি, মাঝে সরস্বতী পুজো পড়ে গেছে। আসার দিন এগিয়ে আসাতে বাড়িতে মান অভিমান, অশান্তি। বাড়িতে পুজো। প্রতিমা সাজিয়ে লাগেজ ঘাড়ে নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। সব বাড়িতেই মোটামুটি গল্প এক। ছেলেমেয়েরা আজ কাজে বেরোনোর সময়ে ইচ্ছে জানিয়েছিল যে আজ যদি কোথাও সরস্বতী পুজোর মন্ডপ চোখে পড়ে তো ওরা কাজের ফাঁকে আগামীকাল পুজোয় অঞ্জলি দিয়ে আসবে। আমাদের আপত্তি তো কিছু নেই। কিন্তু আজ এত ঘুরেও মন্ডপ খুঁজে পাওয়া গেলনা। এটাতো বাংলা নয় ওড়িশা। তায় আদিবাসী অঞ্চল। এঁরা সকলে খৃষ্টান। অনাদিবাসীরাও থাকেন। প্রতিমা বিক্রি হচ্ছে, মানে পুজো হয়, বাড়িতে হয়। কিন্তু বাড়িতে যাওয়ার মতো যোগাযোগ কারোর সঙ্গে নেই, থাকলেও চল্লিশ জন মিলে যাওয়া সম্ভব হতনা। তিনজন মিলে চকিত সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরাই হোটেলের ঘরে পুজো করব। প্রতিমা থাকলেও কেনা সম্ভব নয়। অচেনা জায়গায় ভাসান দেব কোথায়? আমার ব‍্যাগে মা সরস্বতীর ছবি ছিল। ঠিক হল ঐ ছবিতেই পুজো হবে। এবারে এক প‍্যাকেট ধূপ, একটা ধূপদানি, মোমবাতি, দেশলাই আর কিছু ফল কিনতে হবে। এগুলোই হবে আমাদের পুজোর উপকরণ। এগুলো কেনার জন্য আম‍রা দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। তখনই নজরে পড়ল যে বাসন কোসন আর মণিহারী জিনিসের দোকানদার সব উত্তর ভারতীয়। স্থানীয় মানুষ স্থানীয় ফসল, ফল, মুড়ি, মোয়া এসব বিক্রিবাটা করছেন। আর বাকি দোকানের মালিক ওড়িয়া, কিন্তু আশপাশের জেলা থেকে এসেছেন। কেউই এখানকার ভূমিপুত্র নন। ব‍্যবসার জন্য এখানে থাকেন। হোটেল ব‍্যবসা যাঁরা করছেন তাঁরা বেশিরভাগই গঞ্জাম জেলার মানুষ। ব্রহ্মপুরের সমতল থেকে পাহাড়ি পথে দারিংবাড়ি ওঠার সময়ে আমরা গঞ্জাম জেলা পেরিয়ে এসেছি। তবে কি ঐ অদ্ভুত বাড়ি গঞ্জাম জেলার বৈশিষ্ট্য? একটা জিনিস স্পষ্ট বুঝলাম। দারিংবাড়ি ওড়িশার পর্যটন মানচিত্রে এসেছে ২০১৫ সালে। এখন ২০২০। ব‍্যবসা বাণিজ্য, নতুন যানবাহন, নানান কারণে এই আদিবাসী অধ‍্যুষিত পাহাড়ি জনপদে অনাদিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে। পথে ঘাটে প্রচুর আবর্জনা ছড়িয়ে রয়েছে, ঠিক আমাদের হোটেলের চারপাশের মতো। সদ‍্য উন্নয়নের ধাক্কা লেগেছে, পরিপক্ক হতে সময় লাগবে। অনেক খুঁজেও ফুল পাওয়া গেলনা। গাছের ফুলও যে বিকিকিনির জিনিস, সেটা এখনও স্থানীয় মানুষের ধারণায় আসেনি। ফল কি কেনা যায়! ফলকাটার সময় নেই, কেটে রাখার ও জায়গা নেই। এমন কোনো ফল চাই যা পকেট ফ্রেন্ডলি, ফিরে গিয়ে সব টাকার পাইপয়সা হিসেব দিতে হবে। পাঁচদিন ফিল্ডের খরচ চালাতে হবে। আবার প্রত‍্যেকের ভাগে যাতে একটা গোটা ফল পড়ে, সেটাও ব‍্যবস্থা করতে হবে। প্রথমে আপেল দর করে পিছিয়ে আসতে হল। পকেটের থেকে ভারি ফলে পকেট ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। নজর পড়ল স্থানীয় উৎপাদন মোলায়েম হলুদ পুরুষ্টু পাকা কলার কাঁদির দিকে। মা সরস্বতী সবই দেখছেন, বুঝছেন। শস্তায় পুষ্টিকর দিশি কলায় অরুচি তাঁর হবেনা নিশ্চিত। আমরা ঊনচল্লিশ, ভ্রমণ সংস্থার কর্ণধার বিদ‍্যুৎবাবু ও তাঁর দল আছেন। পুজো হবে, আর হোটেলের কর্মীদের মধ্যে সামান‍্য কিছু বিলি হবেনা, তাতো হয়না। তাঁদের সহযোগিতাও তো দরকার। এক কর্তা গিন্নির দোকানে ষাটটা কলা বেঁধে দিতে বললাম। এই অভাবনীয় খরিদ্দারির প্রস্তাবে তাঁদের চোখে উপচে পড়ে আনন্দ ও বিস্ময়, মুখে অনাবিল হাসি। বাঙালির স্বভাব বাইরে গেলেই হিন্দি বলা। এখানে হিন্দি বলে সুরাহা হলনা। আকার ইঙ্গিত সহকারে বাংলাটাই ওনারা বুঝতে পারলেন। উড়িষ্যায় সেটা স্বাভাবিক। এই পূর্বঘাটেই পথের পাশে লম্বা লম্বা শিমের বিচির মতো সাদা রঙের বীজ দেখে অন্ধ্রপ্রদেশের আদিবাসী মহিলাদের জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিলাম এটা কি খাওয়া হয়? তেলেগু জানিনা। ওঁরা হিন্দি বোঝেননা। শেষে পরিষ্কার বাংলায় বললাম, “রান্না হয়?” ওঁরা মাথা নেড়ে একগাল হেসে একমুঠো বীজ ব‍্যাগে ভরে দিয়েছিলেন।

কলা, ধূপ আর  ধূপদানি নিয়ে তাড়াতাড়ি পা চালাই। অন্ধকার পথ, দোকানের আলো মিলিয়ে এসেছে। সবাইকে বুঝিয়ে কিভাবে সব সুষ্ঠুভাবে আয়োজন হবে জানিনা। তবে ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছে, সৌরভ খুবই উত্তেজিত। হতেই হবে, শিক্ষক হিসেবে এটা ওর প্রথম ফিল্ড, আর অগ্নিশার দ্বিতীয়। প্রথমবার ও জড়োসড়ো ছিল। এবারে সেটা নেই। কিন্তু আমি যেহেতু ওর ডাইরেক্ট টিচার, তাই খাপ খুলছেনা। বাইশ বছর পড়ানোর চাকরি রে বাবা, আমার চোখ এড়ানো কি অতই সহজ!!

জয় জয় দেবী

হোটেলে ঢোকার মুখে কাচের দরজার বাইরে দেখি রিসেপশনের ছেলেটি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে। সৌরভ তাকে দেখেই উদগ্রীব প্রশ্ন করে বসে, আপকে পাস্ ঘন্টা হ‍্যায়? আরে, সত‍্যিই তো, রিসেপশনে গণেশ মূর্তি আছে। সৌরভের বেশ বুদ্ধি। ছেলেটি কী উত্তর দিল শোনার আগেই দেখি অগ্নিশা দৌড়ে একটু দূরে চলে গেল। আমিও ওর কাছে চলে এসেছি। সৌরভও দৌড়ে এসেছে। অগ্নিশা মুখ চেপে হাসছে। সৌরভকে দেখিয়ে দুহাতের বুড়ো আঙুল তুলে ঠোঁট উল্টে আমাকে বলছে, “আপকে পাস্ ঘ-ন্-টা  হ‍্যায়”। ও হরি, সৌরভের প্রশ্নটা affirmative করে বললে অর্থটা বদলে যায়। তিনজন মিলে খুব একচোট হেসে নিলাম। অগ্নিশার স্নাতকোত্তর হিন্দি বলয়ে। হিন্দিতে ও আমাদের থেকে অনেক বেশি চোস্ত। একটু আগেই দেখেছি এটা হিন্দির জায়গা নয়। বাংলায় বললেই ছেলেটি বুঝতে পারতো। যা হোক চারিদিকে টেনশনের মাঝে এগুলোই অক্সিজেন।

হোটেলে ফিরে সবাইকে ডেকে বুঝিয়ে দেওয়া হল আগামীকাল সকাল সাড়ে সাতটায় প্রাতরাশ। সাড়ে ছটার মধ্যে সকলকে স্নান সেরে রেডি থাকতে হবে। আধঘন্টার মধ্যে আমরা ঘরেই পুজো সেরে নেব। প্রসাদ এবং প্রাতরাশ খেয়ে আটটার মধ্যে সার্ভেতে বেরিয়ে পড়তে হবে। রোদ চড়ে গেলে কষ্ট বাড়ে। আজ বিকেলে যা যা কাজ হয়েছে, সেগুলো এবার ফাইনাল করতে হবে। ছেলেমেয়েদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আমরা বসলাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে।

আজ বিকেলে যখন আমরা কাজ করছিলাম, তখন বাজারে একটা জিপ ঘুরে ঘুরে মাইকে ঘোষণা করছিল। ওড়িয়াতে হলেও কেতাবি ঢঙে ধীরে ধীরে বলছিল বলে পুরোটাই আমরা বুঝতে পেরেছি। বিদ্যুৎ বাবু আমাদের কাছাকাছি আদিবাসী গ্রামের মৌজা ম‍্যাপ যোগাড় করে দিয়েছিলেন, সেখানে কাজ করার জন্য। ঐ ঘোষণা শুনে সেদিকে পা না বাড়িয়ে আমরা আজ দারিংবাড়ি মিউনিসিপ‍্যালিটি আর বাজারের মধ্যেই থাকব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামীকাল বাড়ি বাড়ি ঘুরে হাউসহোল্ড সার্ভে হবে। ডাম্পি লেভেলে টেরেন প্রোফাইল আর কনট‍্যুরিং হবে। নতুন সি বি সি এস সিলেবাস অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গার মাটি আর জল পরীক্ষার জন্য স‍্যাম্পল সংগ্রহ হবে। আবার সরকারি অফিসগুলো থেকে যথাসম্ভব সেকেন্ডারি তথ্য যোগাড় করতে হবে। একটা দিনের জন্য হারকিউলিয়ান টাস্ক। কখন কী হবে আর কতজন থাকবে, কে কোন কাজে উপযুক্ত, সব কিছু ছকে ফেলতে হবে। বাজারের ঘোষণায় বলা হচ্ছিল আগামীকাল এন আর সি এবং সি এ এ – র বিরোধিতায় বন্ধ ডাকা হয়েছে, কোনো দোকান খুলবেনা, কোনো গাড়ি চলবেনা। এলাকায় উত্তেজনা থাকলে ছেলেমেয়েরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবে কিকরে? তিনজন মিলে যুক্তি করে পরিচয়, পরিযান, আদি বাসস্থান সংক্রান্ত যে সব বিশদ প্রশ্ন থাকে, সব কেটে বাদ দিয়ে দিলাম। প্রশ্নপত্র একেবারে ছোট করে ছেঁটে ফেলেছি, এবারে ক‍্যাপ্টেনদের ডেকে বলে দিতে হবে, ডিনারের পর ঘরে না গিয়ে সবাই যেন ডাইনিং হলে আধঘণ্টা থেকে যায়, আগামীকালের কাজ নিয়ে ডিসকাশন হবে। দরজা খুলে বেরোতে যাব দেখি ছেলেরাই আমাদের ডাকতে এসেছে। ছোট ঘর গুলোতে তিনজন করে আছে। একটা বড় ঘরে ছজন ছেলে আছে, অভিজিৎ, অনিত, অর্পন, ইভান, সায়ন, নাজিবুল। কাল পুজোর জন্য ওদের ঘরেই ঠাকুর সাজানো হয়েছে। আমাদের দেখতে যেতে হবে। ঘরে ঢুকে আমি তো অবাক। ছেলেমেয়েরা অসাধ‍্য সাধন করেছে। খাট ওপাশে ঠেলে দরজার সামনে লম্বা মেঝে, পরিষ্কার মোছা। মাঝখানে একটি প্লাস্টিকের চেয়ার।ইন্সট্রুমেন্ট মোছার পেপার টাওয়েল দিয়ে চেয়ার ঢাকা দেওয়া। তার ওপরে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো সরস্বতী ঠাকুরের ছবি। ছবিতে কাগজের মালা। সামনে মেঝেতে খবরের কাগজ পেতে কলার কাঁদি, ধূপের প‍্যাকেট, ধূপদানি, দেশলাই, মোমবাতি, পিতলের ঘন্টা ও পঞ্চপ্রদীপ। সব আমাদের পারমিতা সাজিয়েছে। শুনলাম শেষের ঊপকরণদুটি যোগাড় হয়েছে, হোটেলের রিসেপশন থেকে। এতেই শেষ নয়। হোটেলের পুরোনো বাড়ির ছাদে ফুলের টব আছে। সকালে সেখান থেকে ফুল পাড়ার অনুমতি পাওয়া গেছে। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের সরস্বতী পুজোর মন্ত্রোচ্চারণ হোয়াটস্ অ্যাপে পেয়ে ডাউনলোড করা হয়ে গেছে। গান শোনার ফোন স্পিকার সেট করা হয়ে গেছে। অঞ্জলি দেওয়ার মন্ত্র ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছেনা। তাই অরগানাইজারেরা যথেষ্ট চিন্তিত। সবার একটা আর্জি আছে, কাল মিষ্টি আনতে হবে। মিষ্টিমুখের প্রস্তাবে না করা কি যায়? তবে কাল যে বন্ধ্! শুনলাম হোটেলের ছেলে কথা বলে দোকান খুলিয়ে দেবে। লাড্ডু পাওয়া যাবে। ব‍্যস  আয়োজনের পনেরো কলা পূর্ণ, কেবল অঞ্জলির মন্ত্রটুকু। ঘরটা বেশ পুজো পুজোই লাগছে, এটা স্বীকার করতেই হবে।

ডিনারের পর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া হল যে কাল আমরা কি কি করব এবং কি কি করবনা। ঘরে ফিরে এসে আবার নিজেদের মধ্যে একদফা প্ল‍্যান, যুক্তি তর্ক সেরে অবশেষে বিছানা। বিকেলে যে জানলা দিয়ে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল, এখন সেখানে কাচের ওপারে জমাট বাঁধা অন্ধকার। গতরাতে ট্রেনে ছিলাম। সকালে বাস জার্নি, এখানে পৌঁছনো ইস্তক এত কাজ হয়ে গেল, মনে হচ্ছে আজ নয়, বেশ কিছুদিন দারিংবাড়িতে আছি। কাল কি যে হবে। একে তো দিন কে দিন যাতায়াত আর হোটেল খরচ বাড়ছে। তার ওপর কখনো প্রাকৃতিক, কখনো সামাজিক নানা কারণে ফিল্ড করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। আগে আটদিনের কমে ফিল্ড হবে এটা কল্পনাও করা যেত না। একটা জায়গার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে না উঠলে তাকে অনুভব করা যায়না। অনুভব না থাকলে পরিবেশ মানুষ সম্পর্কের বোধ জন্মায় না। বোধ তৈরি না হলে, কুঁড়ি ফোটা ভৌগোলিকেরা প্রস্ফুটিত হবে কেমন করে। এবারে তো সব জলাঞ্জলি দিয়ে পাঁচদিনের ফিল্ডে এসেছি। আসা যাওয়া, মাঝে তিন দিন। একদিন বন্ধ পড়ে গেল। মা সরস্বতী মাথায় আছেন, তিনিই দেখবেন। একরাশ চিন্তা মাথায় নিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, জানিনা।

ঘুম ভাঙলো বেশ ভোরে। শীতকাল, এখনো ভালো করে আলো ফোটেনি। আজকের সার্ভের জন্য দরকারি কাগজপত্র ফাইলে গুছিয়ে নিলাম। কুয়াশা ভেজা কাচের জানলা দিয়ে সকালের নরম রোদ ঢুকে অগ্নিশার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। শাল গায়ে জড়িয়ে দুজনে করিডোরের কমন  বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। নিচে ভ্রমণ সংস্থার রন্ধন কর্মীরা অতি দ্রুত প্রাতরাশ তৈরি করছেন। এতবছর ধরে দেখছি, এঁরা যে কখন ঘুমান, কখন ওঠেন হিসেব করা মুস্কিল। সবই ঘড়ির কাঁটা ধরে চলে, নড়চড় নেই। বলতে বলতে চা বিস্কুট হাজির। অন্যদিন হলে চায়ের কেটলি নিয়ে ঘরে ঘরে নক করে ঘুম ভাঙাতে হয়। আজ সব উত্তেজনায় ফুটছে, করিডোর দিয়ে সেজেগুজে এঘর ওঘর হুড়োহুড়ি করছে। কালকের দুশ্চিন্তা আর মনে আসছেনা। অঞ্জলি দিতে হবে তো, চা বিস্কুট ফেরত পাঠালাম। ফিল্ডের নিয়ম হলো একই পোশাকে যতদিন কাটানো যায়, সেই চেষ্টা করা। কিন্তু আজ সে নিয়ম চলবেনা। জ‍্যাকেট আর সোয়েটারের তো বদল হবেনা, কারণ স্টকে একটি মাত্রই আছে। মোজাটা নতুন পরে নিয়েছি। পুজোর ঘরে ফুল সাজানো শেষ। ছাদের টবে সাকুল্যে পাঁচটি ফুল পাওয়া গেছে। হালকা কমলা রঙের বড় পঞ্চজবাটি চেয়ারে ঠাকুরের সামনে মাঝখানে। সবচেয়ে লোভনীয় বাক্স ভর্তি লাড্ডু। ও বাবা সৌরভ একেবারে রেডি হয়ে চলে এসেছে, আবার পরনে ঊজ্জ্বল বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি। কিন্তু অঞ্জলির মন্ত্রের কী হল? খবর পেলাম, আমাদেরই এক ছাত্রীর বন্ধুর বাবা পুজো করেন। সেই বন্ধু খাতায় মন্ত্র লিখে ছবি তুলে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাই আয়োজনের ষোল কলা পূর্ণ।  ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ছটা পেরিয়ে পৌনে সাতটার দিকে। মেঝেয় সবার দাঁড়ানোর জায়গা হচ্ছেনা বলে বাকিরা খাটে উঠে পড়েছে। তিল ধারণের জায়গা নেই। মোবাইল ধরে ক‍্যামেরাম‍্যানেরা রেডি।  আমাদের অগ্নিশা সব‍্যসাচী। বামহাতে ঘন্টা নেড়ে ডানহাতে পঞ্চপ্রদীপের আরতি করতে পারে। ভ্রমণ সংস্থার রান্নাঘর থেকে সর্ষের তেল যোগাড় হয়েছে। তুলো সঙ্গেই ছিল, সলতে তেলে ভেজানো আছে। স্পিকারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র পাঠ শুরু করেছেন। বিদ্যুৎ বাবুও এসে দাঁড়িয়েছেন পুজোর ঘরের দরজায়। পঞ্চপ্রদীপের আগুনের আভা সকলের চোখে। সঙ্গে ঘন্টাধ্বনি বলছে আমরা সবাই এক। এই অনুরণন ঢেউ হয়ে ভেসে যাক পাহাড়ে জঙ্গলে, ছড়িয়ে পড়ুক আসমুদ্র হিমাচলে। ফুল তো নেই, মোবাইল দেখে অগ্নিশার উচ্চারণের সাথেই সকলে চোখ বুজে অঞ্জলি দিলাম নিজেদের ভক্তি।
প্রসাদ বিতরণ সারা হল। এবার ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়। ছেলেমেয়েরা বেশিরভাগ হাউসহোল্ড সার্ভে করবে হোটেলের চারপাশের বাড়িগুলিতে। দূরে যাবেনা। একটা ছোট দল আর ইন্সট্রুমেন্টের ট্রলি নিয়ে রওনা হলাম চারমাথার মোড়ের দিকে। বেরোনোর মুখে দেখি দুপুরের খাবারের যোগাড় চলছে। আজ আর মাছের ঝোল নয়। আমাদের আবদারে মেনু বদল। খিচুড়ি, লাবড়া, ধোঁকার ডালনা, চাটনি, পায়েস। মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছে। একটা প্রত‍্যয়ের অনুভূতি, সবাই তো আছি। যা হবে দেখা যাবে।

দ্বিতীয় পর্ব

চারমাথার মোড়টা ইন্স্ট্রুমেন্ট সার্ভের পক্ষে বেশ উপযোগী। বন্ধ থাকার জন্য শাপে বর হয়েছে। নিরিবিলিতে কাজ করা যাচ্ছে। ব‍্যস্ত রাস্তার মোড়ে নৈনিতালে একবার লোকজন আর যানবাহনের চাপে খুব অসুবিধে হয়েছিল। সব শেষ হল বেলা বারোটা নাগাদ। এবার অফিসগুলোতে যেতে হবে। হাউসহোল্ড যারা করছে, সৌরভ ওদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রেখেছে। জল আর মাটির স‍্যাম্পল যারা সংগ্রহ করছে, তাদের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়ে গেল। যানবাহন অমিল। তাই হন্টন বিনা গতি নেই। সব কিছু শেষ করে, পায়ের দড়ি ছিঁড়ে হোটেলে যখন ফিরলাম, ঘড়িতে বাজল তিনটে। সেকেন্ডারি ডাটা যোগাড় হয়েছে। হাউসহোল্ড সার্ভেও শেষ। ছেলেমেয়েরা স্থানীয় মানুষজনের কাছ থেকে ভালো ব‍্যবহার পেয়েছে। অনেক ঘুরেছে। তারা বেশ সন্তুষ্ট। লাঞ্চ করে ডাইনিং হল ছেড়ে যখন বেরোলাম, তখন বিকেলের রোদ পড়েছে গাছের মাথায়। বিশ্রামের সময় নেই, এবারে একটি বেসরকারি অফিসে যেতে হবে। আমাদের বাস ড্রাইভার বন্ধ বলে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন। শেষে হোটেলের অ্যামবাসাডরের ব‍্যবস্থা হল বটে, সকলের যাওয়াটা গেল আটকে।

গাড়ি চলল চারমাথার মোড় পেরিয়ে ডানদিকে। এদিকে রাস্তা ফাঁকা। অফিসে ঢোকার পথটা মিস হয়ে গেল। ভুল করে আমরা এগিয়ে চললাম দূরে। দুপাশে ঘাসের দৈর্ঘ্য বাড়ছে। সোনালি রোদ লালচে হয়ে আসছে। একি আমরা তো পাহাড়ে উঠে পড়ছি। অনেক দূরে ছোট একটা আদিবাসী গ্রাম দেখা যাচ্ছে। আজ অফিসে কাজ করার সময়ে এক স্থানীয় স্কুলের হেডমাস্টার মশায়ের সঙ্গে আলাপ হল। তিনি গবেষক ও বটে। বাংলাতেও যান বক্তৃতা দিতে। তাঁর কাছে শুনছিলাম এই এলাকায় ইংরেজ আমল থেকে আদিবাসী অনাদিবাসীদের সম্পর্কের জটিল অন্তর্জাল। আমার ইতিহাস জ্ঞানের দৌড় মাধ্যমিক পর্যন্ত। সিধু কানু বিরসার কথা পড়েছি। তবু মনে হয় তখন সিলেবাসে আদিবাসী বিদ্রোহ বিশদে ছিলনা। এখন মেয়ের ক্লাস টেনের বইতে জঙ্গলমহলের কোল বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ অনেক বিশদভাবে ব‍্যাখ‍্যা করা আছে। সামাজিক ভূগোল বুঝতে গেলে ইতিহাসের বোধ জরুরী। ওড়িশার কন্ধ উপজাতির কাহিনী যা শুনলাম, তাও ঐসব বিদ্রোহের কাহিনীর সমতুল্য, আর সেটাই স্বাভাবিক। ইংরেজ মিশনারিরা উপজাতি মানুষদের খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করেছেন, যা আজও মূলধারার স্থানীয় সমতলের বেশিরভাগ মানুষের থেকে স্বতন্ত্র। আজ ঐ সমতলের মানুষ পাহাড়ি পরিবেশের সৌন্দর্য কে কাজে লাগিয়ে পর্যটন ব‍্যবসা বাড়াতে চায়। তার জন্য লাগবে বাড়তি জমি। কে না জানে জমির অধিকারের লড়াই হল খাদ্য আর বাসস্থানের জন্য মানুষের আদিম লড়াই। ভদ্রলোকের কথা গুলো ভুলতে পারছিনা। আজকের হোটেল আর দোকানগুলো জনজাতির মানুষের জমিতেই তৈরি হয়েছে। তাঁরা সরে গেছেন পাহাড়ের আরও উঁচু ঢালে। পূ্র্বঘাট বেশি তো উঁচু নয়। টপকে গেলে দেশের মধ‍্যকার জমি, আরও বেশি জনবহুল। সরতে স‍রতে আর কোথায়? কোথায় ভূমিকন্যা ও পুত্রদের পরিযানের শেষ? দারিংবাড়ির ঘাসের, পাহাড়ের, রোদের লাল রং মানুষের শিরার ভিতরের লাল রংটার কথা কি আমায় বলতে চাইছে?

আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। “চলুন ম‍্যাডাম”,সম্বিৎ ফিরল সৌরভের ডাকে। গাড়ি থেমেছে। আমরা এখন ঈপ্সিত অফিসের সামনে। কেরলের এক ভদ্রলোক গত শতকের আটের  দশকে এই সংস্থা তৈরি করেছিলেন আদিবাসী কল‍্যাণে কাজ করার জন্য। এঁদের একটা লাইব্রেরি আছে। স্থানীয় স্কুলের ছেলেমেয়েরা বই নেয়। অনেক রকম স্থানীয় শস‍্যের নমুনা দেখলাম। একটা কথা শুনলাম, ২০০৮ সালে জাতি সম্পর্ক মান অভিমানের সীমা পেরিয়ে ঘাত প্রতিঘাতে পৌঁছেছিল। তখন থেকে সরকারি ব‍্যবস্থা অতি সতর্ক। একথাগুলো নির্দিষ্টভাবে জানার আগেই ভৌগোলিকের চেতনা আমাকে জানান দিচ্ছিল। মানুষের যন্ত্রণা মনে বাজে, কাঁটার মতোন বিদ্ধ করে।

দরকারি কাজ সেরে হোটেলে যখন ফিরলাম তখন সন্ধ্যা নেমেছে। হোটেলের উল্টোদিকে একটা হনুমান মন্দির আছে। সেখান থেকে ঘন্টা ধ্বনি শুনে লোহার গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। একজন মাত্র পূজারী আরতি করছেন, আর জনমনিষ‍্যি বলতে আমরা এই কজন। গর্ভগৃহে টিমটিমে হলুদ বাল্ব জ্বলছে। কামিনীর গন্ধ আসছে নাকে।পাঁচিলের মধ্যে ধারে ধারে ফুলগাছ, পাতাবাহার। মাথার ওপরে শুক্লা পঞ্চমীর আধখানা চাঁদ। আকাশে মেঘ নেই, চারিপাশে বিজলি আলো যথেষ্ট নেই। প্রায়ান্ধকার নিরিবিলি এই মন্দিরটিতে মনটা ভারি শান্ত লাগছিল। মনের মেঘ আর নেই।আরতি শেষ হল। আমাদের ঘরেও যে সরস্বতী মা বসে আছেন, তাঁকেও আরতি করতে হবে।

মুস্কিল আসান অগ্নিশা তো আছেই। আমাদের আরতি ও সুসম্পন্ন হল। উমম্ জলখাবারে আজ চাউমিন হয়েছে। ছেলেমেয়েদের পছন্দ, আর দুজনের ও খুব – কাদের আবার সৌরভ আর অগ্নিশা। খেতে খেতে গল্প হল। সারাদিনের ক্লান্তি আর নেই। এই জিনিসটা আমি ফিল্ডে এলেই খেয়াল করি। সমতলে দূষিত বাতাসে কাজ চালাই তো, প্রকৃতির কাছে বাড়তি অক্সিজেনে নিশ্বাস নিয়ে চট করে ক্লান্ত হইনা। আজ বিভিন্ন দলে কী কী কাজ হয়েছে তার খতিয়ান নিয়ে বসা হল। মূল মৌজা ম‍্যাপটা বিদ্যুৎ বাবু এখানে আসার আগেই যোগাড় করে দিয়েছিলেন। ঐ ম‍্যাপে বসানোর মতো যথেষ্ট প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি ডাটা আমাদের যোগাড় হয়েছে। কিন্তু মুস্কিল হল   এখনও দুটো মোক্ষম কাজ বাকি আছে। ক্লাইনোমিটার সার্ভে আর প্ল‍্যান্ট ডাইভার্সিটি ম‍্যাপিং। টাইমে কুলোবে কিকরে? কাল যে সাইট সীয়িং এ বেরোনোর কথা। এলাকার উল্লেখযোগ্য ভূদৃশ‍্য গুলিও যে ছেলেমেয়েদের দেখাতে হবে। এই পৃথিবীই যে ভূগোলের ল‍্যাবরেটরি। অবশ্য এজন্য অন্য বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা একটু দুঃখ করেন। টাইম ম‍্যাপিং এর জন্য ডিনারের সময়ে বিদ্যুৎ বাবুর শরণাপন্ন হলাম। সমাধান সূত্র ও মিলে গেল সহজে। সবই নির্ভর করছে আমরা কত ভোরে উঠে কাজ শেষ করতে পারব তার ওপরে। ঘুমোতে গেলে জায়গা দেখা যাবেনা। এটা শহর নয়। এখানে সূর্য ঘড়ি অনুসরণ করে চলতে হবে। তিনি অন্তর্হিত হলে বাইরের কাজও সাঙ্গ হয়। ঘরে ঘরে ডিনার টাইম মিটিং এর ডাক গেল। ছেলেমেয়েদের অনেক এনার্জি, কিন্তু সব বাড়ির রাজপুত্র রাজকন‍্যে। এত পরিশ্রম করার অভ‍্যেস তো নেই। থাকলেও এধরনের কাজ ওদের কাছে একেবারেই নতুন। এখনই বেশ রাত। সারাদিন রোদে পুড়ে কাজ করেছে। কাল আবার খুব ভোরে ওঠা। একটা অন্য সমস‍্যাও হয়েছে। দুদিন কাটল। জল খারাপ। মেট্রোজিল, নরফ্লক্স টি জেড এবং অন‍্য সমতুল্য ওষুধের খোঁজ পড়েছে সব ঘরে। যদিও জটিল কিছু নয়, তবু ওরা পারবে তো? ছেলেমেয়েদের বলাতে তারা এককথায় রাজি। যেকোনো কষ্ট করতে প্রস্তুত। ভোরে লাইট টিফিন করেই সার্ভে। ফিরে এসে আর্লি লাঞ্চ করে সারাদিনের জন্য বেরিয়ে পড়া।

রাতে আবার তিনজন যুক্তি করতে বসলাম। আসল চ‍্যালেঞ্জ আমাদের। ছেলেমেয়েরা কাজগুলো তো জানেনা। দুঘন্টার মধ্যে লোকেশন খুঁজে, ওদের শিখিয়ে দু দুটো সার্ভে কমপ্লিট করা কি সম্ভব? এদিকে যত দেরি হবে, ওদিকে একটা করে সাইট বাদ যাবে, সেটা কি মানা যায়? কখনোই নয়। আমাদের ভিতরের ছেলেমানুষগুলো মরে গেছে বুঝি!! আচ্ছা আমরা পুরো টীম সকলে কাল যে অত কষ্ট করব, একটা প্রাইজ নেবনা? কাল এক ফাঁকে ঠাকুর ও তো তুলতে হবে। ফিরে এসে দধিকর্মা পেলে কেমন হয়। প্রতিবারই বিদ্যুৎ বাবু আমাদের নানা আবদারে পাগল হন, কিন্তু এটা যে সম্পূর্ণ অন্য। আচ্ছা উনি কি শুয়ে পড়েছেন? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তিনজন ই লাফিয়ে উঠেছি। রাত একটা ছুঁই ছুঁই। অন্তত চারঘন্টার বিশ্রাম চাই এক্ষুনি শুয়ে না পড়লে, নিজেরাই উল্টে যাব।

তৃতীয় পর্ব

ভোরেই রান্নাঘরে দধিকর্মার আর্জি পেশ করলাম। মঞ্জুর ও হল। এবারে সবাই মিলে ঘড়ির সঙ্গে যুদ্ধে নামলাম। কাজ শেষ করেই ছোড়েঙ্গে। আবার দারিংবাড়ি সবটা দেখার পণটাও নেহি তোড়েঙ্গে।

হোটেলের সামনে থেকে ঢালু পায়ে চলা পথ গড়িয়ে গিয়েছে বাস রাস্তার দিকে। বেশি খোঁজাখুঁজি করে মাথাগরম করার দরকার কী?। এপথে যথেষ্ট ঢাল আছে। ক্লাইনোমিটার সার্ভে ভালোই হবে। হৈ হৈ করে সকলে কাজে নেমে পড়লাম। এর পর একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে হবে, যেখানে প্ল‍্যান্ট ডাইভার্সিটি ম‍্যাপিং করা যায়। বাস রাস্তায় পৌঁছে কয়েকজন বলল, ওপারে একটা জায়গা আছে যেখানে ঐ কাজ করা যেতে পারে। গতকাল হাউসহোল্ড সার্ভে করতে করতে ওরা ওখানে পৌঁছে গিয়েছিল‌। আচ্ছা যাওয়া যাক তাহলে।

রাস্তা পেরিয়ে বিরাট মাঠ, আর বিশাল দুটো অশ্বত্থ গাছ। আরও এগোই। ওপাশে তো একটা মন্দির মনে হচ্ছে। গত দুদিন আমরা বাজার পেরিয়ে চারমাথার মোড়ের দিকে কাজ করছিলাম। ওদিকে সব চার্চ দেখলাম। এদিকটায় তার মানে মন্দির গুলো আছে। ভাবনা মুক্ত হয়েই এগোচ্ছিলাম, কল্পনা করিনি দুমিনিট পরে কোন বিস্ময়ের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি। জানিনা পাঠক বিস্মিত হবেন কিনা। জিওমরফোলজির বইএর পাতা জ‍্যান্ত হতে দেখলে ভৌগোলিকের হৃদস্পন্দন নিজের বশে থাকেনা। একটু গুছিয়ে নিই। তার পরে বলছি।

দারিংবাড়ির আবিষ্কার

আমি যা প্রথম দেখি, তা আমারই আবিষ্কার – একথা বলেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ‍্যোপাধ‍্যায়। এখানেও ব‍্যপারটা কতকটা অমনি হল। আমি খুঁজছিলাম এমন একটা জায়গা যেখানে  স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠা ছোট বড় গাছপালা মিলে মিশে রয়েছে, মানুষের লাগানো গাছ নয়। আবার খুব বেশি ঝোপ জঙ্গল থাকলে ছেলেমেয়েদের কাজের অসুবিধে হবে। অশ্বথ গাছ পেরিয়ে মন্দিরে ঢোকার পায়ে চলা পথ। পথের ওপারে এবড়ো খেবড়ো একটা উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেল, যেখানে প্ল‍্যান্ট ডাইভার্সিটির কাজ করা সম্ভব। আরও একটু দূরে গেলে গাছ আরও ঘন। কিন্তু শুনলাম ওদিকে অনেক সাপের গর্ত। স্থানীয় মানুষ বারণ ক‍রছেন। হোক শীতকাল। ছেলেমেয়ে সঙ্গে নিয়ে বিবেচনা জলাঞ্জলি দেওয়া যায়না। আমরা সামনের দিকেই রইলাম। যে স্পটে কাজ করতে চাইছি, তার ডান সীমানা দিয়ে সোজা চলে গেছে উঁচু মাটি আর পাথর দিয়ে তৈরি বাঁধ। সে বাঁধ দিয়ে যাতায়াত করা যায়। মানে আমরা মেয়েরা যেতে পারব। কিন্তু ছেলেদের নিচে দিয়ে যেতে হবে। এমন অদ্ভুত নিয়ম কেন? আগে খেয়াল করিনি। বাঁধটা বেশ কিছুটা নাক বরাবর গিয়ে ডানদিকে বেঁকেছে, আসলে গোল হয়ে বিশাল একটা নিচু জায়গাকে ঘিরে রেখেছে। আমাদের সামনে বাঁধের গা ঘেঁষে সিমেন্টের দেওয়াল তোলা আছে। ডানদিকে সিঁড়ি নেমে গেছে। মন্দিরের মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম সিঁড়ি দিয়ে নেমে মহিলাদের স্নানের জায়গা। পুকুর তো নেই এখানে‌। আমার সন্দেহ গাঢ় হচ্ছে। কথা বলে তা নিরসন হল। মাটির তলা থেকে সারাবছর জল ওঠে। একজন ছাত্রকে বলি জিজ্ঞেস করোতো, ওটা কোন ঠাকুরের মন্দির। যা ভেবেছি তাই। দেবাদিদেব শিবশম্ভুর ভজনা করা হয় এখানে। একজনকে বলি চট করে দেখে এসো তো মূর্তি পুজো হচ্ছে,  নাকি শিবলিঙ্গ। সে এসে বলে মূর্তি নয় ম‍্যাডাম। আমি হাসি। এ জিনিস প্রথম দেখেছিলাম প্রায় কুড়ি বছর আগে মধ্য ভারতে। মহাকাল পর্বতের অমরকন্টকে। আসলে একটি প্রাকৃতিক কুন্ড, বা ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। ভূগর্ভস্থ জলস্তর আগ্নেয় আর রূপান্তরিত শিলার ফাটল দিয়ে চুঁইয়ে বেরিয়ে আসছে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখে এলাম জলের লেভেল। এখন শীতকাল। জলস্তর নেমে যাওয়ার কথা। এখনো এতটা জল মানে জলস্তর ভূপৃষ্ঠের খুবই কাছে। হুমম, বুঝলাম। জলস্তর কাছে বলে বেশি ফিল্টার হবার সুযোগ পায়না। সেজন্যই সবার পেটের গোলমাল হয়েছে। এবারে শিবঠাকুরকে দেখে আসি। শিব ও বুদ্ধের শান্ত, ধ‍্যানী কল্পনাটি আমার খুব ভালোলাগে। আমার মনে হয় ঐ মূর্তি মানুষের মনঃসংযোগ আর অনুভবের ক্ষমতার মূর্ত রূপ। সাদামাটা মন্দিরটির পিছনে একটি বেশ বড় চাতাল। দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলে সিমেন্ট বাঁধানো বড় ঘর। একসাথে অনেকের বসা সম্ভব। তার একপাশে মেঝেতেই জটাজূট শিবঠাকুর বসে আছেন নন্দীকে পাশে নিয়ে। তবে সেখানে পুজো হয়না। বাঁদিকে ধাপে ধাপে নেমে গেছে পথ। পূজারী উঠে এসে জিজ্ঞেস করলেন স্নান করে এসেছি কিনা। অবশ্যই স্নান করে এসেছি। ‘তাহ‍্যানে আপণ আসুন’ পূজারী ডাকছেন। আমি আর অগ্নিশা পা বাড়ালাম। কিন্তু সৌরভ যাচ্ছেনা কেন? হায় ভগবান, ও চান করে আসেনি। ব‍্যস। তিনজনের যাওয়াই আটকে গেল। কারণ পূজারী রাজি হলেন না। হয়তো ভেবেছেন এক পরিবারে এক যাত্রায় পৃথক ফল হয়না। মনে মনে হাসি, পূজারী ঠিকই বুঝেছেন, আমরা এক পরিবারের তো বটেই। মাঠে প্রান্তরে, মানুষের অন্তরে বাহিরে খুঁজে বেড়াচ্ছি ভূগোলের জ্ঞান ক্ষ‍্যাপার মতো, ভৌগোলিক পরিবারের প্রতিনিধি হয়ে। পূজারী একটা জিনিস বোঝেননি। আমরা ফুল বেলপাতায় পূজো দিতে আসিনি। শিবলিঙ্গ স্পর্শ করে দেখতে চেয়েছিলাম ঊদবেধী শিলা কিনা। জ্ঞানের অন্বেষণই আমাদের প্রণাম। পূর্বঘাট পাহাড়ের শ্রেণী আসলে তো পাহাড় নয়। সৃষ্টির প্রথম আগ্নেয় শিলায় পৃথিবীর বুকে তৈরি হয়েছিল মালভূমি। সেই আদি মালভূমি টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে আফ্রিকায়, দক্ষিণ আমেরিকায়, অস্ট্রেলিয়ায়, ভারতে, আন্টার্কটিকায়। ভারতের দুই উপকূলে পূর্বঘাট আর পশ্চিম ঘাট হল সেই আদিম মালভূমির দুই ধার। আজ দুধারের মাঝখানের অংশটা ক্ষয় হয়ে নিচু হয়ে গেছে। সৃষ্টির সেই অশান্ত দিনে পাথর ফেটে গিয়েছিল কোথাও কোথাও। সেই ফাটল দিয়ে উঠে আসছিল পৃথিবীর বুকের ভিতরে লুকোনো গরম তরল ম‍্যাগমা। পশ্চিমে আরব সাগরের দিকে কাছাকাছি অনেক ফাটল দিয়ে পাতলা লাভা বেরিয়ে পড়ল বাইরে। তৈরি করলো মালভূমির আর একটা পরত – কালো ব‍্যাসল্ট পাথরের। মুম্বাইয়ের জুহু বিচের কালো বালি আরব সাগরের জলে ভিজে যেন কাজলপারা। প্রথম দর্শনে তুলে চোখে পরে নিতে ইচ্ছে হয়েছিল আমার। ভারতের বাকি মালভূমির ফাটলের ম‍্যাগমা কিন্তু ছিল ভারি ও সান্দ্র, পশ্চিমা লাভার মতোন পাতলা ছিলনা। তাই তারা বেরোতে পারেনি। মাটির গভীরেই জমে গেছে। তাদেরই আজ বলে ঊদবেধী শিলা। উল্লম্ব আগ্নেয় উদবেধী শিলাকে বলে ডাইক। কোটি কোটি বছরের ক্ষয়ের ফলে অনেক ডাইক আজ বেরিয়ে এসেছে। অমরকন্টকে শুনেছিলাম ওস্থানটি শিবক্ষেত্র। কারণ ওখানকার মন্দিরের কোনো শিবই মানুষ প্রতিষ্ঠা করেনি, সবই পাতাল থেকে উঠেছে। শহুরে মন নিয়ে আমরা বিশ্বাস করিনি। আর যত নদীর উৎস সব মন্দিরে। এটাও বিশ্বাস করিনি। পরে দেখলাম সব মন্দিরেই শিবলিঙ্গ ভেজা, ওপর থেকে নয়, নিচের দিক থেকে। স্থানীয় মানুষ বলেন বর্ষা কালে মা গঙ্গা দেখা করতে আসেন। ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসে জল। ঐ ডাইক গুলিই যে শিবজ্ঞানে পূজিত হচ্ছে সহস্র বছর ধরে। মানুষের সাধ‍্য কি পাতাল থেকে ঐ দেবতাকে উপড়ে এনে অন্য কোথাও প্রতিষ্ঠা করার। বর্ষা কালে ভূগর্ভস্থ জল ঐ ফাটল দিয়ে ওভার ফ্লো হয়। যে জলের উৎস জানা নেই, ধর্মভীরু মানুষের কাছে তা গঙ্গা জল ছাড়া কী? লোকবিশ্বাসকেও মর্যাদা দিতে হয়। তার মধ্যে থাকতে পারে সত্য অনুষঙ্গ। এই কথাটা অমরকন্টকে জীবন একটা চড় মেরে শিখিয়েছিল। এখানে এমন কোন ধর্মীয় গল্প নেই। হয়তো আদিবাসী লোক ধর্ম এবং খৃষ্টধর্মের মিশ্রণে হিন্দু সংস্কৃতি মাথা চাড়া দিতে পারেনি। আফটার অল পূর্ব ভারত তো এখানে সহাবস্থানই স্বাভাবিক নিয়ম। কট্টরবাদীদের সামনে পূবদিক কোনোদিন মাথা নোয়ায়নি। এ হল সূর্যোদয়ের দিক। যুক্তি ও জ্ঞানই যে মানুষের হৃদ-সূর্য। ভূতাত্ত্বিক তো নই আমি, ম‍্যাজিসিয়ান ও না, যে দূর থেকে দেখেই নিশ্চিত বলতে পারব, দারিংবাড়ির এই শিবঠাকুর হল ডাইক। কিন্তু আমরা যে ভৌগোলিক। এখানকার সারফেস এক্সপ্রেশনগুলি সেদিকেই নির্দেশ করছে। প্রথম ক্লু হল ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসা জল, আর দ্বিতীয় হল, মানুষ ই যদি শিবলিঙ্গ বসিয়েছে, তবে অতগুলো ধাপ নিচে কেন? ভিতরে জল কেন? ছেলেমেয়েরা বলছে, গতকাল যখন ওরা গ্রামে ঢুকেছিল, তখন ওখানেও অমন কুন্ড আর ঝোরা দেখেছে। আশ্চর্য কিছু নয়। বরং এটাই স্বাভাবিক। আদিম কম্পনে প্রাচীন শিলায় ফাটল তো আর একটা হবেনা। এখানে চারপাশেই এমন থাকবে। হয়তো এই ঝোরাগুলোই এখানকার জলের যোগানদার। বর্ষায় ওভার ফ্লো এখানেও হয় সেটা নিশ্চিত। ঐজল ধরে রাখার জন্যই এতটা জায়গা বাঁধ দিয়ে ঘেরা। এঅঞ্চল তো মহানদীর ক‍্যাচমেন্ট এলাকা আর বঙ্গোপসাগরের মাঝে জলবিভাজিকা। যেদিক দিয়েই হোক, এখানকার জল মিলে যায় বঙ্গোপসাগরের ঢেউ এ। প্রাকৃতিক কুন্ড আর শিবলিঙ্গের সহাবস্থান আমি অনেক জায়গায় দেখেছি। আমাদের বাংলায় বক্রেশ্বরের উষ্ণ প্রস্রবণের পড়শিও তো বক্রেশ্বর শিব। দারিংবাড়িতে এই সম্পদ আছে আগে জানিনি। বইতে এসব লেখা থাকেনা। শুধু বই পড়া ভৌগোলিক হল আর্ম চেয়ার জিওগ্রাফার। সায়েন্স কলেজে আমাদের স‍্যার সুভাষ রঞ্জন বসু বলতেন, কখনো যেন আরাম কেদারায় বসে থেকোনা। ফিল্ডে এলে বারবার স‍্যারেদের কথা মনে আসে। ফিসফিস করে বলি আমি বসিনি স‍্যার। অমরকন্টকে এই প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোকে পৌরাণিক গল্পের মোড়কে, সঙ্গে দোকান বাজার বাহারি চটকের সাথে পরিবেশিত হয়। আর দারিংবাড়িতে অজান্তে অগোছালো হয়ে পড়ে আছে এখানে ওখানে।

আমাদের প্ল‍্যান্ট ডাইভার্সিটির কাজ শেষ। না দুঘন্টার মধ্যে পারলাম না। প্রায় পৌনে তিনঘন্টা কাবার। সব সাইট গুলো ছুঁতে পারবো তো? দেখিই না কী হয়।

চতুর্থ পর্ব

বাস চলল জনবসতির সীমানা ছাড়িয়ে, আর দারিংবাড়ির রূপ রস আমাদের চোখে স্পষ্ট হতে শুরু করল। ঢেউ খেলানো কালো পিচের রাস্তা, দুপাশে পাইনের বন। মাঝে মাঝে চা বাগান। ফাঁকে ফাঁকে লালচে আগ্নেয় পাথরের টিলা। নিজের কলেজ জীবনের ফিল্ডের কথা মনে পড়ে। যেন দারিংবাড়ি নয়, পাঁচমারী; যেন পূর্বঘাট নয়, সাতপুরা; যেন আমি শিক্ষিকা নই, ছাত্রী। মনটা পালকের মতো হাল্কা লাগে। পাইনের পাতায় রোদের ঝিলমিল, আর পিছনের সিটগুলোতে চাপা খিলখিল, আড়াই দিনের কাজের চাপ সরে গিয়ে রঙিন প্রজাপতিরা ডানা মেলেছে। পাইনের বন শেষ, এবারে পর্ণমোচী গাছের সারি, কখনো ঘন, কোথাও বা একটু ফাঁকা ফাঁকা। সঙ্গে চলেছে দূরে, কাছে পাহাড়ের শ্রেণী। আন্দাজ সতেরো আঠেরো কিলোমিটার যাওয়ার পরে বাসটা পাকা রাস্তা ছেড়ে কাঁচা রাস্তায় উঠল, লালচে হলুদ ধুলো উড়িয়ে  চলল নাচতে নাচতে। রাস্তা খুব খারাপ, সরুও। এত বড় বাস, কষ্ট করে চালাতে হচ্ছে। প্রায় এক কিলোমিটার এমন যাবার পর বাস থামল। কোমরটা যেন আরাম পেল। কিন্তু মনে ছিলনা আরাম হারাম হ‍্যায়। বাস থেমেছে আরাম দিতে নয়। এখান থেকে হাঁটতে হবে। মূলত উৎরাই পথ, মাঝে মাঝে চড়াই, আর প্রায় দুশোর কাছাকাছি সিঁড়ি ভেঙে আমরা পৌঁছবো মিদুবান্দা জলপ্রপাতের সামনে। অমরকন্টকের দুধধারা বা পাঁচমারীর বী ফলসের মতো রাস্তা অতটা কঠিন নয়। তবে পাহাড়ি পথ, সমতল তো নয়। দম লাগে। যাওয়ার পথটুকু ছাড়া দুপাশে জঙ্গল। অর্ধেক পথ নামার পর একটু জিরিয়ে নেবার জন্য পাথরের ওপর বসেছি, সায়ন এসে গাছের ডাল ভাঙা লাঠি  হাতে ধরিয়ে দিল আমার। তাতে বাকি পথটা পার হতে বেশ সুবিধে হয়ে গেল। লাঠি ঠুকে ঠুকে নামতে লাগলাম। এবারে পাশের নিচু খাদে জলের আওয়াজ শুনতে পেলাম, নদী এখনও দেখা দেয়নি। শেষ পর্যায়ে এসে নদীর জল দেখলাম, কিন্তু এ কি, নদীতে অনেক ভাত ভেসে যাচ্ছে। বড় বড় পাথরের বাঁক পেরিয়ে একটা গাছের গুঁড়ি লাল সিমেন্টে বাঁধানো, সিঁদুর মাখা। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা সব পৌঁছে গেছে, মোবাইলে ছবি তুলছে। অন্য পর্যটকেরাও আছে। ঘুরে পিছু ফিরতেই বাকরুদ্ধ হলাম। পাহাড়ের মাথা থেকে ঘন বনের মধ্য দিয়ে তিনটে ধাপে নেমে আসছে দুরন্ত নদী। জল পাথরে আছড়ে পড়ে কুয়াশা তৈরি করেছে। শীতকালে এত জল! বড় বড় পাথরের খাঁজে গভীর জলাশয়ের মতো তৈরি হয়েছে। শ‍্যাওলায় গাঢ় সবুজ। কিন্তু পিকনিক পার্টির চাপে চারিদিকে থার্মোকলের বাসন আর এঁটো শালপাতা ভাসছে। বুঝেছি, এইজন্য নদীতে অত ভাত ভেসে যাচ্ছিল। প্রকৃতির এই দান, যদি একটু পরিচ্ছন্ন রাখা যেত, ভালো হত। বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে ফিরতে শুরু করলাম। উঠতে সময় লাগবে আমার। জিরিয়ে নিতে হবে বারবার। সবগুলো স্পট ছুঁতে হবে, একথা ভুললে চলবেনা। সৌরভ আর অগ্নিশা তো আছে, ঠিক ছেলেমেয়েদের গুছিয়ে নিয়ে চলে আসবে। নামার সময়ে একটানে নেমে গেছি। অন‍্যদিকে তাকানোর মন ছিলনা। এখন চারদিক দেখতে দেখতে উঠছি। পর্যটক বেশিরভাগই স্থানীয়। তবে বাঙালিও আছে। আদিবাসী মহিলারা কাঁচা হলুদ বিক্রি ক‍রছেন। এখানে হলুদের চাষ ভালো হয়। মিদুবান্দাকে পিছনে রেখে নেচে নেচে বাস চললো পরের গন্তব্যে।

কিছুটা পরে পাকা রাস্তা ধরলাম। চার পাঁচ কিলোমিটার যাওয়ার পরে, আবার বাঁদিকে লাল ধুলোয় ঢাকা পথ, তবে আগের বারের থেকে ঢাল কম, অনেকটা সোজা। একটু পরেই পাহাড়ের কোল ঘেঁষে হাঁটা শুরু হল। এখানে পাহাড়ের গা রুক্ষ, গাছপালা কম, আর বিশাল বিশাল বোল্ডার। আচ্ছা সামনে নদী আছে তাহলে। বোলপুরের কাছে মামা ভাগ্নে পাহাড়ের মতো বড় বড় পাথর রয়েছে ছড়িয়ে। ওমা সৌরভ কই? আমরা যাচ্ছি নিচে দিয়ে, ও যাচ্ছে ওপর দিয়ে! কখন ঢাল বেয়ে পাহাড়ে উঠে পড়েছে। বেশ খানিকটা হেঁটে দেখি সামনে এক বিরাট খোলা জায়গা। না কোনো মাটি নেই। তাই গাছও নেই। বিরাট এক প্রাকৃতিক মুক্ত পাথুরে চাতাল। মাঝে মাঝে হাতির মতো বড় বড় বোল্ডার। একটা জিনিস নজর কাড়ল, পাথরের রং এখানে লাল নয় সাদা। তাই, হোক বিকেলের আলো, চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। চাতালের ধার দিয়ে বইছে চঞ্চলা নদী, নাম ডুলুরি। জায়গাটা হল দারিংবাড়ির লাভার্স পয়েন্ট পিকনিক স্পট। পাথরে ঘিরে নদীর জল কোথাও কোথাও জলাশয় হয়ে আছে। চান করা যাবে, মিদুবান্দার মতো অপরিচ্ছন্ন মনে হচ্ছে না। কিন্তু লাভার্স পয়েন্ট নাম কেন? একটা গাছ নেই, ছায়া নেই, নিভৃতি নেই। মুক্ত প্রাঙ্গণ। গ্রীষ্মের দুপুরে, খোলা তপ্ত পাথরের উপর যুগলের কল্পনা, তায় আবার ধুলো মেখে এতটা ট্রেক করে, এতো কষ্ট! চোখে জল চলে আসছে আমার। আর ভিতর থেকে অট্টহাসি আসছে। এখানে বোধহয় নেচার লাভারদের  কথা বলা হয়েছে। বোল্ডারের তলায় তলায় তিরতিরে জলের ধারা যাচ্ছে। তাই পাথরগুলো খুব স্লিপারি। একটু অসতর্ক হলেই পপাত চ মমার চ হয়ে যাবে। আচ্ছা যুগল যদি আনমনা হয়, তখন কী হবে? লাভার্স পয়েন্টে অস্থিভঙ্গ? এ-ই-ই যাঃ সৌরভ পড়ে গেল। না না ও আনমনা হয়নি। পাহাড় চড়ে অতি উৎসাহী হয়ে পড়েছিল। আমি আর অগ্নিশা একটা বড় বোল্ডারে পা ঝুলিয়ে বসে ছিলাম। ওখানে উঠতে গেলে পিছন দিয়ে ঘুরে আসতে হবে। ও অত না ঘুরে সামনে দিয়ে এক লাফ মেরে উঠতে গিয়েছিল। নিচের জলে পা স্লিপ করে গেল। ভগবান বাঁচিয়েছেন, বেশি কিছু হয়নি। এবার ফেরার পালা। কিন্তু সৌরভ ওপরে গুহা দেখে এসেছে। ছেলেমেয়েদের দেখাতে নিয়ে যেতে চায়। ওরা স‍্যার পড়ে গেছেন দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল, হাসিও গোপন করছিল। এখন স‍্যারের ডাকে ওনার পিছনে দৌড় লাগালো। আমি বসে রইলাম অন্য একটা বোল্ডারের ওপরে। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে আমরা বন্ধুরা মিলে পাঁচমারীর চৌরাগড় পাহাড়ের মাথায় উঠে গিয়েছিলাম। আমাদের টিচারেরা উঠতে পারেননি। কে না জানে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়।

একা বসে বসে নদীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে মনের মধ্যে ভাবনার স্রোত চলে। এই জায়গাটা দেখে আর একটা স্মৃতি মনে আসে। অমরকন্টকের  মাঈ কি মণ্ডপ। একই রকম ভূদৃশ‍্য। ছেলেমেয়েরা গুহা দেখতে পাহাড়ে চড়ছে, ফিরতে একটু তো সময় লাগবে। এই ফাঁকে গল্পটা বলি। একই রকম পাথুরে চাতাল, পাথরে ঘেরা জলাশয়, মৈকাল পর্বতের কন্দরে গুহা আর দুরন্ত নদী। চাতালের ওপরে পটহোলের মতো গর্ত। কোমল শিলাগুলো ক্ষয়ে গিয়ে বোধ করি অমন গর্ত হয়েছে। অবাক কান্ড গর্তগুলো মাথার দিকে চওড়া আর তলার দিকে সরু। হাতা, খুন্তির মতো দেখতে। দারিংবাড়ির এই লাভার্স পয়েন্টেও চাতালে গর্ত আছে। আমি খুঁজে দেখেছি। আকৃতিতে গোল। যা হোক অমরকন্টকের কথায় আসি। মহাকাল বা মৈকাল পাহাড়ের অমরকন্টক হল নর্মদা, কুমারী আর শোনভদ্র এই তিনটি নদীর উৎস ভূমি। শোন তো উত্তর ভারতের সমভূমির দিকে গড়িয়ে গিয়ে গঙ্গায় মিশেছে। কুমারী গিয়ে মিশেছে শোনভদ্রে। আর নর্মদা একই স্থানে জন্ম নিলেও চ‍্যুতিরেখা ধরে নাকবরাবর চলে গেছে ভূমি ঢালের উল্টো দিকে আরব সাগরে। কোনো উপনদীর সঙ্গম ছাড়া একাকী। এই অসামান্য ঘটনার ভূপ্রাকৃতিক ব‍্যাখ‍্যা যাই হোক, এক জমজমাট পৌরাণিক থ্রিলার শুনেছিলাম মাঈ কি মণ্ডপ ঘিরে, যে মাঈ কি মণ্ডপ আর লাভার্স পয়েন্ট একই রকম। নর্মদা শিবের পুত্রী, গঙ্গা অবধি তাঁর মন ভেজাতে দেখা করতে আসেন, দেমাক ই আলাদা। কুমারী হলেন তাঁর সখী। এহেন নর্মদা প্রেমে পড়লেন শোনভদ্রের। বিবাহ স্থির হল। এদিকে কেউ জানেনা, কুমারী নদী ও মনে মনে শোনকে ভালোবাসে, শুধু কাউকে বলতে পারেনা। নর্মদা আর শোনের বিবাহের আয়োজন সম্পূর্ণ। স্বর্গের দেবতারা নিমন্ত্রিত, মহাভারতের পান্ডবেরা নিমন্ত্রিত। নর্মদা অপেক্ষা করছেন বধূ বেশে। বর আর আসেনা। অপেক্ষায় ক্লান্ত, বিষন্ন নর্মদা নিজেই সন্ধান করেন শোন কোথায়? অন্ধকার নেমে এসেছে, খানিক দূরে দেখেন কুমারী  গিয়ে মিশেছে শোনের বুকে। দুজনে মিলে চলেছে গঙ্গার উদ্দেশে। নর্মদার মতো সাজ পোশাকে কুমারী নদী দাঁড়িয়েছিল বরবেশে শোন আসার পথে। অন্ধকারে না বুঝে শোন গ্রহণ করেছে তারই দেয়া বরমালা। প্রতারিত নর্মদার বিষাদ ক্রোধে পরিণত হয়, ঘৃণাভরে বঙ্গোপসাগরের দিশা পরিবর্তন করে সে পশ্চিম মুখে ধাবিত হয় আরব সাগরের দিকে। আর কাউকে এ জীবনে গ্রহণ সে করেনি, তাই কোন উপনদী নেই, আজও একাকিনী। গঙ্গা শিবের স্ত্রী, সম্পর্কে সৎমা। আবার আশ্রয় দিয়েছে প্রতারক শোন ও কুমারীর জলকে। তাই আজও মেয়ের মন ভেজাতে শ্রাবণ মাসে লিঙ্গরূপী শিবের গা জড়িয়ে, ভূঅভ‍্যন্তরের ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসেন, দেখা করে যান মেয়ের সাথে। বিয়ে তো হলনা। মাঈ কি মণ্ডপ পড়ে রইল তার আয়োজন নিয়ে। কোনো বোল্ডারের গায়ে রং দিয়ে লেখা ভীম কা আটা। ভীম খাবে বলে মাখা হয়েছিল। একসারি বোল্ডারের গায়ে লেখা নাগাড়া অর্থাৎ বিয়ের বাদ‍্য। গোল জলাশয় গুলিকে দেখানো হয় ডালের আর সব্জির কড়া হিসেবে। লম্বাটে পটহোলগুলিকে বলা হয় হাতা, চামচ, খুন্তি।নিজের মনেই হা হা করে হাসি। দারিংবাড়িতে সব প্রাকৃতিক ঘটনা গুলো ই আছে। কিন্তু নেই ব্লকবাস্টার কাহিনীর মিশেল। মাঈ কি মণ্ডপ প্রেম পেরিয়ে বিরহে উত্তীর্ণ হয়। লাভার্স পয়েন্ট নামেই প্রেমের কথা বলে, জানিনা উত্তীর্ণ হবে কিনা।

ছেলেমেয়েরা এক এক করে ফিরছে। এবারে আমি ও দৌড় লাগাই। সূর্য ঢলছে পশ্চিমে। বিদ্যুৎ বাবু কে জিজ্ঞেস করে নিয়েছি, ছুঁয়ে দেখার জন্য আরও পাঁচটা পয়েন্ট আছে।

লাভার্স পয়েন্ট থেকে দু কিলোমিটারের মধ্যেই এমু ব্রিডিং ফার্ম, লাগোয়া নেচার ক‍্যাম্প। সুন্দর সাজানো পার্ক আর থাকার কুটির আছে। এখানে ঢুকতে গিয়ে আবার সালমা পড়ে গেল ঠোক্কর খেয়ে। আমি দেখেছি ফিল্ডের শেষে যখন ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ হয়, তখনই সব দুর্ঘটনা ঘটে। তাই নিজে খুব সতর্ক থাকার চেষ্টা করি।
বাস চলছে, এবার কফি আর গোলমরিচের বাগান। পাইন গাছের সারির ফাঁকে কফি গাছের সারি। আর পাইন গাছের গা জড়িয়ে আকাশে উঠেছে গোল মরিচের লতা। সূর্য আরও ঢলে পড়েছে। এখানে থামলে বাকি তিনটে পয়েন্ট আর ঘোরা হবেনা। সূর্য ডুবে যাবে। তাই বাগানের সামনে দিয়ে বাস চলল খুব ধীরে ধীরে। বাইরে থেকে দেখেই সন্তুষ্ট হতে হল। এবারে দৌড়ে দৌড়ে নেচার পার্ক। নয়নাভিরাম ফুলের মেলা। ভিতরে বাটারফ্লাই পার্ক। কপাল খারাপ এখন একটাও প্রজাপতি নেই। তা হোক, চারিদিকে অসংখ্য ওষধি গাছের মেলা। মাঝে সুশ্রুতর মূর্তি। কুটিয়া কন্ধ উপজাতি মানুষের মডেল সাজানো আছে মিউজিয়ামের মতো। উল্টো দিকে হিলটপ পার্ক। এখানে বাচ্চাদের দোলনা, স্লিপ, ঢেঁকি এইসব সাজানো। একটা উঁচু টাওয়ার আছে পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগের জন্য।

সূর্যদেব পাটে বসেছেন, আমরা পৌঁছে গেছি সানসেট পয়েন্টে। সিমেন্টের গ‍্যালারির মতো করা আছে। সামনে অসংখ্য পর্বত শ্রেণী। সাগরের ঊর্মিমালা যেন স্থবির হয়ে অপেক্ষা করছে কারো নির্দেশের। এ জায়গাটা আমাকে পাঁচমারীর ধূপগড়ের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে। নেচার পার্কের কমলা সূর্য এখন টকটকে লাল। দূরের শ্রেণীগুলি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হচ্ছে। দারিংবাড়ি চলেছে ছায়াবৃত্ত পেরিয়ে রাতের গর্ভে, আবার পরের দিনের ভোর দেখবে বলে। পর্বত চূড়ায় যখন রক্তরাগের শেষ রেশ, তখন আমাদের অবাক করে দিয়ে পিছনে বেজে উঠল মাদল। তাকিয়ে দেখি এক কন্ধ পুরুষের হাতের বোলের তালে তালে তাকে ঘিরে নাচছে একদল কন্ধ নারী। আমাদের ছাত্রীরাও যোগ দিল তাদের সঙ্গে। গোলমরিচের বাগানে আমরা ঢুকতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু এটা বাড়তি পাওনা হল।

দারিংবাড়িতে সন্ধ্যা নেমেছে। আমরা হোটেলে ফিরছি। ঘরে গিয়ে ব‍্যাগ গোছাবো। আগামী কাল দারিংবাড়িকে বিদায় জানাতে হবে। তপ্ত পানি, গোপালপুর হয়ে ফিরে যাব যে যার ঘরে। হয়তো অনেক কিছুই জানা হলনা। যেটুকু জানলাম সেটাও অনেক। অমরকন্টক, পাঁচমারী, উটি এসব বিখ্যাত পর্যটনক্ষেত্রের মতো সম্পদ এখানেও আছে। কিন্তু সাজান গোছান কম। ভারি আটপৌরে আর আন্তরিক। দারিংবাড়িতে আর একবার আসা যেতেই পারে।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল

লকডাউনের জানলা: পর্ব ১

লকডাউনের জানলা মানে আমার জানলা। কোভিড ১৯ এর লকডাউনে বাড়িতে আটকে আছি, আজ দুমাস পেরিয়ে তিন মাসে পড়ল। বাইরে বেরোতে পারছি না বটে, কিন্তু অবাক হয়ে যাচ্ছি, যে আমার বাড়িতে জানলা অনেক বেড়ে গেছে, এতগুলো জানলা আগে কখনও ছিলনা।

হাওড়ার ঘিঞ্জি গলিতে দোতলার ছোট ফ্ল্যাট। এক চিলতে বারান্দা, জানলার এক্সটেনশন। যে দিকে চাই, নজর আটকে বড় বড় বাড়ি। খুব কষ্ট করে ফালি আকাশ দেখা যায়। দুটো বাড়ির ফাঁক দিয়ে দেখি একটু রাস্তার আভাস। ঘরে রোদের মুখ দেখিনা তাই দিনেও বিদ‍্যুতের আলোয় কাজ চালিয়ে নিই। তিনটে ঘরে জানলা সাকুল্যে চারটি। এতদিন এসব নিয়ে মাথা ঘামাইনি, কারণ দরকার হয়নি। সকাল হলেই নাকে মুখে গুঁজে কলেজে ছুটি। বাড়ি ফিরতে সেই সন্ধ‍্যে। ঘরে রোদ হাওয়া ঢুকেছিল কিনা খোঁজ নিইনি কোনোদিন। ছুটি থাকলে রবীন্দ্রভারতীর দূরশিক্ষার ক্লাসের জন্য সোজা সল্টলেক। নইলে কোনো মেলা, প্রদর্শনী, আমন্ত্রণ, একাডেমির নাটক বা পি ভি আরের সিনেমা। বাড়িতে থাকলে কম্পিউটারে লেকচার রেডি, খাতা দেখা আর রোজকার পড়াশোনা। ঘরের কাজ, রান্না এগুলো বেঁচে থাকার উপায়, তাই উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। এসবের মধ্যে বাড়িটা ছিল, বারান্দা আর জানলাগুলোও ছিল। আলাদা করে চোখে পড়তনা। কারণ বাড়িটা ছিল কেবল ঘুমোনোর জায়গা‌।

এখন আমি রোজ জানলায় আর বারান্দায় যাই। কিছুক্ষণ বসি অথবা দাঁড়িয়ে থাকি স্থির হয়ে, বলা ভালো সুস্থির হয়ে। ছোটবেলার গরমের ছুটির কথা মনে আসে। সেই দিনগুলোর পরে আমার জীবন কখনো এমন সুস্থির ছিলনা।

পিছনের বাড়িটার পাঁচিলের গায়ে, ছায়া পেয়ে অনেকগুলো ফার্ন গজিয়ে উঠেছে। ওদের গায়ে গায়ে ওটা তো পুঁইশাক মনে হয়। অনেক ছোটবেলায় বসিরহাটের দেশের বাড়িতে পাকা পুঁইমিটুলির চচ্চড়ি দিয়ে ভাত খেতাম। ভাতটা লাল হয়ে যেত। পরে আর কখনো খাইনি। ওদের পেঁপে গাছটায় কত পেঁপে ধরেছে রে বাবা। সব কি ওরাই খাবে? তেমন আলাপ নেই। থাকলে দুটো চাইতাম। পাশে উঁচু ফ্ল্যাট বাড়িটার সারা গায়ে দেওয়ালের বিভিন্ন জায়গায় গাছ গজিয়ে উঠেছে। বাড়িটাতো বেশি দিন হয়নি! সুন্দর রং, মলিনতার ছাপ পড়েনি। এরা কি কিছু দেখেওনা। আচ্ছা আমাদের বিল্ডিং টায়ও এমন হয়েছে নাকি? আমার সামনেই ওদের দেওয়ালে পাইপের বাঁকে ঝাঁপড়া অশ্বথ্থের চারা।ওখানে বসে খুঁটে খুঁটে কিছু খাচ্ছে একটা সাদা বক। মাঝে মাঝে উড়ে যাচ্ছে, আবার বসছে। আশ্চর্য! আমি বাড়ি বসে এ তল্লাটে বক কখনো দেখিনি।

দুটো বিড়ালছানা ডানদিকের বাড়ির পিছনে খেলা করছে। একটা লালে সাদায় মেশানো, অন্যটা ঝিম কালো। ওদের মা এবাড়ি ওবাড়ির পাঁচিলে পাঁচিলে, পাম্পঘরের নিচু ছাদে ঘোরে। বাড়ি বাড়ি অভিযান ও চালায়। বারকতক আমাদের বাড়িও এসেছিল‌। পাখি আছে তো, সাবধান থাকতে হয়। সপ্তা দুয়েক আগে সারা রাত ম‍্যাও ম‍্যাও কান্না। জানলা দিয়ে ঝুঁকে দেখি, ছানা হয়েছে, তাদের নিয়ে বসে আছে। কিন্তু হল টা কী? আজ তো ঝড় জল কিছু নেই। সকালে জানলাম তিনটে ছানার একটা ছানা মরে গিয়েছে। আহা রে, ঐজন‍্যই কাঁদছিল।

লকডাউনের মধ্যে অনেকেই চলে গেলেন, চুনী গোস্বামী, ইরফান খান, ঋষি কাপুর, আমার নিজের মেসোমশায়। ফোন আর টিভির জানলা দিয়ে দেখলাম, বেরোতে পারলাম না। শুধু ঘরের জানলার সামনে তাকিয়ে রইলাম বাইরে। একচিলতে আকাশে জ্বলজ্বলে অনেক তারা। রাস্তায় গাড়ি নেই, তাই ধোঁয়া ধুলোর পরত গেছে মুছে। এত পরিষ্কার আকাশে কি প্রিয় মানুষদের খুঁজে পাওয়া যাবেনা?

বুদ্ধপূর্ণিমার রাতে, আমার শোবার ঘরের জানলা দিয়ে রোদ্দুর পড়ল ঘরে। এল কোথা থেকে? গ্রিলে নাক ঠেকিয়ে শুয়ে পড়ে দেখি একচিলতে আকাশে হাজার ওয়াটের এল.ই.ডি বাতি হয়ে ঝলমল করছে পূর্ণিমার চাঁদ। হতবাক হয়ে যাই। জীবনে একবার শ্বশুর বাড়ির গ্রামে এক লক্ষ্মী পুজোর রাতে পথ হেঁটেছিলাম এমনই জোছনা মাখা রোদ্দুরে। সে রোদ্দুর শহরের ঘিঞ্জি গলিতে আমার বাড়িতে!!! বিশ্বাস হতে চায়না।

আজকাল অবিশ্বাস্য অনেক কিছুই ঘটছে। চড়ুই-এর ডাকে ভোর থেকে কান ঝালাপালা। বেরোনোর তাড়া নেই, একটু বেলা করে যে ঘুমিয়ে থাকবো তার জো টি নেই। খেয়াল করে শুনি, দুরকম আওয়াজ আসছে। একটা সাধারণ, আর একটা আরও মিহি একটানা চুঁ চুঁ। একটার পর অন‍্যটা। ঠিক যেন সংলাপ। জানলায় পর্দার আড়ালে আড়ালে তদন্ত চালাই। ব‍্যাপার বুঝে তো আমি থ। মেয়ের আবদারে, কলেজের সামনে শচীনদার কাঠের দোকান থেকে বানিয়ে এনেছিলাম পাখির বাসা। ঘটা করে জানলায় বাঁধা হয়েছিল। এতদিন লাভ কিছু হয়নি। লকডাউনে সেটি বারান্দার মাথায় বাঁধা হল। কর্তা সময় কাটাতে টবে শসার চাষ করছিলেন। সবুজ নরম ডাল, আর বড় বড় পাতা আমাদের বারান্দার গ্রিল ছেয়ে ফেলেছে। কাঠের বাক্সেও এখন পাতার আড়াল। ভরসা পেয়ে এতদিনে চড়ুই দম্পতি সেখানে সংসার পেতেছে। সেই সংসারেই আজ নতুন অতিথি। কাঠের বাক্সটা এতদিন পড়ে আছে। সেখানে নতুন প্রাণ আসবে, আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। বারান্দা থেকে শসা পেড়ে, রায়তা করে, স‍্যালাড করে, লম্বা কেটে নুন মরিচ মাখিয়ে কচমচিয়ে খাবো, একথাই কি ভেবেছি কোনোদিন? চড়ুইছানাদের কলরব আর তদের বাবা মায়ের ব‍্যস্ততা, ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ আসা যাওয়া দেখে কলেজের হৈচৈ এর কথা মনে পড়ে। ক্লাসের সময়ে, কাজের সময়ে হট্টগোলে কত বিরক্ত হয়েছি, আজ সেই হট্টমেলায় মন টানে। ছেলেমেয়েদের সাথে অনলাইনে দেখা হয়। পুরোনো ল‍্যাপটপটা জাদুবলে আজ জানলা হয়ে উঠেছে।

সপ্তা তিনেক গেল বড় হয়ে চড়ুই ছানাদের ওড়া শিখতে। ওরা যেদিন বাসা ফাঁকা করে উড়ে গেল, তার দুদিন পরেই এল, ভয়ানক উম্পুন ঝড়। ফ্ল‍্যাটের সব দরজা জানলা বন্ধ করেও করা যাচ্ছে না। ঝড়ের ধাক্কায় খুলে যাচ্ছে। হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখা যাচ্ছে না। জলের ঝাপটার তোড়ে বাড়ি ভেসে যাচ্ছে। চার পাশের বাড়ির, দোকানের, গ‍্যারেজের অ্যাসবেস্টস বা টিনের চালা ঘুড়ির মতো উড়ে যাচ্ছে। জানলার কাচ চুরচুর হয়ে ভেঙে পড়ছে। গাছ উল্টে পড়ছে। আমার ঊনপঞ্চাশ বছরের জীবনে নানা জায়গায় অনেক রকম ঝড়, বন‍্যা দেখেছি। এমন ভয়াবহ দেখিনি। কোনোক্রমে দীঘায় শ্বশুর বাড়ি থেকে সব তছনছ আর ধ্বংসের খবর এসেছে। কর্তার চোখে জল। ঝড়ের দাপটে আদরের শসা গাছটা আর বেঁচে নেই। 

আজ এখন টিভি, ফোন, ইন্টারনেট সব জানলা বন্ধ। তবু নিজেকে বলি সব তালারই চাবি থাকে, রাতের পরে দিন থাকে, তাই চাষা মরলেও আশা রাখে। সেই আশাতে ভর করে, মনের জানলা আমি হাট করে খুলে রেখেছি।

কলমে ড.শারদা মণ্ডল
২১ শে মে, ২০২০






মৌলিন্নং

টুংটাং মিষ্টি ঘন্টার মতো বেজে উঠল নামটা – মৌলিন্নং। এশিয়ার পরিচ্ছন্নতম গ্রাম। গুয়াহাটি থেকে শিলং পেরিয়ে পাড়ি দিতে হবে আরও কিছুটা, মোটমাট প্রায় ছ সাত ঘন্টার পথ‌। মেঘালয়ের পূর্ব খাসি পাহাড়ের কোলে নির্জন নিরিবিলি এলাকা। ওখানেই এবারে আমাদের স্নাতকোত্তর ছাত্রছাত্রীদের ফিল্ড সার্ভে হবে। আমার সহকর্মিনী বল্লরীদির নেতৃত্বে আমি, মধুসূদন ও গার্গী প্রস্তুতি শুরু করলাম।

রেলগাড়ি ঝমাঝম

নির্ধারিত দিনে হাওড়া স্টেশন থেকে বিকেল বিকেল রেলগাড়িতে চেপে বসলাম। সরাইঘাট এক্সপ্রেস, ছাড়ল বিকেল তিনটে পঞ্চাশে। বেশিরভাগ সময়েই আমাদের গন্তব্য থাকে হয় ডুয়ার্স, নতুবা উত্তর বঙ্গের পাহাড়, কিংবা সিকিম। তাই একরাত ট্রেনে কাটিয়ে সকাল হলেই নিউ জলপাইগুড়িতে নেমে পড়ি। গত বাইশ বছরে এতবার এসেছি, যে মুখস্থ হয়ে গেছে। এবারে কিন্তু যাত্রা অন‍্যরকম। ভোরে ট্রেন থেকে নামার চাপ নেই। আধোঘুমের মধ্যেই রাত দুপুরে মানে এই দুটো নাগাদ ট্রেন নিউ জলপাইগুড়ি ছাড়িয়ে পুবদিকে বাঁক নিল। আমি আগে কখনো আসাম দেখিনি। তাই মনে বেশ উত্তেজনা। ভোরবেলা বার্থে শুয়ে শুয়েই এক ছাত্রীর গলা শুনতে পেলাম। বল্লরীদি জিজ্ঞেস করছিল কোথায় এল গো। উত্তর শুনলাম বঙ্গাইগাঁও ম‍্যাডাম। শুনেই লাফ দিয়ে উঠলাম। আসাম এসে গেছে তাহলে। সেই কোন শৈশবে, প্রাথমিক বিভাগে পড়ি যখন, বাবা এনে দিয়েছিল, হযবরল। সেখানে বিচার সভায় আসাম থেকে একজন এসে পড়েছিল, সেই প্রথম আসাম নাম টা জানা। মা, বোন আর মাসিদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম- চামেলী মেমসাব। মনে সুরের রেশ ভেসে আসে …….. আসাম দেশের মেয়ে আমি চা-মে-লী…..যেন গত জন্মের কথা।

দিনটা নয়ই ফেব্রুয়ারি। মাঠে ভোরের শিশির, আর রেলকামরায় জানলার বন্ধ কাচে কুয়াশা, দুটোই এখনো জমাট। জানলা খুলতেই ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝলক লাগে মুখে চোখে। পশমের চাদরের আড়ালে নিজেকে বাঁচিয়ে কুয়াশা ভেদ করে দূরে দেখার চেষ্টা করি। ভোরের আলোয় চোখ জুড়িয়ে যায়। বাংলার মতোই শ‍্যামল জমি। শুধু তফাৎ হল, এ সবুজ ব্রহ্মপুত্রের দান, আমাদের মতো গঙ্গা-ভাগিরথীর নয়। আমি এখনো ব্রহ্মপুত্র দেখিনি। প্রথম দর্শনের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে আছি। মধ‍্যে মধ‍্যে চা বাগান। হঠাৎ কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে যায়।  দূরে পাহাড়ের শ্রেণী, ধোঁয়া ধোঁয়া। বার বার ঠাহর করে দেখি, ঠিক পর্বত শ্রেণীই বটে। কী পাহাড় ওটা? চলেছি পুবদিকে। ডানদিকের জানলায় অনেক দূরে পাহাড়। সত‍্যজিতের রয়েল বেঙ্গল রহস‍্য মনে পড়ে। ‘দিক পাও ঠিক ঠিক জবাবে’। জবাব হল উত্তর। উত্তরে পাহাড়।  ভূগোলের জ্ঞান বলে ও ভূটান পাহাড় না হয়ে যায় না। তার মানে ভোর ভোর হিমালয় দর্শন।দেবতাত্মা হিমালয়কে প্রণাম করে দিন শুরু করি। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলে। সকালের রোদ বেরিয়েছে। রেলকামরার জানলাগুলো এখন সব খোলা। এবারে বাঁদিকের জানলায় পাহাড়। একটানা শ্রেণী নয়। ব‍্যবচ্ছিন্ন। তবে খুব কাছে। গার্গী চলভাষে গুগল ম‍্যাপ খোলে। আমরা সবাই ঝুঁকে পড়ে দেখি। আচ্ছা এটা তবে গারো পাহাড়।
ম‍্যাপে দেখি, ব্রহ্মপুত্র আছে, শুধু একটু দূরে। তাই ট্রেন থেকে দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পরে রেললাইন আর নদীর দেখা হবে। তখনই আমাদের আশা পূর্ণ হবে।

আশা পূর্ণ হল, অনুভব করলাম ব্রহ্মপুত্রের বিশালতা। এরপরে দেখলাম দিপোর বিল। নদীর গতিপথে ছেড়ে যাওয়া বিশাল হ্রদ। গুয়াহাটির আগে কামাখ্যা জংশন থেকে কামাখ‍্যা মন্দিরের চূড়া দেখলাম। গুয়াহাটিতে নামলাম সকাল এগারোটা নাগাদ।

ছিল রেলগাড়ি হয়ে গেল দিব‍্য প‍্যাঁকপ‍্যাঁকে হর্ন দেওয়া বাস

একরাত গুয়াহাটিতে কাটিয়ে, পরদিন প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম মৌলিন্নংয়ের উদ্দেশে। এবার যাত্রা সড়কপথে, ডিলাক্স বাসে।

আসাম পেরিয়ে চলেছি মেঘালয়ের পথে। এক ভূতাত্ত্বিক যুগে মেঘালয় মালভূমি স্রষ্টার অধৈর্য মাথা নাড়ায়, ছোটোনাগপুর মালভূমি থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে তার বিবর্তন হয়েছে ছোটোনাগপুর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জলবায়ু ক্ষেত্রে। তাই আজ তার স্বাভাবিক উদ্ভিদ ও বাস্তুতন্ত্র উৎস থেকে একেবারেই আলাদা। এসব কথা বইএ তো কতবারই পড়েছি। কিন্তু বই এ পড়া আর সচক্ষে দেখে অনুভব করা, দুটো তো আর এক নয়। কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ি পথে বাস চলেছে, তার বাঁদিকে খাদ। আমি বসে আছি ডানদিকের জানলায়। আমার দিকে পাহাড়ি ঢালে কখনো পাইনের বন, কখনো পাহাড়ি ফার্নের পুরু আচ্ছাদন। পূর্ব হিমালয় দেখা অভ‍্যস্ত চোখে ধাঁধা লাগে, বুঝি হিমালয়েই আছি। কিন্তু বাঁদিকে তাকালে ধন্ধ কেটে যায়, কারণ খাদের উপত‍্যকা পেরিয়ে ওপাশের শৈলশিরায় চোখ পড়ে। তা হিমালয়ের মতো শঙ্কুসদৃশ ভঙ্গিল নয়, বরঞ্চ গিরি শীর্ষগুলি সমতল। অর্থাৎ এই পাহাড়ি অঞ্চল কোনো ভঙ্গিল পর্বতের অংশ নয়, বরং ব‍্যবচ্ছিন্ন মালভূমির খণ্ড। কিন্তু কি অদ্ভুত।
আগ্নেয় পাথরের মালভূমি গায়ে সবুজ মেখলা পরে চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়। বেরিয়েছি সকাল আটটায়, প্রাতরাশ করে। একটানা যাত্রায় একঘেয়েমি আসে। ঘাড়, কোমর ব‍্যথা করে। কিন্তু প্রকৃতির অসামান্য রূপ সব বেদনাকে ভুলিয়ে দেয়।

বেলা বারোটা নাগাদ বাস থামল পথের পাশে এক চটির সামনে। সেখানেই দুপুরের খাওয়া হবে। আমাদের যাত্রার যিনি পেশাদার কর্ণধার, অর্থাৎ বিদ্যুৎ বাবু, ভোরে খাবার তৈরি করিয়েই বাসে উঠেছেন। মানে খাবার আমাদের সঙ্গেই আছে। আমরা বাস থেকে একে একে সকলে নেমে হাত পা ছাড়িয়ে নিয়ে থিতু হতে না হতে, টেবিলে থালা, জল, নুন, লেবু রেডি। শুধু আমাদের বসার অপেক্ষা। দেরি করা যাবেনা। বিকেলের মধ্যে পৌঁছতে হবে। আবহাওয়া খামখেয়ালি। এখন পরিষ্কার, কিন্তু যখন তখন ঘন কুয়াশা নামে। চারিপাশ দেখা যায়না। চটপট খাওয়া সেরে নিলাম। চটির বাইরে কল, বেসিন। লাগোয়া বাড়িতে শৌচাগার। এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন। মেঘালয়ের যতটুকু ঘুরেছি, সব জায়গায় কিছুদূর অন্তর অন্তর সরকারি শৌচাগার, কোথাও স্হায়ী, কোথাও অস্থায়ী। প্রতিটি ঝকঝকে পরিষ্কার, একেবারে নতুনের মতো। বোঝাই যায়না যে এই পরিষেবা হাজার হাজার পর্যটকের চাপ বহন করে। প্রতিটি কমপ্লেক্সে ভারতীয়, ইংলিশ দুই ধরণ মিলিয়ে একাধিক ব‍্যবস্থা। পর্যাপ্ত জল। কল এবং কমোড শাওয়ার গুলি ও চকচক করছে। কয়েকটি জায়গায় টিস‍্যু পেপারও পেয়েছি। এখানে আসার একসপ্তাহ আগে আমি উড়িষ্যার নবীন পর্যটনক্ষেত্র দারিংবাড়ি থেকে ফিরেছি। সেখানে এই পরিষেবা এতটাই অপরিচ্ছন্ন, যে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়বে। আর দারিংবাড়িকে আলাদা করে দোষ দিয়ে লাভ তো নেই, পুরো ভারতবর্ষের ছবিটা এক। সেখানে মেঘালয় কেমন করে, কোন মন্ত্রে এই অসাধ‍্যসাধন করল, ভাবলে অবাক লাগে। Cleanliness is next to Godliness. খাসি উপজাতির মানুষেরা এই আদর্শকে সত‍্যি সত্যি বাস্তবে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন।

যাকগে, আমরা ছাব্বিশ জন প্রস্তুত হয়ে বাসে উঠতে উঠতে দেখি, আমাদের পর্যটন ব‍্যবস্থাপক কর্মীরা এঁটো বাসন মেজে ধুয়ে প‍্যাক করে ফেলেছেন। বহুবছর ধরেই দেখি এঁরা যন্ত্রের মতো কাজ করে আমাদের যাত্রা, সার্ভে সব কিছু সহজ করে দেন।

বাস এগিয়ে চলে বিশাল এক হ্রদের পাশ দিয়ে ঘুরে ঘুরে। নাম বড়াপানি বা উমিয়াম। বাস কিছুক্ষণ থেমে আমাদের নেমে ভালো করে দেখার সুযোগ করে দেয়। ইংরেজি ইউ আকৃতির মতো এক বিশাল হ্রদ। আমরা দেখছি পাহাড়ের অনেক উঁচু থেকে। নিচু থেকে কাছে গেলে নৌকা বিহারেরও সুযোগ আছে দেখলাম। ইউ এর মাঝখানে দ্বীপের মতো উঁচু হয়ে আছে। দুপাশের পাহাড় আর মাঝখানের দ্বীপ বড় ঘন সবুজ। মনে হয় খালি তাকিয়ে থাকি, মুখে কথা সরেনা। বাস এগিয়ে চলে, কিছু পরে আবার দাঁড়ায়। এবার সোহরা। সবুজ উপত্যকায় ভিউ পয়েন্ট। পাহাড়ী রাস্তার ধারে রেলিং। সেদিকে ঝুঁকে ঝুঁকে অনেকে কিছু দেখছে। আমরাও দেখতে এগিয়ে গেলাম। নদী আছে অনেক নিচে। খাসি ভাষায় নাম মাওডক ডিমপেপ। উপর থেকে দেখছি ইংরেজি ভি আকৃতির উপত‍্যকা, ঘন বনের আড়ালে পাহাড়ের গা দেখা যায়না। হঠাৎ মনে হল, কিছু সরে গেল। ভালো করে ঠাহর করে দেখি ব‍্যাপারটা কী? সবুজে সবুজে চোখ সয়ে এলে, মনে হল পাহাড়ের এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত কাছি দড়ি বাঁধা, কিন্তু কেন? কারণ খুঁজতে এগিয়ে গিয়ে আবিষ্কার করি পায়ের কাছে সিঁড়ি। ঢাল বরাবর খানিকটা নামতেই বিষয়টা পরিষ্কার হল। পর্যটকদের জন্য নতুন রকম অ্যাডভেঞ্চার – জিপ লাইনিং। একটা চেয়ারে নিজেকে বেঁধে নিয়ে, দড়ি ধরে হুস করে পাহাড়ের ওপারে যাওয়া, আবার দড়ি ধরে নিমেষে এপারে চলে আসা। কাঞ্চন মূল্য ধরে দিলে বাধাহীন উড়ানের অভিজ্ঞতা। আমাদের হাত পা নিশপিশ করছিল। সঙ্গে ছাত্রছাত্রীরা আছে। অ্যাডভেঞ্চারে গা ভাসাতে পারিনা। কিছুক্ষণ দৃষ্টিসুখ আর মন-উড়ানের পর যখন বাসে উঠছি, মধুসূদন বলে উঠল, শারদাদি, আমি বাড়ি থেকে আবার এসে জিপ লাইনিং করব, বুঝলেন। আমি হাসি, আমারও তো মনের কথা একই। ওর বয়স অল্প, তাই বলে দিয়েছে। কিন্তু আবার এসে সত্যিই কি এ অভিজ্ঞতা নিতে পারব? শিশু, বয়স্ক, বিশেষ করে হৃদরোগীর জন্য এই মজা নিষেধ।

লাভ এ্যাট ফার্স্ট সাইট

মৌলিন্নং পৌঁছলাম বিকেলে, ঘড়িতে সময় চারটে সাড়ে চারটে। প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হলাম। দেখলাম বাড়ির টিনের চালে, উঠোনের ফুলগাছ, আর লতাপাতায়, ছোট ছোট জানলার কাচে, পথের নুড়িতে বিকেলের ন‍রম রোদ খেলা করছে। যতক্ষণ আলো আছে ছেলেমেয়েদের সার্ভে করতে পাঠানো হল। আমরা চারজনও তদারক করতে বেরিয়ে পড়লাম। গ্রামের মাঝখান দিয়ে সরু পাকা রাস্তা। আশপাশের পাথুরে সুঁড়ি পথগুলির মাঝে মাঝে ঘাস আর গোল গোল নুড়ি। কাছে কোন নদী আছে। তার তিরতিরে একটা ঝিমধরা একটানা মৃদু আওয়াজ আর পাখির ডাক – এছাড়া পার্থিব কোনো শব্দ পাচ্ছিলাম না। মনটা খুব শান্ত লাগছিল। গোধূলি আলোয় প্রথম দর্শনেই মৌলিন্নংকে মন দিয়ে ফেললাম। আমি কি থাকার জন্য মনে মনে এমন একটা জায়গাই খুঁজছিলাম? সামনে একটা রেলিং ঘেরা ফাঁকা জায়গা। তার বাঁ দিকে সরু বনপথ দিয়ে এগিয়ে গেলে একটি বিদ্যালয়, তার সামনে বড় মাঠ। নতুন ভবন তৈরি হচ্ছে। আর ডানদিকে ছায়ায় ঢাকা সমাধিস্থল। এ গ্রামের একশ শতাংশ মানুষই খৃষ্টধর্মাবলম্বী। সব বাড়িতেই ফুলের সমারোহ। পথের ধারে ধারে বসার মতো জায়গা আছে। বড় পাথরের ওপরেও বসা যায় অবশ্য। এখানে কোন হোটেল নেই। গ্রামের মানুষেরা নিজেদের বাড়িতেই অতিথি পর্যটককে আপ‍্যায়ণ করেন, আধুনিক ভাষায় যাকে বলে হোম স্টে। অতিথিদের জন্য বাড়ি বাড়ি আলাদা রান্না হয়না। দুটি রেস্তোরাঁ আছে। সেখান থেকে খাবার সরবরাহ হয়। আমরা অবশ্য স্থানীয় খাবারের ওপরে নির্ভরশীল নই। কারণ বিদ্যুৎ বাবু রান্নার সরঞ্জাম ও রাঁধুনি সঙ্গে এনেছেন। শুধু রোজকার কাঁচা সব্জি স্থানীয় বাজার থেকে নেবেন।
গ্রামে ঢুকে একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করেছি, চারিদিকে এতো সবুজের সমারোহ অথচ, একটা ঝরা পাতাও পথে কোথাও পড়ে নেই। আর বেতের তিন কোণা ঝুড়ি প্রায় দশ মিটার অন্তর অন্তর, কোথাও গাছে, কোথাও বেড়ার গায়ে, কাঁধ সমান উচ্চতায় বাঁধা রয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেকটা চলে এসেছি আমরা। প্রকৃতির এই বাঁধ ভাঙা উদযাপন উপভোগ করতে করতে বেখেয়াল হয়ে গিয়েছিলাম। অন্ধকার নামছে, তাড়াতাড়ি ফিরতে শুরু করলাম। ছেলেমেয়েদের কাজ কতদূর হল, খোঁজ নিতে হবে। ফিরতি পথে দেখি, জায়গায় জায়গায় এক এক জন মানুষ, নারী বা পুরুষ ঝাঁটা দিয়ে বাড়ির সামনের পথটুকু পরিষ্কার করছেন, ধুলোবালি, ঝরাপাতা জড়ো করে, তিন কোণা বেতের ঝুড়িতে রাখছেন। পথে পাতা না পড়ে থাকা, আর এত বেতের ঝুড়ি কেন, দুটো রহস্যই স্পষ্ট হল। ঝাঁটাগুলো ফুলঝাড়ুর মতো, কিন্তু আমাদের চেনা ফুলঝাড়ু নয়, একটু অন্যরকম ঘাসের তৈরি।

আমাদের অস্থায়ী ঘরে ফিরে এলাম। এখানে প্রতিটি বাড়িতে একটা বা দুটো ঘর পর্যটকদের জন্য রাখা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাড়িগুলির মোট আটটি ঘরে আমরা সবাই ভাগ করে রয়েছি। আমরা সবসময় একটা হোটেলে ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকি। সকলে চোখের সামনে থাকে। এখানে খুব দূরে না হলেও, একটা বাড়ি থেকে আরেকটায় যেতে উঁচু নিচু পথে কিছুটা সময় তো লাগবেই। মনে নানারকম শঙ্কা ছিল। কিন্তু স্থানীয় মানুষেরাই অভয় দিয়ে সে উদ্বেগ দূর করে দিলেন। এখানকার অধিবাসীদের অপরাধ প্রবণতা কিছু নেই।  সমস্যা পর্যটকদের নিয়ে। সেজন্য পর্যটকদের এখানে কঠোর অনুশাসনে রাখা হয়। এই গ্রামে বসে কোনো মাদক গ্রহণ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। রাত দশটার পরে ঘরের বাইরেও তাদের বেরোতে দেওয়া হয়না। যে বাড়িতে কোনো পর্যটক রয়েছেন, তাঁর যে কোনো ভুল আচরণের দায়, সম্পূর্ণ ভাবে সেই পরিবারের। পরিবারের লোকেরা বিফল হলে পঞ্চায়েতের দ্বারস্থ হয়। পঞ্চায়েত তৎক্ষণাৎ কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তাই ছেলেমেয়েরা যে বাড়িতেই থাকুক সে বাড়ির গৃহকর্ত্রীর নজরে থাকবে। এখানে সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে, ঘরের দাওয়ায় বসে গল্প করছিলাম। আজ কি পূর্ণিমা? ফিল্ডে এলে বার, তারিখ, তিথি কিছু মনে থাকেনা। চলভাষে বাংলা ক্যালেন্ডার খুলে দেখি গতকাল ছিল মাঘী পূর্ণিমা। আকাশে গোল চাঁদ। বাড়িগুলোর কাছাকাছি সৌরব‍্যাটারির মৃদু আলো। এছাড়া চারিপাশ জোছনায় ভেসে যাচ্ছে।

সন্ধ্যে ছটা সাড়ে ছটায় হঠাৎ চোখে লাগলো বেমানান সাদা আলো। চোখ ফেরাতে দেখলাম কাছেই মানুষের জটলা। সবাই যেন ব‍্যস্ত। খবর পেলাম দুঘন্টার হাট বসেছে মঙ্গলবারে, মেঘালয়ের মৌলিন্নংয়ে। তাড়াতাড়ি চাদরটা গায়ে জড়িয়ে ছুট লাগালাম। গিয়ে দেখি উচ্ছে, বেগুন পটল মুলো সবাই আছেন বিকিকিনিতে। বেতের বোনা ধামা কুলো নেই, তবে তিনকোণা ঝুড়ি আছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের হল, বড় বড় হাঁড়িতে খলবলে জ‍্যান্ত মাছ। বড় পোনা, চারা মাছ, তেলাপিয়া, চিংড়ি এসব চোখে পড়ল। ক্রেতা, বিক্রেতা অধিকাংশ মহিলা। দুপক্ষেই এক দুজন পুরুষ মানুষ আছেন। গৃহকর্ত্রীরা মাছ টিপেটাপে, সব্জি পরখ করে কেনাকাটা করছেন। কিন্তু খাসি পাহাড়ের ভিতরে এত মাছ এল কিভাবে? সবচেয়ে কাছের গঞ্জ গাড়িতে চল্লিশ মিনিট দূরে। শিলং বাসে ঘন্টা তিনেকের পথ। এত টাটকা মাছ, সব্জি সেখান থেকে এসেছে বলে মনে হয়না। ভোজবাজি নাকি? বিদ্যুৎ বাবু তাঁর রান্নাঘরের রসদ যোগাড় করে নিলেন। সত্যিই দুঘন্টার মধ্যে চেঁছেপুঁছে সবকিছু বিক্রি হয়ে গেল। আলো সরে গেল। সবকিছু আগের মতো হয়ে গেল। হাটের চিহ্নমাত্র রইলনা। কিন্তু প্রশ্নের উত্তরটা? একটু জিজ্ঞাসাবাদ করে যে উত্তর পেলাম, তা ভোজবাজির থেকে কোনো অংশে কম নয়। মেঘালয়ের এই অংশটি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী। খাসি পাহাড়ের পায়ে চলা অলিগলি দিয়ে বাংলাদেশ মাত্র আধঘণ্টা কি বড়জোর চল্লিশ মিনিটের পথ। গাড়িতে আট ঘন্টা দূরের আসামের সমভূমি থেকে বাংলাদেশের নরম মাটি এ এলাকার অনেক বেশি আপন।  আবহমান কাল ধরে খাসি পাহাড়ের মানুষ প্রতিকূল পাহাড় আর অনুকূল সমভূমির যে প্রাকৃতিক  মিথোজীবিতায় টিঁকে রয়েছে, ধর্ম, রাজনীতি, দেশভাগ সেই জীবনচর্যাকে বন্ধ করতে পারেনি। কাল আমরা বাংলাদেশের সব্জি দিয়ে ভাত খাব। মনটা খুশি হয়ে গেল। সত্যি সত্যিই রাত দশটার পরে সব শুনশান। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা।

মোরগের ডাকে সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেল। প্রাতরাশ করেই বেরিয়ে পড়লাম। এবার নানারকম সার্ভের কাজ। ঠিক হল গ্রামের মানুষ কাজে বেরোনোর আগেই ঘরে ঘরে প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক সমীক্ষা সেরে নেওয়া হবে। তাতে গ্রামটাও চেনা হয়ে যাবে। ঘন্টা তিনেকের সমীক্ষার পর যখন যন্ত্রপাতি নিয়ে ভূপ্রকৃতি জরিপের কাজ শুরু হবে, তখন কোথায় কোনটা হবে, সেই স্থান নির্বাচন করা সহজ হবে। এমন ঘুরতে ঘুরতে চলে এলাম মাঝারি আকৃতির সমতল মাঠে। মাঠের মখমল সবুজ ঘাস অনেক যত্নে বোনা। চারিপাশে বাঁশের বেড়ায় ফুলের কেয়ারি। এগোতেই সামনে দেখি একটি ছোট গীর্জা। পাহাড় আর নীল আকাশের গায়ে যেন আঁকা ছবি। কিন্তু তালা বন্ধ। সন্ধ্যা ছটায় খোলে। মনে পড়ল গতকাল হাটে যাওয়ার আগে একটা মিষ্টি ঘন্টার আওয়াজ ভেসে এসেছিল। আগের দিন দুটি রেস্তোরাঁ দেখেছিলাম। আজ আবিষ্কার করলাম একটি চা জলখাবারের ঝুপড়ি দোকান। ছেলেমেয়েরা কাজে ব‍্যস্ত। Household survey, road morphology, tourist survey, water, soil sample collection, সব কিছুর জন্য ওদের দলে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা শিক্ষক শিক্ষিকারা চা খাওয়ার ছলে দোকানের ভদ্রমহিলার সঙ্গে আলাপ জমাই। এখানে হিন্দি চলেনা। বাংলা শব্দ এঁরা কিছুটা বোঝেন। কিন্তু সুবিধেটা অন্য জায়গায়। এখানে ছোট্ট বাচ্ছা থেকে বুড়ো সবাই ঝরঝরে ইংরেজিতে কথা বলে। গতকাল এসে খুব অবাক হয়েছিলাম, এখন সয়ে গেছে। দোকানে চায়ের সঙ্গে টা হিসেবে পাতায় মোড়া একরকম লম্বা কী যেন পাওয়া যাচ্ছে। একটা কিনে ভাগ করে খেলাম। মিষ্টি মিষ্টি চালের কেক। পাটিসাপটার মতো দেখতে, কিন্তু সলিড, কোনো পুর ভরা নেই। বাঁশের ছায়ায় এই দোকান টিতে বসে কত কথা উথলে ওঠে। আহাএখানেই যদি অলস বেলাটি কাটানো যেত। কিন্তু হায় কর্তব্য ডাক দেয়। সাধাসিধে বয়স্কা পসারিণীকে হাসিমুখে বিদায় জানাই। আবার শুরু হয় চলা। পথে চলতে চলতে খুঁজে পাই সেই নদী। কাল বিকেলে যার নুড়ি পাথরের নূপুরের একটানা ঝিমধরা শব্দ কানে ভেসে এসেছিল। বেশি চওড়া নয়, কিন্তু গভীর। নদীর ওপরে একটি লোহার সেতু। পায়ে হেঁটে পার হওয়ার মতো, গাড়ি যাবেনা। এপার থেকে সেতু পর্যন্ত নামতে, আবার ওপারে উঠতে প্রায় একশ সিঁড়ি। নদীর বুকেও রয়েছে টেরাস বা ধাপ। ঠিক সেতুর নিচের ধাপটি অনেকটা গভীর। এখন শুষ্ক সময়ে দু তিনটি সরু ধারায় জল আসছে। স্বচ্ছ জল, গতি কম নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতযুক্ত অঞ্চল মৌসিনরাম আর চেরাপুঞ্জি এখান থেকে কয়েক ঘন্টার পথ। এখানেও বৃষ্টি কম হয়না, সেটা এই ছোট নদীর গভীরতা আর দুপাশে সিঁড়ির সংখ্যা দেখলেই মালুম হয়। চোখে পড়ে নদীর ঢালে একটা উচ্চতায় সরল রেখা বরাবর পাথরের রং সামান‍্য হলেও আলাদা। হুম, বোঝা গেল। সচরাচর ঐ পর্যন্ত জল ওঠে। তাই ভেজা পাথরের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। স্থির হল এই নদী উপত‍্যকাতেই যন্ত্রপাতি নিয়ে জরিপ কার্য সেরে নেওয়া হবে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ছেলেমেয়েরা কাজে লেগে পড়ল। গুয়াহাটি থেকে সাত আট ঘন্টার পথ উজিয়ে যখন আসছিলাম, তখন একটা জিনিস বারবারই চোখে পড়েছে, সেটা হল পথের ধারে নদীগুলিতে অসংখ্য পট হোল। এ নদীও ব‍্যতিক্রম নয়। নদীর ওপরের ধাপে পট হোলগুলির কাছে যাওয়া যাবে মনে হয়। বড় বড় পাথরে ভর রেখে আমরা কয়েকজন সাবধানে নদীর বুকে নেমে এলাম। ছেলেরা বেশি লাফাতে পারে। একজন ছাত্র এক লাফে প্রথম ধারাটি টপকে মাঝখানের বড় পাথরটাতে পৌঁছলো। এবারে দুদিক থেকে টেপ ধরে সেগুলির মাপ জোক সম্পন্ন হল। স্কেল ডুবিয়ে গভীরতাও পাওয়া গেল। বাইশ বছরের কর্মজীবনে কম জায়গায় ঘুরিনি। কিন্তু বইয়ের পাতায় পড়া নদী গর্ভের ছোট ছোট গর্ত এভাবে এতসংখ্যক আগে কখনো দেখিনি। কানের পাশে এম. কে. বি. -র গলার স্বর ভেসে আসে, “কেমন বলেছিলাম তো?” মনে মনে বলি, হ‍্যাঁ স‍্যার। আমার চওড়া কপাল, তাই তিন জন stalwart geomorphologist এর কাছে পড়ার সুযোগ পেয়েছি। মনোতোষ কুমার বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় (M.K.B), সুভাষ রঞ্জন বসু (S.R.B) আর সুভাষ চন্দ্র মুখোপাধ্যায় (S.C.M). আমার যত বয়স বাড়ছে, তত যেন অতীতমুখী হয়ে পড়ছি। এখন ফিল্ডে এলে স‍্যারেরা যেন সঙ্গে সঙ্গে চলেন। বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের ক্লাস মনে পড়ে যায়। এম. কে. বি বলেছিলেন, আর্দ্র উত্তর পূর্ব ভারতে চুনাপাথর সবচেয়ে নরম শিলা, কারণ তা জলে দ্রবীভূত হয়। কোনো শিলাস্তরের কোথাও চুনাপাথর থাকলে সে অঞ্চলটা ফাঁকা হয়ে যায়। বাকি পাথরটুকু পড়ে থাকে, আবার উত্তর আমেরিকার মরুভূমিতে জল নেই, তাই ওখানে ওটাই সবচেয়ে শক্ত শিলা। সূর্যের অসহ‍্য তাপ সয়ে নিয়ে চুনাপাথরের গঠনগুলি রয়ে গেছে, বাকি পাথর ক্ষয়ে গেছে। মৌলিন্নং এর কাছে চেরাপুঞ্জিতে বড় বড় চুনাপাথরের গুহা আছে। এখানেও থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে কি সেজন্যই এত পট হোল চারিদিকে? বেলা আড়াইটে বাজে। রোদ্দুর ঝাঁ ঝাঁ করছে। আমাদের ভীষণ খিদে পেয়ে গেছে। কাজও শেষ। ফিরতে গিয়েও এক জায়গায় চোখ আটকে গেল। ঠিক ব্রিজের তলায় নদী যেখানে অনেক নীচে ঝাঁপ দিয়েছে, সেই মুখে সিমেন্টের তিনটে খোপ কাটা। কাছে গিয়ে দেখা গেল তিনটি খোপে তিনটি ফুটো করা আছে। আন্দাজ করলাম, বৃষ্টিতে জল যখন বেড়ে যায়, তখন এখানে কিছুক্ষণের জন্য তার গতি কমিয়ে, ঐ ফুটোগুলোতে পাইপ লাগিয়ে গ্রামে জল সরবরাহ হয়। এই শুকনো সময়েও বাড়িগুলিতে অস্থায়ী প্লাস্টিকের পাইপ লাগিয়ে ঝোরার জল সরবরাহ হচ্ছে দেখছি। পথে ঘাটে পাইপের মুখ খুলে গিয়ে হামেশাই জল নষ্ট হচ্ছে, এটাও চোখে পড়েছে। এ গ্রামের মানুষ পরিচ্ছন্নতা নিয়ে এত সচেতন, অথচ জলের ব‍্যাপারে তাঁরা উদাসীন। যাই হোক নদীতে এই সামান্য অথচ কার্যকর কারিগরিটি বেশ লাগল। ব্রীজের উপর দিয়ে মাঝে মাঝেই অন্য পর্যটকদের আনাগোনা চলেছে, কারণ, সেতু পেরিয়ে কিছুদূর গেলেই, পাহাড়ের ওপর থেকে বাংলাদেশের সমভূমি দেখতে পাওয়া যায়। এবার ক্লান্ত সবাই যে যার ঘরে ফিরে আসি। দুপুরের খাওয়া সেরেই অন্য অভিযানে বেরোতে হবে।

ডাউকি নাকি পিয়াং?

দুপুরে খাওয়া সেরেই বেরিয়ে পড়লাম। এবারে আর হেঁটে নয় বাসে, গন্তব্য ডাউকি। পাহাড়ি পথ, জায়গায় জায়গায় খুব সংকীর্ণ। সামনে অন্য গাড়ি এসে গেলে দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে। কিছু দূর অন্তর এক একটা পাহাড়ী গ্রাম। পাহাড়ীয়া খাসি শিশুর দল ধুলোয় গড়াগড়ি দিয়ে খেলা করছে, তাদের পরণের সামান্য পোশাকগুলি ধুলোবালি লেগে মলিন, তবে মুখের হাসিটি বড় উজ্জ্বল। বেশিরভাগই আমাদের টাটা করছে। এক দুজন হাঁ করে ভয় ও দেখাচ্ছে। মনটা বেশ ভালো লাগছিল। কিছুক্ষণ এমন চলার পর অনুভবে মনে হল পাহাড়ের চরিত্র বদল হয়েছে। মাঝে মাঝে উল্লম্ব ঢাল। পাহাড় ভর্তি ঘন সুপুরি গাছের বন। মানুষের লাগানো। সবুজ আছে, তবু যেন পাহাড় এখানে বেশি রূঢ়। গার্গী আবার চলভাষে গুগল দাদার শরণাপন্ন হয়। দেখা যায় আমাদের চোখ ভুল কথা বলেনি। এ পাহাড় জয়ন্তীয়া। মানে এসফরে এক যাত্রায় গারো খাসি জয়ন্তীয়া তিন পাহাড়েরই দর্শন হল! আনন্দে বল্লরীদিকে জড়িয়ে ধরি। কারণ পরিকল্পনা ওরই ছিল। পাঠক যদি ভূগোলের ছাত্র বা ছাত্রী না হন, তবে এই আনন্দ বুঝতে পারবেন না। বাংলাদেশের পিঠের ওপরে তিনটে ড‍্যাশ গারো খাসি জয়ন্তীয়া এজীবনে মানচিত্রে কতবার যে এঁকেছি, তার ইয়ত্তা নেই। তাদের পর পর দেখা আমার পরমপ্রাপ্তি। বাস নিচের দিকে নামতে থাকে, সুপুরি গাছের ফাঁকে ঢালের ওপাশে দিগন্ত জোড়া মরকত সবুজ চাষের ক্ষেত দেখা যায়। বিদ্যুৎ বাবু ডেকে বলেন, ঐ দেখুন দিদি , বাংলাদেশ দেখা যাচ্ছে। আমরা জানলায় ঝুঁকে পড়ি। বাস পুরোপুরি সমতল নাহলেও পাদদেশে খানিকটা সমান জায়গায় নেমে পড়ে। নিচের দিকে সুপুরি বন নেই, তাই ভালো করে দেখা যাবে বলে প্রস্তুত হই। আর তখনই আঁতকে উঠি। সামনে প্রায় তিন মানুষ উঁচু একটানা কাঁটা তারের বেড়া। ওপাশে ধানের ক্ষেতে হাল টানা চলছে। বাংলাদেশের হাওয়া গায়ে, মুখে লাগছে আমাদের। হাওয়ারা ওপাশের ধানগাছের ডগা দুলিয়ে এপাশের ঢালে সুপুরি পাতার কানে গান গায়। বেড়া ওদের থামাতে পারেনা। সমান জায়গা পেয়ে বাস ছুটছে দুরন্ত গতিতে। সহসা মনে হয়, বাসটা যেন এক বিশাল করাতকল। গোঁ গোঁ ঘর্ঘর শব্দে কাঁটাতারের বেড়াটা আমার হৃৎপিণ্ড কাটতে কাটতে চলেছে।
বাস বাঁক ঘুরছে। বাঁদিকের জানলায় খাড়া পাহাড় আর ডানদিকে একটা চওড়া নদী নুড়ি পাথরে ভরা। বাস এবারে একটি সেতু পেরিয়ে যায়। বাঁদিকে আসলে রয়েছে এক জলপ্রপাত, এখন জল নেই। কিছুদূর এগিয়ে ডানদিকে এবারে বিশাল ডাউকি হ্রদ। অর্ধচন্দ্রাকৃতি। নীলচে সবুজ জল, অথচ একেবারে স্বচ্ছ। জলের নিচে নুড়িভরা নদীগর্ভ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একধারে সারিবদ্ধ নৌকো বাঁধা পর্যটকের অপেক্ষায়। বিরাট হ্রদে ইতিউতি এক দুটি নৌকা ঘুরে বেড়াচ্ছে সওয়ারি নিয়ে। বাসে করে এবারে আমরা হ্রদের উপরের ঝুলন্ত সেতু পার হচ্ছি। সেতু লম্বায় বড় কম নয়। যখন আমরা মাঝবরাবর, অবাক হয়ে দেখি নৌকোগুলোর ছায়া পড়েছে জলের নিচের মেঝেতে। সেতু পেরিয়ে কিছুদূর গিয়ে বাস থামে। চালক বলেন ঘড়ি ধরে একঘন্টা সময় দিচ্ছি। তার মধ্যে নদীতে ঘুরে এসে বাসে উঠবেন। রাত হয়ে যাবে ফিরতে। আর ভালো কথা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সাবধানে পা ফেলবেন, ঐ নদীতেই ভারত বাংলাদেশ সীমান্ত। দুদিকে বি. এস. এফ আর বি. ডি. আর বন্দুক উঁচিয়ে আছে। মনে শঙ্কার দোলাচল নিয়ে উৎরাই পথে দৌড় লাগাই আমরা। পাড়ে পৌঁছে অনেক গুলো সিঁড়ি ভেঙে তবে নদীর বুকে নামা গেল। ভারতের পশ্চিম জয়ন্তীয়া পাহাড় থেকে এই নদী ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে বাংলাদেশের শ্রীহট্টে। শ্রী-হ-ট্ট মানে সিলেট। সেই কত ছোটবেলা থেকে মার মুখে শুনেছি সিলেটি বাংলা আর চাটগাঁয়ের বাংলা বোঝা দায়। ডাউকি আসলে মেঘালয়ের সীমানায় এক ছোট শহর। নদীর নাম স্থানীয় ভাষায় উঙগট। লোকমুখে ডাউকি নামটাই চলে। তবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ওর আদরের নাম “পিয়াং”। পাহাড়ের পাদদেশে বলে নদী খুব চওড়া, দিগন্ত জোড়া। খরস্রোতা নদী পাহাড় থেকে হঠাৎ নেমে গতি হারিয়ে সব নুড়ি পাথ‍রগুলি জড়ো করেছে মাটির বুকে। এখন শুষ্ক সময়, তাই জল কেবল একপাশ দিয়ে বইছে। প্রথমে নেমেই কোন দিকে কী, ঠিক ঠাহর পাইনা। নদীর বুকে যেন হট্টমেলা। অসংখ্য লোক আর অজস্র বিকিকিনি। ক্রমে ধাতস্থ হয়ে এক এক করে লক্ষ্য করি। একদিকে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের শিবির, উল্টো দিকে বাংলাদেশ রাইফেলসের। এপাশে ভারতের নৌকোগুলি সার দিয়ে বাঁধা তো ওপাশে বাংলাদেশের। বেলুনওলা রয়েছেন কয়েকজন, সঙ্গে হরেক খেলনা ও মুখোশের পসরা। বেশ কিছু লোক, বাংলাদেশের মুড়ি মাখা, বাংলাদেশের আচার, বলে হেঁকে হেঁকে ঘোরাঘুরি করছেন। যদি তাঁরা “বাংলাদেশের” শব্দটি উচ্চারণ না করতেন, তবে, (সবে ভাত খেয়েই বেরিয়েছি, পরিশ্রম বেশি হয়েছিল বলে খাওয়া টা হয়েছেও জোর) আমরা সেদিকে ধাবিত হতাম না। কিন্তু ঐ শব্দটির অমোঘ টানে আমরা একজন বিক্রেতাকে পাকড়াও করলাম। বিক্রেতারা এপারের বাঙালির কাছে ঐ শব্দটির কুহক জানেন বলেই, ওটিকে হাইলাইট করে হাঁকাহাঁকি করছেন। মুড়ি একটু মোটা ধরণের, মাখাটাও স্বাদে আলাদা, কলকাতার মতো নয়। আচার তিনধরণের। আমের, কুলের আর তেঁতুলের। লোভে পড়ে সবাই গাদা গাদা আচার কিনে ফেললাম। মধুসূদন বলল প্লেন মুড়ি কিনব আর আমি বললাম, বাংলাদেশের টাকা দেখব। বিক্রেতা বললেন, প্লেন মুড়ি তো এখানে বিক্রি হয়না দাদা, আচ্ছা আমি দেখছি। আমাকেও হাত তুলে আশ্বাস দিয়ে তিনি ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হলেন। এবারে আমাদের নজরে পড়ল, একটা বেশ বড়সড় কালো বোর্ড। যার এদিকটা ভারতের, ওদিকে লেখা আছে বাংলাদেশ সীমান্ত। ওদিকে যাওয়া মানা। আমরা প্রথমে বাংলাদেশ সীমান্ত লেখাটাকে রেখে নিজেদের সেলফি তোলার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু মিরর ইমেজ বলে লেখাটা উল্টো আসছে। ছবিটা ঠিক করে তুলতে গেলে কাউকে বাংলাদেশে ঢুকতে হবে। মধুসূদন বলল, শারদা দি, আমি কিন্তু বাংলাদেশে ঢুকব। বল্লরীদি তাই শুনে লাফিয়ে উঠে বলে, তুমি ঢুকলে আমিও ঢুকব। আমি মনে মনে হাসি। ওরা ঢুকলে আমি যেন দাঁড়িয়ে থাকব। আমিও তো ঢুকবই। কিন্তু কিভাবে। বি. ডি. আরের একজন জওয়ানকে ডেকে বলি আমাদের ইচ্ছের কথা। তিনি গাম্ভীর্যের আড়ালে মৃদু হেসে বলেন, যান, কিন্তু বেশি দূর যাবেন না। আমরা শ্রীহট্টে ঢুকে পড়ে ছবি তুলে নিই। আবার দেশে ফিরে ওনাকে ধন্যবাদ দিতে গেলে তিনি একটু নরম হয়েই জিজ্ঞাসা করেন, কোথা থেকে আসছেন আপনারা? আমাদের মুখে কলকাতা শুনে তাঁর চোখে আলো ঝিকিয়ে উঠে আবার মিলিয়ে যায়। আলাপ আরো একটু অগ্রসর হয়। জওয়ান জানান, তাঁর বাড়ি ঢাকাতে। এবারে আমাদের চোখে আলো। কলকাতা আর ঢাকা যে আত্মার আত্মীয় তা উভয়পক্ষই অন্তরে গোপন করি।
তিনি আরো বলেন, আমি যদি আপনাদের ছবি তুলতে না দিই, খারাপ ব‍্যবহার করি, আপনাদের ভ্রমণটাই নষ্ট হয়ে যাবে। আপনি হয়তো আমাকে দিয়ে পুরো বি. ডি. আরকে বিচার করে বসবেন। কিন্তু আপনাদের বি. এস. এফ এসব অ্যালাউ করতে চায়না। দেখুন আপনাদের কিভাবে দেখছে? মনে ভাবি, ভারত থেকে হয়তো কেউ চট করে বাংলাদেশে থাকতে যায়না, কিন্তু বি. এস. এফের সেই চিন্তা আছে। তাই তারা সদা সন্ত্রস্ত। ঘুরতে ঘুরতে এক ইয়ং বি. এস. এফ জওয়ানের সঙ্গেও আলাপ হয়। বাড়ি উত্তর প্রদেশের বারাউনিতে। হিন্দিতে লাজুক মুখে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা ব‍্যাঙ্গালোর থেকে এসেছি কিনা। কলকাতার নাম শুনে তাঁর আলাদা কোনো ভাবোদয় হয়না। বুঝি, কলকাতা আর ব‍্যঙ্গালোর, তাঁর কাছে যতটা আপন, ততটাই দূরের। ইতিমধ্যে সেই আচার দোকানি মধুসূদনের হাতে খোলা প্লাস্টিক প‍্যাকেটে প্রায় আড়াইশো মুড়ি ধরিয়ে বলেন, প্লেন মুড়ি এটুকুই যোগাড় করতে পারলাম দাদা। আর আমার সামনে মেলে ধরেন বাংলাদেশী নোট। তাতে ছাপা ছবি দেখিয়ে বলেন, এই আমাদের শেখ মুজিব, হাসিনা আপার বাবা। মধুসূদন জিজ্ঞেস করে মুড়ির দাম কত। তিনি ওর হাত ধরে বলেন। না না দাদা দাম লাগবে না। আপনি আমাদের মুড়ি চেয়েছেন, তাই উপহার দিলাম। আমরা দুহাত ভরে গ্রহণ করি ওপার ব়াংলার এই অপ্রত্যাশিত এবং অসামান্য উপহার। মনটা ভারী হয়ে আসে। আনমনে হাঁটছিলাম‌। গোল নুড়ির ওপরে পা ফেললে টলে যায়। হঠাৎ কানের কাছে এক ওপার-বাঙালি ফটোগ্রাফার ফিসফিস করে বলেন, এদিকে নয়, ওদিকে পা ফেলুন দিদি, বি. এস. এফ দেখছে আপনাকে। এখুনি তেড়ে আসবে। চমকে তাকিয়ে দেখি, নদীর বুকে এক কাল্পনিক অর্ধচন্দ্রাকার রেখার দুপাশে সতৃষ্ণ নয়নে মুখোমুখি চেয়ে আছে দুদিকের মানুষ। চোখে জল আসে। হাতের উল্টো পিঠে চোখ ডলে তা গোপন করি। যা দেখছি তা অজানা নয়, তবু মুখোমুখি দাঁড়ানো কষ্টের। বাস চালকের নির্দিষ্ট একঘন্টা প্রায় শেষ হয়ে এল। সূর্যদেব পাটে বসেছেন। ছেলেমেয়েরা যেতে চাইছেনা। ওদের অনেক প্রশ্ন। থাকাটাই স্বাভাবিক, পৃথিবীই যে ভৌগোলিকের ল‍্যাবরেটরি। এভাবে পর্যটন, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ করতে করতেই কুঁড়ি ফোটা ভৌগোলিকেরা প্রস্ফুটিত হবে।

আমাদের বাস ফেরার রাস্তা ধরেছে। অন্ধকার নেমে এসেছে। এখন আর জানলা দিয়ে দেখার কিছু নেই। স্বাধীন দেশে জন্মেছি। দেশভাগ, দাঙ্গা, ছিন্নমূল মানুষের স্রোত, চোখে না দেখলেও, সব কিছুই জানা। তবু কাঁটাতারের বেড়ার এই দর্শন বুকে বড় বাজে। এখানে আসার সময়ে ছেলেমেয়েরা বাসের মধ্যে কতই না কলকল করছিল। এখন সব চুপ। শুধু সবার বুকের ভিতর উথাল পাথাল ঢেউ ভাঙে।  দেশভাগের ব‍্যথাভরা নৌকা সেই ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেয়ে চলে।

শেষ রজনী

মৌলিন্নং ফিরে এলাম সন্ধ‍্যেবেলায়। গীর্জা খুলে গেছে। বল্লরীদি বাকিদের নিয়ে ফাদারের সঙ্গে দেখা করতে চলে গেল। পড়াশোনা জানা লোক। গ্রাম সম্পর্কে দরকারি কিছু জানা যেতে পারে। এদিকে আমি পড়েছি মুস্কিলে। দুকৌটো কুলের আচার কিনেছি, এক কৌটো তেঁতুলের আচার। তেঁতুলের কৌটো ফাঁক হয়ে রস গড়াচ্ছে। এমন হলে হাওড়া অবধি নিয়ে যাব কিকরে? ঘরের সামনের দোকান থেকে একটা লম্বা লজেন্সের বয়াম কিনে আনলাম পাঁচ টাকা দিয়ে। ছোট ফাঁকা বয়াম পাওয়া গেলনা। কিন্তু বয়ামে একরকম আচার ভরলে অনেকটা ফাঁকা পড়ে থাকবে। সুটকেসে ফেলে ছড়িয়ে রাখার মতো জায়গা তো নেই। এক উপায় হতে পারে, যদি সেকশন করে বয়ামের ভিতরেই তিন কৌটো আচার রাখা যায়। তবে নিয়ে যেতেও সুবিধে। আচারের কৌটো গুলো কাঁচি দিয়ে গোল করে কেটে, বয়ামের ভিতরে বসিয়ে কারিগরিতে লেগে পড়লাম। বাড়ি অবধি সুস্থভাবে আচার নিয়ে যাওয়া আমার জীবন মরণ সমস্যা। বল্লরীদি ঘরে ফিরে এসেও দেখল, তখনও আমার আচার অপারেশন চলছে। সেই প্রাণান্তকর প্রচেষ্টাকে সম্মান জানিয়ে ও বয়ামটির নামকরণ করল “কেঁতুল কুঁতুল”। অর্থাৎ ট্রেনে সুটকেসের ভিতরে ঝাঁকুনিতে কুল তেঁতুল মাখামাখি হবেই। মিক্সচারে যেখানটায় কুলের ভাগ বেশি থাকবে, সেটা কুঁতুল আর যেখানে তেঁতুলের ভাগ বেশি থাকবে, সেটা কেঁতুল। আমার দুর্দশায় সবাই একচোট হেসে নিল। আমিও তাতে যোগ দিলাম। দোকানি বলে দিয়েছে, কুলের আচার ভালো থাকবে পনেরো দিন আর তেঁতুলের আচারের মেয়াদ সাত দিন।

ক্রমে রাত বাড়ে। বিছানায় শুয়ে ঘুম আসতে চায়না। বাইরে জোছনা ভাসা চাঁদনি রাত। বি. এস. এফের ছেলেটির লাজুক মুখ বারবার মনে পড়ে। আমাদের ছাত্রদের থেকে বয়সে হয়তো একটু বড়। বাড়ি ছেড়ে কোথায় পড়ে আছে।  বড় মায়া হয়। না চিনলেও, ও যে আমাদের আপন। আর বি. ডি. আরের ছেলেটি? যে কলকাতার নাম শুনে চোখ নামিয়ে উচ্ছ্বাস গোপন করে, ও কি পর? উত্তর আছে আমার অন্তরে। প্রকাশ করতে পারিনা। দেশভাগের ক্ষত মানুষের মন থেকে কোনোদিন ও মুছবেনা। সেদিন নাহয় বিদেশি শাসক ছিল, ক্ষতি করার ভাবনা ছিল। আজও কেউ এই ক্ষত খুঁচিয়ে তুলে ভোটে জিততে চায়। স্বাধীনতার এত দিন পরেও ক্ষতি চাওয়া লোকের সংখ্যা কমতি হলনা। ভাবতে ভাবতে কখন দুচোখে ঘুম নেমেছে জানিনা।

বিদায়

বেশিরভাগ জিনিসপত্র গতকাল রাতেই গুছিয়ে রেখেছিলাম। ভোরে উঠে বাকি টুকিটাকি কাজ সেরে নিলাম। অনেকটা ভালোলাগা আর মনখারাপ দুটোই সঙ্গে নিয়ে মৌলিন্নংকে বিদায় জানালাম। এরপরে ফেরার পথে আরও অনেক রকম দর্শন, দুদিন শেষের কবিতার শিলংয়ে কাটানো, অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরিয়ে সেযাত্রা বাড়ি ফিরলাম। তবে সেসব গল্প অন‍্যদিন হবে।

পুনশ্চঃ কেঁতুল কুঁতুল সুস্থভাবেই বাড়ি পৌঁছেছিল। আর সাতদিন গেলনা, পনেরো দিন তো দূর। কর্তা আর কন‍্যা দুজন মিলে হামলে পড়ায় আচার চারদিনেই সাবাড়।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল

এক শালিকের গল্প

ড. শারদা মণ্ডল

“তখন নিয়ে দাদার খাঁচাখানা, ভালো ভালো পুষবো পাখির ছানা” – কবিগুরু একথা লিখে গেছেন কতকাল হল। মানুষ নিজে পাখি হতে পারেনা, তাই পাখির প্রতি তার আকর্ষণ চিরকালের। আর জীবশিশু সবাই ভালবাসে, সে পাখির ছানা হোক, অথবা সিংহ শিশু লায়ন কিং সিম্বা – একই কথা। আমাদের বাড়ীতে কদিনের জন্য অতিথি হয়েছিল এক মিষ্টি শালিকছানা। যে কদিন সে ছিল, তার সব কীর্তি লিখে রেখেছি ডাইরিতে। আজ সেই ডাইরির পাতা খুলে দিলাম তোমাদের জন্য।

৭ই জুলাই রবিবার ২০১৯

প্রথম দেখা

আজ কলেজে যেতে হয়েছিল। কারণটা হল প্রাক্তনী সংসদের ডাকে আজ কলেজে পুনর্মিলন উৎসব। গল্প করে, নাটক শুনে, পেটপুজো করে বিকেলে বাড়িতে ঢুকে আমিতো অবাক। সবাই মহাব্যস্ত। সবথেকে ব্যস্ত ও চিন্তিত আমার কন্যা। ব্যাপার টা কী? বাড়িতে নতুন অতিথি এসেছে। ছোট্ট শালিক ছানা। বেশ কিছুক্ষণ গেল পুরো ঘটনাটা জানতে।

খুলেই বলি তাহলে। সকালে আমি বেরিয়ে যাবার পরে মেয়ের বাবার কানে এল জানলার বাইরে কিচির মিচির, ঝটাপটি মহা হট্টগোল। সঙ্গে চেনা মানুষের গলার আওয়াজ। কৌতূহলী হয়ে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখে, একজোড়া শালিক প্রাণপণে চীৎকার করছে। চার পাঁচটি পায়রা তাদের সমর্থন যোগাচ্ছে। কিছুটা ওপরে চক্কোর দিচ্ছে কাকের দল । শালিক দুটি তাদের সঙ্গে মরণপণ লড়াই চালাচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথা মতো ভোর থেকে এই কাণ্ড চলছে। মানুষের গলাটা হল বেনিয়ার। সে ভীম পরাক্রমে কাক তাড়িয়ে শালিকদের সাহায্য করছে। এইখানে বেনিয়ার পরিচয়টা দেওয়া প্রয়োজন। বাড়ির সামনে আছে একটি কচুরি শিঙ্গাড়া জিলিপির ছোট দোকান। ছোট বলে বিক্রি কম নয়। দোকানের মালিক ভবঘুরে, পাগল মানুষ, যারা রাস্তায় পড়ে থাকে, তাদের খাওয়ায়। এলাকার নেড়িকুকুরের অসুখ হলে তুলেএনে চিকিৎসা করায়। মোহনবাগানের খেলা থাকলে সে ঝুড়ি করে শিঙ্গাড়া নিয়ে গিয়ে গ্যালারিতে বিলি করে। তার ভালো নামটা আমরা কেউই জানিনা। পাড়ার লোক আদর করে তাকে বেনিয়া বলে ডাকে। বেনিয়া পাড়ায় ঘোষিত পশুপ্রেমী। সে শালিকের হয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ায় আমার কর্তাও রাস্তায় নেমে পড়লেন ব্যাপারটা কী সেটা বুঝতে।

ঘটনা হল পাশের টালির বাড়ির চালের খাঁজে খাঁজে অনেক পাখির আস্তানা। সেখান থেকেই ভোর রাতে শালিক ছানা বাসা থেকে পড়ে গেছে। এখনো উড়তে শেখেনি। অসহায় ভাবে পড়ে আছে ছানাটা। কাকগুলো শক্ত ঠোঁটে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে তাদের প্রাতরাশটা বেশ জম্পেশ করার জন্য, আর ছানার বাবা মা লড়াই করে যাচ্ছে। তারা না পারছে কাকগুলোর সঙ্গে এঁটে উঠতে, না পারছে ছানাটাকে বাসায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু দুটো বাড়ির ফাঁকে এমন জায়গায় পড়েছে ছানাটা, চট করে তাকে তুলে আনা যাচ্ছেনা, আবার টালির চালের কোন খাঁজে তার বাসা সেটাও বাইরে থেকে বোঝা অসম্ভব। তাই মানুষের পক্ষেও তাকে বাসায় ফেরানো সম্ভব হচ্ছেনা। আমার কর্তামশাই বহু চেষ্টায় সেই আহত ছানা উদ্ধার করে বাড়িতে এনেছেন। তার নতুন তারজালের বাসা, খাওয়ানোর ড্রপার সব কিছু কিনে আনা হয়েছে। আমি যখন বাড়ি ফিরলাম, তখন তাকে কোলে করে ছাতু জল খাওয়ানো হচ্ছিল। নতুন সদস্যের নামকরণও হয়ে গেছে, “মুনু”।

৯ই জুলাই, মঙ্গলবার, ২০১৯

খলনায়কের প্রবেশ

মুনুকে রাতে বাসা সমেত কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখছি। রাতে বিদ্যুতের আলোয় থাকা ওর অভ্যেস নয়। সকাল হলে ওকে জানলায় রাখছি। দুদিনে বেশ চাঙ্গা হয়েছে, খাঁচা থেকে ঠোঁট বার করতে পারছে। তার মা এসে মাঝে মাঝে সাদা সাদা পোকা, রুটির টুকরো নানারকম খাইয়ে যাচ্ছে। মায়ের কাছে খাওয়া দেখে, এবেলা আর ছাতু জল দেওয়া হয়নি। এখন কখনো কখনো ডানাও মেলছে। খাঁচার জাল বেয়ে উঠছে। খাঁচার ভিতরে এপাশ ওপাশ করতে পারছে। আজ দুপুরে মুনুকে তাক করে ভুলু বেড়াল এসেছিল। রোমশ বেড়াল খাঁচার মাথায় চেপে বসেছিল। জানলা থেকে মুনুর মায়ের চীৎকারে আমার কন্যা ছুটে যেতেই ম্যাও বাবাজী হাওয়া। যতদিন না উড়তে শিখছে খুব নজরে রাখতে হবে।

১০ই জুলাই, বুধবার, ২০১৯

মা বাবার দায়িত্ব

আজ সকালে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। মুনুর মানুষ বাবা আমাদের বসার ঘরের মেঝেতে বসে, ওকে খাঁচা থেকে বার করে ছাতু জল খাওয়াচ্ছিলেন। মুনু চুঁ চুঁ করছিল। হঠাৎ বাড়ির রান্নার মেয়েটি চেঁচিয়ে উঠল, “হা! দাদা, তার মা আসছি”। চমকে উঠে সকলে দেখি মুনুর মা লাফাতে লাফাতে ঘরের দরজা দিয়ে বসার ঘরে এল। তারপরে খাঁচার একটু দূরে মেঝেতে বসে মুনুকে খাওয়ানো দেখল। মুনুকে খাঁচায় ঢোকানো হলে উড়ে চলে গেল। এরপরে ওকে জানলায় দেওয়ার পরে একবার বাবা, একবার মা খালি জানলায় বসতে লাগল আর সরু ঠোঁট খাঁচার ভিতরে ঢুকিয়ে মুনুকে নানারকম জিনিষ খাওয়াতে শুরু করল। আমরা ঘরে বসে লক্ষ্য করতে লাগলাম। ওর বাবা মা কিন্তু আমাদের এড়িয়ে গেলনা। আমাদের সামনেই নিজেদের কাজ চালিয়ে গেল। লম্বা লম্বা পোকা আনছিল মুখে করে। জানলার গ্রিলটা চওড়া, কয়েকটা ছোট টব আছে। টবের কানায় বসে, টবের ভিতরে মাটির ওপরে খাবার জিনিষটা রাখছে, টুকরো টুকরো করে মুনুর মুখে দিচ্ছে। মুনু খাঁচার জাল থেকে একটু ভিতরে বসে এ্যত্ত বড় হাঁ করে খাচ্ছে আর অবিরাম চুঁ চুঁ শব্দ করে যাচ্ছে। একটু খেয়াল করে দেখলাম, মুনুর মা বাবা সাধারণ শালিক নয়। এরা হল গাং শালিক বা ঝোঁট শালিক। কারণ এদের ঠোঁটের একটু ওপরে ছোট্ট ঝুঁটি রয়েছে। কোনটা যে মা আর কোনটা যে বাবা বোঝার উপায় নেই। তবে চেহারা আর আচরণ দেখে আন্দাজ করলাম, মুনুর মায়ের শরীরটা সরু, ঠোঁটও সূচলো। ঠোঁটের রঙ হাল্কা হলুদ। বাবার শরীর সামান্য হলেও ভোঁতা। ঠোঁটের রঙ গাঢ় কমলা। একসময় ওর মা একটা বড় সাদা পাতলা জিনিষ নিয়ে এল খাওয়ানোর জন্য। আমিতো চমকে উঠেছি, প্লাস্টিক খাওয়াবে নাকিরে বাবা। পরে খুঁটিয়ে দেখলাম, প্লাস্টিক নয়, ওটা চিংড়ি মাছের খোলা। এরপরে তো আমি কলেজে চলে গেছি। ফিরে এসে শুনি, সারাদিনই এমন চলছে। বিকেলে আমার কর্তা ওকে জানলায় রেখেই জল খাওয়াতে গেছে। তখন মুনুর আসল বাবা জানলায় বসে ছিল। মানুষ বাবাকে দেখে শালিক বাবা দুবার ক্যাঁ ক্যাঁ করে ডেকে উঠল। তারপরে উড়ে চলে গেল। সেকেন্ডের মধ্যে মুনুর মাকে ডেকে নিয়ে চলে এল। মুনুর মা এসে সব দেখল, কিছু বললনা। বিকেল-সন্ধ্যের মুখে বৃষ্টি এল ঝমঝমিয়ে। মুনুকে জানলা থেকে নামিয়ে ঘরে রাখা হল। তাও কিছুক্ষণ ওর বাবা মা অপেক্ষা করল। তারপরে ফিরে গেল নিজের বাসায় । নিজের চোখে দেখছি তাই, না হলে অন্য কেউ বললে মোটেও বিশ্বাস করতামনা।

১১ই জুলাই, বৃহস্পতিবার, ২০১৯

শালিক নিয়ে গবেষণা

আজ ভোরে মুনুকে জানলায় রাখতেই তার মা চলে এল। মনে হয়, কাকভোর থেকে বাইরে অপেক্ষা করছিল। পাখিদের সচরাচর একাধিক ছানা থাকে। কিন্তু মুনু মনে হয় ওর বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। মুনুর পায়ের টলোমলো ভাব আর নেই। বেশ তুড়ুক তুড়ুক করে লাফাচ্ছে। ঘাড়েও পালক গজিয়েছে। প্রথমদিনের মতো সেই হাড়গিলে চেহারা আর নেই। এর মধ্যে আমি অন্তর্জালে শালিক নিয়ে পড়াশোনা শুরু করে দিয়েছি। গাং শালিকেরা সাধারণত নদী বা জলাশয়ের ধারে থাকে, কিন্তু অনেক দল শহরেও থাকে। এরা দল বেঁধে গাছের কোটরে বা বাড়ির দেওয়ালের গর্তে থাকে। পায়রা, কাক ইত্যাদি অন্য পাখির সঙ্গে পাশাপাশি থাকতেও এদের দ্বিধা নেই। এরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রচুর সংখ্যায় বাস করে। তাই এই মুহূর্তে পৃথিবীতে এদের বিলুপ্তির কোন আশঙ্কা নেই। এদের একটা খারাপ স্বভাব আছে। এরা অন্য পাখির বাসা দখল করে, এমনকি বাপ মায়ের অনুপস্থিতিতে তাদের ছানাকে ঠোঁটে করে ফেলে দিতেও দুবার ভাবেনা। বিভিন্ন দেশে এদের জন্য নাকি অনেক নিরীহ পাখির বংশ নাশ হচ্ছে। শালিক হচ্ছে, সেই সব পাখিদলের অন্তর্ভুক্ত যারা শহরের পরিবেশের সঙ্গে খুব ভালো ভাবে মানিয়ে নিয়েছে। এরা পোকামাকড়, শস্যদানা থেকে মানুষের ভুক্তাবশেষ সবই খায়, অর্থাৎ এরা সর্বভুক বা omnivorous।

১৩ই জুলাই, শনিবার, ২০১৯

শিশু পালনের রকমফের

আজ শনিবার, মুনু আমাদের বাড়িতে আসার পর এক সপ্তাহ পূর্ণ হল। মেয়ের স্কুল নেই, তাই সকালে উঠতে দেরি হয়েছে। মুনুর মায়ের চীৎকারে কান ঝালাপালা। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে মুনুকে জানলায় রাখতে হল। তবে কাল থেকে একটা জিনিষ লক্ষ্য করছি, প্রথম চারদিন প্রতি পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বাবা কি মা চলে আসছিল। শুক্রবার থেকে অত ঘন ঘন আসছেনা। পনের কুড়ি মিনিট অন্তর অন্তর আসছে। মানুষের বাচ্ছাকেও জন্মের পরে ঘন ঘন খাওয়াতে হয়। কিছুদিন পরে সময়ের অন্তর বাড়ে। এখানেও দেখছি নিয়মটা একই রকম। ঠিক ঠিক পেট ভরছে কিনা সেই চিন্তায় আমার কর্তা তাকে আবার ছাতু জল খাওয়াতে বসলেন। এখন আমরা খাওয়ালেও ওকে জানলাতে রেখেই খাওয়াই, যাতে ওর বাবা মা দেখতে পায়। প্রথম দু তিন বার কোঁত কোঁত করে খেয়ে নেয়। তারপরে পেট ভরে গেলে ফু…. করে মুখ থেকে বার করে ছেটায়। তখনই বোঝা যায় পেট ভরে গেছে। আগে তো কখনো এভাবে পক্ষীশিশুকে কাছ থেকে দেখিনি, তাই রোজই নতুন নতুন কিছু শিখছি। ছাতু জল খাওয়ানোর পরে যত্ন করে ঘাড়, গলা, পেটের পালক মুছে দিতে হয়। কারণ পালকে ছাতু শুকিয়ে থাকলে ওকে পিঁপড়ে আক্রমণ করতে পারে। ওর খাঁচার নিচে গ্রিলের ওপরে খবরের কাগজ পাতা থাকে। দেখছি সেখানে কালো কালো সুড়সুড়ি পিঁপড়ের আনাগোনা শুরু হয়েছে। গতকাল ওকে অল্প করে চান করিয়ে দেওয়া হল।

আজ সকালে দেখি মুনুর চেহারায় বেশ পেলব পাখি পাখি গড়ন এসেছে, যদিও আকারে ছোট। তাই ওর পা দুটো শরীরের তুলনায় এখন বড় মনে হয়। ওর মা বাবার পায়ের রং হলদে। কিন্তু মুনুর পায়ে এখনো হলদে রং ধরেনি। পা দুটো লালচে গোলাপি। মুনুর পেট সাদা, মাথা কালো, আর ডানা খুললে বাইরের দিকে সাদা ছোপ আছে। পিঠের রং এখনো কালচে ধূসর। ওর বাবা মায়ের মতো গাঢ় কালচে বাদামি রং এখনো ধরেনি। মুনুর মতো পাখিদের ইংরেজিতে বলে Bank Myna। বৈজ্ঞানিক নাম হল Acridotheres ginginianus।

খলনায়কের প্রবেশ

মুনুর গল্পে মূর্তিমান খলনায়ক হল ভুলু বেড়াল। সে হাল ছাড়েনি। মুনুর গলার আওয়াজ অনেকটা চড়াই পাখির ডাক একটু ভারি হলে যেমন শোনায় তেমন। বাবা মাকে দেখলে হাঁ করা অবস্থাতেও অদ্ভুত সুরে একটানা চুঁ চুঁ চুঁ চুঁ করতে থাকে। ওর বাবা মায়ের ডাক একটানা নয়। অনেকটা চ্যাঁও চ্যাঁও শোনায়। সায়েন্স কলেজে দুপুরে মিটিং ছিল। অন্যদিনের থেকে একটু বেলায় বেরলেই হবে। বেরোনোর সময়ে মনে হল মা বাবার ডাকটা কেমন অন্যরকম শোনাচ্ছে, কর্কশ ক্যাঁ ক্যাঁ আওয়াজ। ডাকের মধ্যে কী ছিল? বোধে যেন কেমন আঘাত করল। কিছু না ভেবেই ছুটে গেলাম ঘরের জানলায়, দেখি ভুলু বেড়ালটা গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছে খাঁচার দিকে। চেঁচিয়ে উঠে তাড়ালাম ওকে। মুনুকে বাঁচানোর, ওকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে দেবার এতো প্রচেষ্টা কি বিফলে যাবে? সন্ধ্যেয় বাড়ি ফিরে শুনলাম, বিড়াল আবার এসে খাঁচার খিল খোলার চেষ্টা করেছে। ভুলুবেড়াল আমাদের বাড়ির আশেপাশেই থাকে। সবসময় পাঁচিল দিয়ে যাওয়া আসা করে। ঘরে মাঝে মাঝে ঢোকে, খাবার চুরি করার জন্য। আজ থেকে আর ও ভুলু নয় পচা বেড়াল। মুনুর খাঁচার খিলটা দড়ি দিয়ে বেঁধে দিলাম।

১৪ই জুলাই রবিবার, ২০১৯

মুনুর ডানায় সামান্য হলেও বাদামি রং ধরেছে। ওর বাবা মা সামনের বাড়ির কার্নিশ থেকে একবার একবার ডাকছে, মুনুও একটানা চুঁ চুঁ না করে ঐভাবে সাড়া দিচ্ছে। বাবা মা বোধহয় উড়ে ওদের কাছে যেতে বলছে। কিন্তু এখন ছাড়বো কোন ভরসায়? মুনু এখনও নিজে নিজে খেতে শেখেনি। খাঁচার ভিতরে বাটিতে একটু জল জল করে ছাতুমাখা রাখা হয়েছে। একবারের জন‍্যও মুখ দেয়নি। ওর ঠোঁটের দৈর্ঘ্য আগের থেকে বড় হয়েছে। ঠোঁটের কমলা রংটা বেশ পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। আজ রবিবার বলে মুনুর ঘরে বসেই সকালের খাওয়া সারলাম। ওখানে বসেই লিখছি। লিখতে লিখতে মনে হল যেন মুনুর বাবা এসে বসল। কিন্তু একি! বাবা কথা বলছেনা, মুনুও তুড়ুক তুড়ুক করে লাফিয়ে চুঁ চুঁ করছেনা। খাতা থেকে মুখ তুলে দেখি, ওরে বাবা, এযে বড়সড় অন‍্য একটা সাধারণ শালিক। জানলায় বসে টবের গাছের আড়াল থেকে বন্দোবস্ত দেখছে। মুনুর মা বাবা এর থেকে আকারে ছোট, আর গায়ের রঙেও একটু আলাদা। বড় শালিকের গা লালচে বাদামি, চোখে, হলুদ কাজল প‍রা। মুনুর পরিবারে কারোর অমন নেই। বড় শালিক যেতে না যেতেই চোখে পড়ল সামনের কার্নিশে একটা পাতিকাক স্থির দৃষ্টিতে মুনুকে দেখছে। আগে কয়েকদিন মুনুর বাবা মাকে পাতিকাক তাড়া করেছে এমনও দেখেছি। এই পৃথিবীটা সবার কাছে যতটাই সুন্দর, ঠিক ততটাই ভয়ঙ্কর। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে পাতিকাক অন‍্যদিকে সরে গেল। মুনু ঘাড় বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে নিজের পালক টেনে টেনে সুন্দর করছে। ওমা এটা নতুন শিখেছে, কাল অবধি তো এমন ক‍রেনি। রবিবার হলেও আজ বেরোতে হবে। কারণ রবীন্দ্রভারতী দূরশিক্ষায় ক্লাস আছে। বেলা দুটো নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম। সন্ধ‍্যেয় ফিরে এসে শুনি, ভুলু মানে পচা বেড়াল আজও মুনুর গ্রিলের তলায় গ‍্যারাজের টিনের চালে ঘোরাঘুরি শুরু করেছিল। ম‍্যাও ম‍্যাও আওয়াজ শুনে আমার মেয়ে গায়ে জল ঢেলে তাড়িয়ে দিয়েছে।

১৫ই জুলাই, সোমবার, ২০১৯

আজ ভোর থেকে মুনুকে জানলায় দিয়েছি, কিন্তু ওর বাবা কি মা কারোর দেখা নেই। সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ এল। মেয়েকে স্কুলের বাসে তুলে দিয়ে আমি তখন ঐ ঘরেই বসে ছিলাম। একটু খাইয়ে দিয়েই চলে গেল। সকাল নটা অবধি অপেক্ষা করেও যখন যথেষ্ট খাবার পাওয়া গেলনা, তখন কর্তাকে ডাকলাম। কারণ মুনু ততক্ষণে বিরাট হাঁ করে খাঁচার চালে ঝুলে পড়েছিল। কলেজ থেকে ফিরেই খবর নিলাম, সারাদিন মা বাবা এসেছে, কিন্তু আগের মতো ঘনঘন নয়। খাবারও খাইয়েছে। একটা নতুন জিনিস খেয়াল করলাম, মুনুর গলার স্বর একটু ভারি হয়েছে। আর ঠিক ওর মায়ের নকল করে একবার একবার ডাকছে।

১৭ই জুলাই, বুধবার, ২০১৯

মুনুর মা, বাবা আসছেইনা প্রায়। সকাল দশটা বাজে, দুবার মাত্র এসেছে। গতকাল দেখলাম ওর মা মুখে একটা লাল পোকা নিয়ে এল, মুনুকে দেখাল, কিন্তু খাইয়ে দিলনা। দেখিয়ে উড়ে চলে গেল। মুনু এখন বড় পাখিদের মতো ডাকছে। ওর ডানাটা একটু হলেও লম্বা হয়েছে। ও এখন গলা লম্বা করে এদিকে ওদিকে দেখছে। মুনুর লেজ কোয়ার্টার ইন্চির মতো লম্বা হয়েছে। লেজের রং আমগাছের ছালের মতো। লেজের শেষ প্রান্তে সাদা পাড়। মুনু লেজের কেরামতি দেখানো শিখেছে। লেজটা কখনো ছোট্ট জাপানি পাখার মতো ছড়িয়ে দিচ্ছে, কখনো ডানার পালকের সোজাসুজি না রেখে ডানদিকে বা বাঁদিকে বেঁকিয়ে রাখছে। হাঁটার মধ্যে বেশ বড় বড় ভাব এসেছে। বাবা মা খাবার কমিয়ে দিয়েছে, তাই কর্তা বেরোনোর আগে ওকে ড্রপারে খাইয়ে দিয়ে যান। প্রথমে একটু চেঁচামেচি করে। কিন্তু খাবার মুখে পড়লে একেবারে চুপ। মুনুর এখন অনেক খিদে, বড় হচ্ছে। আজ দেখলাম খাওয়ানোর সময়ে একটা পা দিয়ে কর্তার হাতের আঙুল শক্ত করে ধরে রেখেছে।

মুনুর কৌতূহল

সকাল সাড়ে এগারোটা। মুনুর মা একবার দেখে গেল। তিরিশ সেকেন্ড মতো জানলায় বসল। মুনু শান্ত হয়েছিল, মাকে দেখে যতজোরে পারে একটানা ডাকতে লাগলো। কিছুক্ষণ লাফালাফি করল, মা চলে যেতে আবার শান্ত। জানলার সামনে যে কোনো পাখি উড়ে গেলে মুনু ঘাড় উঁচু করে দেখার চেষ্টা করে। দোতলার জানলার বক্স গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ও নিচের দিকেও লক্ষ্য রাখে, কী হচ্ছে না হচ্ছে। মুনু এখন লেজ উঁচু করে নিচের দিকে দেখছে। তাই আমি লেজের পিছন দিকটা দেখতে পেলাম। লেজের উলটো দিকটা প্রায় পুরোটাই সাদা। তার মানে এক সারি লম্বা সাদা পালকের ওপরে কি একটু খাটো কালচে ধূসর পালক সাজানো রয়েছে? সেটাই আমি সামনে থেকে লেজের সাদা পাড় মনে করেছিলাম? মুনু এখন ঘরের দিকেও দেখে আমরা কী করছি। ওর বুদ্ধি কৌতূহল এগুলো বাড়ছে।

নিজে নিজে খাওয়া

এখুনি আমার চোখের সামনে একটা ঘটনা ঘটলো। মুনুর মা একটা কালো পোকা ঠোঁটে নিয়ে এসেছিল। আমি অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলাম। কিন্তু মুনুর ডাক শুনে বুঝে গেলাম যে মা এসেছে। তাকিয়ে দেখি কখনো খাঁচার ডানদিকে, কখনো খাঁচার মাথায়, কখনো সামনে টবের ওপরে মুনুর মা ঘুরে ঘুরে বসছে। মা যে দিকে যাচ্ছে, মুনুও সেদিকে গিয়ে বিরাট হাঁ করে পরিত্রাহি চীৎকার করছে। মুনুর মা ঘুরে ঘুরে অনেকবার মুনুর হাঁ-এর ভিতরে নিজের ঠোঁট ঢোকাল, কিন্তু মুখ স্পর্শ করলনা, আমি অবাক হয়ে দেখছি। মায়ের ঠোঁটের ফাঁকে খাবার যেমন ছিল তেমন রয়ে গেল।মা উড়ে গেল। আর ঠিক তখনই মুনু খাঁচার মেঝেয় লাফিয়ে পড়ে নিজে নিজে প্রথমবার বাটিতে রাখা ছাতু জলে মুখ দিল। দু তিনবার ঠোঁট নাড়ল। এবার তাহলে ও নিজে নিজে খেতে শিখবে।

আজ বেনিয়া খোঁজ নিয়েছে মুনু কেমন আছে। হাজার হোক বেনিয়াই তো মুনুর প্রথম রক্ষাকর্তা। ওর সঙ্গে মুনুর আত্মীয়তা আছে, কারণ মুনুর মা বাবা বেনিয়ার দোকানে শিঙাড়া খায়।

কাছে গিয়ে মুনুকে ডাকি, “মুনু মুনু”। কিন্তু ডাক শোনেনা। আমার প্যারাকিট আছে। তাকে যখনই ডাকি “মি–ঠু!” তখনই ঘাড় বাঁকিয়ে গোল কালো কাচের মতো চোখ তুলে আমায় দেখে। “উঁ-য়া” বলে হাঁ করে আদুরে সাড়া দেয়। আমি কাছে গেলে কাছে আসে। ঠোঁট বাড়ায়। স্পর্শ পছন্দ করে। হাতে করে খাওয়ালে ভীষণ খুশি হয়। কিন্তু মিঠুর জন্ম মানুষের বাড়িতে, বাইরের পৃথিবীতে কেমন করে বাঁচতে হয়, তাও জানেনা। ও জানে, আমরাই ওর পরিবার। আমি যখন কলেজের ফিল্ড সার্ভে থেকে ফিরি, তখন মিঠু প্রথমে অভিমান দেখায়, তারপরে কাছে বসতেই, ডানা ঝাপটায়, গায়ে গা লাগিয়ে রাখে, ওর অভিমান, আনন্দ, সবই ওর চোখ দিয়ে বোঝা যায়।

কিন্তু মুনুর জীবন তো এমন নয়। ও মা বাবার কাছে ছিল, নেহাত ঝড়ে পড়ে গেছে তাই। ওকে ওর স্বাধীন জীবনে ফিরিয়ে দিতে হবে।

বিকেলের মুখে দেখি বাটির ছাতুজল বেশিরভাগটাই শেষ। মুনু নিজে নিজে খেতে শিখে গেছে। এবার বোধহয় ওর নিজের বাড়ি যাওয়ার দিন চলে এল।

১৯ শে জুলাই, শুক্রবার

আশাভঙ্গ

গতকাল মুনুর বাবা মা তিন চারবার এসেছিল। মুনু হাঁ করে যতই চেঁচাক, যতই খাবারের জন্য ছটফট করুক, ওর মা বাবা শুধু ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকিয়ে আদর করে চলে গেছে, খাবার দেয়নি। গতকাল ওকে ছাতুমাখার সঙ্গে কুচি কুচি করে আপেল দিয়েছিলাম, একটু আধটু মুখে দিয়েছে।

আজ সারাদিন মুনুর বাবা মা একবারও আসেনি। মুনুকে কি ওরা বিদায় জানিয়ে দিল? মুনু সারাদিন ইতিউতি লাফালাফি করল। ঘাড় উঁচিয়ে, বাঁকিয়ে চারিদিকে দেখল, সারাদিন ডাকল, কিন্তু বাবা মা আসেনি। দুপুরে আমি কলেজে ছিলাম। কর্তা ফোন করে জানালেন, উনি ঘরের জানলা, দরজা বন্ধ করে খাঁচা থেকে মুনুকে বার করেছিলেন। মুনু কিছুক্ষণ ভালোই উড়তে পেরেছে। মুনুকে হাতে ধরে অনেকক্ষণ জানলায় অপেক্ষা করেছেন, যদি ওর গলার আওয়াজ শুনে বাবা মা চলে আসে। কিন্তু হা হতোস্মি। তারা মনে হয় এলাকা ছেড়েই চলে গেছে। শুনে ভারি চিন্তায় পড়ে গেলাম। গতকাল রাতের আঁধারে পচা বেড়াল ঘরে ঢুকেছিল। রাতে মুনুকে ঘরে লাইট নিভিয়ে একটা কাপড় চাপা দিয়ে রাখি। রাতে একটা কাজে ঘরে ঢুকতে গিয়ে মনে হল সাদা একটা কি যেন সরে গেল। আঁধারে ঠাহর করে বুঝলাম, পচা বেড়াল মুনুকে মুখে পুরবে বলে নিঃশব্দে ঘুরছে। তাড়া করতেই লেজ উঁচিয়ে পালালো।আজ সকালে দেখলাম, শুধু পচা বেড়াল নয়, তার সঙ্গে আরও পাঁচটা বেড়াল এসেছে। পচা বেড়ালের নেতৃত্বে আমাদের জানলার নিচে ছটা বেড়ালের পল্টন দেখে কপালের ভাঁজ আরও গভীর হল। মুনু আজ উড়লেও, সেতো একটু উড়েছে, একটু বসেছে। মুনু স্বাভাবিক ভাবে বড় হবে, ওর বাবা মা ওকে ছোট ছোট গাছে ওঠাবে, পোকা ধরা শেখাবে, অনেক কিছু কল্পনা করে রেখেছিলাম। কিন্তু এ কী হল? বাবা মা ওকে আমাদের হাতে রেখে নিশ্চিন্ত হয়ে এলাকাছাড়া হয়ে যাবে, এতো স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। এতদিন ছাতুর সঙ্গে মুনুর মা বাবার আনা পোকামাকড়ও খাচ্ছিল। লম্বা লম্বা ফড়িং খাওয়াতো, লাল লাল কালো কালো পোকা আনতো। আমরা তো এগুলো খাওয়াতে পারবোনা। এতে ওর স্বাস্থ্য খারাপ হবে না তো? একফালি পাকা পেয়ারা দিয়েছিলাম, খেতে পারেনি। শালিক পাখির ঠোঁটের জোর খুব কম। জানলার সামনের কার্নিশে পাতিকাক ওঁৎ পেতে বসে থাকে। ওঁর ঠোঁটে খুব জোর।

২৪ শে জুলাই, বুধবার

মুনুর মা বাবা আর আসেনি। মুনুকে এর মধ্যে ঘরে আরও দুবার ওড়ানো হয়েছে। একটু উড়ছে, একটু বসছে। ও এখনও পরিণত হয়নি। পায়ের রং হলুদ হয়নি। ঠোঁটের কাছে ঝুঁটি ও ওঠেনি। এখন অনেক প্রশ্ন, বাবা – মা ওকে ছেড়ে গেছে। মাঝে টালির চালের বাড়ি থেকে ওর মা বাবার ডাক শুনেছি। মুনুও উতলা হয়ে খুব ছটপট করেছে, কিন্তু ওরা ফিরে তাকায়নি, নিজের জীবনে ফিরে গেছে। মুনুকে ছেড়ে দিলে ও থাকবে কোথায়? হয়তো মা বাবা ওকে বাসায় নেবেনা। বা অন্যভাবে দেখলে সন্তানকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য ওদের নেই। মুনু বাসায় পৌঁছনোর আগেই ও পচা বেড়ালের পল্টন বা পাতিকাকের নজরে পড়ে যাবে। কুকুর, বিড়াল বা অন্য চারপেয়ে প্রাণী মুখে করে বাচ্ছাকে ঘাড়ে ধরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিতে পারে। কিন্তু বাচ্ছা বাসা থেকে পড়ে গেলে পাখি বাপ মা চীৎকার করে সাহায্য চায়, তুলে নিয়ে যেতে পারেনা। আমার ঘরের জানলা থেকে টলোমলো মুনুকে উড়িয়ে উড়িয়ে বাসায় নিয়ে যেতে পারবেনা ভেবেই হয়তো ওরা ওকে ত‍্যাগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মুনু এখন দুধ ছাতু খায়। পাকা পেয়ারা, বেদানা খেতে শিখেছে। ওর নতুন ভালো নাম রেখেছি – কংসাবতী। আমার কন‍্যা রঞ্জাবতী। মেয়ের খুড়তুতো দিদি কর্ণাবতী। তার লাসা কুকুর পদ্মাবতী। মেয়ের প‍্যারাকিট সত‍্যবতী। তাই মুনুর নাম হল কংসাবতী। ও এখন আমাদের পরিবারের সদস্য। কর্ণার বাবা মানে আমার দেবর প্রস্তাব দিয়েছেন বড় হলে মুনুকে আমাদের গ্রামের বাড়ির গাছে ছেড়ে দেওয়া হবে। সেখানে ওর মতো শালিক অনেক থাকে। যতদিন না সেটা হচ্ছে, মুনুর ওড়ার মহড়া জারি থাকবে। ছেড়ে দেওয়ার পরেও মুনু যদি যোগাযোগ রাখে, তবে কর্তামশাই স্থির করেছেন, ঝাঁকের শালিক বেছে শুভদিনে মুনুর বিয়ে দেবেন।

২৫ শে জুলাই, বৃহস্পতিবার

ভেবেছিলাম গতকালই মুনুর গল্পে ইতি টানবো। কিন্তু ইংরেজিতে একটি কথা আছে – Truth is stranger than fiction, অর্থাৎ সত‍্য কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়, সে এতটাই অদ্ভুত। সেই কথা আমাদের পরিবারেও সত‍্যি হল। আজ ভোর ভোর ঘুম থেকে উঠতে হয়নি। কারণ মেয়ের স্কুল নেই। ষান্মাষিক পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির জন্য কয়েকদিন ছুটি আছে। মেয়েকে সাহায্য করব বলে, আমিও এ কদিন কলেজ থেকে ছুটি নিয়েছি। উল্টো পুরাণ করে, কর্তামশাই ভোরে উঠে বাজারে গেছেন। ফিরে এসেই তিনি আমাদের ঘুম থেকে তুললেন। বললেন, উনি দেখে এলেন মুনুর মতো ছোট ছোট শালিক ঘুরে ঘুরে বাজারে নানা জিনিস খেয়ে বেড়াচ্ছে। আর মুনুর মা বাবাকেও দেখেছেন বেনিয়ার দোকানে। আমাকে বললেন, “সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি, কাল, রবিবারেই ওকে উড়িয়ে দেবো”। আমি বললাম, “আজ নয় কেন”? কর্তা বললেন, “আজ বাজার থেকে পাকা পেয়ারা এনেছি, মুনু খাবে বলে”। আমি বললাম, “পেয়ারার দিকে তাকিয়োনা। যো কাল করে সো আজ। যো আজ করে সো অব”। কর্তা বললেন, “বলছো”? আমি বললাম “হ‍্যাঁ”। তাড়াতাড়ি কন্যাকে ঘুম থেকে তুললাম। সবাই মিলে মুনুর কাছে জানলায় গেলাম। সে রোজকার মতোই বাইরের দিকে তাকিয়ে তুড়ুক তুড়ুক লাফাচ্ছে আর খাঁচার জালে ঝুলছে। জল, বাটি, ছাতু, পেয়ারা যেমন কে তেমন রইল। কর্তা বাইরের দিকে মুখ করে খাঁচার দরজা খুলে দিলেন। আমাদের চোখে জল, গলায় শ্বাস আটকে আসার অবস্হা। মুনু প্রথমটা হতভম্ব, তারপরেই পাখা মেলে সোজা উড়ে গিয়ে বসল মুখোমুখি কার্নিশে। এদিক ওদিক গেল। আমরা তো জানলা দিয়ে, ওঘরের বারান্দা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে পাগলের মতো খুঁজছি। হঠাৎ দেখি বাড়ির নিচের সিমেন্টের চাতালে বসে আছে। রে রে করে কর্তামশাই ছুটে গেলেন নিচে, ওখান থেকে ওড়ানোর জন্য। পচা বেড়ালের নজরে পড়লে সর্বনাশ। পাতিকাকও নজরে রেখেছে। মাথার ওপরে চক্কর দিচ্ছে। ওখান থেকে আবার কার্নিশ। পাতিকাকও দিল উড়ান। আর তখনই ঠিক তখনই মুনুর পাশে এসে বসল দুই শালিক, গায়ে গায়ে ঘেঁষে, ঠোঁটে ঠোঁটে লাগিয়ে। আমরা অবাক হয়ে দেখছি। মুনুর মা বাবা তাহলে ঠিকই নজর রেখেছিল সন্তানের ওপর। তিন শালিকে চিঠি আসে, জানিনা কার চিঠি পাব। তিন শালিক দেখে যে এত প্রাণের আরাম আর আত্মার শান্তি তা তো আগে কখনো বুঝিনি। আচ্ছা বাবা মা বাচ্চা নিয়েই পৃথিবীর সব তিন শালিক হয়? আমাদের চোখের সামনেই মায়ের তত্ত্বাবধানে প্রথমে মুনু ছোট পাঁচিলে উঠল, তারপর সামনের দোতলা বাড়ির ট‍্যাঙ্কে। পরিষ্কার চেনা যাচ্ছে। মায়ের ঝুঁটি আছে, মুনুর নেই। ধীরে ধীরে মুনু আমাদের চোখের আড়াল হয়ে গেল।

যা মুনু যা, এই পৃথিবীর ভালো খারাপ সব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে বাঁচতে শেখ।

কর্তামশাইয়ের মন খারাপ, মুখে কিছু প্রকাশ করেননা। কন‍্যার মন খুবই খারাপ। শালিক বন্ধুকে তার ছাড়ার ইচ্ছে ছিলনা। রান্নার মেয়েটিরও খুব মায়া পড়ে গিয়েছিল, তাই মন খারাপ। শুধু আমার প‍্যারাকিটের চোখে, শরীরী ভঙ্গিমায় আনন্দের অভিব‍্যক্তি। ও কি বুঝতে পেরেছে, ওর আদরের ভাগীদার আর কেউ নেই!

ভালো মন্দ সব মিশিয়ে পৃথিবী চলে তার নিজের ছন্দে। এর মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়াই তো জীবন। মুনু একটা শিক্ষা দিয়ে গেল। আমাদের বাড়ির আর কেউ কোনোদিন একশালিককে অপয়া বলবেনা। কারণ একশালিক দেখলে মুনুর কথা মনে পড়বে।

অথ মুনু কথা সমাপ্ত।

পুনশ্চঃ

ফেব্রুয়ারি, ২০২০

দুমাস আগে পর্যন্ত মুনু বাবা মায়ের সঙ্গেই ঘুরতো। নিঃসঙ্কোচে তিনজন আমাদের বারান্দায় এসে বসত। এখন দেখছি। মুনু সঙ্গী খুঁজে নিয়েছে। স্বাধীন ভাবে নিজের সংসার পেতেছে। মুনু এসেছিল একশালিক হয়ে। মাঝে হলো তিনশালিক। এখন জানলা আর বারান্দা দিয়ে দুই শালিক দেখি।

লেখাটি জ্ঞান বিজ্ঞান পত্রিকায় নভেম্বর, ২০২০ সংখ‍্যায় প্রকাশিত।

এই লেখাটির জন্য জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকার কিশোর বিজ্ঞানীর বিভাগে 2020 সালের শ্রেষ্ঠ লেখার জন্য অমলেশ চন্দ্র তালুকদার স্মৃতি পুরস্কার প্রাপকঃ শারদা মন্ডল

গোত্র ভৌগোলিক

নামে কী বা আসে যায়

বছর পনের আগেকার কথা। ভূগোল অনার্সের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে গিয়েছিলাম শিলিগুড়ি, ফিল্ড সার্ভেতে। শহর পেরিয়ে গ্রামের পাশে বালাসন নদীর বালিতে জনা দশেককে নিয়ে ডাম্পি লেভেল যন্ত্র দিয়ে কনট‍্যুরিং (এক ধরনের জরিপ) করাচ্ছিলাম। দলের বাকিরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে সমীক্ষা করছিল। এমন সময়ে সমীক্ষাকারী দলের একটি ছাত্র ছুটতে ছুটতে এল। “ম‍্যাডাম, একজন লোককে সার্ভে করার পর বললাম আপনার একটা ছবি তুলতে পারি? সে আমার নাম জিজ্ঞেস করল। আমি নাম বলতেই সে তীব্রভাবে বলল, ছিঃ আমি মুসলমানের হাতে ছবি তুলিনা।” প্রসঙ্গত বলে রাখি, অনুমতি নিয়ে ছবি তোলা আমাদের কাজেরই অঙ্গ। ছবিগুলি সার্ভে রিপোর্টে দেওয়া হয়। ছেলেটির দুচোখে ছিল প্রশ্ন ও বিষাদ। হয়তো সে চেয়েছিল আমি গ্রামে ঢুকে সেই লোকটির আচরণের প্রতিবাদ করি। কিন্তু বিজন বিভুঁইয়ে সেটা সমীচীন হবেনা ভেবে তাকে বললাম, তুমি আর ওদিকে যেওনা। শিক্ষক হিসেবে হাতে কলমে পারিনি প্রতিবাদ করতে, আজও মনের মধ্যে একটা সূঁচোলো কাঁটা বিঁধে আছে। সেদিন শীতের সকালে রোদ্দুর বড় মিঠে, কিন্তু চিকচিকে বালির পাশে বালাসনের তিরতিরে জল হৃদয়ের রক্ত মিশে নোনা হয়েছিল। আজও ক্লাসে ছাত্র আসে। পাশাপাশি বসে টিফিন খায় শেখ তমোঘ্ন আর গুলশন চট্টোপাধ্যায়। এ বাংলায় আরও মিলেমিশে যাক নাম। কেউ যেন নামের তালিকা থেকে কিচ্ছুটি খুঁজে না পায়।

ও নদী রে…..

সেবার সিলেবাসের বাধ‍্যবাধকতায় ফিল্ডে গেলাম মুর্শিদাবাদ। ২০০৩ থেকে সিলেবাসে ঢুকেছে নদী ভাঙ্গনের মানচিত্র নির্মাণ। সালটা খুব সম্ভবত ২০০৪ কি ৫ হবে। ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে ভৌগোলিক নিরীক্ষায় ঐ মানচিত্র কিভাবে তৈরি হবে তা সরেজমিনে দেখতে পৌঁছলাম আখেরিগঞ্জের কাছে এক মৌজায়। সামনে বয়ে চলেছে পদ্মা নদীর সাথে যুক্ত এক ক্ষীণ ধারা। একটা মৌজা মানচিত্র যোগাড় করতে হবে। রাজমহল পাহাড় পেরিয়ে গঙ্গা নদী আসে বাংলায়। মালদহে ঢোকা থেকে মুর্শিদাবাদে বাংলাদেশের দিকে বেরোনো পর্যন্ত ধারাটি যেন সাইন কার্ভের মতো। কে না জানে নদী তার বাঁকের পিঠের দিকে ভাঙে, আর কোলের দিকে গড়ে। তাই উত্তল পিঠে মালদহ ভেঙে যায়, চর ওঠে ঝাড়খণ্ডে। পরের বাঁকে উপুড় পিঠে ভাঙে মুর্শিদাবাদ, আর চর ওঠে বাংলাদেশে। এসব খবর তো পুঁথির পাতায় পড়েছি কতবার। সরেজমিনে তার ই তো মানচিত্র বানাতে চাই। মৌজা ম্যাপ কোথায় পাই – ইতিউতি ঘুরে বেড়াই।

এক বাস ভর্তি ছেলেমেয়ে কী করছে এখানে! ব‍্যপার বুঝতে জড়ো হয়েছেন স্থানীয় কিছু মানুষ, কঙ্কালসার চেহারা, তায় মলিন শতছিন্ন বসন। বুঝে যাই যে ম‍্যাপ মেকিং বলে এঁদের কিছু বোঝানো যাবেনা। কিন্ত্ত অন‍্য উপায় নেই, নান‍্য পন্থা। গাছের তলায় সহজ করে, আসলে কিঞ্চিত বোকা করে বোঝাতে বসি। জমি আছে আপনাদের? জমির দাগ বা ছক কাটা কাগজ দেখেছেন কখনো? কোথায় দেখেছেন বলতে পারবেন? জলের কুলকুল আর বাধাহীন বাতাসের হু হু শব্দের ভিতর দিয়ে ভেসে আসে আলতো স্বর। “আমাদের কাছে সব সি. এস., আপনাদের বোধহয় এল. আর. লাগবে।” বিস্ময়ে মূক আমাদের মাথায় আকস্মিকতার আকাশ ভেঙে পড়ে। ভারতাত্মা রোষনেত্রে শহুরে অর্বাচীন নাগরিকের দিকে তাকান। মাথা পেতে নিই সেই ভর্ৎসনা। সি.এস. হল ক‍্যাডাস্ট্রাল সার্ভে সিরিজের মৌজা ম‍্যাপ, যা ইংরেজ আমলে হয়েছিল।  স্বাধীন ভারতে হল রেভিনিউ সার্ভে সিরিজ বা আর. এস. । আর আধুনিক ভারতবর্ষে শুরু হয়েছে ল‍্যান্ড রেভিনিউ বা এল. আর. সিরিজ। ধীরে অনুধাবন করি, ভাঙনে ওদের সর্বস্ব গিয়েছে। একবার নয় বারবার। ক্ষতিপূরণ (বা নাগরিকত্ব?) দাবী অথবা ক্ষতির প্রমাণে মানচিত্র টুকুই ভরসা। সারা জীবন ধরে নদীর সঙ্গে যুঝছে যে মানুষগুলি, তারা নদী আর তার মানচিত্র বিষয়ে আমার মতো পুঁথি-সর্বস্ব পণ্ডিতের থেকে অনেক বেশি জানে। সি.এস. মানচিত্র আসে। মাটিতে তা বিছিয়ে বসি। তার ওপরে ট্রেসিং পেপার। “হ‍্যাঁ একদম ঠিক এঁকেছেন, ঐখানে আবুলের জমি ধরে নিয়েছে নদীতে, এবারে ডানদিকে আর একটু নিচে…” –  নির্দেশ শুনে শুনে পেনসিল বোলাই। ইংরেজ আমলে নদী কোথায় ছিল, আর আজ কোথায় আছে, দুই রেখার মাঝে চিত্রিত হয় এপার বাংলার হারিয়ে যাওয়া ভূমি সম্পদের খতিয়ান। হাঁটু গেড়ে বসে শিখি ব-দ্বীপের নদীর গতায়াত, ধারাপথের দোলন গতি আর ফ্লুভিয়াল জিওমরফোলজির খুঁটিনাটি। ঘন্টা দুয়েক পলকেই পার হয়। জিজ্ঞাসা করি, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সে জায়গা শেষ কবে ভেঙেছিল? উত্তর পাই, আশির দশকের শেষ থেকে আর ভাঙেনি। “কিকরে?” উত্তরে যা শুনি, তাতে অন্তরাত্মা কাঁপে। আশির দশকের শেষে এসেছিলেন তরুণ সরকারি ইঞ্জিনিয়ার। রোদ বৃষ্টি না মেনে, নাওয়া খাওয়া ভুলে ছাতা মাথায় ঠায় দাঁড়িয়ে বাঁধ বাঁধাতেন তিনি। যেটুকু করে যেতে পেরেছিলেন, সেটুকু ভাঙেনি। পুরোটা শেষ করতে পারেন নি। কারণ ঠিকাদারেরা বিপদ বুঝে, ওপরে কলকাঠি নেড়ে কলকাতার অফিসে বদলি করে দিয়েছে। এখানকার মানুষ কলকাতায় গেলে ওনার সঙ্গে দেখা করে আসে। হায় রে ভারতবর্ষ, বিপদের মুখে বাঁধ বাঁধা ঠিকাদার, ঋণ খেলাপী ব‍্যবসাদার, ভন্ড ধর্মের জমাদার থেকে কবে মুক্তি পাবে? ভারী মন নিয়ে ফিরে এসেছিলাম। সেদিন মেঘলা আকাশের নিচে নদীর রং যেন মনকাড়া ছাইরঙা নীল, কিন্তু মাঠের সবুজ বিষন্নতার কালি মিশে ধূসর হয়েছিল।

দু তিন বছর পরে প্রায় একই ধরণের কাজে গেলাম মালদা। ইংলিশ বাজারে বি. এল এল. আর. ও অফিসে কোন মৌজায় সার্ভে করানো যায়, তা বুঝতে খোঁজাখুঁজি করছি, এমন সময়ে অফিসার বললেন,
এই মৌজাটার ম‍্যাপ নেবেন?
কিন্তু এটাই কেন?
অফিসার স্থির দৃষ্টিতে তাকান। বলেন, সার্ভে করতে তো এসেছেন। গিয়েই দেখুননা। ম‍্যাপ কিনে হোটেলে ফিরি। রাতে নিরীক্ষণ করে বুঝি যে এটা পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের সীমান্তবর্তী গ্রাম। পরদিন গন্তব্যে পৌঁছে যা দেখলাম, তা আমাদের দেখা আর এক হাঁসুলিবাঁকের উপকথা। মালদহের গ্রামের কিছু অংশের এপার ভেঙে  চর উঠেছে ওপারে। নদী – মানুষ সম্পর্কের স্বাভাবিক নিয়মে এপারের গ্রাম ও গিয়ে বসেছে ওপারে। কিন্তু যেহেতু, নদীর মাঝখান দিয়ে গেছে ঝাড়খণ্ড আর বাংলার সীমানা, ওপারে চর উঠলেই ঝাড়খণ্ড বলে এ আমার জমি। বাংলার কাগজপত্র জমা করে দিলে ঝাড়খণ্ডের কাগজপত্র তৈরি হতে পারে। বাংলার গ্রাম হয়ে যায় ঝাড়খণ্ডের গ্রাম। কিন্তু মানুষগুলি চায়না বাংলা ছাড়তে। সরকারি অফিস, কাজকর্ম সবই এদিকে। প্রতিদিন অন্তত দুবার নদী পারাপার। আরও অনেক হেনস্থা। বিপদ আপদে সবসময় নৌকা থাকে না। বাংলার পুলিশ নদীর ওপারে যায় না। গ্রামবাসীরা ঝাড়খণ্ডের ঠিকানা চায়না বলে, সেদিকের পুলিশ ও আসে না। ভারতের মূল ভুখণ্ডে থেকেও এ এক অদ্ভুত অনিশ্চিত ভাগ্যহত জীবন যাপন। ভরা গঙ্গার পাশে এক চায়ের দোকানে বসে চলছিল কথোপকথন। আমাদের কথায় সমবেদনার সুরটুকু ওঁদের জমানো আবেগের আগল খুলে দেয়। দাড়িভরা ভাঙা গাল, পরণে লুঙ্গি, কোটরাগত চোখে বোবা আর্তি, মানুষগুলি বারবার বলতে থাকেন, বলো দিদি, ও চরের মাটি কি বাংলার নয়? এদিকে ই তো ছিল, কেন ঝাড়খণ্ডে যাব? আমরা তো বাঙালি। উত্তর দিতে পারিনি। উত্তর আজ ও খুঁজছি। ইংরেজ ইঞ্জিনিয়ার, সার্ভেয়ারেরা তন্ন তন্ন করে বাংলার ভূপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ করেছিলেন। রেনেলের ম‍্যাপ আজও ভৌগোলিক রেফারেন্স হিসেবে অদ্বিতীয়। ব-দ্বীপের নদী পথ সতত সঞ্চরনশীল, তা জেনেশুনেই বিরোধ জিইয়ে রাখার জন্য, তারা নদীর মধ্যরেখা বরাবর রাজ‍্য আর রাষ্ট্রের সীমা নির্দিষ্ট করেছিল। এটাও বলা হয়নি, ৪৭ সালে নদী যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সীমানা সেখানে ই থাকবে, নদী সরলেও, সীমানা নড়বেনা। স্বাধীনতার এত দিন পরেও এই চরম ভুল কোনো সরকার ই সমাধান করেননি। নদীর স্বাভাবিক গতি, পাড়ের অসহায় মানুষকে নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবেই রয়ে গেছে।

আচ্ছা, এমন যদি হত, ২০১৪ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর নদীগুলি যেখান দিয়ে বইছে, সেটিই যেন হল সীমানার ভিত্তি রেখা। এরপরে নদী যদি সরে যায়, হেজে মজে হারিয়েও যায়, সীমান্ত সরবেনা। নদীর গতিপথের বদলের মতো প্রাকৃতিক ঘটনায় যেন ভারতবর্ষে আর কাউকে রাজনৈতিক ঠিকানা হারাতে না হয়। কিন্তু বাস্তবে এমন কিছু ঘটেনা। এ শুধু আমাদের কষ্ট কল্পনা। সেদিন সেই সীমান্ত-গ্রামের আকাশ ঘন নীল, সামনে ভরা নদী, আমাদের উজ্জ্বল শীতের পোশাক ঐ বিপন্ন বাঙালিদের সামনে ফ‍্যাকাশে হয়েছিল।

পরিচয় কিছু আছে নাকি ….

ক্লাসে পড়াতে হয় যুদ্ধোত্তর ভূগোল। দুই বিশ্বযুদ্ধের পরে ভৌগোলিক বিশ্লেষণ কেমন করে আরও গণমুখী, আরও কল‍্যাণকামী হয়ে উঠলো তা বিশ্লেষণ করি। বিশ্লেষণ যত বেশি আধুনিক, তত বেশি প্রযুক্তি নির্ভর। যত বেশি তা উত্তর আধুনিক, তত বেশি তীব্র সমালোচক, ধাপে ধাপে যুক্তি সাজিয়ে এক্স রে আই এর মতো সমাজের, ব‍্যক্তি মানুষের সমস্যার মূলে পৌঁছাতে চায়। শ্রেণী কক্ষে বিতর্ক জমে ওঠে। একজন ছাত্র অন্য আর একটি ছাত্রের দিকে তাকিয়ে বলে, এই যে ধরুন ম‍্যাডাম, আমি হিন্দু, আর ও মুসলমান; দুজনের কেউ জানিনা কবে চাকরি পাব, বা কিছু করে খাবার যোগাড় করব। এখন সে সব না ভেবে, দুজন কি মারপিট শুরু করব? দুজনেই সশব্দে হেসে ওঠে। ছাত্রটি বলে চলে, আমার বাবা বাড়িতে সব সময় লুঙ্গি পরে থাকে, আর ও চব্বিশ ঘন্টায় জিন্সের প‍্যান্ট ছাড়েনা। জামা কাপড় দেখে, কে কী বুঝবে বলুন তো! পুরো ক্লাস হো হো করে হেসে ওঠে। মুসলিম ছাত্র টি বলে, যেদেশে সোনু নিগম, শ্রেয়া ঘোষাল আর দীপিকা পাড়ুকোন নেই, সেখানে হাজার সুযোগ থাকলেও আমি যেতে পারবোনা। আমার চোখের সামনে এক ঝাঁক উজ্জ্বল ছেলে মেয়ের মধ্যে বসে ভারতমাতা আর বাংলা মা একসঙ্গে হেসে গড়িয়ে পড়েন।

সত্যিই তো, উত্তর আধুনিক বিশ্লেষণে, “স্পেস”-এর থেকে “প্লেস” বড়। গোষ্ঠীর থেকে ব‍্যক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শৈশবের স্মৃতিতে আসে, বাবা মা ডুয়েট আবৃত্তি করছেন, নজরুলের “বলো বীর, বলো উন্নত মম শির….”। হেমন্ত, কিশোর, রফি কানে সবার সুরই গুনগুন করে। চোখ বুজলে পাওলো রসির গোল, মারাদোনার দৌড়, গাভাস্কারের কভার ড্রাইভ, ইমরানের রান আপ, বোলিং সব দেখতে পাই। আজ প্রায় অর্ধশতক বয়সে, মনটা অতীতের দিকে টানে। ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের হাসির মধ্য দিয়ে কলেজ জীবনের বন্ধুদের হাসি ভেসে আসে। কলেজ কেটে অজয় দেবগণের ফুল ঔর কাঁটে, আমির খানের যো জিতা ওহি সিকন্দর দেখা মনে পড়ে যায়। আমার একান্ত ব‍্যক্তিগত ইতিহাসের খাপে খোপে যত জন বসে আছে, তার মধ্যে বেছে বেছে মুসলমানকে বাদ দিতে গেলে আমার নিজেরই যে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস হয়ে যাবে। আজকের শাসকের কাছে আধুনিকের থেকে প্রাচীন বেশি প্রিয়। নিজের প্রাচীন পরিচয় খুঁজতে গিয়ে দেখি, আমি জন্মে শুদ্র, বৈবাহিকে ক্ষত্রিয় আর কর্মে ব্রাহ্মন। এত জটিলতা বাদ দিয়ে, নিজের পরিচয় নিজেই ঠিক করি। আজ আমি জাতীয়তায় ভারতীয়, ধর্মে মানবতাবাদী, কৃষ্টিতে বাঙালি, আর গোত্রে ভৌগোলিক। এ পৃথিবীতে গাছপালা, পশু পাখি ছাড়া মানুষ যেমন বাঁচেনা, ঠিক তেমনি এ ভারতে হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান, বৌদ্ধ, পার্সী সব মিলে মিশে গেছে। আর আলাদা করা যাবেনা। আর বাংলার মাটি চিরকালই সুফী, সন্ত, বাউল প্রভাবিত। যত মত তত পথ এ বাংলার মূল সুর। বিভেদ যতটুকু আছে, তা মুছে দেওয়ার জন্য এই নবীন ছাত্রছাত্রীরাই যথেষ্ট। গত পাঁচশো বছরে দুজন বাঙালি নিখোঁজ। এক শ্রীচৈতন্যদেব আর দুই নেতাজি সুভাষ। প্রথম জন যবন হরিদাস কে বুকে নিয়েছেন, দ্বিতীয় জনের আজাদ হিন্দ ফৌজে সব জাতির জন‍্য এক রান্না ঘর, একসঙ্গে পংক্তি ভোজন। এ বাংলায় তাঁদের শিক্ষা নিখোঁজ হয়নি। আমি আর আমার ছাত্রছাত্রীরা নিখোঁজ হতে দেব না।

কলমে ড.শারদা মন্ডল
অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর
ভূগোল বিভাগ
প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজ
আন্দুল, হাওড়া

রাজভবন, রাজ‍্যপাল ও একটি সাধারণ মেয়ের গল্প

রাজভবন, রাজ‍্যপাল ও একটি সাধারণ মেয়ের গল্প

৪ঠা ডিসেম্বর, ২০১৯

রাজ‍্যপাল কী, তা বোঝার আগেই, শিশুকালে একবার নিবেদিতা ইস্কুলের বার্ষিক উৎসবে রাজ‍্যপাল ভৈরব দত্ত পাণ্ডের হাত থেকে পুরষ্কার নিয়েছিলাম। পরিণত বয়সে দু দুবার গোপাল কৃষ্ণ গান্ধীর ভাষণ শুনে ঋদ্ধ হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে কেশরীনাথ ত্রিপাঠীজীর দর্শনও হয়েছে। যৌবনে রাজভবনের সঙ্গে পরিচয় হল। শ‍্যামল সেন রাজ‍্যপাল থাকাকালীন ক্ষুদ্র এক পারিবারিক সম্মেলনে রাজভবনের আদবকায়দার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। চা চক্রে চায়ে চিনি মেশানো আর নোনতায় সস মাখানোর কিংবা জামবাটি থেকে নিজের প্লেটে একটি মিষ্টি তুলে নেওয়ার চামচের মাপ যে আলাদা, অথবা কোনটির পরে কোন কাজ, এসব জানতুমনা বলে ভুলভাল হয়ে যাচ্ছিল। রাজভবনের রাজকীয় পোশাক আর পাগড়ি পরা বয়স্ক কর্মীরা মুখে কথা বলেন না। কেবল চোখের ইশারায় ঠিক টা দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। রাজভবনের অসংখ্য ঘর, কোনটায় কোন রাষ্ট্রনেতা থাকা পছন্দ করতেন, ইন্দিরা গান্ধী এসে কোন ঘরে থাকতেন, নুরুল হাসানের জন্য শয়নঘর লাগোয়া স্নানাগারের নকশা কেমন পরিবর্তন ক‍রতে হয়েছিল, সেসব মৃদুকন্ঠে কিন্তু অনর্গল বলে চলেছিলেন গাইড। এখানে উচ্চগ্রামে কথা বলা মানা। উচ্চ শব্দে কয়েক শ বছরের প্রাচীন দেওয়াল, ছাদ, আসবাব, তৈলচিত্র, প্রত্ন সামগ্রীর আঘাত লাগে। ইংরেজ আমলের স্মৃতিচিহ্নের বিশাল অংশটির তালা খুলে দেখিয়েছিলেন গাইড। আবছা আলোয় চোখ সয়ে এলে ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। চোখ আটকে গেল, দেওয়ালে ঝোলানো একটি ছবিতে। দেড়শো বছর আগেকার এক তারিখে সস্ত্রীক বড়লাট রাজভবনের ফটকে নেমে আসছেন ফিটন গাড়ি থেকে। ছবিতে মানব চরিত্রগুলির তুলনায় ফিটন গাড়িটি বড় বাঙ্ময়। পিছু ফিরতেই ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম, ঘরের মাঝসারিতে দাঁড়িয়ে আছে স্বয়ং কালো রঙের ফিটন গাড়িটি। এও শুনলাম কর্মীরা অনেক সময়েই অতীত চরিত্রদের পদচারণা অনুভব করেন। অনেকদিন পর্যন্ত মরা আলোয় দেখা রাজভবনের জমকালো অলিগলির ঘোর কাটতেই চাইছিলনা। আমার মা ও ছোট মামা তাঁদের তুতো দাদা ও বাল‍্যবন্ধুর যশের শরীক হতে এই রাজভবন অভিযানের আয়োজন করেছিলেন। আজ মামা অমৃতলোকে। মা পার্কিনসনের ছোবলে নির্বাক।

যাক সে কথা, ভণিতা ছেড়ে এইসব স্মৃতির ঝাঁপি খুলল কেন, সেই আসল কথা টা বলি এবার। আজ দুপুরে কিছু পেশাদারী কাজ সম্পন্ন ক‍রার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছলাম। প্রধান ফটক পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতে চারিদিকে চাপা সন্ত্রস্ত ভাব নজর এড়ালোনা। ইতস্তত কর্মচারীদের জটলা। কেউ বলছেন, আমি ভালোভাবে দেখে নিয়েছি, তো কারোর অনুযোগ, ধু–র, ক‍্যামেরাম‍্যানদের জন্য পুরোপুরি দেখতেই পেলাম না। কানাঘুষোয় বুঝলাম, রাজ‍্যপাল এসেছেন। দু তিনটি দরকারী কাজ সেরে, লাগোয়া ডাকঘরে অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য স্পীড পোস্ট করে, ফুটপাতে এক ভাঁড় জিব-পোড়ানো দুধ-চা খেয়ে মন্দ পায়ে, দুলকি চালে মোড়ের দিকে হাঁটা লাগিয়েছি, এমন সময়ে কানে এল হুটারের শব্দ। সেই মূহুর্তে রাস্তাটি রাজশাসনে যানহীন ও কতকটা যেন জনবিরল। হিন্দু স্কুলের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে পড়ি আমি। এমন সুযোগ কি ছাড়া যায়? ক্ষণেক অপেক্ষা, হুস করে চলে এল লাল নীল আলো জ্বলা রক্ষীবহুল পাইলট ভ‍্যান। কিন্তু একি দ্বিতীয় গাড়িটি আসছে বেশ ধীরে, প্রথমটির সঙ্গে সমলয়ে নয়। সামনে আসতে স্পষ্ট হল, চকচকে খয়েরি নিচু কিন্তু প্রশস্ত গাড়িটির কাচ নামিয়ে হাত নাড়তে নাড়তে চলেছেন রাজ‍্যপাল ধনখড়। পথে পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই একলা আমাকে তিনি চওড়া হাসি উপহার দিলেন, সঙ্গে ঊর্ধ্ব-কর অভিবাদন। চমৎকৃত আমি সম্বিত ফিরে পেয়ে হাসি তো ফিরিয়ে দিলামই, উপরোন্তু তিন তিনবার টা টাও করে দিলাম। প্রায় অর্ধশতকের জীবনে অনেক অভিজ্ঞতাই হয়েছে। এটিই বা কম কি? রাজ‍্যপালের ছোট কনভয় মোড়ের বাঁকে মহাত্মা গান্ধী রোড ধরে অদৃশ্য হওয়া পর্যন্ত একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তারিয়ে তারিয়ে দৃশ্যটি উপভোগ করতে লাগলাম। লক্ষ্য করলাম কলেজ স্ট্রিটের পোড় খাওয়া দোকানি থেকে মোড়ের জটলা, কেউ কেউ হাত তুলছেন বটে, তবে সবাই বিস্ময়ে হতবাক।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল