কয়েক বছর ধরেই উড়িষ্যার দার্জিলিং, দারিংবাড়ি নাম টা শুনছিলাম। গতবছর আমাদের প্রাক্তন ছাত্র প্রদীপ এসে বলল, বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে ও ফিল্ডে গিয়েছিল দারিংবাড়ি। জায়গাটার যা বর্ণনা ও দিল, ঠিক করলাম এবারে যেতেই হবে।
চারমাস আগে রেলের বুকিং শুরু হয়ে যায়। সময়মতো তারিখ না বেছে রাখলে বুকিং পাবোনা। দলবল তো কম নয়। পঁয়ত্রিশ জন ছাত্রছাত্রী। সঙ্গে আমরা মিলে মোট ঊনচল্লিশ। কিন্তু এতদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা সূচী স্পষ্ট নয়। হাজারো চিন্তা ভাবনা, ঝক্কি শেষে একটা দিন নির্দিষ্ট করা গেল। জানুয়ারির শেষে।
দারিংবাড়ির অদ্ভুত বাড়ি
হাওড়া স্টেশন থেকে রাতে ট্রেন। সকালবেলা ব্রহ্মপুর। সেখান থেকে প্রাতরাশ সেরে পাহাড়ি রাস্তায় ঘন্টা চারেকের পথ। আমি এর আগে বিশাখাপত্তনম, আরাকু ঘুরেছি, তাই পূর্বঘাট পর্বতমালা আমার একেবারে অচেনা নয়। কিন্তু এদিকের ভূদৃশ্য বেশ কিছুটা আলাদা। রাস্তা কিছুটা ভালো, কিছুটা আবার খুবই এবড়ো খেবড়ো। তবে দুপাশের অপরূপ সবুজে চোখ জুড়িয়ে যায়। ব্রহ্মপুর থেকে পুরো রাস্তায় একটা বিশেষ ব্যপার নজরে পড়ছিল। সেটা হল প্রতিটি বসতিতে বাড়ির অদ্ভুত নক্সা। আমরা দারিংবাড়ি পৌঁছলাম দুপুর দুটো নাগাদ। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম যে হোটেলের সামনে আমাদের বাসটা দাঁড়ালো, সেই হোটেলের সামনের বিল্ডিং টাও ঐ একই নক্সায় তৈরি। নক্সাটা হল বাড়িগুলি আয়তাকার। অনুপাতে প্রস্থ খুব কম আর লম্বায় খুব বেশি। বাড়িগুলোর সামনের অংশ হল আয়তক্ষেত্রের প্রস্থ। এখানে একটি দরজা ও সরু জানলা থাকে। লম্বায় টানা দেওয়াল এবং সেই দেওয়ালে কোনো জানলা নেই। নেই মানে নেই। আমি এর আগে কখনো এমন বাড়ি দেখিনি। দরজার সোজাসুজি করিডোর উলটোদিকে মুখোমুখি আর একটি দরজা পর্যন্ত। বাকি অংশে পাশাপাশি ছোট ছোট ঘর। করিডোরের দিকে তাদের দরজা খুলছে। দরজার মাথায় করিডোরের দিকে জালকাটা ভেন্টিলেশন। বাইরের দিকে কোনো জানলা নেই। আর কোনো দিক দিয়ে বাইরের আলো বাতাস ঢোকার পথ নেই।
হোটেলের সামনের দিকের বিল্ডিংটা এমন হলেও পিছনের নতুন বিল্ডিং যেখানে আমরা ছিলাম, সেটার প্ল্যান আধুনিক। কিন্তু প্রথম দর্শনে খারাপ লাগলো, হোটেলের ক্যাম্পাসের ভিতরের জমিটা আগাছা, জঙ্গল আর সিমেন্ট বালির রাবিশে ভর্তি। এতটা জায়গা সুন্দর বাগান করা যেত। তবে ঘরগুলো সুন্দর। আমাদের জানলা দিয়ে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল। ডাইনিং হলটাও প্রশস্ত, আর বেশ সাজানো। আশপাশের ছোটোখাটো হোটেলগুলোর নক্সাও আয়তাকার।
কাজ শুরু
বেলা হয়ে গিয়েছিল, সবার খিদে পেয়ে গেছে। দেড়ঘন্টায় খেয়ে দেয়ে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে কাগজপত্র নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। হাতে সময় কম, জায়গাটা চিনতে হবে, সার্ভের কাজ শুরু করতে হবে।
একটাই ঢালু রাস্তা নেমে গেছে। দুপাশে কয়েকটি হোটেল, দোকান। পাকা দোকান কিছু আছে। বেশিরভাগ দোকান বেড়া, খড় আর টালি দিয়ে তৈরি। আনাজ, খাবার জিনিস খোলা রাস্তার ধারে মাটিতে বসে বিক্রি হচ্ছে। আদিবাসী মহিলারা নানা রঙের, নানা রকমের বীজ আর ডালের পসরা সাজিয়ে বসেছেন, বেশিরভাগই অচেনা।
উৎরাই পথে নামতে নামতে সরকারি অফিসও দেখলাম। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি দুরকম ব্যাঙ্কেরই বেশ কয়েকটি শাখা রয়েছে। এ টি এম কাউন্টার ও আছে। নিচের দিকে জিপ আর অটো রিক্সা স্ট্যান্ড রয়েছে বটে। বহুক্ষণ অপেক্ষা করে ভর্তি হলে তবে রওনা দেবে। দেখে মনে হল সবই দূরের যাত্রী। কাজ শেষে হোটেলে ফিরতে হলে, যতটা উৎরাই নেমেছি, ততটাই চড়াই পার হতে হবে। মাঝপথে পা ব্যথা করলে, বাস, অটো, জিপ কিছুই পাওয়ার জো টি নেই। সাইকেল রিক্সাও চোখে পড়লনা। বেশ কিছুটা নেমে চারমাথার মোড় দেখতে পেলাম। এবারে সামনে বেশ ফাঁকা। চারিদিকে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। পূর্ব দিকে ঢালু পথ গড়িয়ে গেছে এলাকার একমাত্র বাস ডিপোর দিকে। খবর পেলাম ওদিকেই বনবিভাগ ও ব্লকের অফিস আছে। আজ আর যাওয়ার সময় নেই। পশ্চিমের আকাশে লাল ফাগের হোলি। লালচে সোনালি রোদের আভায় লাল মাটি আর বাদামি ঘাস জ্বলজ্বল করছে। দূরে পাহাড়ের রং লালে, ধূসরে মাখামাখি। আমার প্রিয় রং নীল। লাল নয়, তবু মাটি থেকে আকাশ সবার এই রংখেলা দেখে কেমন নেশা ধরে যায়। কীকাজে এসেছি ভুলে যেতে ইচ্ছে করে।
ছেলেমেয়েদের ট্রাফিক সার্ভে, রোড মরফোলজি ড্রয়িং, হোটেল সার্ভে আর মার্কেট সার্ভে শেষ হল। ক্লাসে টেকনিক যতই শেখানো হোক, তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে সাহস আর উপস্থিত বুদ্ধি প্রয়োজন হয়। এখানে গ্রুপে ভাগ করে দিতে, ওরা বেশ সুচারু ভাবে চারটে কাজই সম্পন্ন করেছে। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা গ্রামের ছেলেমেয়ে হলেও, বেশ স্মার্ট আর বুদ্ধিমান। ওদের দলে দলে হোটেলের দিকে রওনা করিয়ে দিলাম। কাউকে একা না ফিরতে হয়। পায়ে হেঁটে ফিরতে হবে চড়াই এর দিকে। চারমাথা থেকে পশ্চিম দিকে রাস্তা উঁচু। ওদিকে সামনেই উৎকল সরকারের ট্যুরিস্ট বাংলো। লোহার গেটের আড়ালে বড় সাজানো ক্যাম্পাস। দেখে খুব লোভ হচ্ছিল একবার ঢোকার জন্য। কিন্তু হলনা। মনের কথা মনেই রাখাই বেস্ট, কারণ কাজে এসেছি, আর কাজের নাইকো শেষ। ট্যুরিস্ট বাংলো পেরিয়ে কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে জঙলা মেঠো পথ দিয়ে ঢুকলে জাগ্রুতি NGOএর অফিস। এঁদের কাজ সম্পর্কে অনেক কিছু শুনে এসেছি, একবেলা সময় করে যেতেই হবে। আজ পথটা চিনে রাখলাম। ধীরে ধীরে আমি অগ্নিশা আর সৌরভ উপরে উঠছি। মানে আমার জন্য ওরা ধীরে উঠতে বাধ্য হচ্ছে। অগ্নিশা আজ কলিগ হলেও আসলে প্রাক্তন ছাত্রী। আর সৌরভও কলিগ এবং ছাত্রসম। পথটা দেখে আরাকুর সঙ্গে খুব মিল পাচ্ছি, তবে ওখানে রাস্তা তুলনায় চওড়া আর জমজমাট। লোকসংখ্যা, যানবাহন সবই বেশি। দুদিকে দেখতে দেখতে মন থেকে যেটা খুঁজছিলাম, সেটা দেখতে পেলাম। একটি বাড়ির ছোট রকে তিনটি ছোট, মাঝারি সরস্বতী প্রতিমা। আসলে চারমাস আগে যখন অনেক হিসেব কষে দিন ঠিক করা হয়েছিল, তখন কারোরই খেয়াল হয়নি, মাঝে সরস্বতী পুজো পড়ে গেছে। আসার দিন এগিয়ে আসাতে বাড়িতে মান অভিমান, অশান্তি। বাড়িতে পুজো। প্রতিমা সাজিয়ে লাগেজ ঘাড়ে নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। সব বাড়িতেই মোটামুটি গল্প এক। ছেলেমেয়েরা আজ কাজে বেরোনোর সময়ে ইচ্ছে জানিয়েছিল যে আজ যদি কোথাও সরস্বতী পুজোর মন্ডপ চোখে পড়ে তো ওরা কাজের ফাঁকে আগামীকাল পুজোয় অঞ্জলি দিয়ে আসবে। আমাদের আপত্তি তো কিছু নেই। কিন্তু আজ এত ঘুরেও মন্ডপ খুঁজে পাওয়া গেলনা। এটাতো বাংলা নয় ওড়িশা। তায় আদিবাসী অঞ্চল। এঁরা সকলে খৃষ্টান। অনাদিবাসীরাও থাকেন। প্রতিমা বিক্রি হচ্ছে, মানে পুজো হয়, বাড়িতে হয়। কিন্তু বাড়িতে যাওয়ার মতো যোগাযোগ কারোর সঙ্গে নেই, থাকলেও চল্লিশ জন মিলে যাওয়া সম্ভব হতনা। তিনজন মিলে চকিত সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরাই হোটেলের ঘরে পুজো করব। প্রতিমা থাকলেও কেনা সম্ভব নয়। অচেনা জায়গায় ভাসান দেব কোথায়? আমার ব্যাগে মা সরস্বতীর ছবি ছিল। ঠিক হল ঐ ছবিতেই পুজো হবে। এবারে এক প্যাকেট ধূপ, একটা ধূপদানি, মোমবাতি, দেশলাই আর কিছু ফল কিনতে হবে। এগুলোই হবে আমাদের পুজোর উপকরণ। এগুলো কেনার জন্য আমরা দোকানে দোকানে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। তখনই নজরে পড়ল যে বাসন কোসন আর মণিহারী জিনিসের দোকানদার সব উত্তর ভারতীয়। স্থানীয় মানুষ স্থানীয় ফসল, ফল, মুড়ি, মোয়া এসব বিক্রিবাটা করছেন। আর বাকি দোকানের মালিক ওড়িয়া, কিন্তু আশপাশের জেলা থেকে এসেছেন। কেউই এখানকার ভূমিপুত্র নন। ব্যবসার জন্য এখানে থাকেন। হোটেল ব্যবসা যাঁরা করছেন তাঁরা বেশিরভাগই গঞ্জাম জেলার মানুষ। ব্রহ্মপুরের সমতল থেকে পাহাড়ি পথে দারিংবাড়ি ওঠার সময়ে আমরা গঞ্জাম জেলা পেরিয়ে এসেছি। তবে কি ঐ অদ্ভুত বাড়ি গঞ্জাম জেলার বৈশিষ্ট্য? একটা জিনিস স্পষ্ট বুঝলাম। দারিংবাড়ি ওড়িশার পর্যটন মানচিত্রে এসেছে ২০১৫ সালে। এখন ২০২০। ব্যবসা বাণিজ্য, নতুন যানবাহন, নানান কারণে এই আদিবাসী অধ্যুষিত পাহাড়ি জনপদে অনাদিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে। পথে ঘাটে প্রচুর আবর্জনা ছড়িয়ে রয়েছে, ঠিক আমাদের হোটেলের চারপাশের মতো। সদ্য উন্নয়নের ধাক্কা লেগেছে, পরিপক্ক হতে সময় লাগবে। অনেক খুঁজেও ফুল পাওয়া গেলনা। গাছের ফুলও যে বিকিকিনির জিনিস, সেটা এখনও স্থানীয় মানুষের ধারণায় আসেনি। ফল কি কেনা যায়! ফলকাটার সময় নেই, কেটে রাখার ও জায়গা নেই। এমন কোনো ফল চাই যা পকেট ফ্রেন্ডলি, ফিরে গিয়ে সব টাকার পাইপয়সা হিসেব দিতে হবে। পাঁচদিন ফিল্ডের খরচ চালাতে হবে। আবার প্রত্যেকের ভাগে যাতে একটা গোটা ফল পড়ে, সেটাও ব্যবস্থা করতে হবে। প্রথমে আপেল দর করে পিছিয়ে আসতে হল। পকেটের থেকে ভারি ফলে পকেট ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। নজর পড়ল স্থানীয় উৎপাদন মোলায়েম হলুদ পুরুষ্টু পাকা কলার কাঁদির দিকে। মা সরস্বতী সবই দেখছেন, বুঝছেন। শস্তায় পুষ্টিকর দিশি কলায় অরুচি তাঁর হবেনা নিশ্চিত। আমরা ঊনচল্লিশ, ভ্রমণ সংস্থার কর্ণধার বিদ্যুৎবাবু ও তাঁর দল আছেন। পুজো হবে, আর হোটেলের কর্মীদের মধ্যে সামান্য কিছু বিলি হবেনা, তাতো হয়না। তাঁদের সহযোগিতাও তো দরকার। এক কর্তা গিন্নির দোকানে ষাটটা কলা বেঁধে দিতে বললাম। এই অভাবনীয় খরিদ্দারির প্রস্তাবে তাঁদের চোখে উপচে পড়ে আনন্দ ও বিস্ময়, মুখে অনাবিল হাসি। বাঙালির স্বভাব বাইরে গেলেই হিন্দি বলা। এখানে হিন্দি বলে সুরাহা হলনা। আকার ইঙ্গিত সহকারে বাংলাটাই ওনারা বুঝতে পারলেন। উড়িষ্যায় সেটা স্বাভাবিক। এই পূর্বঘাটেই পথের পাশে লম্বা লম্বা শিমের বিচির মতো সাদা রঙের বীজ দেখে অন্ধ্রপ্রদেশের আদিবাসী মহিলাদের জিজ্ঞাসা করতে চেয়েছিলাম এটা কি খাওয়া হয়? তেলেগু জানিনা। ওঁরা হিন্দি বোঝেননা। শেষে পরিষ্কার বাংলায় বললাম, “রান্না হয়?” ওঁরা মাথা নেড়ে একগাল হেসে একমুঠো বীজ ব্যাগে ভরে দিয়েছিলেন।
কলা, ধূপ আর ধূপদানি নিয়ে তাড়াতাড়ি পা চালাই। অন্ধকার পথ, দোকানের আলো মিলিয়ে এসেছে। সবাইকে বুঝিয়ে কিভাবে সব সুষ্ঠুভাবে আয়োজন হবে জানিনা। তবে ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছে, সৌরভ খুবই উত্তেজিত। হতেই হবে, শিক্ষক হিসেবে এটা ওর প্রথম ফিল্ড, আর অগ্নিশার দ্বিতীয়। প্রথমবার ও জড়োসড়ো ছিল। এবারে সেটা নেই। কিন্তু আমি যেহেতু ওর ডাইরেক্ট টিচার, তাই খাপ খুলছেনা। বাইশ বছর পড়ানোর চাকরি রে বাবা, আমার চোখ এড়ানো কি অতই সহজ!!
জয় জয় দেবী
হোটেলে ঢোকার মুখে কাচের দরজার বাইরে দেখি রিসেপশনের ছেলেটি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছে। সৌরভ তাকে দেখেই উদগ্রীব প্রশ্ন করে বসে, আপকে পাস্ ঘন্টা হ্যায়? আরে, সত্যিই তো, রিসেপশনে গণেশ মূর্তি আছে। সৌরভের বেশ বুদ্ধি। ছেলেটি কী উত্তর দিল শোনার আগেই দেখি অগ্নিশা দৌড়ে একটু দূরে চলে গেল। আমিও ওর কাছে চলে এসেছি। সৌরভও দৌড়ে এসেছে। অগ্নিশা মুখ চেপে হাসছে। সৌরভকে দেখিয়ে দুহাতের বুড়ো আঙুল তুলে ঠোঁট উল্টে আমাকে বলছে, “আপকে পাস্ ঘ-ন্-টা হ্যায়”। ও হরি, সৌরভের প্রশ্নটা affirmative করে বললে অর্থটা বদলে যায়। তিনজন মিলে খুব একচোট হেসে নিলাম। অগ্নিশার স্নাতকোত্তর হিন্দি বলয়ে। হিন্দিতে ও আমাদের থেকে অনেক বেশি চোস্ত। একটু আগেই দেখেছি এটা হিন্দির জায়গা নয়। বাংলায় বললেই ছেলেটি বুঝতে পারতো। যা হোক চারিদিকে টেনশনের মাঝে এগুলোই অক্সিজেন।
হোটেলে ফিরে সবাইকে ডেকে বুঝিয়ে দেওয়া হল আগামীকাল সকাল সাড়ে সাতটায় প্রাতরাশ। সাড়ে ছটার মধ্যে সকলকে স্নান সেরে রেডি থাকতে হবে। আধঘন্টার মধ্যে আমরা ঘরেই পুজো সেরে নেব। প্রসাদ এবং প্রাতরাশ খেয়ে আটটার মধ্যে সার্ভেতে বেরিয়ে পড়তে হবে। রোদ চড়ে গেলে কষ্ট বাড়ে। আজ বিকেলে যা যা কাজ হয়েছে, সেগুলো এবার ফাইনাল করতে হবে। ছেলেমেয়েদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আমরা বসলাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে।
আজ বিকেলে যখন আমরা কাজ করছিলাম, তখন বাজারে একটা জিপ ঘুরে ঘুরে মাইকে ঘোষণা করছিল। ওড়িয়াতে হলেও কেতাবি ঢঙে ধীরে ধীরে বলছিল বলে পুরোটাই আমরা বুঝতে পেরেছি। বিদ্যুৎ বাবু আমাদের কাছাকাছি আদিবাসী গ্রামের মৌজা ম্যাপ যোগাড় করে দিয়েছিলেন, সেখানে কাজ করার জন্য। ঐ ঘোষণা শুনে সেদিকে পা না বাড়িয়ে আমরা আজ দারিংবাড়ি মিউনিসিপ্যালিটি আর বাজারের মধ্যেই থাকব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আগামীকাল বাড়ি বাড়ি ঘুরে হাউসহোল্ড সার্ভে হবে। ডাম্পি লেভেলে টেরেন প্রোফাইল আর কনট্যুরিং হবে। নতুন সি বি সি এস সিলেবাস অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গার মাটি আর জল পরীক্ষার জন্য স্যাম্পল সংগ্রহ হবে। আবার সরকারি অফিসগুলো থেকে যথাসম্ভব সেকেন্ডারি তথ্য যোগাড় করতে হবে। একটা দিনের জন্য হারকিউলিয়ান টাস্ক। কখন কী হবে আর কতজন থাকবে, কে কোন কাজে উপযুক্ত, সব কিছু ছকে ফেলতে হবে। বাজারের ঘোষণায় বলা হচ্ছিল আগামীকাল এন আর সি এবং সি এ এ – র বিরোধিতায় বন্ধ ডাকা হয়েছে, কোনো দোকান খুলবেনা, কোনো গাড়ি চলবেনা। এলাকায় উত্তেজনা থাকলে ছেলেমেয়েরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবে কিকরে? তিনজন মিলে যুক্তি করে পরিচয়, পরিযান, আদি বাসস্থান সংক্রান্ত যে সব বিশদ প্রশ্ন থাকে, সব কেটে বাদ দিয়ে দিলাম। প্রশ্নপত্র একেবারে ছোট করে ছেঁটে ফেলেছি, এবারে ক্যাপ্টেনদের ডেকে বলে দিতে হবে, ডিনারের পর ঘরে না গিয়ে সবাই যেন ডাইনিং হলে আধঘণ্টা থেকে যায়, আগামীকালের কাজ নিয়ে ডিসকাশন হবে। দরজা খুলে বেরোতে যাব দেখি ছেলেরাই আমাদের ডাকতে এসেছে। ছোট ঘর গুলোতে তিনজন করে আছে। একটা বড় ঘরে ছজন ছেলে আছে, অভিজিৎ, অনিত, অর্পন, ইভান, সায়ন, নাজিবুল। কাল পুজোর জন্য ওদের ঘরেই ঠাকুর সাজানো হয়েছে। আমাদের দেখতে যেতে হবে। ঘরে ঢুকে আমি তো অবাক। ছেলেমেয়েরা অসাধ্য সাধন করেছে। খাট ওপাশে ঠেলে দরজার সামনে লম্বা মেঝে, পরিষ্কার মোছা। মাঝখানে একটি প্লাস্টিকের চেয়ার।ইন্সট্রুমেন্ট মোছার পেপার টাওয়েল দিয়ে চেয়ার ঢাকা দেওয়া। তার ওপরে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো সরস্বতী ঠাকুরের ছবি। ছবিতে কাগজের মালা। সামনে মেঝেতে খবরের কাগজ পেতে কলার কাঁদি, ধূপের প্যাকেট, ধূপদানি, দেশলাই, মোমবাতি, পিতলের ঘন্টা ও পঞ্চপ্রদীপ। সব আমাদের পারমিতা সাজিয়েছে। শুনলাম শেষের ঊপকরণদুটি যোগাড় হয়েছে, হোটেলের রিসেপশন থেকে। এতেই শেষ নয়। হোটেলের পুরোনো বাড়ির ছাদে ফুলের টব আছে। সকালে সেখান থেকে ফুল পাড়ার অনুমতি পাওয়া গেছে। বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের সরস্বতী পুজোর মন্ত্রোচ্চারণ হোয়াটস্ অ্যাপে পেয়ে ডাউনলোড করা হয়ে গেছে। গান শোনার ফোন স্পিকার সেট করা হয়ে গেছে। অঞ্জলি দেওয়ার মন্ত্র ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছেনা। তাই অরগানাইজারেরা যথেষ্ট চিন্তিত। সবার একটা আর্জি আছে, কাল মিষ্টি আনতে হবে। মিষ্টিমুখের প্রস্তাবে না করা কি যায়? তবে কাল যে বন্ধ্! শুনলাম হোটেলের ছেলে কথা বলে দোকান খুলিয়ে দেবে। লাড্ডু পাওয়া যাবে। ব্যস আয়োজনের পনেরো কলা পূর্ণ, কেবল অঞ্জলির মন্ত্রটুকু। ঘরটা বেশ পুজো পুজোই লাগছে, এটা স্বীকার করতেই হবে।
ডিনারের পর ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া হল যে কাল আমরা কি কি করব এবং কি কি করবনা। ঘরে ফিরে এসে আবার নিজেদের মধ্যে একদফা প্ল্যান, যুক্তি তর্ক সেরে অবশেষে বিছানা। বিকেলে যে জানলা দিয়ে পাহাড় দেখা যাচ্ছিল, এখন সেখানে কাচের ওপারে জমাট বাঁধা অন্ধকার। গতরাতে ট্রেনে ছিলাম। সকালে বাস জার্নি, এখানে পৌঁছনো ইস্তক এত কাজ হয়ে গেল, মনে হচ্ছে আজ নয়, বেশ কিছুদিন দারিংবাড়িতে আছি। কাল কি যে হবে। একে তো দিন কে দিন যাতায়াত আর হোটেল খরচ বাড়ছে। তার ওপর কখনো প্রাকৃতিক, কখনো সামাজিক নানা কারণে ফিল্ড করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। আগে আটদিনের কমে ফিল্ড হবে এটা কল্পনাও করা যেত না। একটা জায়গার সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে না উঠলে তাকে অনুভব করা যায়না। অনুভব না থাকলে পরিবেশ মানুষ সম্পর্কের বোধ জন্মায় না। বোধ তৈরি না হলে, কুঁড়ি ফোটা ভৌগোলিকেরা প্রস্ফুটিত হবে কেমন করে। এবারে তো সব জলাঞ্জলি দিয়ে পাঁচদিনের ফিল্ডে এসেছি। আসা যাওয়া, মাঝে তিন দিন। একদিন বন্ধ পড়ে গেল। মা সরস্বতী মাথায় আছেন, তিনিই দেখবেন। একরাশ চিন্তা মাথায় নিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, জানিনা।
ঘুম ভাঙলো বেশ ভোরে। শীতকাল, এখনো ভালো করে আলো ফোটেনি। আজকের সার্ভের জন্য দরকারি কাগজপত্র ফাইলে গুছিয়ে নিলাম। কুয়াশা ভেজা কাচের জানলা দিয়ে সকালের নরম রোদ ঢুকে অগ্নিশার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে। শাল গায়ে জড়িয়ে দুজনে করিডোরের কমন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। নিচে ভ্রমণ সংস্থার রন্ধন কর্মীরা অতি দ্রুত প্রাতরাশ তৈরি করছেন। এতবছর ধরে দেখছি, এঁরা যে কখন ঘুমান, কখন ওঠেন হিসেব করা মুস্কিল। সবই ঘড়ির কাঁটা ধরে চলে, নড়চড় নেই। বলতে বলতে চা বিস্কুট হাজির। অন্যদিন হলে চায়ের কেটলি নিয়ে ঘরে ঘরে নক করে ঘুম ভাঙাতে হয়। আজ সব উত্তেজনায় ফুটছে, করিডোর দিয়ে সেজেগুজে এঘর ওঘর হুড়োহুড়ি করছে। কালকের দুশ্চিন্তা আর মনে আসছেনা। অঞ্জলি দিতে হবে তো, চা বিস্কুট ফেরত পাঠালাম। ফিল্ডের নিয়ম হলো একই পোশাকে যতদিন কাটানো যায়, সেই চেষ্টা করা। কিন্তু আজ সে নিয়ম চলবেনা। জ্যাকেট আর সোয়েটারের তো বদল হবেনা, কারণ স্টকে একটি মাত্রই আছে। মোজাটা নতুন পরে নিয়েছি। পুজোর ঘরে ফুল সাজানো শেষ। ছাদের টবে সাকুল্যে পাঁচটি ফুল পাওয়া গেছে। হালকা কমলা রঙের বড় পঞ্চজবাটি চেয়ারে ঠাকুরের সামনে মাঝখানে। সবচেয়ে লোভনীয় বাক্স ভর্তি লাড্ডু। ও বাবা সৌরভ একেবারে রেডি হয়ে চলে এসেছে, আবার পরনে ঊজ্জ্বল বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবি। কিন্তু অঞ্জলির মন্ত্রের কী হল? খবর পেলাম, আমাদেরই এক ছাত্রীর বন্ধুর বাবা পুজো করেন। সেই বন্ধু খাতায় মন্ত্র লিখে ছবি তুলে পাঠিয়ে দিয়েছে। তাই আয়োজনের ষোল কলা পূর্ণ। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ছটা পেরিয়ে পৌনে সাতটার দিকে। মেঝেয় সবার দাঁড়ানোর জায়গা হচ্ছেনা বলে বাকিরা খাটে উঠে পড়েছে। তিল ধারণের জায়গা নেই। মোবাইল ধরে ক্যামেরাম্যানেরা রেডি। আমাদের অগ্নিশা সব্যসাচী। বামহাতে ঘন্টা নেড়ে ডানহাতে পঞ্চপ্রদীপের আরতি করতে পারে। ভ্রমণ সংস্থার রান্নাঘর থেকে সর্ষের তেল যোগাড় হয়েছে। তুলো সঙ্গেই ছিল, সলতে তেলে ভেজানো আছে। স্পিকারে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র পাঠ শুরু করেছেন। বিদ্যুৎ বাবুও এসে দাঁড়িয়েছেন পুজোর ঘরের দরজায়। পঞ্চপ্রদীপের আগুনের আভা সকলের চোখে। সঙ্গে ঘন্টাধ্বনি বলছে আমরা সবাই এক। এই অনুরণন ঢেউ হয়ে ভেসে যাক পাহাড়ে জঙ্গলে, ছড়িয়ে পড়ুক আসমুদ্র হিমাচলে। ফুল তো নেই, মোবাইল দেখে অগ্নিশার উচ্চারণের সাথেই সকলে চোখ বুজে অঞ্জলি দিলাম নিজেদের ভক্তি।
প্রসাদ বিতরণ সারা হল। এবার ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়। ছেলেমেয়েরা বেশিরভাগ হাউসহোল্ড সার্ভে করবে হোটেলের চারপাশের বাড়িগুলিতে। দূরে যাবেনা। একটা ছোট দল আর ইন্সট্রুমেন্টের ট্রলি নিয়ে রওনা হলাম চারমাথার মোড়ের দিকে। বেরোনোর মুখে দেখি দুপুরের খাবারের যোগাড় চলছে। আজ আর মাছের ঝোল নয়। আমাদের আবদারে মেনু বদল। খিচুড়ি, লাবড়া, ধোঁকার ডালনা, চাটনি, পায়েস। মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছে। একটা প্রত্যয়ের অনুভূতি, সবাই তো আছি। যা হবে দেখা যাবে।
দ্বিতীয় পর্ব
চারমাথার মোড়টা ইন্স্ট্রুমেন্ট সার্ভের পক্ষে বেশ উপযোগী। বন্ধ থাকার জন্য শাপে বর হয়েছে। নিরিবিলিতে কাজ করা যাচ্ছে। ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে নৈনিতালে একবার লোকজন আর যানবাহনের চাপে খুব অসুবিধে হয়েছিল। সব শেষ হল বেলা বারোটা নাগাদ। এবার অফিসগুলোতে যেতে হবে। হাউসহোল্ড যারা করছে, সৌরভ ওদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রেখেছে। জল আর মাটির স্যাম্পল যারা সংগ্রহ করছে, তাদের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়ে গেল। যানবাহন অমিল। তাই হন্টন বিনা গতি নেই। সব কিছু শেষ করে, পায়ের দড়ি ছিঁড়ে হোটেলে যখন ফিরলাম, ঘড়িতে বাজল তিনটে। সেকেন্ডারি ডাটা যোগাড় হয়েছে। হাউসহোল্ড সার্ভেও শেষ। ছেলেমেয়েরা স্থানীয় মানুষজনের কাছ থেকে ভালো ব্যবহার পেয়েছে। অনেক ঘুরেছে। তারা বেশ সন্তুষ্ট। লাঞ্চ করে ডাইনিং হল ছেড়ে যখন বেরোলাম, তখন বিকেলের রোদ পড়েছে গাছের মাথায়। বিশ্রামের সময় নেই, এবারে একটি বেসরকারি অফিসে যেতে হবে। আমাদের বাস ড্রাইভার বন্ধ বলে বেরোতে ভয় পাচ্ছেন। শেষে হোটেলের অ্যামবাসাডরের ব্যবস্থা হল বটে, সকলের যাওয়াটা গেল আটকে।
গাড়ি চলল চারমাথার মোড় পেরিয়ে ডানদিকে। এদিকে রাস্তা ফাঁকা। অফিসে ঢোকার পথটা মিস হয়ে গেল। ভুল করে আমরা এগিয়ে চললাম দূরে। দুপাশে ঘাসের দৈর্ঘ্য বাড়ছে। সোনালি রোদ লালচে হয়ে আসছে। একি আমরা তো পাহাড়ে উঠে পড়ছি। অনেক দূরে ছোট একটা আদিবাসী গ্রাম দেখা যাচ্ছে। আজ অফিসে কাজ করার সময়ে এক স্থানীয় স্কুলের হেডমাস্টার মশায়ের সঙ্গে আলাপ হল। তিনি গবেষক ও বটে। বাংলাতেও যান বক্তৃতা দিতে। তাঁর কাছে শুনছিলাম এই এলাকায় ইংরেজ আমল থেকে আদিবাসী অনাদিবাসীদের সম্পর্কের জটিল অন্তর্জাল। আমার ইতিহাস জ্ঞানের দৌড় মাধ্যমিক পর্যন্ত। সিধু কানু বিরসার কথা পড়েছি। তবু মনে হয় তখন সিলেবাসে আদিবাসী বিদ্রোহ বিশদে ছিলনা। এখন মেয়ের ক্লাস টেনের বইতে জঙ্গলমহলের কোল বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ অনেক বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা আছে। সামাজিক ভূগোল বুঝতে গেলে ইতিহাসের বোধ জরুরী। ওড়িশার কন্ধ উপজাতির কাহিনী যা শুনলাম, তাও ঐসব বিদ্রোহের কাহিনীর সমতুল্য, আর সেটাই স্বাভাবিক। ইংরেজ মিশনারিরা উপজাতি মানুষদের খৃষ্টধর্মে দীক্ষিত করেছেন, যা আজও মূলধারার স্থানীয় সমতলের বেশিরভাগ মানুষের থেকে স্বতন্ত্র। আজ ঐ সমতলের মানুষ পাহাড়ি পরিবেশের সৌন্দর্য কে কাজে লাগিয়ে পর্যটন ব্যবসা বাড়াতে চায়। তার জন্য লাগবে বাড়তি জমি। কে না জানে জমির অধিকারের লড়াই হল খাদ্য আর বাসস্থানের জন্য মানুষের আদিম লড়াই। ভদ্রলোকের কথা গুলো ভুলতে পারছিনা। আজকের হোটেল আর দোকানগুলো জনজাতির মানুষের জমিতেই তৈরি হয়েছে। তাঁরা সরে গেছেন পাহাড়ের আরও উঁচু ঢালে। পূ্র্বঘাট বেশি তো উঁচু নয়। টপকে গেলে দেশের মধ্যকার জমি, আরও বেশি জনবহুল। সরতে সরতে আর কোথায়? কোথায় ভূমিকন্যা ও পুত্রদের পরিযানের শেষ? দারিংবাড়ির ঘাসের, পাহাড়ের, রোদের লাল রং মানুষের শিরার ভিতরের লাল রংটার কথা কি আমায় বলতে চাইছে?
আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। “চলুন ম্যাডাম”,সম্বিৎ ফিরল সৌরভের ডাকে। গাড়ি থেমেছে। আমরা এখন ঈপ্সিত অফিসের সামনে। কেরলের এক ভদ্রলোক গত শতকের আটের দশকে এই সংস্থা তৈরি করেছিলেন আদিবাসী কল্যাণে কাজ করার জন্য। এঁদের একটা লাইব্রেরি আছে। স্থানীয় স্কুলের ছেলেমেয়েরা বই নেয়। অনেক রকম স্থানীয় শস্যের নমুনা দেখলাম। একটা কথা শুনলাম, ২০০৮ সালে জাতি সম্পর্ক মান অভিমানের সীমা পেরিয়ে ঘাত প্রতিঘাতে পৌঁছেছিল। তখন থেকে সরকারি ব্যবস্থা অতি সতর্ক। একথাগুলো নির্দিষ্টভাবে জানার আগেই ভৌগোলিকের চেতনা আমাকে জানান দিচ্ছিল। মানুষের যন্ত্রণা মনে বাজে, কাঁটার মতোন বিদ্ধ করে।
দরকারি কাজ সেরে হোটেলে যখন ফিরলাম তখন সন্ধ্যা নেমেছে। হোটেলের উল্টোদিকে একটা হনুমান মন্দির আছে। সেখান থেকে ঘন্টা ধ্বনি শুনে লোহার গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। একজন মাত্র পূজারী আরতি করছেন, আর জনমনিষ্যি বলতে আমরা এই কজন। গর্ভগৃহে টিমটিমে হলুদ বাল্ব জ্বলছে। কামিনীর গন্ধ আসছে নাকে।পাঁচিলের মধ্যে ধারে ধারে ফুলগাছ, পাতাবাহার। মাথার ওপরে শুক্লা পঞ্চমীর আধখানা চাঁদ। আকাশে মেঘ নেই, চারিপাশে বিজলি আলো যথেষ্ট নেই। প্রায়ান্ধকার নিরিবিলি এই মন্দিরটিতে মনটা ভারি শান্ত লাগছিল। মনের মেঘ আর নেই।আরতি শেষ হল। আমাদের ঘরেও যে সরস্বতী মা বসে আছেন, তাঁকেও আরতি করতে হবে।
মুস্কিল আসান অগ্নিশা তো আছেই। আমাদের আরতি ও সুসম্পন্ন হল। উমম্ জলখাবারে আজ চাউমিন হয়েছে। ছেলেমেয়েদের পছন্দ, আর দুজনের ও খুব – কাদের আবার সৌরভ আর অগ্নিশা। খেতে খেতে গল্প হল। সারাদিনের ক্লান্তি আর নেই। এই জিনিসটা আমি ফিল্ডে এলেই খেয়াল করি। সমতলে দূষিত বাতাসে কাজ চালাই তো, প্রকৃতির কাছে বাড়তি অক্সিজেনে নিশ্বাস নিয়ে চট করে ক্লান্ত হইনা। আজ বিভিন্ন দলে কী কী কাজ হয়েছে তার খতিয়ান নিয়ে বসা হল। মূল মৌজা ম্যাপটা বিদ্যুৎ বাবু এখানে আসার আগেই যোগাড় করে দিয়েছিলেন। ঐ ম্যাপে বসানোর মতো যথেষ্ট প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি ডাটা আমাদের যোগাড় হয়েছে। কিন্তু মুস্কিল হল এখনও দুটো মোক্ষম কাজ বাকি আছে। ক্লাইনোমিটার সার্ভে আর প্ল্যান্ট ডাইভার্সিটি ম্যাপিং। টাইমে কুলোবে কিকরে? কাল যে সাইট সীয়িং এ বেরোনোর কথা। এলাকার উল্লেখযোগ্য ভূদৃশ্য গুলিও যে ছেলেমেয়েদের দেখাতে হবে। এই পৃথিবীই যে ভূগোলের ল্যাবরেটরি। অবশ্য এজন্য অন্য বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা একটু দুঃখ করেন। টাইম ম্যাপিং এর জন্য ডিনারের সময়ে বিদ্যুৎ বাবুর শরণাপন্ন হলাম। সমাধান সূত্র ও মিলে গেল সহজে। সবই নির্ভর করছে আমরা কত ভোরে উঠে কাজ শেষ করতে পারব তার ওপরে। ঘুমোতে গেলে জায়গা দেখা যাবেনা। এটা শহর নয়। এখানে সূর্য ঘড়ি অনুসরণ করে চলতে হবে। তিনি অন্তর্হিত হলে বাইরের কাজও সাঙ্গ হয়। ঘরে ঘরে ডিনার টাইম মিটিং এর ডাক গেল। ছেলেমেয়েদের অনেক এনার্জি, কিন্তু সব বাড়ির রাজপুত্র রাজকন্যে। এত পরিশ্রম করার অভ্যেস তো নেই। থাকলেও এধরনের কাজ ওদের কাছে একেবারেই নতুন। এখনই বেশ রাত। সারাদিন রোদে পুড়ে কাজ করেছে। কাল আবার খুব ভোরে ওঠা। একটা অন্য সমস্যাও হয়েছে। দুদিন কাটল। জল খারাপ। মেট্রোজিল, নরফ্লক্স টি জেড এবং অন্য সমতুল্য ওষুধের খোঁজ পড়েছে সব ঘরে। যদিও জটিল কিছু নয়, তবু ওরা পারবে তো? ছেলেমেয়েদের বলাতে তারা এককথায় রাজি। যেকোনো কষ্ট করতে প্রস্তুত। ভোরে লাইট টিফিন করেই সার্ভে। ফিরে এসে আর্লি লাঞ্চ করে সারাদিনের জন্য বেরিয়ে পড়া।
রাতে আবার তিনজন যুক্তি করতে বসলাম। আসল চ্যালেঞ্জ আমাদের। ছেলেমেয়েরা কাজগুলো তো জানেনা। দুঘন্টার মধ্যে লোকেশন খুঁজে, ওদের শিখিয়ে দু দুটো সার্ভে কমপ্লিট করা কি সম্ভব? এদিকে যত দেরি হবে, ওদিকে একটা করে সাইট বাদ যাবে, সেটা কি মানা যায়? কখনোই নয়। আমাদের ভিতরের ছেলেমানুষগুলো মরে গেছে বুঝি!! আচ্ছা আমরা পুরো টীম সকলে কাল যে অত কষ্ট করব, একটা প্রাইজ নেবনা? কাল এক ফাঁকে ঠাকুর ও তো তুলতে হবে। ফিরে এসে দধিকর্মা পেলে কেমন হয়। প্রতিবারই বিদ্যুৎ বাবু আমাদের নানা আবদারে পাগল হন, কিন্তু এটা যে সম্পূর্ণ অন্য। আচ্ছা উনি কি শুয়ে পড়েছেন? ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তিনজন ই লাফিয়ে উঠেছি। রাত একটা ছুঁই ছুঁই। অন্তত চারঘন্টার বিশ্রাম চাই এক্ষুনি শুয়ে না পড়লে, নিজেরাই উল্টে যাব।
তৃতীয় পর্ব
ভোরেই রান্নাঘরে দধিকর্মার আর্জি পেশ করলাম। মঞ্জুর ও হল। এবারে সবাই মিলে ঘড়ির সঙ্গে যুদ্ধে নামলাম। কাজ শেষ করেই ছোড়েঙ্গে। আবার দারিংবাড়ি সবটা দেখার পণটাও নেহি তোড়েঙ্গে।
হোটেলের সামনে থেকে ঢালু পায়ে চলা পথ গড়িয়ে গিয়েছে বাস রাস্তার দিকে। বেশি খোঁজাখুঁজি করে মাথাগরম করার দরকার কী?। এপথে যথেষ্ট ঢাল আছে। ক্লাইনোমিটার সার্ভে ভালোই হবে। হৈ হৈ করে সকলে কাজে নেমে পড়লাম। এর পর একটা উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে হবে, যেখানে প্ল্যান্ট ডাইভার্সিটি ম্যাপিং করা যায়। বাস রাস্তায় পৌঁছে কয়েকজন বলল, ওপারে একটা জায়গা আছে যেখানে ঐ কাজ করা যেতে পারে। গতকাল হাউসহোল্ড সার্ভে করতে করতে ওরা ওখানে পৌঁছে গিয়েছিল। আচ্ছা যাওয়া যাক তাহলে।
রাস্তা পেরিয়ে বিরাট মাঠ, আর বিশাল দুটো অশ্বত্থ গাছ। আরও এগোই। ওপাশে তো একটা মন্দির মনে হচ্ছে। গত দুদিন আমরা বাজার পেরিয়ে চারমাথার মোড়ের দিকে কাজ করছিলাম। ওদিকে সব চার্চ দেখলাম। এদিকটায় তার মানে মন্দির গুলো আছে। ভাবনা মুক্ত হয়েই এগোচ্ছিলাম, কল্পনা করিনি দুমিনিট পরে কোন বিস্ময়ের সম্মুখীন হতে যাচ্ছি। জানিনা পাঠক বিস্মিত হবেন কিনা। জিওমরফোলজির বইএর পাতা জ্যান্ত হতে দেখলে ভৌগোলিকের হৃদস্পন্দন নিজের বশে থাকেনা। একটু গুছিয়ে নিই। তার পরে বলছি।
দারিংবাড়ির আবিষ্কার
আমি যা প্রথম দেখি, তা আমারই আবিষ্কার – একথা বলেছিলেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এখানেও ব্যপারটা কতকটা অমনি হল। আমি খুঁজছিলাম এমন একটা জায়গা যেখানে স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠা ছোট বড় গাছপালা মিলে মিশে রয়েছে, মানুষের লাগানো গাছ নয়। আবার খুব বেশি ঝোপ জঙ্গল থাকলে ছেলেমেয়েদের কাজের অসুবিধে হবে। অশ্বথ গাছ পেরিয়ে মন্দিরে ঢোকার পায়ে চলা পথ। পথের ওপারে এবড়ো খেবড়ো একটা উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেল, যেখানে প্ল্যান্ট ডাইভার্সিটির কাজ করা সম্ভব। আরও একটু দূরে গেলে গাছ আরও ঘন। কিন্তু শুনলাম ওদিকে অনেক সাপের গর্ত। স্থানীয় মানুষ বারণ করছেন। হোক শীতকাল। ছেলেমেয়ে সঙ্গে নিয়ে বিবেচনা জলাঞ্জলি দেওয়া যায়না। আমরা সামনের দিকেই রইলাম। যে স্পটে কাজ করতে চাইছি, তার ডান সীমানা দিয়ে সোজা চলে গেছে উঁচু মাটি আর পাথর দিয়ে তৈরি বাঁধ। সে বাঁধ দিয়ে যাতায়াত করা যায়। মানে আমরা মেয়েরা যেতে পারব। কিন্তু ছেলেদের নিচে দিয়ে যেতে হবে। এমন অদ্ভুত নিয়ম কেন? আগে খেয়াল করিনি। বাঁধটা বেশ কিছুটা নাক বরাবর গিয়ে ডানদিকে বেঁকেছে, আসলে গোল হয়ে বিশাল একটা নিচু জায়গাকে ঘিরে রেখেছে। আমাদের সামনে বাঁধের গা ঘেঁষে সিমেন্টের দেওয়াল তোলা আছে। ডানদিকে সিঁড়ি নেমে গেছে। মন্দিরের মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে জানলাম সিঁড়ি দিয়ে নেমে মহিলাদের স্নানের জায়গা। পুকুর তো নেই এখানে। আমার সন্দেহ গাঢ় হচ্ছে। কথা বলে তা নিরসন হল। মাটির তলা থেকে সারাবছর জল ওঠে। একজন ছাত্রকে বলি জিজ্ঞেস করোতো, ওটা কোন ঠাকুরের মন্দির। যা ভেবেছি তাই। দেবাদিদেব শিবশম্ভুর ভজনা করা হয় এখানে। একজনকে বলি চট করে দেখে এসো তো মূর্তি পুজো হচ্ছে, নাকি শিবলিঙ্গ। সে এসে বলে মূর্তি নয় ম্যাডাম। আমি হাসি। এ জিনিস প্রথম দেখেছিলাম প্রায় কুড়ি বছর আগে মধ্য ভারতে। মহাকাল পর্বতের অমরকন্টকে। আসলে একটি প্রাকৃতিক কুন্ড, বা ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। ভূগর্ভস্থ জলস্তর আগ্নেয় আর রূপান্তরিত শিলার ফাটল দিয়ে চুঁইয়ে বেরিয়ে আসছে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখে এলাম জলের লেভেল। এখন শীতকাল। জলস্তর নেমে যাওয়ার কথা। এখনো এতটা জল মানে জলস্তর ভূপৃষ্ঠের খুবই কাছে। হুমম, বুঝলাম। জলস্তর কাছে বলে বেশি ফিল্টার হবার সুযোগ পায়না। সেজন্যই সবার পেটের গোলমাল হয়েছে। এবারে শিবঠাকুরকে দেখে আসি। শিব ও বুদ্ধের শান্ত, ধ্যানী কল্পনাটি আমার খুব ভালোলাগে। আমার মনে হয় ঐ মূর্তি মানুষের মনঃসংযোগ আর অনুভবের ক্ষমতার মূর্ত রূপ। সাদামাটা মন্দিরটির পিছনে একটি বেশ বড় চাতাল। দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলে সিমেন্ট বাঁধানো বড় ঘর। একসাথে অনেকের বসা সম্ভব। তার একপাশে মেঝেতেই জটাজূট শিবঠাকুর বসে আছেন নন্দীকে পাশে নিয়ে। তবে সেখানে পুজো হয়না। বাঁদিকে ধাপে ধাপে নেমে গেছে পথ। পূজারী উঠে এসে জিজ্ঞেস করলেন স্নান করে এসেছি কিনা। অবশ্যই স্নান করে এসেছি। ‘তাহ্যানে আপণ আসুন’ পূজারী ডাকছেন। আমি আর অগ্নিশা পা বাড়ালাম। কিন্তু সৌরভ যাচ্ছেনা কেন? হায় ভগবান, ও চান করে আসেনি। ব্যস। তিনজনের যাওয়াই আটকে গেল। কারণ পূজারী রাজি হলেন না। হয়তো ভেবেছেন এক পরিবারে এক যাত্রায় পৃথক ফল হয়না। মনে মনে হাসি, পূজারী ঠিকই বুঝেছেন, আমরা এক পরিবারের তো বটেই। মাঠে প্রান্তরে, মানুষের অন্তরে বাহিরে খুঁজে বেড়াচ্ছি ভূগোলের জ্ঞান ক্ষ্যাপার মতো, ভৌগোলিক পরিবারের প্রতিনিধি হয়ে। পূজারী একটা জিনিস বোঝেননি। আমরা ফুল বেলপাতায় পূজো দিতে আসিনি। শিবলিঙ্গ স্পর্শ করে দেখতে চেয়েছিলাম ঊদবেধী শিলা কিনা। জ্ঞানের অন্বেষণই আমাদের প্রণাম। পূর্বঘাট পাহাড়ের শ্রেণী আসলে তো পাহাড় নয়। সৃষ্টির প্রথম আগ্নেয় শিলায় পৃথিবীর বুকে তৈরি হয়েছিল মালভূমি। সেই আদি মালভূমি টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে আফ্রিকায়, দক্ষিণ আমেরিকায়, অস্ট্রেলিয়ায়, ভারতে, আন্টার্কটিকায়। ভারতের দুই উপকূলে পূর্বঘাট আর পশ্চিম ঘাট হল সেই আদিম মালভূমির দুই ধার। আজ দুধারের মাঝখানের অংশটা ক্ষয় হয়ে নিচু হয়ে গেছে। সৃষ্টির সেই অশান্ত দিনে পাথর ফেটে গিয়েছিল কোথাও কোথাও। সেই ফাটল দিয়ে উঠে আসছিল পৃথিবীর বুকের ভিতরে লুকোনো গরম তরল ম্যাগমা। পশ্চিমে আরব সাগরের দিকে কাছাকাছি অনেক ফাটল দিয়ে পাতলা লাভা বেরিয়ে পড়ল বাইরে। তৈরি করলো মালভূমির আর একটা পরত – কালো ব্যাসল্ট পাথরের। মুম্বাইয়ের জুহু বিচের কালো বালি আরব সাগরের জলে ভিজে যেন কাজলপারা। প্রথম দর্শনে তুলে চোখে পরে নিতে ইচ্ছে হয়েছিল আমার। ভারতের বাকি মালভূমির ফাটলের ম্যাগমা কিন্তু ছিল ভারি ও সান্দ্র, পশ্চিমা লাভার মতোন পাতলা ছিলনা। তাই তারা বেরোতে পারেনি। মাটির গভীরেই জমে গেছে। তাদেরই আজ বলে ঊদবেধী শিলা। উল্লম্ব আগ্নেয় উদবেধী শিলাকে বলে ডাইক। কোটি কোটি বছরের ক্ষয়ের ফলে অনেক ডাইক আজ বেরিয়ে এসেছে। অমরকন্টকে শুনেছিলাম ওস্থানটি শিবক্ষেত্র। কারণ ওখানকার মন্দিরের কোনো শিবই মানুষ প্রতিষ্ঠা করেনি, সবই পাতাল থেকে উঠেছে। শহুরে মন নিয়ে আমরা বিশ্বাস করিনি। আর যত নদীর উৎস সব মন্দিরে। এটাও বিশ্বাস করিনি। পরে দেখলাম সব মন্দিরেই শিবলিঙ্গ ভেজা, ওপর থেকে নয়, নিচের দিক থেকে। স্থানীয় মানুষ বলেন বর্ষা কালে মা গঙ্গা দেখা করতে আসেন। ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসে জল। ঐ ডাইক গুলিই যে শিবজ্ঞানে পূজিত হচ্ছে সহস্র বছর ধরে। মানুষের সাধ্য কি পাতাল থেকে ঐ দেবতাকে উপড়ে এনে অন্য কোথাও প্রতিষ্ঠা করার। বর্ষা কালে ভূগর্ভস্থ জল ঐ ফাটল দিয়ে ওভার ফ্লো হয়। যে জলের উৎস জানা নেই, ধর্মভীরু মানুষের কাছে তা গঙ্গা জল ছাড়া কী? লোকবিশ্বাসকেও মর্যাদা দিতে হয়। তার মধ্যে থাকতে পারে সত্য অনুষঙ্গ। এই কথাটা অমরকন্টকে জীবন একটা চড় মেরে শিখিয়েছিল। এখানে এমন কোন ধর্মীয় গল্প নেই। হয়তো আদিবাসী লোক ধর্ম এবং খৃষ্টধর্মের মিশ্রণে হিন্দু সংস্কৃতি মাথা চাড়া দিতে পারেনি। আফটার অল পূর্ব ভারত তো এখানে সহাবস্থানই স্বাভাবিক নিয়ম। কট্টরবাদীদের সামনে পূবদিক কোনোদিন মাথা নোয়ায়নি। এ হল সূর্যোদয়ের দিক। যুক্তি ও জ্ঞানই যে মানুষের হৃদ-সূর্য। ভূতাত্ত্বিক তো নই আমি, ম্যাজিসিয়ান ও না, যে দূর থেকে দেখেই নিশ্চিত বলতে পারব, দারিংবাড়ির এই শিবঠাকুর হল ডাইক। কিন্তু আমরা যে ভৌগোলিক। এখানকার সারফেস এক্সপ্রেশনগুলি সেদিকেই নির্দেশ করছে। প্রথম ক্লু হল ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসা জল, আর দ্বিতীয় হল, মানুষ ই যদি শিবলিঙ্গ বসিয়েছে, তবে অতগুলো ধাপ নিচে কেন? ভিতরে জল কেন? ছেলেমেয়েরা বলছে, গতকাল যখন ওরা গ্রামে ঢুকেছিল, তখন ওখানেও অমন কুন্ড আর ঝোরা দেখেছে। আশ্চর্য কিছু নয়। বরং এটাই স্বাভাবিক। আদিম কম্পনে প্রাচীন শিলায় ফাটল তো আর একটা হবেনা। এখানে চারপাশেই এমন থাকবে। হয়তো এই ঝোরাগুলোই এখানকার জলের যোগানদার। বর্ষায় ওভার ফ্লো এখানেও হয় সেটা নিশ্চিত। ঐজল ধরে রাখার জন্যই এতটা জায়গা বাঁধ দিয়ে ঘেরা। এঅঞ্চল তো মহানদীর ক্যাচমেন্ট এলাকা আর বঙ্গোপসাগরের মাঝে জলবিভাজিকা। যেদিক দিয়েই হোক, এখানকার জল মিলে যায় বঙ্গোপসাগরের ঢেউ এ। প্রাকৃতিক কুন্ড আর শিবলিঙ্গের সহাবস্থান আমি অনেক জায়গায় দেখেছি। আমাদের বাংলায় বক্রেশ্বরের উষ্ণ প্রস্রবণের পড়শিও তো বক্রেশ্বর শিব। দারিংবাড়িতে এই সম্পদ আছে আগে জানিনি। বইতে এসব লেখা থাকেনা। শুধু বই পড়া ভৌগোলিক হল আর্ম চেয়ার জিওগ্রাফার। সায়েন্স কলেজে আমাদের স্যার সুভাষ রঞ্জন বসু বলতেন, কখনো যেন আরাম কেদারায় বসে থেকোনা। ফিল্ডে এলে বারবার স্যারেদের কথা মনে আসে। ফিসফিস করে বলি আমি বসিনি স্যার। অমরকন্টকে এই প্রাকৃতিক ঘটনাগুলোকে পৌরাণিক গল্পের মোড়কে, সঙ্গে দোকান বাজার বাহারি চটকের সাথে পরিবেশিত হয়। আর দারিংবাড়িতে অজান্তে অগোছালো হয়ে পড়ে আছে এখানে ওখানে।
আমাদের প্ল্যান্ট ডাইভার্সিটির কাজ শেষ। না দুঘন্টার মধ্যে পারলাম না। প্রায় পৌনে তিনঘন্টা কাবার। সব সাইট গুলো ছুঁতে পারবো তো? দেখিই না কী হয়।
চতুর্থ পর্ব
বাস চলল জনবসতির সীমানা ছাড়িয়ে, আর দারিংবাড়ির রূপ রস আমাদের চোখে স্পষ্ট হতে শুরু করল। ঢেউ খেলানো কালো পিচের রাস্তা, দুপাশে পাইনের বন। মাঝে মাঝে চা বাগান। ফাঁকে ফাঁকে লালচে আগ্নেয় পাথরের টিলা। নিজের কলেজ জীবনের ফিল্ডের কথা মনে পড়ে। যেন দারিংবাড়ি নয়, পাঁচমারী; যেন পূর্বঘাট নয়, সাতপুরা; যেন আমি শিক্ষিকা নই, ছাত্রী। মনটা পালকের মতো হাল্কা লাগে। পাইনের পাতায় রোদের ঝিলমিল, আর পিছনের সিটগুলোতে চাপা খিলখিল, আড়াই দিনের কাজের চাপ সরে গিয়ে রঙিন প্রজাপতিরা ডানা মেলেছে। পাইনের বন শেষ, এবারে পর্ণমোচী গাছের সারি, কখনো ঘন, কোথাও বা একটু ফাঁকা ফাঁকা। সঙ্গে চলেছে দূরে, কাছে পাহাড়ের শ্রেণী। আন্দাজ সতেরো আঠেরো কিলোমিটার যাওয়ার পরে বাসটা পাকা রাস্তা ছেড়ে কাঁচা রাস্তায় উঠল, লালচে হলুদ ধুলো উড়িয়ে চলল নাচতে নাচতে। রাস্তা খুব খারাপ, সরুও। এত বড় বাস, কষ্ট করে চালাতে হচ্ছে। প্রায় এক কিলোমিটার এমন যাবার পর বাস থামল। কোমরটা যেন আরাম পেল। কিন্তু মনে ছিলনা আরাম হারাম হ্যায়। বাস থেমেছে আরাম দিতে নয়। এখান থেকে হাঁটতে হবে। মূলত উৎরাই পথ, মাঝে মাঝে চড়াই, আর প্রায় দুশোর কাছাকাছি সিঁড়ি ভেঙে আমরা পৌঁছবো মিদুবান্দা জলপ্রপাতের সামনে। অমরকন্টকের দুধধারা বা পাঁচমারীর বী ফলসের মতো রাস্তা অতটা কঠিন নয়। তবে পাহাড়ি পথ, সমতল তো নয়। দম লাগে। যাওয়ার পথটুকু ছাড়া দুপাশে জঙ্গল। অর্ধেক পথ নামার পর একটু জিরিয়ে নেবার জন্য পাথরের ওপর বসেছি, সায়ন এসে গাছের ডাল ভাঙা লাঠি হাতে ধরিয়ে দিল আমার। তাতে বাকি পথটা পার হতে বেশ সুবিধে হয়ে গেল। লাঠি ঠুকে ঠুকে নামতে লাগলাম। এবারে পাশের নিচু খাদে জলের আওয়াজ শুনতে পেলাম, নদী এখনও দেখা দেয়নি। শেষ পর্যায়ে এসে নদীর জল দেখলাম, কিন্তু এ কি, নদীতে অনেক ভাত ভেসে যাচ্ছে। বড় বড় পাথরের বাঁক পেরিয়ে একটা গাছের গুঁড়ি লাল সিমেন্টে বাঁধানো, সিঁদুর মাখা। আমাদের ছাত্রছাত্রীরা সব পৌঁছে গেছে, মোবাইলে ছবি তুলছে। অন্য পর্যটকেরাও আছে। ঘুরে পিছু ফিরতেই বাকরুদ্ধ হলাম। পাহাড়ের মাথা থেকে ঘন বনের মধ্য দিয়ে তিনটে ধাপে নেমে আসছে দুরন্ত নদী। জল পাথরে আছড়ে পড়ে কুয়াশা তৈরি করেছে। শীতকালে এত জল! বড় বড় পাথরের খাঁজে গভীর জলাশয়ের মতো তৈরি হয়েছে। শ্যাওলায় গাঢ় সবুজ। কিন্তু পিকনিক পার্টির চাপে চারিদিকে থার্মোকলের বাসন আর এঁটো শালপাতা ভাসছে। বুঝেছি, এইজন্য নদীতে অত ভাত ভেসে যাচ্ছিল। প্রকৃতির এই দান, যদি একটু পরিচ্ছন্ন রাখা যেত, ভালো হত। বেশিক্ষণ না দাঁড়িয়ে ফিরতে শুরু করলাম। উঠতে সময় লাগবে আমার। জিরিয়ে নিতে হবে বারবার। সবগুলো স্পট ছুঁতে হবে, একথা ভুললে চলবেনা। সৌরভ আর অগ্নিশা তো আছে, ঠিক ছেলেমেয়েদের গুছিয়ে নিয়ে চলে আসবে। নামার সময়ে একটানে নেমে গেছি। অন্যদিকে তাকানোর মন ছিলনা। এখন চারদিক দেখতে দেখতে উঠছি। পর্যটক বেশিরভাগই স্থানীয়। তবে বাঙালিও আছে। আদিবাসী মহিলারা কাঁচা হলুদ বিক্রি করছেন। এখানে হলুদের চাষ ভালো হয়। মিদুবান্দাকে পিছনে রেখে নেচে নেচে বাস চললো পরের গন্তব্যে।
কিছুটা পরে পাকা রাস্তা ধরলাম। চার পাঁচ কিলোমিটার যাওয়ার পরে, আবার বাঁদিকে লাল ধুলোয় ঢাকা পথ, তবে আগের বারের থেকে ঢাল কম, অনেকটা সোজা। একটু পরেই পাহাড়ের কোল ঘেঁষে হাঁটা শুরু হল। এখানে পাহাড়ের গা রুক্ষ, গাছপালা কম, আর বিশাল বিশাল বোল্ডার। আচ্ছা সামনে নদী আছে তাহলে। বোলপুরের কাছে মামা ভাগ্নে পাহাড়ের মতো বড় বড় পাথর রয়েছে ছড়িয়ে। ওমা সৌরভ কই? আমরা যাচ্ছি নিচে দিয়ে, ও যাচ্ছে ওপর দিয়ে! কখন ঢাল বেয়ে পাহাড়ে উঠে পড়েছে। বেশ খানিকটা হেঁটে দেখি সামনে এক বিরাট খোলা জায়গা। না কোনো মাটি নেই। তাই গাছও নেই। বিরাট এক প্রাকৃতিক মুক্ত পাথুরে চাতাল। মাঝে মাঝে হাতির মতো বড় বড় বোল্ডার। একটা জিনিস নজর কাড়ল, পাথরের রং এখানে লাল নয় সাদা। তাই, হোক বিকেলের আলো, চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। চাতালের ধার দিয়ে বইছে চঞ্চলা নদী, নাম ডুলুরি। জায়গাটা হল দারিংবাড়ির লাভার্স পয়েন্ট পিকনিক স্পট। পাথরে ঘিরে নদীর জল কোথাও কোথাও জলাশয় হয়ে আছে। চান করা যাবে, মিদুবান্দার মতো অপরিচ্ছন্ন মনে হচ্ছে না। কিন্তু লাভার্স পয়েন্ট নাম কেন? একটা গাছ নেই, ছায়া নেই, নিভৃতি নেই। মুক্ত প্রাঙ্গণ। গ্রীষ্মের দুপুরে, খোলা তপ্ত পাথরের উপর যুগলের কল্পনা, তায় আবার ধুলো মেখে এতটা ট্রেক করে, এতো কষ্ট! চোখে জল চলে আসছে আমার। আর ভিতর থেকে অট্টহাসি আসছে। এখানে বোধহয় নেচার লাভারদের কথা বলা হয়েছে। বোল্ডারের তলায় তলায় তিরতিরে জলের ধারা যাচ্ছে। তাই পাথরগুলো খুব স্লিপারি। একটু অসতর্ক হলেই পপাত চ মমার চ হয়ে যাবে। আচ্ছা যুগল যদি আনমনা হয়, তখন কী হবে? লাভার্স পয়েন্টে অস্থিভঙ্গ? এ-ই-ই যাঃ সৌরভ পড়ে গেল। না না ও আনমনা হয়নি। পাহাড় চড়ে অতি উৎসাহী হয়ে পড়েছিল। আমি আর অগ্নিশা একটা বড় বোল্ডারে পা ঝুলিয়ে বসে ছিলাম। ওখানে উঠতে গেলে পিছন দিয়ে ঘুরে আসতে হবে। ও অত না ঘুরে সামনে দিয়ে এক লাফ মেরে উঠতে গিয়েছিল। নিচের জলে পা স্লিপ করে গেল। ভগবান বাঁচিয়েছেন, বেশি কিছু হয়নি। এবার ফেরার পালা। কিন্তু সৌরভ ওপরে গুহা দেখে এসেছে। ছেলেমেয়েদের দেখাতে নিয়ে যেতে চায়। ওরা স্যার পড়ে গেছেন দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল, হাসিও গোপন করছিল। এখন স্যারের ডাকে ওনার পিছনে দৌড় লাগালো। আমি বসে রইলাম অন্য একটা বোল্ডারের ওপরে। আজ থেকে তিরিশ বছর আগে আমরা বন্ধুরা মিলে পাঁচমারীর চৌরাগড় পাহাড়ের মাথায় উঠে গিয়েছিলাম। আমাদের টিচারেরা উঠতে পারেননি। কে না জানে, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয়।
একা বসে বসে নদীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে মনের মধ্যে ভাবনার স্রোত চলে। এই জায়গাটা দেখে আর একটা স্মৃতি মনে আসে। অমরকন্টকের মাঈ কি মণ্ডপ। একই রকম ভূদৃশ্য। ছেলেমেয়েরা গুহা দেখতে পাহাড়ে চড়ছে, ফিরতে একটু তো সময় লাগবে। এই ফাঁকে গল্পটা বলি। একই রকম পাথুরে চাতাল, পাথরে ঘেরা জলাশয়, মৈকাল পর্বতের কন্দরে গুহা আর দুরন্ত নদী। চাতালের ওপরে পটহোলের মতো গর্ত। কোমল শিলাগুলো ক্ষয়ে গিয়ে বোধ করি অমন গর্ত হয়েছে। অবাক কান্ড গর্তগুলো মাথার দিকে চওড়া আর তলার দিকে সরু। হাতা, খুন্তির মতো দেখতে। দারিংবাড়ির এই লাভার্স পয়েন্টেও চাতালে গর্ত আছে। আমি খুঁজে দেখেছি। আকৃতিতে গোল। যা হোক অমরকন্টকের কথায় আসি। মহাকাল বা মৈকাল পাহাড়ের অমরকন্টক হল নর্মদা, কুমারী আর শোনভদ্র এই তিনটি নদীর উৎস ভূমি। শোন তো উত্তর ভারতের সমভূমির দিকে গড়িয়ে গিয়ে গঙ্গায় মিশেছে। কুমারী গিয়ে মিশেছে শোনভদ্রে। আর নর্মদা একই স্থানে জন্ম নিলেও চ্যুতিরেখা ধরে নাকবরাবর চলে গেছে ভূমি ঢালের উল্টো দিকে আরব সাগরে। কোনো উপনদীর সঙ্গম ছাড়া একাকী। এই অসামান্য ঘটনার ভূপ্রাকৃতিক ব্যাখ্যা যাই হোক, এক জমজমাট পৌরাণিক থ্রিলার শুনেছিলাম মাঈ কি মণ্ডপ ঘিরে, যে মাঈ কি মণ্ডপ আর লাভার্স পয়েন্ট একই রকম। নর্মদা শিবের পুত্রী, গঙ্গা অবধি তাঁর মন ভেজাতে দেখা করতে আসেন, দেমাক ই আলাদা। কুমারী হলেন তাঁর সখী। এহেন নর্মদা প্রেমে পড়লেন শোনভদ্রের। বিবাহ স্থির হল। এদিকে কেউ জানেনা, কুমারী নদী ও মনে মনে শোনকে ভালোবাসে, শুধু কাউকে বলতে পারেনা। নর্মদা আর শোনের বিবাহের আয়োজন সম্পূর্ণ। স্বর্গের দেবতারা নিমন্ত্রিত, মহাভারতের পান্ডবেরা নিমন্ত্রিত। নর্মদা অপেক্ষা করছেন বধূ বেশে। বর আর আসেনা। অপেক্ষায় ক্লান্ত, বিষন্ন নর্মদা নিজেই সন্ধান করেন শোন কোথায়? অন্ধকার নেমে এসেছে, খানিক দূরে দেখেন কুমারী গিয়ে মিশেছে শোনের বুকে। দুজনে মিলে চলেছে গঙ্গার উদ্দেশে। নর্মদার মতো সাজ পোশাকে কুমারী নদী দাঁড়িয়েছিল বরবেশে শোন আসার পথে। অন্ধকারে না বুঝে শোন গ্রহণ করেছে তারই দেয়া বরমালা। প্রতারিত নর্মদার বিষাদ ক্রোধে পরিণত হয়, ঘৃণাভরে বঙ্গোপসাগরের দিশা পরিবর্তন করে সে পশ্চিম মুখে ধাবিত হয় আরব সাগরের দিকে। আর কাউকে এ জীবনে গ্রহণ সে করেনি, তাই কোন উপনদী নেই, আজও একাকিনী। গঙ্গা শিবের স্ত্রী, সম্পর্কে সৎমা। আবার আশ্রয় দিয়েছে প্রতারক শোন ও কুমারীর জলকে। তাই আজও মেয়ের মন ভেজাতে শ্রাবণ মাসে লিঙ্গরূপী শিবের গা জড়িয়ে, ভূঅভ্যন্তরের ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসেন, দেখা করে যান মেয়ের সাথে। বিয়ে তো হলনা। মাঈ কি মণ্ডপ পড়ে রইল তার আয়োজন নিয়ে। কোনো বোল্ডারের গায়ে রং দিয়ে লেখা ভীম কা আটা। ভীম খাবে বলে মাখা হয়েছিল। একসারি বোল্ডারের গায়ে লেখা নাগাড়া অর্থাৎ বিয়ের বাদ্য। গোল জলাশয় গুলিকে দেখানো হয় ডালের আর সব্জির কড়া হিসেবে। লম্বাটে পটহোলগুলিকে বলা হয় হাতা, চামচ, খুন্তি।নিজের মনেই হা হা করে হাসি। দারিংবাড়িতে সব প্রাকৃতিক ঘটনা গুলো ই আছে। কিন্তু নেই ব্লকবাস্টার কাহিনীর মিশেল। মাঈ কি মণ্ডপ প্রেম পেরিয়ে বিরহে উত্তীর্ণ হয়। লাভার্স পয়েন্ট নামেই প্রেমের কথা বলে, জানিনা উত্তীর্ণ হবে কিনা।
ছেলেমেয়েরা এক এক করে ফিরছে। এবারে আমি ও দৌড় লাগাই। সূর্য ঢলছে পশ্চিমে। বিদ্যুৎ বাবু কে জিজ্ঞেস করে নিয়েছি, ছুঁয়ে দেখার জন্য আরও পাঁচটা পয়েন্ট আছে।
লাভার্স পয়েন্ট থেকে দু কিলোমিটারের মধ্যেই এমু ব্রিডিং ফার্ম, লাগোয়া নেচার ক্যাম্প। সুন্দর সাজানো পার্ক আর থাকার কুটির আছে। এখানে ঢুকতে গিয়ে আবার সালমা পড়ে গেল ঠোক্কর খেয়ে। আমি দেখেছি ফিল্ডের শেষে যখন ফূর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ হয়, তখনই সব দুর্ঘটনা ঘটে। তাই নিজে খুব সতর্ক থাকার চেষ্টা করি।
বাস চলছে, এবার কফি আর গোলমরিচের বাগান। পাইন গাছের সারির ফাঁকে কফি গাছের সারি। আর পাইন গাছের গা জড়িয়ে আকাশে উঠেছে গোল মরিচের লতা। সূর্য আরও ঢলে পড়েছে। এখানে থামলে বাকি তিনটে পয়েন্ট আর ঘোরা হবেনা। সূর্য ডুবে যাবে। তাই বাগানের সামনে দিয়ে বাস চলল খুব ধীরে ধীরে। বাইরে থেকে দেখেই সন্তুষ্ট হতে হল। এবারে দৌড়ে দৌড়ে নেচার পার্ক। নয়নাভিরাম ফুলের মেলা। ভিতরে বাটারফ্লাই পার্ক। কপাল খারাপ এখন একটাও প্রজাপতি নেই। তা হোক, চারিদিকে অসংখ্য ওষধি গাছের মেলা। মাঝে সুশ্রুতর মূর্তি। কুটিয়া কন্ধ উপজাতি মানুষের মডেল সাজানো আছে মিউজিয়ামের মতো। উল্টো দিকে হিলটপ পার্ক। এখানে বাচ্চাদের দোলনা, স্লিপ, ঢেঁকি এইসব সাজানো। একটা উঁচু টাওয়ার আছে পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগের জন্য।
সূর্যদেব পাটে বসেছেন, আমরা পৌঁছে গেছি সানসেট পয়েন্টে। সিমেন্টের গ্যালারির মতো করা আছে। সামনে অসংখ্য পর্বত শ্রেণী। সাগরের ঊর্মিমালা যেন স্থবির হয়ে অপেক্ষা করছে কারো নির্দেশের। এ জায়গাটা আমাকে পাঁচমারীর ধূপগড়ের কথা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে। নেচার পার্কের কমলা সূর্য এখন টকটকে লাল। দূরের শ্রেণীগুলি ধীরে ধীরে অদৃশ্য হচ্ছে। দারিংবাড়ি চলেছে ছায়াবৃত্ত পেরিয়ে রাতের গর্ভে, আবার পরের দিনের ভোর দেখবে বলে। পর্বত চূড়ায় যখন রক্তরাগের শেষ রেশ, তখন আমাদের অবাক করে দিয়ে পিছনে বেজে উঠল মাদল। তাকিয়ে দেখি এক কন্ধ পুরুষের হাতের বোলের তালে তালে তাকে ঘিরে নাচছে একদল কন্ধ নারী। আমাদের ছাত্রীরাও যোগ দিল তাদের সঙ্গে। গোলমরিচের বাগানে আমরা ঢুকতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু এটা বাড়তি পাওনা হল।
দারিংবাড়িতে সন্ধ্যা নেমেছে। আমরা হোটেলে ফিরছি। ঘরে গিয়ে ব্যাগ গোছাবো। আগামী কাল দারিংবাড়িকে বিদায় জানাতে হবে। তপ্ত পানি, গোপালপুর হয়ে ফিরে যাব যে যার ঘরে। হয়তো অনেক কিছুই জানা হলনা। যেটুকু জানলাম সেটাও অনেক। অমরকন্টক, পাঁচমারী, উটি এসব বিখ্যাত পর্যটনক্ষেত্রের মতো সম্পদ এখানেও আছে। কিন্তু সাজান গোছান কম। ভারি আটপৌরে আর আন্তরিক। দারিংবাড়িতে আর একবার আসা যেতেই পারে।
কলমে ড. শারদা মণ্ডল