আনন্দ নিকেতন

আনন্দ নিকেতন

আজ ১৬ ই নভেম্বর, ২৯ শে কার্তিক, আমার অনেক দিনের সাধ পূর্ণ হল। ছোটবেলা থেকে শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় লোকশিল্প সংগ্রাহক তারাপদ সাঁতরার বই পড়ছি। আজ হঠাৎ সুযোগে তাঁর হাতে গড়া “আনন্দ নিকেতন কীর্তিশালা” পর্যবেক্ষণ করে ধন‍্য হলাম। বাংলার লোকশিল্পের অনন্য সংগ্রহ এখানে আছে, যার  মাত্র বিশ শতাংশ প্রদর্শিত হয়। আশি শতাংশই স্থানাভাবে স্টোরে বন্দি।

বাগনান দুই ব্লকের নবাসন মৌজায় চল্লিশ বিঘা জায়গার ওপরে, তিনতলা বাড়িতে মিউজিয়াম।এগারোটি গ্যালারি। ক‍্যাম্পাসের ভিতরে একটি নিম্ন বুনিয়াদী বিদ্যালয়, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, গ্রামীণ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, একটি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল, জল পরীক্ষা কেন্দ্র, পুকুর আর অনেক গাছ, ফুল, পাখি আর প্রজাপতি। স্কুলটিতে ছাত্র ছাত্রী সংখ্যা দুহাজারের বেশি।

আমাদের কলেজের সুমনদার গৃহকর্ত্রী বন‍্যা এই সংগ্রহশালারও কর্ত্রী। কলেজ থেকে এখানে আসার পরিকল্পনা হয়েছে অনেকবার। কিন্তু কোনোবারই রূপায়িত হয়নি। গতকাল বাড়ি ফেরার পথে যখন শুনলাম ইতিহাস বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা এখানে আসছে, খুব ইচ্ছা করছিল। আজ সকালে সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম। বাড়িতেও কিছু জানালাম না।  পড়ে রইল ভূগোলের কাজ। চুপচাপ কলেজে বেরিয়ে পড়ে ইতিহাসের সঙ্গী হলাম। এক একদিন মন্দ হলে মন্দ কি?

পুনশ্চঃ বন‍্যার আতিথেয়তায় আলু উচ্ছে ভাজা, মুসুর ডাল, ফুলকপির তরকারি, টাটকা পোনা মাছ, আমের চাটনি, পাঁপড়, রসগোল্লা সহযোগে ওয়ান ডে হ‍্যাং আউটে ভূগোল ইতিহাস একাকার। কবে যেন কান্ট সাহেব দুটো বিষয়ের কী যেন একটা তফাৎ করে দিয়েছিলেন। সব সময়ে সব কথা মনে রাখলে চলে?

একটি সঙ্গীত সন্ধ্যা ও ফিরে দেখা জাতীয়তাবাদ

একটি সঙ্গীত সন্ধ্যা ও ফিরে দেখা জাতীয়তাবাদ

গত ১২ই এপ্রিল কলকাতার হো চি মিন সরণিতে Indian Council of Culture and Research (ICCR) এর প্রেক্ষাগৃহে পৌঁছলাম সকন্যা। উপলক্ষ্য একটি গীতিআলেখ্যের সাক্ষী হওয়া। যেমন তেমন কোনো অনুষ্ঠান নয়, ১৯১৯ সালের ১৩ই এপ্রিল পঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালা বাগে ইংরেজ সরকার ঘটিয়েছিল এক নারকীয় হত্যালীলা। আজ শতাব্দী অতিক্রান্ত। একশ বছর পরের মানুষ ফিরে দেখবে, স্মরণ করবে শহীদের আত্মত্যাগ, অনুভব করবে শহীদের পরিবারের যন্ত্রণা।

অনুষ্ঠানের নির্ধারিত সময় সন্ধ্যা সাড়ে ছটার কিছু আগেই পৌঁছে গেছি। স্বনামধন্যা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী প্রমিতা মল্লিকের গানের দল বৈকালী পরিবেশন করতে চলেছে যে গীতিআলেখ্য, তা কেবলই কয়েকটি গান নয়, এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ঘটনার বিবরণ, বিশ্লেষণ, অতীতের প্রামাণ্য ফটোগ্রাফ, চিঠি ও অন্যান্য নথি, অর্থাৎ এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ গবেষণা। এসব কথাই আমি শুনেছি বল্লরীদির কাছে। বল্লরীদি আমার কলেজের সহকর্মিনী, সুগায়িকা, প্রমিতাদির ছাত্রী এবং অবশ্যই বৈকালীর সক্রিয় সদস্যা। ওর কাছেই শুনেছি, প্রমিতাদি অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের কাকীমা। কোয়েল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন পঞ্জাবী রানে পরিবারের সঙ্গে। সে পরিবারের অনেকেই আজ উপস্থিত থাকবেন। রানে পরিবারের বর্তমান সদস্যরা পূর্বপুরুষের আত্মত্যাগের এই স্মরণ অনুষ্ঠানের অংশীদার।

ধীরে ধীরে প্রেক্ষাগৃহ ভরে উঠছে। এদিনের কিছু টিকিট বিক্রি হয়েছে, বাকি সকলেই আমন্ত্রিত। প্রমিতাদি ঘোষণা করলেন, যদি কোনো অতিথি বসার জায়গা না পান, তাহলে তাঁর ছাত্র ছাত্রীরা যেন আসন ছেড়ে দিয়ে নিজেরা মাটিতে বসেন। প্রেক্ষাগৃহ ভরে গেলে কয়েকজনকে সত্যি সত্যিই কার্পেটে বসতে দেখলাম। মানুষকে সম্মান করা, গুরুকে মান্য করা এই সংস্কারগুলি আমার কন্যা যত সচক্ষে দেখতে পায়, ততই মঙ্গল।

প্রেক্ষাগৃহে ক্রমে আলো কমে আসে, মঞ্চে পর্দা ওঠে। মঞ্চ জুড়ে বৈকালীর কুশীলবেরা যেযার আসনে রয়েছেন দুই সারিতে। মঞ্চে নরম হলুদ আলো। ডানদিকে বেদীর ওপর রয়েছেন তিনজন। মাঝে প্রমিতাদি নিজে, তিনি বাংলা ভাষ্য পাঠের দায়িত্বে। একপাশে ইংরেজি ভাষ্যে রয়েছেন মনোজিত। অন্যপাশে হারমোনিয়াম শিল্পী। মঞ্চের বামদিকে তিনজন যন্ত্রশিল্পী। বল্লরীদি দীর্ঘাঙ্গী, তাই ও গায়ক গায়িকাদের পিছনের সারিতে রয়েছে। আজ বল্লরীদির আর আমার দুজনের মনই ভারী। হৃদয়ে শোক। কারণ আজ দুজনেই হারিয়েছি একজন পিতৃপ্রতিম ব্যক্তিত্বকে। পি জি হসপিটালের অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন সুপার দেবদ্বৈপায়ন চট্টোপাধ্যায় আজ চলে গেলেন। আকস্মিক অসুস্থতায় জীবন মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়ানো আমি তাঁর জন্য নবজীবন পেয়েছিলাম। আমার আয়ুর জন্য আমি তাঁর কাছে ঋণী। বল্লরীদির মুখে আমি ওর হৃদয়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছি।

গীতি আলেখ্যের নাম “একটি বাগানের কথা”। যন্ত্রসঙ্গীত শুরু হয়। জালিয়ানওয়ালা বাগের মনের কথা বলে চলেন প্রমিতাদি নিজে। একটি নারকীয় হত্যাকাণ্ডে মৃত অসংখ্য শহীদের স্মারক বুকে নিয়ে বাগানের হাহাকার তাঁর বাচিক দক্ষতায় মূর্ত হয়ে ওঠে। অনেকদিন ধরে চাপা পড়ে থাকা ইতিহাসের পাতাগুলি খুলতে থাকে। মঞ্চে লালচে আলোর আবহে দ্রিমি দ্রিমি বাজনা বাজতে থাকে। শিল্পীদের কন্ঠে বেজে ওঠে

“প্রচণ্ড গর্জনে আসিল একি দুর্দিন, দারুণ ঘনঘটা, …….. ”

একে একে পরতে পরতে প্রকাশিত হয় বীভৎস রাওলাট আইন, দেশনেতাদের গ্রেফতার, অত্যাচারী বিদেশী শাসনে ছটফট করা দেশবাসীর যন্ত্রণা। শুধু সন্দেহের বশে যে কারোকেই জেলে পোরা যাবে। দেশ জুড়ে অসন্তোষ আর প্রতিবাদের ঝড়। পর্দায় ফুটে ওঠে অত্যাচারী ইংরেজ আধিকারিকদের ছবি আর তাদের কৃতকর্মের প্রামাণ্য নথিপত্রের দলিল দস্তাবেজ। বাংলায় প্রমিতাদি এবং ইংরেজিতে মনোজিতের গ্রন্থনা ও হার্দিক উপস্থাপনা মঞ্চে সেই কালাদিনগুলিকে ফিরিয়ে আনে। অনুভব করি শিরা উপশিরাগুলি দ্রুত রক্ত প্রবাহের সঙ্গে শক্ত হয়ে উঠেছে।মধ্যে মধ্যে গানগুলি যেন ধারালো অস্ত্র, হৃৎপিণ্ড টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে।

ভাষ্য শুরু হয় ঐ হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন আগের ধারাবিবরণী থেকে। ৬ই এপ্রিল, ১৯১৯। দেশ জুড়ে সত্যাগ্রহের ডাক দিয়েছেন গান্ধীজী। কিন্তু তার কয়েকদিন আগেই, অর্থাৎ ৩১শে মার্চ দিল্লির রাজপথে প্রতিবাদ মিছিলে ইংরেজের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন বেশ কিছু সাধারণ মানুষ। স্বামী শ্রদ্ধানন্দ দিল্লির জুম্মা মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে ডাক দিয়েছেন হিন্দু, মুসলিম ঐক্যের। পঞ্জাবের পথে পথে স্বদেশী আন্দোলন জোয়ারের ঢেউএর মতো আছড়ে পড়ছে। পঞ্জাবে ঢোকার আগেই গান্ধীজীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইংরেজ শাসকদের আচরণে ফুটে উঠছে অতি প্রতিক্রিয়াশীলতা। ছয় দশক আগের সিপাহী বিদ্রোহের মতো এই অহিংস অসহযোগ আবার শাসনের ভিতে কোনো বড় ধাক্কা দেবেনাতো! শঙ্কিত ইংরেজ শাসক ১০ই এপ্রিল পঞ্জাবের জাতীয়তাবাদী নেতা সত্যপাল এবং সইফুদ্দিন কিচলুকেও বন্দী করল। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ল পথে ঘাটে, বাজারে, অফিসে সর্বত্র। কয়েকজন ইংরেজও সেই রোষের আগুনে ঘায়েল হল। পঞ্জাবে মার্শাল আইন জারী হল। ভারতীয় জনসাধারণকে বাড়ি থেকে বেরোতে হলে পথে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে হবে এই নির্দেশ জারী হল। কারোর ওপরে বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলেই তার জল, বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হতে লাগল। ভাষ্য, ছবি, আলোয় সেদিনের দৃশ্যকল্প এমনভাবে ঐ প্রেক্ষাগৃহে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মনে হচ্ছে আমি যেন সেযুগেরই মানুষ। প্রেক্ষাগৃহের বাতাস, দেওয়াল কাঁপিয়ে মঞ্চের কুশীলবেরা গাইছেন,

“কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙে ফেল, কররে লোপাট….. শিকল পূজার পাষাণবেদী……”।

গানটি সেই ছোটোবেলা থেকে কতবারইতো শুনেছি, রোমাঞ্চিত হয়েছি। কিন্তু আজকের মতো কখনোই এমনভাবে অনুভব করিনি, কি পরিস্থিতিতে এই আগুনঝরা, ব্যথাভরা গান কলমের মুখে বেরিয়ে আসে।

আন্দোলন চলে নিজের গতিতে। সাধারণ মানুষের জীবনের ছন্দ ব্যাহত হলেও বন্ধ হয়না। বৈশাখী উৎসবের দিন চলে আসে। দলে দলে গ্রামের মানুষের ঢল নামে অমৃতসরের পথে। তারা এসেছে স্বর্ণমন্দিরে প্রণাম করতে। মঞ্চে শুরু হয় ওয়াহে গুরুর নামে প্রার্থনা সঙ্গীত। ভাষা জানিনা, তবু কানে বড় মিষ্টি লাগে। কয়েকটি চেনা শব্দ শুনে মনে হয়, সবার সুখ চাওয়া হচ্ছে। ছোট বড় সবার গায়ে নতুন পোষাক। জালিয়ানওয়ালা বাগেও দুঃখ, আতঙ্ক থেকে একটু মুক্তির আনন্দ খোঁজা মানুষের ভিড় বাড়ে। মঞ্চে শুরু হয় বৈশাখী উৎসবের আবহে একটি দ্রুতলয়ের ভাংরা তালের লোকগান।

তখন পঞ্জাব শাসনের ভার ছিল স্যর মাইকেল ফ্রান্সিস ও ড্যোয়ারের ওপর। তাঁর হেড অফিস লাহোরে। আন্দোলন বেড়ে উঠতে পরিস্থিতি নিয়ণ্ত্রণ করার অছিলায় তিনি ডেকে নিলেন আর এক অফিসার রেজিনাল্ড ডায়ারকে।

চলে এল বৈশাখী উৎসব ও মেলার দিন। ১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯, জালিয়ানওয়ালাবাগে আয়োজন সুসম্পন্ন। হাজারে হাজারে আনন্দমুখর মানুষ, নারী, শিশু ঘুরে বেড়াচ্ছে বাগানে। ঐ মানুষগুলো কেউই জানতোনা, ধূর্ত ডায়ার সেদিন সকালেই এক নতুন নির্দেশ জারী করে অমৃতসরের রাস্তায় চারজন মানুষ একসঙ্গে হওয়া নিষিদ্ধ করেছে, কিন্তু সেই নির্দেশ প্রচার করেনি।
রেজিনাল্ড ডায়ার উৎসবে বিভোল মানুষকে সতর্ক করা তো দূর, বাগানের চারিদিকে সৈন্য আর সাঁজোয়া বাহিনী সাজিয়ে, নিরপরাধ আইনভঙ্গকারীকে সাজা দিলেন, বন্দুকের সমস্ত গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিরস্ত্র মানুষের ওপর নিরন্তর গুলিচালনার নির্দেশ দিয়ে। বুঝে ওঠার আগেই জীবনের সিংহ দরজা পেরিয়ে অমৃতলোকের পথে রওনা হল অমৃতসরের মানুষ। পিছনে পড়ে রইল নশ্বর দেহ, রুধির আর অশ্রুর মিলিত সিন্ধু। সেদিন দেহগুলিকে বাগানের বাইরে বার করা যায়নি, কারণ বেরোনোর সব পথ ছিল বন্ধ। আর বাইরে থেকেও কেউ আসতে পারেনি, কারণ কারফিউ, বেয়নেট আর বুটের চাপে কেউ রাস্তায় নামতে পারেনি। মঞ্চে এক এক করে প্রত্যক্ষদর্শীদের
বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছিল। সে বিবরণী কানে গরম লোহা হয়ে ঢুকে পড়ছিল, মনে হচ্ছিল কান চেপে ধরে চীৎকার করে উঠি, “আর না। ” কিন্তু সত্য থেকে পালিয়ে যাব কোথায়?

কানে ভেসে আসে ধীর লয়ের সুর, “শুভদিন নিশিদিন পরাধীন হয়ে ভ্রমিছ এই ভুবনে”।

পর্দায় ভেসে উঠেছে রেজিনাল্ড ডায়ারের মুখ, ও মুখের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করেনা। মঞ্চে পড়ে শোনানো হচ্ছে ডায়ারের সেদিনের মিথ্যা ভরা রিপোর্ট, “সেদিন তিনি বাগানে ঢুকলেন। রাস্তা সরু, তাই সাঁজোয়া গাড়ি রেখে আসতে হয়েছিল। মাঠে ঢুকে দেখলেন উঁচু বেদীতে দাঁড়িয়ে একজন লোক হাত নেড়ে নেড়ে কিছু বোঝাচ্ছেন। শুনছেন হাজার পাঁচেক মানুষ, উপস্থিত ইংরেজ সৈন্যদের তুলনায় সংখ্যায় অনেক বেশী। বুঝলেন আইন ভঙ্গ করতেই জড় হয়েছে সকলে। এই স্পর্ধা মেনে নেওয়া যায়না। এমন কিছু করতে হবে যাতে এই স্পর্ধা ভারতবাসী আর দেখাতে না পারে। তিনি গুলির নির্দেশ দিলেন। ২০০ থেকে ৩০০ মানুষ মারা যায়।” জোরের সঙ্গে তিনি মুখোমুখি বিচারসভাতেও বললেন, “১৬৫০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়েছিল। যা করেছি, ঠিক করেছি। দ্বিতীয়বার আইন ভাঙার আগে ভারতীয়রা দুবার ভাববে”।

পঞ্জাবের এই কলঙ্কিত ইতিহাস কিন্তু বাকি ভারতবর্ষ তখনই জানতে পারলনা। কারণ অমৃতসর তখন দুর্গ, না ভিতর থেকে কেউ বাইরে যেতে পারছেন, না বাইরে থেকে কেউ পৌঁছতে পারছেন। কিন্তু সত্য চিরকাল চাপা থাকেনা। বেশ কিছুদিন পরে বাংলার প্রবাসী ও ভারতবর্ষ পত্রিকায় ছাপা হল পঞ্জাবের ঘটনার মর্মন্তুদ বর্ণনা ও ব্যাখ্যা। দেশের বাকি অংশেও দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল এই খবর। সরলাদেবী চৌধুরানী তখন বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছিলেন লাহোরে। স্বামী রামভজ দত্ত চৌধুরী। তিনি ঐ ঘটনার অনেকদিন আগে থেকেই রাওলাট আইনের বিরুদ্ধে অহিংস সত্যাগ্রহ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি সত্যপাল ও সইফুদ্দিন কিচলুর গ্রেপ্তারের পরে যখন অনেকেই থমকে গিয়েছিলেন, তখনও তিনি একরোখা। কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। পরে তিনিও কারারুদ্ধ হন। সংবাদ পত্রে খবর প্রকাশের আগেই সরলাদেবীর চিঠি এসে পৌঁছোয় রবীন্দ্রনাথের কাছে। সেই চিঠিতেই রবীন্দ্রনাথ বিশদে জানতে পারেন এই নারকীয় ঘটনার কথা। বিধির কি অদ্ভুত সংযোগ, বিশ্বকবি ১২ই এপ্রিল ঐ ঘটনার একদিন আগেই গান্ধীজীকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। ইংরেজি সেই চিঠিটি মঞ্চে পড়ে শোনানো হয়। চোখ বুজে অনুভব করার চেষ্টা করি কবির বাণী। “Dear Mahatmaji power in all its form is irrational…. এটা যেন অনেকটা ছ্যাকরা গাড়ি টেনে চলা চোখে ঠুলি বাঁধা ঘোড়ার মতো। যিনি এই ঘোড়া গাড়ির চালক, একমাত্র তাঁর পক্ষেই কিছুটা নৈতিকতা বাঁচিয়ে রাখার সুযোগ থাকে।” অবাক হয়ে শুনি সত্যদ্রষ্টা কবির বাণী। এচিঠি কি সেদিনের জন্য লেখা নাকি আজকের জন্য। আজকের কোনো ক্ষমতাধরের কানে কি এবাণী পৌঁছবে? কানে ভেসে আসে, “passive resistance is a force which is not necessarily moral in itself, এটি সত্যের পক্ষে বা বিপক্ষে দুভাবেই ব্যবহৃত হতে পারে। ….যেকোনো ক্ষমতা বা শক্তির পথ সফল হলে তার প্রলোভন হয়ে ওঠার বিপদ বৃদ্ধি পায়।” হায় রে বিধি, পঞ্চায়েত থেকে লোকসভা এ বাণী কেই বা মনে রাখবে? মনটা ভারি উচাটন করে। বুকের ভিতর উথাল পাথাল। প্রেক্ষাগৃহ কাঁপিয়ে বুকে এসে বেঁধে চেনা সুর – “বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান, তুমি কি এমনি শক্তিমান, ………” ঐ চিঠিটি কবি শেষ করেন একটি ইংরেজি কবিতা দিয়ে, যেটি আমরা সবাই আজ চিনি বাংলায় – “চিত্ত যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ যেথা শির”।

জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডের পরে সরলাদেবী চৌধুরানীর চিঠি পড়ে কেঁপে উঠেছিলেন কবি। সংবাদ পত্রে সব জানাজানির পরে একটি বেসরকারী তদন্ত কমিটি করে দীনবন্ধু এণ্ড্রুজ কে তার ভার দেওয়া হয়। কিছুদিনের মধ্যেই এণ্ড্রুজ জানিয়ে দেন সত্যভাষ্য, মৃতের সংখ্যা হাজারেরও বেশী। ডায়ারের বক্তব্য সর্বৈব মিথ্যা। এ এক ঠাণ্ডা মাথার পূর্ব পরিকল্পিত জঘন্য হত্যাকাণ্ড। বিনিদ্র রজনী যাপন করেন রবীন্দ্রনাথ। আবার চিঠি লেখেন গান্ধীকে। প্রস্তাব দেন, “চলুন আমি আপনি দুজনে যাই পঞ্জাবে, যদি অত্যাচারী ইংরেজ ঢুকতে না দেয়, তো একসঙ্গে কারাবরণ করব। এই হবে আমাদের প্রতিবাদ”। কিন্তু উত্তর আসে এই মর্মে যে গান্ধী এখন সরকারকে বিব্রত করতে চাইছেননা। হতাশ কবি কলকাতায় প্রতিবাদ সভা আয়োজন করতে চান, কিন্তু উপযুক্ত সাড়া না পেয়ে বিফল মনোরথ হন। নিজের মধ্যে আত্মস্থ হন কবি। কেউ যদি পাশে না থাকে তবে একাই কিছু করতে হবে। বিনিদ্র রাতের পরে আলোর দিশা দেখান ভারতমাতা। ইংরেজ সরকারকে চিঠি লেখেন রবীন্দ্রনাথ। বিশ্ব চমকে ওঠে পরাধীন দেশের কবির স্বাধীন উচ্চারণে। দেশের ভিতরে ও বাইরে ছড়িয়ে যায় খবর, জালিয়ানওয়ালা বাগের নারকীয় হত্যালীলার প্রতিবাদে নাইটহুড খেতাব ত্যাগ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। ছোটোবেলা থেকেই শুনেছি এই তথ্য। কিন্তু তখন দেশমাতাকে বোঝার মতো, বিশ্বকবিকে অনুভব করার মতো বোধ তৈরি হয়নি, বড়বেলায় চর্চা করিনি, সব কিছু ভুলে শুধু আত্মস্বার্থে মগ্ন হয়ে ছিলাম। নিজের ওপর ধিক্কার আসে, কেমন যেন ঘোরের মধ্যে কানে ভেসে আসে,

“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে”। শ্রবণেন্দ্রিয়ে একটু অন্য কিছু ধরা পড়ে। আলগোছে দেখি পাশে কন্যা গলা মিলিয়েছে এই গানে।

বড়লাটকে লেখা সেই চিঠিটি পড়ে শোনানো হচ্ছে মঞ্চে। কাঁপা কাঁপা হাতে অনুষ্ঠানের চারপাতা লীফলেটটি চোখের সামনে ধরি। তার শেষ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত আছে ঐ চিঠিটি, অবিকল, ইংরেজিতে। কানে শোনার সঙ্গে সঙ্গে চিঠিতে চোখও বোলাই। স্ব স্ব ক্ষুদ্র স্বার্থের তাড়নায় দেশের দশের ইতিহাসকে তো ভুলেই থাকি সবসময়। এই যে কয়েক মুহূর্ত মনঃসংযোগ, এও যেন আমার আত্ম সংশোধন। শেষ লাইনটি পড়া হয়, তবু অনুভবের রেশ শেষ হবার নয়। কানে আসে ব্যথা ভরা গানের সুর। মঞ্চে প্রমিতাদি গাইছেন,

“আমি জ্বালবোনা মোর বাতায়নে প্রদীপ আনি ………”

জালিয়ানওয়ালা বাগে ভারতবাসীর আত্মত্যাগ বিফলে যায়নি, কারণ এর পরে অসহযোগ ও খিলাফৎ এই দুটি আন্দোলনই তীব্র আকার ধারণ করে। ১৯১১ এ বঙ্গভঙ্গ রদের পরে বাংলায় আবার দৃঢ় স্বরে বেজে ওঠে হিন্দু মুসলিম শিখ সবের সম্প্রীতির সুর।
মঞ্চে ধ্বনিত হল,

“একবার দেখ মা এবার দুয়ার খুলে …..”

জুন মাস থেকে গান্ধীজী ভাষণে এবং লিখিত বয়ানে ইংরেজ শাসকের দমননীতির তীব্র বিরোধিতা শুরু করেন। বিশেষ করে পঞ্জাবের সামরিক শাসন, ও দমন পীড়নের বিষয়ে বহু প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান সংগ্রহ করেন তিনি। যথোপযুক্ত প্রমাণ সহযোগে কংগ্রেসের দাবী সনদ তৈরি করে দাবী জানান দুই ডায়ারকে যেন ইংরেজ সরকারের কোনো আধিকারিকের পদে বহাল না করা হয়। কিন্তু ভিনদেশী সরকার সে দাবী অগ্রাহ্য করে। দেশের মানুষের বুকে ধিকিধিকি জ্বলা তুষের আগুন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সেদিনের দৃশ্যপট আরও বাস্তব করে মঞ্চে শোনা যায়,

“তোদের বাঁধন যতই শক্ত হবে মোদের ততই বাঁধন টুটবে ……”

১৯১৯-২০ জুড়ে একের পরে এক ভারতীয় সংবাদ পত্রে বিভিন্ন ভাষায় জালিয়ানওয়ালা বাগের ঘটনার বর্ণনা ও ব্যাখ্যা ছাপা হল। ছোট বালক মদনমোহনের নিষ্প্রাণ দেহের ছবি দেখে পাঠকবর্গ শিউরে উঠলেন। এই মুদ্রণ সম্প্রচারের নেতৃত্বে ছিল প্রবাসী, ভারতবর্ষের মতো বাংলা সংবাদপত্রগুলি। সমালোচনামূলক তাদের দীর্ঘ প্রতিবেদনগুলি সমকালীন ভারতীয় মননকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। জনমানসে সেই বেদনার সুর জীবন্ত হয়ে ওঠে মঞ্চে। বৈকালীর পুরুষ সদস্যদের কন্ঠে বেজে ওঠে,

“এ ভারতে রাখো নিত্য প্রভু তব শুভ আশীর্বাদ”

৭ই জুলাই, ইংল্যান্ডের হাউস অফ কমন্স এ জেনারেল ডায়ারের কীর্তি সম্পর্কে একটি আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে বহু শিক্ষিত, সম্ভ্রান্ত ইংরেজ ভদ্রলোক এই কুকীর্তিকে দ্ব্যর্থহীনভাবে সমর্থন জানালেন। মানবতাবাদ মুখ ঢাকল, ইংরেজি নির্লজ্জতায়। ২২শে জুলাই বীতশ্রদ্ধ রবীন্দ্রনাথ লিখলেন,

“…The result of the Dyer debates in both houses of the parliament makes painfully evident attitudes and mind of the ruling classes of the country towards India. The unashamed conditions and brutality experienced in the speeches and according to their newspapers is ugly in its pridefulness”.

জহরলাল নেহরু যিনি নিজে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করেছিলেন, তিনি লিখেছেন, “I realize then more vividly than I had ever done it before, how brutal and immoral imperialism was and how it had eaten the soul of the British upper classes”.

পঞ্জাবকেশরী লালা লাজপত রায় লিখলেন, “Benevolent imperialism is like a caged lion, however we will play with it, so long, as it is caged or under the spell of a master trainer. The moment it gets out of control, it is bound to become in conformity with its real nature. The atrocities perpetuated at Amritsar have trued that imperialism run mad is more dangerous, more vindictive, more inhumane for its uncontrollable nature”.
সমগ্র দেশবাসীর মনোভাব সুর হয়ে বেজে ওঠে মঞ্চে।

“এখন আর দেরী নয় ধরগো তোরা হাতে হাতে ধরো….. ”

১৩ই এপ্রিল, ১৯৪৩ এর জালিয়ানওয়ালাবাগ দিবসে আজাদ হিন্দ রেডিওতে দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তৃতায় নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু জানান, অমৃতসরের ঐ নৃশংস ঘটনা, ভারতীয়দের প্রতি বৃটিশদের স্বাধীনতা, শান্তি ও শৃঙ্খলা বিষয়ে মিথ্যা প্রবঞ্চনার প্রতীক। “….This bloody incident exposed all the hypocrisy of British Democracy. British pretended to fight the last war for the freedom of nations, to the right of self determination of people and for making the world safe for democracy” তিনি দৃঢ় স্বরে আরও জানান, যে, ডোমিনিয়ন স্টেটাস দেওয়া হবে ইংরেজের এই মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে ভুলে ভারতীয়রা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অনেক রক্ত ঝরিয়েছে। “…cold massacre of thousands of men, women and children gathered in the Jaliwanwala Bag was the brutal reply of Britain to peaceful demand of Human Rights”. বুক ভরা ব্যথার মাঝে কানে আসে।

“তোমারই তরে মা সঁপিনু এ দেহ তোমারই তরে মা সঁপিনু এ প্রাণ”।

ভারী মন গানের আবেশে গলে পড়ে। চমক ভাঙে প্রমিতাদির কন্ঠস্বরে। তিনি বলে চলেন বাগানের বয়ানে। কত রাত, কত দিন, অসহনীয় বেদনা বুকে নিয়ে আজও আছে সেই বাগান। দোষীরা আজ আর কেউ নেই। বিবেকহীন ডায়ার লন্ডনের রাস্তায় লুটিয়ে পড়েছেন ভারতীয় বিপ্লবীর গুলি খেয়ে সেই কোন যুগে। কালা কানুন উঠে গেছে ১৯২২ এ। কিন্তু একশ বছর পেরিয়ে আজও হাহাকার, আর ব্যথার স্মৃতি যেন এক জ্বলন্ত আগুনের শিখা হয়ে বেঁচে আছে মানুষের মনে। বলতে বলতে গায়িকা গান ধরেন। বলিষ্ঠ কন্ঠে গেয়ে ওঠেন,

“বিঘ্ন বিপদ দুঃখ দহন তুচ্ছ করিল যারা,
মৃত্যু গহন হইল, ছুটিল গ্রহ তারা
দিন আগত ঐ, ভারত তব কই”।

বৈকালীর সদস্যরা বারংবার ধুয়ো ধরেন।

“দিন আগত ঐ, ভারত তব কই”।

দিন আগত ঐ, ভারত তবু কই?

আমার জগৎ দুলতে থাকে, সেদিনে এদিনে মিলে যায়। চোখের সামনে ভাসতে থাকে সংসদে হামলা, তাজ হোটেলে হত্যাকাণ্ড, উরি, পুলওয়ামা থেকে নির্ভয়া, কাঠুয়া, শবরীমালা, গৌরী লঙ্কেশ।

জালিয়ানওয়ালাবাগে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বাহুবল তছনছ হয়ে যায় পরের আঠের বছরে।ক্ষমতার ভিত্তি নাড়িয়ে আমরা স্বাধীন হই, কিন্তু বিভক্ত হয়ে। আজও স্বাধীন ভারতে যখন মানবতার হানি হয়, বাগানের আত্মা প্রার্থনা করে শান্তির জন্য। কিন্তু আজকের ভারতবর্ষ কি কান পাতে সেই প্রার্থনা শোনার জন্য?

“বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বারি” এই গান গেয়ে কুশীলবেরা অনুষ্ঠান শেষ করেন। আর প্রমিতাদি উচ্চারণ করেন বৈদিক শান্তি মন্ত্র।

হয়তো পাঠকের মনে হবে একটি অনুষ্ঠানের ভাষ্যগুলির এত বিস্তার কী প্রয়োজন! কিন্তু মনে হয় এগুলি চর্চার দরকার। যদি এ লেখা পড়ে পাঠকের মনে কোনো অনুভূতি জেগে থাকে, তবে তার পিছনে অবদান আমার নয়, সম্পূর্ণ ভাবে সে কৃতিত্ব বৈকালীর। ঘটনার পারম্পর্য আর মনীষীদের বয়ানে যদি কোনো ভুল হয়, তবে সে দায় একান্তভাবে আমার। একদিনের একটি অনুষ্ঠান বেঁচে থাকে শুধু কুশীলব আর সেদিনের দর্শকের স্মৃতিতে। মানুষের আয়ু সীমিত আর স্মৃতির আয়ু আরও কম। কিন্তু এই বিশ্বমানবতার ভাবনা, একতার অনুভব, আত্মত্যাগের স্মরণ, দেশের ইতিহাস, পুরাণ, ঐতিহ্য এগুলির বারংবার ও সঠিক চর্চা আজকের যুগে বড় প্রয়োজন। কারণ এগুলির প্রতি আমাদের অনীহা দিয়ে নতুন প্রজন্মকে দুর্বল করছি আমরাই। বছর দুয়েক আগে আমার ছাত্র আজ আমারই সহকর্মী দেবব্রত স্নাতকোত্তর ভূগোল ক্লাসে Historical Geography পড়াতে গিয়ে জিজ্ঞেস করে বলতো রামের মায়ের নাম কী? কৌশল্যা নামটি ফিরে এলে বলতে পারতো রামের মা কোশল দেশের রাজকুমারী। এইভাবে ঐতিহাসিক নথি ছাড়াও পুরাণে বা মহাকাব্যে ভৌগোলিক উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু না কিছুই বলা হয়না কারণ পুরো ক্লাস নিরুত্তর। স্নাতকোত্তরের ক্লাসে আমার একটি ছেলে কি মেয়ে রামের মায়ের নাম জানেনা। বাড়িতে আছে আমার আর এক মেয়ে। সেই কোন ছোটবেলায় উপনিষদের, মঙ্গলকাব্যের সরল গল্পের বই আমার মা আমার হাতে তুলে দিয়েছিল। আমিও দিয়েছি আমার কন্যাকে। কিন্তু হায়, আমার বই আমি গোগ্রাসে পড়েছি, আমার কন্যার বইগুলি এখনো নতুন। শেষে বেলুড় মঠ থেকে খুঁজে এনেছি ইংরেজিতে ছবিওলা রামায়ণের চটি বই, আর Divine Children নামে, ধ্রুব, প্রহ্লাদ আর নচিকেতার গল্প। হুইপ জারী করেছি অঙ্ক, ভূগোল নয়, ঐ বই থেকে পড়ে বলতে হবে একটি করে গল্প তবেই গরমের ছুটিতে, অভ্নি মল ঘোরা, কন্ঠ সিনেমা দেখা এসব হবে, নচেৎ নয়। তাও দুটির বেশি গল্প এগোয়নি। গত শতাব্দীতে ইংরেজের বিরুদ্ধে সর্বস্ব পণ করেছিল এই ভারত। আর আজকের দেশ কত সহজে তার নিজের সরল আর গভীর একতার ভাবনাগুলি ভুলে বিদেশী সংস্কৃতিকে আপন করেছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা রামচন্দ্রের কোমল মন, ভ্রাতৃস্নেহ, ন্যায় বিচার, পরোপকার, প্রজানুরঞ্জন, সর্বস্ব ত্যাগ বিষয়ে কিছুই জানেনা।সহস্র বছর ধরে ভারতীয় মানস অমঙ্গলের ভুত তাড়াতে রাম লক্ষণের নাম আশ্রয় করেছে। আর আজ রাম কে না জেনে কেউ সেই পরমাশ্রয়কে বিদ্রূপের হাতিয়ার করে। আমাদের মতো মধ্য বয়সীদের মনে ঝোড়ো সমুদ্রের ঢেউ ভাঙে, যুব মন নিস্তরঙ্গই থাকে।

প্রমিতাদি আপনি, এবং আপনার মতো গুণী মানুষেরা সুস্থ থাকুন। সুস্থ ভাবনা বারবার আমাদের মনে করিয়ে দিন। গত শতাব্দীর শুরুতে ছিল বিদেশী শাসন থেকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাওয়ার লড়াই। আজ বর্তমান শতাব্দীর শুরুতে লড়াই অন্য। কলেজের স্টাফরুমে দুটি হাসিমুখ উঁকি মারে। কি ব্যাপার? হজে গিয়েছিলাম ম্যাডাম, আপনার জন্য মক্কার পবিত্র জল এনেছি। অপর মুখটি বলে, আপনি খাজা খান ম্যাডাম? পুরী গিয়েছিলাম, নিয়ে এসেছি। মক্কার পবিত্র জল, আর পুরীর খাজা মিলে যায় ভালোবাসায়। আজ আমার লড়াই এই হাসিমুখদুটি এমনভাবেই পাশাপাশি রাখার জন্য, দুজনকেই থিওডোলাইট আর প্রিসম্যাটিক কম্পাস সার্ভেতে একইরকম দক্ষ করার জন্য। ভাঙা দেশের ঘরপোড়া মানুষ আমি। ৪৭ শে জন্ম হয়নি তো কী? অনুভবে বয়ে নিয়ে চলেছি গত প্রজন্মের যন্ত্রণা। তাই ভারতীয়ত্ব, বাঙালিয়ানা আর মানবতা ছাড়া হাসিমুখদুটির অন্য পরিচয় অস্বীকার করি আমি। এই সঙ্গীত সন্ধ্যাটি আমার আত্মানুসন্ধান উস্কে দেয়। আজ যতই অডিও ভিসুয়ালের যুগ আসুক, কলম সর্বযুগে শক্তিমান। সেই ভরসাতে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের শতবর্ষের স্মরণে দেশমাতার চরণে আমার অঞ্জলি সমর্পণ করলাম।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল

মানচিত্রের রূপকথা

ড. শারদা মণ্ডল

ম্যাপ ঘর

আমি ভূগোলের প্রেমে পড়েছিলাম পঞ্চম শ্রেণীতে, সেই যেবার নিবেদিতা ইস্কুলের ছোট বাড়ি মানে প্রাথমিক বিভাগ পেরিয়ে বড় বাড়িতে অর্থাৎ মাধ্যমিক বিভাগে এলাম। কাকলিদি ভূগোল পড়াতেন। সেই সময় প্রথম জানলাম ক্লাসের ঘন্টা পড়লেই দিদি আসার আগে ব্ল্যাকবোর্ডের হুকে মানচিত্র টাঙিয়ে রাখতে হয়। আর ভূগোল ক্লাসে খাতা আনতে ভুলে গেলে তাও কোনোদিন ক্ষমা পেতেও পারি, কিন্তু চণ্ডীচরণের ম্যাপ বই না আনলে ক্ষমা নেই। স্কুলের নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যে ঘরের বড় টানাটানি। তার মধ্যে ফাইভ এ আর টিচার্স রুমের মধ্যে আস্ত একটি ঘর রাখা আছে কেবল মানচিত্রের জন্য। সেঘরে ভর্তি কালো ভারি কাঠের সুদৃশ্য সব আলনা। না জামাকাপড় রাখার মতো মোটেই নয়। দুপাশে গোল করে ঘোরানো হ্যাঙারের মতো। প্রতিটা খাঁজে থাকে রোল করে রাখা দেয়াল মানচিত্র। ঘরটায় জানলা ছিল অনেকগুলো। সবকটাই দরজার মতো বড়। পাছে বৃষ্টির ছাটে মানচিত্র ভিজে যায়, তাই জানলা বড় একটা খোলা হতনা। কিন্তু পাল্লাগুলো ছিল পুরোনো আমলের খড়খড়ি দেওয়া, ফাঁক দিয়ে রোদ আসতো। তাই ভিতরে অন্ধকার হতনা। বেশ একটা ঝিলমিলে আলো আঁধারি থাকত। ঐ অদ্ভুত ঘরে ইচ্ছে হলেই ঢোকা যেতনা। তালা দেওয়া থাকত। প্রতিদিন ভূগোল ক্লাসের আগে ছাত্রীদের দুজন প্রতিনিধি দস্তুর মতো অনুমতি নিয়ে ঐ ঘরে প্রবেশাধিকার পেত। এক একটা রোল খুলে কোনটা ইউরোপ, কোনটা এশিয়া, কোনটাই বা ভারতের নদনদী, আমরা খুঁজে বের করতাম। কোনোটা প্রাকৃতিক, আবার কোনটা রাজনৈতিক। কোথাও এশিয়া মাইনর, পামীর মালভূমি আবার কোথাও উত্তর আমেরিকার পঞ্চ হ্রদ কিংবা আফ্রিকায় কঙ্গোর জঙ্গল। ম্যাপ ঘরে ঢুকে পড়লে আমার কল্পনা ডানা মেলতো। খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে আসা রোদ্দুরের রেখা ধরে মন ইস্কুল বাড়ির বাইরে কখনো সাইবেরিয়ায় তুন্দ্রা অঞ্চলে পাড়ি জমাতো, কখনো ভূমধ্যসাগরে জাহাজ ভাসাতো।

মানচিত্রের গুরুত্

সেই ছোট বয়সেই বুঝতে পেরেছিলাম যে জিনিসের জন্য ইস্কুলে একটা আলাদা তালা দেওয়া ঘর থাকে সে জিনিস মহামূল্যবান।

আমাদের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন প্রব্রাজিকা স্বরূপপ্রাণাজী। তিনি ছিলেন ভীষণ কড়া ভূগোলের দিদিমণি। আমাদের ইস্কুলে ঢুকতেই বাঁদিকে দেয়াল জোড়া বিশাল ভারতের ম্যাপ ছিল। কাগজে ছাপা নয়। কাগজের মণ্ড দিয়ে তৈরি, অপূর্ব রং করা দেয়ালে বসানো মানচিত্র। হিমালয়ের পর্বতশ্রেণী সেখানে উঁচু হয়ে আছে। হিমালয়ের প্রথম পর্বতশৃঙ্গ নাঙ্গা পর্বত থেকে শেষ পর্বত শৃঙ্গ নামচাবারোয়া পর্যন্ত যে কোনো শিখরই সেখানে ছুঁয়ে দেখা যেত। সমভূমি ছিল নিচু, মালভূমি উঁচু। সেই ছোটবেলাতেই বুঝেছিলাম বইয়ের মানচিত্র যেমন দ্বিমাত্রিক হয়, তেমনই এই ভূপ্রাকৃতিক মডেল হিসেবে মানচিত্র ত্রিমাত্রিকও হতে পারে। আমরা একথা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে এই বিশাল ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তিনি নিজে তৈরি করেছিলেন। পরে বড় হয়ে পড়েছি মানচিত্রবিদ্যা যতটা বিজ্ঞান ঠিক ততটাই শিল্প। “Cartography is the science and art of map making.”
সত্যিই তো মাপজোখে নির্ভুল হলেও একটা বিশ্রী দেখতে মানচিত্র কি আমরা দোকান থেকে কখনো কিনব?
শ্রদ্ধাপ্রাণাজী ঐ ত্রিমাত্রিক মানচিত্রে আমাদের ভারতের নদনদীর প্রকৃতি বুঝিয়েছিলেন। ভারতের উত্তরে হিমালয় উঁচু। মধ্যভারতের মালভূমিও উঁচু। মাঝখানে নিচু খাঁজ গঙ্গানদীর পলি দিয়ে ভরে উঠেছে। সেটাই তো গঙ্গা বিধৌত সমভূমি। দুপাশের দুই উচ্চভূমি থেকে অনেক জলধারা গড়িয়ে এসে নিচু গঙ্গার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সেগুলিই তো গঙ্গার উপনদী। আবার দাক্ষিণাত্যের মালভূমি পূর্বে বঙ্গোপসাগরের দিকে ঢালু। তাই মহানদী, কৃষ্ণা, গোদাবরী আর কাবেরী চার নদীবোন তাদের সহচরী উপনদীদের হাত ধরাধরি করে বঙ্গোপসাগরের দিকে দৌড় দিয়েছে। কিন্তু আর দুবোন পারেনি। নর্মদা আর তাপ্তী। তাদের বন্দী করেছে বিন্ধ্য আর সাতপুরা পর্বত শ্রেণীর পাশে থাকা দুই গ্রস্ত উপত্যকা। এইজন্য তারা বাধ্য হয়েছে উল্টোদিকে আরবসাগরমুখী হতে। শৈশবের স্মৃতি আজ এতদিন পরেও একই রকম জীবন্ত। প্রধান শিক্ষিকা ভালো পড়িয়েছিলেন সন্দেহ নেই। কিন্তু তা চোখের সামনে বাস্তব করে তুলেছিল সেই বিশাল ত্রিমাত্রিক ম্যাপ। কোনো অচেনা জায়গার দৃশ্যকল্প তৈরি করতে, বৈজ্ঞানিক চেতনা, নির্ভুল ধারণা তৈরি করাতে মানচিত্রের জুড়ি মেলা ভার।

আশ্চর্য হল মানচিত্র সেই সভ্যতার আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত একই রকম গুরুত্বপূর্ণ। আদিম গুহামানবও গুহাচিত্রে চিহ্ন দিয়ে পশু আর নিজের অবস্থান চিহ্নিত করেছে। কাগজ যখন আবিষ্কার হয়নি, তখনও প্যাপিরাসের গায়ে বা মাটির টালির ওপরে সেযুগের মানুষ স্থানাঙ্ক বোঝাতে চেয়েছে। ছাপাখানা আবিষ্কারের কত আগে রোমের মানুষ তাদের পরিচিতির মাপ অনুযায়ী স্থানীয় নয় পৃথিবীর মানচিত্র আঁকার সাহস দেখিয়েছে। আজ বিশ্বব্যাপী অন্তর্জালের দৌলতে মানচিত্র আর বইয়ের পাতায় বন্দী নেই। সে আমাদের মুঠোফোনের মধ্যে থেকে আমাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়েছে। অচেনা কোথাও যেতে হলে চেনা মানুষের দিকনির্দেশের তুলনায় এখন আমরা গুগল ম্যাপ আর ফোনের জি পি এস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম)কে বেশি ভরসা করি।

ম্যাপ পয়েন্টিং

আমাদের ভূগোলের ম্যাপ পয়েন্টিং শিখিয়েছিলেন মানসীদি। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত ভূগোল বিষয়ে তাঁর হাতেই মানুষ হয়েছি। এমন নেশা ধরিয়ে দিলেন, মানচিত্র চর্চা এজীবনে ছাড়তে পারলামনা। ম্যাপ বই তো ছিলই। তিনি আমাদের একটা লম্বা সাদা খাতা করাতেন। তার নাম ম্যাপ খাতা। যে ক্লাসে সিলেবাসে যে দেশ বা মহাদেশ থাকত, ম্যাপ খাতায় তার সীমানার প্রতিটি খাঁজ মুখস্থ করে খাতার পাতায় আঁকতে হত। আজ যখন ক্লাসে পড়াতে গিয়ে বোর্ডে ম্যাপ আঁকি, মানসীদির কথা মনে পড়ে। লম্বা ছিপছিপে কাঁধে আঁচল টানা, কপালে লাল টিপ দিদি ম্যাপ আঁকছেন। ব্ল্যাকবোর্ডে চকের অনায়াস বিচরণে ফুটে উঠছে নিখুঁত মানচিত্র। আমার আঁকাটা দিদির মতো হয়না। একদিন রাত্তিরে চলভাষে প্রতিবেশিনীর গলা ভেসে আসে, বৌদি কাল মেয়ের ভূগোল পরীক্ষা। ম্যাপ পয়েন্টিংটা কিছুতেই ঠিক হচ্ছেনা। একটু দেখিয়ে দেবেন? বললাম, নিশ্চয়ই। মেয়েকে পাঠিয়ে দাও। অতঃপর ম্যাপ হাতে চিন্তিত মুখে বালিকার প্রবেশ। সবই করছি আন্টি। ইস্কুলে খালি নম্বর কেটে দিচ্ছে। তাই নাকি? দেখি তো! ম্যাপটাতো বেশ পরিচ্ছন্ন আর্টিস্টিক হয়েছে। এস এবার এটাকে নির্ভুল করে সায়েন্স করে তুলি। বই তে কী আছে? ব্রম্ভপুত্র নদ, অরুণাচল প্রদেশের এই খাঁজটা দিয়ে ভারতে ঢুকেছে। কিন্তু তুমি যে খাঁজে রেখেছ, ওটা ভূটানের। এই দেখ, গোদাবরীর মোহনায় বদ্বীপ অাছে। এই জায়গায় সীমানাটা উত্তল প্রকৃতির। কিন্তু তুমি অবতল জায়গা দিয়ে ওকে বঙ্গোপসাগরে ফেলেছ। বালিকা অনুযোগের সুরে বলে ঐ একটুখানিই তো সরে গেছে। আমি বলি, তা বটে, ঐ একটুখানি স্কেল হিসেবে দুশ কিলোমিটার হবে। বলো দেখি নম্বর দেওয়া যায়? তুমি দিতে? টিচার হলে? বালিকা ভুরু কুঁচকে বলে নাঃ, একেবারেই না। আরও মিনিট দশেক বিভিন্ন টিপ্স দেওয়ার পর বালিকা লাফিয়ে ওঠে। বুঝেছি আন্টি, ম্যাপ পয়েন্টিংএ আমাকে আর কেউ হারাতে পারবেনা। সোৎসাহে সে বলে চলে,
নিয়ম এক ঃ যে জিনিসটা পয়েন্টিং করব তার সম্পর্কে ভৌগোলিক তথ্যগুলো মাথায় রাখতে হবে।
নিয়ম দুই ঃ যে দেশ বা মহাদেশের ভিতর পয়েন্টিং করা হচ্ছে, তার সীমানার প্রতিটি খাঁজ, ভাঁজ মনে রাখতে হবে।
নিয়ম তিন ঃ সীমানার অভ্যন্তরে কোনো বিন্দু নির্দিষ্ট করতে হলে সুবিধামতো অন্য দুটি বা তিনটি সীমান্ত বিন্দু থেকে তার দূরত্বের আন্দাজ রাখতে হবে।
বলি, সাব্বাশ। সপ্তাহ খানেক পরে চলভাষে বালিকার গলা ভেসে আসে। আন্টি, এবারে ম্যাপ পয়েন্টিং এ ফুল মার্কস। অভিনন্দন জানিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকি। সেই কবে গ্রীক দার্শনিক এরাটস্থেনীস শুধু ভৌগোলিক নীরিক্ষণের দ্বারা পৃথিবীর ব্যাস নির্ণয় করেছিলেন, কোনো প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়াই। তারপরে দুহাজার বছরে হয়তো যন্ত্রের আতিশয্যে মানুষের শারীরিক সক্ষমতা কমেছে। কিন্তু মনের ধার বেড়েছে বই কমেনি। বাচ্ছারা খুবই বুদ্ধিমান। শুধু একটু ধরিয়ে দেওয়ার লোক চাই।
আমার কন্যা স্কুলে যাবে। তার ভবিষ্যত ভালো হবে, অনেক আশা নিয়ে বেসরকারী ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে তাকে ভর্তি করেছি। পড়ানোর অনেক খরচ। সকালে খুব তাড়াহুড়োয় স্কুল ব্যাগে বই গোছাতে বসি। রুটিনে আজ ভূগোল আছে দেখে স্কুল অ্যাটলাসটা ব্যাগে পুরে দিই। মেয়ে খুব বিরক্ত হয়। মা, তুমি দেখছ ব্যাগটা এত ভারি, কাঁধ, পিঠ ফেটে যায়, এর মধ্যে এত মোটা ফালতু ম্যাপ বইটা ঢুকিয়েছ? তাকে বৃথাই বোঝাই ভূগোল ক্লাসে লাগবে বাবু। মা তোমাকে নিয়ে পারা যায়না, আমাদের ম্যাপ ফ্যাপ লাগেনা। ক্লাসে ম্যাপ দেখিয়ে পড়ানো হয়না। ব্যাগ থেকে টান মেরে বইটা বার করে দিয়ে মেয়ে স্কুল বাসে উঠে যায়। জানলা দিয়ে হাওয়া আসে, খাটের ওপর ম্যাপ বই এর পাতা ওড়ে। বুকের ভিতর মোচড় দেয়। স্বরূপপ্রাণাজী, মানসীদি আপনারা কোথায়? আকাশ থেকে দেখছেন? গতকাল আমি কলেজের ক্লাসে ম্যাপ আঁকা ঠিক হয়নি বলে, স্টুডেন্টদের খুব বকাবকি করেছি। আমি ভুল করেছি, ভীষণ ভুল করেছি। ওদের কলেজের লেভেলে তুলে আনতে গেলে, আমাকে স্কুলের পড়া থেকে শুরু করতে হবে।

মানচিত্রবিদ্যার অ আ ক খ

স্কুলের গণ্ডী পেরিয়ে ছেলেমেয়েরা আমার ভূগোল অনার্সের ক্লাসে ভর্তি হয়। কলেজের আর পাঁচটা ছেলেমেয়ের তুলনায় তাদের মুখগুলি বেশ কচি। বালিকা বিদ্যালয় পেরিয়ে আসা মেয়েরা কোএডুকেশন কলেজে কী জানি কি হবে, ভেবে আলাদা বেঞ্চে একটু জড়োসড়ো হয়ে বসে। কলেজে স্কুলের থেকে স্বাধীনতা বেশি, তাই ভেবে কোনো ছেলের চোখে দুষ্টুমি ঝিকিয়ে ওঠে। কেউ আবার চশমা আঁটা সিরিয়াস। কেউ বা আগে থাকতেই ভেবে বসে অাছে, কলেজে লেখাপড়া কিছুই হবেনা। বাংলা মিডিয়ামের স্টুডেন্ট ভাবে অনার্সের সব বই কি ইংরেজি? একবার ভর্তির সময়ে এক অভিভাবিকা আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ম্যাডাম, আমার ছেলে ইংলিশ মিডিয়াম। এ কলেজে বাংলায় পড়ানো হবেনা তো? আজ এত বছরের অভিজ্ঞতায় মুখের দিকে তাকালে ছাত্রছাত্রীদের মন পড়তে পারি। নানা সংশয়ে ভরা মুখগুলোকে প্রথম ক্লাসে হেসে জিজ্ঞেস করি, তোমরা ভূগোল বেছে নিলে কেন গো? ভূগোল পড়তে ভালোলাগে ম্যাম। ওমা তাই বুঝি? তাহলে বলোতো, দুনিয়ার বাকি লোকের থেকে ভৌগোলিকেরা কিসে আলাদা? প্রশ্ন শুনে কোনো চোখে কৌতুক খেলা করে, কোনো চোখ আকাশ পাতাল এক করে ভাবতে বসে। নিজেই উত্তর দিই, only geographers are map makers and the rest of the world is map user. শ্রেণী কক্ষে পলকে খেলে যায় বিস্ময়ের ঢেউ। তবে হ্যাঁ আজ এই স্যাটেলাইট টেকনোলজি আর সফ্টওয়্যার বিস্ফোরণের যুগে মহাকাশ বিজ্ঞানী আর সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররাও মানচিত্র নির্মাণে হাত লাগিয়েছেন। তবে সেখানে এক ধরণের অসুবিধা আছে। নশো কিলোমিটার ওপর থেকে কৃত্রিম উপগ্রহ আমাদের চেনা ক্যামেরার মতো ছবি তুলতে পারেনা বরং নানাধরণের ডিজিটাল সিগন্যাল পাঠায়। ল্যাবরেটরিতে সেই সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে তার ওপরে কৃত্রিম রং চাপানো হয়। নদীর জল আর পাকা রাস্তা থেকে আলো বা সূর্যের অন্য তড়িৎ চুম্বকীয় রশ্মির প্রতিফলন তো আর এক হবেনা। তাই ল্যান্ডস্কেপ অনুযায়ী সিগন্যাল আলাদা হবেই। তার ওপর নির্ভর করে কম্পিউটার রং গুলোও চাপায় আলাদা আলাদা। এইভাবে একরকমের ইমেজ তৈরি হয়। সাধারণ মানুষ যে এইসব কৃৎকৌশল জানেনা, তার মনে হবে এযেন, নানা রঙের ছোপ দেওয়া হিজিবিজি কাগজ। কিন্তু পৃথিবীর প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব ধরণের কার্যকারণ বিশ্লেষণ করে ফাইনাল মানচিত্রীকরণ আর তার সঠিক ব্যাখ্যা করে তথ্য বিশ্লেষণ, একৌশল ভৌগোলিক ছাড়া পৃথিবীতে আর কারোর জানা নেই। শ্রেণীকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের চোখে অজান্তে গর্ব ফুটে ওঠে। কিন্তু এবারে প্রশ্ন হল মানচিত্র একই সঙ্গে হতে হবে সহজ, সর্বজনবোধ্য, নির্ভুল ও দৃষ্টিনন্দন। আবার তাকে ছাপানো বই, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার সব মাধ্যমে ইউজার ফ্রেন্ডলিও হতেই হবে।

কূটতর্ক

পর পর ক্লাসে মানচিত্রবিদ্যার কূট তর্কের অবতারণা হয়। মহাভারতে আছে দ্রৌপদী পূর্বজন্মে পাঁচটি শ্রেষ্ঠ গুণে গুণান্বিত পতি চেয়েছিলেন, তাই তাঁকে পঞ্চপতি বরণ করে নিতে হয়। কারণ একক মানুষ পঞ্চশ্রেষ্ঠগুণের অধিকারী হতে পারেনা। মহাকাব্য শুধু তো গল্প নয়। বাস্তবের রূপক। মানচিত্রও সর্বদিকে নির্ভুল হতে পারেনা। যেমন ধরা যাক যদি নিরক্ষরেখাকে মাঝখানে রেখে চৌকো আকৃতির বিশ্ব মানচিত্র আঁকি, তাহলে নিরক্ষীয় অঞ্চল ভালো দেখায় বটে, কিন্তু দুই মেরু অঞ্চল দুই সীমানায় বেঢপ হয়ে দাঁড়ায়। আবার উত্তর মেরুকে কেন্দ্রে রেখে গোলাকার মানচিত্র অঙ্কন করলে সেটা নিরক্ষরেখাতেই শেষ হয়ে যায়। কারণ বাকি দক্ষিণ গোলার্ধের বেড় যেহেতু নিরক্ষরেখার থেকে ছোট সে অংশটা আড়ালে থেকে যায়। পরিস্থিতি আর উদ্দেশ্য বিচার করে যে অংশটা দরকার সেটা ঠিক রেখে বাকি অংশের ভুল মেনে নিতে হয়। যেমন সড়ক মানচিত্র আঁকতে গেলে দৈর্ঘ্যটা ভুল হলে চলেনা। কিন্তু সেটা ঠিক রাখতে গেলে দেশের আয়তন উনিশ বিশ হয়ে যেতে পারে। আবার ধরা যাক ভারতবর্ষের আকৃতি বরফির মতো। দক্ষিণ আমেরিকার চিলি দেশটা একটা লংকার মতোই লম্বাটে। স্পেন দেশটা অনেকটা যেন বর্গক্ষেত্রের মতো। এমন ধারা আলাদা আকৃতির সঠিক অঙ্কনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অঙ্ক কষতে হয়। অঙ্ক কষার ঝামেলা কি কম! বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে এমন একটা জ্যামিতিক আকৃতির খোঁজ পাওয়া যায়না, যার সঙ্গে পৃথিবীর আকৃতি সঠিক ভাবে মিলে যায়। পৃথিবী গোল বটে, কিন্তু মেরুতে চাপা, বিষুবরেখা বরাবর ফোলা। মেরু ব্যাস, নিরক্ষীয় ব্যাসের থেকে ছোট। তাহলে কি উপগোলক? না তাও নয়। কোথাও পাহাড় তো কোথাও গভীর সমুদ্র খাত। গড় সমুদ্র পৃষ্ঠও চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণ, জোয়ার ভাঁটা, কোরিওলিস বল প্রভৃতি কারণে সর্বত্র এক নয়। শেষ পর্যন্ত মেনে নিতেই হয় পৃথিবীর আকৃতি পৃথিবীর মতো। তাই কোন মানচিত্রের জন্য কোন অঙ্ক কষতে হবে তা বুঝতে গেলে, জানতে হয় অভিক্ষেপ শাস্ত্র (Theory of Map Projection)।

মানচিত্র সজ্জা

মানচিত্র তো কেবলমাত্র দেশ বা মহাদেশের সীমান্ত সূচীত করেনা। সেখানকার ভূপ্রকৃতি, নদনদী, স্বাভাবিক উদ্ভিদ, জনবসতি, অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপ, পরিকাঠামো, পরিষেবা সব কিছু দেখায়। দেখানোর জন্য দরকার হয় সর্বজনগ্রাহ্য রং আর চিহ্নের ব্যবহার। যেমন নিয়মমতো কৃষিক্ষেত্রে হলুদ, জলে নীল আর জনবসতিতে লাল রং ব্যবহার হয়। আমি আমার ইচ্ছে হলেই এগুলো অদল বদল করতে পারিনা। আর শুধু এঁকে দিলেই কাজ শেষ হয়ে যায়না। হেডিং, স্থান নাম, চিত্রসূচী অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশ, স্কেলের অনুপাত সব কিছু আইন মোতাবেক লিখে দিতে হয়। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বাছবিচার না করে সব তথ্য দেখায় যে মানচিত্র তা হল টোপোগ্রাফিকাল ম্যাপ। আবার বাকিগুলো বাদ দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে মানচিত্র বানালে, তা হয় বিষয় ভিত্তিক মানচিত্র বা থিম্যাটিক ম্যাপ।

ক্ষুদ্রতম মানচিত্র একক

তবে মানচিত্রে দেখাব ভাবলেই সব জিনিস দেখানো যায়না। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। যেমন ধরা যাক, কোনো ম্যাপের স্কেল হল এক সেন্টিমিটারে পাঁচশ মিটার। অর্থাৎ কিনা কাগজে এক সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য ভূপৃষ্ঠে পাঁচশ মিটারের সমতুল্য। তবে হিসেব অনুযায়ী কাগজে এক মিলিমিটার দৈর্ঘ্য ভূপৃষ্ঠে পঞ্চাশ মিটারের সমতুল্য হবে। এবারে মানচিত্রের উপরে যদি একটি বিন্দু অঙ্কন করি, তার ক্ষেত্রফল কমবেশি এক স্কোয়ার মিলিমিটার হয়ে দাঁড়ায়। হিসেব মোতাবেক ভূপৃষ্ঠে ঐ পরিমাণ এলাকার মাপ হয় পঞ্চাশ মিটার গুণিতক পঞ্চাশ মিটার, অর্থাৎ কিনা ঐ নির্দিষ্ট ম্যাপটিতে এক বিন্দু পরিমাণ এলাকার মাপ ভূপৃষ্ঠে আড়াই হাজার স্কোয়ার মিটার হয়ে দাঁড়ায়। তার অর্থ হল ঐ ম্যাপে আড়াই হাজার স্কোয়ার মিটারের থেকে ছোট কোনো বস্তু এঁকে দেখানো যায়না। সেই কারণেই একটা A4 সাইজের কাগজে যদি ভারতের ম্যাপ আঁকি, তবে সেখানে একটি পৃথক নদী আঁকা সম্ভব, কিন্তু একটি পৃথক নলকূপ আঁকা সম্ভব নয়। প্রতিটি মানচিত্র নির্মাণে এই ক্ষুদ্রতম মানচিত্র একক নির্ণয় করতে হয়।

জরিপ

মানচিত্রে যে এতরকম বিষয়ের সঙ্কুলান করা হয়, সেগুলো যাতে ঠিক ঠিক জায়গায় বসে, তার জন্য নির্ভুল অবস্থান নির্ণয়ের দরকার হয়। অবস্থান নির্ণয় করতে গেলে নানাবিধ যন্ত্রপাতি সহযোগে জরিপ কাজের দরকার। ইংরেজ আমলে সারা ভারতবর্ষ জরিপ করে টোপোগ্রাফিকাল মানচিত্র অঙ্কন করা হয়েছিল। সেই মহা জরিপকার্যের নাম হল Great Triangulation Survey বা সংক্ষেপে GTS । এই জরিপ সমাধা করার জন্য বেশ কিছু ইটের টাওয়ার তৈরি করা হয়েছিল। এখনো তার কিছু কিছু ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। ছোটবেলায় খড়দহ পেরিয়ে পানিহাটিতে বড়মামার বাড়ি যেতাম। পথের উপর এমন টাওয়ার দেখেছি। লোকে বলতো সুখচর গীর্জা। ২০১৮ সালে জি টি এস এর দু’শ বছর পূর্ণ হল। এই উপলক্ষ্যে ভারত ও ব্রিটেনের সহযোগিতায় বেশ কিছু মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান, সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। আলিপুরের জাতীয় গ্রন্থাগারের ভাষা ভবনে এই জি টি এস টাওয়ারগুলি নিয়ে একটি চমৎকার প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। বেলফাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অধ্যাপক এসেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগ আর সার্ভে অফ ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ ছিলেন যৌথ দায়িত্বে। দু’শ বছর আগেকার সেই instrumental survey – এর যন্ত্র বসানোর একটা বড় তেপায়া স্ট্যান্ড ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে সংরক্ষিত আছে, যে কেউ ইচ্ছে হলে দেখে আসতে পারে।

জিওগ্রাফিকাল ইনফর্মেশন সিস্টেম (GIS)

আজকাল বেশিরভাগ মানচিত্র কাগজের ওপরে হাতে আঁকা হয়না। প্রাথমিক মানচিত্র স্ক্যান করে কম্পিউটারে সফ্ট কপি বানানো হয়। ঐ ডিজিটাল ম্যাপ ছোট ছোট পিক্সেল দিয়ে তৈরি। অমন ম্যাপকে আমরা বলি রাস্টার ম্যাপ। এবারে জি আই এস সফ্টওয়্যারের সাহায্যে ডিজিটাইজ করে সেটিকে ভেক্টর ম্যাপে পরিণত করা হয়। এই ভেক্টর ম্যাপের মধ্যে যেকোনো ধরণের প্রাকৃতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক তথ্য যুক্ত করা সম্ভব। যুক্ত করার পরে পছন্দমতো যে কোনো রকম মানচিত্র কম্পিউটারে তৈরি করা যায়, দরকারে প্রিন্ট আউটও বার করা যেতে পারে। এই পুরো ব্যবস্থাটি কৃত্রিম উপগ্রহের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। এই জিওগ্রাফিকাল ইনফর্মেশন সিস্টেম (GIS) আজ মানচিত্রবিদ্যার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ভারতবর্ষের সেনাবাহিনী থেকে গ্রাম পঞ্চায়েত পর্যন্ত প্রশাসনিক প্রতিটি সেক্টর এই সিস্টেমের অংশ।

নিজে মানচিত্র তৈরি

ওপরের কথাগুলো শুনে মনে হতে পারে, মানচিত্র নির্মাণ একটা ভীষণ কঠিন আর ভজকট ব্যাপার। কিন্তু আজও যখন অভিযান হয়, দুর্গম প্রদেশে না থাকে কম্পিউটার, না থাকে ইন্টারনেট সংযোগ অথবা প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ। চাঁদের পাহাড়ে শঙ্করকে মনে পড়ে? সঙ্গী আলভারেজকে হারিয়ে তাকে নিজের মানচিত্র বানিয়ে, দিক ঠিক করে বাঁচার পথ খুঁজে নিতে হয়েছিল। ভূগোল অনার্সের ক্লাসে ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমাদের ফিল্ড সার্ভেতে যেতে হয়। সেবার অন্ধ্রপ্রদেশের আরাকু উপত্যকায় গিয়ে কি সমস্যা! গ্রামে গেছি প্রশ্নপত্র বানিয়ে, গ্রামবাসীদের সাক্ষাৎকার নিতে। প্রশ্নের সঙ্গে আছে সম্ভাব্য উত্তর তালিকা। যিনি যেমন উত্তর দেবেন, সেই অনুযায়ী ডেটা টেবিল বানানো হবে। তার ওপরে ভিত্তি করে বারগ্রাফ, পাইগ্রাফ ইত্যাদি নানা লেখচিত্র আঁকা হবে। সেই লেখচিত্র বসানো হবে গ্রামের মানচিত্রের ওপরে। এমনভাবে তৈরি হবে আমাদের নিজেদের তৈরি থিম্যাটিক ম্যাপ। কিন্তু গোল বেঁধেছে যে মানচিত্রটা এখানে আসার আগে গ্রামের বলে যোগাড় করা হয়েছিল, সেটার সঙ্গে গ্রামের মিল পাওয়া যাচ্ছেনা। স্থানীয় লোককে জিজ্ঞাসা করেও কোনো সুরাহা মিলছেনা। অথচ ম্যাপ না হলে রিপোর্ট সম্পূর্ণ হবেনা। শেষ পর্যন্ত ঠিক হল কুছ পরোয়া নেই। ম্যাপ আমরা নিজেরাই বানিয়ে নেব। চারজন ছাত্রছাত্রী আর আমি পাঁচজনের দল বানিয়ে গ্রামের পথে রওনা হলাম ম্যাপ মেকিং অভিযানে। পাহাড়তলির ছোট গ্রাম। কাঁচা রাস্তা ধরে চলেছি। দুজনকে কাজ দিলাম রাস্তার দুধারের ভূমির ব্যবহার বা land use দেখে আঁকার। তৃতীয়জনকে আগে দশ পা হাঁটিয়ে দেখে নিলাম কত মিটার হচ্ছে। তার কাজ হল প্রতিটি ভূমির ব্যবহার যেখানে বদল হচ্ছে সেখানে গুণে গুণে কত পা হল সেটা বলা, যাতে লিখে রাখা যায়। চতুর্থজনের কাজ হল পথের প্রতিটা বাঁকে কম্পাস দিয়ে রিডিং নেওয়া, আর কৌণিক পরিমাপটা লিখে রাখা। এমনভাবে চলে তিন ঘন্টায় আমরা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম সেখানে ফিরে এলাম। হোটেলে ফিরে ঘন্টা দেড়েকের প্রচেষ্টায় আরাকুর গ্রামের চমৎকার ম্যাপ তৈরি হয়ে গেল। নিজের দলের হাতে তৈরি ম্যাপ দেখে স্টুডেন্টদের সে কি আনন্দ।

কর্কটক্রান্তি

একবার জেনারেল কোর্সের ছেলেমেয়েদের নিয়ে আমরা কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণি গ্রামে মাটির পুতুলের ওপরে সার্ভে করতে গিয়েছিলাম। সমীক্ষা, জরিপ সবকিছু সম্পন্ন হওয়ার পরে ওদের নিয়ে নবদ্বীপ, মায়াপুর বেড়াতে গেলাম। প্রধান সড়কের উপর একপাশে দেখি এক বিবর্ণ সিমেন্টের ফলক। নিজেরাই ধুলো ঝেড়ে পড়ে নিই, তাতে লেখা, এই স্থান দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা বিস্তৃত রয়েছে। মানে আমরা এখন কর্কটক্রান্তির ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। পুরো দল আনন্দে আত্মহারা। স্থানীয় মানুষের চোখে বিস্ময়, এক বাস ভর্তি উন্মাদ একটা ময়লা হয়ে যাওয়া সিমেন্টের ফলকের চারপাশে নাচানাচি করছে। জড়িয়ে ধরে ছবি তুলছে। হায়রে আমার স্বদেশ। গ্রিনিচে মূলমধ্যরেখার ওপরে পা দেওয়ার জন্য পর্যটকদের ডলার গুণতে হয়। আর এদেশে প্রায় দুহাজার কিলোমিটার ধরে বিস্তৃত রয়েছে কর্কটক্রান্তি রেখা। আসলে প্রকৃতি সব অমূল্য জিনিস আমাদের এত বেশি বেশি দিয়েছেন, আমরা সব মূল্যহীন করে ফেলি। মনীষীরাও সব সময় ত্যাগ তিতিক্ষা শিখিয়ে গেছেন। তাই দেশের সরকারও সামান্য পয়সা রোজগারের ফিকিরকে গুরুত্ব দেননা।

শেষের কথা

মানচিত্র নির্মাণে এক একটি কূটতর্ক এক একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ, যার সমাধান করতে করতে সংশয়ী ছাত্র ছাত্রীরা হয়ে ওঠে সহযোদ্ধা। ছেলে কি মেয়ে, বাংলা না ইংলিশ মিডিয়াম সব পরিচয় ভেসে যায়। উচ্চ শিক্ষার যুক্তিজালের ধারালো ছুরিতে শান দিয়ে দিয়ে কচি মুখগুলো এতোদিনে ঝলমলিয়ে ওঠে। এক শিক্ষক দিবসে তারা উপহার দেয় বর্গাকৃতি রাংতা মোড়া বাক্স। খুলে দেখি থার্মোকলের এক সুন্দর ভারতবর্ষ। আহা, চোখে জল আসে, আমার কুঁড়ি ফোটা ভূবিজ্ঞানীদের নিজের হাতে তৈরি। এযে কোহিনূরের থেকেও দামী।

একবার ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো আমাদের এক কর্মশালায় ডেকেছিলেন। অনুষ্ঠান নিউ টাউনের রবীন্দ্র তীর্থে। ভালো ফাইল, পেন উপহার পেলাম। দুপুরে এলাহি খাওয়া দাওয়া। সবকিছু সরকারী খরচে। অফিসারেরা জানালেন শিক্ষকদের এমন খাতির যত্ন তাঁরা করছেন মানচিত্রবিদ্যা সম্পর্কে কিছু সরকারী প্রকল্প যাতে আমরা ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দিই। শুনে একই সঙ্গে চমৎকৃত ও কৌতূহলী হই। প্রোজেক্টরের কৌশলে সামনের পর্দায় ফুটে ওঠে কিছু অবিশ্বাস্য ভবিষ্যৎ। কল্পনা করা যাক, আমি বেশ দিল্লি গেছি। কুতুবমিনার বেড়াতে যাব, কিন্তু রাস্তা চিনিনা। মোবাইল ফোনের ক্যামেরা অন করে ফোনটাকে সোজা করে ধরে ঘুরে গেলাম এক পাক। আমার ঘোরার সাথে সাথে ইসরোর কৃত্রিম উপগ্রহ গুলো ফোন ক্যামেরার সাহায্যে বুঝে নিল আমি কোথায় আছি। এবারে ফোনের স্ক্রিনে চলে আসবে কার্টুন চরিত্র, যে আমাকে গন্তব্যে পৌঁছনো পর্যন্ত আঙুল দিয়ে দেখাবে কোন দিকে যাব। আর কোথা থেকে বাস বা ট্যাক্সি ধরব, কোথায় খাব, কোথায় ওষুধ বা অন্যকিছু দরকারী জিনিস কিনব সে সবও বলে দেবে। আবার ধরা যাক, আমি ভ্রমণ পিয়াসী, এদিকে অসুস্থতার কারণে বেরোনোর উপায় নেই। বন্ধুরা মুর্শিদাবাদের হাজার দুয়ারী প্রাসাদ দেখতে যাচ্ছে। আমার ভীষণ মন খারাপ। তখনও মুস্কিল আসান হবে ইসরো। কি করে? খাটে শুয়ে শুয়ে সোজা ঢুকে পড়ব ইসরোর ওয়েবসাইটে। বলব আমাকে হাজার দুয়ারী ঘোরাও। কার্টুন গাইড আমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে রওনা দেবে। হাজার দুয়ারীর গেট দিয়ে ঢুকে প্রতিটি অলিগলি দেখাবে, তার সম্পর্কে তথ্য, ইতিহাস সব জানাবে। বন্ধুরা চোখে দেখে হয়তো অনেক কিছুই মিস করবে। কিন্তু এই ভার্চুয়াল ট্যুরে আমি সব জেনে যাব। কোনো আপশোষ থাকবেনা। দুটি প্রকল্পই মানচিত্রবিদ্যার চরম উৎকর্ষের নিদর্শন। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের দরকার কেন? এই বিশাল ভারতবর্ষে আছে হাজার দুয়ারীর মতো লাখো জায়গা যেখানে মানুষ বেড়াতে যেতে চায়, অথবা রাস্তা খোঁজে। গুটিকয়েক বিজ্ঞানীর পক্ষে এই বিশাল কাজ সম্পন্ন করা দুর্ঘট। এছাড়াও চাই অভিনব কিছু আইডিয়া, যা আগে কেউ ভাবতে পারেনি। এজন্য ভারত সরকার চান নবীন প্রজন্ম এই কাজে এগিয়ে আসুক।

লেখা শেষের আগে চুপি চুপি দুটো খবর জানিয়ে রাখি। প্রথমতঃ ইসরোর ভুবন প্রোগ্রাম আর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ব বিভাগের ইউ. এস. জি. এস. আর্থ এক্সপ্লোরে অ্যাকাউন্ট করলে সারা পৃথিবীর উপগ্রহ চিত্র খুলে যায়। সেখান থেকে যেকোনো স্থানের মানচিত্র সম্বন্ধে ধারণা করা সম্ভব। ঐ উপগ্রহ চিত্র এতটাই পুঙ্খানুপুঙ্খ সেখান থেকে আমি আমার গ্রামের বাড়ির তিন শিবের মন্দির পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছি।

দ্বিতীয়তঃ মাপজোকের জন্য দৈর্ঘ্য মাপার রুলার, দিক নির্ণয়ের কম্পাস, কোনো কিছু অনুভূমিক কিনা বোঝার জন্য স্পিরিট লেভেল, ভূপৃষ্ঠের নতি বোঝার জন্য ক্লাইনোমিটার, কোনো স্থানে শব্দের প্রাবল্য মাপার নয়েজ মিটার, উচ্চতা মাপার অল্টিমিটার এত কিছু নিয়ে ঘোরা তো অসুবিধে। তাছাড়া প্রতি মুহূর্তে সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর ও প্রয়োজন হয়। তাই আমি গুগল প্লে স্টার থেকে মুঠোফোনে এই সব অ্যাপ্লিকেশন ডাউনলোড করে নিয়েছি। এখন দরকার মতো অ্যাপের আইকনে ট্যাপ করলেই মুঠোফোনটা ঐসব যন্ত্রের মতো আচরণ করে, রিডিং ও দেয়। তাই ইচ্ছেমতো স্থানীয় মানচিত্র তৈরি করা এখন খুবই সহজ।

তাহলে কি ভাবছ গো আমার ছোট ছোট পাঠক বন্ধুরা? মানচিত্রবিদ্যা শিখবে তো? দেশের ভবিষ্যৎ যে তোমাদেরই হাতে।

বিষয়: শিক্ষক সম্বন্ধীয় সরকারী বিজ্ঞপ্তি ২৯ শে মে, ২০১৯

গতকাল সরকারের একটি বিজ্ঞপ্তি থেকে জানতে পারলাম যে কলেজ গুলিকে এই মর্মে বয়ান দিতে হবে, সেখানে নেট /সেট পাশ করেনি, পি এইচ ডি বা এম ফিল ডিগ্রি নেই এমন কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হয়নি। সত্যিই তো উচ্চ শিক্ষার প্রাঙ্গণে ন্যূনতম যোগ্যতা থাকলে তবেই পড়ানো যাবে, এতে কোনো ভুল নেই।

মনে পড়ে অনেক দিন আগের কথা। স্নাতক পরীক্ষা শেষ হয়েছে সদ্য। তখনও ফলপ্রকাশ হয়নি। বাড়িতে ফোন ছিলনা, এক বার্তাবাহক খবর আনলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা প্রব্রাজিকা স্বরূপ প্রাণাজী ডেকে পাঠিয়েছেন। তড়িঘড়ি ইস্কুলে ছুটলাম। প্রধান শিক্ষিকা যা বললেন, শুনে বিস্ময়ের অবধি রইলনা। তিনি অনুরোধ করলেন, ভূগোলের এক শিক্ষিকা অসুস্থ, ছুটি নিয়েছেন। স্নাতক পরীক্ষার ফল প্রকাশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এসব হওয়ার আগে, এই দুমাস অবসর। এসময়ে ইস্কুলে ঐ শিক্ষিকার বদলে আমি যেন পড়িয়ে দিই। পরদিন থেকে শুরু হল আমার শিক্ষিকা জীবন। আমি একটি সাধারণ মেয়ে, এতদিন ক্লাসরুমে টেবিলের ওপারে ছিলাম, হঠাৎ এপারে এসে এক আশ্চর্য সম্মানের জগতে নিজেকে অনুভব করলাম। আমি যে প্রাঞ্জল ভাবে কোনো বিষয় বোঝাতে পারি, সেটাও দেখে চমকে গেলাম। ছোটদের কখনো অবোধ, কখনো তীক্ষ্ণ প্রশ্নের সামনে নাকাল হলাম। আর যাতে অমন না হয় তার জন্য জানা বিষয় গুলি আবার পাগলের মতো পড়তে শুরু করলাম। প্রতিদিনের প্রতিটি ক্লাস যেন নতুন নতুন পরীক্ষা। এই নতুন চ্যালেঞ্জে জীবনে তখন নতুন রোমাঞ্চ। সব মিলিয়ে এ আমার অদ্ভুত আত্মআবিষ্কার। স্নাতকোত্তর পাশ করার পর, বেতালবাবু আমাকে বিদ্যাসাগর মর্নিং আর হাওড়া গার্লস্ কলেজে পাঠিয়েছিলেন কথা বলতে। তাঁদের তখন অস্থায়ী শিক্ষকের দরকার ছিল। অপূর্ব রবি বাবু পাঠালেন রামমোহন কলেজে। শেষ পর্যন্ত সেখানে বহাল হলাম। আজকের ভাষায় বলা যেতে পারে কলেজ অ্যাপয়েন্টেড পার্ট টাইম টিচার। মাইনে মাসে দেড়শ টাকা, সপ্তাহে এগারোটি ক্লাসের বিনিময়ে। সকাল ছটায় ক্লাস শুরু। মানছি পরিশ্রমের তুলনায় বাজার দর ছিল স্বল্প। কিন্তু ঐ ভোরের ক্লাসেই মনের ভিতরে নতুন সুর বেজে ওঠে। অন্য কোনো কেরিয়ার নয়। মনস্থির করি শিক্ষকের চাকরিটাই করব। কয়েকমাসের মধ্যে আমি যে এক চান্সে স্লেট পরীক্ষায় পাশ করে গেলাম তার পিছনে রামমোহন কলেজের ঐ ভোরের ক্লাসের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। আসলে শিল্প ক্ষেত্রে ইন্টার্নশিপ থাকে, ডাক্তারিতে হাউসস্টাফ হওয়ার সুযোগ আছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে তো কিছুই নেই। তাই এই সুযোগ গুলোই ছিল আমার জীবনের ইনফর্মাল ইন্টার্নশিপ, যা আমাকে এই পেশায় উঠে আসতে সাহায্য করেছে। শুধু আমাকেই নয়, যুগে যুগে বহু শিক্ষককেই এই ব্যবস্থা সাহায্য করেছে। আজ আমারও ছাত্র ছাত্রী বিভিন্ন কলেজে এই ভাবে আছে। কলেজের পরিমণ্ডলে থেকে সেট, জে আর এফের জন্য লড়াই করছে। এখনও চাকরির নানা স্বার্থপরতা শেখেনি, পড়ানোটা তাদের কাছে হল অনেকটা আবেগ। এই নির্দেশিকার পর তাদের এই সুযোগটা আর থাকবেনা। এখন যারা আছে, তারা হয়তো কাজ হারাবে। সর্বজনীন প্রতিযোগিতায় সবাই হয়তো শিক্ষা ক্ষেত্রে আর ফিরবেনা। জানি আমাদের যুগ আর নেই। নতুন যুগে নতুন পেশাদারিত্ব মেনে নিতে হবে। কিন্তু পেশাদার তখনই হতে পারি, যখন ছাত্র ছাত্রীদের যথেষ্ট শিক্ষকপদ আর প্রচুর ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সুযোগ দিতে পারব। তাই মনটা একটু খারাপ। একটু কি অন্য ভাবে ভাবা যেতে পারতো?

কাউকে সমালোচনা বা আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। মতামত একান্তই ব্যক্তিগত।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল

মূর্তি নদী আর গরুমারা অভয়ারণ্য

পরিবারের সবাই মিলে ডুয়ার্স বেড়াতে এসেছি। সময়টা ডিসেম্বরের শেষার্ধ। শীত অসহনীয় নয়। বেশ উপভোগ্য।মূর্তি নদীর ধারে রিসর্টে থাকব তিনদিন। কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম বনবিভাগের কর্মীরা একে একে কুনকি হাতিদের নিয়ে আসছেন নদীতে স্নান করাবেন বলে। দূর থেকে দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি জুতোটা পায়ে গলিয়ে নিয়ে কন্যাসহ দৌড় লাগাই। হাতিদের জলকেলি এতকাল কেবল সিনেমা কিংবা টিভিতেই দেখেছি। সামনে থেকে এমন দৃশ্য উপভোগের সুযোগ কি ছাড়া যায়? কিন্তু নদীর কাছে যেতেই গজরাজেরা শুধু শুঁড়ের মুখটা জলের উপরে রেখে বাকি শরীরটা জলের মধ্যে লুকিয়ে ফেলে। বনবিভাগের কর্মীরা সনির্বন্ধ অনুরোধ জানান, আমরা যেন সরে যাই। হাতিরা লজ্জা পাচ্ছে। সত্যিই তো আমরা মানুষেরা কি স্বার্থপর! শুধু নিজেদের উল্লাসকে এতটা গুরুত্ব দিই, যে অন্যের পছন্দ অপছন্দ গুলো ধর্তব্যের মধ্যেই আনিনা। সে হোকনা মানুষ ছাড়া অন্য কেউ, কারোর একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তে অনধিকার প্রবেশ করতে নেই। নিজেরাই খুব লজ্জিত হলাম।

নগাধিপতি হিমালয়। তার পাদদেশে ডুয়ার্সের প্রকৃতি যে এত সুন্দর, যে চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয়না। ঢেউ খেলানো জমিতে চা বাগান, মধ্যে মধ্যে কাঁচা মাটির পথ, ছোট ছোট গ্রাম, আর তরাইয়ের জঙ্গল। নীল আকাশ ঝুঁকে পড়ে সবুজ চা বাগানের সঙ্গে কত কী কথা বলে। হাওয়ায় কান পাতলে শোনা যায়। কলেজ থেকে যতবার এদিকে ফিল্ড সার্ভেতে এসেছি, জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারিতে, আকাশ সবসময় মেঘে ঢাকা পেয়েছি। লাভা, লোলেগাঁও, রিশপ গেলাম দুবার। চারিপাশ শুধু সাদা, হিমালয়ের শ্রেণী দেখা তো দূর, নিজেকে দেখা দায়। সেবার পেলিং গিয়েও একই দশা। পর্বত দুহিতা উমাতো আমাদের ঘরের মানুষ, আমাদের মা। তাই গিরিরাজ আমার একরকম অভিভাবকও বটে। তাই মাতামহের ওপরে খুব অভিমান হয়েছিল। মনে মনে বলেছিলাম এতই যদি আড়াল রাখবে, আর তোমার কাছে আসবোনা। এবারে কর্তা যখন স্থির করলেন, গন্তব্য পূর্ব হিমালয়, তখন মুখভার করেছিলাম। পরে তাঁর মন রাখতে নিমরাজি হলাম। এখানে এসে বুঝলাম, না এলে অনেক কিছুই হারাতাম। নীল আকাশে মেঘের চিহ্নমাত্র নেই। যেখান থেকেই উত্তরে তাকাই না কেন, নীল পর্দার সামনে ঝকঝকে গিরিশ্রেণী, মাথায় হীরের মুকুট। এতটুকু আড়াল নেই। মাতামহ আমার সব অভিমান মূর্তি নদীর জলে ভাসিয়ে দিলেন। মূর্তি থেকে একটু এগোলে চালসা। এখানে আমি দু দুবার ভূগোলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ফিল্ড সার্ভে করেছি। অপূর্ব দৃশ্যপট, চোখ ফেরানো যায়না। এখানকার টিয়াবনের জঙ্গলের ধারে বেশিরভাগ হোটেল রিসর্টগুলো আছে। জঙ্গল খুব ঘন নয়। সূর্যের আলো ঢোকে। সবচেয়ে ওপরের সারির গাছেরা সরলবর্গীয় ও দীর্ঘকায়। তাদের গায়ে জড়িয়ে আছে বিচিত্র সব লতাপাতার দল, কেউ আলতোভাবে, কেউবা ঘন আশ্লেষে। মাটির কাছে ঝোপঝাড় আর বুনো ঘাস। উপরি পাওনা হল বনের মাটিতে লাল, হলুদ, সবুজ, বাদামি পাতার পুরু নরম চাদর। ডুয়ার্সের সব বনপথেই হাতিদের অবাধ গতায়াত। কিন্তু এই টিয়াবনে নাকি হাতি ঢোকেনা। তাই অন্য বনগুলির তুলনায় এই পথ মানুষের কাছে নিরাপদ। সেজন্যই এখানে কাছাকাছি হোটেলগুলি রয়েছে। কিন্ত হাতি ঢোকেনা কেন? লক্ষ্য করলাম, মধ্যম উচ্চতার গাছের সারিরা এখানে অনুপস্থিত। হুম্ বুঝলাম, এ বনে হাতির লুকোবার জায়গা নেই।

মূর্তি থেকে সবথেকে আকর্ষণীয় ঘোরার জায়গা হল, গরুমারা অভয়ারণ্য। নির্দিষ্ট দিনে পরিবারের সবাই মিলে ভাগাভাগি করে বনবিভাগের দুটি জিপে চড়ে বসলাম। দুপুর অল্পকাল হল গত হয়েছে। চারিপাশে বিকেলের নরম আলো। হুড খোলা জিপ। মাথার ওপরে ছাউনি না থাকলেও রড আছে, ধরে বসা যায়। এক একটি জিপে পিছনে আমরা ছ জন। সামনে চালকের পাশে একজন করে সহকারী আছে। রাস্তা মসৃণ, দুপাশে গরুমারা জঙ্গল। জিপ ছুটছে, হু হু হাওয়া। হাওয়ার ঝাপটায় টুপি উড়ে যাচ্ছে। চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। গরুমারা নামটার মধ্যে হিংস্র শ্বাপদের ভয় লুকিয়ে আছে। মধ্যপ্রদেশের মহাকাল পর্বতের অমরকন্টক শৃঙ্গে উঠতে গেলেও জঙ্গল পেরোতে হয়। প্রথমবার সে বনের নাম শুনে চমকে উঠেছিলাম। বনের নাম ‘অচানক মার’, অর্থাৎ sudden attack। এখানেও তেমন। নিশ্চয় সেই কবে থেকে বনবস্তির রাখালেরা বন এলাকায় গরুর বাগালি করতে যেত। কিন্তু শ্বাপদের আক্রমণে সব গরু বাড়ি ফেরাতে পারেনি।

অভয়ারণ্যের প্রবেশদ্বার আসতে এখনও কিছুটা পথ বাকী। হঠাৎ আমাদের জিপ গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ল। চালক বাঁদিকে ইশারা করলেন। রাস্তা থেকে জঙ্গল আলাদা করা আছে কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে। বেড়ায় মৃদু বিদ্যুৎ সংযোগ আছে। পশু ও মানুষ উভয়েরই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বনবিভাগের এই ব্যবস্থা। কিন্তু বেড়ার ওপারে ওটা কী? গাছের ডালপালা নড়ছে। একটা সাদা লম্বাটে জিনিস, ওটা হাতির দাঁত না! চালক ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে নিঃশব্দ থাকতে বলছেন। কয়েক মুহূর্ত রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা, জঙ্গলে প্রবেশের আগেই কি তরাইবনের রাজদর্শন সম্ভব হবে? বেশিক্ষণ লাগেনি। গাছের আড়াল থেকে ঐতো বেরিয়ে আসছেন বিশাল গজরাজ। এবারে মাথা আর সামনের পা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এবারে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। বিশাল বড় বড় কান দুটো নড়ছে। পুরো আত্মপ্রকাশের আগে বোধহয় মানুষের উপস্থিতির আঁচ পেলেন। পুরো শরীরটা পাতার আড়াল থেকে বেরোনোর আগে থমকে গেল। কিছুক্ষণ প্রাণভরে দর্শনের সুযোগ করে দিয়ে জিপ আবার চলতে শুরু করেছে। বনরাজ্যে ঢোকার আগেই রাজদর্শন। মনটা খুব খুশি খুশি লাগছে।

টিকিট কেটে গরুমারা অভয়ারণ্যে ঢোকা গেল। বিকেলের আলোয় অরণ্য বড় মোহময়ী লাগে। আমাদের দুটো জিপের সঙ্গে অন্য ট্যুরিস্টদের অারো দুটো জিপ রয়েছে। গোল বাধল অন্য ট্যুরিস্টরা আমাদের জিপের সঙ্গে যেতে চাইছেননা। তাঁরা ভাবছেন, সামনের জিপ জীবজন্তু দেখতে পাবে, কিন্তু যে জিপ পিছনে থাকবে তারা সুযোগ হারাতেও পারে। কিন্তু জঙ্গল গাড়ির রেষারেষি বা অসন্তোষ প্রকাশের জায়গা নয়। তাই দুটি দুটি করে জিপ আলাদা দুটি বনপথ ধরে।
বাঁকে বাঁকে দেখা হয়। তারপরে আবার চোখের আড়াল। অনেক পাখি ডাকছে। আহা যদি পাখি চিনতাম! গাছ, পাখি চিনিনা বলে, অনেক কিছু চোখের সামনে থাকলেও তাদের অস্তিত্ব অদেখাই থেকে যাচ্ছে। বড় আফসোস হয়।

হঠাৎ শুনি হাসির শব্দ। শুঁড়ি পথ ধরে আদিবাসী মহিলারা গল্প করতে করতে চলেছেন শুকনো পাতা আর কাঠের বোঝা মাথায় নিয়ে। চালকেরা গাড়ি দাঁড় করিয়ে তাঁদের সাবধান করে দিলেন, “তাড়াতাড়ি বাড়ি যাও, ঠাকুর আছে “। দেখলাম একথা শুনে মহিলাদের মুখ ভয়ে সাদা। গল্প থামিয়ে দ্রুতপদে তাঁরা বনপথের বাঁকে অদৃশ্য হলেন। ঠাকুর মানে? চালকের কথা শুনে আমাদের চক্ষু চড়ক গাছ। অরণ্যে প্রবেশের আগে আমরা নিজের চোখে ঠাকুর দেখে এসেছি। বিরাট বড় বড় কান নাড়াচ্ছিলেন। কিন্তু ঠাকুর বলে ডাকা হয় কেন? চালক কাম গাইডের মুখে অর্থবহ হাসি। বললেন, আর একটু অপেক্ষা করুন। নিজেরাই বুঝতে পারবেন। বিকেলের রোদ আর হলুদ নেই, লালচে হয়ে এসেছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যদেব লুকোচুরি খেলছেন। সামনে মাঠ। একটু দূরে আবার জঙ্গল শুরু হয়েছে। এবারে আশপাশে কিছু কিছু একচালা বাড়ি ঘর দেখা যাচ্ছে। চালক বললেন গরুমারার ভিতরে এটি একটি ছোট আদিবাসী গ্রাম বা বনবস্তি। সামনে একটি পাকা ঘর, কিন্তু দেয়াল পুরো ভাঙা। এঘরের ইতিহাস শুনে অবাক হলাম। পাশের ঘরটি প্রাথমিক ইস্কুল। ভাঙাঘরটি ছিল ঐ ইস্কুলের রান্নাঘর। কয়েকমাস আগে মিডডে মিলের খিচুড়ির গন্ধে হাতির দল হানা দিয়েছিল। ঘর ভেঙে খিচুড়ি খেয়ে গেছে। ক্ষেতে যখন ফসল পাকে, বর্গি হাতির দল আসে। ফসল কিছু খায়, বাকিটা তাদের পায়ের তলায় পিষে যায়। টাকাপয়সা, পরিশ্রম, খাদ্যসুরক্ষা, সম্বৎসরের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সবকিছুর একবেলাতেই সর্বনাশ হয়ে যায়। মানুষের প্রাণও যায় হরবখত। এই কারণে হাতি এই বনবস্তির মানুষদের কাছে সাক্ষাৎ যমদূত। হাতিকে এঁরা দূর থেকে পূজা করেন, দয়া ভিক্ষা করেন। তাই হাতিকে কে কেউ নাম ধরে ডাকেনা। ঠাকুর বলে ডাকা হয়। মনে পড়ল, মূর্তি নদীর পাশে যে রিসর্টে আমরা আছি, তার পাশে মহাকালের পুজো হচ্ছিল। মণ্ডপে শিব ঠাকুর আর হাতি ঠাকুর দুজনেরই বিগ্রহ ছিল। দেবতাত্মা হিমালয়ের দুই অধীশ্বরের কৃপাপ্রার্থী এখানকার মানুষ। বনবস্তির সীমান্তে এক অদ্ভুত গাছ। তার ডাল থেকে একধরণের গোল গোল কিন্তু বৃহদাকার ফল ঝুলছে। চালক জানালেন এত বছর এ বনে জীবিকা নির্বাহ করছেন, এগাছে ফল হতে প্রথমবার দেখলেন। এবছরে ফলেছে। আদিবাসীরাই জানিয়েছেন, এফলের নাম মহাবেল।

গ্রাম ছাড়িয়ে গাড়ি আবার জঙ্গলের রাস্তা ধরেছে। ওপাশে উঁচু, সোজা সরলবর্গীয় গাছ বেশি ছিল। এদিকে বিশাল বিশাল ডালপালা ছড়ানো পর্ণমোচী গাছ বেশি। অনেক ডাল ঝুঁকে গায়ে এসে পড়ছে। হুড খোলা জিপে খুব সাবধানে বসতে হচ্ছে। অসতর্ক হলে আহত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সরু ডাল তীক্ষ্ণ ফলার মতো চোখেও ঢুকে যেতে পারে। একটা ছোট ঝোরা বয়ে যাচ্ছে। নুড়ি পাথরে ভরা তার বক্ষ। মাঝখান দিয়ে তির তির করে বইছে জলের ধারা। কিন্তু তার চাইতে বড় জিনিষ হল, নদীর এপাশে ওপাশে অনেকগুলো ময়ুরী, আর কয়েকটা বিশাল ময়ুর ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুটো ময়ুর এতটাই কাছে, যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। নদী পেরিয়ে কিছুটা দূর এগিয়েছি। বন মনে হচ্ছে একটু হাল্কা হয়ে আসছে। ও আচ্ছা বন পেরিয়ে পাকা রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম।

বন চিরে পিচ সড়ক, দুপাশে ঘন ছায়ায় ঢাকা বৃক্ষরাজি। জিপ ছুটছে দুরন্ত গতিতে। একঘেয়ে জীবন যেন মিথ্যে। সেই কবে ছোটবেলায় সিনেমা দেখেছিলাম আফ্রিকান সাফারি। কিংবা বেনহারের রথের দৌড়। সব মনে পড়ে যাচ্ছে। কিন্তু না না বনের মধ্যে এত জোরে গাড়ি চলা তো ভালো নয়। বনের বাসিন্দারা রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ি চাপা পড়তে পারে। আমার শখ, আমার থ্রিল, তার জন্য ওদের জীবন নিয়ে খেলতে পারিনা। কিছুতেই না। চালককে বললাম আমাদের তাড়া কম, একটু ধীরে চলতে। চালক বললেন শীতের বেলা এমনিতে ছোট, তায় জঙ্গলে ছায়া, খুব দ্রুত অন্ধকার নামে। শেষ বিকেলে জীবজন্তুর দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু অন্ধকার নেমে গেলে সব আশায় ছাই পড়বে, তাই তিনি তাড়া করছেন। আমাদের অতশত অভিজ্ঞতা নেই। যা হোক গাইডের ওপরে সব ছেড়ে আবার প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে মগ্ন হলাম। আর একটু এগিয়ে জিপ এবার পিচ রাস্তার ওপাশের জঙ্গলে ঢুকল। আবার সেই সংকীর্ণ বনপথ। আমরা যেমন ঢুকছি, অনেকগুলো জিপ তেমন সাফারি সেরে বেরিয়ে আসছে। তাদের সময় শেষ।

পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে ওপাশের ফিরতি পথের জিপ থেকে প্রশ্ন ভেসে আসে, কিছু দেখতে পেলেন ভাই? আমার ভ্রাতুষ্পুত্রের চটজলদি জবাব শুনে চমকে যাই – হ্যাঁ হ্যাঁ গাছে গাছে বুনো পিঁপড়ে দেখলাম প্রচুর। দুই জিপেই হাসির রোল ওঠে। হাসির রেশ শেষ হবার আগেই উল্টোমুখে চলতি জিপ দুটি পরস্পরের থেকে অদৃশ্য হয়। মনে ভাবি পুরোটাতো রসিকতা নয়। জঙ্গলকে বুঝতে হলে শুধু বড় বড় জন্তুজানোয়ার দেখাটাই সব নয়। বড় গাছ, ছোট গাছ, ঝোপঝাড়, লতাপাতা, কীটপতঙ্গ, পশুপাখি সবাইকে নিয়ে পুরো সংসারটাকেই অনুভব করতে হবে। ছোট ছেলের মুখের কথা যেন একটা বড় শিক্ষা দিয়ে যায়। তবে চালক আশ্বাস দেন, যে আমরা যে সময়ে ঢুকেছি, সে সময়ে সচরাচর পর্যটকদের কপাল চওড়া থাকে। দেখি বনদেবীর কৃপা পাই কিনা।

হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি। সম্বিত ফিরতে দেখি, চালক দাঁড়িয়ে উঠে ঠোঁটে তর্জনী ঠেকিয়ে নিঃশব্দ থাকার ইশারা করছেন। ওনার দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি, পথের বাঁদিকে ঘন পাতার আড়ালে একটা কালো কিছু যেন রয়েছে। হাতি দেখার সময়ে যেমন ডালপালা নড়ছিল, এখানে তেমন নয়, বরং একটু যেন বেশিই স্থবির, কোনো নড়ন চড়ন নেই। ধীরে ধীরে চোখ সয়ে এলে মনে হল সামনের দিকে একটা বিশাল মুখ। তারপর পাতার আড়ালে দৃষ্টিগোচর হল একটা বাইসন রাস্তা থেকে সামান্য দূরে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে। নিবেদিতা স্কুলে আমাদের সন্ন্যাসিনী শিক্ষিকা বড় মিনুদির বাংলা ক্লাসের পড়া মনে পড়ে যায় – ‘নিবাতনিষ্কম্পমিবপ্রদীপম্’ বাতাস না থাকলে প্রদীপের শিখা যেমন নিষ্কম্প থাকে, তেমনই নিশ্চল এই বাইসন। অপেক্ষা করছে আমাদের সরে যাওয়ার জন্য। চালক জানালেন একটা যখন আছে, তখন আরো বাইসন কাছাকাছিই আছে। জিপ আবার স্টার্ট দিল। আরো বাইসন কাছাকাছি আছে, কথাটা মনের মধ্যে ঘুরছে। বেশি দূর যেতে হলনা। এবারে পথের ডানদিকে দেখা গেল একদল বাইসন। চালক দেখিয়ে দিলেন দলনেতা সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পিছনে আছে পুরো দল। রাস্তা পেরোবে। একটু সরে গিয়ে আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমাদের কাছে ভালো ক্যামেরা ছিলনা। চালক নির্দেশ দিলেন ছবি তুলতে হলে ফোনের ভিডিও ক্যামেরা অন করে প্রস্তুত হয়ে থাকুন। আমার ভাই ভিডিও ক্যামেরা অন করেছে দেখে, আমি ফোনের স্টিল ক্যামেরা অন করে রাখলাম। বাইসন বেরোনো মাত্র ক্লিক মারব। এক এক করে তিনটি বিশালাকায় পূর্ণবয়স্ক বাইসন ঊর্দ্ধশ্বাসে রাস্তা পেরিয়ে ওপাশে চলে গেল। কিন্তু হায়, তিনবারই আমার রিফ্লেক্স ফেল। ফোনে ট্যাপ করার সময় দিলনা। বুঝলাম কেন গাইড বলেছিলেন ভিডিও ক্যামেরা অন করতে। এদের যা গতি, আমাদের মতো আনাড়িদের পক্ষে স্টিল ক্যামেরায় বন্দী করা অসম্ভব। একটাই সান্ত্বনা, ভাই ভিডিও করতে পেরেছে।

আমাদের যে সৌভাগ্য হল, আমার কর্তার ভাগ্যে তা হলনা। কারণ তিনি ছিলেন অন্য জিপে। সে গাড়ির চালক অন্ধকারকে ভয় পান, তাই অনেক আগেই ফেরার পথ ধরেছেন। সত্যি, ট্যুরিস্টদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়, কোন গাইড দক্ষ, আর কে নয়। বনদেবীর কৃপার বিষয় তো আছেই, উপরি যদি অদক্ষ, আনাড়ি গাইড কপালে জোটে, দুর্ভাগ্যের আর আফসোসের সীমা থাকেনা। হরিদ্বারের উপকণ্ঠে রাজাজী ন্যাশানাল পার্কেও একই ঘটনা ঘটেছিল। আমরা পাহাড়ের গায়ে ছানা সমেত বিশাল হাতির দল দেখলাম, পথের ওপরে বসে থাকা চিতাবাঘ দেখলাম। অথচ আমার কর্তার জিপটি অন্ধকারের ভয়ে বহুক্ষণ আগেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। কর্তা প্ল্যান করেন, ছুটোছুটি করে ট্রেনের টিকিট কাটেন, হোটেল বুকিং করেন, যাতায়াত, খাওয়া দাওয়ার সুবন্দোবস্ত করেন, অথচ বনদেবী ওনার ওপর কৃপাদৃষ্টি দেননা, দুবার প্রমাণ পেলাম। সূর্যদেব পাটে বসেছেন। জিপ ফেরার পথ ধরেছে। হঠাৎ আমাদের অবাক করে দিয়ে এক পথের বাঁকে গাড়ি উল্টোমুখে গভীর জঙ্গলের দিকে চলতে শুরু করে। কিছুদূর এগিয়ে দেখি বিশাল জলাশয়, ওধারে বোধহয় নদী আছে। আমাদের আগে থেকেই আরও তিনটি জিপ ছড়িয়ে, ছিটিয়ে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে। কিছুটা দূরে পাহাড়। গরুমারার পাহাড়ী অংশ আছে, একথা জানা ছিলনা। গোধূলির আলোর শেষ রেশ পাহাড়ের গায়ে। আমাদের চারপাশে আঁধার নামছে। জল-জঙ্গল-পাহাড়-গোধূলি-আঁধারের ছায়া, একি আমারই পরিচিত বঙ্গদেশ! একটা অপার্থিব অনুভূতি মনটাকে ছেয়ে ফেলছে। এখানে আসার জন্যই কি আমার জীবনটা এতদিন অপেক্ষায় ছিল? কানের কাছে চালকের চাপাস্বর শুনে চমকে উঠি। তিনি বলছেন। জলের ধারে ন্যাড়া গাছ। আপনি নিজেকে আর গাছ মনে মনে এক সরলরেখায় যুক্ত করে সেই রেখা বরাবর পাহাড়ের খাঁজটা দেখুন। জীবনে প্রথমবার এমন জায়গা। অনভিজ্ঞতায়, আর চরাচরব্যাপী ধূসর আলোয় ঠিক ঠাহর হয়না। শুধু মনপ্রাণ দিয়ে সরলরেখা খুঁজি। ধীরে ধীরে চোখ সয়ে আসে। যা অদৃশ্য তা দৃশ্যমান হয়। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে জলের দিকে নামছে হস্তীযূথ। বড়দের শুঁড়ের তলায় শিশুরাও আছে। এপাশে পর্যটকরা বাক্যহীন, স্থবির। কন্যা ও দুই ভ্রাতুষ্পুত্র গা ঘেঁষে আসে। ওদের জড়িয়ে ধরি। ওপাশে হস্তীমায়ের সন্তান, এপাশে আমার। প্রকৃতির কোলে ওদের স্বাধীন বিচরণ মনে বড় বাজে, যন্ত্রণা দেয়। কারণ আমার নোঙর বাঁধা কিনারার কাছে। চমক ফেরে, হাতড়ে হাতড়ে ফোনটা বার করে পাগলের মতো কর্তাকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। বলতে চাই ফিরে এসো, দেখে যাও। লাভ হয়না। এখানে ভোডাফোন, এয়ারটেল কারোর টাওয়ার নেই। জিওফাই বার করে, মেসেজ করার চেষ্টা করি। মেসেজ ডেলিভারি হয়না। ধীরে ধীরে অাঁধার নামে। নদী, পাহাড়, দূরের জঙ্গল সবই অদৃশ্য হয়। গাড়িগুলির হেডলাইটের তীব্র আলো জ্বলে ওঠে। সে আলোয় পথ চিনে যে যার গাড়িতে চুপচাপ উঠে বসি। রাতের জঙ্গলে নিরাপত্তা কম। এবারে বিদায় নেবার পালা।

আঁধার বনপথ নিঝুম, শুধু গাড়ির শব্দ। ঘোর লাগা মন নিয়ে মাথা নিচু করে বসে ছিলাম। কী মনে হয় পিছন ফিরে ফেলে আসা বনপথের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে। মুখ তুলে গতির পিছন দিকে তাকাই। একলহমায় ছোটবেলার বাংলা পাঠ্য মনে পড়ে যায়, “আহা, কী দেখিলাম, জন্মজন্মান্তরেও ভুলিবনা”। আকাশে পূর্ণ চন্দ্র, মেঘের চিহ্ন মাত্র নেই। গরুমারার চরাচরে জোছনার বান ডেকেছে। বনপথ অনেক দূর পর্যন্ত চোখের সামনে স্পষ্ট। শুধু বড় বড় গাছের ছায়াগুলো কাঁপতে কাঁপতে দূরে সরে যাচ্ছে। রাতের জঙ্গলের সেই অনির্বচনীয় সৌন্দর্য পান করতে করতে মনে কাঁটা বেঁধে, কর্তাতো কিছুই দেখতে পেলেননা। একযাত্রায় পৃথক ফল, বিধির ষড়যন্ত্র। তখনও জানিনা আরও কিছু বাকি আছে। আবার জিপ দাঁড়িয়ে যায়। চড়া হেডলাইটের আলোয় দেখি বাইসনের দল ঠিক আগের মতোই ঊর্দ্ধশ্বাসে রাস্তা পার হচ্ছে। তৃপ্ত, পূর্ণ মন নিয়ে বনের সীমানার বাইরে আসি। কর্তা জিজ্ঞাসা করেন, এত দেরী হল কেন? আমার বলার ছিল, তোমার গাড়ি এত তাড়া করল কেন? শেষ পর্যন্ত নীরবই থাকি, কিছুই বলা হয়না। বাচ্ছারা কিছু বলার চেষ্টা করে। শুনতে পাই ও গাড়ির অন্য সওয়ারিরা ছোটদের খেপাচ্ছে, কিচ্ছু দেখেনি, যত্ত সব বানানো। মনে মনে হাসি, যা দেখেছি তা বানানো না হলেও স্বপ্ন তো বটেই। ওরা কিছুই দেখতে পায়নি, তাই মনের ঝাল মেটাচ্ছে। বাচ্ছাদের বলি শান্ত হতে। দুপাশে জঙ্গল আর চা বাগানের মধ্যে দিয়ে পাকা সড়ক জোছনায় ভাসছে। কনকনে হাওয়া দিচ্ছে। মাথায় উলের রুমালটা ভালো করে জড়িয়ে নিয়েছি। আমরা এখন মূর্তি নদীর ধারে রিসর্টে ফেরত যাচ্ছি।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল

সাউথ খয়েরবাড়ি টাইগার অ্যান্ড লেপার্ড রেসকিউ সেন্টার

পরিবারের সবাই মিলে জলদাপাড়ার বনে বেড়াতে এসেছি। রয়েছি মাদারিহাটে জলদাপাড়া সরকারী ট্যুরিস্ট লজে। জঙ্গলে হাতি সাফারি, বক্সা জয়ন্তী শর্ট ট্রিপ সম্পন্ন হয়েছে। একদিন পড়শি দেশ ভূটানের ফুন্টশিলিং এও ঘুরে আসা গেল। হাতে সময় আছে, তাই বনের ধারে সেল্ফ হেল্প গ্রুপের হস্তশিল্পের দোকানে কিছু কেনাকাটা করা হল। সময়টা ডিসেম্বরের শেষার্ধ। শীত ভালোই। কিন্তু ঋতুটা পোস্ট মনসুন তাই পূর্ব ডুয়ার্সের এই দিকটায় শ্যামলিমার কমতি নেই। নদীতে জলও আছে, শুকোয়নি। বাড়িতে থাকলে কাজের ঠেলায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দরকারী কথা ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ থাকেনা। গল্প করা, আড্ডা মারা তো ভুলতে বসেছি। এখানে সন্ধ্যে গুলো বেশ অলসভাবেই কাটছে। কতদিন যেন এমন ভাবে সকলের সঙ্গে কথা বলা হয়নি। এমনই এক সন্ধ্যেবেলায় পতিদেব খবর আনলেন খুব কাছেই নাকি একটা চমৎকার জায়গা আছে। আমাদের যদি ইচ্ছে থাকে, তিনি যাওয়ার বন্দোবস্ত করবেন। খবরটা তিনি যোগাড় করেছেন স্থানীয় গাড়ি চালকদের কাছ থেকে। সাউথ খয়েরবাড়ি টাইগার অ্যান্ড লেপার্ড রেসকিউ সেন্টার। চা বাগানে একা হয়ে যাওয়া চিতাবাঘের ছানা, মা হয়তো মারা পড়েছে মানুষের হাতে, অথবা জখম বাঘ বা চিতাবাঘদের ওখানে প্রাকৃতিক পরিবেশে শুশ্রূষা করা হয়। শুনে খুবই কৌতূহলী হলাম। কিন্তু মুখে অতটা উচ্ছাস প্রকাশ না করে বললাম যাওয়া যেতে পারে। এইটুকু ছলনার একটা কারণ আছে। পতিদেব সবসময় অনুযোগ করেন, আমি যখন কলেজের সঙ্গে কোথাও ফিল্ড সার্ভেতে যাই, তখন পাথরও রসসিক্ত মনে হয়। আবেগের প্রাবল্যে তখনই লিখতে বসে যাই। কিন্তু যখন বাড়ির সঙ্গে যাই (অর্থাৎ উহ্য কথাটা হল ওনার সঙ্গে যখন যাই) তখন সেই আবেগ থাকেনা, আর আমার কলমও সরেনা। এখন কৌতূহল পুরো দেখালাম না কারণ, জায়গাটি যখন এক্ষেত্রে ওনার আবিষ্কার, তখন পরীক্ষা করে দেখতে হবে স্থানটি লেখার জন্য যথেষ্ট আবেগ তৈরি করতে পারে কিনা।

ট্যুরিস্ট লজ থেকে পাকা সড়ক ধরে গাড়ি চলল মূর্তি নদীর দিকে মুখ করে। পুব থেকে পশ্চিম অভিমুখে চলেছি তাই ডানহাতে হিমালয়ের বরফ ঢাকা শ্রেণীও রয়েছে সঙ্গে। কিন্তু বেশি দূর নয় বড় জোর দু তিন কিলোমিটার পরেই আমাদের গাড়ি কাঁচা রাস্তায় নেমে পড়ল। দুপাশে গাছের সারি। জিজ্ঞাসা করে জানলাম আমরা খয়েরবাড়ি জঙ্গলে ঢুকে পড়েছি। বন এখানে মিশ্র প্রকৃতির। ডানদিকে মধ্যে মধ্যে লম্বা ঘাসের বন। বাঁদিকে অনেক বাঁশঝাড়। এত বড় জায়গা জুড়ে এত ঘন সবুজ বাঁশঝাড় আমি কখনো দেখিনি। দূরে দূরে ছোট ছোট গ্রামও আছে। কোথাও খানিকটা ফাঁকা জায়গা, সেখানে গরু চরছে। আমার ঠাকুরদার ভিটে উত্তর চব্বিশ পরগণার বসিরহাট মহকুমার বাদুড়িয়ায়। আর শ্বশুরবাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের গ্রামে। তাই জানি যে বাংলার গ্রামগুলির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ভালো রাস্তা হয়েছে। যানবাহনের সুবিধে বেড়েছে, কল খুললে জল। সকালে খবরের কাগজ, স্লাইস পাঁউরুটি আর প্যাকেটের তরল দুধ দশ বছর আগেও যা মিলতনা, এখন সবই দোকানে সাজানো। এই সব উন্নয়নের স্রোতে তাল মিলিয়ে বেড়েছে ঘরবাড়ি। বসিরহাটে আমাদের বাড়ির পাশে একটাও জমির টুকরো ফাঁকা পড়ে নেই। বিখ্যাত আমের বাগানগুলি এখন ইতিহাস। আদি বাসিন্দারা নগরের পথে হারিয়ে গিয়েছে। পড়শি দেশের মানুষেরা সেখানে সংসার পেতেছে। এসবের সাথে পাল্লা দিয়ে কমেছে গাছপালা। দক্ষিণ বঙ্গের পল্লীগ্রামগুলি কবির ভাষায় আর ছায়া সুনিবিড় নেই। কিন্ত উত্তর বঙ্গের বনের মাঝের এই গ্রামগুলি দেখে মনটা কেবলই ছোটবেলায় ফিরে যাচ্ছে। রাস্তা খারাপ, কাদা কাদা। জায়গায় জায়গায় জল জমে আছে। যতই এগোচ্ছি জঙ্গল ক্রমশ ঘন হচ্ছে। প্রায় বারো কিলোমিটার এগোনোর পরে লোকজনের দেখা মিলল। দেখা গেল ওটা গাড়ি পার্কিং এর জায়গা। এসে গিয়েছি তাহলে?

গাড়ি থেকে নেমে মনটা বেশ ভালো লাগলো। আসল প্রবেশদ্বার পর্যন্ত পৌঁছতে এখন প্রায় আধ কিলোমিটার হাঁটতে হবে। শুকনো লাল হলুদ পাতায় ঢাকা বনপথ। মাথার উপর সবুজ পাতার চাঁদোয়া। চড়া রোদ আছে। মাথায় রোদ লাগলে আমার মাথার যন্ত্রণা হয়। তাই সবসময় টুপি, রোদচশমার আশ্রয় নিই। গাড়ি থেকে নামার সময় সব উপকরণ সঙ্গে নিয়েছি। কিন্তু বনপথে প্রয়োজন পড়লনা। হাওয়ায় হাওয়ায় গাছের পাতার গান, পায়ের নিচে শুকনো পাতার মর্মর, কতরকম পাখি ডাকছে। একটা অদ্ভুত বন্য গন্ধ। নিজেকে হারিয়ে ফেলি। একটা আশ্চর্য চিন্তাশূন্য অনুভূতি মনটাকে ছেয়ে ফেলে। মনে হয় আজ কতকাল আমি হাঁটছি। সামনে পথের বাঁক। বাঁকের মুখে সিমেন্টের পিলারের উপর নাম লেখা সাউথ খয়েরবাড়ি লেপার্ড রেসকিউ সেন্টার। বাঁক ঘুরে কিছুটা পথ। তারপরে সেন্টারের বড় লোহার গেট। গেটের বাঁ পাশে টিকিট কাউন্টার।

গেট দিয়ে ঢুকে বেশ অনেকটা ফাঁকা জায়গা। একধারে নলকূপ ও একটি ছোট শৌচাগার। কিছুদূরে তিন চারটি ঘর দেখতে পেলাম। জিজ্ঞাসা করে জানলাম, এটা পিকনিক স্পট। আড়াইশ টাকা ভাড়া জমা দিয়ে এখানে পিকনিক করা যায়। কিন্তু চারিদিকে গাছপালা আর শুকনো পাতা। তাই এখানে কাঠ, কয়লা বা পাতা জ্বালিয়ে উনুন করা নিষিদ্ধ। নির্দিষ্ট ঘরে গ্যাস ওভেনে রান্না করা যায়। আরও কিছুদূর এগিয়ে যাই। এবারে বেশ বড় জায়গা জুড়ে ছোটদের খেলার পার্ক। দোলনা, ঢেঁকি, চড়ার মতো রেলিং সব আছে। অনেক জীবজন্তুর মডেল বানানো আছে। একটা দারুণ গণ্ডারের মডেল আছে। বাচ্ছারা তার পিঠের উপর চাপছিল।

এই জায়গাটা পেরোলে বন আবার অন্যরকম। একটা ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। ওপরে উঠে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। টাওয়ার থেকে দেখি সামনে নদী। নাম বুড়ি তোর্সা। সোনা গলা রোদ বুড়ি তোর্সার বুকে সোনালি রুপালি জরির সাজ পরিয়ে দিয়েছে। কে যে এমন চপল নদীর নাম রেখেছে বুড়ি, কে জানে। বুঝলাম ও অরণ্যের বড় আদরের বালিকা, তাই বুঝি বুড়ি নাম। ওয়াচ টাওয়ার থেকে নেমে নদীর দিকে এগোই। নদীর ওপর একটা কাঠের ব্রিজ। ছোট, তবু বড় সুন্দর। ব্রিজ থেকে নদীর দিকে ঝুঁকে দেখি। স্বচ্ছতোয়া তোর্সা। জলের গতি পাহাড়ী নদীর মতো দুরন্ত না হলেও, তরাইয়ের নদী হিসেবে যথেষ্ট। জলের নিচে আর একটা অরণ্য। অসংখ্য জলজ উদ্ভিদ, নানা আকৃতির, নানা রঙের। জলজ গাছের ফাঁকে অজস্র মাছের চলাচল। অনেকটা বড় বড় বাটা মাছের মতো দেখতে। কিন্তু স্থানীয় মানুষ জানান, এত ঠাণ্ডা জলে বাটা মাছ বাঁচেনা। এগুলো সব বোরোলি। জলদাপাড়ার সরকারী ট্যুরিস্ট লজের ক্যান্টিনে বোরোলি মাছের ঝাল খেয়েছি। পেঁয়াজ কুচি দিয়ে কষে রান্না করেছিল। দারুণ স্বাদ। হলুদ, পাঁচফোড়ন, বা সামান্য সর্ষেবাটা দিয়েও অসামান্য লাগবে আশা করি। কর্তার ইচ্ছে ছিল, সকালে কাঁচা বোরোলি মাছ বাজার থেকে কিনে রাস্তার ধারে, আদিবাসীদের পাইস হোটেলে অর্ডার মাফিক রান্না করাবেন। তিনি বাংলার সাগরতটের বাসিন্দা এবং মৎস্যবিলাসী। কিন্তু কপাল খারাপ। এলাকার অর্থনীতি অনেকটাই বোরোলি নির্ভর। তাই যে কজন নদী থেকে বোরোলি পান, তাঁদের সঙ্গে সব হোটেল, লজের বন্দোবস্ত থাকে। তাঁরা সরাসরি সেখানেই মাছের যোগান দেন। সেইজন্য খোলা বাজারে বোরোলি পাওয়া আর রথযাত্রা বাম্পারের ফার্স্ট প্রাইজ জেতা কতকটা একইরকম। কপালের জোর লাগে। গতকাল কর্তামশাই কাকভোর থেকে চড়া রোদ বেরোনো পর্যন্ত গলদঘর্ম হয়ে ঘুরে একটিও বোরোলির দেখা পাননি। আজ নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে বোরোলি দেখে অপাঙ্গে তাঁর মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করি। কন্যার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায়। দুজনেই হাসি গোপন করি। না, তাঁর চোখে কোনো হাহুতাশ নেই। বরং একদৃষ্টিতে দেখছেন বোরোলি মাছের চলাচল। সে দৃষ্টিতে গভীর তৃপ্তির সঙ্গে আছে অনুসন্ধিৎসা। কাঠের ব্রিজ পেরিয়ে দেখি খানিকটা দূরে একটা ছোটো বনবিভাগের বিট অফিস রয়েছে। আরও ওপাশে কর্মচারীদের থাকার কোয়ার্টার। বনপথ ডানদিকে বাঁক নেয়। কর্তা, কন্যাকে বোঝাতে বোঝাতে চলেছেন, অন্য ছোট মাছের সঙ্গে বোরোলি মাছের গড়নে কি তফাৎ। আমার শ্বশুর বাড়িতে সাকুল্যে আটখানি পুকুর। সেখানে ছিপ ফেলা আর জাল ফেলা নিত্য কর্মের মধ্যে পড়ে। আমার কর্তা পুকুরে নেমে, খালি হাতে কই মাছ ধরে ধরে ছুঁড়ে দিচ্ছেন, আর মেজো ননদ হাঁড়ি হাতে দৌড়ে দৌড়ে সেগুলি হাঁড়িতে পুরছেন, এই দৃশ্য আমি স্বচক্ষে দেখেছি। এছাড়াও গাঁয়ের বাজারে ওঠে নানা আকার ও আকৃতির অদ্ভুত দর্শন সমুদ্রের মাছ। অন্যান্য কুলীন মাছের তুলনায় দাম বেশ কম। পুষ্টিকর ও স্বাদু। বাজার থেকে ব্যাগ ভর্তি হয়ে সেগুলিও আসে। এই ধরণের মাছ সম্পর্কে বিয়ের আগে কোনো ধারণাই ছিলনা আমার। এগুলি উপকূল অঞ্চলের দরিদ্র মানুষের শরীরে প্রোটিনের যোগানদার। তাছাড়াও ঐ এলাকা চিংড়ি চাষের জন্য বিখ্যাত। আবার দীঘা মোহনায় ইলিশের ঢল নামলে বাড়িতে ফোন চলে আসে। ভোররাতে আমরা ঘুম থেকে ওঠার অনেক আগেই কর্তার নেতৃত্বে বাহিনী মৎস্য অভিযানে বেরিয়ে পড়ে। বাড়িতে লোক এলে তো কথাই নেই। সাধারণ দিনেও গ্রামের বাড়িতে তিন চার রকম মাছ রান্না হওয়াটাই দস্তুর। বিয়ের আগে আমি মাছ এড়িয়ে চলতাম। আমার সেজজ্যাঠামশাই কৌতুক করে বলতেন, এ মেয়ের মেছো বাড়িতে বিয়ে হবে। সে কথা যে এমনভাবে সত্যি হবে, কে জানতো!!

ডানদিকে এগোতেই চোখ আটকে যায়, প্রায় দু মানুষ সমান জাল। তবে আমার মতো চার ফুট দশ ইঞ্চি মানুষের মাপে দু মানুষ নয়। ছ ফুট লম্বা মানুষের মাপে ভাবতে হবে। কাছে গিয়ে দেখি লোহার জাল সিঙ্গল নয়, ডবল। জাল দিয়ে ওপাশের ঘন জঙ্গল আলাদা করা আছে। একজন গাইড এগিয়ে আসেন। ঠিকই ধরেছি। এটা সেই জায়গা, যেটা দেখতে আসা। ওপাশে অসুস্থ, জখম, অনাথ বন-বাসিন্দাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র। কেউ কেউ মানুষখেকোও আছে। তবে ওরা যদি নিজে থেকে ধরা না দেয় জালের এপার থেকে ওদের দেখতে পাওয়ার আশা বৃথা। জালের ধারে রাস্তা তিন হাত সমান চওড়া হবে। বাঁদিকে জাল। ডানদিকে খয়ের, চন্দন, শিরীষ, সেগুন, ওদলা, দারুচিনি, রুদ্রাক্ষ গাছের সারি। কাকে ছেড়ে কাকে দেখব। গাইড এক এক করে চিনিয়ে দিচ্ছেন। বনের বাসিন্দাদের নিভৃতে থাকার অধিকারকে সম্মান জানিয়ে বলছি, যদি একজনকেও না দেখি শুধু গাছ দেখার জন্য এখানে বার বার আসা যায়। জলদাপাড়া গেছি, গরুমারা, এমনকি সুন্দর বনেও ঘুরেছি। কোথাও গাছের গায়ে গায়ে এমন নিশ্চিন্তে ঘোরা যায়না। যদিও এটা পুরোটা স্বাভাবিক বন নয়, তবু বনপথে হাঁটা আর নিরাপত্তা দুটো একসঙ্গে পেতে গেলে এটুকু কম্প্রোমাইজ করা যেতেই পারে।

গাইড ভদ্রলোকের কাছে বেশ চমকপ্রদ সব তথ্য পাওয়া যায়। এই কেন্দ্র শুরু হয় ২০০৫ সালে। ঐ সময়ে সার্কাসে জীবজন্তু রাখা নিষিদ্ধ হয়। অলিম্পিক সার্কাসের এগারোটি বাঘ সরকার বাজেয়াপ্ত করেন। তাদের প্রথমে হলং নদীর পাশে, পরে এই বুড়ি তোর্সার ধারে নিয়ে আসা হয়। সেই থেকে কেন্দ্রটি চলছে। ঐ বাঘগুলি মারা গেছে। কেন্দ্র খালি হয়নি। বন কেটে বসত করে, রাস্তা বানিয়ে, বন চিরে দ্রুত বেগে রেলগাড়ি চালিয়ে মানুষ কেবলই নামানুষদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে। তাই জখম, অনাথ পশুদের সংখ্যাও বেড়ে চলে। কথা বলতে বলতে অনেকটা এগিয়ে এসেছি। গাইড বললেন আপনাদের কপাল ভালো। ঐ দেখুন রকি এসেছে। জালের নিচের দিকটা সলিড পাত। সেই ছায়ায় বসে আছে একটি চিতাবাঘ। সন্তর্পণে জালের কাছে গিয়ে ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করি। জালে হাত দেওয়া কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ। ওপারের বাসিন্দারা মোটেই পোষা নয়। এজায়গাটাও চিড়িয়াখানা নয়। এদিক থেকে হাত বাড়ালে ওপাশ থেকেও হাত বাড়াতে পারে। সেক্ষেত্রে এপাশের হাতটি খোয়া যাওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা। রকি আমাদের দেখলেও বিশেষ পাত্তা দিলনা। পর্যটক দেখে বোধহয় অভ্যাস হয়ে গেছে। আর একটু এগিয়ে বিরাট জলের ট্যাঙ্ক। তারপরে দেখি ওমা একটা বিরাট উঁচু ঘর, আকারেও বিশাল। যদিও ফাঁকা, ভিতরটা দেখতে ঠিক বাথরুমের মতো। ব্যাপারটা কী? এত বড় ফাঁকা বাথরুম কি কাজে লাগে রে বাবা। গাইড যা শোনালেন, তাতে আমাদের চক্ষু চড়ক গাছ। এই কেন্দ্রের পরম মাননীয় বাসিন্দাদের চানঘর এটি। চানঘর ফাঁকা ছিল, তাই চানঘরে গান তাঁরা কেমন গাইবেন সেটি কল্পনা করে নিতে হল। স্বকর্ণে শোনার সুযোগ হয়নি। গাইড আর একবার গতিরোধ করলেন। ঐ দেখুন মিঠু এসেছে। তাঁর কন্ঠে স্নেহ ঝরে পড়ে। কই মিঠু কই! তাড়াতাড়ি এগিয়ে যাই। আর একটি চিতাবাঘ ঘাসের মধ্যে বসে আছে। শুনলাম ক্ষুদ্র একটি মানবক তার পেটে গিয়েছে। সেই থেকে এখানে বন্দী। আশ্চর্য এই পৃথিবী। আরও অদ্ভুত মানুষের আচরণ। কোথাও সে অসহায় প্রাণীকে খুঁচিয়ে মারছে। আর এখানে মানবশিশুর হত্যাকারীকেও সে পরম যত্নে রক্ষা করছে। কন্যা অন্যদিকে ছিল। তাকে ডাকি এদিকে আয় চট করে, মিঠু চলে গেলে আর দেখতে পাবিনা। গাইড আশ্বাস দেন, চিন্তা নেই, এখন খাবার দেওয়ার সময় হয়েছে। বিরক্ত না করলে এখানেই থাকবে।

চিতাবাঘের এলাকা শেষ হল। কিছুটা ফাঁকা জায়গা পেরিয়ে একটা বড় বাঘের মূর্তি। আরও সামনে বিরাট গোলাকার এনক্লেভ, ঠিক চিড়িয়াখানার মতোই। এটা বনাঞ্চল নয়। সিমেন্টের খাঁচা ঘর, তবে বেশ বড় বড় সেগমেন্ট। হাঁকডাক শুনতে পাচ্ছিলাম। কাছে গিয়ে দেখি, একি এযে সোঁদরবনের দক্ষিণ রায়। খিদে পেয়ে গেছে, বিরক্ত হয়ে ঘোরাঘুরি করছেন। কিন্তু মহারাজ খোঁড়াচ্ছেন কেন? হায় ভগবান, মহারাজের তিনটি পা। চতুর্থটি শুনলাম কুমীরে কেটে নিয়েছে। বাকি খোপে খোপেও বাঘ বা চিতাবাঘ আছে, আবছা দেখা যাচ্ছে, সব ভিতরে ঢুকে বসে আছে। বুঝলাম এজায়গাটা একটু বেশি অসুস্থ বা প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্ধারিত।

কেটে গেল অনেকটা সময়। এবার যে পথ দিয়ে এসেছিলাম সে পথ দিয়েই ফেরার পালা। আবার বুড়ি তোর্সা, বোরোলি মাছ। কন্যার মনোভাব পিতৃকুলের মতোই। মাছধরায় উৎসাহ। বাপবেটি যতক্ষণ পারা যায় নদীতে ঝুঁকে রইল। যাওয়ার সময় খেয়াল করিনি। ফেরার সময় দেখলাম এক বিশাল যজ্ঞডুমুর গাছ, তার দুটো গুঁড়ি। গুঁড়ি থেকে নিচের দিকে ডানার মতো অনেকগুলো প্রক্ষিপ্ত অংশ বেরিয়ে এসেছে। নেহাত বাড়ি থেকে এসেছি তাই, আমার ছাত্রছাত্রীরা যদি সঙ্গে থাকত, আমি নিশ্চিত ঐ গাছটা ঘিরে তাদের লুকোচুরি খেলা চলত বেশ কিছুক্ষণ। প্রকল্প এলাকায় নদীতে বোটিং এর ব্যবস্থা আছে। ব্যাটারি চালিত গাড়িতে লেপার্ড সাফারিও করা যায়। তবে পায়ে হেঁটে যে অনুভূতি পেলাম, তা গাড়িতে বসে হত বলে মনে হয়না। তাই পায়ের জোর থাকলে হেঁটে ঘোরাই ভালো।

লোহার গেটের বাইরে আবার সেই ছায়াঘেরা বনপথ। টোটো দাঁড়িয়ে আছে। চালকদের ইচ্ছে বাকি পথটুকু আমরা না হেঁটে টোটোয় সওয়ারি হই। কিন্তু এই বনপথে হাঁটার লোভ ছাড়তে পারিনা। কি জানি, আর কোনোদিন সুযোগ হবে কিনা। জীবনের অর্ধশতক অতিক্রান্ত প্রায়। আবার এলেও যদি হাঁটুর জোর না থাকে। যখন প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করেছিলাম, তখন ভোরবেলা না হলেও বেশ সকাল। এখন বেলা বেড়েছে। পথের দুধারে গ্রামের লোকেরা হরেকরকম পসরা সাজিয়ে বসেছে। পর্যটকদের নজর কাড়ার জন্য নানান সুরে ডাকাডাকি করছে। ডাব, ঝালমটর, ঘুগনি, পেয়ারা, শসা কত কী। গরম চা চাইলে তাও পাওয়া যাবে। সবাই মিলে ডাব খাওয়া হল। গাড়ির দিকে এগিয়ে চলি। হঠাৎ পিছন থেকে কাতর ডাক শুনতে পেলাম। আমার থেকে নাও না গো দিদি, কেউ কিনছেনা। আমার গাছের, নিজে বানিয়েছি। থমকে পিছন ফিরি। ঘোমটা মাথায় লাজুক বধূ। মায়া মাখা চোখ দুটি ছলছল। অন্য দোকানিদের মতো হাঁকাহাঁকি করতে পারছেননা। সামনে খয়েরি রঙের ছোট ছোট বুনো কুল, মশলা মাখা। আমি রাস্তায় এভাবে কুল খাইনা। কলেজে পড়তে লেডি ব্রেবোর্নের সামনে বড় বড় টোপা ঝাল কুল বিক্রি হত, তখনও খাইনি। ভাতের সঙ্গে কুলের অম্বল হলে আলাদা কথা। কিন্তু এখানে All women solidarity এর কথা মাথায় রেখে কুল কেনার সিদ্ধান্ত নিই। বধূর মুখে স্বর্গীয় হাসি। একমনে মশলার ফাইন টিউনিং করছেন। কুড়ি টাকায় এক বড় ঠোঙা কুল। এক গাল হেসে বধূ বলেন, খেয়ে দেখো দিদি কেমন লাগে। মন রাখতে হেসে দুটো কুল মুখে দিই। ওঃ জিভে অমরাবতীর ঝংকার ওঠে। গুড় মিষ্টি কুল, সামান্য একটু টকের ভাব, সঙ্গে ঝালঝাল চটপটা মশলা। দলের সদস্যদের কিছু কিছু বিলি বাঁটোয়ারা করে ঠোঙাটা নিজের হাতে সাবধানে রাখি, ছোটদের দল যে কোনো মুহূর্তে ছিনতাই করতে পারে। মুখের গুলো শেষ হলেই আরও দুটো দুটো মুখে পুরতে থাকি। অবশেষে গাড়ি ফেরার পথ ধরে। জানলা দিয়ে নজরে পড়ে হাতির মল। আসার সময় তো দেখিনি। দেখে তো খুব পুরোনো মনে হচ্ছেনা। তবে কি হাতির দল সদ্য সদ্য এ পথ দিয়ে গেছে! স্নায়ু টানটান করে বসি। গাড়ি বড় রাস্তায় উঠে পড়ে। মনের মধ্যে অনেক ভাবনা ভিড় করে আসে। আমার এই এক জ্বালা। যখন কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে ফিল্ড সার্ভেতে আসি, তখন আমার কন্যা এগুলো দেখতে পেলনা ভেবে মনটা খচখচ করে। এখন ওকে নিয়ে ঘুরছি, তবু মনে কাঁটা বেঁধে। এখানে বায়োডাইভার্সিটি রেজিস্টারটা করাতে পারলে কত ভালো হত। তুষার মুকুটপরা হিমালয়কে ডান পাশে রেখে শিলিগুড়ির দিকে চলেছি। কলেজে ফিরেই এই বিষয়ে আলোচনা করতে হবে।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল

সিকিয়া ঝোরায় কিছুক্ষণ

ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে মাদারিহাট ফিল্ড সার্ভেতে এসেছি। সারাদিন রোদে রোদে ঘুরে কাজ হয়েছে। সন্ধ্যেবেলা ছেলেমেয়েদের ম্যাপের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে আমরা শিক্ষক শিক্ষিকারা আলোচনা করছি আগামীকালের কাজ কি হবে। আমার সহকর্মিনী ও দিদি বল্লরীদি আমাদের কলেজে আসার আগে কোচবিহার কলেজে পড়াতো। তাই উত্তর বঙ্গে এলে ওর স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যায়। কথায় কথায় ও বলল, কোচবিহার কলেজে থাকাকালীন একবার এমন একটা জায়গায় ওরা সহকর্মীরা আর প্রিন্সিপাল মিলে বেড়াতে গিয়েছিল, সেখানে জঙ্গল আর নদী। কিন্তু ডুয়ার্সের অন্য জঙ্গল আর নদীর থেকে সেজায়গাটা আলাদা, কারণ সুন্দরবনে যেমন নৌকো করে জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করা যায়, জঙ্গলটাকে কাছ থেকে অনুভব করা যায়, এখানে তেমনই নৌকো করে ডুয়ার্সের জঙ্গলের হৃদয়ে প্রবেশ করা যায়। কিন্তু এখন কিছুতেই নামটা মনে পড়ছেনা। শুনে তো আমাদের ভীষণ আগ্রহ। বল্লরীদিকে ঘিরে ধরলাম, প্লীজ প্লীজ একবার মনে করার চেষ্টা কর। মনে আর পড়েনা। শেষে কনিষ্ঠ মধুসূদন বলল, আসুন বল্লরীদি, ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় এসে ঐ অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে মনোনিবেশ করুন। নামটা মনে না পড়ে যাবেনা। হোটেলের আলোর ক্ষীণ রেশ যত দূর যায়, তত দূর গাছের মাথার রেখার আবছা আভাষ পাওয়া যায়। কিন্তু তারপর ঘন কৃষ্ণ দেওয়ালে দৃষ্টি আটকে যায়, সবই একাকার। এক এক পল কাটছে, আমাদের উত্তেজনার পারদ আরও উঁচুতে উঠছে। বল্লরীদির মুখটা আরও করুণ হচ্ছে। মনে পড়ি পড়ি করেও শেষ রক্ষা হচ্ছেনা। আধঘন্টা কাটল, মশককুলের মহাভোজ শুরু হয়েছে। প্রতি মুহূর্তেই আমন্ত্রিত মশক অতিথির নতুন নতুন ঝাঁক জলদাপাড়ার জঙ্গল থেকে হোটেলের বারান্দায় পদার্পণ করছে। আমরাও হাল ছাড়ার পাত্র নই। বল্লরীদি বলল দাঁড়াও আমি পুরোনো কলিগদের ফোন করি। তেমনই একজন চলভাষের ওপার থেকে জানালেন, জায়গাটার নাম উত্তর পানিয়ালগুড়ি। ব্যাস, কেল্লা ফতে। ঐ একটা নাম সম্বল করে আমরা সকলে যে যার চলভাষে অন্তর্জালের অলিগলিতে খোঁজাখুঁজি শুরু করি। বেশি চেষ্টা করতে হয়না। একটু পরেই নদীর নাম বেরিয়ে পড়ে : সিকিয়া ঝোরা।

সেখানে কী আছে, কিভাবে যাওয়া যায় একটা আভাষ পাওয়া যায়। আগে যাঁরা গেছেন, তাঁদের লেখা, তাঁদের তোলা স্থিরচিত্র বা চলচ্ছবি আমাদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তোলে। হোটেলের মালিক, গাইড, গাড়িচালক, ট্যুর অপারেটর সবার সঙ্গে আলোচনায় বসে যাই। ঠিক হয়, ফেরার দিন সময় বার করে যাওয়ার চেষ্টা করা হবে। ফিল্ড সার্ভের শেষ দিনে শেষ বিকেলে নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে রেলগাড়ি চাপতে হবে। সারাদিনে অনেকটাই সময়। বক্সা জয়ন্তী থেকে ফেরার পথে প্রায় বিকেল তিনটে নাগাদ ছখানা ভাড়া গাড়ি করে মোট একচল্লিশজন পৌঁছলাম উত্তর পানিয়ালগুড়ি গ্রামে।

বেশ শান্ত প্রকৃতি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিকিয়াঝোরা ইকোট্যুরিসম ক্যাম্পাসে ঢোকার মুখেই টিকিট কাউন্টার। মাথাপিছু কুড়িটাকা দিয়ে টিকিট কেটে ভিতরে ঢোকা গেল। ঢুকেই ডানদিকে একটি বড় ক্যান্টিন। চা আর টুকিটাকি জলখাবার পাওয়া যায়। দুপুরে ভাতও মিলবে। একটা জিনিসে চোখ আটকে গেল, বসার টুল আর সামনের টেবিল সবই চা গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি। উত্তর বঙ্গের গর্ব তার চা বাগান। বাগানের বয়স পঁচিশ বছর হলে উৎপাদন কমে। তাই সব পুরোনো গুঁড়ি তুলে ফেলে, নতুন চা গাছ লাগানো হয়।

এলাকার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে সিকিয়া ঝোরা। এটি ডুয়ার্সের বালা নদীর উপনদী। জন্ম জয়ন্তী পর্বত শ্রেণীতে। সামনে একটি বাঁশের ব্রিজ। পেরিয়ে ওপারে গেলে হাল্কা জঙ্গল। ভিতরে বেশ পরিপাটি বসার জায়গা করা আছে। দূরে ঘন জঙ্গলের হাল্কা আভাষ। ডানদিকে ক্যান্টিন ছাড়িয়ে একটু এগোলেই সামনে বাচ্ছাদের খেলার জায়গা। দোলনা আছে। প্রকৃতির কোলে বড়দেরও ছোট হতে ইচ্ছে করে। তাই বড়রা গেলেও কারোর আপত্তি নেই। ঘাসের মধ্যে শুঁড়ি পথ ধরে আরও এগোলে নৌকোর ঘাট। ঘাটের দিকে এগোচ্ছি, হঠাৎ একটা কোলাহল কানে এল। পিছনদিকে তাকাতে না তাকাতে দেখি, ছেলেমেয়েরা বাঁশের ব্রিজের দিকে দৌড়োচ্ছে। কি হল রে বাবা, হাঁচড় পাঁচড় করে ওদের অনুসরণ করি। দেখি জলের মধ্যে বিদ্যুৎ চমকানোর মতো গতিতে হিলহিল করে চলেছে এক বিরাট গোখরো।

নৌকোর ঘাটে দুটি নৌকো, কিন্তু সাধারণ নৌকোর মতো দেখতে নয়, বরং পার্কের মোটর চালিত বোটের মতো রঙচঙে, গড়নটাও সেরকম। নৌকোর গতির দিকে মুখ করে অর্থাৎ নৌকোর খোলের দিকে আড়াআড়ি পরপর বেঞ্চি পাতা। এক একটি নৌকোয় তিরিশ জনের মতো বসতে পারে। একজন করে মাঝি, তিনি দাঁড়িয়ে লগি ঠেলছেন। আমরা একচল্লিশজন মোটামুটি সমভাগে দুটি বোটে চেপে বসলাম। নৌকাবিহারের জন্য পারানি আলাদা গুনতে হয়।

নৌকো চলতে শুরু করে। জলপথে জঙ্গল ভ্রমণের জন্য সময় বরাদ্দ আধঘন্টা। এখন ঘড়িতে সময় বিকেল সাড়ে তিনটে। জঙ্গলের নিয়ম অনুসারে কোনরকম হৈচৈ বারণ। নৌকোর দুলুনিতে মনেও খুশির দোলা লাগে। ঝিরিঝিরি হাওয়া বয়। জঙ্গলের অপার্থিব শব্দ। সবাই চুপ করে আছি। আমরা টিচার, স্টুডেন্ট আর এই প্রকৃতি সবাই যে এক, কোনো অমিল নেই, সেই কথাটা বড় একান্তভাবে অনুভব করি। জীবনের কত দায়িত্ব, না পাওয়ার বেদনা, বিশ্বাসভঙ্গের ব্যথা, শারীরিক কষ্ট, সব ভুলে যাই। নিজেকে ভীষণ হাল্কা লাগে। জীবনটা কানায় কানায় পূর্ণ মনে হয়।

কয়েক মুহূর্ত পরেই জলের দিকে নজর পড়ে। জলের তলায় দৃষ্টি থিতু হতেই চমকে উঠি। একি!! তবে কি এটাই রূপকথার পাতালপুরীর রাজকন্যের রাজত্ব!! জল কাচের মতো স্বচ্ছ নয়, আবার ঘোলা অস্বচ্ছও নয়। বলা যেতে পারে হালকা সবুজ অনচ্ছ, ইংরেজিতে যাকে বলে translucent, জলের তলায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে অসংখ্য ধরণের জলজ উদ্ভিদ। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে, পাতা ওয়ালা একধরণের লম্বাটে গাছ। মনে হল বড় হোটেলের বড় অ্যাকোরিয়ামে আমি এমন গাছ দেখেছি। আকাশে ঝকঝকে সূর্য। কিন্তু নদীর ওপরে গাছের ছায়া। তাই খোলা নৌকোয় থাকলেও একটুও রোদ লাগছেনা। নদী খুব চওড়া নয়।
দুপাশ থেকে জংলি গাছ ঝুপসি হয়ে ঝুঁকে পড়েছে জলের ওপর। আমরা এখন নদীর বাঁপাড়ের কাছ দিয়ে চলেছি। ঠিক পাশ দিয়ে নয়, বলা যেতে পারে নদীখাতের মধ্য রেখা থেকে একটুখানি বাঁদিকে সরে রয়েছি। এর চেয়ে বেশি কাছে গেলে বিপদ হবে। জঙ্গল এত ঘন, মাঝে মাঝে ফাঁকগুলো মনে হচ্ছে যেন গাছ ঢাকা আদিম গুহা। নৌকোর মাঝি এমনই একটি গাছ – গুহার সামান্য কাছে নৌকোর গতি কমিয়ে বললেন, দেখুন। জঙ্গলের অন্ধকারে চোখটা সইয়ে নিয়ে মনে হল, একটা ছিট ছিট চাদরের মতো কিছু নিচু গাছের ডালে আটকে রয়েছে। আমাদের সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তরে মাঝি জানালেন ওটা হরিণের দেহাবশেষ। গত পরশু চিতাবাঘের বনভোজনের চিহ্ন। বনের ভিতর গাঢ় অন্ধকার। মাঝি বলেন অনেক জোড়া চোখ আমাদের লক্ষ্য করছে। আমরা দেখতে পাচ্ছিনা। গা ছমছম করে ওঠে। একটু এগিয়ে নদী খানিক চওড়া। তার পরে একটা ইংরেজি ইউ অক্ষরের মতো বাঁক। বাঁক ঘুরে দেখা যায় জঙ্গলের অন্দরমহল আর ঝুঁকে পড়া গাছে ঢাকা বহুদূর জলপথের সুড়ঙ্গ। জলে মেঘের ছায়া আর পড়ন্ত বিকেলের সোনা রং। সব মিলিয়ে চোখে ঘোর লাগে। আমি কি ছিন্ন ওজোন গ্যাসের চাদরে মোড়া, কার্বন মনোক্সাইডের বিষবাষ্পে জ্বরাক্রান্ত পৃথিবীতেই আছি, নাকি বিজ্ঞানী হকিন্সের কল্পনার মতো মানুষ খুঁজে বার করেছে এ এক অন্য আদিম গ্রহ, মানুষের যন্ত্র সভ্যতা যাকে কলুষিত করেনি।

হঠাৎ তাল কাটে। নৌকো মুখ ঘুরিয়ে ফেরার রাস্তা ধরে। সকলে একসঙ্গে ককিয়ে উঠি, কী হল!!! মাঝি জানান সরকারী নিয়ম অনুযায়ী পর্যটকদের এই পর্যন্তই নিয়ে যাওয়া যায়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাড়তি টাকার বিনিময়ে আরও কিছুদূর ওঁরা নিয়ে যান বটে, তবে তা নিরাপত্তা বিচার করে। বিশেষ ট্রেনিং, পোষাক, উপকরণ ছাড়া আরও গভীরে যাওয়া সমীচিন নয়। ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা সবার আগে। আর ফিল্ড সার্ভের শেষদিনে বাড়তি টাকার যোগাড় নেই। তাই ফিরতেই হয়। সবাই মিলে অনুনয় করি আরও একটু গেলে কী দেখতে পেতাম, প্লিজ বলুন। মাঝি বলেন অনতিদূরেই আজ নিয়ে তিনদিন বিরাট অজগর জলের ধারে শুয়ে রয়েছে।

ফেরার পথে নৌকো অপর পাড় ধরে আগের নিয়মেই চলে। এদিকে কাদা বেশি। কিছুদূর অন্তর অন্তর কাদার মধ্যে একসঙ্গে অনেক গর্ত দেখতে পাচ্ছিলাম। কারণটা আন্দাজ করেছিলাম। মাঝির কথায় নিশ্চিত হলাম। এগুলি গজরাজদের নদী পারাপারের চিহ্ন। এদিকটায় জলের ওপরে অনেক ঝাঁঝি। তারমধ্যে পানকৌড়ি আর বুনো হাঁস। আবার ঘাটে ফিরে আসি। অনেক কিছু পেলাম। কিন্তু আরও একটু বেশি পেলে কি আরও ভালো হতনা!!!

জায়গাটা ছেড়ে যেতে কারোরই ইচ্ছে করছেনা। পায়ে পায়ে হেঁটে এসে ক্যান্টিনে বসি। চা খাই। তখনই জানতে পারলাম, এই প্রকল্পটি সম্পূর্ণভাবে মহিলাদের সেল্ফ হেল্প গ্রুপ দ্বারা পরিচালিত। সদস্য মহিলারা নিজেই এসে আলাপ করেন। অনুরোধ করেন, পর্যটকদের মতামতের খাতায় যেন কিছু লিখে দিই। প্রকল্প এলাকার ভিতরে নতুন বাড়ি, শৌচাগার তৈরি করা হয়েছে। এখনও উদ্বোধন হয়নি। এখানে সরকারী ট্যুরিস্ট লজের মতো পর্যটকেরা থাকতে পারবেন। এটি পুরোনো প্রকল্প। কিন্তু মাঝে নানা সমস্যায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার নতুন করে সাজিয়ে গুছিয়ে গতবছর মানে ২০১৮ সালে নাম বদলে খোলা হয়েছে। প্রকল্প চালিয়ে যা আয় হয়, তার এক অংশ সরকারী কোষাগারে জমা পড়ে। বাকিটা সদস্যদের মধ্যে ভাগ হয়। আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামের মহিলারা এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। আলাপ জমে উঠেছে। এমন সময়ে বনদপ্তরের সরকারী আধিকারিক পৌঁছলেন পরিদর্শনে। মহিলারা আবার সেদিকে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমরাও এবার ওঠার তোড়জোড় করি। হঠাৎ দেখি দুই মহিলা ছুটতে ছুটতে আসছেন। হাত দেখিয়ে আমাদের দাঁড়াতে বলছেন। কাছে এসে অনুরোধ করেন, আমরা যেন সরকারী আধিকারিককে বলি, আমরা এখানে এসে সরকারী আবাসে থেকে ডুয়ার্সের সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাই, তাই তাড়াতাড়ি যেন পর্যটক আবাস চালু করা হয়। নৌকোর সংখ্যা যেন বাড়ানো হয় আর যে নৌকোগুলি আছে, সেগুলি যেন মেরামত করে ভালো রাখার ব্যবস্থা করা হয়। মহিলাদের দৃঢ় বিশ্বাস, আমরা কলেজের দিদিমণি, মাস্টারমশাইরা বললে, স্যার না করতে পারবেননা। তাঁদের সরল, অকপট অনুরোধ না রাখার কোনো কারণই নেই। কারণ এগুলো আমাদেরও মনের কথা। আধিকারিক অল্পবয়স্ক অমায়িক ভদ্রলোক। পরিদর্শনে এসেছেন। সঙ্গে তরুণী স্ত্রী ও তাঁর বাপের বাড়ির লোকজন বেড়াতে এসেছেন। কথাবার্তায় তিনি জানালেন খুব শিগগিরই আবাসটি উদ্বোধন হবে। পর্যটনের মানোন্নয়ন এখন রাজ্য সরকারের অন্যতম প্রায়োরিটি। কথা শেষ হলে প্রকল্পের পরিচালিকা মহিলারা হাত ধরে ধন্যবাদ জানান। সজল চোখে অনুরোধ করেন আবার যেন আসি। ধন্য আমার বাংলা ভূমি। মাত্র দুঘন্টার আলাপে এত আন্তরিকতা, এত স্নেহ, চোখের জল। আমরা শহরের মানুষ, কেউ স্বার্থ ছাড়া বুঝিনা। বনের ধারের সরলতার ছোঁয়ায় মনটা একই সঙ্গে মুগ্ধ, তৃপ্ত কিন্তু ভারি হয়ে ওঠে। আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করে। কিছুটা গেলেই নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশন। ট্রেনের টিকিট কাটা আছে। বিদায় ডুয়ার্স। এবার আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল

প্রবন্ধ পর্যালোচনা

বর্তমান পত্রিকা, ৬ই জানুয়ারি

প্রবন্ধ : হনুমান

আজ রবিবারের বর্তমান পত্রিকায় নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ীর লেখা পড়লাম, হনুমানের চরিত্র নিয়ে লিখেছেন। লেখাটা পড়ে ছেলেবেলার অনেক কথা মনে পড়ে গেল।

আমার ছোটোবেলায় বাড়ীতে চাঁদমামা নয় শুকতারা নেওয়া হত। বাবা মা বোধহয় ভেবেছিলেন আমাকে শুধু রাজা রাণী বণিক আর সুন্দরী মেয়ের গল্পে বেঁধে রাখবেন না। সেই শুকতারা পড়া থেকে গল্প পড়ার এমন নেশা হল, যে বই খবরের কাগজ মায় বাজার থেকে আসা ঠোঙা অবধি পড়ার আগে ফেলা যেতনা। সেই শুকতারায় মাঝে মাঝে পৌরাণিক গল্প  ছাপা হতো। লেখকের নামটা বানান করে পড়ে নিতাম বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র। নিবেদিতা ইস্কুলে পড়তাম। ইস্কুলে সংস্কৃত পড়ানো হতো। রামনবমীতে শ্রদ্ধাপ্রাণাজী রাম আর হনুমানের কথা ব্যাখ্যা করতেন। সবকিছু না বুঝলেও মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। একদিন আবিষ্কার করলাম বাড়ীর আলমারিতে বহু খণ্ডে কালী প্রসন্ন সিংহের মহাভারত। মহাভারতে ডুব দিলাম।  মাধ্যমিকে ইস্কুলে প্রথম হয়ে অনেক পুরস্কারের ভীড়ে চোখে পড়ল সুখময় ভট্টাচার্যের রামায়ণের চরিতাবলী। এক নিশ্বাসে শেষ করলাম। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে কিনে নিলাম মহাভারতের চরিতাবলী। কলেজে এসে সান্নিধ্য পেলাম খ্যাতনামা অধ্যাপিকা সাহিত্যিক গৌরী ধর্মপালের। তিনি একবার রামায়ণ নিয়ে কলেজে একটি প্রদর্শনী করেছিলেন। সেখানে রামায়ণে রামের রাজত্বকালের বৈজ্ঞানিক পরিমাপ নিয়ে তর্ক জুড়ে দিলাম। তিনি হেসে বললেন তোমার বিষয় কী? আমি বললাম ভুগোলে অনার্স। তিনি বললেন সঙ্গে কী? বললাম অঙ্ক, অর্থনীতি। হাত ধরে বললেন, শুক্রবার করে আমার ক্লাস করবে? মূর্খ আমি, প্রথম বর্ষের ছাত্রী। তাঁর খ্যাতি, ধার, ভার কিছুই জানতাম না, নির্বিকার বলে দিলাম আমার তো প্র্যাকটিকাল আছে। কালের নিয়মে  একদিন বীরেন্দ্র কৃষ্ণের কলম থেমে গেল, কিন্তু তখন কলম ধরেছেন আর একজন নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুড়ী। কোথাও তাঁর লেখা পেলে গোগ্রাসে গিলতাম। কিন্তু এই পুরাণ চর্চার মধ্যে না ছিল কোনো ক্ষুদ্র স্বার্থ, না ছিল বিভেদের কালি। আজ রাম নামে বুক কাঁপে। রাম নামের আসল অর্থ যে সুন্দর তাই ভুলতে বসেছি।

ই-পেপার থেকে কেমন করে লেখা শেয়ার করতে হয়, সে কৃৎকৌশল জানা নেই। পাঠক লেখাটি পড়ে দেখতে পারেন।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল

নানা রঙের দিনগুলি

ডঃ শারদা মণ্ডল

বিভাগীয় প্রধান, এসোসিয়েট প্রফেসর, ভূগোল বিভাগ, প্রভু জগদ্বন্ধু কলেজ, আন্দুল, হাওড়া

অবসারভারের ভাইবোনেরা সনির্বন্ধ অনুরোধ জানিয়েছে, বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে আমাদের সেদিনের কথা নিয়ে কিছু লিখতে। আমাদের কেজো মস্তিষ্কের ভিতরে কিছু লুকোনো সিন্দুক থাকে, তার নাম মণিকোঠা। সেই মনিকোঠা, পুরীর মন্দিরের মণিকোঠা  থেকে কিছু কম সুরক্ষিত নয়। লোকমুখে শুনেছি পুরীর মন্দিরের সেই মণিকোঠা পাহারা দেন নাগরাজ। আর মনের মণিকোঠা খুলতে গেলে এক ভয়ানক অসুখে আক্রান্ত হতে হয়, সেই অসুখের নাম হল স্মৃতি মেদুরতা। অতীত বর্তমানের বিভেদ যায় ঘুচে। বর্তমানের ছাত্র ছাত্রী, প্রিন্সিপালের আদেশ, প্রশাসনিক কর্ম ব্যাস্ততা এক লহমায় ফিকে হতে শুরু করে। পাশে এসে দাঁড়ায় সেদিনের বন্ধুরা, কতো অভিমান, কতো সমবেদনা, কতো অট্টহাস্য, কতো হইচই, কতো চোখের জল। কিছু মুখ ঘষা কাচের আড়ালে অস্পষ্ট। কুয়াশা সরিয়ে তাদের মুখ গুলো স্পষ্ট করার চেষ্টায় মেতে উঠি। কিছু নাম মনে পড়ি পড়ি করেও পড়েনা। সেগুলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে আজকের দরকারি কাজটাই যায় বন্ধ হয়ে। বয়স বাড়ছে বলে কি বেশী বলে ফেলছি আজকাল! ভণিতা থাক। গল্পে আসি।

লেডি ব্রেবোর্ন থেকে আমি গ্র্যাজুয়েট হয়েছি ১৯৯২ সালে। আর ওই বছরেই আমার বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে আসা। সায়েন্স কলেজে যেদিন প্রথম আসি, সেদিন আমাদের প্রথম ক্লাস বোধহয় নিয়েছিলেন মালাকার বাবু, প্রফেসর সুধীর মালাকার। তারপর ধীরে ধীরে সুভাষ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু এবং মনতোষ  বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচিত হলাম। প্রাকৃতিক ভূগোলের নানা দিক চোখের সামনে উন্মোচিত হতে শুরু করলো। সমুদ্র বিজ্ঞানের হাতেখড়ি হোল অধ্যাপক হিমাংশু রঞ্জন বেতালের কাছে। আঞ্চলিক ভূগোল পড়াতেন বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন রসিক মানুষ। আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলাম, সেটা হল যত শীত ই পড়ুক স্যার কখনও সোয়েটার পরেননা। অর্থনৈতিক ভূগোলের নানা দিকের সঙ্গে পরিচয় করালেন অধ্যাপিকা সুপ্রভা রায় এবং অধ্যাপিকা জয়তী হাজরা। উদ্ভিদ ভূগোল পড়াতেন অধ্যাপক পান্নালাল দাস আর মৃত্তিকা ভূগোল পড়াতেন রবিন বাবু। জলবায়ু বিদ্যা পড়াতেন অধ্যাপক পীযূষ কুমার সাহা। পরে তিনি উত্তর বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছিলেন।

আমাদের ক্লাস শুরু হয়েছিল পুজোর ছুটির আগে না পরে, সেটা ঠিক মনে পড়ছেনা। তবে আমাদের ভর্তির পরপরই কিন্তু নবীনবরণ হয়নি। কারণ সে সময়ে আমাদের সিনিয়র দাদা দিদিদের পরীক্ষা চলছিলো। বেশ কিছুদিন পরে আমাদের নবীনবরণ হল। সে সময়ে আমরা আর আনকোরা মোটেও নই, বরং বেশ পাকা হয়ে উঠেছি। অর্থাত স্যার আর ম্যাডামদের নেচার, এক্সপারটাইস, ম্যানারিস্‌ম এগুলো আমাদের তখন ভালোভাবে জানা হয়ে গিয়েছিল। নবীনবরনের সবচেয়ে মজাদার অংশে ছিল স্যার, ম্যাডামদের তাতক্ষণিক বক্তৃতা। বক্তৃতার বিষয়গুলি লটারির মাধ্যমে না করে “পারপাসিভ স্‌ট্‌র‍্যাটিফায়েড  স্যামপ্লিং” মেথডে ঠিক করা হয়েছিল।  

বীরেশ্বর বাবুর টপিক পড়ল – ‘ইভনিং ইন টোকিও”। স্যার আমাদের জাপান পড়াতেন। ঘরে তখন পিন পড়লে শব্দ শোনা যাবে। যুগ টা আজকের মতো ছিলনা। ছাত্রছাত্রীদের সম্পর্ক টিচারদের সঙ্গে এতো খোলামেলা ছিলনা। স্যার তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে ঈষত কাঁপা কণ্ঠস্বরে (বিচলিত হয়ে কাঁপা নয়, ওটাই ওনার স্বাভাবিক কণ্ঠস্বর) মাইক হাতে বললেন, জাপানের আগের নাম ছিল ‘এদো’। পৃথিবীতে অনেক ভালো ভালো জিনিষ আছে, যেগুলো এঁদো, যেগুলো পচা সেগুলো তোমাদের না জানলেও চলবে। হলে তখন হাসির রোল। এবারে পি. কে. এস এর পালা। আগেই বলেছি তিনি জলবায়ুবিদ্যা পড়াতেন। তাঁর বিষয় পড়ল – ‘একখানা মেঘ ভেসে এলো বাতাসে’। আবার নীরবতা। স্যার বেশী হাসতেন না। গম্ভীর মানুষ। তাঁর গলার স্বর ও ছিল ভারিক্কি। স্টেজে উঠে মন্দ্র স্বরে তিনি বললেন – এই বিষয়ে আমি অনেক ভালো বলতে পারতাম, যদি পঁচিশ বছর আগে এটা পেতাম। কারণ তখন আমি কবিতা লিখতাম। এখন এটাই আমার মনে হচ্ছে যে সচরাচর একখানা মেঘ বাতাসে ভাসেনা। এরপর ডাক পড়ল বেতাল বাবুর। তাঁর বিষয় টা হল – ‘রাম আর বাবরি, হয়ে গেল রাবড়ি’। স্যারের মুখে এই অভাবনীয় বিষয় শুনে আমরা হতবাক। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, অনুষ্ঠান চলছিল ১৯৯৩ সালের প্রথম দিকে, কাজেই ৯২ এর ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার স্মৃতি ও ক্ষত তখন টাটকা। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা তে আমরা দুঃখিত হয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু স্যার কে এমন টপিকে বলতে হবে জেনে মজা পেয়েছিলাম।  কারণ বেতাল বাবুকে আমরা ভীষণ ভয় করে চলতাম।  তিনি যে খুব বকাবকি করতেন তা নয়। দিনের প্রথম ক্লাস বেতাল বাবুর থাকত। সকাল দশটার নির্দিষ্ট ক্লাসে তিনি দশটা বাজতে এক মিনিট আগে ঢুকে পড়তেন। ক্লাসে ঢোকার দরজা আমাদের জন্য বন্ধ হয়ে যেত। তখন নোটের বা বোর্ডের ছবি তুলে অথবা লেকচার রেকর্ড করে হোয়াট্‌স্‌ অ্যাপ্‌ এ পাঠিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি আবিষ্কার হয়নি। কাজেই ক্লাসের বিশ্লেষণ শুনতে না পেলে বিষয় টা বোঝা সম্ভব ছিলনা। দরজা বন্ধ হলে উপস্থিতির খাতায় শতকরা হিসেবে পিছিয়ে পড়তে হত। স্যার ওনার পুরো সিলেবাসে কোন দিন, কোন সময়ে কোন টপিক পড়াবেন তা সেশনের শুরুতে নোটিস বোর্ডে টাঙ্গিয়ে দিতেন। সদ্য ইউনিভারসিটি তে পা দেওয়া, ছক ভাঙ্গা, ডানা মেলা যৌবন স্যারের কঠোর নিয়মানুবর্তীতাকে দূর থেকে সমীহ করত, কাছে যেতে ভয় পেত। পাঠক মনে করতে পারেন আমি ধান ভানতে শিবের গান গাইছি, কিন্তু সেদিনের অনুষ্ঠানগৃহটিকে অনুভব করতে হলে প্রেক্ষিতটা জানা জরুরী। যাক। স্যার শুরু করলেন – ‘আমার বিষয়টা হল – রাম আর বাবরি, হয়ে গেল রাবড়ি। এগুলো হোল এমন জিনিস…’- এই টুকু বলে তিনি একটা চক চাইলেন।  দোর্দণ্ডপ্রতাপ বেতাল বাবু এই গুগলি কেমন করে সামলান  সেটা দেখার জন্য আমরা রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা করতে লাগলাম। বেতাল বাবু চক নিয়ে ব্ল্যাক বোর্ডে একটি সরল রেখা কে জ্যামিতিক ভাবে কেমন করে তিন ভাগে ভাগ করা যায় নিবিষ্ট চিত্তে বুঝিয়ে যেতে লাগলেন। আমাদের এদিকে পেটের দম ফেটে যাচ্ছে। মুখটাকে নির্বিকার রাখার চেষ্টা করে চলেছি। আমি তো নিজে বেঁটে মানুষ। সামনের লম্বা বন্ধুর আড়ালে মুখ লুকিয়েছি। আমার পিছনের জনের কি অবস্থা হয়েছিল তা অবশ্য তাকিয়ে দেখিনি। দু তিন মিনিট পরে দেখলাম কয়েকজন বেঞ্চের তলায় ঢুকে গেলো। বোধকরি তাদের সামনে আমার মতো খর্বকায় প্রাচীর ছিল। একটু পরে আমাদের আয়োজক দাদাদিদিরা সম্বিত ফিরে পেয়ে সমস্বরে প্রতিবাদ জানালো –‘না না স্যার, আজকে পড়ানো যাবেনা’। কিন্তু বেতাল বাবু তড়িত গতিতে উত্তর দিলেন যে, বলতে শুরু করলে পুরোটা না বুঝিয়ে তিনি থামতে পারেননা। এটি তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ। শেষকালে আয়োজকদের মধ্যে থেকে সময় পরিচালক বলে উঠল স্যার আপনার সময় শেষ। বেতাল বাবু ডায়াস থেকে নেমে গেলেন। এবারে এলেন পি. ডি.। তিনি উদ্ভিদ ভূগোল পড়াতেন। ডবিনমায়ারের বই এর অলিগলি তাঁর হাত ধরেই চেনা। আর অরগ্যানিক ডেব্রিস কেমন করে ডিকমপোস্‌ড্‌ হয় ততদিনে আমাদের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। পি. ডি. ডায়াসে উঠলেন। পকেট থেকে বিষয় লেখা কাগজটি ভাঁজ খুলে পড়লেন। তাতে লেখা ছিল ‘নেমে এসো মাটিতে’। পরশুরামের বিরিঞ্চিবাবা  গল্পের সত্যব্রতের মতো আবার আমাদের পেটের ভিতরে হাস্যস্রোতকে চেপে রাখার পরীক্ষা শুরু হল। এবারে আবার কি হয়। কিন্তু ডায়াসের ওপরে যা ঘটল তার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। স্যার কাগজটি আবার ভাঁজ করে পকেটে রাখলেন আর ঘোষণা করলেন যে, তাতক্ষণিক বক্তৃতা না দিয়ে তিনি অন্য একটি অভিনয় করে দেখাবেন। আচ্ছা লেখা দিয়ে কি অভিনয় করা যায়? লিখে কেমন করে বোঝাবো, যে স্যার কেমন করে কি অভিনয় করলেন। পি. ডি. স্যারের গল্প ঃ- এক স্কুলে নাটকের মহড়া চলছে। তাতে এক ছাত্রকে বলতে হবে – “সূর্য সিংহ, কোন সাহসে তুমি রণ করো মোর সনে!” যে ছাত্রটি অভিনয় করছে, সে মিনমিন করে নেতিয়ে পড়া ভঙ্গিতে কথাটি বলছে। এবারে নাট্যপরিচালক শিক্ষক কেমন করে একই সঙ্গে কণ্ঠস্বরের ওঠাপড়া ও শারীরিক অভিনয় করে ছাত্রটিকে শেখালেন, সেটা পি. ডি. স্যার আমাদের অভিনয় করে দেখালেন। দুই হাতের তর্জনী মুখমণ্ডলের চারপাশে গোল করে ঘুরিয়ে সূর্য দেখিয়ে, আবার দুই আঙ্গুল মাথার দুপাশে নিয়ে শিং দেখিয়ে নাট্যপরিচালকের ভূমিকায় স্যার ধমক দিয়ে বলে উঠলেন সূ – ঊ – র্য  সিং – হ !! তারপরে দুই হাতের শার্টের হাতা গুটিয়ে পেশী আস্ফালন করে বলে উঠলেন – কোন সাহসে তুমি রণ করো মোর সনে? কিন্তু বাক্যটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্যারের ডান হাত একটি বিশেষ ভঙ্গিতে স্থির হয়ে রইল। ছোটোবেলায় লুকিয়ে লুকিয়ে শিখেছিলাম ঐ ভঙ্গিটির মানে হচ্ছে কাউকে বক দেখানো। আহা ছিঃ ছিঃ স্যার এমন ……। কিন্তু না সিনিওরেরা জানিয়ে দিল ওটি জিজ্ঞাসা চিহ্নের ভঙ্গিমা। সমস্ত হল হেসে লুটিয়ে পড়লো।

এবারে এলেন জয়তীদি। তিনি ছিলেন স্মার্ট, চটপটে ও আধুনিকা। তাঁর সাজগোজ আমরা বিশেষভাবে লক্ষ্য করতাম। তাঁর বিষয় হল, ‘ওহ্‌, সো কিউট’। আবার হাস্য বিস্ফোরণ। জয়তীদি স্টেজে এসেই দর্শকদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, ‘কিউট মানে টা কি’। এক একটা ব্যাখ্যা এপাশ ওপাশ থেকে আসতে শুরু করলো। তিনি কোনো না কোনো কারণ দেখিয়ে সেই ব্যাখ্যাগুলিকে খারিজ করে, মনোমত ব্যাখ্যার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। মানে কেতাবি ভাষা বাদ দিয়ে, আজকের ছাত্রছাত্রীদের মুখের ভাষায় বলি, তিনি আয়োজক ও দর্শক দু পক্ষকেই বোর করে জব্দ করে দিলেন। একেবারে শেষে উঠলেন সুপ্রভাদি। তিনি নিজের সম্ভ্রান্ত আচরণ ও পরিশীলিত বাচনভঙ্গি দিয়ে আমাদের মন জয় করেছিলেন। সুপ্রভাদির বিষয় পড়ল – হাত বাড়ালেই বন্ধু। তিনি স্টেজে উঠে বললেন, ‘আমি কেবল একটি কথাই বলব। হাত বাড়ালেই বন্ধু, কিন্তু বেশী বাড়ালেই শত্রু হয়ে যায়’। তাঁর এই কথাটি আমি মনে রেখেছি এবং পেশাদার জীবনে সর্বদা মেনে চলার চেষ্টা করি।

তোমরা কি ভাবছ, যে আমি মজা করার জন্য বাড়িয়ে, বানিয়ে এসব লিখছি! বিশ্বাস না হয় তো চুপি চুপি এল. এন. এস. স্যারকে জিজ্ঞাসা কোরো। তিনিও সেদিন ঐ হলে উপস্থিত ছিলেন। আজ কলমটা এখানেই থামালাম। বাকি গল্প পরের বছর অবসারভারের পরের খণ্ডের জন্য তোলা রইল।  

লেখাটি ২০১৮ সালে কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অবসারভার পত্রিকাতে প্রকাশিত।

আমার বিজয়া

আমার ঠাকুরদার বাড়ি বসিরহাটের আড়বেলে গ্রামে। ছোটবেলায় দশমী সেখানেই কাটাতাম। তিন শিবের মন্দিরের মাঠে মেলা বসত। চারপাশের সব গ্রামের দুর্গা প্রতিমা মেলায় আসতো বরণের জন্য। তারপরে সংলগ্ন বিশাল পুকুরে নৌকোর জোড় ভেঙে যেত, মা দুর্গা জলে পড়ে যেতেন, দু চোখ জলে ভরে যেত। বাড়ি ফিরে বেল পাতায় “শ্রী শ্রী দুর্গা সহায়” লিখে বাড়ি বাড়ি বিজয়া সারা হতো, আর মিষ্টির সঙ্গে ঝুলিতে যে পার্বণী জমা পড়ত তাও কম ছিলনা। এই পর্ব শেষ হলে কলকাতায় ফেরা অ্যানুয়াল পরীক্ষার প্রস্তুতি। তাই মন চাইতনা দশমী আসুক। তখন বিজয়া মানে ছিল জেঠু, জ্যাঠাইমা, আর দাদা দিদিদের সঙ্গে বিচ্ছেদের কষ্ট।

বিয়ের পরে নতুন বউ, শ্বশুর বাড়িতে দুর্গাপুজো, শ্বাশুড়ি বরণ শেখাচ্ছেন, সিঁদুর খেলা, বরের ক্যামেরায় সিঁদুর মাখা মুখের ছবি, মত্ত হয়ে ছিলাম। বাড়িসুদ্ধ সবাই মাতোয়ারা। চোখে পড়লো, সবার প্রিয় বড়দি, আমার বড় ননদ ঘরে মুখ চেপে ডুকরে কাঁদছে। বিধবা বলে এই আনন্দে তার অধিকার নেই, নিজের বাড়িতেও। সেদিন বিজয়া মানে বুঝলাম exclusion and seclusion of widows in the Hindu rituals

এক সরস্বতী পুজোয় ব্যাস্ত উচ্ছল বাড়িতে সদ্য বালিকা কন্যা পিছন থেকে পোষাক টেনে ধরে, বলে, “মা, পিরিয়ড হয়েছে বলে অঞ্জলি দিতে পারবোনা মা? আমি কি অশুদ্ধ?” মায়ের জগত টলে ওঠে। যে মা সহস্র বছর আগেকার পুরোহিততন্ত্রের কাছে প্রশ্ন না তুলে আত্মসমর্পণ করে বসে আছে, তার চোখের সামনে থেকে কালো পর্দা খসে যায়। মেয়ের সুপ্রীম কোর্ট, তার মা বলে, “অঞ্জলি দিতে পারবে মা, ওসব কুসংস্কার।”

আজ কিশোরী মেয়েদের সাথে নবীনা মা অষ্টমীর অঞ্জলি সাজায়, তারা রজঃস্বলা কিনা তার তোয়াক্কা না করে।

দশমীর বরণে পারুল কে ডাকি। অল্প বয়সে পারুলের বর সুরাটে কাজ করতে গিয়ে এইডসে মারা যায়। তিনটি শিশু সন্তানসহ একঘরে পারুলকে শাশুড়ি আশ্রয় দেন। পারুল বলে, “হ গো বৌদি, মো কি ঘর পূজা করিনা? শুধু সিন্দুর দিবানি, প্রদীপ, ধূ্‌প, মিষ্টি, জর, পানও সবু দিবা”। প্রথাগত শিক্ষার নাগালের বাইরে থাকা আত্মবিশ্বাসী নারীকে বড় ভালোলাগে।

আছেন এক ঋজু বৃদ্ধা, অন্নদা দিদি, একা থাকেন, পুজোয় একাই আসেন, বয়স প্রায় নব্বই। অন্নদা দিদিকে ডাকি,”আসুন, বরণ করবেন।” বৃদ্ধার চোখে বিস্ময় আর অবিশ্বাস চিকমিক করে, “মো বরণ করিবি বউমা?”

পারুলের আত্মবিশ্বাসে, অন্নদা দিদির আনন্দে, কন্যাদের তেজে আমার বিজয়া সম্পন্ন হয়।

যেদিন চারপাশের বেশিরভাগ মানুষ মূর্খ ছিল, সেদিন একজন রামমোহন, একজন বিদ্যাসাগরের প্রয়োজন ছিল। আজ তো সে অবস্থা নয়। শিক্ষার আলো আমি পেয়েছি। আমার ক্ষুদ্র জগতে, আমিই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও, আমিই রোকেয়া।

এইটুকু বুঝেছি, একটা অপ্রয়োজনীয় সংস্কার যদি নিজের জীবন বৃত্তে ভাঙতে পারি, পরবর্তী প্রজন্মের একটু সুবিধে বাড়বে। And yes, my feelings are gender neutral. কারণ প্রতিটি পদক্ষেপেই বর ও দেবর দুজনেরই পূর্ণ সমর্থন পাই।

কলমে ড. শারদা মণ্ডল